আল কুরআন


সূরা আল-ইনসান (আদ-দাহর) (আয়াত: 14)

সূরা আল-ইনসান (আদ-দাহর) (আয়াত: 14)



হরকত ছাড়া:

ودانية عليهم ظلالها وذللت قطوفها تذليلا ﴿١٤﴾




হরকত সহ:

وَ دَانِیَۃً عَلَیْهِمْ ظِلٰلُهَا وَ ذُلِّلَتْ قُطُوْفُهَا تَذْلِیْلًا ﴿۱۴﴾




উচ্চারণ: ওয়া দা- নিয়াতান ‘আলাইহিম জিলা- লুহা- ওয়া যুলিল্লাত কুতূফুহা- তাযলীলা- ।




আল বায়ান: তাদের উপর সন্নিহিত থাকবে উদ্যানের ছায়া এবং তার ফলমূলের থোকাসমূহ তাদের সম্পূর্ণ আয়ত্তাধীন করা হবে।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৪. আর তাদের উপর সন্নিহিত থাকবে গাছের ছায়া এবং তার ফলমূলের থোকাসমূহ সম্পূর্ণরূপে তাদের আয়ত্তাধীন করা হবে।




তাইসীরুল ক্বুরআন: জান্নাতের বৃক্ষরাজির ছায়া তাদের উপর থাকবে, আর ফলের গুচ্ছ একেবারে তাদের নাগালের মধ্যে রাখা হবে।




আহসানুল বায়ান: (১৪) সন্নিহিত বৃক্ষছায়া তাদের উপর থাকবে[1] এবং ওর ফলমূল সম্পূর্ণরূপে তাদের আয়ত্তাধীন করা হবে। [2]



মুজিবুর রহমান: উহার বৃক্ষছায়া তাদের উপর ঝুকে থাকবে এবং এর ফলমূল সম্পূর্ণ রূপে তাদের নাগালের মধ্যে থাকবে।



ফযলুর রহমান: জান্নাতের (গাছের) ছায়া তাদের ওপর নুয়ে থাকবে (ছায়া দেবার জন্য গাছগুলো তাদের ওপর নুয়ে আসবে) এবং তার ফলমূল তাদের নাগালের মধ্যে নিচে ঝুলিয়ে রাখা হবে।



মুহিউদ্দিন খান: তার বৃক্ষছায়া তাদের উপর ঝুঁকে থাকবে এবং তার ফলসমূহ তাদের আয়ত্তাধীন রাখা হবে।



জহুরুল হক: আর তাদের সন্নিকটে থাকবে তাদের গাছের ছায়া, আর তাদের থোকা-থোকা ফল থাকবে নত হয়ে নাগালের মধ্যে।



Sahih International: And near above them are its shades, and its [fruit] to be picked will be lowered in compliance.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১৪. আর তাদের উপর সন্নিহিত থাকবে গাছের ছায়া এবং তার ফলমূলের থোকাসমূহ সম্পূর্ণরূপে তাদের আয়ত্তাধীন করা হবে।


তাফসীর:

-


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১৪) সন্নিহিত বৃক্ষছায়া তাদের উপর থাকবে[1] এবং ওর ফলমূল সম্পূর্ণরূপে তাদের আয়ত্তাধীন করা হবে। [2]


তাফসীর:

[1] সেখানে সূর্যের তাপ থাকবে না। তা সত্ত্বেও গাছের ছায়া তাদের প্রতি ঝুঁকে থাকবে অথবা এর অর্থ হল, গাছের শাখাগুলো তাদের অনেক কাছে হবে।

[2] অর্থাৎ, গাছের ফল আজ্ঞাবহ দাসের মত অপেক্ষায় থাকবে। মানুষের যখনই তা খাবার ইচ্ছা জাগবে, তখনই তা (ফল) নুয়ে এত নিকটে হয়ে যাবে যে, তারা বসে বসে অথবা শুয়ে শুয়ে তা নিয়ে খেতে পারবে। (ইবনে কাসীর)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১৩-২২ নম্বর আয়াতের তাফসীর :



এ আয়াতেগুলোতে জান্নাতীদের জন্য যে অশেষ নেয়ামত প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে তার বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। জান্নাতীরা জান্নাতে অতিশয় শান্ত, সুখময়, নিরুদ্বেগ, কোমল, সৌহার্দময় ও নাতিশীতোষ্ণ পরিবেশে থাকবে।



(لَا يَرَوْنَ فِيْهَا شَمْسًا وَّلَا زَمْهَرِيْرًا) زمهرير-



অর্থ কঠিন শীত। অর্থাৎ জান্নাতে কোন গরম এবং ঠান্ডা অনুভব করবে না।



(وَدَانِيَةً عَلَيْهِمْ ظِلَالُهَا)



অর্থাৎ গাছের ছায়া তাদের প্রতি ঝুঁকে থাকবে, এবং গাছের ফলগুলো তাদের আয়ত্তাধিন করে দেওয়া হবে, মন চাইলে হাত বাড়ালেই ওর ফল নিতে পারবে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন :



إِنَّ فِي الجَنَّةِ لَشَجَرَةً يَسِيرُ الرَّاكِبُ فِي ظِلِّهَا مِائَةَ سَنَةٍ



জান্নাতে এমন একটি গাছ রয়েছে যার ছায়াতলে একজন আরোহী একশত বছর অতিক্রম করবে। (সহীহ বুখারী হা. ৩২৫২, সহীহ মুসলিম হা. ২৮২৬)



قَوَارِيْرَا অর্থ : কাঁচের পাত্র। এ কাঁচের পাত্রগুলোও রৌপ্যের হবে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন :



لاَ تَلْبَسُوا الحَرِيرَ وَلاَ الدِّيبَاجَ، وَلاَ تَشْرَبُوا فِي آنِيَةِ الذَّهَبِ وَالفِضَّةِ، وَلاَ تَأْكُلُوا فِي صِحَافِهَا، فَإِنَّهَا لَهُمْ فِي الدُّنْيَا وَلَنَا فِي الآخِرَةِ



তোমরা রেশমি কাপড় পরিধান করো না, স্বর্ণ ও রৌপ্যের পাত্রে পান করিও না এবং সে সব পাত্রে খাবে না। কেননা এগুলো তাদের (কাফির) জন্য দুনিয়াতে আর তোমাদের জন্য আখিরাতে। (সহীহ বুখারী হা. ৫৪২৬, সহীহ মুসলিম হা. ২০২৭)





(قَدَّرُوْهَا تَقْدِيْرًا)



অর্থাৎ যে পানপাত্রে পানীয় পরিবেশন করা হবে তা তাদের তৃষ্ণা পরিমাণ। ফলে পান করার পর অতিরিক্ত থাকবে না।



زَنْجَبِيْلًا শুকনো আদা (শুঠ)-কে বলে। এটা গরম জাতীয় জিনিস। এর মিশ্রণে সুগন্ধময় এক ধরনের ঝাঁঝ সৃষ্টি হয়।



(وِلْدَانٌ مُّخَلَّدُوْنَ)



অর্থাৎ জান্নাতী যুবক যারা এক অবস্থায় চিরস্থায়ী থাকবে। তাদের বয়স বৃদ্ধি হবে না। তাদের কিশোর সুলভ বয়স ও সৌন্দর্য অব্যাহত থাকবে। তাদের সৌন্দর্য, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সজীবতা ও সতেজতা দেখে মনে হবে যেন তারা মণি-মুক্তা।



ثَمَّ শব্দ দ্বারা স্থানের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। অর্থাৎ জান্নাতের যেদিকেই তাকাবে সেদিকেই দেখতে পাবে অসংখ্য নিয়ামত ও আল্লাহর সীমাহীন রাজত্ব।



سُنْدُسٍ হল পাতলা বা চিকন রেশমী আর إِسْتَبْرَقٌ হল মোটা রেশমী পোশাক। আলী (রাঃ) বলেন : যখন জান্নাতীরা জান্নাতের দরজায় পৌঁছবে তখন তারা দুটি নহর দেখতে পাবে, যার খেয়াল যেন তাদের মনেই জেগে ছিল। একটির পানি তারা পান করবে। ফলে মনের কালিমা সবই দূরীভূত হয়ে যাবে। অন্যটিতে তারা গোসল করবে। ফলে তাদের চেহারা উজ্জ্বল হবে। বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ উভয় সৌন্দর্যই তারা পুরো মাত্রায় লাভ করবে। (সূরা আ‘রাফ, আয়াত ৪৩) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : আল্লাহ তা‘আলা বলেন :



أَعْدَدْتُ لِعِبَادِي الصَّالِحِينَ مَا لاَ عَيْنٌ رَأَتْ، وَلاَ أُذُنٌ سَمِعَتْ، وَلاَ خَطَرَ عَلَي قَلْبِ بَشَرٍ



আমি আমার সৎ বান্দাদের জন্য এমন কিছু তৈরি করে রেখেছি যা কোন চক্ষু দেখেনি, কোন কান তা শ্রবণ করেনি এবং কোন মানুষের অন্তরে তা কল্পনাতেও আসেনি। (সহীহ বুখারী হা. ৩২৪৪, সহীহ মুসলিম হা. ২৮২৪)



আমরা যেন এ নেয়ামতপূর্ণ জান্নাত পেতে পারি সে জন্য উপযুক্ত আমল করতে হবে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :

১. জান্নাতীদের জন্য প্রস্তুত রাখা অশেষ নেয়ামত রাজির কথা জানতে পারলাম।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১৩-২২ নং আয়াতের তাফসীর

জান্নাতীদের নিয়ামতরাশি, তাদের সুখ-শান্তি এবং ধন-সম্পদের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তারা সর্বপ্রকারের শান্তিতে ও মনের সুখে জান্নাতের সুসজ্জিত আসনে সমাসীন থাকবে। সূরা সাফফাতের তাফসীরে এর পূর্ণ ব্যাখ্যা গত হয়েছে। সেখানে এটাও বর্ণিত হয়েছে যে, (আরবি) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো শয়ন করা বা কনুই পেড়ে বসা বা চার জানু বসা অথবা কোমর লাগিয়ে হেলান দিয়ে বসা। এও বর্ণনা করা হয়েছে যে, (আরবি) বলা হয় ছাপর খাটকে।

অতঃপর এখানে আর একটি নিয়ামতের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সেখানে সূর্যের প্রখর তাপে তাদের কোন কষ্ট হবে না বা সেখানে তারা অতিশয় শীতও বোধ করবে না। অথবা না তারা অত্যধিক গরম বোধ করবে, না অত্যধিক ঠাণ্ডা বোধ করবে। বরং তথায় সদা-সর্বদা বসন্তকাল বিরাজ করবে। গরম-ঠাণ্ডার ঝামেলা হতে তারা সম্পূর্ণরূপে মুক্ত থাকবে। জান্নাতী গাছের শাখাগুলো ঝুঁকে ঝুঁকে তাদের উপর ছায়া করবে। গাছের ফলগুলো তাদের খুবই নিকটে থাকবে। ইচ্ছা করলে তারা শুয়ে শুয়েই ভেঙ্গে খাবে, ইচ্ছা করলে বসে বসে ভেঙ্গে নিবে এবং ইচ্ছা করলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েও ভেঙ্গে খেতে পারবে। কষ্ট করে গাছে উঠবার কোন প্রয়োজনই হবে না। মাথার উপর ফলের ছড়া বা কাঁদি লটকে থাকবে। পাড়বে ও খাবে। দাঁড়ালে দেখবে যে, ডাল ঐ পরিমাণ উঁচুতে রয়েছে, বসলে দেখতে পাবে যে, ডাল কিছুটা ঝুঁকে পড়েছে এবং শুয়ে গেলে দেখবে যে, ফলসহ ডাল আরো নিকটে এসে গেছে। না কাঁটার কোন প্রতিবন্ধকতা আছে, না দূরে থাকার কোন ঝামেলা রয়েছে।

মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, জান্নাতের যমীন হলো রৌপ্যের, ওর মাটি হলো খাঁটি মৃগনাভীর, ওর বৃক্ষের কাণ্ড হলো সোনা-চাঁদির, শাখা মণি-মুক্তা, যবরজদও ইয়াকূতের। এগুলোর মাঝে রয়েছে পাতা ও ফল, যেগুলো পেড়ে নিতে কোন কষ্ট ও কাঠিণ্য নেই। ইচ্ছা করলে শুয়ে, বসে এবং দাঁড়িয়ে পেড়ে নেয়া ও খাওয়া যাবে।

একদিকে দেখবে যে, সুশ্রী সুদর্শন ও কোমলমতি অনুগত কিশোর পরিচারক নানা প্রকারের খাদ্য রৌপ্যপাত্রে সাজিয়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এবং অপরদিকে দেখতে পাবে যে, বিশুদ্ধ পানীয় পূর্ণ রজতশুভ্র স্ফটিক পাত্র হাতে নিয়ে পরিবেশনকারীরা আদেশের জন্যে অপেক্ষমান রয়েছে। ঐ পানপাত্রগুলো পরিষ্কার ও স্বচ্ছতার দিক দিয়ে কাঁচের মত এবং শুভ্রতার দিক দিয়ে রৌপ্যের মত। ভিতরের জিনিস বাহির থেকে দেখা যাবে। জান্নাতের সমস্ত জিনিস শুধু বাহ্যিকভাবে দুনিয়ার জিনিসের সঙ্গে সাদৃশ্যযুক্ত হবে। কিন্তু আসলে ঐ রৌপ্য ও কাঁচের পানপাত্রগুলোর কোন তুলনা দুনিয়ায় নেই। এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, প্রথম (আরবি) শব্দটির উপর (আরবি)-এর হিসেবে যবর হয়েছে এবং দ্বিতীয় (আরবি)-এর উপর যবর হয়েছে (আরবি)-এর ভিত্তিতে।

পরিবেশনকারীরা পানপাত্র যথাযথ পরিমাণে পূর্ণ করবে। অর্থাৎ পানকারীরা যে পরিমাণ পান করতে পারবে সেই পরিমাণ পানীয় দ্বারাই ঐ পানপাত্রগুলো পূর্ণ করা হবে। ঐ পানীয় পান করার পর কিছু বাঁচবেও না, আবার তৃপ্তি সহকারে পান করতে গিয়ে তা কমেও যাবে না। জান্নাতীরা এই সব দুষ্প্রাপ্য পানপাত্রগুলোতেও এই যে সুস্বাদু, আনন্দদায়ক নেশাবিহীন সুরা প্রাপ্ত হবে ওগুলো সালসাবীল নামক নহরের পানি দ্বারা মিশ্রিত করে তাদেরকে প্রদান করা হবে। যেমন উপরে বর্ণনা গত হয়েছে যে, কাফূরের পানি দ্বারা মিশ্রিত করে দেয়া হবে। তাহলে ভাবার্থ এই যে, কখনো ঠাণ্ডা পানি মিশ্রিত করা হবে এবং কখনো গরম পানি মিশ্রিত করা হবে যাতে সমতা রক্ষা পায় এবং নাতিশীতুষ্ণ হয়ে যায়। এটা সৎকর্মশীল লোকদের বর্ণনা। খাস ও নৈকট্যলাভকারী বান্দারাই এই নহরের শরবত পান করবে।

হযরত ইকরামা (রঃ)-এর মতে ‘সালসাবীল’ হলো জান্নাতের একটি প্রস্রবণের নাম। কেননা, ওটা পর্যায়ক্রমে দ্রুতবেগে প্রবাহিত রয়েছে। ওর পানি অত্যন্ত হালকা, খুবই মিষ্টি, সুস্বাদু এবং সুগন্ধময়। ওটা অতি সহজেই পান করা যাবে। এই নিয়ামতরাজির সাথে সাথে জান্নাতীদের জন্যে রয়েছে সুন্দর, সুশ্রী অল্প বয়স্ক কিশোরগণ, যারা তাদের খিদমতের জন্যে সদা প্রস্তুত থাকবে। এই জান্নাতী বালকরা চিরকাল এক বয়সেরই থাকবে। তাদের বয়সের কোন পরিবর্তন ঘটবে না। এমন নয় যে, তারা বয়স্ক হয়ে যাবার ফলে তাদের আকৃতি বিকত হবে। তাদেরকে দেখে মনে হবে তারা যেন বিক্ষিপ্ত মুক্তা। তারা মূল্যবান পোশাক ও অলংকার পরিহিত বিভিন্ন কাজে এদিক ওদিক ছুটাছুটি করবে। এ কারণেই মনে হবে যে তারা ছড়ানো মণি-মুক্তা। এরচেয়ে বড় উপমা তাদের জন্যে আর কিছু হতে পারে না। তারা এরূপ সৌন্দর্য, মূল্যবান পোশাক পরিচ্ছদ এবং অলংকারাদি নিয়ে তাদের জান্নাতী মনিবদের খিদমতের জন্যে সদা এদিক ওদিক দৌড়াদৌড়ি ও ছুটাছুটি করবে।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেন যে, প্রত্যেক জান্নাতীর জন্যে এক হাজার করে খাদেম থাকবে যারা বিভিন্ন কাজ-কর্মে লেগে থাকবে।

এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি যখন সেথায় দেখবে, দেখতে পাবে ভোগ-বিলাসের উপকরণ এবং বিশাল রাজ্য। হাদীস শরীফে রয়েছে যে, সর্বশেষে যাকে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাতে নিয়ে যাওয়া হবে, তাকে মহান আল্লাহ বলবেনঃ “তোমার জন্যে রয়েছে দুনিয়া পরিমাণ জিনিস এবং তারও দশগুণ।”

হযরত ইবনে উমার (রাঃ)-এর রিওয়াইয়াতে ঐ হাদীসটিও গত হয়েছে, যাতে রয়েছে যে, সর্বনিম্ন শ্রেণীর জান্নাতীর রাজ্য ও রাজত্বের মধ্যে ভ্রমণপথ হবে দু'হাজার বছর (অর্থাৎ দু’হাজার বছর ধরে ভ্রমণ করা যাবে)। দূরবর্তী ও নিকটবর্তী সব জিনিসই সে এক রকমই দেখবে। এই অবস্থা তো হবে সর্বনিম্ন শ্ৰেণীর জান্নাতীর। তাহলে সর্বোচ্চ শ্রেণীর জান্নাতীর মর্যাদা কি হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।

হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন হাবশী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “তোমার যা কিছু জানবার ও বুঝবার আছে তা আমাকে প্রশ্ন কর।” তখন সে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! রূপে ও রঙে এবং নবুওয়াতের দিক থেকে আপনাকে আমাদের উপর ফযীলত দেয়া হয়েছে। এখন বলুন তো, যার উপর আপনি ঈমান এনেছেন তার উপর যদি আমিও ঈমান আনি এবং যার উপর আপনি আমল করছেন তার উপর যদি আমিও আমল করি তবে কি আমিও আপনার সাথে জান্নাতে থাকতে পারি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “যাঁর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! কালো বর্ণের লোককে জান্নাতে ঐ সাদা রঙ দেয়া হবে যা হাজার বছরের পথের দূরত্ব হতে দেখা যাবে!” তারপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যে ব্যক্তি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলে তার জন্যে আল্লাহর আহদ বা প্রতিশ্রুতি নির্দিষ্ট হয়ে যায়। আর যে ব্যক্তি সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি' বলে তার জন্যে এক লক্ষ চব্বিশ হাজার পুণ্য লিখা হয়। লোকটি তখন বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এরপরেও আমরা কি করে ধ্বংস হতে পারি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাবে বললেনঃ “একটা লোক এতো বেশী (সৎ) আমল নিয়ে আসবে যে, যদি ওগুলো কোন পাহাড়ের উপর রেখে দেয়া হয় তবে ওর উপর অত্যন্ত ভারী বোঝা হয়ে যাবে। কিন্তু এগুলোর মুকাবিলায় যখন আল্লাহর নিয়ামতরাশি আসবে তখন ঐ সমুদয় আমল ধ্বংস হয়ে যাওয়ার উপক্রম হবে। কিন্তু আল্লাহর দয়া হলে সেটা স্বতন্ত্র কথা।” ঐ সময় (আরবি) পর্যন্ত এই সূরাটি অবতীর্ণ হয়। তখন হাবশী বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) জান্নাতে আপনার চক্ষু যা দেখবে তাই আমার চক্ষুও দেখবে কি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হ্যাঁ, হ্যাঁ।” একথা শুনে লোকটি কাঁদতে লাগলো। এমন কি (কাঁদতে কাঁদতে) তার দেহ হতে প্রাণপাখী উড়ে গেল। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেনঃ “আমি দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজের হাতে তাকে দাফন করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা অত্যন্ত গারীব হাদীস)

এরপর জান্নাতীদের পোশাকের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তাদের দেহের আবরণ হবে সূক্ষ্ম সবুজ রেশম ও স্কুল রেশম। (আরবি) হলো ঐ উন্নত মানের রেশম যা খাটি ও নরম এবং যা দেহের সাথে লেগে থাকবে। আর (আরবি) হলো উত্তম ও অতি মূল্যবান রেশম যাতে উজ্জ্বল্য থাকবে এবং যা উপরে পরিধান করানো হবে। সাথে সাথে হাতে চাঁদীর কংকন থাকবে। এটা হলো সৎলোকদের পোশাক। আর বিশেষ নৈকট্যলাভকারীদের ব্যাপারে অন্য জায়গায় ইরশাদ হয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ তাদেরকে জান্নাতে সোনা ও মুক্তার কংকন পরানো হবে এবং তাদের পোশাক হবে খাঁটি নরম রেশমের।” (২২:২৩)

এই বাহ্যিক ও দৈহিক নিয়ামতরাশির বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ পাক বলেনঃ তাদের প্রতিপালক তাদেরকে পান করাবেন বিশুদ্ধ পানীয় যা তাদের বাইরের ও ভিতরের সমস্ত কলুষতাকে দূর করে দিবে। যেমন আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী ইবনে আবী তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন জান্নাতীরা জান্নাতের দরজায় পৌঁছবে তখন তারা দু’টি নহর দেখতে পাবে, যার খেয়াল যেন তাদের মনেই জেগেছিল। একটির পানি তারা পান করবে। ফলে তাদের অন্তরের কালিমা সবই দূরীভূত হয়ে যাবে। অন্যটিতে তারা গোসল করবে। ফলে তাদের চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীন উভয় সৌন্দর্যই তারা পুরো মাত্রায় লাভ করবে। এখানে এটাই বর্ণনা করা হয়েছে।

অতঃপর তাদেরকে খুশী করার জন্যে এবং তাদের আনন্দ বৃদ্ধি করার জন্যে বারবার বলা হবেঃ এটা তোমাদের সৎকর্মের প্রতিদান এবং তোমাদের কর্মপ্রচেষ্টা স্বীকৃত। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)

অর্থাৎ “তোমরা পানাহার কর তৃপ্তির সাথে, তোমরা অতীত দিনে যা করেছিলে তার বিনিময়ে।” (৬৯:২৪) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ তাদেরকে ডাক দিয়ে বলা হবেঃ তোমাদের কৃতকর্মের বিনিময়ে তোমাদেরকে এই জান্নাতের ওয়ারিশ বানিয়ে দেয়া হয়েছে।” (৭:৪৩) এখানেও বলা হয়েছেঃ তোমাদের কর্মপ্রচেষ্টা স্বীকৃত। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে কম আমলের বিনিময়ে বেশী প্রতিদান প্রদান করেছেন।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।