আল কুরআন


সূরা আল-মুযযাম্মিল (আয়াত: 14)

সূরা আল-মুযযাম্মিল (আয়াত: 14)



হরকত ছাড়া:

يوم ترجف الأرض والجبال وكانت الجبال كثيبا مهيلا ﴿١٤﴾




হরকত সহ:

یَوْمَ تَرْجُفُ الْاَرْضُ وَ الْجِبَالُ وَ کَانَتِ الْجِبَالُ کَثِیْبًا مَّهِیْلًا ﴿۱۴﴾




উচ্চারণ: ইয়াওমা তারজুফুল আরদুওয়ালজিবা-লুওয়াকা-নাতিল জিবা-লুকাছীবাম মাহীলা-।




আল বায়ান: যেদিন যমীন ও পর্বতমালা প্রকম্পিত হবে এবং পাহাড়গুলো চলমান বালুকারাশিতে পরিণত হবে।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৪. সেদিন যমীন ও পর্বতমালা প্রকম্পিত হবে এবং পর্বতসমূহ বিক্ষিপ্ত বহমান বালুকারাশিতে পরিণত হবে।(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: (এসব শাস্তি দেয়া হবে) যেদিন যমীন আর পাহাড়গুলো কেঁপে উঠবে, আর পাহাড়গুলো হবে চলমান বালুকারাশি।




আহসানুল বায়ান: (১৪) যেদিন পৃথিবী ও পর্বতমালা প্রকম্পিত হবে এবং পর্বতসমূহ বহমান বালুকারাশিতে পরিণত হবে।[1]



মুজিবুর রহমান: সেই দিনে পৃথিবী ও পর্বতমালা প্রকম্পিত হবে এবং পর্বতসমূহ বহমান বালুকারাশিতে পরিণত হবে।



ফযলুর রহমান: (সেই কেয়ামতের দিনে) যেদিন ভূমি আর পাহাড় কেঁপে উঠবে এবং পাহাড়গুলো বালির বহমান স্তুপে পরিণত হবে।



মুহিউদ্দিন খান: যেদিন পৃথিবী পর্বতমালা প্রকম্পিত হবে এবং পর্বতসমূহ হয়ে যাবে বহমান বালুকাস্তুপ।



জহুরুল হক: সেইদিন পৃথিবী ও পাহাড়গুলো কেঁপে উঠবে, আর পাহাড়গুলো হয়ে যাবে স্তূপাকার বালির গাদা!



Sahih International: On the Day the earth and the mountains will convulse and the mountains will become a heap of sand pouring down.



তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।


তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১৪. সেদিন যমীন ও পর্বতমালা প্রকম্পিত হবে এবং পর্বতসমূহ বিক্ষিপ্ত বহমান বালুকারাশিতে পরিণত হবে।(১)


তাফসীর:

(১) সে সময় অতি শক্ত-মজবুত পাহাড়সমূহ দূৰ্বল হয়ে পড়বে, তাই প্রথমে তা মিহি বিক্ষিপ্ত বালুর স্তুপে পরিণত হবে। অতঃপর বালুর এ স্তুপ বিক্ষিপ্ত হয়ে উড়ে যাবে। [সা’দী] এরপর গোটা ভূপৃষ্ঠ একটা বিশাল প্রান্তরে রূপান্তরিত হবে। এ অবস্থার একটি চিত্র অন্যত্র এভাবে তুলে ধরা হয়েছে যে, “লোকেরা আপনাকে এসব পাহাড়ের অবস্থা কি হবে সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। আপনি বলুন, আমার রব পাহাড়সমূহকে ধুলির মত করে ওড়াবেন এবং ভূপৃষ্ঠকে এমন সমতল বিশাল প্রান্তরে রূপান্তরিত করবেন যে, তুমি সেখানে উঁচু নীচু বা ভাঁজ দেখতে পাবে না।” [সূরা ত্বা-হা: ১০৫–১০৭]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১৪) যেদিন পৃথিবী ও পর্বতমালা প্রকম্পিত হবে এবং পর্বতসমূহ বহমান বালুকারাশিতে পরিণত হবে।[1]


তাফসীর:

[1] অর্থাৎ, এই আযাব সেই দিন হবে যেদিন যমীন এবং পাহাড় ভূমিকম্পে উলট-পালট হয়ে যাবে। আর অতীব বিশাল ভয়ঙ্কর পাহাড়-পর্বত সেদিন অসার বালুর স্তূপে পরিণত হবে। كَثِيْبٌ বালির ঢিপি। مَهِيْلًا অর্থ বহমান (ভুরভুরে) বালি, যা পায়ের নিচে থেকে সরে যায়।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১০-১৮ নম্বর আয়াতের তাফসীর :



আল্লাহ তা‘আলা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে রিসালাত গ্রহণের প্রস্তুতি, আল্লাহ তা‘আলার ইবাদতে মগ্ন হওয়া ইত্যাদি নির্দেশের পর অত্র আয়াতগুলোতে কাফির-মুশরিকদের মিথ্যা অপবাদ, অকথ্য গালিগালাজ এবং ঠাট্টা-বিদ্রƒপে ধৈর্য ধারণ করার নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি তাদেরকে সৌজন্যতার সাথে পরিহার করার উপদেশ দিচ্ছেন। কারণ সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের স্বভাব হল তারা সত্য গ্রহণ করবে না, বরং সত্যাগ্রহীদের অপবাদ দেবে, গালিগালাজ করবে এবং তাদের নিয়ে ঠাট্টা-ব্যঙ্গ করবে। এটা নতুন নয়, পূর্বেও ফিরআ‘উন সত্য প্রত্যাখ্যান করেছিল, ফলে তাকে পাকড়াও করেছিলাম। তাই এসব সত্যপ্রত্যাখ্যানকারী ও মিথ্যুকদেরও পাকড়াও করব এবং তাদের জন্য আখিরাতে ন্যাক্কারজনক শাস্তি প্রস্তুত করা আছে।



(وَذَرْنِيْ وَالْمُكَذِّبِيْنَ)



অর্থাৎ যাদেরকে অনেক ধন-জন দিয়ে প্রভাব-প্রতিপত্তির অধিকারী বানিয়েছি তাদের মধ্যে যারা মিথ্যুক ও আখিরাতে অবিশ্বাসী তাদের ব্যাপারটা আমার কাছে ছেড়ে দাও। অথবা তাদের ব্যাপারে আমাকে ছেড়ে দাও, আমি তাদেরকে কিছু দিন অবকাশ দেব, তারপর তাদের জন্য রয়েছে আয়াতে উল্লিখিত শাস্তিসমূহ। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন :



(نُمَتِّعُھُمْ قَلِیْلًا ثُمَّ نَضْطَرُّھُمْ اِلٰی عَذَابٍ غَلِیْظٍ)



“আমি অল্প সময়ের জন্য তাদেরকে সুখ-সম্ভোগ দেব, পুনরায় তাদেরকে বাধ্য করব কঠিন শাস্তি ভোগ করতে।” (সূরা লুক্বমান ৩১ : ২৪)



تَرْجُفُ অর্থ تزلزل বা প্রকম্পন।



(كَثِيْبًا مَّهِيْلًا) مَّهِيْلًا



বলা হয় বালির স্তুপকে, আর كَثِيْب বলা হয় বহমান (ভূর ভূরে) বালি, যা পায়ের নিচে থেকে সরে যায়। অর্থাৎ কিয়ামতের দিন পাহাড়সমূহ বহমান বালুকারাশিতে পরিণত হবে।



(شَاهِدًا عَلَيْكُمْ) অর্থাৎ شاهدا بأعمالكم



বা আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের নিকট রাসূল মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে প্রেরণ করেছেন যিনি তোমাদের আমলসমূহ প্রত্যক্ষ করবেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা ফির‘আউনের নিকট মূসা (রাঃ)-কে প্রেরণ করেছিলেন। কিন্তু ফির‘আউন মূসা (রাঃ)-এর অবাধ্য হলো, ফলে আল্লাহ তা‘আলা তাকে সাগরে ডুবিয়ে মারলেন। সুতরাং আল্লাহ তা‘আলার সাথে কুফরী করলে রেহাই পাওয়ার কোন সুযোগ নেই যেমন রেহাই পায়নি ফির‘আউন ও তার দলবল।



شِيْبَ হল اشيب এর বহুবচন। কিয়ামতের দিন কিয়ামতের ভয়াবহতা দেখে শিশুরা বৃদ্ধ হয়ে যাবে। অথবা কিয়ামতের মাঠের জটিল অবস্থার একটি চিত্র তুলে ধরতে এ উদাহরণ পেশ করা হয়েছে। অতএব বুদ্ধিমান তারাই যারা সেদিনের দূরবস্থা থেকে বাঁচার জন্য যথাসম্ভব পাথেয় অর্জন করে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :



১. কাফির-মুশরিকদের জন্য আল্লাহ তা‘আলাই যথেষ্ট। তাদের কর্মের পরিণাম প্রস্তুত আছে।

২. কিয়ামতের ভয়াবহতা সম্পর্কে জানলাম।

৩. নাবী-রাসূলদের প্রেরণ করার অন্যতম একটি উদ্দেশ্য হল উম্মতের আমল প্রত্যক্ষ করা। অবশ্য এটা প্রত্যেক রাসূলের জীবদ্দশার সাথে সম্পৃক্ত, মারা যাওয়ার পর না।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১০-১৮ নং আয়াতের তাফসীর

আল্লাহ তা’আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে কাফিরদের বিদ্রুপাত্মক কথার উপর ধৈর্য ধারণের হিদায়াত করছেন এবং বলছেনঃ তাদেরকে কোন তিরস্কার ধমক ছাড়াই তাদের অবস্থার উপর ছেড়ে দাও। আমি স্বয়ং তাদেরকে দেখে নিবো। আমার গজব ও ক্রোধের সময় দেখবো কি করে তারা মুক্তি পেতে পারে। তাদের মধ্যে যারা সম্পদশালী ও স্বচ্ছল লোক, যারা তোমাকে নানা প্রকারে কষ্ট দিচ্ছে, যাদের উপর দ্বিগুণ প্রাপ্য রয়েছে, এক জানের আর এক মালের, আর তারা কোনটাই আদায় করছে না, তাদের সাথে তুমি সম্পর্ক ছিন্ন করে দাও, তারপর দেখে নিয়ো, আমি তাদের সাথে কি ব্যবহার করি। অল্প দিন তারা দুনিয়ায় ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকুক, পরিণামে তারা কঠিন শাস্তির মধ্যে পতিত হবে। কেমন আযাব? এমন কঠিন আযাব যে, তাদেরকে শৃংখল পরিয়ে জাহান্নামের প্রজ্বলিত অগ্নিতে নিক্ষেপ করা হবে। আর তাদেরকে এমন খাদ্য খেতে দেয়া হবে যা কণ্ঠ নালীতে আটকে যাবে। নীচেও নামবে না এবং উপরেও উঠবে না। আরো নানা প্রকারের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদেরকে দেয়া হবে। এমন এক সময়ও হবে যখন পৃথিবী ও পর্বতমালা প্রকম্পিত হবে। পর্বতসমূহ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে বালুকারাশিতে পরিণত হয়ে যাবে। যে বালুকারাশিকে বাতাস এদিক-ওদিক উড়িয়ে নিয়ে যাবে। কারো কোন নাম-নিশানাও বাকী থাকবে না। যমীন এক সমতল ভূমিতে পরিণত হবে, যেখানে কোন উঁচু-নীচু পরিলক্ষিত হবে না।

এরপর প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ হে লোক সকল এবং বিশেষ করে হে কাফিরদের দল! আমি তোমাদের নিকট তোমাদের জন্যে সাক্ষী স্বরূপ এক রাসূল (সঃ) পাঠিয়েছি, যে রাসূল সত্যবাদী ও সত্যায়িত, যেমন আমি ফিরাউনের নিকট আমার আহকাম পৌঁছাবার জন্যে একজন রাসূল পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু ফিরাউন যখন তাকে অমান্য করলো তখন আমি তাকে কিরূপ কঠিন শাস্তি দিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছিলাম তা তো তোমাদের জানা আছে। সুতরাং আমার এই নবী (সঃ)-কে যদি তোমরা অমান্য কর তবে তোমাদেরও পরিণাম ভাল হবে না। তোমাদের উপরও আল্লাহর আযাব এসে পড়বে এবং তোমাদেরকে তচনচ করে দেয়া হবে। কেন না এই রাসূল (সঃ) সমস্ত রাসূলের নেতা। সুতরাং তাকে অমান্য করার শাস্তিও হবে অন্যান্য শাস্তি অপেক্ষা বড়।

এর পরবর্তী আয়াতের দু’টি অর্থ হতে পারে। একটি অর্থ হলোঃ যদি তোমরা কুফরী কর তবে বল তো ঐ দিনের শাস্তি হতে তোমরা কিরূপে মুক্তি পেতে পার যে দিনের ভয়াবহতা কিশোরকে বৃদ্ধে পরিণত করবে? দ্বিতীয় অর্থ হলোঃ তোমরা যদি এতো বড় ভয়াবহ দিনকে অস্বীকার ও অবিশ্বাস কর তবে তোমরা, তাকওয়া বা আল্লাহর ভয় কিরূপে লাভ করতে পার? এই উভয় অর্থই উত্তম হলেও প্রথম অর্থটিই বেশী উত্তম! এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি) এ আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “এটা হলো কিয়ামতের দিন যেই দিন আল্লাহ তা’আলা হযরত আদম (আঃ)-কে বলবেনঃ ‘উঠো এবং তোমার সন্তানদের মধ্য হতে জাহান্নামীদেরকে পৃথক কর।' তখন হযরত আদম (আঃ) বলবেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! কতজনের মধ্য হতে কতজন? আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ প্রতি হাজারের মধ্য হতে নয়শ নিরানব্বই জনকে।' এ কথা শুনে মুসলমানদের আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেল এবং তারা হতবুদ্ধি হয়ে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-ও তাদের চেহারা দেখে তা বুঝে নিলেন। সুতরাং তিনি তাদেরকে সান্ত্বনার সুরে বললেনঃ জেনে রেখো যে, হযরত আদম (আঃ)-এর সন্তান অনেক। ইয়াজুজ ও মাজুজও হযরত আদম (আঃ)-এরই সন্তান। তারা এক একজন নিজের পিছনে এক হাজার করে সন্তান ছেড়ে যায়। সুতরাং তারা এবং তাদের মত লোক মিলে এই সংখ্যা দাঁড়াবে। সুতরাং ঘাবড়াবার কিছুই নেই। জান্নাত তোমাদের জন্যে এবং তোমরা জান্নাতের জন্যে।” (ইমাম তিবরানী (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। এটা গারীব হাদীস) সূরা হজ্বের শুরুতে এরকম হাদীস সমূহের বর্ণনা গত হয়েছে।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ঐ দিনের ভয়াবহতার কারণে আকাশও বিদীর্ণ হয়ে যাবে। কেউ কেউ (আরবি)-এর (আরবি) সর্বনামটি আল্লাহর দিকে ফিরিয়েছেন। কিন্তু এটা সবল নয়। কেননা এখানে তাঁর যিকিরই নেই।

মহান আল্লাহ বলেনঃ ঐদিনের ওয়াদা নিশ্চিতরূপে সত্য। ওটা সংঘটিত হবেই। ঐ দিনের আগমনে কোন সন্দেহই নেই।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।