সূরা আল-জ্বিন (আয়াত: 1)
হরকত ছাড়া:
قل أوحي إلي أنه استمع نفر من الجن فقالوا إنا سمعنا قرآنا عجبا ﴿١﴾
হরকত সহ:
قُلْ اُوْحِیَ اِلَیَّ اَنَّهُ اسْتَمَعَ نَفَرٌ مِّنَ الْجِنِّ فَقَالُوْۤا اِنَّا سَمِعْنَا قُرْاٰنًا عَجَبًا ۙ﴿۱﴾
উচ্চারণ: কুলঊহিয়া ইলাইইয়া আন্নাহুছতামা‘আ নাফারুম মিনাল জিন্নি ফাকা-লূইন্না-ছামি‘নাকুরআ-নান ‘আজাবা- ।
আল বায়ান: বল, ‘আমার প্রতি ওহী করা হয়েছে যে, নিশ্চয় জিনদের একটি দল মনোযোগ সহকারে শুনেছে। অতঃপর বলেছে, ‘আমরা তো এক বিস্ময়কর কুরআন শুনেছি,
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১. বলুন(১), ‘আমার প্রতি ওহী নাযিল হয়েছে যে, জিনদের(২) একটি দল মনোযোগের সাথে শুনেছে(৩) অতঃপর বলেছে, আমরা তো এক বিস্ময়কর কুরআন শুনেছি(৪),
তাইসীরুল ক্বুরআন: বল, ‘‘আমার কাছে ওয়াহী করা হয়েছে যে, জিন্নদের একটি দল মনোযোগ দিয়ে (কুরআন) শুনেছে অতঃপর তারা বলেছে ‘আমরা এক অতি আশ্চর্যজনক কুরআন শুনেছি
আহসানুল বায়ান: (১) বল, আমার প্রতি অহী প্রেরিত হয়েছে যে, জ্বিনদের একটি দল[1] মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করে বলেছে, ‘আমরা তো এক বিস্ময়কর কুরআন শ্রবণ করেছি। [2]
মুজিবুর রহমান: বলঃ আমার প্রতি অহী প্রেরিত হয়েছে যে, জিনদের একটি দল মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করেছে এবং বলেছে, আমরাতো এক বিস্ময়কর কুরআন শ্রবণ করেছি –
ফযলুর রহমান: বল, “আমাকে ওহীর মাধ্যমে জানানো হয়েছে যে, একদল জ্বিন কান পেতে (কোরআন) শুনেছে আর বলেছে, “আমরা এক বিস্ময়কর কোরআন শুনেছি,
মুহিউদ্দিন খান: বলুনঃ আমার প্রতি ওহী নাযিল করা হয়েছে যে, জিনদের একটি দল কোরআন শ্রবণ করেছে, অতঃপর তারা বলেছেঃ আমরা বিস্ময়কর কোরআন শ্রবণ করেছি;
জহুরুল হক: বলো -- "আমার কাছে প্রত্যাদেশ করা হয়েছে যে জিনদের একটি দল শুনেছিল, এবং বলেছিল -- 'আমরা নিশ্চয় এক আশ্চর্যজনক কুরআন শুনেছি,
Sahih International: Say, [O Muhammad], "It has been revealed to me that a group of the jinn listened and said, 'Indeed, we have heard an amazing Qur'an.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১. বলুন(১), ‘আমার প্রতি ওহী নাযিল হয়েছে যে, জিনদের(২) একটি দল মনোযোগের সাথে শুনেছে(৩) অতঃপর বলেছে, আমরা তো এক বিস্ময়কর কুরআন শুনেছি(৪),
তাফসীর:
(১) হাদীসের বিভিন্ন গ্রন্থে এসেছে যে, এই ঘটনা তখনকার যখন শয়তানদেরকে আকাশে খবর শোনা থেকে উল্কাপিণ্ডের মাধ্যমে প্ৰতিহত করা হয়েছিল। এ সময়ে জিন্নরা পরস্পরে পরামর্শ করল যে আকাশের খবরাদি শোনার ব্যাপারে বাধাদানের এই ব্যাপারটি কোন আকস্মিক ঘটনা মনে হয় না। পৃথিবীতে অবশ্যই কোন নতুন ব্যাপার সংঘটিত হয়েছে। অতঃপর তারা স্থির করল যে, পৃথিবীর পূর্ব পশ্চিম ও আনাচে-কানাচে জিন্নদের প্রতিনিধিদল প্রেরণ করতে হবে। যথাযথ খোঁজাখুঁজি করে এই নতুন ব্যাপারটি কি তা জেনে আসবে। হেজাযে প্রেরিত তাদের প্রতিনিধিদল যখন 'নাখলাহ' নামক স্থানে উপস্থিত হল, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীগণকে সাথে নিয়ে ফজরের সালাত আদায় করছিলেন।
জিন্নদের এই প্রতিনিধিদল সালাতে কুরআন পাঠ শুনে পরস্পরে শপথ করে বলতে লাগলঃ এই কালামই আমাদের ও আকাশের খবরাদির মধ্যে অন্তরায় হয়েছে। তারা সেখান থেকে প্রত্যাবর্তন করে স্বজাতির কাছে ঘটনা বিবৃত করল। আল্লাহ্ তা'আলা এসব আয়াতে সমস্ত ঘটনা সম্পর্কে তাঁর রাসূলকে অবহিত করেছেন। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বর্ণনা করেন এই ঘটনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিন্নদেরকে ইচ্ছাকৃতভাবে কুরআন শোনাননি এবং তিনি তাদেরকে দর্শনও করেন নি বরং তার কাছে জিন্নদের কথা ওহী করে শোনানো হয়েছিল মাত্ৰ।” [বুখারী: ৪৯২১, মুসলিম: ৪৪৯]
(২) জিন্ন আল্লাহ তা'আলার এক প্রকার শরীরী আত্মাধারী ও মানুষের ন্যায় জ্ঞান এবং চেতনাশীল সৃষ্টজীব। জিন এর শাব্দিক অর্থ গুপ্ত। তারা মানুষের দৃষ্টিগোচর নয়। এ কারণেই তাদেরকে জিন বলা হয়। জিন ও ফেরেশতাদের অস্তিত্ব কুরআন ও সুন্নাহর অকাট্য বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত। এটা অস্বীকার করা কুফর। মানব সৃষ্টির প্রধান উপকরন যেমন মৃত্তিকা তেমনি জিন সৃষ্টির প্রধান উপকরণ অগ্নি। এই জাতির মধ্যেও মানুষের ন্যায় নর ও নারী আছে এবং সন্তান প্রজননের ধারা বিদ্যমান আছে।
পবিত্র কুরআনে যাদেরকে শয়তান বলা হয়েছে, তারা জিন্নদের দুষ্ট শ্রেনীর নাম। অধিকাংশ আলেমের মতে, সমস্ত জিনই শয়তানের বংশধর। তাদের মধ্যে কাফের ও মুমিন দু’শ্রেণী বিদ্যমান। যারা ঈমানদার তাদেরকে জিন বলা হলেও তাদের মধ্যে যারা কাফির তাদেরকে শয়তান বলা হয়। তবে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত আছে যে, জিন্নরা ভিন্ন প্ৰজাতি, তারা শয়তানের বংশধর নয়। তারা মারা যায়। তাদের মধ্যে ঈমানদার ও কাফির দু শ্রেণী রয়েছে। পক্ষান্তরে ইবলীসের সন্তানদেরকে শয়তান বলা হয়, তারা ইবলীসের সাথেই মারা যাবে, তার আগে নয়। [দেখুন: কুরতুবী; ড. উমর সুলাইমান আল-আশকার: আলামুল জিন্ন ওয়াশ শায়াতীন]
(৩) এ থেকে জানা যায় যে; রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে সময় জিন্নদের দেখতে পাচ্ছিলেন না এবং তারা যে কুরআন শুনছে একথাও তার জানা ছিল না। পরবর্তী সময়ে আল্লাহ তা'আলা তাকে অহীর মাধ্যমে এ ঘটনা জানিয়ে দিয়েছেন। এ ঘটনাটি বর্ণনা প্রসংগে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস স্পষ্টভাবে বলেছেন যে; সে সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিন্নদের উদ্দেশ্যে কুরআন পাঠ করেননি এবং তিনি তাদের দেখেনওনি। [মুসলিম ৪৪৯, সহীহ ইবনে হিব্বান: ৬৫২৬, তিরমিযী: ৩৩২৩, মুসনাদে আহমাদ: ১/২৫২]
(৪) জিন্নদের উক্তির অর্থ হলো, আমরা এমন একটি বাণী শুনে এসেছি যা ভাষাগত উৎকর্ষতা, বিষয়বস্তু, প্রজ্ঞা, জ্ঞান, বিধান ইত্যাদিতে বিস্ময়কর ও অতুলনীয়। [মুয়াস্সার]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১) বল, আমার প্রতি অহী প্রেরিত হয়েছে যে, জ্বিনদের একটি দল[1] মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করে বলেছে, ‘আমরা তো এক বিস্ময়কর কুরআন শ্রবণ করেছি। [2]
তাফসীর:
[1] এই ঘটনা সূরা আহক্বাফের ২৯নং আয়াতের টীকায় উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনা হল নবী (সাঃ) ওয়াদীয়ে নাখলাহ নামক স্থানে সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ)-দেরকে নিয়ে ফজরের নামায পড়াচ্ছিলেন। এই সময় কয়েকজন জ্বিন সেদিক দিয়ে যাচ্ছিল। তারা নবী (সাঃ)-এর কুরআন পাঠ শুনে প্রভাবিত হয়। এখানে বলা হচ্ছে যে, সেই সময় জ্বিনদের কুরআন শোনার ব্যাপারটা নবী (সাঃ) জানতেন না। বরং অহীর মাধ্যমে তাঁকে এ খবর জানানো হয়।
[2] عَجَبًا ‘আ’জাবান’ হল মাসদার (ক্রিয়ামূল, বা ক্রিয়া-বিশেষ্য) মুবালাগা (অতিরিক্ত বুঝানোর) অর্থে ব্যবহার হয়েছে। অথবা সম্বন্ধপদের যাকে সম্বন্ধ করা হয় সে শব্দ ঊহ্য আছে; অর্থাৎ, ذَا عَجَبٍ । কিংবা মাসদার (ক্রিয়া বিশেষ্য) ব্যবহার হয়েছে ইসম ফায়েল (কর্তৃকারক)এর অর্থে مُعْجِبًا। অর্থ হল, আমরা এমন কুরআন শুনেছি যা ভাষার চমৎকারিত্ব ও সাহিত্য-শৈলীর দিক দিয়ে বড়ই বিস্ময়কর অথবা ওয়ায-নসীহতের দিক দিয়ে বিস্ময়কর কিংবা বর্কতের দিক দিয়ে অতি আশ্চর্যজনক। (ফাতহুল ক্বাদীর)
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: নামকরণ :
الجن-জিন একটি জাতি, যাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা আগুন দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। তাদেরকেও আমাদের মত এক আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। জিনদের থেকে কোন নাবী-রাসূল আগমন করেনি। মানুষের মধ্য থেকে আল্লাহ তা‘আলা যে নাবী বা রাসূল প্রেরণ করেন তা উভয় জাতির জন্য নাবী বা রাসূল হিসাবে বিবেচিত। এ সূরার প্রথম আয়াতে উল্লিখিত الجن শব্দ থেকে সূরার নামকরণ করা হয়েছে।
শানে নুযূল :
ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন : একদল সাহাবী নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উকায বাজারের দিকে যাত্রা করলেন। এমন সময় জিনদের আসমানী খবরাদি শোনার ব্যাপারে বাধা সৃষ্টি করে দেওয়া হল এবং তাদের দিকে ছুড়ে মারা হল লেলিহান অগ্নিশিখা। ফলে জিন শয়তানরা ফিরে আসলে অন্য জিনেরা বলল : তোমাদের কী হয়েছে? তারা বলল : আসমানী খবরাদি শোনার ক্ষেত্রে আমাদের ওপর বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে এবং লেলিহান অগ্নিশিখা ছুঁড়ে মারা হয়েছে। তখন শয়তান বলল : আসমানি খবরাদি সংগ্রহের ক্ষেত্রে তোমাদের প্রতি যে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে, তা অবশ্যই নতুন কোন ঘটনা ঘটার কারণে। সুতরাং তোমরা পৃথিবীর পূর্ব ও পশ্চিম দিগন্ত (সারা পৃথিবী) সফর কর এবং দেখ কী নতুন ঘটনা ঘটেছে, যে কারণে আসমানি খবরাদি সংগ্রহে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে।
ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলছেন : যারা তিহামার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিল, তারা “নাখলা” নামক স্থানে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে উপস্থিত হল। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এখান থেকে উকায বাজারে যাওয়ার মনস্থ করছিলেন। এমন সময় সাহাবীদের নিয়ে ফজর সালাত আদায় করছিলেন। জিনদের ঐ দলটি কুরআন শুনতে পেয়ে আরো বেশি মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগল এবং বলল : আসমানি খবর আর তোমাদের মাঝে এটাই বাধা সৃষ্টি করেছে। এরপর তারা স্বজাতির কাছে ফিরে এসে বলল : হে আমাদের জাতি আমরা এক আশ্চর্য কুরআন শ্রবণ করেছি যা সঠিক পথ দেখায়। এতে আমরা ঈমান এনেছি আর আমরা কখনো প্রতিপালকের সাথে শরীক করব না। এরপর আল্লাহ তা‘আলা এ সূরাটি অবতীর্ণ করলেন। (সহীহ বুখারী হা. ৪৯২১, সহীহ মুসলিম হা. ৪৪৯) সূরা আহকাফের ২৯ নম্বর আয়াতের টীকায় এ ঘটনা উল্লেখ আছে।
সূরায় দু’টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনায় স্থান পেয়েছে :
১. এতে ইসলামের কয়েকটি মৌলিক আকীদাহর ওপর জিনদের সাক্ষ্য হাযির করা হয়েছে। এসব আকীদাহকে মুশরিকরা সরাসরি অস্বীকার করত এবং এ নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হত। কখনো তারা দাবী করত যে, মুহাম্মাদ তাদের কাছে অদৃশ্য আকীদাহ বিশ্বাস সংক্রান্ত যেসব কথা বলে থাকে তা সে জিনদের থেকে সংগ্রহ করে। এর জবাবে স্বয়ং জিনদের সাক্ষ্য উপস্থিত করা হয়েছে। জিনেরা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছ থেকে শ্রবণের পূর্বে কুরআন সম্পর্কে কিছুই জানতো না। এ কারণে যখনই রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছ থেকে কুরআন তেলাওয়াত শুনলো তখনি তারা ভয়ে ও আতংকে এত অধীর হয়ে পড়লো যে, তারা কিছুতেই চুপ থাকতে পারলো না। তারা সর্বত্র এ কথা প্রচার করে দিলো।
২. এ সূরা দ্বারা পাঠকদের মনে জিনদের ব্যাপারে বিরাজমান অনেক ভ্রান্ত ধারণার সংশোধন করা হয়েছে। এসব ভুল ধারণা কুরআন নাযিল হওয়ার সময়কার শ্রোতাদের মনেও ছিল, তাদের ও পরের লোকদের মনেও ছিল। কুরআন এ অদৃশ্য সৃষ্টির প্রকৃত তথ্য কোন অতিরঞ্জন ও রাখঢাক ছাড়াই প্রকাশ করেছে। কুরআনের প্রাথমিক শ্রোতা আরবরা ভাবতো যে, পৃথিবীর ওপর জিনদের একটি আধিপত্য রয়েছে, সে জন্যই একজন আরব পৌত্তলিক যখন কোন এলাকায় অবতরণ করত তখন তারা সে এলাকার জিনদের থেকে আশ্রয় চাইতো।
১-৭ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
এ আয়াতগুলো প্রমাণ করছে, জিনদের মধ্যে একশ্রেণির জিন রয়েছে যারা আল্লাহ তা‘আলার তাওহীদ, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর রিসালাত ও আখিরাতে বিশ্বাসী। তারা মু’মিন। আব্দুর রহমান বলেন : আমি মাসরূককে জিজ্ঞাসা করলাম, যে রাতে জিনরা মনোযোগের সাথে কুরআন শ্রবণ করেছিল ঐ রাতে নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে তাদের উপস্থিতির কথা জানানো হয়েছিল। তিনি বলেন : তোমার পিতা আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) আমাকে বলেছেন যে, একটি গাছ তাদের উপস্থিতির খবর দিয়েছিল। (সহীহ বুখারী হা. ৩৮৫৯, সহীহ মুসলিম হা. ৪৫০)
شَطَطًا অর্থ جور বা মিথ্যা কথা।
(وَّأَنَّا ظَنَنَّآ أَنْ لَّنْ تَقُوْلَ....)
অর্থাৎ আমাদের বিশ্বাস ছিল-মানুষ ও জিনেরা আল্লাহ তা‘আলার ব্যাপারে মিথ্যা বলবে না। এখন আমরা কুরআন শুনলাম এবং তাদের ভ্রান্ত আকিদাহ জানতে পারলাম।
(...كَانَ رِجَالٌ مِّنَ الْإِنْسِ يَعُوْذُوْنَ)
অর্থাৎ জাহিলিয়াতের যুগে একটি প্রচলন ছিল যে, যখন তারা কোথাও সফর করত তখন সেখানে অবস্থিত জিনদের থেকে আশ্রয় চাইত। যেমন অঞ্চলের বিশেষ ব্যক্তি এবং সরদারের কাছে আশ্রয় চাওয়া হয়। ইসলাম এ প্রচলন বাতিল করে দিয়েছে। আশ্রয় চাইতে হবে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার কাছে। যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্য কারো কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করবে সে শির্কে লিপ্ত হবে। যাবতীয় বালা মসিবত ও অনিষ্ট থেকে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার কাছে আশ্রয় চাইতে হবে।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : যে ব্যক্তি কোন জায়গায় অবতরণ করবে এবং বলবে :
أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ
আমি আল্লাহ তা‘আলার পরিপূর্ণ কালেমার মাধ্যমে তাঁর সৃষ্টির সকল অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাচ্ছি। তাহলে সে স্থান ত্যাগ করার পূর্বে তাকে কিছুই ক্ষতি করতে পারবে না। (সহীহ মুসলিম হা. ৭০৫৩)
رَهَقًا অর্থ : অবাধ্যতা, অহংকার। জিনদের কাছে মানুষের আশ্রয় চাওয়ার কারণে তাদের অহংকার আরো বেড়ে যেত।
يَّبْعَثَ اللّٰهُ এখানে بعث এর দু’টি অর্থ হতে পারে- (১) কাউকে পুনরুত্থিত করবেন না বলে বিশ্বাস করত, (২) কাউকে আর নাবীরূপে প্রেরণ করবেন না-এ বিশ্বাস রাখতো।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. জিনদের মধ্যেও অনেক মু’মিন জিন রয়েছে।
২. আশ্রয় প্রার্থনা করতে হবে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার কাছে। কোন জিন শয়তান বা মানুষ শয়তানের কাছে নয়।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১-৭ নং আয়াতের তাফসীর
আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বীয় রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি তোমার কওমকে ঐ ঘটনাটি অবহিত কর যে, জ্বিনেরা কুরআন কারীম শুনেছে, সত্য জেনেছে, ওর উপর ঈমান এনেছে এবং ওর অনুগত হয়েছে। সুতরাং হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে বলঃ আমার প্রতি প্রত্যাদেশ করা হয়েছে যে, জ্বিনদের একটি দল কুরআন কারীম শুনে নিজেদের কওমের মধ্যে গিয়ে বলেঃ আজ আমরা এক অতি চমৎকার ও বিস্ময়কর কিতাবের বাণী শুনেছি যা সত্য ও মুক্তির পথ প্রদর্শন করে। আমরা তা মেনে নিয়েছি। এখন এটা অসম্ভব যে, আমরা আল্লাহর সাথে অন্য কারো ইবাদত করবো। এই বিষয়টিই নিম্নের আয়াতের মতঃ (আরবি)
অর্থাৎ “যখন আমি জ্বিনদের একটি দলকে তোমার নিকট প্রেরণ করেছিলাম, যেন তারা কুরআন শ্রবণ করে।” (৪৬:২৯) এর তাফসীর হাদীস সমূহের মাধ্যমে আমরা সেখানে বর্ণনা করেছি। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন।
জ্বিনেরা নিজেদের সম্প্রদায়কে বলেঃ আমাদের প্রতিপালকের কার্য, ক্ষমতা ও নির্দেশ উচ্চ মানের ও বড়ই মর্যাদা সম্পন্ন। তাঁর নিয়ামতরাজি, শক্তি এবং সৃষ্টজীবের প্রতি করুণা অপরিসীম। তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা উচ্চাঙ্গের। তাঁর মহত্ত্ব ও সম্মান অতি উন্নত। তাঁর যিকর উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন। তাঁর মাহাত্ম্য খুবই উন্নত মানের।
মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ (আরবি) বলা হয় পিতাকেও। যদি জ্বিনেরা জানতো যে, মানুষের মধ্যেও (আরবি) রয়েছে তবে তারা আল্লাহর সম্পর্কে এই শব্দ ব্যবহার করতো না। (এ উক্তিটি সনদের দিক দিয়ে সবল হলেও এর অর্থ বোধগম্য হচ্ছে না। সম্ভবতঃ এতে কোন একটা কিছু ছুটে গেছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)
ঐ জ্বিনেরা তাদের কওমকে আরো বলেঃ আল্লাহ গ্রহণ করেননি কোন পত্নী এবং না কোন সন্তান। এর থেকে তিনি সম্পূর্ণরূপে পবিত্র।
তারা আরো বলেঃ আমাদের নির্বোধরা অর্থাৎ শয়তানরা আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে ও অপবাদ দেয়। আর এর দ্বারা উদ্দেশ্য সাধারণও হতে পারে। অর্থাৎ প্রত্যেক ব্যক্তিই যে আল্লাহর জন্যে স্ত্রী ও সন্তান সাব্যস্ত করে সে নির্বোধ এবং চরম মিথ্যাবাদী। সে বাতিল আকীদা রাখে এবং অন্যায় ও অবিচারমূলক কথা মুখ থেকে বের করে।
ঐ জ্বিনেরা আরো বলতে থাকে আমাদের ধারণা ছিল যে, দানব ও মানব কখনো আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করতে পারে না। কিন্তু কুরআন পাঠ করে আমরা জানতে পারলাম যে, এ দু'টি জাতি আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে থাকে। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্ সত্তা এসব থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র।
এরপর বলা হচ্ছেঃ জ্বিনদের খুব বেশী বিভ্রান্ত হওয়ার কারণ এই যে, তারা দেখতো যে, যখনই মানুষ কোন জঙ্গলে বা মরু প্রান্তরে যেতো তখনই সে বলতোঃ আমি এই জঙ্গলের সবচেয়ে বড় জ্বিনের আশ্রয় গ্রহণ করছি। এ কথা বলার পর সে মনে করতো যে, সে সমস্ত জ্বিনের অনিষ্ট হতে রক্ষা পেয়ে যাবে। যেমন তারা যখন কোন শহরে যেতো তখন ঐ শহরের বড় নেতার শরণাপন্ন হতো। ফলে ঐ শহরের অন্যান্য লোকও তাদেরকে কোন কষ্ট দিতো না, যদিও তারা তার শত্রু হতো। যখন জ্বিনেরা দেখলো যে, মানুষও তাদের আশ্রয়ে এসে থাকে তখন তাদের ঔদ্ধত্য ও আত্মম্ভরিতা আরো বৃদ্ধি পেলো এবং তারা আরো বেশী বেশী মানুষের ক্ষতি সাধনে তৎপর হয়ে উঠলো। আর ভাবার্থ এও হতে পারে যে, জ্বিনেরা মানুষের এ অবস্থা দেখে তাদেরকে আরো ভয় দেখাতে শুরু করলো ও তাদেরকে নানাভাবে কষ্ট দিতে লাগলো। প্রকৃতপক্ষে দানবরা মানবদেরকে ভয় করতো, যেমন মানব দানবদেরকে ভয় করতো এবং তার চেয়েও বেশী। এমনকি যে জঙ্গলে বা মরু প্রান্তরে মানব যেতো সেখান থেকে দানবরা পালিয়ে যেতো। কিন্তু যখন থেকে মুশরিকরা দানবদের শরণাপন্ন হতে শুরু করলো এবং বলতে লাগলোঃ “এই উপত্যকার জ্বিন-সরদারের আমরা শরণাপন্ন হলাম এই স্বার্থে যে, সে আমাদের, আমাদের সন্তানদের এবং আমাদের ধন-মালের কোন ক্ষতি সাধন করবে না তখন থেকে জ্বিনদের সাহস বেড়ে গেল। কারণ তারা মনে করলো যে, মানুষই তো তাদেরকে ভয় করে। সুতরাং তারা নানা প্রকারে মানুষকে ভয় দেখাতে, কষ্ট দিতে ও উৎপীড়ন করতে লাগলো।
কারদাম ইবনে আবী সায়েব আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি আমার পিতার সাথে কোন কার্য উপলক্ষে মদীনা হতে বাইরের দিকে যাত্রা শুরু করি। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) মক্কায় রাসূলরূপে প্রকাশিত হয়েছিলেন। রাত্রিকালে আমরা জঙ্গলে এক রাখালের নিকট অবস্থান করি। অর্ধ রাত্রে একটি নেকড়ে বাঘ এসে ঐ রাখালের একটি বকরী ধরে নিয়ে যায়। রাখালটি বাঘটির পিছনে দৌড় দেয় এবং চীৎকার করে বলতে লাগেঃ “হে এই উপত্যকার আবাদকারী! আমি তোমার আশ্রয়ে এসেছি।” সাথে সাথে একটি শব্দ শোনা গেল, অথচ আমরা কোন লোককে দেখতে পেলাম না। শব্দটি হলোঃ “হে নেকড়ে বাঘ! এ বকরীকে ছেড়ে দাও।” অল্পক্ষণ পরেই আমরা দেখলাম যে, ঐ বকরীটিই পালিয়ে আসলো এবং যুথে এসে মিলিত হয়ে গেল। সে একটু যখমও হয়নি। এটার পরিপেক্ষিতেই আল্লাহ্ তা'আলা মক্কায় স্বীয় রাসূল (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ করেনঃ কতিপয় মানুষ কতক জিনের আশ্রয় গ্রহণ করতো, ফলে তারা জ্বিনদের আত্মম্ভরিতা বাড়িয়ে দিতো। (এটা ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হতে পারে যে, নেকড়ে বাঘের রূপ ধরে জ্বিনই এসেছিল, যে বকরীকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল এবং এদিকে ঐ রাখালটির দোহাইতে ছেড়ে দিয়েছিল, যাতে রাখালের এবং তার মুখে শুনে অন্যান্য লোকদেরও এ বিশ্বাস জন্মে যে, জ্বিনদের আশ্রয়ে আসলে বিপদ-আপদ হতে নিরাপত্তা লাভ করা যায়। এভাবে জ্বিন মানুষকে পথভ্রষ্ট করে দ্বীন হতে সরিয়ে দিতে পারে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
মুসলমান জ্বিনগুলো তাদের কওমকে আরো বললোঃ হে জ্বিনদের দল! তোমাদের মত মানুষও মনে করে যে, মৃত্যুর পর আল্লাহ্ কাউকেও পুনরুত্থিত করবেন না। অথবা এই অর্থ হবেঃ তোমাদের মত মানুষও মনে করতো যে, আল্লাহ্ কাউকেও রাসূলরূপে প্রেরণ করবেন না।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।