সূরা নূহ (আয়াত: 21)
হরকত ছাড়া:
قال نوح رب إنهم عصوني واتبعوا من لم يزده ماله وولده إلا خسارا ﴿٢١﴾
হরকত সহ:
قَالَ نُوْحٌ رَّبِّ اِنَّهُمْ عَصَوْنِیْ وَ اتَّبَعُوْا مَنْ لَّمْ یَزِدْهُ مَالُهٗ وَ وَلَدُهٗۤ اِلَّا خَسَارًا ﴿ۚ۲۱﴾
উচ্চারণ: কা-লা নূহুররাব্বি ইন্নাহুম ‘আসাওনী ওয়াত্তাবা‘ঊ মাল্লাম ইয়াযিদহু মা-লুহূওয়া ওয়ালাদুহূ ইল্লা- খাছা-রা- ।
আল বায়ান: নূহ বলল, ‘হে আমার রব! তারা আমার অবাধ্য হয়েছে এবং এমন একজনের অনুসরণ করেছে যার ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কেবল তার ক্ষতিই বাড়িয়ে দেয়’।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২১. নূহ বলেছিলেন, হে আমার রব! আমার সম্প্রদায় তো আমাকে অমান্য করেছে এবং অনুসরণ করেছে এমন লোকের যার ধন-সম্পদ ও সন্তানসন্ততি তার ক্ষতি ছাড়া আর কিছুই বৃদ্ধি করেনি।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: নূহ বলেছিল, ‘হে আমার প্রতিপালক! তারা আমার কথা প্রত্যাখ্যান করেছে আর আনুগত্য করছে তাদের (অর্থাৎ এমন সব লোকদের) যাদের মালধন আর সন্তানাদি তাদের ক্ষতি ছাড়া অন্য কিছুই বৃদ্ধি করেনি,
আহসানুল বায়ান: (২১) নূহ বলেছিল, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমার সম্প্রদায় তো আমাকে অমান্য করেছে[1] এবং অনুসরণ করেছে এমন লোকের যার ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তার ক্ষতি ব্যতীত আর কিছুই বৃদ্ধি করেনি।[2]
মুজিবুর রহমান: নূহ বলেছিলঃ হে আমার রাব্ব! আমার সম্প্রদায়তো আমাকে অমান্য করছে এবং অনুসরণ করছে এমন লোকের যার ধন সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তার ক্ষতি ব্যতীত আর কিছুই বৃদ্ধি করেনি।
ফযলুর রহমান: নূহ বলল, “প্রভু! ওরা (আমার লোকেরা) আমার কথা অমান্য করেছে এবং এমন ব্যক্তির অনুসরণ করেছে যার ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কেবল তার ক্ষতিই বৃদ্ধি করেছে।
মুহিউদ্দিন খান: নূহ বললঃ হে আমার পালনকর্তা, আমার সম্প্রদায় আমাকে অমান্য করেছে আর অনুসরণ করছে এমন লোককে, যার ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কেবল তার ক্ষতিই বৃদ্ধি করছে।
জহুরুল হক: নূহ্ বলেছিলেন -- "আমার প্রভূ! নিঃসন্দেহ তারা আমাকে অমান্য করেছে এবং অনুসরণ করছে তার যার ধনসম্পত্তি ও সন্তানসন্ততি ক্ষতিসাধন ছাড়া তার আর কিছুই বাড়ায় নি,
Sahih International: Noah said, "My Lord, indeed they have disobeyed me and followed him whose wealth and children will not increase him except in loss.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ২১. নূহ বলেছিলেন, হে আমার রব! আমার সম্প্রদায় তো আমাকে অমান্য করেছে এবং অনুসরণ করেছে এমন লোকের যার ধন-সম্পদ ও সন্তানসন্ততি তার ক্ষতি ছাড়া আর কিছুই বৃদ্ধি করেনি।(১)
তাফসীর:
(১) অর্থাৎ তারা আমার অবাধ্য হয়েছে। তারা সমাজের ধনী ও নেতৃস্থানীয় লোকদের অনুসরণ করেছে। অথচ এ সমস্ত লোকদের ধন-সম্পদ ও প্রভাব-প্রতিপত্তি, সন্তান সন্তুতি তাদের ক্ষতি ছাড়া আর কিছুই বৃদ্ধি করবে না। [কুরতুবী]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (২১) নূহ বলেছিল, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমার সম্প্রদায় তো আমাকে অমান্য করেছে[1] এবং অনুসরণ করেছে এমন লোকের যার ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তার ক্ষতি ব্যতীত আর কিছুই বৃদ্ধি করেনি।[2]
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, আমার অবাধ্যতা করাতে অটল আছে এবং আমার দাওয়াতে সাড়া দিচ্ছে না।
[2] অর্থাৎ, তাদের নিম্নশ্রেণীর লোকেরা সেই বড় ও ধনীশ্রেণীর লোকেদেরই অনুসরণ করেছে, যাদেরকে তাদের ধন ও সন্তান-সন্ততি দুনিয়া ও আখেরাতের ক্ষতির দিকেই নিয়ে যাচ্ছে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ২১-২৪ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
নূহ (আঃ) এক পুরুষের পর দ্বিতীয় পুরুষকে অতঃপর তৃতীয় পুরুষকে এমনিভাবে সাড়ে নয়শত বছর দাওয়াতী কাজ করলেন এ আশায় যে, তারা ঈমান আনবে। কিন্তু শতাব্দীর পর শতাব্দী বিরতিহীন দাওয়াত দেওয়া সত্ত্বেও তারা ঈমান আনল না। তখন নূহ (আঃ) আল্লাহ তা‘আলার কাছে অভিযোগ করে বললেন : হে আল্লাহ তা‘আলা! তারা আমার অবাধ্য হয়েছে এবং এমন মা‘বূদের অনুসরণ করছে যারা ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে ক্ষতি ছাড়া কোন উপকার করতে পারে না। আর তারা হককে প্রতিহত করার জন্য সর্বপ্রকার ষড়যন্ত্র করছে।
নূহ (আঃ)-এর দাওয়াতের বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় জাতির লোকেরা তাঁকে হত্যা করার চক্রান্ত করল।
যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(لَئِنْ لَّمْ تَنْتَھِ یٰنُوْحُ لَتَکُوْنَنَّ مِنَ الْمَرْجُوْمِیْنَ)
‘হে নূহ! তুমি যদি বিরত না হও তবে তুমি অবশ্যই প্রস্তরাঘাতে নিহতদের মাঝে শামিল হবে।’ (সূরা শুআরা ২৬ : ১১৬) তিনি স্বজাতিকে ডেকে বললেন : ‘‘হে আমার সম্প্রদায়! আমার অবস্থিতি ও আল্লাহর নিদর্শন দ্বারা আমার উপদেশ দান তোমাদের নিকট যদি দুঃসহ হয় তবে আমি তো আল্লাহর ওপর নির্ভর করি। তোমরা যাদেরকে শরীক করেছ তৎসহ তোমাদের কর্তব্য স্থির করে নাও, পরে যেন কর্তব্যের বিষয়ে তোমাদের কোন অস্পষ্টতা না থাকে। আমার সম্বন্ধে তোমাদের কর্ম নিষ্পন্ন করে ফেল এবং আমাকে অবকাশ দিও না। ‘আর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তোমাদের নিকট আমি তো কোন পারিশ্রমিক চাই না, আমার পারিশ্রমিক আছে একমাত্র আল্লাহর নিকট, আমি আত্মসমর্পণকারীদের অন্তর্ভুক্ত হতে আদিষ্ট হয়েছি।’ আর তারা তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করল।” (সূরা ইউনুস ১০ : ৭১-৭৩) জাতির লোকেরা তাঁর কথায় কর্ণপাত না করে শির্কের ওপর অটল রইল এবং অন্যদেরকেও জানিয়ে দেয়, তোমরা নূহের কথায় তোমাদের মা‘বূদদেরকে বর্জন করো না।
(لَا تَذَرُنَّ اٰلِهَتَكُمْ وَلَا تَذَرُنَّ)
অর্থাৎ নূহ (আঃ)-এর যুগের লোকেরা যে সকল ব্যক্তিদের পূজা করত তারা সকলে সৎ বান্দা ছিল। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন : নূহ (আঃ)-এর জাতির মাঝে যে প্রতিমার পূজা চালু ছিল পরবর্তীতে আরবের মাঝেও তার পূজা প্রচলিত হয়েছিল।
(ود) ওয়াদ “দাওমাতুল জান্দাল” নামক জায়গায় কালব গোত্রের একটি দেবমূর্তি, (سُوَاعً) সূওয়া হল হুযায়ল গোত্রের একটি দেবমূর্তি এবং (يَغُوْثَ) ইয়াগুছ ছিল মুরাদ গোত্রের, পরবর্তীতে তা গাতীফ গোত্রের হয়ে যায়। এর আস্তানা ছিল কওমে সাবার নিকটবর্তী “জাওফ” নামক স্থানে। (يَعُوْق) ইয়াউক ছিল হামাদান গোত্রের মূর্তি, (نَسْرًا) নাসর ছিল যুলকালা গোত্রের হিময়ার শাখার মূর্তি। নূহ (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের কতিপয় নেক লোকের নাম নাসর ছিল। তারা মারা গেলে শয়তান তাদের জাতির লোকদের অন্তরে এ কথা ঢেলে দিল যে, তারা যেখানে বসে আলোচনা করত, সেখানে তোমরা কতিপয় মূর্তি স্থাপন কর এবং ঐ সমস্ত পূন্যবান লোকদের নামেই এদের নামকরণ কর। তারা তাই করল, কিন্তু তখনও ঐসব মূর্তির পূজা করা হত না। তবে মূর্তি স্থাপনকারী লোকেরা মারা গেলে এবং মূর্তিগুলোর ব্যাপারে প্রকৃত জ্ঞান বিলুপ্ত হয়ে গেলে লোকজন তাদের পূজা করা শুরু করে দেয়। (সহীহ বুখারী হা. ৪৯২০)
ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন : তাই সৎ ব্যক্তিদের নিয়ে বাড়াবাড়ি করা, তাদের মর্যাদা থেকে বেশি সম্মান প্রদর্শন করা ও শরীয়ত গর্হিত কাজ মানুষকে পথভ্রষ্টতার দিকে নিয়ে যায়। সেজন্য তাদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি না করে উপযুক্ত সম্মান দিয়ে শরীয়ত নির্দেশিত পন্থায় আমল করা আবশ্যক।
আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, একদা উম্মু হাবীবাহ ও উম্মু সালামাহ (রাঃ) হাবশায় গীর্জা দেখলেন, সেগুলোকে মারিয়া বলা হয়। সেখানে অনেক ছবি, প্রতিকৃতি ও মূর্তি ছিল। রাসূলুুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে এসব কথা বললে, তিনি বলেন : ঐ সমাজে যখন কোন সৎ লোক মারা যেত, তারা সেই সৎ লোকের কবরের ওপর মাসজিদ বানাতো এবং তাতে তাদের প্রতিকৃতি বানিয়ে রাখতো। এসব লোকেরা হল সৃষ্টির মধ্যে নিকৃষ্ট। এরা কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলার কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট জাতি হিসাবে গণ্য হবে। (সহীহ বুখারী হা. ৪২৭, ৩৮৭৩, সহীহ মুসলিম হা. ৫২৮)
(وَقَدْ أَضَلُّوْا)
অর্থাৎ নূহ (আঃ)-এর জাতির নেতা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ অনেক লোকদেরকে প্রতিমা পূজার দিকে দাওয়াত দিয়ে পথভ্রষ্ট করেছে।
সৃষ্টির সূচনালগ্ন অর্থাৎ আদম (আঃ) থেকে নূহ (আঃ) পর্যন্ত সমস্ত মানুষ তাওহীদের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। সে সময় ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্ম ছিল না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(کَانَ النَّاسُ اُمَّةً وَّاحِدَةًﺤ فَبَعَثَ اللہُ النَّبِیّ۪نَ مُبَشِّرِیْنَ وَمُنْذِرِیْنَ...)
“মানবজাতি একই সম্প্রদায়ভুক্ত ছিল। অতঃপর আল্লাহ সুসংবাদদাতা ও ভয় প্রদর্শনকারী হিসাবে নাবীদেরকে পাঠালেন...।”
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন : আদম ও নূহ (আঃ)-এর মধ্যকার দশ যুগ বা প্রজন্মের সকলেই সত্য ধর্মের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল, অতঃপর তারা ধর্মীয় বিষয়ে মতবিরোধে লিপ্ত হয়। ফলে তাদেরকে সত্য ধর্মের ওপর পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য আল্লাহ তা‘আলা নাবীদেরকে সুসংবাদদাতা ও ভয় প্রদর্শনকারীস্বরূপ প্রেরণ করেন (তাবারী ২/৩৩৪)। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনু আব্বাস (রাঃ) যা বলেছেন তার সত্যতা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর একটি হাদীসেও প্রমাণিত। তিনি বলেন : আদম ও নূহ (আঃ)-এর মধ্যবর্তী দশ যুগ বা প্রজন্ম পর্যন্ত সবাই ইসলামের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। (তাবারী ২/৩৩৪) এ ছাড়াও অনেক প্রমাণ রয়েছে যা প্রমাণ করে-আদম ও নূহ (আঃ)-এর মধ্যবর্তী সময়ের লোকেরা তাওহীদের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।
সর্বপ্রথম যে জাতি শির্কে লিপ্ত হয় :
এ আয়াতের তাফসীরে ইমাম ইবনু জারীর বলেন : এরা পাঁচজন আদম ও নূহ (আঃ)-এর মধ্যবর্তী সময়ের সৎ মানুষ ছিলেন। তাদের অনুসরণকারী অনেক মানুষ ছিল। তারা মৃত্যু বরণ করার পর তাদের অনুসারীরা বলল : আমরা যদি তাদের প্রতিকৃতি নির্মাণ করি তাহলে তা দেখে আমরা আল্লাহ তা‘আলার ইবাদতের প্রতি আগ্রহী ও মনোযোগী হতে পারব। এটা মনে করে তারা তাদের প্রতিকৃতি তৈরি করল। এদের মৃত্যুর পর দ্বিতীয় প্রজন্মের জনগণের নিকট শয়তান এসে বলল : তোমাদের পূর্ব পুরুষগণ এদের উপাসনা করত ও এদের ওসীলায় তারা বৃষ্টি কামনা করতো। এভাবে শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে তারা তাদের উপাসনা করতে আরম্ভ করে। (তাবারী ১২/২৯/৬২, এগাছাতুল লাহফান ২/১৬১)
আরবে শির্কের অনুপ্রবেশ :
আরবে বসবাসকারী সাধারণ লোকজন ইসমাঈল (আঃ)-এর দাওয়াত ও প্রচারের ফলে ইবরাহীম (আঃ) প্রচারিত দীনের অনুসারী ছিলেন। এ কারণেই তারা ছিলেন আল্লাহ তা‘আলার একত্বে বিশ্বাসী এবং তারা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলারই ইবাদত করত। কিন্তু কালপ্রবাহে ক্রমান্বয়ে তারা আল্লাহ তা‘আলার একত্ববাদ এবং খালেস দীনি শিক্ষার কোন কোন অংশ ভুলে যেতে থাকে। এতদসত্ত্বেও আল্লাহ তা‘আলার একত্ব ও দীনে ইবরাহীমের কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য অবশিষ্ট থাকে। বনু খুযাআহ গোত্রের সরদার আমর বিন লুহাইকে ধর্মীয় বিষয়াদির প্রতি তার গভীর অনুরাগের কারণে লোকজন তাকে শ্রদ্ধা করত এবং তার কথা অনুসরণ করত। এক পর্যায়ে সে ব্যক্তি শাম দেশে ভ্রমণ করে এবং সেখানে মূর্তি পূজা দেখতে পায়। শাম দেশে বহু নাবী-রাসূলগণ এসেছেন। সেই হিসাবে লুহাই মূর্তি পূজাকে অধিকতর ভাল ও সত্য বলে ধারণা করে। তাই দেশে ফিরে আসার সময় সে হুবাল নামক একটি মূর্তি সাথে নিয়ে আসে এবং খানায়ে কাবার মধ্যে তা রেখে দিয়ে পূজা করা শুরু করে। সাথে সাথে মক্কাবাসীকেও পূজা করার জন্য আহ্বান করে। মক্কাবাসী তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে মূর্তি হোবলের পূজা করতে থাকে। কাল বিলম্ব না করে হিজাযবাসীও মক্কাবাসীর অনুসরণ করে মূর্তি পূজা করতে লাগল। এভাবে একত্ববাদী আরববাসী মূর্তি পূজায় লিপ্ত হয়। (আর রাহীকুল মাখতূম)
(وَلَا تَزِدِ الظّٰلِمِيْنَ إِلَّا ضَلٰلًا)
অর্থাৎ নূহ (আঃ) তাঁর অবাধ্য সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বদ্দুআ করেছেন, যেমন মূসা (আঃ) করেছিলেন :
(وَقَالَ مُوْسٰي رَبَّنَآ إنَّكَ اٰتَيْتَ فِرْعَوْنَ وَمَلَأَه۫ زِيْنَةً وَّأَمْوَالًا فِي الْحَيٰوةِ الدُّنْيَا لا, رَبَّنَا لِيُضِلُّوْا عَنْ سَبِيْلِكَ ج رَبَّنَا اطْمِسْ عَلٰٓي أَمْوَالِهِمْ وَاشْدُدْ عَلٰي قُلُوْبِهِمْ فَلَا يُؤْمِنُوْا حَتّٰي يَرَوُا الْعَذَابَ الْأَلِيْمَ )
“মূসা বলল : ‘হে আমাদের প্রতিপালক, তুমি তো ফির‘আউন ও তার পারিষদবর্গকে পার্থিব জীবনে শোভা ও সম্পদ দান করেছ, হে আমাদের প্রতিপালক! যার করণে তারা মানুষকে তোমার পথ হতে ভ্রষ্ট করছে। হে আমাদের প্রতিপালক! তাদের সম্পদ বিনষ্ট কর, তাদের হৃদয় কঠিন করে দাও, তারা তো যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রত্যক্ষ না করা পর্যন্ত ঈমান আনবে না।’’ (সূরা ইউনুস ১০ : ৮৮)
সুতরাং যুগে যুগে সৎ ব্যক্তিদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি থেকেই মূলত শিরকের আস্তানা গড়ে উঠেছে। আমাদের দেশেও দেখা যায় যত মাযার, খানকা ইত্যাদি রয়েছে তার অধিকাংশ সৎ লোকদের কবরকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হয়েছে। আর কিছু আছে ভন্ড শয়তান যারা কোনদিন নামায রোযার ধার ধারত না; অথচ তাদের অনুসারীরা তাদের মৃত্যুর পর কবরের ওপর মাযার গড়ে তোলে। আর কিছু মাযার রয়েছে মূলত সেখানে কোন মৃত ব্যক্তিই নেই, রাতারাতি মাযারের মত গড়ে তুলে ব্যবসা করছে। আমাদের সবাইকে এ সমস্ত ধোঁকা থেকে সাবধান থাকতে হবে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. মূর্তি পূজার সূচনা জানলাম।
২. প্রকৃত জ্ঞান না থাকলে মানুষ সহজেই পথভ্রষ্ট হয়ে যায়।
৩. যুগে যুগে যারাই সৎ ব্যক্তিদের নিয়ে বাড়াবাড়ি করেছে তারাই পথভ্রষ্ট হয়েছে।
৪. নাবীরা মুসতাজাবুত দাওয়াহ বা দু‘আ করলে কবূল হত এমন ব্যক্তি ছিলেন।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ২১-২৪ নং আয়াতের তাফসীর
আল্লাহ তা'আলা হযরত নূহ (আঃ) সম্পর্কে খবর দিচ্ছেন যে, তিনি তাঁর অতীতের অভিযোগের সাথে সাথেই আল্লাহ তা'আলার সামনে স্বীয় সম্প্রদায়ের আরেকটি আচরণের কথাও তুলে ধরে বলেছিলেনঃ আমার আহ্বান যেন তাদের কানেও না পৌঁছে এ জন্যে তারা তাদের কানে অঙ্গুলি দিয়েছিল, অথচ এটা ছিল তাদের জন্যে খুবই উপকারী। তারা আমার অনুসরণ না করে অনুসরণ করেছে এমন লোকের যার ধন-সম্পদ ও সন্তান সন্ততি তার ক্ষতি ব্যতীত আর কিছুই বৃদ্ধি করেনি। কেননা, এই ধন-মাল ও সন্তান সন্ততির গর্বে গর্বিত হয়ে তারা আল্লাহকেও ভুলে বসেছিল এবং ধরাকে সরা জ্ঞান করেছিল। (আরবি) এর অন্য পঠন (আরবি) রয়েছে।
কাফিরদের মধ্যে যারা নেতৃস্থানীয় ও সম্পদশালী ছিল তারা ভীষণ ষড়যন্ত্র করেছিল। (আরবি) ও (আরবি) দুটোই (আরবি)-এর অর্থে ব্যবহৃত অর্থাৎ খুব বড়। কিয়ামতের দিনও তারা এ কথাই বলবেঃ (আরবি)
অর্থাৎ “বরং দিন রাত তোমাদের চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রমূলক কাজ ছিল এই যে, তোমরা আমাদেরকে আল্লাহর সাথে কুফরী করার ও তাঁর সাথে শরীক স্থাপন করার নির্দেশ দিতে।” (৩৪:৩৩) তাদের বড়রা ছোটদেরকে বলেঃ তোমরা তোমাদের যে দেব-দেবীগুলোর পূজা করতে রয়েছে ওগুলোকে কখনও পরিত্যাগ করো না।
সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, হযরত নূহ (আঃ)-এর যুগের প্রতিমাগুলোকে আরবের কাফিররা গ্রহণ করে। দুমাতুল জানদালে কালব গোত্র ওয়াদ প্রতিমার, পূজা করতো। হুয়েল গোত্র পূজা করতো সূওয়া নামক প্রতিমার। মুরাদ গোত্র এবং সাবা শহরের নিকটবর্তী জারফ নামক স্থানের অধিবাসী বানু গাতীফ গোত্র ইয়াগ্স নামক প্রতিমার উপাসনা করতো। হামাদান গোত্র ইয়াউক নামক প্রতিমার পূজারী ছিল এবং যীকিলার গোত্র হুমায়ের নাসর নামক প্রতিমার পূজা করতো। প্রকৃতপক্ষে এগুলো হযরত নূহ (আঃ)-এর কওমের সৎ লোকদের নাম ছিল। তাদের মৃত্যুর পর শয়তান ঐ যুগের লোকদের মনে এই খেয়াল জাগিয়ে তুললো যে, ঐ সৎ লোকদের উপাসনালয়ে তাদের স্মারক হিসেবে কোন নিদর্শন স্থাপন করা উচিত। তাই তারা তথায় কয়েকটি নিশান স্থাপন করে ও প্রত্যেকের নামে নামে ওগুলোকে প্রসিদ্ধ করে। তারা জীবিত থাকা পর্যন্ত ঐ সৎলোকদের পূজা হয়নি বটে, কিন্তু তাদের মৃত্যুর পর ও ইলম উঠে যাওয়ার পর যে লোকগুলোর আগমন ঘটে তারা অজ্ঞতা বশতঃ ঐ জায়গাগুলোর ও ঐ নামগুলোর নিদর্শন সমূহের পূজা শুরু করে দেয়। হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত যহহাক (রঃ), হযরত কাতাদা (রঃ) এবং হযরত ইবনে ইসহাকও (রঃ) একথাই বলেন।
হযরত মুহাম্মাদ ইবনে কায়েস (রঃ) বলেন যে, ঐ লোকগুলো ছিলেন আল্লাহর ইবাদতকারী, দ্বীনদার, আল্লাহওয়ালা ও সৎ। তাঁরা হযরত আদম (আঃ) ও হযরত নূহ (আঃ)-এর ছিলেন সত্য অনুসারী, যাদের অনুসরণ অন্য লোকেরাও করতো। যখন তাঁরা মারা গেলেন তখন তাদের অনুসারীরা পরস্পর বলাবলি করলোঃ যদি আমরা এঁদের প্রতিমূর্তি তৈরী করে নিই তবে ইবাদতে আমাদের ভালভাবে মন বসবে এবং এদের প্রতিমূর্তি দেখে আমাদের ইবাদতের আগ্রহ বদ্ধি পাবে। সুতরাং তারা তাই করলো। অতঃপর যখন এ লোকগুলোও মারা গেল এবং তাদের বংশধরদের আগমন ঘটলো তখন শয়তান তাদের কাছে এসে বললোঃ “তোমাদের পূর্বপুরুষরা তো ঐ বুযুর্গ ব্যক্তির পূজা করতো এবং তাদের কাছে বৃষ্টি ইত্যাদির জন্যে প্রার্থনা করতো। সুতরাং তোমরাও তাই করো!' তারা তখন নিয়মিতভাবে ঐ মহান ব্যক্তিদের প্রতিমূর্তিগুলোর পূজা শুরু করে দিলো।
হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) হযরত শীষ (আঃ)-এর ঘটনার বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ হযরত আদম (আঃ)-এর চল্লিশটি সন্তান ছিল। বিশটি ছিল পুত্র এবং বিশটি ছিল কন্যা। তাদের মধ্যে যারা বেশী বয়স পেয়েছিল তারা হলো হাবীল, কাবীল, সালিহ এবং আব্দুর রহমান, যাঁর প্রথম নাম ছিল আবদুর হারিস এবং ওয়াদ। তাঁকে শীষ ও হিব্বাতুল্লাহও বলা হতো। সমস্ত ভাই তাঁকেই নেতৃত্ব দান করেছিল। সুওয়াআ, ইয়াগ্স, ইয়াউক এবং নাসার এই চারজন ছিলেন তাঁরই পুত্র।
হযরত উরওয়া ইবনে যুবায়ের (রঃ) বলেন যে, হযরত আদম (আঃ)-এর রোগের সময় তার পাঁচটি ছেলে ছিলেন। তাঁরা হলেন ওয়াদ, ইয়াউক, ইয়াগৃস, সূওয়াআ এবং নাসর। এদের মধ্যে ওয়াদ ছিলেন সর্বাপেক্ষা বড় ও সবচেয়ে সৎ।
মসনাদে ইবনে আবী হাতিমে বর্ণিত আছে যে, আবূ জাফর (রঃ) নামায পড়ছিলেন এবং জনগণ ইয়াযীদ ইবনে মুহাল্লিবের সম্পর্কে আলোচনা করে। নামায শেষ করার পর তিনি বলেনঃ তোমরা ইয়াযীদ ইবনে মুহাল্লাব সম্পর্কে আলোচনা করছো? সে এমন এক ব্যক্তি, যাকে এমন জায়গায় হত্যা করা হয় যেখানে সর্বপ্রথম গায়রুল্লাহর ইবাদত করা হয়। অতঃপর একজন মুসলমান সম্পর্কে আলোচনা করা হয় যিনি তাঁর কওমের কাছে অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন। তিনি খুব জ্ঞানী লোক ছিলেন। যখন তিনি মারা গেলেন তখন জনগণ তাঁর কবরের চারদিকে বসে পড়লো এবং তাদের মধ্যে কান্নার রোল উঠলো। তাঁর মৃত্যু তাদের কাছে বড়ই বিপদের কারণ হয়ে গেল। অভিশপ্ত শয়তান তাদের এই অবস্থা দেখে মানুষের রূপ ধরে তাদের নিকট আগমন করে এবং তাদেরকে বলেঃ “এই বুযুর্গ ব্যক্তির কোন স্মারক স্থাপন করছো না কেন? যা সদা-সর্বদা তোমাদের সামনে থাকবে এবং তোমরা তাঁকে ভুলবে না?` সবাই এই প্রস্তাব পছন্দ করলো। অতঃপর শয়তান ঐ বুযুর্গ লোকটির প্রতিমূর্তি তৈরী করে তাদের সামনে দাঁড় করিয়ে দিলো। ঐ প্রতিমূর্তি দেখে দেখে ঐ লোকগুলো তাকে স্মরণ করতে থাকলো। যখন তারা তাতে মগ্ন হয়ে পড়লো তখন শয়তান তাদেরকে বললোঃ “তোমাদের সকলকেই এখানে আসতে হচ্ছে। এটা তোমাদের জন্যে বড়ই অসুবিধাজনক। কাজেই এটা খুব ভাল হবে যে, আমি তোমাদের জন্যে তার অনেকগুলো মূর্তি তৈরী করে দিচ্ছি। তোমরা ওগুলো নিয়ে গিয়ে নিজ নিজ বাড়ীতে রেখে দিবে।” ঐ লোকগুলো এতেও সম্মত হয়ে গেল এবং ওটা কার্যেও পরিণত হলো। এ পর্যন্ত ঐ মূর্তিগুলো শুধু স্মারক হিসেবেই ছিল। কিন্তু ঐ লোকদের উত্তরসূরীরা সরাসরিভাবে ঐ মূর্তিগুলোর পূজা শুরু করে দিলো। প্রকৃত ব্যাপারটি তারা সম্পূর্ণরূপে বিস্মৃত হয়ে গেল এবং নিজেদের পূর্বপুরুষদেরকেও এর পূজারী মনে করে নিজেরাও এর পূজায় লিপ্ত হয়ে পড়লো। ঐ বুযুর্গ ব্যক্তির নাম ছিল ওয়াদ এবং ওটাই ছিল প্রথম প্রতিমূর্তি আল্লাহ ছাড়া যার পূজা করা হয়েছিল।
তারা অনেককে বিভ্রান্ত করেছে। ঐ সময় হতে নিয়ে আজ পর্যন্ত আরব ও অনারবে আল্লাহকে ছাড়া অন্যদের পূজা হতে থাকে এবং মানুষ পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ে। হযরত (ইবরাহীম) খলীল (আঃ) স্বীয় প্রার্থনায় বলেছিলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমাকে এবং আমার সন্তানদেরকে মূর্তিপূজা হতে রক্ষা করুন! হে আমার প্রতিপালক! তারা অধিকাংশ লোককে পথভ্রষ্ট করেছে।”
এরপর হযরত নূহ (আঃ) স্বীয় কওমের উপর বদ দু'আ করেন। কেননা তাদের ঔদ্ধত্য, হঠকারিতা এবং শত্রুতা চরমে পৌঁছেছিল। তিনি বদ দু'আয় বলেনঃ হে আমার প্রতিপালক! আপনি যালিমদের বিভ্রান্তি ব্যতীত আর কিছুই বৃদ্ধি করবেন না। যেমন হযরত মূসা (আঃ) ফিরাউন ও তার লোকদের উপর বদ দু'আ করে বলেছিলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “হে আমাদের প্রতিপালক! তাদের মাল-ধনকে আপনি ধ্বংস করে দিন ও তাদের অন্তরকে কঠোর করে দিন, সুতরাং তারা যেন যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রত্যক্ষ করা পর্যন্ত ঈমান আনয়ন না করে।”(১০:৮৮)
অতঃপর হযরত নূহ (আঃ)-এর প্রার্থনা কবূল হয়ে যায় এবং তাঁর কওমকে পানিতে নিমজ্জিত করা হয় এবং তাদেরকে দাখিল করা হয় অগ্নিতে, অতঃপর তারা কাউকেও আল্লাহর মুকাবিলায় সাহায্যকারী পায়নি। পরবর্তীতে আল্লাহ তা'আলা একথাই বলেনঃ
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।