আল কুরআন


সূরা আল-আন‘আম (আয়াত: 16)

সূরা আল-আন‘আম (আয়াত: 16)



হরকত ছাড়া:

من يصرف عنه يومئذ فقد رحمه وذلك الفوز المبين ﴿١٦﴾




হরকত সহ:

مَنْ یُّصْرَفْ عَنْهُ یَوْمَئِذٍ فَقَدْ رَحِمَهٗ ؕ وَ ذٰلِکَ الْفَوْزُ الْمُبِیْنُ ﴿۱۶﴾




উচ্চারণ: মাইঁ ইউসরাফ ‘আনহু ইয়াওমাইযিন ফাকাদ রাহিমাহূ ওয়া যা-লিকাল ফাওযুল মুবীন।




আল বায়ান: সেদিন যার থেকে আযাব সরিয়ে নেয়া হবে তাকেই তিনি অনুগ্রহ করবেন, আর এটাই প্রকাশ্য সফলতা।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৬. সেদিন যার থেকে তা সরিয়ে নেয়া হবে, তার প্রতি তো তিনি দয়া করলেন(১) এবং এটাই স্পষ্ট সফলতা।(২)




তাইসীরুল ক্বুরআন: সে দিন যাকে (শাস্তি থেকে) রক্ষা করা হবে তাকে তো বড় অনুগ্রহ করা হবে। আর এটাই হবে সুস্পষ্ট সাফল্য।




আহসানুল বায়ান: (১৬) সে দিন যাকে শাস্তি হতে রক্ষা করা হবে তার প্রতি তিনি তো দয়া করবেন এবং ঐটিই হল স্পষ্ট সফলতা।’ [1]



মুজিবুর রহমান: সেদিন যার উপর হতে শাস্তি প্রত্যাহার করা হবে তার প্রতি আল্লাহ বড়ই অনুগ্রহ করবেন, আর এটাই হচ্ছে প্রকাশ্য মহাসাফল্য।



ফযলুর রহমান: সেদিন যাকে শাস্তি থেকে দূরে রাখা হবে তাকে অবশ্যই তিনি অনুগ্রহ করলেন। আর সেটাই হবে স্পষ্ট (যথার্থ) সফলতা।



মুহিউদ্দিন খান: যার কাছ থেকে ঐদিন এ শাস্তি সরিয়ে নেওয়া হবে, তার প্রতি আল্লাহর অনুকম্পা হবে। এটাই বিরাট সাফল্য।



জহুরুল হক: যার কাছ থেকে সেদিন এটি অপসারিত করা হবে তাকে তবে নিশ্চয় তিনি করুণা করেছেন। আর এ এক সুস্পষ্ট সাফল্য!



Sahih International: He from whom it is averted that Day - [Allah] has granted him mercy. And that is the clear attainment.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১৬. সেদিন যার থেকে তা সরিয়ে নেয়া হবে, তার প্রতি তো তিনি দয়া করলেন(১) এবং এটাই স্পষ্ট সফলতা।(২)


তাফসীর:

(১) বলা হয়েছে, হাশর দিবসের শাস্তি অত্যন্ত লোমহর্ষক ও কঠোর হবে। কাতাদা বলেন, এখানে যা সরানোর কথা বলা হচ্ছে, তা হচ্ছে শাস্তি। কারো উপর থেকে এ শাস্তি সরে গেলে মনে করতে হবে যে, তার প্রতি আল্লাহর অশেষ করুণা হয়েছে। [তাফসীর আবদির রাযযাক]


(২) অর্থাৎ এটিই বৃহৎ ও প্রকাশ্য সফলতা। [কুরতুবী] এখানে সফলতার অর্থ জান্নাতে প্রবেশ। কারণ, শাস্তি থেকে মুক্তি ও জান্নাতে প্রবেশ ওতপ্রোতভাবে জড়িত।


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১৬) সে দিন যাকে শাস্তি হতে রক্ষা করা হবে তার প্রতি তিনি তো দয়া করবেন এবং ঐটিই হল স্পষ্ট সফলতা।’ [1]


তাফসীর:

[1] যেমন অন্যত্র বলেছেন, {فَمَنْ زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَأُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ} ‘‘সুতরাং যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সে সফল হবে।’’ (সূরা আল-ইমরান ১৮৫) কারণ, সফলতা হলো অকল্যাণ থেকে বেঁচে যাওয়া এবং কল্যাণ অর্জন করার নাম। আর জান্নাত অপেক্ষা কল্যাণকর জিনিস আর কি হতে পারে?


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১২-১৬ নং আয়াতের তাফসীর:



كَتَبَ عَلٰي نَفْسِهِ



অর্থাৎ নিজের ওপর আবশ্যক করে নিয়েছেন।



অত্র আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রুববিয়্যাহ সম্পর্কে অবগত করছেন যে, তিনি আকাশ- জমিন ও এতদুভয়ের মাঝে যা আছে সবকিছুর স্রষ্টা। তিনি সকল সৃষ্টি জীবকে আহার দেন, তাঁর আহারের প্রয়োজন হয় না।



সৃষ্টি জীবের প্রতি দয়া করা আল্লাহ তা‘আলা নিজের প্রতি আবশ্যক করে নিয়েছেন।



রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:



إنَّ اللَّهَ لَمَّا قَضَي الْخَلْقَ كَتَبَ عِنْدَهُ فَوْقَ عَرْشِهِ إِنَّ رَحْمَتِي سَبَقَتْ غَضَبِي



নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা যখন সৃষ্টি জীব সৃষ্টি করলেন তখন তাঁর আরশের ওপর নিজের কাছে লিখে রাখলেন যে, আমার রহমত আমার ক্রোধের ওপর জয় লাভ করেছে। (সহীহ বুখারী হা: ৭৪০৪)



এ দয়া ও রহমত কিয়ামতের দিন শুধু ঈমানদারদের জন্য হবে। আর কাফিরদের প্রতি থাকবে চরম ক্রোধ।



(لَيَجْمَعَنَّكُمْ إِلٰي يَوْمِ الْقِيٰمَةِ..)



‘কিয়ামতের দিন তিনি তোমাদেরকে অবশ্যই একত্র করবেন’অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা আদি-অন্ত সকলকে কিয়ামতের দিন হাশরের মাঠে উপস্থিত করবেন। সেদিন তারাই ক্ষতিগ্রস্ত যারা কিয়ামত দিবসে বিশ্বাসী ছিল না।



রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:



لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ إِلَّا نَفْسٌ مُّسْلِمَةٌ



মুসলিম আত্মা ছাড়া কেউ জান্নাতে যেতে পারবে না। (সহীহ বুখারী হা: ২৮৯৭)



(وَهُوَ يُطْعِمُ وَلَا يُطْعَمُ)



‘তিনিই খাদ্য দান করেন কিন্তু তাঁকে কেউ খাদ্য দান করে না’অর্থাৎ যিনি আকাশ মণ্ডলী ও জমিনের সৃষ্টিকর্তা তাঁকে ব্যতীত অন্য কাকে আমি অভিভাবকরূপে গ্রহণ করব? তিনি জীবিকা দেন, তাঁকে জীবিকা বা খাবার দেয়ার প্রয়োজন হয় না।



অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُوْنِ مَآ أُرِيْدُ مِنْهُمْ مِّنْ رِّزْقٍ وَّمَآ أُرِيْدُ أَنْ يُّطْعِمُوْنِ)



“আমি সৃষ্টি করেছি জিন ও মানুষকে এজন্য যে, তারা একমাত্র আমারই ইবাদত করবে। আমি তাদের নিকট হতে কোন রিযিক চাই না এবং এও চাই না যে তারা আমাকে খাওয়াবে।”(সূরা যারিয়াত ৫১:৫৬-৫৭)



সুতরাং আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে খাদ্য, সুস্বাস্থ্যসহ কত নেয়ামত দান করেছেন, উদ্দেশ্য একটাই আমরা যেন একমাত্র তাঁরই ইবাদত করি, তাঁর সাথে কাউকে শরীক না করি।



আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. তাওহীদে রুবুবিয়্যাহ তথা আল্লাহ তা‘আলা সবকিছুর মালিক, সৃষ্টিকর্তা, রিযিকদাতা ও পরিচালক।

২. মু’মিনদের অভিভাবক হিসেবে আল্লাহ তা‘আলাকেই গ্রহণ করা উচিত।

৩. রহমত, ক্রোধ, শ্রবণ ও জ্ঞান-ইত্যাদি আল্লাহ তা‘আলার সিফাত বা গুণাবলী প্রমাণিত হল।

৪. সবকিছু আল্লাহ তা‘আলার মুখাপেক্ষী কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা কারো কিছুর প্রতি মুখাপেক্ষী নন।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১২-১৬ নং আয়াতের তাফসীর:

জানিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, আল্লাহ পাক আকাশ ও পৃথিবীর মালিক এবং তিনি নিজের উপর দয়া ও অনুগ্রহকে ওয়াজিব করে নিয়েছেন । সহীহ্ বুখারী ও সহীহ্ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা মাখলুককে সৃষ্টি করার পর লাওহে মাহফুযে লিখে। দেন- আমার রহমত আমার গযবের উপর জয়যুক্ত থাকবে।”

ইরশাদ হচ্ছে-অবশ্যই তিনি কিয়ামতের দিন তোমাদের সকলকে একত্রিত করবেন। এখানে (আরবী) টি কসমের জন্যে ব্যবহৃত হয়েছে। আল্লাহ পাক যেন কসম খেয়ে বলছেন যে, তিনি নির্ধারিত দিনে তার সকল বান্দাকে একত্রিত করবেন। মুমিনদেরতো এ ব্যাপারে কোনই সন্দেহ নেই । কিন্তু কাফিরদের এতে সন্দেহ রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, সেখানে কি প্রস্রবণও রয়েছে? তিনি উত্তরে বলেছিলেনঃ “আল্লাহর কসম! তথায় প্রস্রবণ রয়েছে। নিশ্চয়ই আল্লাহর সৎ বান্দারা নবীদের হাওযে অবতরণ করবে। আল্লাহ তাআলা সত্তর হাজার ফেরেশতা পাঠাবেন যাদের হাতে আগুনের ডাণ্ডা থাকবে এবং নবীদের হাওযের উপর অবতরণকারী কাফিরদেরকে সেখান থেকে ডাক দিতে থাকবে।” এই হাদীসটি গারীব। জামিউত্ তিরমিযীতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক নবীর একটি করে হাওয থাকবে এবং আমি আশা করি যে, আমার হাওযে জনগণের ভীড় বেশী হবে।”

বলা হচ্ছে-যারা নিজেরাই নিজেদেরকে ক্ষতি ও ধ্বংসের মুখে ফেলেছে, তারাই ঈমান আনে না এবং পরকাল সম্পর্কে ভয় রাখে না।

এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ রাত্রিকালে এবং দিবাভাগে যা কিছু বসবাস করে সব কিছুই আল্লাহর ব্যবস্থাপনায় রয়েছে, তিনি বান্দাদের সমস্ত কথাই শুনেন এবং তাদের সম্পর্কে সব কিছুই অবগত আছেন। তিনি তাদের অন্তরের কথা সম্পর্কেও পূর্ণ ওয়াকেফহাল।

অতঃপর তার যে রাসূল (সঃ)-কে মহান একত্ববাদ এবং সুদৃঢ় শরীয়ত প্রদান করা হয়েছে তাঁকে তিনি সম্বোধন করে বলেনঃ “তুমি লোকদেরকে সিরাতে মুসতাকীমের দিকে আহ্বান কর এবং তাদেরকে বলে দাও আমি কি আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে নিজের পৃষ্ঠপোষক ও বন্ধু রূপে গ্রহণ করবো?” যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেছেনঃ

“(হে নবী সঃ!) তুমি বল, হে মূখ লোকেরা! তোমরা কি আমাকে নির্দেশ দিচ্ছ যে, আমি আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কারও ইবাদত করবো?” ভাবার্থ এই যে, আল্লাহ হচ্ছেন আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা। বিনা নমুনায় তিনি নভোমণ্ডল ও ভূ-মণ্ডলকে সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং আমি এইরূপ মাবুদকে বাদ দিয়ে অন্য কারও কিরূপে ইবাদত করতে পারি? তিনি সকলকে খাওয়াইয়ে থাকেন, তাঁকে খাওয়ানো হয় না, তিনি বান্দার মুখাপেক্ষী নন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “আমি দানব ও মানবকে শুধুমাত্র আমার ইবাদতের জন্যে সৃষ্টি করেছি।” কেউ কেউ লা-য়ুআমু শব্দটিকে লা-য়্যাআমু পড়েছেন, অর্থাৎ তিনি নিজে কিছুই খান না। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “আহলে কুবার একজন আনসারী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে দাওয়াত করেন। তাঁর সাথে আমরাও গমন করি। খাওয়া শেষে তিনি বলেন- সেই আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি যিনি খাওয়ান অথচ নিজে খান না, তিনি আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করতঃ আমাদেরকে খাওয়ান, পান করান এবং আমাদের উলঙ্গ দেহে কাপড় পরান। সুতরাং আমরা সেই আল্লাহকে ছাড়তে পারি না, তাঁর প্রতি অকৃতজ্ঞ হতে পারি না এবং আমরা তার থেকে অমুখাপেক্ষীও থাকতে পারি না। তিনি আমাদেরকে পথভ্রষ্টতা থেকে বাঁচিয়েছেন, আমাদের অন্তরের কালিমা দূর করেছেন এবং সমস্ত মাখলুকের উপর আমাদের মর্যাদা দান করেছেন।

ইরশাদ হচ্ছে- হে নবী (সঃ)! তুমি বল, আমাকে এই নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যে, আমি যেন সর্ব প্রথম মুসলমান হই এবং শির্ক না করি। আমি যদি আল্লাহর না-ফরমানী করি তবে ভীষণ দিনের কঠিন শাস্তির আমার ভয় রয়েছে। কিয়ামতের দিন যার উপর থেকে আল্লাহর শাস্তি সরিয়ে দেয়া হবে, তার প্রতি ওটা তাঁর অনুগ্রহই বটে, আর ওটাই হচ্ছে বিরাট সফলতা। যেমন এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ “যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে সেই ব্যক্তি হবে পূর্ণ সফলকাম।” আর সফলতা হচ্ছে উপকার লাভ করা এবং ক্ষতি হতে বেঁচে থাকা।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।