সূরা আত-ত্বলাক্ব (আয়াত: 7)
হরকত ছাড়া:
لينفق ذو سعة من سعته ومن قدر عليه رزقه فلينفق مما آتاه الله لا يكلف الله نفسا إلا ما آتاها سيجعل الله بعد عسر يسرا ﴿٧﴾
হরকত সহ:
لِیُنْفِقْ ذُوْ سَعَۃٍ مِّنْ سَعَتِهٖ ؕ وَ مَنْ قُدِرَ عَلَیْهِ رِزْقُهٗ فَلْیُنْفِقْ مِمَّاۤ اٰتٰىهُ اللّٰهُ ؕ لَا یُکَلِّفُ اللّٰهُ نَفْسًا اِلَّا مَاۤ اٰتٰىهَا ؕ سَیَجْعَلُ اللّٰهُ بَعْدَ عُسْرٍ یُّسْرًا ﴿۷﴾
উচ্চারণ: লিইয়ুনফিকযূছা‘আতিম মিন ছা‘আতিহী ওয়া মান কুদিরা ‘আলাইহি রিযকুহূ ফালইউনফিকমিম্মাআ-তা-হুল্লা-হু লা-ইউকালিলফুল্লা-হু নাফছান ইল্লা-মাআ-তাহা- ছাইয়াজ‘আলুল্লা-হু বা‘দা ‘উছরিইঁ ইউছরা-।
আল বায়ান: সামর্থ্যবান যেন নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করে আর যার রিয্ক সংকীর্ণ করা হয়েছে সে যেন আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন তা হতে ব্যয় করে। আল্লাহ কারো ওপর বোঝা চাপাতে চান না তিনি তাকে যা দিয়েছেন তার চাইতে বেশী। আল্লাহ কঠিন অবস্থার পর সহজতা দান করবেন।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৭. বিত্তবান নিজ সামৰ্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করবে এবং যার জীবনোপকরণ সীমিত সে আল্লাহ যা দান করেছেন তা থেকে ব্যয় করবে। আল্লাহ যাকে যে সামর্থ্য দিয়েছেন তার চেয়ে গুরুতর বোঝা তিনি তার উপর চাপান না। অবশ্যই আল্লাহ কষ্টের পর দেবেন স্বস্তি।
তাইসীরুল ক্বুরআন: সচ্ছল ব্যক্তি তার সচ্ছলতা অনুসারে ব্যয় করবে। আর যার রিযক সীমিত করা হয়েছে, সে ব্যয় করবে আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন তাত্থেকে। আল্লাহ যাকে যতটা দিয়েছেন তার অতিরিক্ত বোঝা তার উপর চাপান না। আল্লাহ কষ্টের পর আরাম দিবেন।
আহসানুল বায়ান: (৭) সামর্থ্যবান নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করবে[1] এবং যার জীবনোপকরণ সীমিত,[2] সে আল্লাহ তাকে যা দান করেছেন, তা হতে ব্যয় করবে। আল্লাহ যাকে যে সামর্থ্য দিয়েছেন, তার চেয়ে গুরুতর বোঝা তিনি তার উপর চাপান না।[3] আল্লাহ কষ্টের পর স্বস্তি দান করবেন। [4]
মুজিবুর রহমান: বিত্তবান নিজ সামর্থ অনুযায়ী ব্যয় করবে এবং যার জীবনোপকরণ সীমিত সে, আল্লাহ যা তাকে দান করেছেন তা হতে ব্যয় করবে। আল্লাহ যাকে যে সামর্থ্য দিয়েছেন তদপেক্ষা গুরুতর বোঝা তিনি তার উপর চাপিয়ে দেননা। আল্লাহ কষ্টের পর দিবেন স্বস্তি।
ফযলুর রহমান: বিত্তবান ব্যক্তি তার বিত্ত অনুযায়ী ব্যয় করবে এবং যার জীবিকা সীমিত (সংকুচিত) করা হয়েছে, সে ব্যয় করবে আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন তা থেকে। আল্লাহ যাকে যতটুকু দিয়েছেন তার চেয়ে বেশি তিনি কাউকে ব্যয় করতে বলেন না। কষ্টের পর আল্লাহ স্বাচ্ছন্দ্য দান করবেন।
মুহিউদ্দিন খান: বিত্তশালী ব্যক্তি তার বিত্ত অনুযায়ী ব্যয় করবে। যে ব্যক্তি সীমিত পরিমাণে রিযিকপ্রাপ্ত, সে আল্লাহ যা দিয়েছেন, তা থেকে ব্যয় করবে। আল্লাহ যাকে যা দিয়েছেন, তদপেক্ষা বেশী ব্যয় করার আদেশ কাউকে করেন না। আল্লাহ কষ্টের পর সুখ দেবেন।
জহুরুল হক: প্রাচুর্যের অধিকারী যেন তার প্রাচুর্য থেকে খরচ করে, আর যার উপরে তার জীবিকা সীমিত করা হয়েছে সে যেন খরচ করে আল্লাহ্ তাকে যা দিয়েছেন তা থেকে। আল্লাহ্ কোনো সত্ত্বাকে কষ্ট দেন না তিনি তাকে যা দিয়েছেন তার অতিরিক্ত। আল্লাহ্ অচিরেই কষ্টের পরে আরাম প্রদান করবেন।
Sahih International: Let a man of wealth spend from his wealth, and he whose provision is restricted - let him spend from what Allah has given him. Allah does not charge a soul except [according to] what He has given it. Allah will bring about, after hardship, ease.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৭. বিত্তবান নিজ সামৰ্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করবে এবং যার জীবনোপকরণ সীমিত সে আল্লাহ যা দান করেছেন তা থেকে ব্যয় করবে। আল্লাহ যাকে যে সামর্থ্য দিয়েছেন তার চেয়ে গুরুতর বোঝা তিনি তার উপর চাপান না। অবশ্যই আল্লাহ কষ্টের পর দেবেন স্বস্তি।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৭) সামর্থ্যবান নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করবে[1] এবং যার জীবনোপকরণ সীমিত,[2] সে আল্লাহ তাকে যা দান করেছেন, তা হতে ব্যয় করবে। আল্লাহ যাকে যে সামর্থ্য দিয়েছেন, তার চেয়ে গুরুতর বোঝা তিনি তার উপর চাপান না।[3] আল্লাহ কষ্টের পর স্বস্তি দান করবেন। [4]
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, দুগ্ধদাত্রী মহিলাদেরকে পারিশ্রমিক নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী দিতে হবে। আল্লাহ যদি মাল-ধনে প্রাচুর্য দিয়ে থাকেন, তবে এই প্রাচুর্য অনুযায়ী দুগ্ধদাত্রীকে প্রচুর পারিতোষিক দেওয়া কর্তব্য।
[2] অর্থাৎ, আর্থিক দিক দিয়ে যে দুর্বল।
[3] এই জন্য তিনি দরিদ্র ও দুর্বলকে এই নির্দেশ দেন না যে, তারা দুধ দানকারিণীকে বেশী বেশী পারিশ্রমিক দিক। এই নির্দেশাবলীর উদ্দেশ্য হল, শিশুর পিতা-মাতার উচিত এমন পন্থা অবলম্বন করা, যা উভয়ের জন্য সামঞ্জস্যপূর্ণ। আর তারা যেন একে অপরকে কোন প্রকার কষ্ট দেওয়ার চেষ্টা না করে এবং তার ফলে শিশুর দুধ পানের ব্যাপারটা যেন জটিল হয়ে না দাঁড়ায়। এই জন্য মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেছেন, لا تُضَارَّ وَالِدَةٌ بِوَلَدِهَا وَلا مَوْلُودٌ لَهُ بِوَلَدِهِ ‘‘মাকে তার সন্তানের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না এবং তাকেও না যার সন্তান।’’ (সূরা বাক্বারাহ ২৩৩ আয়াত)
[4] সুতরাং যারা আল্লাহর উপর আস্থা ও ভরসা রাখে, মহান আল্লাহ তাদেরকে স্বস্তি ও প্রশস্ততা দানে ধন্য করেন।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৬-৭ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
এখানে আল্লাহ তা‘আলা রজয়ী ত্বালাকপ্রাপ্তা নারীর জন্য স্বামীর অবস্থানের জায়গাতেই অর্থাৎ স্বামী যেমন পরিবেশে থাকবে ত্বালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর জন্য একই ধরনের বাসস্থানের ব্যবস্থা করার নির্দেশ প্রদান করেছেন। কারণ রজয়ী ত্বালাক প্রাপ্তা নারীর বাসস্থান ও ভরণ-পোষণের দায়িত্ব স্বামীর। যথাসম্ভব স্বামী তার নিজ কক্ষে রাখবে। কারণ এতে স্বামীর স্ত্রীর প্রতি দয়া ও ভালবাসা জাগবে। ফলে ফিরিয়ে নেবে বিশেষ করে যদি সন্তান থাকে তাহলে ফিরিয়ে নেওয়ার বেশি সম্ভাবনা থাকে। আমাদের সমাজে ত্বালাক দেওয়ার সাথে সাথে স্ত্রীকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। ফলে তারা আল্লাহ তা‘আলার এ নির্দেশের ফলাফল থেকে বঞ্চিত হয়।
তিন ত্বালাক প্রাপ্তা নারীর জন্য বাসস্থান ও খোরপোষ দিতে হবে কিনা এ নিয়ে তিনটি মত পাওয়া যায় : (১) ইবনু আব্বাস, জাবেরসহ প্রমুখ বলেন : তিন ত্বালাক প্রাপ্তা নারীর জন্য কোন প্রকার বাসস্থান ও খোরপোষ দিতে হবে না। এটাই ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল বলেছেন। এটাই সঠিক। কেননা ফাতেমা বিনতে কায়েস (রাঃ) বলেন : আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে প্রবেশ করলাম। সাথে আমার স্বামীর ভাই ছিল। আমি বললাম : আমার স্বামী আমাকে ত্বালাক দিয়েছে আর সে বলছে আমার নাকি কোন বাসস্থান ও খোরপোষ নেই? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন : বরং তোমার জন্য বাসস্থান ও খোরপোষ আছে। স্বামীর ভাই বলল : তার স্বামী তাকে তিন ত্বালাক দিয়ে দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন : তোমার কোন বাসস্থান ও খোরপোষ নেই। (সিলসিলা সহীহাহ হা. ১৭১১)
(২) ইমাম আবূ হানিফা (রহঃ) বলেন : তিন ত্বালাক প্রাপ্তা নারীর জন্য বাসস্থান ও খোরপোষ আছে।
(৩) ইমাম মালেক (রহঃ) ও শাফিঈ (রহঃ) বলেন : তার জন্য বাসস্থান আছে কিন্তু কোন খোরপোষ নেই।
(وَلَا تُضَآرُّوْهُنَّ لِتُضَيِّقُوْا)
‘তাদেরকে কষ্ট দিও না সংকটে ফেলার জন্য’ অর্থাৎ খোরপোশ অথবা বাসস্থানের ব্যাপারে তাদের ওপর সংকীর্ণতা সৃষ্টি করা এবং তাদের মানহানি করা, যাতে তারা ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়। ইদ্দত শেষ হয়ে যাওয়ার কাছাকাছি পর্যায়ে তোমরা আবার রুজু করে নাও এবং বারংবার এ রকম কর। যেমন, জাহিলিয়াতের যুগে ছিল। সুতরাং সে পথ বন্ধ করার জন্য শরীয়ত ত্বালাক দেওয়ার পর ফিরিয়ে নেওয়ার সময় নির্দিষ্ট করে দিল। যাতে আগামীতে কেউ এভাবে মহিলার ওপর সংকীর্ণতা সৃষ্টি না করে। এখন একজন কেবল দুবার এ রকম করতে পারে। অর্থাৎ ত্বালাক দিয়ে ইদ্দত শেষ হওয়ার পূর্বেই ফিরিয়ে নিতে পারে। কিন্তু তৃতীয়বার আবার ত্বালাক দিলে তার ফিরিয়ে নেওয়ার মোটেই অধিকার থাকবে না।
(وَإِنْ كُنَّ أُولَاتِ حَمْلٍ)
‘তারা গর্ভবতী থাকলে...’ অধিকাংশ আলেম বলেছেন : এ বিধান বায়েনাহ ত্বালাক প্রাপ্তা নারীর ক্ষেত্রে। অর্থাৎ বায়েনাহ ত্বালাক প্রাপ্তা নারী সে গর্ভবতী হোক আর না হোক তার ভরণ পোষণ ওয়াজিব। অন্যরা বলেছেন : না, এটা রজয়ী ত্বালাক প্রাপ্তা গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে, কেননা পূর্বাপর রজয়ী ত্বালাক প্রাপ্তা নারীর ব্যাপারে আলোচনা করা হয়েছে। এখানে বিশেষ ভাবে গর্ভবতী নারীর কথা উল্লেখ করার কারণ হল, যেহেতু অধিকাংশ সময় গর্ভধারণের সময় দীর্ঘ হয়। এ মতই সঠিক। (তাফসীর সা‘দী)।
(فَاٰتُوْهُنَّ أُجُوْرَهُنَّ)
অর্থাৎ ত্বালাক দেওয়ার পর তারা যদি তোমাদের শিশুদের দুধ পান করায় তাহলে তার পারিশ্রমিক তোমাদেরকেই দিতে হবে। (তখন সম্পর্ক নেই বলে কোন অর্থ ব্যয় করব না বলা চলবে না।)
(وَأْتَمِرُوْا بَيْنَكُمْ بِمَعْرُوْفٍ)
‘তোমরা সঙ্গতভাবে নিজেদের মধ্যে পরামর্শ কর’ অর্থাৎ আপোষে পরামর্শ করে পারিশ্রমিক ও অন্যান্য সমস্ত বিষয় ঠিক করে নেবে, কেউ কারো ক্ষতি করবে না। যেমন সূরা বাকারাতে বলা হয়েছে :
(لَا تُضَآرَّ وَالِدَةٌۭبِوَلَدِهَا وَلَا مَوْلُوْدٌ لَّه۫بِوَلَدِه۪)
“কোন মাকে তার সন্তানের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না। আবার কোন পিতাকেও তার সন্তানের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না।” (সূরা বাকারা ২ : ২৩৩)
(وَإِنْ تَعَاسَرْتُمْ) অর্থাৎ পারিশ্রমিক ও অন্যান্য ব্যাপারে যদি তাদের মতের মিল না হয় তবে অন্য কোন মহিলার সাথে চুক্তি করে নেবে, সে যেন তার শিশুকে দুধ পান করায়।
(لِيُنْفِقْ ذُوْ سَعَةٍ مِّنْ سَعَتِه)
অর্থাৎ দুগ্ধদাত্রী মহিলাদেরকে পারিশ্রমিক নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী দিতে হবে। যদি ধন-সম্পদশালী হয় তাহলে সে অনুযায়ী দুগ্ধদাত্রীকে সম্মানজনক পারিশ্রমিক দিবে আর আর্থিক অসচ্ছল হলে অবস্থা অনুযায়ী ব্যয় করবে। আল্লাহ তা‘আলা কারো ওপর তার সামর্থ্যাতীত কিছু চাপিয়ে দেন না।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. ত্বালাকে বায়েনাহ প্রাপ্তা নারী গর্ভবতী হলে তার ভরণ-পোষণ দেওয়া ওয়াজিব।
২. ত্বালাক প্রাপ্তা নারীর ক্ষতি সাধনের জন্য সংকীর্ণতা সৃষ্টি করা হারাম।
৩. স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সম্পর্ক সম্পূর্ণ ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর স্ত্রী স্বামীর সন্তানকে দুধ পান করালে তার পারিশ্রমিক স্বামীকে দিতে হবে।
৪. ব্যয় বহণকারীর আর্থিক সামর্থ্যানুযায়ী ব্যয় বহন করবে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৬-৭ নং আয়াতের তাফসীর
আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদেরকে হুকুম করছেন যে, যখন তাদের মধ্যে কেউ তার স্ত্রীকে তালাক দিবে তখন যেন তার ইদ্দতকাল পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তাকে তার বসবাসের জায়গা দেয়। এ জায়গা তার শক্তি ও সামর্থ্য অনুযায়ী হবে। এমনকি হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, যদি সে খুবই সংকীর্ণ অবস্থার লোক হয় তবে যেন তার ঘরের এক কোণাতেই তাকে স্থান দেয়।
মহান আল্লাহ বলেনঃ তোমরা তাদেরকে সংকটে ফেলার উদ্দেশ্যে উত্যক্ত করো না। তাদেরকে কষ্ট দিয়ে এমন সংকটময় অবস্থায় ফেলে দিয়ো না যে, তারা সহ্য করতে না পেরে বাড়ী ছেড়ে চলে যায়। অথবা তোমাদের হাত হতে রক্ষা পাওয়ার জন্যে তারা তাদের প্রাপ্য মোহর ছেড়ে দেয়। কিংবা তোমরা তাদেরকে এমনভাবে তালাক দিবে না যে, ইদ্দত পূর্ণ হওয়ার দুই একদিন পূর্বে রাজআত করার ঘোষণা দিবে, এরপর আবার তালাক দিবে এবং ইদ্দত পূর্ণ হওয়ার নিকটবর্তী সময়ে রাজমাত করে নিবে।
এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ তালাকপ্রাপ্তা নারী যদি গর্ভবতী হয় তবে তার খাওয়া-খরচের দায়িত্ব তার স্বামীর। অধিকাংশ আলেমের মতে এই হুকুম ঐ মহিলাদের জন্যে খাস করে বর্ণনা করা হচ্ছে যাদেরকে শেষের তালাক দিয়ে দেয়া হয়েছে। যাদেরকে রাজআত করার অধিকার স্বামীর নেই। কেননা, যাকে রাজআত করার অধিকার স্বামীর উপর রয়েছে তার খরচাদি বহন করার দায়িত্ব তো স্বামীর উপর রয়েছেই। সে গর্ভবতী হোক আর না-ই হোক। অন্যান্য আলেমগণ বলেন যে, এটা ঐ নারীদেরও হুকুমের বর্ণনা যাদেরকে রাজআত করার অধিকার স্বামীদের রয়েছে। কেননা, উপরেও এদের বর্ণনা ছিল। এটাকে পৃথকভাবে বর্ণনা করার কারণ এই যে, সাধারণতঃ গর্ভবতীর ইদ্দত কাল দীর্ঘ হয়ে থাকে। সুতরাং কেউ যেন এটা ধারণা না করে যে, ইদ্দতের সময়কাল পর্যন্ত তো তার স্ত্রীর খরচ বহনের দায়িত্ব তার উপর ন্যস্ত, তার পরে নয়। এজন্যেই পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করে দেয়া হয়েছে যে, রাজয়ী তালাক দেয়ার সময় যদি স্ত্রী গর্ভবতী হয় তবে সন্তান ভূমিষ্ট না হওয়া পর্যন্ত তার খরচ বহনের দায়িত্ব স্বামীর উপর অর্পিত। এ ব্যাপারেও আলেমদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে যে, এই খরচ তার জন্যে গর্ভের মাধ্যমে, না গর্ভের জন্যে? ইমাম শাফিয়ী (রঃ) প্রমুখ হতে দু’টি উক্তিই বর্ণিত আছে এবং এর ভিত্তিতে বহু মাসআলাতেও মতানৈক্য প্রকাশ পেয়েছে।
এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যখন এই তালাকপ্রাপ্ত নারীরা গর্ভ হতে ফারেগ হবে তখন যদি তারা তোমাদের সন্তানদেরকে দুধ পান করায় তবে তাদেরকে দুধ পান করাতে দিতে হবে। তবে সন্তানদেরকে দুধ পান করানো বা না করানোর এখতেয়ার তাদের রয়েছে। কিন্তু প্রথম বারের দুধ পান অবশ্য তাদেরকে করাতেই হবে। পরে না পান করাতেও পারে। কেননা, শিশুর জীবন সাধারণতঃ এই দুধের সাথেই জড়িত। অতঃপর সে যদি এর পরেও দুধ পান করাতে থাকে তবে পিতা-মাতার মধ্যে যে পারিশ্রমিক দানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে তা অবশ্যই আদায় করতে হবে। তোমরা পরস্পর যে কাজ করে থাকো তা কল্যাণের সাথে ও নিয়ম মাফিক হওয়া উচিত। এটা নয় যে, ক্ষতি করার চেষ্টা করবে এবং তাকে কষ্ট দেয়ার চেষ্টা করবে। যেমন সূরায়ে বাকারায় রয়েছেঃ (আরবি)
অর্থাৎ “মাতাকে তার ছেলের ব্যাপারে কষ্ট দেয়া হবে না এবং পিতাকে তার ছেলের ব্যাপারে কষ্ট দেয়া হবে না।” (২:২৩৩)
মহান আল্লাহ বলেনঃ যদি পরস্পরের মধ্যে মতভেদ হয়, যেমন শিশুর পিতা কম দিতে চায় এবং মাতা তা স্বীকার করতে চায় না, অথবা মাতা বেশী দাবী করে এবং পিতার নিকট তা ভারী বোধ হয়, তারা কোনক্রমেই একমত হতে পারে না, তবে স্বামীর অন্য কোন ধাত্রী রাখার এখতেয়ার রয়েছে। হ্যাঁ, তবে ধাত্রীকে যে পারিশ্রমিক দেয়া হবে সেটা নিতেই যদি মা সম্মতি প্রকাশ করে তবে মায়েরই অগ্রাধিকার থাকবে।
এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ শিশুর পিতা অথবা অভিভাবক যে রয়েছে তার উচিত যে, সে যেন তার সামর্থ্য অনুযায়ী শিশুর উপর খরচ করে। বিত্তবান নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী খরচ করবে এবং যার জীবনোপকরণ সীমিত সে আল্লাহ যা দান করেছেন তা হতে ব্যয় করবে। আল্লাহ যাকে যে সামর্থ্য দিয়েছেন তদপেক্ষা গুরুতর বোঝা তিনি তার উপর চাপান না।
তাফসীরে ইবনে জারীরে রয়েছে যে, হযরত উমার (রাঃ) হযরত আবূ উবাইদাহ (রাঃ)-এর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে জানতে পারেন যে, তিনি মোটা কাপড় পরিধান করে থাকেন এবং হালকা খাবার খেয়ে থাকেন। অতঃপর তিনি তাঁর নিকট এক হাজার স্বর্ণ মুদ্রা পাঠিয়ে দেয়ার নির্দেশ দেন এবং প্রেরিত লোকটিকে বলে দেন যে, তিনি ঐ এক হাজার স্বর্ণ মুদ্রা পেয়ে কি করেন তা যেন সে দেখে আসে। যখন তিনি এই এক হাজার স্বর্ণ মুদ্রা প্রাপ্ত হন। তখন মিহিন কাপড় পরতে এবং খুব উত্তম খাদ্য খেতে শুরু করেন। প্রেরিত দূত ফিরে এসে হযরত উমার (রাঃ)-এর সামনে ঘটনাটি বর্ণনা করেন। ঘটনা শুনে হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহ হযরত আবূ উবাইদাহ (রাঃ)-এর উপর দয়া করুন! তিনি …… (আরবি) আয়াতের উপর আমল করেছেন।
হাফিয আবূল কাসিম তিবরানী (রঃ) একটি গারীব হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “একটি লোকের নিকট দশটি দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) ছিল। সে তা হতে একটি দীনার আল্লাহর পথে সাদকা করে। দ্বিতীয় এক ব্যক্তির নিকট দশ উকিয়া (এক ঊকিয়ায় চল্লিশ দিরহাম হয়) ছিল। তা হতে সে এক উকিয়া আল্লাহর পথে খরচ করে। তৃতীয় আর এক ব্যক্তির নিকট একশ’ উকিয়া ছিল। তা হতে সে আল্লাহর নামে দশ উকিয়া খরচ করে। এরা তিন জনই প্রতিদান পাওয়ার ব্যাপারে আল্লাহর নিকট সমান। কেননা, প্রত্যেকেই তার মালের এক দশমাংশ আল্লাহর পথে খরচ করেছে।
এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহ কষ্টের পর দিবেন স্বস্তি। যেমন অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “অবশ্য কষ্টের পরেই স্বস্তি আছে।” (৯৪:৬)
মুসনাদে আহমাদের হাদীসটি এখানে উল্লেখযোগ্য। তাতে রয়েছে যে, হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “পূর্ব যুগে এক স্বামী ও এক স্ত্রী বাস করতো। তারা অত্যন্ত দারিদ্রের মধ্যে কালাতিপাত করতো। তাদের কাছে জীবন ধারণের কিছুই ছিল না। একদা স্বামী সফর হতে ফিরে আসে। সে ক্ষুধার জ্বালায় অত্যন্ত অস্থির হয়ে পড়েছিল। স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলোঃ “কোন খাবার আছে কি?` স্ত্রী বললেনঃ “আপনি খুশী হন, আল্লাহ প্রদত্ত খাদ্য আমাদের নিকট এসে পৌঁছেছে।” স্বামী বললোঃ “তাহলে নিয়ে এসো। যা আছে তাই এনে দাও। আমি অত্যন্ত ক্ষুধার্ত।” স্ত্রী বললোঃ “আরো একটু ধৈর্য ধারণ করুন! আমাদের আল্লাহর রহমতের বহু কিছু আশা রয়েছে। যখন আরো কিছু বিলম্ব হয়ে গেল তখন স্বামী আবার বললোঃ “তোমার কাছে যা কিছু আছে তা নিয়ে আস না কেন? আমি যে ক্ষুধার জ্বালায় অত্যন্ত কষ্ট পাচ্ছি। স্ত্রী বললোঃ “এতো তাড়াতাড়ি করছেন কেন? এখনই আমি চুল্লী হতে হাঁড়ি নামিয়ে আনছি।” কিছুক্ষণ পর স্ত্রী যখন দেখলো যে, স্বামী আবার তাগাদা করতে উদ্যত হচ্ছে তখন সে নিজে নিজে বলতে লাগলোঃ “উঠে তন্দুর হতে হাঁড়ি উঠিয়ে দেখি তো!” উঠে দেখে যে, আল্লাহর অসীম কুদরতে তার ভরসার বিনিময়ে হাঁড়ি বকরীর গোশতে পূর্ণ হয়ে আছে। এবং আরো দেখে যে, ঘরের যাঁতা ঘুরতে রয়েছে এবং আটা বের হতে আছে। সে হাঁড়ি হতে সমস্ত গোশত বের করে নিলো এবং যাতা হতে আটা উঠিয়ে নিলো এবং যাতা ঝেড়ে ফেললো। হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “যাঁর হাতে আবূল কাসেম (সঃ)-এর প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) বলেছেনঃ যদি সে যাঁতা না ঝাড়তো বরং শুধু আটা নিয়ে নিতো তবে কিয়ামত পর্যন্ত ঐ যাঁতা ঘুরতে থাকতো।”
অন্য একটি রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, একটি লোক বাড়ীতে প্রবেশ করে দেখে যে, ক্ষুধার জ্বালায় পরিবারস্থ লোকদের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে পড়েছে। এ দেখে সে জঙ্গলের দিকে চলে যায়। তার স্ত্রী যখন দেখলো যে, তার স্বামী অত্যন্ত বিচলিত অবস্থায় রয়েছে এবং তাদের করুণ দৃশ্য দেখতে না পেরে বাড়ী হতে চলে গেছে, তখন সে তার যাতা ঠিকঠাক করলো এবং চুল্লীতে আগুন ধরিয়ে দিলো। অতঃপর আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করলোঃ “হে আল্লাহ! আমাদেরকে আপনি রিয্ক দান করুন!” দু'আ শেষে উঠে দেখে যে, হাঁড়ি গোশতে পরিপূর্ণ রয়েছে এবং যাতা ঘুরতে রয়েছে ও আটা বের হতে আছে। ইতিমধ্যে স্বামী বাড়ীতে পৌঁছে গেল এবং স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলোঃ আমি বাড়ী হতে যাওয়ার পর কিছু পেয়েছো কি?” স্ত্রী উত্তরে বললোঃ “হ্যাঁ, মহান আল্লাহ আমাদেরকে বহু কিছু দান করেছেন। সে গিয়ে যাঁতার পাট উঠিয়ে নিলো। নবী (সঃ)-এর সামনে ঘটনাটি বর্ণিত হলে তিনি বলেনঃ “যদি সে যাতার পাট না উঠাতো তবে কিয়ামত পর্যন্ত ঐ যাতা ঘুরতে থাকতো।”
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।