সূরা আল-মুনাফিকূন (আয়াত: 9)
হরকত ছাড়া:
ياأيها الذين آمنوا لا تلهكم أموالكم ولا أولادكم عن ذكر الله ومن يفعل ذلك فأولئك هم الخاسرون ﴿٩﴾
হরকত সহ:
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا لَا تُلْهِکُمْ اَمْوَالُکُمْ وَ لَاۤ اَوْلَادُکُمْ عَنْ ذِکْرِ اللّٰهِ ۚ وَ مَنْ یَّفْعَلْ ذٰلِکَ فَاُولٰٓئِکَ هُمُ الْخٰسِرُوْنَ ﴿۹﴾
উচ্চারণ: ইয়া আইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানূলা-তুলহিকুম আমওয়া-লুকুম ওয়ালাআওলা-দুকুম ‘আন যিকরিল্লা-হি ওয়া মাইঁ ইয়াফ‘আল যা-লিকা ফাউলাইকা হুমুল খা-ছিরূন।
আল বায়ান: হে মুমিনগণ, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান- সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন না করে। আর যারা এরূপ করে তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৯. হে মুমিনগণ! তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণে উদাসীন না করে। আর যারা এরূপ উদাসীন হবে তারাই তো ক্ষতিগ্ৰস্ত।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: হে মু’মিনগণ! তোমাদের ধন-সম্পদ আর তোমাদের সন্তানাদি তোমাদেরকে যেন আল্লাহর স্মরণ হতে গাফিল করে না দেয়। যারা এমন করবে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।
আহসানুল বায়ান: (৯) হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের ধন-সম্পত্তি ও সন্তান- সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ হতে উদাসীন না করে,[1] যারা উদাসীন হবে, তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত।
মুজিবুর রহমান: হে মু’মিনগণ! তোমাদের ঐশ্বর্য ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণে উদাসীন না করে। যারা উদাসীন হবে তারাইতো ক্ষতিগ্রস্ত।
ফযলুর রহমান: হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে না রাখে। যারা তা করে (যাদের অবস্থা তেমন) তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।
মুহিউদ্দিন খান: মুমিনগণ! তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল না করে। যারা এ কারণে গাফেল হয়, তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত।
জহুরুল হক: ওহে যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের ধনসম্পত্তি ও তোমাদের সন্তানসন্ততি যেন তোমাদের আল্লাহ্র স্মরণ থেকে ফিরিয়ে না রাখে। আর যে তেমন করে -- তারাই তো তবে খোদ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
Sahih International: O you who have believed, let not your wealth and your children divert you from remembrance of Allah. And whoever does that - then those are the losers.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৯. হে মুমিনগণ! তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণে উদাসীন না করে। আর যারা এরূপ উদাসীন হবে তারাই তো ক্ষতিগ্ৰস্ত।(১)
তাফসীর:
(১) এখানে আল্লাহ্ তা'আলা খাঁটি মুমিনদেরকে সম্বোধন করে সতর্ক করছেন যে, তোমরা মুনাফিকদের ন্যায় দুনিয়ার মহব্বতে মগ্ন হয়ে যেয়ো না। যেসব বিষয় মানুষকে দুনিয়াতে আল্লাহ থেকে গাফেল করে, তন্মধ্যে দুটি সর্ববৃহৎ-ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি। তাই এই দুটির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। নতুবা দুনিয়ার যাবতীয় ভোগ-সম্ভারই উদ্দেশ্য। আয়াতের সারমর্ম এই যে, ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততির মহব্বত সর্বাবস্থায় নিন্দনীয় নয়। কিন্তু সর্বদা এই সীমানার প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে যে, এসব বস্তু যেন মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল না করে দেয়। এখানে ‘আল্লাহর স্মরণের’ অর্থ কোন কোন তফসীরবিদের মতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, কারও মতে হজ ও যাকাত এবং কারও মতে কুরআন। হাসান বসরী রাহেমাহুল্লাহ বলেনঃ স্মরণের অর্থ এখানে যাবতীয় আনুগত্য ও ইবাদত। [কুরতুবী, ফাতহুল কাদীর]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৯) হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের ধন-সম্পত্তি ও সন্তান- সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ হতে উদাসীন না করে,[1] যারা উদাসীন হবে, তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত।
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, মাল এবং সন্তান-সন্ততির ভালবাসা তোমাদের উপর এমনভাবে প্রভাব বিস্তার না করে ফেলে যে, তোমরা আল্লাহ কর্তৃক আরোপিত যাবতীয় বিধি-বিধান ও ফরয কার্যাবলী থেকে উদাসীন হয়ে যাও এবং তাঁরই নির্ধারিত হালাল ও হারামের সীমালংঘনের ব্যাপারেও একেবারে বেপরোয়া হয়ে যাও। মুনাফিকদের আলোচনার পরে পরেই এই সতর্কতার উদ্দেশ্য হল, এ কথা জানিয়ে দেওয়া যে, এটা হল মুনাফিকদের চরিত্র যা মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ঈমানদারদের চরিত্র এর বিপরীত। আর তা হল, তাঁরা সব সময় আল্লাহকে স্মরণে রাখেন। অর্থাৎ, তাঁর যাবতীয় বিধি-বিধান ও অত্যাবশ্যকীয় কার্যাবলীর প্রতি যত্ন নেন এবং হালাল ও হারামের মধ্যে পার্থক্য খেয়াল করেন।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৯-১১ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
অত্র আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদেরকে বেশি বেশি তাঁর যিকির করার নির্দেশ দিচ্ছেন এবং সম্পদ, সন্তান-সন্ততির ভালবাসায় যেন আল্লাহ তা‘আলাকে ভুলে না যায় সে সম্পর্কে সতর্ক করছেন আর মৃত্যুর পূর্বেই বেশি থেকে বেশি তাঁর আনুগত্যপূর্ণ কাজে ব্যয় করার প্রতি উৎসাহ প্রদান করছেন।
(وَأَنْفِقُوْا مِنْ مَّا رَزَقْنٰكُمْ)
‘আমি তোমাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি তোমরা তা হতে ব্যয় কর’ এখানে ব্যয় এর মাঝে সকল প্রকার ব্যয় শামিল। যাকাত, কাফফারা, স্ত্রীদের ভরণ-পোষণ ও নফল সদকাহ ইত্যাদি। (তাফসীর সা‘দী) এ আয়াত আরো প্রমাণ করছে, যাকাতসহ সকল প্রকার ইবাদতের সময় হয়ে গেলে যথাসময়ে আদায় করে নিতে হবে বিলম্ব করা বৈধ নয়।
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন : জনৈক সাহাবী বললেন- হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! কোন্ সদকায় সওয়াব বেশি পাওয়া যায়? তিনি বললেন : সুস্থ ও কৃপণ অবস্থায় তোমার সদকাহ করা যখন তুমি দরিদ্রতার আশংকা কর ও ধনী হওয়ার আশা রাখ। সদকাহ করতে এ পর্যন্ত দেরী করবে না যখন প্রাণ বায়ু কণ্ঠাগত হবে আর তুমি বলবে অমুকের জন্য এতটুকু অমুকের জন্য এতটুকু অথচ তা অমুকের জন্য হয়ে গেছে। (সহীহ বুখারী হা. ১৪১৯ মুসলিম হা. ১০৩২)
সুতরাং সময় থাকতে সম্পদের সৎব্যবহার করা উচিত। সারা জীবন আল্লাহ তা‘আলার পথে সম্পদ ব্যয় করলাম না কিন্তু মুমূর্ষু অবস্থায় সব দান করে দিলাম এমন দান কবূল হবে না এবং কোন কাজে আসবে না।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. ফরয, ওয়াজিব ইত্যাদি ইবাদত নষ্ট করে সন্তান ও সম্পদ নিয়ে ব্যস্ত থাকা হারাম।
২. সুস্থ ও কৃপণ অবস্থায় আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় ব্যয় করা উত্তম।
৩. মুমূর্ষু অবস্থায় ব্যয় করা অনর্থক।
৪. মৃত্যুর সময় হলে একটুও বিলম্ব করা হবে না।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৯-১১ নং আয়াতের তাফসীর
আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মুমিন বান্দাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন খুব বেশী বেশী করে আল্লাহর যিক্র করে এবং তাদেরকে সতর্ক করছেন যে, তারা যেন ধন-দৌলত ও সন্তান-সন্ততির প্রেমে পড়ে আল্লাহকে ভুলে না যায়। এরপর বলেনঃ যারা আল্লাহর স্মরণে উদাসীন হবে তারা হবে ক্ষতিগ্রস্ত।
অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তাঁর আনুগত্যের কাজে মাল খরচ করার নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন মৃত্যুর পূর্বেই তাদেরকে প্রদত্ত মাল হতে খরচ করে। মৃত্যুর সময়ের নিরুপায় অবস্থা দেখে মাল খরচ করতঃ শান্তি লাভের আশা করা বৃথা হবে। ঐ সময় তারা চাইবে যে, যদি অল্প সময়ের জন্যেও ছেড়ে দেয়া হতো তবে যা কিছু ভাল কাজ আছে সবই তারা করতো এবং মন খুলে আল্লাহর পথে দান-খয়রাত করতো। কিন্তু তখন সময় কোথায়? যে বিপদ আসার তা এসেই গেছে। এটা কখনো টলবার নয়। বিপদ মাথার উপর এসেই পড়েছে। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)
অর্থাৎ “যেদিন তাদের শাস্তি আসবে সেই দিন সম্পর্কে তুমি মানুষকে সতর্ক কর, তখন যালিমরা বলবেঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে কিছু কালের জন্যে অবকাশ দিন, আমরা আপনার আহ্বানে সাড়া দিবো এবং রাসূলদেরকে অনুসরণ করবো! তোমরা কি পূর্বে শপথ করে বলতে না যে, তোমাদের পতন নেই?` (১৪:৪৪) আল্লাহ তা'আলা আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “শেষ পর্যন্ত তাদের কারো যখন মৃত্যু এসে যাবে তখন বলবে- হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ফিরিয়ে দিন, যেন আমি ভাল কাজ করতে পারি যা আমি ছেড়ে দিয়েছিলাম, কখনো নয়।” (২৩:৯৯-১০০)
এখানে মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ নির্ধারিত সময়কাল যখন উপস্থিত হয়ে যাবে, আল্লাহ কখনো কাউকেও অবকাশ দিবেন না। তোমরা যা কর আল্লাহ সে সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত। এ লোকগুলোকে যদি ফিরিয়ে দেয়া হয় তবে এসব কথা তারা ভুলে যাবে এবং পূর্বে যে কাজ করতো পুনরায় ঐ কাজই করতে থাকবে।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “ঐ মালদার ব্যক্তি যে হজ্ব করেনি ও যাকাত দেয়নি সে মৃত্যুর সময় দুনিয়ায় ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা করবে।` একটি লোক তখন বললোঃ “জনাব! আল্লাহকে ভয় করুন। দুনিয়ায় ফিরে আসার আকাক্ষা তো করবে কাফির।” তখন তিনি বললেনঃ “তাড়াতাড়ি করছো কেন? আমি তোমাকে কুরআন থেকে এটা পাঠ করে শুনাচ্ছি।” অতঃপর তিনি (আরবি) হতে পূর্ণ রুকূটি পাঠ করে শুনালেন। লোকটি জিজ্ঞেস করলোঃ “কি পরিমাণ সম্পদে যাকাত ওয়াজিব হয়?” জবাবে তিনি বলেনঃ “দুই শত এবং এর চেয়ে বেশী হলে।” সে প্রশ্ন করলোঃ “হজ্ব কখন ফরয হয়?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “যখন পথ খরচ ও সওয়ারীর শক্তি থাকে। একটি মারফূ’ রিওয়াইয়াতেও অনুরূপ বর্ণিত আছে। কিন্তু এর মাওকুফটাই সঠিকতর। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত হযরত যহ্হাক (রঃ)-এর রিওয়াইয়াতে ইনকিতা' রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে হযরত আবূ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। যে, একদা সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে বেশী বয়সের আলোচনা করেন। তখন তিনি বলেনঃ “নির্ধারিত কাল যখন উপস্থিত হবে, আল্লাহ কখনো অবকাশ দিবেন না। বয়সের আধিক্য এই ভাবে হয় যে, আল্লাহ তা’আলা কোন বান্দাকে সুসন্তান দান করেন এবং ঐ সন্তানরা তাদের পিতার মৃত্যুর পর তার জন্যে দু'আ করতে থাকে। ঐ দু'আ তার কবরে পৌঁছে থাকে।”
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।