আল কুরআন


সূরা আল-মুনাফিকূন (আয়াত: 4)

সূরা আল-মুনাফিকূন (আয়াত: 4)



হরকত ছাড়া:

وإذا رأيتهم تعجبك أجسامهم وإن يقولوا تسمع لقولهم كأنهم خشب مسندة يحسبون كل صيحة عليهم هم العدو فاحذرهم قاتلهم الله أنى يؤفكون ﴿٤﴾




হরকত সহ:

وَ اِذَا رَاَیْتَهُمْ تُعْجِبُکَ اَجْسَامُهُمْ ؕ وَ اِنْ یَّقُوْلُوْا تَسْمَعْ لِقَوْلِهِمْ ؕ کَاَنَّهُمْ خُشُبٌ مُّسَنَّدَۃٌ ؕ یَحْسَبُوْنَ کُلَّ صَیْحَۃٍ عَلَیْهِمْ ؕ هُمُ الْعَدُوُّ فَاحْذَرْهُمْ ؕ قٰتَلَهُمُ اللّٰهُ ۫ اَنّٰی یُؤْفَکُوْنَ ﴿۴﴾




উচ্চারণ: ওয়া ইযা-রাআইতাহুম তু‘জিবুকা আজছা-মুহুম ওয়াইঁয় ইয়াকূলূতাছমা‘ লিকাওলিহিম কাআন্নাহুম খুশুবুমমুছান্নাদাতুইঁ ইয়াহছাবূনা কুল্লা সাইহাতিন ‘আলাইহিম হুমুল ‘আদুওউ ফাহ যারহুম কা-তালাহুমুল্লা-হু আন্না-ইউ’ফাকূন।




আল বায়ান: আর যখন তুমি তাদের প্রতি তাকিয়ে দেখবে তখন তাদের শরীর তোমাকে মুগ্ধ করবে। আর যদি তারা কথা বলে তুমি তাদের কথা (আগ্রহ নিয়ে) শুনবে। তারা দেয়ালে ঠেস দেয়া কাঠের মতই। তারা মনে করে প্রতিটি আওয়াজই তাদের বিরুদ্ধে। এরাই শত্রু, অতএব এদের সম্পর্কে সতর্ক হও। আল্লাহ এদেরকে ধ্বংস করুন। তারা কিভাবে সত্য থেকে ফিরে যাচ্ছে।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪. আর আপনি যখন তাদের দিকে তাকান তাদের দেহের আকৃতি আপনার কাছে প্ৰীতিকর মনে হবে এবং তারা যখন কথা বলে, আপনি আগ্রহের সাথে তাদের কথা শুনে থাকেন। তারা দেয়ালে ঠেকান কাঠের খুঁটির মতই, তারা যে কোন আওয়াজকেই তাদের বিরুদ্ধে মনে করে। তারাই শক্ৰ, অতএব তাদের সম্পর্কে সতর্ক হোন; আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন! তাদেরকে কোথায় ফিরানো হচ্ছে!




তাইসীরুল ক্বুরআন: তুমি যখন তাদের দিকে তাকাও তখন তাদের শারীরিক গঠন তোমাকে চমৎকৃত করে। আর যখন তারা কথা বলে তখন তুমি তাদের কথা আগ্রহ ভরে শুন, অথচ তারা দেয়ালে ঠেস দেয়া কাঠের মত (দেখন- সুরত, কিন্ত কার্যক্ষেত্রে কিছুই না)। কোন শোরগোল হলেই তারা সেটাকে নিজেদের বিরুদ্ধে মনে করে (কারণ তাদের অপরাধী মন সব সময়ে শঙ্কিত থাকে- এই বুঝি তাদের কুকীর্তি ফাঁস হয়ে গেল)। এরাই শত্রু, কাজেই তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাক। এদের উপর আছে আল্লাহর গযব, তাদেরকে কীভাবে (সত্য পথ থেকে) ফিরিয়ে নেয়া হচ্ছে!




আহসানুল বায়ান: (৪) তুমি যখন তাদের দিকে তাকাও, তখন তাদের দেহাকৃতি তোমাকে মুগ্ধ করে[1] এবং তারা যখন কথা বলে, তখন তুমি সাগ্রহে তা শ্রবণ কর;[2] তারা যেন দেওয়ালে ঠেকানো কাঠের খুঁটি,[3] তারা যে কোন শোরগোলকে মনে করে তাদেরই বিরুদ্ধে।[4] তারাই শত্রু অতএব তাদের সম্পর্কে সতর্ক হও, আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন! বিভ্রান্ত হয়ে তারা কোথায় চলেছে?



মুজিবুর রহমান: তুমি যখন তাদের দিকে তাকাও তখন তাদের দেহাকৃতি তোমার নিকট প্রীতিকর মনে হয় এবং তারা যখন কথা বলে তখন তুমি সাগ্রহে তাদের কথা শ্রবণ কর, যদিও তারা দেয়ালে ঠেকানো কাঠের স্তম্ভ সদৃশ। তারা যে কোন শোরগোলকে মনে করে তাদেরই বিরুদ্ধে। তারাই শত্রু, অতএব তাদের সম্পর্কে সতর্ক হও, আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন! বিভ্রান্ত হয়ে তারা কোথায় চলছে?



ফযলুর রহমান: তুমি যখন তাদেরকে দেখ, তাদের দেহ তোমাকে মুগ্ধ করে এবং তারা যদি কথা বলে, তুমি তাদের কথা শোন। তারা দেয়ালে ঠেকানো কাঠের মত। তারা প্রতিটি আওয়াজকে তাদের বিরুদ্ধে মনে করে। তারাই শত্রু; অতএব, তাদের সম্পর্কে সতর্ক হও। আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন (তারা ধ্বংস হোক)! তারা কীভাবে বিভ্রান্ত হচ্ছে!



মুহিউদ্দিন খান: আপনি যখন তাদেরকে দেখেন, তখন তাদের দেহাবয়ব আপনার কাছে প্রীতিকর মনে হয়। আর যদি তারা কথা বলে, তবে আপনি তাদের কথা শুনেন। তারা প্রাচীরে ঠেকানো কাঠসদৃশ্য। প্রত্যেক শোরগোলকে তারা নিজেদের বিরুদ্ধে মনে করে। তারাই শত্রু, অতএব তাদের সম্পর্কে সতর্ক হোন। ধ্বংস করুন আল্লাহ তাদেরকে। তারা কোথায় বিভ্রান্ত হচ্ছে ?



জহুরুল হক: আর তুমি যখন তাদের দেখ তখন তাদের গা-গতর তোমাকে তাজ্জব বানিয়ে দেয়, আর যদি তারা কথা বলে তবে তুমি তাদের বুলি শোনে থাক। তারা যেন এক-একটি কাঠের কুদোঁ ঠেস দিয়ে রাখা। তারা মনে করে প্রত্যেকটি শোরগোল তাদেরই বিরুদ্ধে। তারাই হচ্ছে শত্রু, ফলে তাদের সন্বন্ধে সাবধান হও। আল্লাহ্ তাদের ধ্বংস করুন! কোথা থেকে তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে!



Sahih International: And when you see them, their forms please you, and if they speak, you listen to their speech. [They are] as if they were pieces of wood propped up - they think that every shout is against them. They are the enemy, so beware of them. May Allah destroy them; how are they deluded?



তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।


তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৪. আর আপনি যখন তাদের দিকে তাকান তাদের দেহের আকৃতি আপনার কাছে প্ৰীতিকর মনে হবে এবং তারা যখন কথা বলে, আপনি আগ্রহের সাথে তাদের কথা শুনে থাকেন। তারা দেয়ালে ঠেকান কাঠের খুঁটির মতই, তারা যে কোন আওয়াজকেই তাদের বিরুদ্ধে মনে করে। তারাই শক্ৰ, অতএব তাদের সম্পর্কে সতর্ক হোন; আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন! তাদেরকে কোথায় ফিরানো হচ্ছে!


তাফসীর:

-


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৪) তুমি যখন তাদের দিকে তাকাও, তখন তাদের দেহাকৃতি তোমাকে মুগ্ধ করে[1] এবং তারা যখন কথা বলে, তখন তুমি সাগ্রহে তা শ্রবণ কর;[2] তারা যেন দেওয়ালে ঠেকানো কাঠের খুঁটি,[3] তারা যে কোন শোরগোলকে মনে করে তাদেরই বিরুদ্ধে।[4] তারাই শত্রু অতএব তাদের সম্পর্কে সতর্ক হও, আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন! বিভ্রান্ত হয়ে তারা কোথায় চলেছে?


তাফসীর:

[1] অর্থাৎ, তাদের সৌন্দর্য, লাবণ্য, সজীবতার কারণে।

[2] অর্থাৎ, ভাষার বিশুদ্ধতা এবং বাকপটুতার কারণে।

[3] অর্থাৎ, তারা তাদের দেহের উচ্চতা, সৌন্দর্য ও শ্রীতে এবং বোধহীনতা ও কল্যাণ স্বল্পতায় ঐরূপ, যেরূপ দেওয়ালে ঠেকানো কাঠ। দর্শককে তা দেখতে ভাল লাগে, কিন্তু কারো কোন উপকারে আসে না। অথবা এটা ‘মুবতাদা মাহযুফ’ (ঊহ্য উদ্দেশ্য) এর বিধেয়পদ। অর্থ হল, এরা রসূল (সাঃ)-এর মজলিসে ঐভাবে বসে, যেমন প্রাচীরে ঠেকানো কাঠ। এরা না কোন কথা শোনে, না বোঝে। (ফাতহুল ক্বাদীর)

[4] অর্থাৎ, এরা এত ভীরু যে, কোন শোরগোল বা হট্টগোল শুনলেই মনে করে, তাদের উপর কোন বিপদ এসে পড়ছে। কিংবা এই ভেবে আতঙ্কিত হয়ে ওঠে যে, হয়তো তাদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ গ্রহণের পরিকল্পনা শুরু হয়েছে। যেমন, চোর ও অপরাধীদের মন অভ্যন্তরীণভাবে সব সময় ধুক্পুক্ করতে থাকে। ‘চোরের মন পুলিশ পুলিশ!’


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: নামকরণ :



الْمُنٰفِقُوْنَ শব্দটি المنافق শব্দের বহুবচন। অর্থ হল : যারা দ্বিমুখীতা অবলম্বন করে, যারা মুখে বলে ঈমানের কথা কিন্তু অন্তরে কুফরী, কপটতা। সূরার প্রথম আয়াতের মুনাফিকুন শব্দ থেকে উক্ত নামে সূরার নামকরণ করা হয়েছে। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জুমু‘আর সালাতের প্রথম রাকআতে সূরা জুমু‘আহ পড়তেন আর এর দ্বারা মু’মিনদের উৎসাহিত করতেন। আর দ্বিতীয় রাকআতে সূরা মুনাফিকুন পড়তেন, আর এর দ্বারা মুনাফিকদের তিরস্কার করতেন। (মাযমাউয যাওয়ায়েদ ২/১৯১, সনদ হাসান)। সূরায় মুনাফিকদের সর্দার আব্দুল্লাহ বিন উবাই ও তার সাথীদের মুনাফিকী কর্মকাণ্ড ও মুসলিমদের সাথে তাদের আচরণ ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনায় স্থান পেয়েছে। তারা নিজেদেরকে সম্মানিত মনে করে আর আল্লাহর রাসূল ও মু’মিনদেরকে অসম্মানিত মনে করে থাকে। তাদের এসব ভ্রান্ত ধারণা খণ্ডন করা হয়েছে। সবশেষে মু’মিনদেরকে সম্পদ ও সন্তান সম্পর্কে সতর্ক করছেন যেন কিছুতেই তারা আল্লাহ তা‘আলা থেকে বিমুখ না হয়।



শানে নুযূল :



জায়েদ বিন আরকাম (রাঃ) বলেন : একদা আমি কোন এক যুদ্ধে ছিলাম। অন্য বর্ণনাতে বলা হয়েছে তাবুক যুদ্ধে (সহীহ বুখারী হা. ৩৫১৮) শুনতে পেলাম আব্দুল্লাহ বিন উবাই বলছে; যদি আমরা মদীনাতে ফিরে যাই তাহলে সম্মানিতরা অসম্মানিতদেরকে মদীনা থেকে বের করে দেব। সাহাবী জায়েদ বলেন : এ কথাটা আমি আমার চাচা অথবা উমার (রাঃ)-এর কাছে বললাম। তিনি এটা নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট উল্লেখ করলেন। জায়েদ (রাঃ) বলছেন : রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে ডাকলেন, আমি গেলাম এবং এ ঘটনা বললাম। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আব্দুল্লাহ বিন উবাই ও তার সঙ্গীদের নিকট ডেকে লোক পাঠালেন। তারা এসে শপথ করে বলল : আমরা এরূপ কথা বলিনি। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে মিথ্যাবাদী মনে করলেন আর তাদের কথা বিশ্বাস করে নিলেন। ফলে আমাকে এমন চিন্তা আক্রান্ত করল যা ইতোপূর্বে কখনো করেনি। আমি (মনের দুঃখে) ঘরে বসে গেলাম। আমার চাচা আমাকে বললেন : রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তোমাকে মিথ্যাবাদী মনে করেছেন এবং তোমার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন বলে তোমার মন খারাপ? এ প্রসঙ্গে এ সূরাটি অবতীর্ণ হয়। পরে নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার কাছে লোক প্রেরণ করলেন এবং এ সূরাটি পাঠ করে শুনালেন আর বললেন আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে সত্য বলে উল্লেখ করেছেন হে জায়েদ। (সহীহ বুখারী হা. ৪৯০০, সহীহ মুসলিম হা. ২৭৭২)



১-৪ নম্বর আয়াতের তাফসীর :



অত্র সূরাতে আল্লাহ তা‘আলা মুনাফিকদের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন। যার অধিকাংশগুলো সূরা বাকারাতে আলোচনা করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মদীনায় আগমনের পর মানুষ প্রতিনিয়ত ইসলামে দিক্ষিত হতে লাগল। এমনকি যখন আওস ও খাজরায গোত্রের অধিকাংশ লোক ইসলাম গ্রহণ করল তখন এক শ্রেণির লোক বাহ্যিক ঈমানের কথা প্রকাশ করল আর অন্তরে কুফরী গোপন রাখল যাতে সমাজে তাদের সম্মান, রক্ত ও সম্পদ হেফাযতে থেকে যায়। এরাই হল মুনাফিক। আল্লাহ তা‘আলা এদের গুণাবলী উল্লেখ করে দিয়েছেন যাতে মু’মিনরা তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে পারে।



(إِذَا جَا۬ءَكَ الْمُنٰفِقُوْنَ)



‘যখন মুনাফিকরা তোমার নিকট আসে’ এখানে মুনাফিক বলতে আব্দুল্লাহ বিন উবাই ও তার সহচর মুনাফিকদেরকে বুঝানো হয়েছে। এরা নিজেদের কপটতা গোপন রাখার জন্য রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সামনে এসে বলে, আল্লাহ তা‘আলার শপথ! আপনি আল্লাহর রাসূল।



(وَاللّٰهُ يَعْلَمُ إِنَّكَ لَرَسُوْلُه۫)



‘আল্লাহ জানেন যে, তুমি নিশ্চয়ই তাঁর রাসূল’ এ বাক্যটি পূর্বের বাক্য থেকে আলাদা একটি বাক্য, যা পূর্বের বিষয়টিকে গুরুত্বারোপ করেছে এবং যার প্রকাশ মুনাফিকরা মুনাফিক হিসাবে করত। আল্লাহ তা‘আলা বলছেন : মুনাফিকদের এটা শুধু মুখের কথা, অন্তরে এর বিশ্বাস নেই। তবে আমি জানি যে, তুমি সত্যিই আমার রাসূল।



(إِنَّ الْمُنَافِقِيْنَ لَكَاذِبُوْنَ)



অর্থাৎ মুনাফিকরা কথায় ও দাবীতে মিথ্যেবাদী।



(اِتَّخَذُوْآ أَيْمَانَهُمْ جُنَّةً)



‘তারা তাদের শপথগুলোকে ঢালস্বরূপ ব্যবহার করে’ অর্থাৎ মুনাফিকরা তাদের মিথ্যা শপথসমূহকে ঢালস্বরূপ ব্যবহার করে। কারণ যারা তাদের প্রকৃত অবস্থা জানেনা তারা তাদেরকে মুসলিম মনে করবে। ফলে তাদেরকে মুরতাদ হিসাবে হত্যা করা হবে না। এভাবে তারা বেঁচে যাবে। তাদের এরূপ কার্যকলাপে মুসলিমদের অনেক ক্ষতি হয়। কারণ অনেক ক্ষেত্রে মুসলিমরা তাদেরকে নিজেদের মত মুসলিম মনে করে তাদের কথা ও কাজের অনুসরণ করে। এজন্য আল্লাহ তা‘আলা বলছেন :



(اِتَّخَذُوْآ أَيْمَانَهُمْ جُنَّةً فَصَدُّوْا عَنْ سَبِيْلِ اللّٰهِ ط إِنَّهُمْ سَا۬ءَ مَا كَانُوْا يَعْمَلُوْن)‏



“তারা তাদের শপথগুলোকে ঢাল স্বরূপ ব্যবহার করে। তারা যা করছে তা কতই না মন্দ।”

মুনাফিকদের এসব কার্যকলাপের কারণ হল তারা তাদের কর্মের কারণে আল্লাহ তা‘আলা তাদের অন্তরকে কুফরীর ওপর বদ্ধমূল করে দিয়েছেন।



(ذٰلِكَ بِأَنَّهُمْ اٰمَنُوْا ثُمَّ كَفَرُوْا)



‘এটা এজন্য যে, তারা ঈমান আনার পর কুফরী করেছে’ এখানে আল্লাহ তা‘আলা জানিয়ে দিচ্ছেন যে, মুনাফিকরা কাফির। তারা মুখে ঈমানের কথা স্বীকার করেছে তারপর অন্তর দ্বারা অস্বীকার করেছে। তাই দুনিয়াতে তাদের ওপর কাফিরদের বিধান কার্যকর না হলেও আখিরাতে কাফিরদের কাতারে থাকবে।



(وَإِذَا رَأَيْتَهُمْ تُعْجِبُكَ)



আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সম্বোধন করে বলছেন : তুমি তাদের দৈহিক কাঠামো, সৌন্দর্য ও সজীবতা দেখে আশ্চর্য হয়ে যাবে। আর তাদের ভাষার যে বিশুদ্ধতা ও তারা যে বাকপটু তাতে তুমি তাদের কথা সাগ্রহে শুনবে। কিন্তু তারা হিদায়াত থেকে বিমুখ। এজন্য আল্লাহ তা‘আলা বলছেন :



(كَأَنَّهُمْ خُشُبٌ مُّسَنَّدَةٌ)



অর্থাৎ দেওয়ালে ঠেকানো কাঠ দেখতে ভাল কিন্তু কোন উপকারে আসে না, এ সকল মুনাফিকরাও প্রাচীরে ঠেকানো কাঠের মত, এরা হিদায়াতের কথা শোনার মত নয়।



(يَحْسَبُوْنَ كُلَّ صَيْحَةٍ)



অর্থাৎ এ সকল মুনাফিকদের অন্তরে সন্দেহ, দুর্বলতা, ভীরুতা ও ভয় থাকার কারণে যে কোন ভীতিকর অবস্থা বা হট্টগোল শুনলেই তারা মনে করে হয়তো কোন বিপদ আমাদের ওপর আপতিত হবে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন :





(أَشِحَّةً عَلَيْكُمْ ج فَإِذَا جَا۬ءَ الْخَوْفُ رَأَيْتَهُمْ يَنْظُرُوْنَ إِلَيْكَ تَدُوْرُ أَعْيُنُهُمْ كَالَّذِيْ يُغْشٰي عَلَيْهِ مِنَ الْمَوْتِ ج فَإِذَا ذَهَبَ الْخَوْفُ سَلَقُوْكُمْ بِأَلْسِنَةٍ حِدَادٍ أَشِحَّةً عَلَي الْخَيْرِ ط أُولٰ۬ئِكَ لَمْ يُؤْمِنُوْا فَأَحْبَطَ اللّٰهُ أَعْمَالَهُمْ ط وَكَانَ ذٰلِكَ عَلَي اللّٰهِ يَسِيْرًا)‏



“তোমাদের প্রতি কার্পণ্য করে আর যখন কোন ভয়ের কারণ সামনে আসে, তখন আপনি তাদেরকে দেখতে পাবেন যে, তারা মৃত্যুভয়ে অচেতন ব্যক্তির ন্যায় চোখ উল্টিয়ে আপনার দিকে তাকিয়ে আছে। অতঃপর যখন সেই ভয় চলে যায়, তখন তারা ধন-সম্পদের লোভে তীব্র ভাষায় তোমাদেরকে আক্রমণ করে। তারা ঈমান আনেনি। অতএব আল্লাহ তাদের কার্যসমূহ ব্যর্থ করে দিয়েছেন। এরূপ করা আল্লাহ্র জন্য খুবই সহজ।” (সূরা আহযাব ৩৩ : ১৯)



মুনাফিকী একটি মারাত্মক ব্যাধি যা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর। মুনাফিকরা মুসলিমদের জন্য কাফিরদের চেয়ে ভয়ংকর। সুতরাং নিজেরা মুনাফিকী চরিত্র থেকে বেঁচে থাকব এবং মুসলিম সমাজকে এ সম্পর্কে সতর্ক করব।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :



১. মুনাফিকরা কাফিরদের চেয়েও মুসলিমদের জন্য বেশি ক্ষতিকর।

২. মুনাফিকরা ফেতনা-ফাসাদ ও অরাজকতা সৃষ্টি করে বেড়ায়।

৩. মুনাফিকরা নিজেরকে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য বেশি বেশি শপথ করবে।

৪. মুনাফিকরা ঈমানদারদের সামনে খুব চমকপ্রদভাবে নিজেদের কথা উত্থাপন করে থাকে যাতে তারা তাদের অন্তরের খবর বুঝতে না পারে।

৫. মুনাফিকরা ইসলাম ও মুসলিমদের চরম শত্রু।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১-৪ নং আয়াতের তাফসীর

আল্লাহ তা’আলা মুনাফিকদের সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে বলেন যে, যখন তারা নবী (সঃ)-এর নিকট আসে তখন শপথ করে করে ইসলাম প্রকাশ করে এবং তাঁর রিসালাত স্বীকার করে। কিন্তু প্রকতপক্ষে তাদের অন্তর ইসলাম হতে বহু দূরে রয়েছে। নিঃসন্দেহে মুহাম্মাদ (সঃ) আল্লাহর নবী এবং মুনাফিকদের উক্তিও এটাই। কিন্তু তাদের অন্তরে এর কোন ক্রিয়া নেই। সুতরাং তারা মিথ্যাবাদী।

মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ এই মুনাফিকরা তোমার কাছে এসে কসম খেয়ে খেয়ে তোমার রিসালাতের স্বীকারোক্তি করে। কিন্তু তুমি বিশ্বাস রেখো যে, তাদের এই কসমের কোনই মূল্য নেই। এটা তাদের মিথ্যাকে সত্য বানাবার একটা মাধ্যম মাত্র।

এর দ্বারা মহান আল্লাহর উদ্দেশ্য হলো এই যে, মুমিনগণ যেন তাদের হতে সতর্ক থাকে। তারা যেন এই মুনাফিকদেরকে খাঁটি মুমিন মনে করে তাদের কোন কাজে তাদের অনুসরণ না করে। কেননা, তারা ইসলামের নামে কুফরী করিয়ে ফেলবে। তারা আল্লাহর পথ হতে বহু দূরে রয়েছে এবং তাদের আমল অতি জঘন্য।

যহহাক (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবি) অর্থাৎ (আরবি) তে যের দিয়ে রয়েছে। তখন ভাবার্থ হবেঃ তারা তাদের বাহ্যিক স্বীকারোক্তিকে নিজেদের জীবন রক্ষার মাধ্যম বানিয়ে নিয়েছে যে, তারা হত্যা ও কুফরীর হুকুম হতে দুনিয়ায় বেঁচে যাবে। তাদের অন্তরে নিফাক স্থান করে নিয়েছে। তাই তারা ঈমান হতে ফিরে গিয়ে কুফরীর দিকে এবং হিদায়াত হতে সরে গিয়ে গুমরাহীর দিকে চলে এসেছে। এখন তাদের হৃদয় মোহর করে দেয়া হয়েছে। ফলে তাদের মধ্যে যে বোধশক্তি ছিল তা নষ্ট হয়ে গেছে। বাহ্যতঃ তো তারা মুখে মিষ্টি কথা বলে এবং তারা বেশ বাকপটু। কিন্তু তাদের অন্তর কালিমাময়।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তারা যে কোন শোরগোলকে মনে করে তাদেরই বিরুদ্ধে।' অর্থাৎ যখনই কোন ভয়াবহ ঘটনা ঘটে তখন তারা ধারণা করে নেয় যে, তাদের উপর হয়তো তা আপতিত হচ্ছে। তাই তারা মৃত্যুর ভয়ে হা-হুতাশ করে। যেমন আল্লাহ তা’আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ “তোমাদের ব্যাপারে কৃপণতা বশতঃ (যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীকে সাহায্য করার ব্যাপারে মুনাফিকরা কৃপণতা প্রকাশ করেছিল), যখন বিপদ আসে তখন তুমি দেখবে, মৃত্যু ভয়ে মূৰ্ছাতুর ব্যক্তির মত চক্ষু উলটিয়ে তারা তোমার দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু যখন বিপদ চলে যায় তখন তারা ধনের লালসায় তোমাদেরকে তীক্ষ্ণ ভাষায় বিদ্ধ করে। তারা ঈমান আনেনি, এই জন্যে আল্লাহ তাদের কার্যাবলী নিষ্ফল করেছেন, আর আল্লাহর পক্ষে এটা সহজ।” (৩৩:১৯)

এ জন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তারাই শত্রু, অতএব তাদের সম্পর্কে তোমরা সতর্ক হও, আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন! বিভ্রান্ত হয়ে তারা কোথায় চলেছে?

হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মুনাফিকদের বহু নিদর্শন রয়েছে যেগুলো দ্বারা তাদেরকে চেনা যায়। তাদের সালাম হলো লা’নত, তাদের খাদ্য হলো লুঠতরাজ, তাদের গানীমাত হলো হারাম ও খিয়ানত, তারা মসজিদের নিকটবর্তী হওয়াকে অপছন্দ করে, নামাযের জন্যে তারা শেষ সময়ে এসে থাকে, তারা অহংকারী ও আত্মগর্বী হয় এবং তারা নম্রতা ও বিনয় প্রকাশ হতে বঞ্চিত থাকে। তারা নিজেরাও ভাল কাজ করে না এবং অন্যদেরকেও ভাল কাজের প্রতি উৎসাহ প্রদান করে না। তারা রাত্রে খড়ি এবং দিনে শোরগোলকারী।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমদে বর্ণিত রয়েছে) অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, তারা দিনে খুবই পানাহারকারী হয় এবং রাত্রে শুষ্ক কাঠের মত তারা পড়ে থাকে।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।