সূরা আল-মায়েদা (আয়াত: 75)
হরকত ছাড়া:
ما المسيح ابن مريم إلا رسول قد خلت من قبله الرسل وأمه صديقة كانا يأكلان الطعام انظر كيف نبين لهم الآيات ثم انظر أنى يؤفكون ﴿٧٥﴾
হরকত সহ:
مَا الْمَسِیْحُ ابْنُ مَرْیَمَ اِلَّا رَسُوْلٌ ۚ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ ؕ وَ اُمُّهٗ صِدِّیْقَۃٌ ؕ کَانَا یَاْکُلٰنِ الطَّعَامَ ؕ اُنْظُرْ کَیْفَ نُبَیِّنُ لَهُمُ الْاٰیٰتِ ثُمَّ انْظُرْ اَنّٰی یُؤْفَکُوْنَ ﴿۷۵﴾
উচ্চারণ: মাল মাছীহুবনুমারইয়ামা ইল্লা-রাছূলুন কাদ খালাত মিন কাবলিহিররুছুলু ওয়া উম্মুহূসিদ্দীকাতুন কা-না-ইয়া’কুলা-নিততা‘আ-মা উনজু র কাইফা নুবাইয়িনু লাহুমুল আ-য়া-তি ছুম্মানজু র আন্না-ইউ‘ফাকূন।
আল বায়ান: মাসীহ ইবনে মারইয়াম একজন রাসূল ছাড়া আর কিছুই নয়; তার পূর্বে আরও বহু রাসূল গত হয়েছে, আর তার মা একজন পরম সত্যবাদিনী, তারা উভয়ে খাদ্য আহার করত। লক্ষ্য কর! আমি কিরূপে তাদের নিকট প্রমাণসমূহ বর্ণনা করছি। আবার লক্ষ্য কর! তারা উল্টা কোন দিকে যাচ্ছে?
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৭৫. মারইয়াম-তনয় মসীহ শুধু একজন রাসূল। তার আগে বহু রাসূল গত হয়েছেন(১) এবং তার মা অত্যন্ত সত্য নিষ্ঠা ছিলেন। তারা দুজনেই খাওয়া-দাওয়া করতেন।(২) দেখুন, আমরা তাদের জন্য আয়াতগুলোকে কেমন বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করি; তারপরও দেখুন, তারা কিভাবে সত্যবিমুখ হয়!
তাইসীরুল ক্বুরআন: মারইয়াম পুত্র ‘ঈসা রসূল ছাড়া কিছুই ছিল না। তার পূর্বে আরো রসূল অতীত হয়ে গেছে, তার মা ছিল সত্যপন্থী মহিলা, তারা উভয়েই খাবার খেত; লক্ষ্য কর তাদের কাছে (সত্যের) নিদর্শনসমূহ কেমন সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরছি আর এটাও লক্ষ্য কর যে, কীভাবে তারা (সত্য হতে) বিপরীত দিকে চলে যাচ্ছে।
আহসানুল বায়ান: (৭৫) মারয়্যাম-তনয় মসীহ তো একজন রসূল মাত্র। তার পূর্বে বহু রসূল গত হয়েছে এবং তার মাতা সত্যনিষ্ঠ ছিল।[1] তারা উভয়ে খাদ্যাহার করত।[2] দেখ, ওদের জন্য আয়াত (বাক্য) কিরূপ বিশদভাবে বর্ণনা করি। আরও দেখ, ওরা কিভাবে সত্য-বিমুখ হয়।
মুজিবুর রহমান: মারইয়াম পুত্র মাসীহ কেবল একজন রাসূল। তার পূর্বে অনেক রাসূল বিগত হয়েছে এবং তার মা ছিল অতি সত্যবাদী। তারা উভয়ে খাবার খেত। দেখ, কীভাবে আমি তাদের জন্য আয়াতসমূহ বর্ণনা করছি। অতঃপর দেখ, কীভাবে তাদেরকে সত্যবিমুখ করা হচ্ছে।
ফযলুর রহমান: মরিয়মপুত্র মসীহ একজন রসূলমাত্র। তার আগেও অনেক রসূল চলে গিয়েছে। আর তার মা একজন সত্যনিষ্ঠ মহিলা। তারা দুজনেই খাবার খেত। দেখ, কীভাবে আমি ওদের জন্য নিদর্শনসমূহ বর্ণনা করছি। তারপর দেখ, ওরা কীভাবে (সত্য থেকে) বিচ্যুত হচ্ছে।
মুহিউদ্দিন খান: মরিয়ম-তনয় মসীহ রসূল ছাড়া আর কিছু নন। তাঁর পূর্বে অনেক রসূল অতিক্রান্ত হয়েছেন আর তার জননী একজন ওলী। তাঁরা উভয়েই খাদ্য ভক্ষণ করতেন। দেখুন, আমি তাদের জন্যে কিরূপ যুক্তি-প্রমাণ বর্ননা করি, আবার দেখুন, তারা উল্টা কোন দিকে যাচেছ।
জহুরুল হক: মরিয়ম-পুত্র মসীহ্ রসূল বৈ নন। তাঁর পূর্বে রসূলগণ নিশ্চয়ই গত হয়ে গেছেন। আর তাঁর মাতা ছিলেন একজন সত্যপরায়ণা নারী। তাঁরা উভয়ে খাদ্য খেতেন। দেখো, কিভাবে আমরা তাদের জন্য আমার বাণী সুস্পষ্ট করি, তারপর দেখো, কেমন করে তারা ঘুরে যায়।
Sahih International: The Messiah, son of Mary, was not but a messenger; [other] messengers have passed on before him. And his mother was a supporter of truth. They both used to eat food. Look how We make clear to them the signs; then look how they are deluded.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৭৫. মারইয়াম-তনয় মসীহ শুধু একজন রাসূল। তার আগে বহু রাসূল গত হয়েছেন(১) এবং তার মা অত্যন্ত সত্য নিষ্ঠা ছিলেন। তারা দুজনেই খাওয়া-দাওয়া করতেন।(২) দেখুন, আমরা তাদের জন্য আয়াতগুলোকে কেমন বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করি; তারপরও দেখুন, তারা কিভাবে সত্যবিমুখ হয়!
তাফসীর:
(১) অর্থাৎ অন্যান্য নবী যেমন দুনিয়াতে আগমন করার পর কিছুদিন অবস্থান করে চলে গেছেন; কাজেই তিনি উপাস্য হতে পারেন না। তিনি অন্যান্য নবী-রাসূলদের মতই একজন মানুষ। একজন রাসূলের বেশী তো তিনি কিছু নন। তবে আল্লাহ তাকে বনী-ইসরাঈলের জন্য নিদর্শন বানিয়েছেন। আল্লাহ্ বলেন, “তিনি তো কেবল আমারই এক বান্দা, যার উপর আমরা অনুগ্রহ করেছিলাম এবং তাকে বানিয়েছিলাম বনী ইসরাঈলের জন্য দৃষ্টান্ত।” [সূরা আয-যুখরুফ ৫৯] [ইবন কাসীর]
(২) যে ব্যক্তি পানাহারের মুখাপেক্ষী সে পৃথিবীর সবকিছুরই মুখাপেক্ষী। মাটি, বাতাস, পানি, সূর্য এবং জীবজন্তু থেকে সে অমুখাপেক্ষী হতে পারে না। পরমুখাপেক্ষীতার এ দীর্ঘ পরম্পরার প্রতি লক্ষ্য রেখে আমরা মসীহ ও মারইয়ামের উপাস্যতা খণ্ডণকল্পে যুক্তির আকারে এরূপ বলতে পারি, মসীহ ও মারইয়াম পানাহারের প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র থেকে মুক্ত ছিলেন না। এ বিষয়টি চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা ও লোক পরম্পরা দ্বারা প্রমাণিত। আর যে পানাহার থেকে মুক্ত নয়, যে সত্তা মানব-মণ্ডলীর মত স্বীয় অস্তিত্ব রক্ষার্থে বস্তুজগতের মুখাপেক্ষী, সে কিভাবে আল্লাহ হতে পারে? এ শক্তিশালী ও সুস্পষ্ট যুক্তিটি জ্ঞানী ও মূর্খ সবাই সমভাবে বুঝতে পারে। অর্থাৎ পানাহার করা উপাস্য হওয়ার পরিপন্থী। [বাগভী, ইবন কাসীর, সা’দী, আইসারুত তাফসীর]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৭৫) মারয়্যাম-তনয় মসীহ তো একজন রসূল মাত্র। তার পূর্বে বহু রসূল গত হয়েছে এবং তার মাতা সত্যনিষ্ঠ ছিল।[1] তারা উভয়ে খাদ্যাহার করত।[2] দেখ, ওদের জন্য আয়াত (বাক্য) কিরূপ বিশদভাবে বর্ণনা করি। আরও দেখ, ওরা কিভাবে সত্য-বিমুখ হয়।
তাফসীর:
[1] صديقة শব্দের অর্থ; মু’মিন ও অলী। অর্থাৎ, তিনিও ঈসা (আঃ)-এর উপর ঈমান আনয়নকারী এবং তাঁকে সত্যজ্ঞানকারীদের একজন ছিলেন। আর তার অর্থ এই যে, তিনি নবী ছিলেন না। যেমনটি কিছু লোকের ধারণা, যাঁরা মারয়্যাম (‘আলাইহাস্ সালাম) সহ (ইসহাক (আঃ)-এর জননী) সারাহ এবং মূসা (আঃ)-এর জননীকে নবী ছিলেন বলে মনে করেন। আর এর প্রমাণে তাঁরা বলেন যে, প্রথমোক্ত দুই জনের সাথে ফিরিশতাগণের কথোপকথন হয়। আর মূসা (আঃ)-এর জননীর সাথে স্বয়ং আল্লাহ অহী করেন। আর এই কথোপকথন ও অহী উভয়ই নবী হওয়ারই প্রমাণ। কিন্তু অধিকাংশ উলামাগণের নিকট এ প্রমাণ বা দলীল এমন নয়, যা কুরআনের স্পষ্ট উক্তির মোকাবেলা করতে পারে। মহান আল্লাহ স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন যে, ‘‘আমি যত রসূল পাঠিয়েছি সকলেই পুরুষ ছিল। (সূরা ইউসুফ ১০৯)
[2] ঈসা (আঃ) এবং মারয়্যাম (‘আলাইহাস্ সালাম) আল্লাহ বা উপাস্য ছিলেন না; বরং তাঁরা উভয়ে মানুষ ছিলেন তার প্রমাণ পেশ করা হচ্ছে। যেহেতু পানাহার করা মানুষের দৈহিক চাহিদা ও প্রয়োজনীয় জিনিসের মধ্যে গণ্য। যিনি মা’বুদ বা উপাস্য তিনি এ সবের ঊর্ধ্বে; বরং ঊর্ধ্ব থেকেও ঊর্ধ্বে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৭২-৭৫ নং আয়াতের তাফসীর:
যারা বলে, “ঈসা হলেন আল্লাহ”এবং যারা বলে, “আল্লাহ তিনজনের একজন” (আল্লাহ, ঈসা ও মারইয়াম) তারা কাফির। এ সম্পর্কে এ সূরার শুরুতে আলোচনা করা হয়েছে। এখানে খ্রিস্টানদের ভ্রষ্টতার বিবরণ পুনরায় উল্লেখ করা হয়েছে। ঈসা (আঃ) আল্লাহ তা‘আলার দাস বলে পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ করেননি। তিনি যখন দুগ্ধপোষ্য শিশু তখন তিনি আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশে সর্বপ্রথম নিজের মুখে আল্লাহ তা‘আলার দাসত্বের কথা প্রকাশ করেছিলেন, যখন সাধারণত শিশুরা কথা বলতে পারে না।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ঈসা (আঃ) বলেছিল,
(قَالَ إِنِّيْ عَبْدُ اللّٰهِ اٰتٰنِيَ الْكِتٰبَ وَجَعَلَنِيْ نَبِيًّا)
“সে বলল: ‘আমি আল্লাহর বান্দা। তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন, আমাকে নাবী করেছেন, (সূরা মারইয়াম ১৯:৩০)
ঈসা (আঃ) এ কথা বলেননি যে, “আমিই আল্লাহ অথবা আল্লাহর পুত্র।”বরং তিনি বলেছেন “আমি আল্লাহর দাস” এবং তিনি পরিণত বয়সে উপনীত হয়ে এ দাওয়াতই দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন:
(إِنَّ اللّٰهَ رَبِّيْ وَرَبُّكُمْ فَاعْبُدُوْهُ ط هٰذَا صِرَاطٌ مُّسْتَقِيْمٌ)
“নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার এবং তোমাদের রব। অতএব তোমরা তাঁরই ইবাদত কর। এটাই সঠিক পথ।”(সূরা আলি-ইমরান ৩:৫১)
এ সেই শব্দাবলী যা তিনি মায়ের কোলেও বলেছিলেন। (সূরা মারইয়াম ১৯:৩৬) অনুরূপ কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে তিনি আসমান হতে অবতরণ করবেন, তিনি মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অনুসারী হয়ে আসবেন, আল্লাহ তা‘আলার এককত্ব ও তাঁর আনুগত্যের দিকে আহ্বান করবেন। নিজের ইবাদতের দিকে নয়।
(فَقَدْ حَرَّمَ اللّٰهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ)
“আল্লাহ তার জন্য জান্নাত অবশ্যই হারাম করবেন”যারা শির্কে আকবার তথা বড় শির্কে লিপ্ত হয়। তাদের পরিণতি হল:
(১) তাদের সকল আমল বাতিল হয়ে যাবে। (২) তারা ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে।
(৩) তাদের জন্য জান্নাত হারাম। (৪) জাহান্নাম তাদের ঠিকানা।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَنَادٰٓي أَصْحٰبُ النَّارِ أَصْحٰبَ الْجَنَّةِ أَنْ أَفِيْضُوْا عَلَيْنَا مِنَ الْمَا۬ءِ أَوْ مِمَّا رَزَقَكُمُ اللّٰهُ ط قَالُوْآ إِنَّ اللّٰهَ حَرَّمَهُمَا عَلَي الْكٰفِرِيْنَ)
“জাহান্নামীরা জান্নাতবাসীদেরকে সম্বোধন করে বলবে, ‘আমাদের ওপর কিছু পানি ঢেলে দাও, অথবা ‘আল্লাহ জীবিকাস্বরূপ তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তা হতে কিছু দাও।’তারা বলবে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কাফিরদের জন্য এ দু’টি হারাম করেছেন।”(সূরা আ‘রাফ ৭:৫০)
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ إِلَّا نَفْسٌ مُّسْلِمَةٌ
মু’মিন আত্মা ছাড়া কেউ জান্নাতে যেতে পারবে না। (সহীহ বুখারী হা: ২৮৯৭)
(وَأُمُّه۫ صِدِّيْقَةٌ)
‘তার মা পরম সত্যনিষ্ঠা ছিলেন।’অর্থাৎ ঈসা (আঃ)-এর মা ছিলেন সত্যবাদী যাদের মযার্দা নাবীদের পরে। তিনি ঈসা (আঃ)-এর ওপর ঈমান এনেছিলেন। অর্থাৎ তিনি নাবী ছিলেন না। যেমন অনেকে ধারণা করে থাকে মারইয়াম (আলাইহাস সালাম)-এর সাথে ফেরেশতা কথা বলেছিলেন, তাঁর ওপর ওয়াহী হয়েছিল তাই তিনিও নাবী।
আল্লাহ তা‘আলা নারীদের থেকে কাউকে নাবী হিসেবে প্রেরণ করেননি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَمَآ أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ إِلَّا رِجَالًا نُّوْحِيْٓ إِلَيْهِمْ مِّنْ أَهْلِ الْقُرٰي)
“তোমার পূর্বেও জনপদবাসীদের মধ্য হতে পুরুষগণকেই প্রেরণ করেছিলাম, যাদের নিকট ওয়াহী পাঠাতাম।”(সূরা ইউসূফ ১২:১০৯)
(كَانَا يَأْكُلٰنِ الطَّعَامَ)
‘তারা উভয়ে খাবার খেত।’মারইয়াম (আলাইহাস সালাম) ও ঈসা (আঃ) উভয়ে খাবার খেতেন। এ আয়াতের এ অংশ প্রমাণ করছে যে, তারা কেউ মা‘বূদ ছিলেন না। যদি মা‘বূদই হতেন তাহলে খাবারের প্রয়োজন হত না এবং তারা ফেরেশতাও ছিলেন না। কেননা ফেরেশতাগণ খাবার ও অন্যান্য জিনিসের প্রতি মুখাপেক্ষী নয় যা মানুষের প্রয়োজন। এসব আল্লাহ তা‘আলা বিস্তারিত বর্ণনা করে দিয়েছেন, এরপরেও যে সকল মানুষ সত্য বিমুখ তারাই জাহান্নামে প্রবেশ করবে।
সুতরাং যারা ত্রিত্ববাদে বিশ্বাসী তারা কাফির, ঈসা (আঃ)-এর ব্যাপারে যারা বাড়াবাড়ি করেছে তাদের থেকে তিনি মুক্ত, তিনি এক আল্লাহ তা‘আলার ইবাদতের দিকে আহ্বান করেছেন।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. ঈসা (আঃ) আল্লাহ তা‘আলার একজন বান্দা ও রাসূল ছিলেন। তিনি নিজে আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করতেন এবং মানুষকে সেদিকে আহ্বান করতেন।
২. শির্কে আকবারে লিপ্ত ব্যক্তি তাওবাহ করে ফিরে না আসলে তার ঠিকানা জাহান্নাম।
৩. ত্রিত্ববাদের বিশ্বাস ভ্রান্ত বিশ্বাস।
৪. বানী ইসরাঈলের জন্যও তাওবার দরজা খোলা ছিল।
৫. পৃথিবীর সকল নাবীই ছিলেন পুরুষ, নারীদের মধ্য হতে কোন নাবী আগমন করেননি।
৬. ঈসা (আঃ) ও তাঁর মা ছিলেন সাধারণ মানুষের মত যারা পানাহার করতেন।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৭২-৭৫ নং আয়াতের তাফসীর:
এখানে খ্রীষ্টানদের দলগুলোর অর্থাৎ মালেকিয়্যাহ, ইয়াকুবিয়্যাহ এবং নাসতুরিয়্যাহদের কুফরের অবস্থা বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তারা মাসীহকেই (আঃ) প্রভু বলে মেনে থাকে। আল্লাহ তাদের এ উক্তি থেকে সম্পূর্ণরূপে পাক ও পবিত্র। মাসীহ (আঃ) তো আল্লাহর গোলাম ছিলেন। পার্থিব জগতে পা রেখে দোলনাতেই তাঁর মুখের প্রথম কথা ছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ নিশ্চয়ই আমি আল্লাহর গোলাম বা দাস। (১৯:৩০) “আমি আল্লাহ বা আল্লাহর পুত্র”-এ কথা তো তিনি বলেননি! বরং তিনি স্বীয় দাসত্বের কথা অকপটে স্বীকার করেছিলেন। সাথে সাথে তিনি বলেছিলেনঃ “আমার এবং তোমাদের সকলের প্রভু একমাত্র আল্লাহ। তাঁরই ইবাদত কর। সরল ও সঠিক পথ এটাই।' যৌবনের পরবর্তী বয়সেও বলেছিলেনঃ “তোমরা আল্লাহরই ইবাদত কর। যারা তাঁর সাথে অন্য কারও ইবাদত করে তাদের জন্যে জান্নাত হারাম এবং জাহান্নাম ওয়াজিব।” যেমন কুরআন পাকের অন্য আয়াতে রয়েছে- “আল্লাহ শিরকের গুনাহ কখনও মাফ করেন না।” জাহান্নামবাসীরা যখন জান্নাতবাসীদের কাছে খাদ্য ও পানি চাইবে তখন তারা এ উত্তরই দেবে যে, এ দুটি জিনিস আল্লাহ কাফিরদের উপর হারাম করে দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঘোষকদের দ্বারা মুসলমানদের মধ্যে ঘোষণা করে দিয়েছিলেন যে, শুধু মুমিন ও মুসলমানরাই জান্নাতে যাবে। সূরায়ে নিসার (আরবী) (৪:১১৬)-এ আয়াতের তাফসীরে এ হাদীসটিও বর্ণনা করা হয়েছে যাতে রয়েছে যে, পাপের তিনটি শ্রেণী রয়েছে। এ তিন শ্রেণীর মধ্যে এক শ্রেণী হচ্ছে ওটা যা আল্লাহ তা'আলা কখনও ক্ষমা করবেন না। সেই পাপটি হচ্ছে আল্লাহর সাথে শিরক করা! হযরত মাসীহ্ (আঃ) স্বীয় কওমের মধ্যে এ ওয়ায করেছিলেন যে, এরূপ অন্যায়কারী মুশরিকদের কোন সাহায্যাকারী হবে না।
এখন ঐ লোকদের কুফরীর বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যারা আল্লাহকে তিন মা'বুদের মধ্যে এক মা’রূদ মনে করতো। ইয়াহুদীরা হযরত উযায়ের (আঃ)-কে এবং খ্রীষ্টানরা হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহর পুত্র বলতো। (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক) এবং আল্লাহকে তিন মা’ৰূদে মধ্যে এক মা'বুদ মনে করতো। কিন্তু এ আয়াতটি শুধু খ্রীষ্টানদের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়। তারা পিতা, পুত্র এবং তাঁর। সেই কালিমাকে মা'বুদ মানতো যা পিতার পক্ষ থেকে পুত্রের দিকে ছিল। অতঃপর এ তিনকে নির্ধারিত করার ব্যাপারেও খুব বড় রকমের মতানৈক্য ছিল এবং প্রত্যেক দল একে অপরকে কাফির বলতো। সত্য কথা এই যে, তারা সবাই কাফির ছিল। তারা হযরত মাসীহ (আঃ)-কে, তার মাকে এবং আল্লাহকে মিলিয়ে দিয়ে আল্লাহ মানতো। এ সূরার শেষে এরই ব কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে সম্বোধন করে বলবেনতুমি কি লোকদেরকে বলেছিলে-তোমরা আল্লাহকে ছাড়াও আমাকে ও আমার মাকে আল্লাহ বলে স্বীকার কর?' তিনি তা স্পষ্টভাবে অস্বীকার করবেন এবং নিজের না জানার কথা ও নিরপরাধ হওয়ার কথা প্রকাশ করবেন। সবচেয়ে বেশী প্রকাশ্য উক্তি হচ্ছে এটাই। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
প্রকৃতপক্ষে ইবাদতের যোগ্য মহান আল্লাহ ছাড়া আর কেউই নয়। সমস্ত সৃষ্টিজগতের প্রকৃত মা'বূদ তিনিই। যদি এরা কুফরীপূর্ণ উক্তি থেকে বিরত না থাকে তবে নিশ্চিতরূপে এরা ধ্বংসাত্মক শাস্তির শিকারে পরিণত হবে।
অতঃপর আল্লাহ স্বীয় দয়া, অনুকম্পা, স্নেহ ও ভালবাসার বর্ণনা দিচ্ছেন এবং তাদের এতো কঠিন অপরাধ ও এতো ভীষণ নির্লজ্জতা ও মিথ্যারোপ সত্ত্বেও তাদেরকে স্বীয় রহমতের দাওয়াত দিচ্ছেন এবং বলছেনঃ এখনও যদি তোমরা আমার দিকে প্রত্যাবর্তিত হও তবে তোমাদের সমস্ত অপরাধ ক্ষমা করে দেবো। এবং তোমাদেরকে আমার রহমতের ছায়ায় আশ্রয় দেবো।
হযরত মাসীহ (আঃ) আল্লাহর বান্দা ও রাসূলই ছিলেন। তাঁর মত রাসূল তাঁর পূর্বেও অতীত হয়েছেন। যেমন তিনি বলেন, (আরবী) অর্থাৎ সে একজন, গোলামই ছিল। (৪৩:৫৯) তবে তিনি তাঁর উপর স্বীয় রহমত নাযিল করেছিলেন এবং বানী ইসরাঈলের জন্যে তাঁর একটি নির্দেশ বানিয়েছিলেন। তাঁর মা মুমিন ও সত্যবাদিনী ছিলেন। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, তিনি নবী ছিলেন না। কেননা, এটা হচ্ছে বিশেষণ বা গুণ বর্ণনার স্থান। সুতরাং তিনি যে গুণের অধিকারিণী ছিলেন তারই বর্ণনা দেয়া হয়েছে। যদি তিনি নবুওয়াতের অধিকারিণী হতেন তবে এ স্থলে ওটার বর্ণনা দেয়া খুবই জরুরী ছিল। ইবনে হাম (রঃ) প্রমুখ মনীষীর ধারণা এই যে, হযরত ইসহাক (আঃ)-এর মা হযরত মূসা (আঃ)-এর মা এবং হযরত ঈসা (আঃ)-এর মা নবী ছিলেন এবং তারা এর দলীল দিতে গিয়ে বলেন, ফেরেশতাগণ হযরত সারা (আঃ) এবং হযরত মারইয়াম (আঃ)-কে সম্বোধন করেন এবং তাদের সাথে কথা বলেছেন। আর হযরত মূসা (আঃ)-এর মাতী সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন- (আরবী) অর্থাৎ “আমি মূসার মায়ের কাছে অহী পাঠিয়েছিলাম-তুমি তাকে দুধ পান করাও। (২৮:৭) কিন্তু জমহুরের মাযহাব এর উল্টো। তারা বলেন যে, নবুওয়াত পুরুষ লোকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। যেমন কুরআন পাকে আছে- (আরবী) অর্থাৎ ‘তোমার পূর্বে আমি গ্রামবাসীদের মধ্য হতে পুরুষ লোকদেরকেই রিসালাত দান করেছিলাম।'(২১:৭) আবুল হাসান আশআরী (রঃ) তো এর উপর ইজমা হওয়ার কথা নকল করেছেন।
এরপর ইরশাদ হচ্ছে-মাতা ও পুত্র উভয়ে পানাহারের মুখাপেক্ষী ছিল। আর এটা প্রকাশ্য কথা যে, যা ভেতরে যাবে তা বেরিয়ে আসবে। অর্থাৎ তাদের প্রস্রাব পায়খানাও হতো। সুতরাং সাব্যস্ত হচ্ছে যে, তাঁরা অন্যদের মত বান্দাই ছিলেন। খোদায়ী গুণ তাদের মধ্যে ছিল না। দেখো তো! আমি কিভাবে খোলাখুলি তাদের সামনে আমার দলীল প্রমাণাদি পেশ করছি! আবার লক্ষ্য কর যে, এতো দলীল প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও কিভাবে তারা বিভ্রান্ত হয়ে এদিক ওদিক ফিরছে! কেমন ভ্রষ্ট মাযহাবের উপর তারা রয়েছে! কেমন জঘন্য ও দলীল প্রমাণহীন উক্তি তারা করছে!
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।