সূরা আল-মায়েদা (আয়াত: 47)
হরকত ছাড়া:
وليحكم أهل الإنجيل بما أنزل الله فيه ومن لم يحكم بما أنزل الله فأولئك هم الفاسقون ﴿٤٧﴾
হরকত সহ:
وَ لْیَحْکُمْ اَهْلُ الْاِنْجِیْلِ بِمَاۤ اَنْزَلَ اللّٰهُ فِیْهِ ؕ وَ مَنْ لَّمْ یَحْکُمْ بِمَاۤ اَنْزَلَ اللّٰهُ فَاُولٰٓئِکَ هُمُ الْفٰسِقُوْنَ ﴿۴۷﴾
উচ্চারণ: ওয়াল ইয়াহকুম আহলুল ইনজীলি বিমাআনযালাল্লা-হু ফীহি ওয়া মাল্লাম ইয়াহকুম বিমাআনযালাল্লা-হু ফাউলাইকা হুমুলফা-ছিকূন।
আল বায়ান: আর ইনজীলের অনুসারীগণ তাতে আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তার মাধ্যমে যেন ফয়সালা করে আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করে না, তারাই ফাসিক।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪৭. আর ইঞ্জীল অনুসারীগণ যেন আল্লাহ তাতে যা নাযিল করেছেন তদনুসারে হুকুম দেয়।(১) আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী যারা বিধান দেয় না, তারাই ফাসেক।(২)
তাইসীরুল ক্বুরআন: ইঞ্জিলের অনুসারীগণ যেন আল্লাহ তাতে যে বিধান দিয়েছেন তদনুযায়ী বিচার ফয়সালা করে। আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তদনুযায়ী যারা বিচার ফায়সালা করে না তারাই ফাসিক।
আহসানুল বায়ান: (৪৭) ইঞ্জীল-ওয়ালাদের উচিত, আল্লাহ ওতে (ইঞ্জীলে) যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুসারে বিধান দেওয়া।[1] আর যারা আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুসারে বিধান দেয় না, তারাই পাপাচারী।
মুজিবুর রহমান: আহলে ইঞ্জীলের উচিত-আল্লাহ তাতে যা কিছু অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী হুকুম প্রদান করা, আর যে ব্যক্তি আল্লাহর অবতারিত (বিধান) অনুযায়ী হুকুম প্রদান করেনা, তাহলে তো এ রূপ লোকই পাপাচারী ফাসিক।
ফযলুর রহমান: ইনজীলে আল্লাহ যে বিধান নাযিল করেছেন ইনজীলধারীরা যেন সে অনুসারে বিচার করে। আর যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুসারে বিচার করে না তারাই ফাসেক।
মুহিউদ্দিন খান: ইঞ্জিলের অধিকারীদের উচিত, আল্লাহ তাতে যা অবতীর্ণ করেছেন। তদানুযায়ী ফয়সালা করা। যারা আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই পাপাচারী।
জহুরুল হক: আর ইনজীলের অনুবর্তীদের উচিত তারা যেন বিচার করে আল্লাহ্ তাতে যা অবতারণ করেছেন তার দ্বারা। আর যে বিচার করে না আল্লাহ্ যা অবতারণ করেছেন তার দ্বারা, তারা তবে নিজেরাই হচ্ছে দুষ্কৃতিপরায়ণ।
Sahih International: And let the People of the Gospel judge by what Allah has revealed therein. And whoever does not judge by what Allah has revealed - then it is those who are the defiantly disobedient.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৪৭. আর ইঞ্জীল অনুসারীগণ যেন আল্লাহ তাতে যা নাযিল করেছেন তদনুসারে হুকুম দেয়।(১) আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী যারা বিধান দেয় না, তারাই ফাসেক।(২)
তাফসীর:
(১) আল্লামা শানকীতী বলেন, এ আয়াতে কি বিধান ইঞ্জীলে দেয়া হয়েছে, সেটার বর্ণনা আসে নি। অন্য আয়াতে বর্ণিত হয়েছে যে সেটা হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুসংবাদ। তার উপর ঈমান ও তার আনুগত্যের আবশ্যকতা। যেমন আল্লাহ বলেন, “আর স্মরণ করুন, যখন মারইয়াম-পুত্র ঈসা বলেছিলেন, হে বনী ইসরাঈল! আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর রাসূল এবং আমার পূর্ব থেকে তোমাদের কাছে যে তাওরাত রয়েছে আমি তার সত্যায়নকারী এবং আমার পরে আহমাদ নামে যে রাসূল আসবেন আমি তার সুসংবাদদাতা।” [সূরা আস-সাফ: ৬] আরও বলেন “যারা অনুসরণ করে বার্তাবাহক উম্মী নবীর, যার উল্লেখ তারা তাদের কাছে তাওরাত ও ইঞ্জীলে লিপিবদ্ধ পায়।” [সূরা আল-আরাফ: ১৫৭] ইত্যাদি। [আদওয়াউল বায়ান]
(২) আল্লাহর আইন বাস্তবায়ন করা একদিক থেকে তা তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহর সাথে সম্পৃক্ত, অপরদিকে তা তাওহীদুল উলুহিয়াহর সাথে সম্পৃক্ত। আল্লাহকে একমাত্র আইনদাতা হিসাবে না মানলে তাওহীদুর রুবুবিয়্যাতে শির্ক করা হয়। অপরদিকে আল্লাহর আইনকে না মেনে অন্য কারো আইনে বিচার-ফয়সালা করলে তাতে তাওহীদুল উলুহিয়াতে শির্ক করা হয়। অনুরূপভাবে, আল্লাহর আইন ছাড়া অন্য কোন আইনের বিচার-ফয়সালা মনে-প্ৰাণে মেনে নেয়াও তাওহীদুল উলুহিয়াতে শির্ক করা হয়। সুতরাং এ থেকে একথা স্পষ্ট হয় যে, আইনদাতা হিসেবে আল্লাহকে মেনে নেয়া এবং আল্লাহর আইন বাস্তবায়ন করা তাওহীদের অংশ। [মাজমু ফাতাওয়া ও রাসাইলে ইবন উসাইমীন ২/১৪০-১৪৪ ও ৬/১৫৮-১৬২]
লক্ষণীয় যে, ৪৪ নং আয়াতে বলা হয়েছে, “আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী যারা বিধান দেয় না, তারাই কাফির।” পরবর্তী ৪৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে, “আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী যারা বিধান দেয় না, তারাই যালিম।” এর পরবর্তী ৪৭নং আয়াতে বলা হয়েছে যে, “আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী যারা বিধান দেয় না, তারাই ফাসিক।” মোটকথা: যারা আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী বিধান দেয় না। তারা কাফির, যালিম ও ফাসিক। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আল্লাহর আইনে বিচার-ফয়সালা না করলে যালিম বা ফাসিক হওয়ার ব্যাপারটি স্বাভাবিক হলেও, এর মাধ্যমে সর্বাবস্থায়ই কি বড় শির্ক বা বড় কুফরী হবে?
মূলতঃ আল্লাহর আইন অনুসারে না চলার কয়েকটি পর্যায় হতে পারেঃ (১) আল্লাহ্র আইন ছাড়া অন্য কোন আইনে বিচার-ফয়সালা পরিচালনা জায়েয মনে করা। (২) আল্লাহর আইন ব্যতীত অন্য কোন আইন দ্বারা শাসন কার্য পরিচালনা উত্তম মনে করা। (৩) আল্লাহর আইন ও অন্য কোন আইন শাসনকার্য ও বিচার ফয়সালার ক্ষেত্রে সমপর্যায়ের মনে করা। (৪) আল্লাহর আইন পরিবর্তন করে তদস্থলে অন্য কোন আইন প্রতিষ্ঠা করা।
উপরোক্ত যে কোন একটি কেউ করলে সে সর্বসম্মতভাবে কাফের হয়ে যাবে। কিন্তু এর বাইরেও আরো কিছু পর্যায় রয়েছে, যেগুলোতে আল্লাহর আইনে বিচার না করা বা অন্য আইনের কাছে বিচার চাওয়ার কারণে গোনাহগার হলেও পুরোপুরি মুশরিক হয়ে যায় না। যেমন, (এক) প্রবৃত্তি বা ঘুষের আশ্রয় নিয়ে অন্য কোন আইনে বিচার-ফয়সালা করে, তখন সে যালিম বা ফাসিক হিসেবে বিবেচিত হবে। (দুই) কেউ মানুষের উপর যুলুম করার মানসে আল্লাহ্র আইন ব্যতীত বিচার করে, আল্লাহ্র আইন বাস্তবায়ন করার সুযোগ না থাকে এবং বিচারের অভাবে মানুষের হক নষ্ট হওয়ার ভয় থাকে। তখন সে ফাসিক বলে বিবেচিত হবে। শেষোক্ত দুটি বড় শির্ক কিংবা বড় কুফরীর পর্যায়ে পড়ে না। যারা এ কাজ করবে, তারা ছোট শির্ক বা ছোট কুফরী করেছে বলে গন্য হবে। [বিস্তারিত দেখুন, আদওয়াউল বায়ান; মাজমু ফাতাওয়া ইবন তাইমিয়্যাহ ২৭/৫৮-৫৯ মিনহাজুস সুন্নাহ ৫/১৩০-১৩২]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৪৭) ইঞ্জীল-ওয়ালাদের উচিত, আল্লাহ ওতে (ইঞ্জীলে) যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুসারে বিধান দেওয়া।[1] আর যারা আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুসারে বিধান দেয় না, তারাই পাপাচারী।
তাফসীর:
[1] ঈসা (আঃ)-এর নবুঅত কালে আহলে ইঞ্জীলদেরকে এই নির্দেশ প্রদান করা হয়েছিল। কিন্তু মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর নবুঅত প্রাপ্তির পর ঈসা (আঃ)-এর নবুঅতের যুগ শেষ হয়ে যায়; অনুরূপ ইঞ্জীলের অনুসরণের নির্দেশও। বর্তমানে ঐ ব্যক্তি ঈমানদার বা মু’মিন বলে বিবেচিত হবে, যে মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর রিসালাতের উপর ঈমান আনবে এবং কুরআনের অনুসরণ করবে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৪৬-৪৭ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা‘আলা বানী ইসরাঈলের নাবীগণের পর পরেই ঈসা (আঃ)-কে প্রেরণ করেছেন যিনি তাওরাতের সত্যায়নকারী। অতএব ইঞ্জীলধারীরা যেন আল্লাহ তা‘আলা যা অবতীর্ণ করেছেন তা দ্বারা ফায়সালা করে। যারা করবে না তারাই পাপাচারী। এমনিভাবে সকল নাবী ও অনুসারীগণও আল্লাহ তা‘আলার দেয়া বিধান অনুযায়ী ফায়সালা করাতে আদিষ্ট।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৪৬-৪৭ নং আয়াতের তাফসীর:
এখানে আল্লাহ পাক বলেনঃ আমি ঈসা (আঃ)-কে বানী ইসরাঈলের শেষ নবী করে পাঠিয়েছিলাম। সে তাওরাতকে বিশ্বাস করতো এবং ওর নির্দেশ অনুযায়ী লোকদের মধ্যে ফায়সালা করতো। আমি তাকে স্বীয় কিতাব ইঞ্জীল প্রদান করেছিলাম। তাতে সত্যের হিদায়াত ছিল, আর ছিল কাঠিন্য ও জটিলতার ব্যাখ্যা এবং পূর্ববর্তী কিতাবগুলোর অনুকরণ। তবে কতগুলো মাসআলার তাতে স্পষ্ট ফায়সালা ছিল, যেগুলোতে ইয়াহূদীরা মতভেদ সৃষ্টি করেছিল। যেমন কুরআন কারীমের অন্য জায়গায় রয়েছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) বলেছিলেনঃ “আমি এমন কতগুলো জিনিস তোমাদের জন্য হালাল করবো যেগুলোতোমাদের জন্যে হারাম করা হয়েছিল। এ জন্যেই আলেমদের প্রসিদ্ধ উক্তি রয়েছে যে, ইঞ্জীল তাওরাতের কতক হুকুম মানসূখ করে দিয়েছে। ইঞ্জীল দ্বারা পুণ্যবান লোকেরা হেদায়াত, ওয়ায ও উপদেশ লাভ করতো এবং এর ফলে তারা পুণ্য লাভের প্রতি আগ্রহী হতো অসৎ কাজ থেকে বিরত থাকতো। অল য়্যাহকুম আহলুল ইঞ্জীলে’ এখানে ‘আহলাল ইঞ্জীলে’ও পড়া হয়েছে। এ অবস্থায় (আরবী) শব্দটি ' (আরবী) -এর অর্থে হবে। তখন ভাবার্থ হবে-আমি ঈসা (আঃ)-কে ইঞ্জীল এ জন্যেই প্রদান করেছি যে, যেন সে তার যুগের তার অনুসারীদেরকে ওটা অনুযায়ীই পরিচালিত করে। আর যদি মাশহর কিরআত (আরবী) অনুযায়ী - (আরবী) কে আমরের (আরবী) মনে করা হয় তবে তখন অর্থ হবে- তাদের উচিত যে, তারা ইঞ্জীলের সমস্ত আহকামের উপর ঈমান আনে এবং ওটা অনুযায়ী ফায়সালা করে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ “ বল হে আহলে কিতাব! যে পর্যন্ত তোমরা তাওরাত, ইঞ্জীল এবং যা আল্লাহর নিকট হতে অবতীর্ণ করা হয়েছে এগুলোর উপর প্রতিষ্ঠিত না হবে সে পর্যন্ত তোমরা কিছুরই উপর নও। (৫:৬৮) আর এক জায়গায় আছে (আরবী) অর্থাৎ “যারা এ রাসূল, নবী উম্মী (সঃ)-এর অনুসরণ করে যার গুণাবলী তারা তাদেরই নিকট গচ্ছিত কিতাব তাওরাতে পেয়ে থাকে তারাই সফলকাম।` (৭:১৫৭) যারা আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর নবী (সঃ)-এর নির্দেশমত ফায়সালা করে। তারা আল্লাহর আনুগত্য হতে বেরিয়ে পড়েছে, সত্যকে পরিত্যাগ করেছে, বাতিলের উপর আমল করেছে। আয়াতটির গতি দ্বারা প্রকাশ পাচ্ছে যে, এটা খ্রষ্টানদের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। আর পূর্বে এ বর্ণনা দেয়াও হয়েছে।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।