সূরা আল-মায়েদা (আয়াত: 15)
হরকত ছাড়া:
يا أهل الكتاب قد جاءكم رسولنا يبين لكم كثيرا مما كنتم تخفون من الكتاب ويعفو عن كثير قد جاءكم من الله نور وكتاب مبين ﴿١٥﴾
হরকত সহ:
یٰۤاَهْلَ الْکِتٰبِ قَدْ جَآءَکُمْ رَسُوْلُنَا یُبَیِّنُ لَکُمْ کَثِیْرًا مِّمَّا کُنْتُمْ تُخْفُوْنَ مِنَ الْکِتٰبِ وَ یَعْفُوْا عَنْ کَثِیْرٍ ۬ؕ قَدْ جَآءَکُمْ مِّنَ اللّٰهِ نُوْرٌ وَّ کِتٰبٌ مُّبِیْنٌ ﴿ۙ۱۵﴾
উচ্চারণ: ইয়াআহলাল কিতা-বি কাদ জাআকুম রাছূলুনা-ইউবাইয়িনুলাকুম কাছীরাম মিম্মাকুনতুম তুখফূনা মিনাল কিতা-বি ওয়া ইয়া‘ফূ‘আন কাছীরিন কাদ জাআকুম মিনাল্লাহি নূরুওঁ ওয়া কিতা-বুম মুবীন।
আল বায়ান: হে কিতাবীগণ, তোমাদের নিকট আমার রাসূল এসেছে, কিতাব থেকে যা তোমরা গোপন করতে, তার অনেক কিছু তোমাদের নিকট সে প্রকাশ করছে এবং অনেক কিছু ছেড়ে দিয়েছে। অবশ্যই তোমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে আলো ও স্পষ্ট কিতাব এসেছে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৫. হে কিতাবীরা! আমাদের রাসূল তোমাদের নিকট এসেছেন(১) তোমরা কিতাবের যা গোপন করতে তিনি সে সবের অনেক কিছু তোমাদের নিকট প্রকাশ করছেন এবং অনেক কিছু ছেড়ে দিচ্ছেন। অবশ্যই আল্লাহর নিকট থেকে এক জ্যোতি ও স্পষ্ট কিতাব তোমাদের কাছে এসেছে।(২)
তাইসীরুল ক্বুরআন: হে কিতাবধারীগণ! তোমাদের কাছে আমার রসূল এসে গেছে, সে তোমাদেরকে অনেক বিষয় বর্ণনা করে কিতাব থেকে যা তোমরা গোপন করতে আর অনেক বিষয় উপেক্ষা করে। তোমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ হতে জ্যোতি ও স্পষ্ট কিতাব এসেছে।
আহসানুল বায়ান: (১৫) হে ঐশীগ্রন্থধারিগণ! আমার রসূল তোমাদের নিকট এসেছে, তোমরা কিতাবের যা গোপন করতে, সে তার অনেক অংশ তোমাদের নিকট প্রকাশ করে[1] এবং অনেক কিছু (প্রকাশ না করে) উপেক্ষা করে থাকে। অবশ্যই তোমাদের নিকট আল্লাহর নিকট হতে জ্যোতি ও সুস্পষ্ট কিতাব এসেছে।[2]
মুজিবুর রহমান: হে আহলে কিতাব! তোমাদের কাছে আমার রাসূল এসেছে, তোমরা কিতাবের যে সব বিষয় গোপন কর তন্মধ্য হতে বহু বিষয় সে তোমাদের সামনে পরিস্কারভাবে ব্যক্ত করে, আর বহু বিষয় (প্রকাশ করা) বর্জন করে, তোমাদের কাছে আল্লাহর নিকট থেকে এক আলোকময় বস্ত্ত এসেছে এবং তা একটি স্পষ্ট কিতাব (কুরআন)।
ফযলুর রহমান: হে কিতাবীরা! তোমাদের কাছে আমার রসূল এসেছেন। তোমরা (আল্লাহর) কিতাবের যা যা গোপন করতে তিনি তার অনেককিছু তোমাদের কাছে প্রকাশ করেন এবং অনেককিছু মার্জনা করেন। তোমাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ আলো ও একটি স্পষ্ট কিতাব এসেছে।
মুহিউদ্দিন খান: হে আহলে-কিতাবগণ! তোমাদের কাছে আমার রাসূল আগমন করেছেন! কিতাবের যেসব বিষয় তোমরা গোপন করতে, তিনি তার মধ্য থেকে অনেক বিষয় প্রকাশ করেন এবং অনেক বিষয় মার্জনা করেন। তোমাদের কাছে একটি উজ্জল জ্যোতি এসেছে এবং একটি সমুজ্জল গ্রন্থ।
জহুরুল হক: হে গ্রন্থপ্রাপ্ত লোকেরা! আমাদের রসূল তোমাদের কাছে ইতিমধ্যে এসে গেছেন, ধর্মগ্রন্থের যা তোমরা লুকোচ্ছিলে তার বহুলাংশ তিনি তোমাদের জন্য সুস্পষ্ট করেছেন, এবং অনেকটা তিনি উপেক্ষা করেছেন। আল্লাহ্র কাছ থেকে তোমাদের কাছে নিশ্চয়ই এসেছে এক জ্যোতি আর উজ্জ্বল কিতাব, --
Sahih International: O People of the Scripture, there has come to you Our Messenger making clear to you much of what you used to conceal of the Scripture and overlooking much. There has come to you from Allah a light and a clear Book.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১৫. হে কিতাবীরা! আমাদের রাসূল তোমাদের নিকট এসেছেন(১) তোমরা কিতাবের যা গোপন করতে তিনি সে সবের অনেক কিছু তোমাদের নিকট প্রকাশ করছেন এবং অনেক কিছু ছেড়ে দিচ্ছেন। অবশ্যই আল্লাহর নিকট থেকে এক জ্যোতি ও স্পষ্ট কিতাব তোমাদের কাছে এসেছে।(২)
তাফসীর:
(১) অর্থাৎ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি তাদের মধ্যকার মতভেদপূর্ণ বিষয়ে সঠিক পথ বলে দেবার পাশাপাশি তারা যে সমস্ত বিষয় গোপন করেছে সেগুলোর অনেকটাই প্রকাশ করে দেন। [ইবন কাসীর] ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, যে ব্যক্তি ‘রাজম’ তথা বিবাহিত ব্যভিচারীকে পাথর মেরে হত্যার কথা অস্বীকার করবে, সে কুরআনের সাথে এমনভাবে কুফরী করল যে সে তা বুঝতেই পারছে না। আল্লাহ্ তা'আলার বাণী, হে কিতাবীরা আমাদের রাসূল তোমাদের নিকট এসেছেন, তোমরা কিতাবের যা গোপন করতে তিনি সে সবের অনেক কিছু তোমাদের নিকট প্রকাশ করছেন। তারা যে সমস্ত জিনিস গোপন করেছিল, রজমের বিধান ছিল তার একটি। [মুস্তাদরাকে হাকিম: ৪/৩৫৯]
(২) এ আয়াতে উল্লিখিত ‘নুর’ সম্পর্কে আলেমদের বিভিন্ন মন্তব্য রয়েছে। যা মূলত পরস্পর সম্পূরক, বিপরীত নয়। কারও কারও মতে, এখানে ‘নূর’ দ্বারা উদ্দেশ্য, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। কারও কারও মতে, কিতাব বা কুরআন। বস্তুত রাসূল ও কিতাব একটি অপরটির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই রাসূল ও কিতাব উভয় ক্ষেত্রেই নুর বিশেষণ ব্যবহার হয়। এখানে নূর দ্বারা উদ্দেশ্য, ইসলামের দিকে আহবানকারী রাসূল, ইসলামের বিধানসম্বলিত কিতাব, অথবা রাসূল ও কিতাব উভয়ই।
আল্লাহ্ তা'আলা কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় রাসূল ও কিতাব উভয়কে নূর বিশেষণে বিশেষিত করেছেন। যেমন সূরা আহযাবের ৪৫-৪৬ নং আয়াতে ‘নূর’ ধাতু থেকে উদগত কতাবাচক বিশেষ্য ‘মুনীর’ শব্দ দ্বারা রাসূলকে বিশেষিত করা হয়েছে। আবার একাধিক জায়গায় আল্লাহ্ তা'আলা তার কিতাব কুরআনকে নূর দ্বারা বিশেষিত করেছেন। যেমন, সূরা আশ-শূরাঃ ৫২; সূরা আল-আরাফ: ১৫৭; সূরা আত-তাগাবুন: ৮; সূরা আন-নিসা ১৭৪। এসব জায়গায় ‘নূর’ দ্বারা আল্লাহ তা'আলা তার অহী তথা শুধু কুরআনুল কারীমকে বুঝিয়েছেন। অন্যত্র অনুরূপভাবে অন্যান্য নবীদের উপর নাযিলকৃত কিতাবকেও তিনি নূর আখ্যা দিয়েছেন। যেমন, সূরা আল-আনআমঃ ৯১; সূরা আল-মায়িদাহ ৪৪, ৪৬৷
কুরআনের এসব আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আসমান থেকে নাযিলকৃত আল্লাহর সকল কিতাবই নূর। লক্ষণীয় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য যেরূপ ‘নুর’ শব্দের কর্তাবাচক শব্দ মুনীর বিশেষণ ব্যবহার করা হয়েছে, অনুরূপ বিশেষণ আল্লাহ্ তা'আলা কুরআনের জন্য ব্যবহার করেছেন। যেমন, সূরা আলে ইমরান: ১৮৫। এ থেকে বুঝা যায় যে, রাসূল, নাযিলকৃত অহী এবং সকল আসমানী কিতাব ‘নূর’; যা বান্দাদের প্রতি তাদের রবের পক্ষ থেকে আগমন করেছে, এর মাধ্যমে আল্লাহ তাকেই হিদায়াত করেন, যে তার সন্তুষ্টির অনুসরণ করে, অর্থাৎ তার মনোনীত দ্বীনের আলোকে চলে। কুরআনের অন্যত্র এ ঘোষণা এসেছে, যেমন সূরা আল-মায়িদাহ ৩; সূরা আয-যুমার: ২২; সূরা আল-আনআমঃ ১২২।
অতএব এ নূর হচ্ছে অহীর নূর। এর মাধ্যমে বান্দা তার রবের ইবাদাত সম্পর্কে দিকনির্দেশনা লাভ করে। মানুষের সাথে সম্পর্কের নীতিমালা অর্জন করে। এ নুরই তার সঙ্গীতে পরিণত হয় এবং পথহারা অবস্থায় এ নুর দ্বারাই সে পথের সঠিক দিশা লাভ করে। মোদ্দাকথা নুর অর্থ অহী, এ অহী যেহেতু রাসূলের উপর নাযিল হয়েছে, তাই কখনো তাকে নূর হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়েছে, কখনো কুরআনকে, কখনো তাওরাত ও ইঞ্জলকে। অতএব আয়াতের অর্থ হচ্ছে, তোমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে অহী সম্বলিত রাসূল ও স্পষ্ট কিতাব আগমন করেছে।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১৫) হে ঐশীগ্রন্থধারিগণ! আমার রসূল তোমাদের নিকট এসেছে, তোমরা কিতাবের যা গোপন করতে, সে তার অনেক অংশ তোমাদের নিকট প্রকাশ করে[1] এবং অনেক কিছু (প্রকাশ না করে) উপেক্ষা করে থাকে। অবশ্যই তোমাদের নিকট আল্লাহর নিকট হতে জ্যোতি ও সুস্পষ্ট কিতাব এসেছে।[2]
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, তারা তাওরাত ও ইঞ্জীলের মধ্যে যে পরিবর্তন ও পরিবর্ধন সাধন করেছে, রসূল (সাঃ) তা উদঘাটন করেছেন এবং যা তারা গোপন করেছিল, তা তিনি প্রকাশ করে দিয়েছেন। যেমন, বিবাহিত ব্যভিচারীকে পাথর ছুঁড়ে মারার শাস্তিকে তারা গোপন করেছিল; যার বিস্তারিত বিবরণ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।
[2] (نُورٌ وَّكِتَابٌ مُبِين) এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা ‘নূর ও কিতাবুন মুবীন’ (জ্যোতি ও সুস্পষ্ট গ্রন্থ) একই সাথে উল্লেখ করেছেন এবং এই দুইয়েরই উদ্দেশ্য হচ্ছে কুরআন কারীম। কেননা এই দুইয়ের মধ্যে وَ সংযোজক অব্যয়টি পাশাপাশি দুই বিশেষ্যের ভিন্নতা বুঝাতে ব্যবহূত হয়নি; বরং অর্থের ভিন্নতা বুঝাতে ব্যবহূত হয়েছে। এই অব্যয়টি আসলে ব্যাখ্যাকারী সংযোজক অব্যয়। যার স্পষ্ট প্রমাণ কুরআনের পরবর্তী আয়াত, যেখানে বলা হচ্ছে يَهدِي بِهِ الله অর্থাৎ তার দ্বারা আল্লাহ হিদায়াত করেন বা সুপথ দেখান। যদি نور ও كتاب আলাদা আলাদা জিনিস হত, তাহলে কুরআনের এই বাক্যটি এইরূপ হত, يَهدِي بِهِمَا الله অর্থাৎ, সর্বনামটি একবচন না হয়ে দ্বিবচন হত (ه) একবচন না হয়ে هما দ্বিবচন হত এবং অনুবাদ ‘এ দ্বারা তিনি তাদেরকে শান্তির পথে পরিচালিত করেন’ না হয়ে) ‘উভয় দ্বারা তিনি তাদেরকে শান্তির পথে পরিচালিত করেন’ হত। কুরআনের এই বাক্য থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ হয়ে গেল যে, ‘নূর’ ও ‘কিতাবে মুবীন’ উভয় থেকে উদ্দেশ্য ‘কুরআন কারীম’। এ নয় যে, ‘নূর’ থেকে উদ্দেশ্য মুহাম্মাদ (সাঃ) আর ‘কিতাবে মুবীন’ থেকে উদ্দেশ্য কুরআন মাজীদ; যেমনটি বিদআত পন্থীদের ধারণা; যারা এই আকীদায় বিশ্বাসী যে, মুহাম্মাদ (সাঃ) আল্লাহর নূরের অংশ বিশেষ এবং যারা অস্বীকার করে যে, তিনি একজন মানুষ। (অথচ ‘নূর’ বলতে যে কুরআনকে বুঝানো হয়েছে, তার প্রমাণ রয়েছে সূরা তাগাবুনের ৮নং আয়াতে। সেখানে মহান আল্লাহ বলেন, {فَآمِنُوا بِاللهِ وَرَسُولِهِ وَالنُّورِ الَّذِي أَنزَلْنَا} অর্থাৎ, সুতরাং তোমরা ঈমান আনয়ন কর আল্লাহর প্রতি, তাঁর রসূলের প্রতি এবং সেই ‘নূর’ বা জ্যোতির প্রতি, যা আমি অবতীর্ণ করেছি।) অনুরূপ এই মনগড়া আকীদাকে সাব্যস্ত করার উদ্দেশ্যে তারা একটি হাদীসও বর্ণনা করে থাকে, "আল্লাহ সর্বপ্রথম নবী (সাঃ)-এর নূরকে সৃষ্টি করেন, তারপর তাঁর নূর থেকে সারা জগৎ সৃষ্টি করেন।" অথচ নির্ভরযোগ্য কোন হাদীসগ্রন্থে এই হাদীসটির উল্লেখ নেই। উপরন্তু এই হাদীসটি ঐ সহীহ হাদীসের পরিপন্থী, যাতে আল্লাহর রসূল (সাঃ) বলেছেন, إن أول ماخلق الله القلم অর্থাৎ, সর্বপ্রথম আল্লাহ যা সৃষ্টি করেন, তা হল কলম। (তিরমিযী ও আবু দাউদ) (এ যুগের শ্রেষ্ঠ) মুহাদ্দিস আল্লামা আলবানী (রঃ) বলেন, হাদীসটি নিঃসন্দেহে সহীহ এবং এটি সেই প্রসিদ্ধ হাদীস বাতিল হওয়ার প্রকাশ্য প্রমাণ, যাতে বলা হয়েছে, ‘‘আল্লাহ সর্বপ্রথম তোমার নবীর নূরকে সৃষ্টি করেছেন হে জাবের!’’ (হাদীসটি বাতিল। দেখুনঃ তা’লীক্বাতে মিশকাত ১/৩৪)
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১৫-১৬ নং আয়াতের তাফসীর:
আহলে কিতাবদের থেকে প্রতিশ্রুতি গ্রহণ ও তাদের দ্বারা সে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের কথা আলোচনা করার পর তাদেরকে সম্বোধন করে আল্লাহ তাআলা বলেন: আমি নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে আরব, অনারব, আহলে কিতাব ও নিরক্ষর সকলের জন্য নাবী হিসেবে প্রেরণ করেছি। তাঁকে সুষ্পষ্ট প্রমাণ ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে প্রেরণ করেছি। সুতরাং তোমরা তাঁর প্রতি ঈমান আনবে। তোমাদেরকে যে কিতাব দেয়া হয়েছে তা থেকে যা গোপন করেছ, তিনি তার অনেক বর্ণনা করে দেবেন, যেমন বিবাহিত ব্যভিচারীকে পাথর মেরে হত্যা করা ইত্যাদি। তবে অধিকাংশই ক্ষমা করে দেবেন। এটা হল নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও নবুওয়াতের সত্যতার অকাট্য প্রমাণ।
(نُوْرٌ وَّكِتٰبٌ مُّبِيْنٌ)
‘জ্যোতি ও স্পষ্ট কিতাব’এখানে نُوْرٌ (আলো) ও وَّكِتٰبٌ مُّبِيْنٌ ( সুস্পষ্ট কিতাব) দ্বারা কুরআনকে বুঝানো হয়েছে। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(فَاٰمِنُوْا بِاللّٰهِ وَرَسُوْلِه۪ وَالنُّوْرِ الَّذِيْٓ أَنْزَلْنَا)
“অতএব তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের এবং যে জ্যোতি আমি অবতীর্ণ করেছি তাতে বিশ্বাস স্থাপন কর।” (সূরা তাগাবুন ৬৪:৮, তাফসীরে সা‘দী, পৃঃ ২১৪)
এ জ্যোতিপূর্ণ কুরআন দ্বারা আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে হিদায়াত দান করেন যারা আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি কামনা করে এবং শান্তির পথে চলে। অতএব যারা নূর দ্বারা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বুঝায় তাদের ব্যাখ্যা ভুল। আর যারা বলে সর্বপ্রথম আল্লাহ তা‘আলা মুহাম্মাদের নূর সৃষ্টি করেছেন তাও মিথ্যা। কেননা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
أَوَّلُ مَاخَلَقَ اللّٰهُ الْقَلَمَ
আল্লাহ তা‘আলা সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেছেন। (তিরমিযী হা: ২১৫৫, আবূ দাঊদ হা: ৪৭০০, সহীহ )।
“আল্লাহ তা‘আলা সর্বপ্রথম মুহাম্মাদের নূর সৃষ্টি করেছেন” এ মর্মে হাদীসটি বানোয়াট। (তালীকাতে মিশকাত ১/৩৪, মেরকাতুল মাফাতিহ ১/৩৮৭)
নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একজন মাটির তৈরি রক্ত মাংসে গড়া মানুষ। তিনি আবদুল্লাহর ঔরসে আমিনার গর্ভে জন্ম লাভ করেছেন। শুধু পার্থক্য এই যে, তিনি রাসূল, তাঁর নিকট ওয়াহী আসে আর সাধারণ মানুষের নিকট ওয়াহী আসে না, যার ফলে তাঁর মর্যাদা অনেক ঊর্ধ্বে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(قُلْ إِنَّمَآ أَنَا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ يُوْحٰٓي إِلَيَّ أَنَّمَآ إلٰهُكُمْ إِلٰهٌ وَّاحِدٌ)
“বল: ‘আমি তো তোমাদের মতই একজন মানুষ, আমার প্রতি প্রত্যাদেশ হয় যে, তোমাদের ইলাহ্ কেবল এক ইলাহ্।”(সূরা কাহফ ১৮:১১০)
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. আহলে কিতাবদেরকে ইসলামের দিকে আল্লাহ তা‘আলা আহ্বান জানিয়েছেন।
২. আহলে কিতাবগণ অনেক শরয়ী বিধানকে গোপন করেছিল তা প্রকাশিত হয়েছে কুরআনে।
৩. নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সারা পৃথিবীর সকল মানব ও দানবের রাসূল, তাঁর প্রতি ঈমান আনা সকলের জন্য আবশ্যক।
৪. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের মত আদম সন্তান ও মাটির তৈরি মানুষ।
৬. হিদায়াত প্রার্থীদের আল্লাহ তা‘আলা হিদায়াত দেন।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১৫-১৬ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তিনি স্বীয় উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে হিদায়াত ও দ্বীনে হকসহ সমস্ত মাখলুকের নিকট পাঠিয়েছেন। মুজিযা ও উজ্জ্বল প্রমাণাদি তাঁকে দান করেছেন। যে কথাগুলো ইয়াহূদ ও নাসারাগণ বদলিয়ে দিয়েছিল, ভুল ব্যাখ্যা করে অন্য অর্থ বানিয়ে নিয়েছিল, আল্লাহর সত্তার উপর অপবাদ দিয়েছিল, কিতাবুল্লাহর যে অংশটি তাদের জীবনের প্রতিকুল ছিল তা তারা গোপন করে দিয়েছিল। ঐ সব কিছুই এ রাসূল (সঃ) প্রকাশ করে দেন। তবে যেগুলো বর্ণনা করার কোন প্রয়োজন। নেই সেগুলো তিনি বর্ণনা করেন না। মুসতাদরিকে হাকিম গ্রন্থে রয়েছে যে, যে ব্যক্তি রজম বা ব্যভিচারীকে পাথর মেরে হত্যা করার মাসআলাকে অস্বীকার করলো সে অজ্ঞতা বশতঃ কুরআন কারীমকে অস্বীকার করলো। কেননা,এ আয়াতে ঐ রজমকেই গোপন করার উল্লেখ রয়েছে। (ইবনে জারীর (রঃ) তাখরীজ করেছেন যে, ইয়াহূদীরা নবী (সঃ)-এর কাছে এসে রজম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি তাদেরকে বললেনঃ “তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় পণ্ডিত কে?' তারা ইঙ্গিতে ইবনে সুরিয়াকে দেখালো। তখন তিনি তাকে সেই আল্লাহর কসম দিলেন যিনি হযরত মূসা (আঃ)-এর উপর তাওরাত অবতীর্ণ করেছিলেন এবং বানী ইসরাঈলের উপর তুর পাহাড় ও অঙ্গীকার তুলে ধরেছিলেন। তখন সে বললোঃ “যখন আমাদের মধ্যে ব্যভিচার ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লো তখন ব্যভিচারের শাস্তি হিসেবে একশ চাবুক মারার ও মাথা মুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেয়া হয়।” একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের উপর রজমের বিধান জারী করেন। সে সময় আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন)
এরপর মহান আল্লাহ কুরআন কারীম সম্পর্কে বলেন যে, তিনিই তাঁর প্রিয় নবী (সঃ)-এর উপর তার এ কিতাব অবতীর্ণ করেছেন, যা সত্য সন্ধানীদেরকে শান্তির পথ দেখিয়ে দেয়, লোকদেরকে অন্ধকার থেকে আলোকের দিকে নিয়ে আসে এবং তাদেরকে সরল সঠিক পথ প্রদর্শন করে। এ কিতাবের কারণে আল্লাহর নিয়ামতসমূহ লাভ করা এবং তার শাস্তি হতে রক্ষা পাওয়া খুবই সহজ। এটা ভ্রান্তিকে বিদূরিতকারী এবং হিদায়াতকে প্রকাশকারী।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।