আল কুরআন


সূরা আল-মায়েদা (আয়াত: 12)

সূরা আল-মায়েদা (আয়াত: 12)



হরকত ছাড়া:

ولقد أخذ الله ميثاق بني إسرائيل وبعثنا منهم اثني عشر نقيبا وقال الله إني معكم لئن أقمتم الصلاة وآتيتم الزكاة وآمنتم برسلي وعزرتموهم وأقرضتم الله قرضا حسنا لأكفرن عنكم سيئاتكم ولأدخلنكم جنات تجري من تحتها الأنهار فمن كفر بعد ذلك منكم فقد ضل سواء السبيل ﴿١٢﴾




হরকত সহ:

وَ لَقَدْ اَخَذَ اللّٰهُ مِیْثَاقَ بَنِیْۤ اِسْرَآءِیْلَ ۚ وَ بَعَثْنَا مِنْهُمُ اثْنَیْ عَشَرَ نَقِیْبًا ؕ وَ قَالَ اللّٰهُ اِنِّیْ مَعَکُمْ ؕ لَئِنْ اَقَمْتُمُ الصَّلٰوۃَ وَ اٰتَیْتُمُ الزَّکٰوۃَ وَ اٰمَنْتُمْ بِرُسُلِیْ وَ عَزَّرْتُمُوْهُمْ وَ اَقْرَضْتُمُ اللّٰهَ قَرْضًا حَسَنًا لَّاُکَفِّرَنَّ عَنْکُمْ سَیِّاٰتِکُمْ وَ لَاُدْخِلَنَّکُمْ جَنّٰتٍ تَجْرِیْ مِنْ تَحْتِهَا الْاَنْهٰرُ ۚ فَمَنْ کَفَرَ بَعْدَ ذٰلِکَ مِنْکُمْ فَقَدْ ضَلَّ سَوَآءَ السَّبِیْلِ ﴿۱۲﴾




উচ্চারণ: ওয়া লাকাদ আখাযাল্লা-হু মীছা-কা বানী ইসরাঈলা ওয়া বা‘আছনামিনহুমুছনাই ‘আশারা নাকীবাওঁ ওয়া কা-লাল্লা-হু ইন্নী মা‘আকুম লাইন আকামতুমুসসালা-তা ওয়া আ-তাইতুমুযযাকা-তা ওয়া আ-মানতুম বিরুছুলী ওয়া আযযারতুমূহুম ওয়া আকরাদতুমুল্লা-হা কারদান হাছানাল লাউকাফফিরান্না ‘আনকুম ছাইয়িআ-তিকুম ওয়ালা উদখিলান্নাকুম জান্না-তিন তাজরী মিন তাহতিহাল আনহা-রু ফামান কাফারা বা‘দা যা-লিকা মিনকুম ফাকাদ দাল্লা ছাওয়াআছছাবীল।




আল বায়ান: আর অবশ্যই আল্লাহ বনী ইসরাঈলের অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন এবং আমি তাদের মধ্য থেকে বার জন দলনেতা পাঠিয়েছিলাম এবং আল্লাহ বলেছিলেন, নিশ্চয় আমি তোমাদের সাথে আছি, যদি তোমরা সালাত কায়েম কর, যাকাত দাও, আমার রাসূলদের প্রতি ঈমান আন, তাদেরকে সহযোগিতা কর এবং আল্লাহকে উত্তম ঋণ দাও, তবে নিশ্চয় আমি তোমাদের থেকে তোমাদের পাপসমূহ মুছে দেব। আর অবশ্যই তোমাদেরকে প্রবেশ করাব জান্নাতসমূহে, যার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হবে নদীসমূহ। তোমাদের মধ্য থেকে এরপরও যে কুফরী করেছে, সে অবশ্যই সোজা পথ হারিয়েছে।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১২. আর অবশ্যই আল্লাহ বনী ইসরাঈলের অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন এবং আমরা তাদের মধ্য থেকে বারজন দলনেতা পাঠিয়েছিলাম। আর আল্লাহ বলেছিলেন, নিশ্চয় আমি তোমাদের সংগে আছি; তোমরা যদি সালাত কায়েম কর, যাকাত দাও, আমার রাসূলগণের প্রতি ঈমান আন, তাদেরকে সম্মান-সহযোগিতা কর এবং আল্লাহকে উত্তম ঋণ প্রদান কর, তবে আমি তোমাদের পাপ অবশ্যই মোচন করব এবং অবশ্যই তোমাদেরকে প্রবেশ করাব জান্নাতসমূহে, যার পাদদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত। এর পরও কেউ কুফরী করলে সে অবশ্যই সরল পথ হারাবে।




তাইসীরুল ক্বুরআন: আল্লাহ বানী ইসরাঈলের নিকট থেকে প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছিলেন, আর তাদের মধ্যে বারজন প্রধান নিযুক্ত করেছিলেন। আর আল্লাহ বলেছিলেন, আমি তোমাদের সঙ্গে আছি, যদি তোমরা নামায কায়িম কর, যাকাত আদায় কর এবং আমার রসূলগণের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর আর তাদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা কর আর আল্লাহকে ঋণ দান কর উত্তম ঋণ, তাহলে আমি তোমাদের পাপগুলো অবশ্য অবশ্যই দূর করে দেব, আর অবশ্য অবশ্যই তোমাদেরকে জান্নাতে দাখিল করাব যার নিম্নে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত। এরপরও তোমাদের মধ্যে যারা কুফুরী করবে তারা সত্য সঠিক পথ হারিয়ে ফেলবে।




আহসানুল বায়ান: (১২) নিশ্চয় আল্লাহ বনী-ইস্রাঈলের অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন[1] এবং তাদের মধ্য হতে বারো জন নেতা নিযুক্ত করেছিলেন[2] আর বলেছিলেন, ‘আমি তোমাদের সঙ্গে আছি, তোমরা যদি নামায পড়, যাকাত দাও, আর আমার রসূলগণকে বিশ্বাস কর ও তাদেরকে সাহায্য কর এবং আল্লাহকে উত্তম ঋণ প্রদান কর, তাহলে তোমাদের পাপরাশি অবশ্যই মোচন করব এবং নিশ্চয় তোমাদেরকে বেহেশ্তে প্রবেশাধিকার দান করব; যার পাদদেশে নদীমালা প্রবাহিত। এর পরও তোমাদের মধ্যে যে অবিশ্বাস করবে সে সরল পথ হারাবে।’



মুজিবুর রহমান: আর আল্লাহ বানী ইসরাঈলের নিকট থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন, আমি তাদের মধ্য হতে বারো জন দলপতি নিযুক্ত করেছিলাম; এবং আল্লাহ বলেছিলেনঃ আমি তোমাদের সাথে রয়েছি, যদি তোমরা সালাত সুপ্রতিষ্ঠিত কর ও যাকাত দিতে থাক এবং আমার রাসূলদের উপর ঈমান আন ও তাদেরকে সাহায্য কর এবং আল্লাহকে উত্তমরূপে কর্জ দিতে থাক; তাহলে আমি অবশ্যই তোমাদের পাপগুলি তোমাদের থেকে মুছে দিব এবং অবশ্যই তোমাদেরকে এমন উদ্যানসমূহে দাখিল করব যার তলদেশে নহরসমূহ বইতে থাকবে, অতঃপর যে ব্যক্তি এরপরও কুফরী করবে, নিশ্চয়ই সে সোজা পথ থেকে দূরে সরে পড়ল।



ফযলুর রহমান: আল্লাহ বনী ইসরাঈল (ইহুদিদের) থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন। আর আমি তাদের মধ্য থেকে বার জন নেতা নিযুক্ত করেছিলাম। আল্লাহ বলেছিলেন, “আমি তোমাদের সাথেই আছি। যদি তোমরা নামায কায়েম করো, যাকাত দান করো, আমার রসূলদেরকে বিশ্বাস করো ও তাদেরকে সাহায্য করো এবং আল্লাহকে একটি উত্তম ঋণ দাও তাহলে আমি তোমাদের পাপসমূহ মোচন করে দেব এবং তোমাদেরকে সেই জান্নাতে স্থান দেব যার তলদেশ দিয়ে নদী প্রবাহিত হয়। কিন্তু এর পরও তোমাদের মধ্যে যে কুফরি করবে সে অবশ্যই সরল পথ থেকে বিচ্যুত হবে।”



মুহিউদ্দিন খান: আল্লাহ বনী-ইসরাঈলের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন এবং আমি তাদের মধ্য থেকে বার জন সর্দার নিযুক্ত করেছিলাম। আল্লাহ বলে দিলেনঃ আমি তোমাদের সঙ্গে আছি। যদি তোমরা নামায প্রতিষ্ঠিত কর, যাকাত দিতে থাক, আমার পয়গম্বরদের প্রতি বিশ্বাস রাখ, তাঁদের সাহায্য কর এবং আল্লাহকে উত্তম পন্থায় ঋন দিতে থাক, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের গোনাহ দুর করে দিব এবং অবশ্যই তোমাদেরকে উদ্যান সমূহে প্রবিষ্ট করব, যেগুলোর তলদেশ দিয়ে নিঝরিনীসমূহ প্রবাহিত হয়। অতঃপর তোমাদের মধ্য থেকে যে ব্যক্তি এরপরও কাফের হয়, সে নিশ্চিতই সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে।



জহুরুল হক: আর আল্লাহ্ অবশ্যই ইসরাইলের বংশধর থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন, আর আমরা তাদের মধ্যে থেকে বারো জন দলপতি দাঁড় করিয়েছিলাম। আর আল্লাহ্ বলেছিলেন -- "নিঃসন্দেহ আমি তোমাদের সঙ্গে রয়েছি। যদি তোমরা নামায কায়েম করো ও যাকাত আদায় করো, আর আমার রসূলদের প্রতি ঈমান আনো ও তাঁদের সমর্থন করো, আর আল্লাহ্‌কে ধার দাও পর্যাপ্ত-সুন্দর ঋণ, তবে আমি নিশ্চয়ই তোমাদের থেকে তোমাদের সব পাপ মোছে দেব ও তোমাদের প্রবেশ করাবো উদ্যানসমূহে যাদের নীচ দিয়ে বয়ে চলেছে ঝরনারাজি। কিন্তু এর পরে তোমাদের মধ্যের যে কেউ অবিশ্বাস পোষণ করবে সে-ই তবে নিশ্চয়ই সরল পথের দিশা হারিয়েছে।"



Sahih International: And Allah had already taken a covenant from the Children of Israel, and We delegated from among them twelve leaders. And Allah said, "I am with you. If you establish prayer and give zakah and believe in My messengers and support them and loan Allah a goodly loan, I will surely remove from you your misdeeds and admit you to gardens beneath which rivers flow. But whoever of you disbelieves after that has certainly strayed from the soundness of the way."



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১২. আর অবশ্যই আল্লাহ বনী ইসরাঈলের অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন এবং আমরা তাদের মধ্য থেকে বারজন দলনেতা পাঠিয়েছিলাম। আর আল্লাহ বলেছিলেন, নিশ্চয় আমি তোমাদের সংগে আছি; তোমরা যদি সালাত কায়েম কর, যাকাত দাও, আমার রাসূলগণের প্রতি ঈমান আন, তাদেরকে সম্মান-সহযোগিতা কর এবং আল্লাহকে উত্তম ঋণ প্রদান কর, তবে আমি তোমাদের পাপ অবশ্যই মোচন করব এবং অবশ্যই তোমাদেরকে প্রবেশ করাব জান্নাতসমূহে, যার পাদদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত। এর পরও কেউ কুফরী করলে সে অবশ্যই সরল পথ হারাবে।


তাফসীর:

-


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১২) নিশ্চয় আল্লাহ বনী-ইস্রাঈলের অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন[1] এবং তাদের মধ্য হতে বারো জন নেতা নিযুক্ত করেছিলেন[2] আর বলেছিলেন, ‘আমি তোমাদের সঙ্গে আছি, তোমরা যদি নামায পড়, যাকাত দাও, আর আমার রসূলগণকে বিশ্বাস কর ও তাদেরকে সাহায্য কর এবং আল্লাহকে উত্তম ঋণ প্রদান কর, তাহলে তোমাদের পাপরাশি অবশ্যই মোচন করব এবং নিশ্চয় তোমাদেরকে বেহেশ্তে প্রবেশাধিকার দান করব; যার পাদদেশে নদীমালা প্রবাহিত। এর পরও তোমাদের মধ্যে যে অবিশ্বাস করবে সে সরল পথ হারাবে।’


তাফসীর:

[1] যখন আল্লাহ তাআলা মুমিন বান্দাদেরকে ঐ অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করলেন, যা তিনি তাঁর রসূল (সাঃ)-এর মারফৎ গ্রহণ করেছেন। আর তাদেরকে হক প্রতিষ্ঠা ও ন্যায্য সাক্ষী প্রদানের নির্দেশ দিলেন এবং তাঁদেরকে তাঁর ঐ সকল পুরস্কার ও অনুগ্রহের কথা স্মরণ করালেন, যা তাঁদের জীবনে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্যভাবে প্রকাশ পেয়েছে; বিশেষ করে এই অনুগ্রহ যে, তিনি তাঁদেরকে সত্য ও সঠিক পথে চলার তওফীক দান করেছেন। তখন এই স্থানে ঐ অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করা হচ্ছে, যা ইতিপূর্বে বানী ইস্রাঈলের নিকট থেকে গ্রহণ করা হয়েছিল এবং যা পূরণ করতে তারা অকৃতকার্য প্রমাণিত হয়েছিল। এ যেন পরোক্ষভাবে মুসলিমদেরকে সতর্ক করা হচ্ছে যে, তোমরা যেন বানী ইস্রাঈলের ন্যায় অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ শুরু করে না দাও।

[2] এটি ঐ সময়কার ঘটনা, যখন মূসা (আঃ) দুর্দান্ত জাতি আমালেকাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন তিনি নিজ জাতির বারটি গোত্রের জন্য একজন করে দলপতি নির্বাচন করেন। যাতে তারা তাদের স্বগোত্রের লোকদেরকে যুদ্ধের জন্য পূর্ণরূপে প্রস্ত্তত করে, তাদের নেতৃত্ব ও পরিচালনার দায়িত্বও পালন করে এবং তাদের অন্যান্য ব্যাপারেও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় অগ্রণীর ভূমিকা গ্রহণ করে।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১২ নং আয়াতের তাফসীর:



পূর্বের আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদেরকে সেসব অঙ্গীকার ও প্রতিশ্র“তি পূর্ণ করার প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন, যা তিনি রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মাধ্যমে গ্রহণ করেছেন। আর তাদেরকে হক প্রতিষ্ঠা ও ন্যায্য সাক্ষ্য প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন এবং তাদেরকে তাঁর ঐ সকল পুরস্কার ও অনুগ্রহের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যা প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে প্রদান করেছেন।



অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা ঐ অঙ্গীকার ও প্রতিশ্র“তির কথা উল্লেখ করেছেন যা ইতোপূর্বে বানী ইসরাঈলদের থেকে গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তারা আল্লাহ তা‘আলার সাথে অঙ্গীকারাবদ্ধ হওয়ার পরেও তা পূর্ণ করতে ব্যর্থ হয়েছিল। এখানে পরোক্ষভাবে মুসলিমদেরকে সতর্ক করা হচ্ছে যে, তোমরা যেন বানী ইসরাঈলের মত অঙ্গীকার ভঙ্গ না কর। তাহলে তাদের ওপর যে আপদ আপতিত হয়েছিল, তোমাদের ওপরও তা বর্তাবে।



বানী ইসরাঈলের জন্য আল্লাহ তা‘আলা বারজন নেতা নিযুক্ত করেছিলেন। এ বারজনের নাম তাফসীর ইবনু কাসীরসহ অন্যান্য গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে। আমাদের নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন আকাবায় আনসারীদের থেকে বায়আত গ্রহণ করেন তখনও বারজন নেতা ছিল। (ইবনু হিশাম ২/৫২-৫৬)



বিশিষ্ট তাবেয়ী মাসরুক (রহঃ) বলেন: একদা আমরা আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদের সাথে বসেছিলাম, তিনি আমাদেরকে কুরআন তেলাওয়াত করে শুনাচ্ছিলেন। তাঁকে জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল: হে আবূ আব্দুর রহমান! আপনারা কি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কত জন খলীফা এ উম্মাতের দায়িত্ব নেবে। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ বললেন: ইরাক আগমনের পর তুমি ছাড়া অন্য কেউ এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেনি। হ্যাঁ, আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেছি, তিনি বলেছেন: বানী ইসরাঈলদের নেতার মত বার জন। (মুসনাদ আহমাদ হা: ১/৩৯৭)



জাবের (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি: বারজন ব্যক্তি দায়িত্ব না নেয়া পর্যন্ত মানুষের নেতৃত্ব বহাল থাকবে। তারপর নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চুপিসারে কিছু কথা বললেন যা আমার কাছে অস্পষ্ট থেকে গেল। আমার পিতাকে জিজ্ঞাসা করলাম, নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কী বললেন? তিনি বললেন: সবাই কুরাইশ থেকে হবেন। (সহীহ বুখারী হা: ৭২২২) তবে এ হাদীস দ্বারা শিয়ারা দলীল দিয়ে বলে যে, এতে তাদের বারজন ইমামকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে। তাদের এ দাবী ভিত্তিহীন।



(اِنِّیْ مَعَکُمْ)



‘আমি তোমাদের সঙ্গে আছি’ তারপর আল্লাহ তা‘আলা ঐসব নেতাদেরকে জানিয়ে দিলেন যে, তিনি তাঁর প্রত্যক্ষ সাহায্য ও সহযোগিতা দ্বারা তাদের সাথে রয়েছেন। মহান আল্লাহ স্ব-স্বত্ত্বায় আরশের উপর রয়েছেন। আর দর্শন, শ্রবণ, জ্ঞান, ক্ষমতা ও সাহায্য-সহযোগিতার মাধ্যমে বান্দার সাথে রয়েছেন। মহান আল্লাহর বান্দার সাথে থাকা দু’ প্রকার- (১) সাধারণভাবে সকলের সাথে থাকেন (২) বিশেষ ব্যক্তি ও গুণের অধিকারীদের সাথে থাকেন।



(১) সাধারণভাবে সকলের সাথে থাকেন- এ অর্থ হল আল্লাহ তা‘আলা তাঁর জ্ঞান, দর্শন, শ্রবণ ও ক্ষমতা ইত্যাদির মাধ্যমে সব কিছু বেষ্টন করে আছেন। তাঁর সারা মাখলূকাতে কী হচ্ছে সব কিছু একই সাথে দেখেন, শুনেন ও জানেন। এমনকি একটি কালো পিপীলিকা গভীর রাতে কালো পাথরের নিচে চলাচল করলেও মহান আল্লাহ তা দেখেন, তার পায়ের শব্দ শুনেন এবং সে পিপীলিকার চলাচল সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন। কোন কিছু আল্লাহ তা‘আলার কাছে অস্পষ্ট নয়। সুতরাং এ অর্থে আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেক জীব-জন্তু, মু’মিন-কাফির, সৎ-অসৎ সবার সাথে রয়েছেন। এ ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَھُوَ مَعَکُمْ اَیْنَ مَا کُنْتُمْ وَاللہُ بِمَا تَعْمَلُوْنَ بَصِیْرٌ)



“তোমরা যেখানেই থাক না কেন তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন, তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ তা দেখেন।” (সূরা হাদীদ ৫৭:৪)



(২) বিশেষ ব্যক্তি ও গুণের অধিকারীদের সাথে থাকেন- অর্থাৎ যারা আল্লাহর প্রিয়পাত্র তাদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা দানের মাধ্যমে তাদের সাথে রয়েছেন। যেমন মুত্তাকি ও ধৈর্যশীলদের সাথে আল্লাহ আছেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন:



(إِنَّ اللہَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ)



আল্লাহ তাদেরই সঙ্গে আছেন যারা তাক্ওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎ কর্মপরায়ণ। (সূরা নাহল ১৬:১২৮) অত্র আয়াত এ অর্থেই ব্যবহার হয়েছে।



নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও আবূ বকর (রাঃ) হিজরতের সময় যখন গারে ছূরে ছিলেন তখন আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে বলেন:



(إِذْ هُمَا فِي الْغَارِ إِذْ يَقُوْلُ لِصَاحِبِه۪ لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللہَ َ مَعَنَا)



‘যখন তারা উভয়ে গুহার মধ্যে ছিল; সে তখন তার সঙ্গীকে বলেছিল, ‘চিন্তা কর না, আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।’(সূরা তাওবা ৯:৪০) এখানে নিরাপত্তা ও সাহায্য প্রদানের মাধ্যমে সাথে রয়েছেন।



মূসা ও হারুন (আঃ) কে যখন ফির‘আউনের কাছে দাওয়াত নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন তখন তাঁরা উভয়ে গ্রেফতারের আশংকা করলেন, তখন তাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(قَالَ لَا تَخَافَآ إِنَّنِيْ مَعَكُمَآ أَسْمَعُ وَأَرٰي )



‘তিনি বললেন: ‘তোমরা ভয় কর না, আমি তোমাদের সঙ্গে আছি, আমি শুনি ও আমি দেখি।’(ত্বহা ২০:৪৬)



আল্লাহ তা‘আলা ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন, যেমন তিনি বলেন:



(وَاصْبِرُوْا ط إِنَّ اللہَ مَعَ الصّٰبِرِيْنَ)



“তোমরা ধৈর্য ধারণ কর; নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন।”(সূরা নাহল ১৬:১২৬)



সুতরাং আল্লাহ তা‘আলার বান্দার সাথে থাকার অর্থ এই নয় যে, তিনি স্ব-স্বত্তায় প্রত্যেকের সাথে রয়েছেন। যেমন কতক গোমরাহ ব্যক্তিরা বলে থাকে- যত কল্লা তত আল্লাহ। বরং আল্লাহ তা‘আলা স্ব-সত্তায় আরশের উপর থেকে তাঁর জ্ঞান, দর্শন ও শ্রবণ দ্বারা প্রত্যেকের সাথে রয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা আরশে রয়েছে এ কথা যেমন কুরআন ও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত তেমনি তিনি সবার সাথে রয়েছেন এ কথাও প্রমাণিত। সুতরাং আল্লাহ তা’আলার এ সকল গুণকে অস্বীকার করা ও অপব্যাখ্যা করার কোন সুযোগ নেই। আল্লাহ তা’আলা প্রতিশ্রুতি দিলেন যদি তোমরা সালাত কায়েম কর, যাকাত প্রদান কর, রাসূলদের প্রতি ঈমান আন, তাদেরকে সহযোগিতা কর এবং আল্লাহ তা‘আলাকে খুশি করার জন্য তাঁর পথে ব্যয় কর, তাহলে অবশ্যই তিনি জান্নাত দেবেন। আর কুফরী করলে জাহান্নাম ছাড়া কিছুই নেই।



আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. বানী ঈসরাঈলরা আল্লাহ তা‘আলার সাথে কৃত অঙ্গীকার পালন না করার কারণে শাস্তির মুখোমুখি হয়েছিল। এদের থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়া উচিত।

২. সৎ আমল জান্নাতে যাওয়ার অন্যতম একটি ওসীলা ।

৩. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সম্মান ও সহযোগিতা করা ঈমানের দাবী।

৪. আয়াতে বর্ণিত বিধান পালন করলে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সহযোগিতা ও সাহায্য প্রদান করবেন।

৫. আল্লাহ তা‘আলা স্ব-স্বত্ত্বায় আরশের ওপর থেকে তাঁর দর্শন, শ্রবণ, জ্ঞান ও ক্ষমতার দ্বারা প্রত্যেকের সাথে রয়েছেন।

৬. আল্লাহ তা‘আলা স্ব-স্বত্ত্বায় সর্বত্র বিরাজমান- এটি একটি শিরকী ও কুফরী আকীদাহ।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১২-১৪ নং আয়াতের তাফসীর:

উপরের আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মুমিন বান্দাদেরকে অঙ্গীকার পুরো করা, সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা এবং ন্যায়ের সাথে সাক্ষ্য দেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সাথে সাথে প্রকাশ্য ও গোপনীয় নিয়ামতগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। এখন এ আয়াতগুলোতে তাদের পূর্ববর্তী আহলে কিতাবের নিকট হতে গ্রহণকৃত অঙ্গীকারের হাকীকত ও অবস্থা বর্ণনা করছেন। তারপর তারা যখন আল্লাহর সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গ করে দেয় তখন তাদের পরিণাম কি হলো তা বর্ণনা করে মুসলমানদেরকে অঙ্গীকার ভঙ্গ করা থেকে বিরত রাখছেন। তাদের বারোজন সর্দার ছিল অর্থাৎ গোত্রের বারোজন চৌধুরী ছিল যারা তাদের নিকট বায়আত গ্রহণ করতো যে, তারা যেন আল্লাহর এ রাসূলের আদেশ-নিষেধ মেনে চলে এবং আল্লাহর কিতাবের অনুসরণ করে। হযরত মূসা (আঃ) যখন অবাধ্যদের সাথে যুদ্ধ করার জন্যে গমন করেন তখন তিনি প্রত্যেক গোত্রের নেতা হতে একজন করে সর্দার নির্বাচন করে যান। (১) আদবীল গোত্রের নেতা ছিল শামুন ইবনে আকওয়ান, (২) শামউনের চৌধুরী ছিল শাফাত ইবনে জাদ্দী, (৩) ইয়াহুদার নেতা ছিল কালিব ইবনে ইউফনা, (৪) ফীখাইলের নেতা ছিল ইবনে ইউসুফ, (৫) ইফরাঈমের সর্দার ছিল ইউশা ইবনে নূন, (৬) বিন ইয়ামীন গোত্রের চৌধুরী ছিল কিতাতামী ইবনে ওয়াফুন, (৭) যাবুকূনের সর্দার ছিল জাদ্দী ইবনে শূরী, (৮) মিনশারীর নেতা ছিল হদ্দিী ইবনে সূফী, (৯) দান আমলাসিলের সর্দার ছিল ইবনে হামল, (১০) আশা গোত্রের সর্দার ছিল সাতুর, (১১) নাফতালীর সর্দার ছিল বাহর, (১২) ইয়াখারার গোত্রের নেতা ছিল লাবিল। তাওরাতের ৪র্থ খণ্ডে বানূ ইসরাঈলের গোত্রগুলোর সর্দারদের নাম উল্লিখিত রয়েছে। ঐ নামগুলো এবং এ নামগুলোর মধ্যে কিছু গরমিল দেখা যায়। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।

বর্তমান তাওরাতের নামগুলো নিম্নরূপঃ

(১) বান্ আদবীল গোত্রের নেতা সুফী ইবনে সাদুন, (২) বান্ শামউনের সর্দার শামওয়াল ইবনে সূর, (৩) বানূ ইয়াহুদার সর্দার হাশূর ইবনে উমাইয়াযার, (৪) বানূ ইয়াসখারের নেতা শাল ইবনে সাউন, (৫) বান্ যাবুর নেতা আলাইয়াব ইবনে হাল্ব, (৬) বানূ ফারাইয়ামের সর্দার মিনশা ইবনে গামছুর, (৭) বা মিনশার নেতা হামইয়াঈল, (৮) বান্ বিন ইয়ামীনের নেতা আবদীনা, (৯) বানূ দানের সর্দার জাইযার, (১) বানূ আশারের নেতা নাহাবিল, (১১) বান্ কানের সর্দার সায়েফ ইবনে দাওয়াবীল এবং (১২) বানূ নাফতারীর নেতা আজযা।

এটা স্মরণীয় বিষয় যে, লাইলাতুল আকাবায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন আনসারদের নিকট হতে বায়আত গ্রহণ করেন সে সময় তাদের সর্দারও বারজনই ছিলেন। আউস গোত্রের ছিলেন তিনজন। তাঁরা হলেনঃ (১) হযরত উসায়েদ ইবনে হুযায়ের (রাঃ), (২) হযরত সা'দ ইবনে হালীমা (রাঃ) এবং (৩) হযরত রুফাআ ইবনে আবদুল মুগযির (রাঃ)। অন্য বর্ণনায় হযরত রুফাআর (রাঃ) স্থলে হযরত আবদুল হাইসাম ইবনে তাইহান (রাঃ)-এর নাম রয়েছে। বাকী নয়জন সর্দার ছিলেন খাযরাজ গোত্রের মধ্য হতে। তারা হচ্ছেনঃ (১) আবু উমামাহ আসআদ ইবনে যারারাহ (রাঃ), (২) সা’দ ইবনে রাবী' (রাঃ), (৩) আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ), (৪) রাফি ইবনে মালিক ইবনে আজলান (রাঃ), (৫) বারা ইবনে মারূর (রাঃ), (৬) উবাদাহ ইবনে সামিত (রাঃ), (৭) সা’দ ইবনে উবাদাহ (রাঃ), (৮) আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে হারাম (রাঃ) এবং (৯) মুনযির ইবনে আমর ইবনে খামরাস (রাঃ)। এ সর্দারগণ নিজ নিজ কওমের পক্ষ থেকে শেষ নবী (সঃ)-এর হাতে শ্রবণ করার ও মান্য করার বায়আত গ্রহণ করেন। হযরত মাসরূক (রাঃ) বলেনঃ আমরা। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর পাশে বসেছিলাম। তিনি সে সময় আমাদেরকে কুরআন পাঠ শিক্ষা দিচ্ছিলেন। এমন সময় একটি লোক তাকে জিজ্ঞেস করেন –এ উম্মতের ক’জন খলীফা হবেন এ কথা কি আপনারা নবী (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন? হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ যখন থেকে আমি ইরাকে এসেছি, আপনি ছাড়া আর কেউ আমাকে এটা জিজ্ঞেস করেননি। এ সম্বন্ধে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “বারোজন হবে। বানী ইসরাঈলের দলপতিদেরও এ সংখ্যাই ছিল।'

সনদের দিক দিয়ে এ হাদীসটি গারীব বটে, কিন্তু হাদীসের বিষয়বস্তু সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের বর্ণনা দ্বারাও সাব্যস্ত হয়েছে। হযরত জাবির ইবনে সামরা (রাঃ) বলেন, আমি নবী (সঃ)-কে বলতে শুনেছি- “মানুষের কাজ চলতে থাকবে যে পর্যন্ত তাদের অলী বারোজন হবে। তারপর নবী (সঃ) একটি কথা বলেন যা আমি শুনতে পাইনি। আমি তখন অন্যকে জিজ্ঞেস করি-নবী (সঃ) এখন কি বললেন? তিনি উত্তরে বলেনঃ “তারা সব কুরাইশ হবে।” সহীহ মুসলিমে এ শব্দই রয়েছে। এ হাদীসের ভাবার্থ এই যে, বারোজন সৎ খলীফা হবেন যারা হক প্রতিষ্ঠিত করবেন এবং লোকদের মধ্যে আদল ও ইনসাফ কায়েম করবেন। এর দ্বারা এটা প্রমাণিত হয় না যে, তারা সবাই পর্যাক্রমেই হবেন। তাদের মধ্যে চারজন খলীফা তো পর্যাক্রমেই হয়েছেন। তারা হচ্ছেনঃ হযতর আবু বকর (রাঃ), হযরত উমার (রাঃ), হযরত উসমান (রাঃ) এবং হযরত আলী (রাঃ)। এ চারজন খলীফার খিলাফত নবুওয়াতের তরীকা অনুযায়ীই ছিল। ঐ বারোজন খলীফার মধ্যে পঞ্চম হচ্ছেন

উমার ইবনে আবদুল আযীয। বানূ আব্বাসের মধ্যে কেউ কেউ এরূপ খলীফা ছিলেন। কিয়ামতের পূর্বে এ বারো সংখ্যা পূর্ণ হওয়া অবশ্যই জরুরী। তাঁদের মধ্য হতেই একজন হচ্ছেন ইমাম মাহদী (রঃ), যার সুসংবাদ হাদীসে এসেছে। নবী (সঃ)-এর নামে তাঁর নাম হবে এবং নবী (সঃ)-এর পিতার নামে তাঁর পিতার নাম হবে। তিনি ভূ-পৃষ্ঠকে আদল ও ইনসাফ দ্বারা পূর্ণ করে দেবেন। অথচ তার পূর্বে পৃথিবী অত্যাচার ও অনাচারে ভরপুর থাকবে। কিন্তু শী আ সম্প্রদায় যে ইমামের জন্যে অপেক্ষমান রয়েছে তিনি সেই ইমাম নন। শী'আদের ঐ ইমামের আসলে তো কোন অস্তিত্বই নেই। এটা তো শুধু তাদের ধারণা ও কল্পনা মাত্র। এ হাদীস শী'আদের বারো ফিরকার ইমামদেরকে বুঝায় না।

এ হাদীসকেই ঐ বারোজন ইমামের উপর মাহমুল করাও শী'আদের ঐ ফিরকার বানানো কথা মাত্র। এটা তো তাদের অজ্ঞতা এবং জ্ঞানের স্বল্পতাই প্রমাণ করে। তাওরাতে হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর শুভ সংবাদের সাথে সাথে লিখিত আছে যে, তাঁর বংশের মধ্যে বারোজন মহান ব্যক্তি হবেন। এর দ্বারাও মুসলমানদের এ বারোজন কুরায়েশী বাদশাহকেই বুঝানো হয়েছে। কিন্তু যেসব ইয়াহূদী মুসলমান হয়েছিল তারা ছিল অন্য। তারা নিজেদের ইসলামে কাঁচা ছিল এবং সাথে সাথে মূখও ছিল। তারা হয় তো শী'আদের কানে এটা কুঁকে দিয়েছিল এবং এর ফলেই তারা মনে করে নিয়েছিল যে, এর দ্বারা বারোজন ইমামকে বুঝানো হয়েছে। নতুবা হাদীসে তো পরিষ্কারভাবে এর উল্টোই বিদ্যমান রয়েছে। এখন ঐ আহাদ ও অঙ্গীকারের আলোচনা করা হচ্ছে যা আল্লাহ তাআলা। ইয়াহূদীদের নিকট গ্রহণ করেছিলেন। সেই অঙ্গীকার এই যে, তারা নামায পড়বে, যাকাত দেবে, আল্লাহর রাসূলদের সত্যতা স্বীকার করবে, তাদের সাহায্য সহানুভূতি করবে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির কাজে নিজেদের মাল খরচ করবে। তারা যদি এ সব কিছু পালন করে তবে আল্লাহর সাহায্য সহায়তা তাদের সাথে থাকবে, তাদের পাপরাশি ক্ষমা করে দেয়া হবে এবং তাদের জান্নাতে প্রবিষ্ট করা হবে। আর তাদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করা হবে এবং তাদের ভয়-ভীতি দূর হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে তারা যদি এ অঙ্গীকারের পরও তা থেকে ফিরে যায় এবং ওগুলো পালন না করে তবে অবশ্যই তারা সত্য পথ থেকে দূরে সরে পড়বে এবং বিভ্রান্ত হয়ে যাবে। সুতরাং হলোও তা-ই। তারা অঙ্গীকার ভেঙ্গে দিলো এবং ওয়াদা খেলাফ করলো। তখন তাদের উপর আল্লাহর লা'নত বর্ষিত হলো, তারা হিদায়াত থেকে দূরে সরে পড়লো, তাদের অন্তর কঠিন হয়ে গেল, তারা ওয়াজ-নসীহতে মোটেই উপকৃত হলো না, তাদের বিবেক-বুদ্ধি বিগড়ে গেল, আল্লাহর কথাকে তারা হেরফের করতে লাগলো এবং ভুল ও মনগড়া ব্যাখ্যা দিতে লাগলো। কালামুল্লাহর প্রকৃত ভাবার্থ যা হবে তা পরিবর্তন করে দিয়ে অন্য ভাবার্থ বুঝতে ও বুঝাতে লাগলো এবং আল্লাহর নাম নিয়ে ঐসব মাসআলা বর্ণনা করতে লাগলো যা আল্লাহ বলেননি। অবশেষে আল্লাহর কিতাব তাদের হাত থেকে ছুটে গেল এবং তারা তা থেকে সম্পূর্ণরূপে বে-আমল হয়ে গেল, আর তার প্রতি অনীহা প্রকাশ করতে লাগলো। দ্বীনের আসল আমল যখন তাদের হাত থেকে ছুটে গেল তখন ফুরূঈ আমল কিরূপে ককূল হতে পারে? আমল ছুটে যাওয়ার কারণে না অন্তর ঠিক থাকলো, না স্বভাব ভাল থাকলো, না আন্তরিকতা রইলো। প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতাকে নিজেদের নীতিতে অভ্যাস বানিয়ে নিলো। আর তারা নবী (সঃ) এবং তাঁর সাহাবীদের বিরোধিতা করতে লাগলো।

নবী (সঃ)-কে বলা হচ্ছে- তুমি তাদেকে ক্ষমা ও মার্জনা করতে থাক। তাদের সাথে এরূপ ব্যবহার করা উত্তম হবে। হযরত উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “যে ব্যক্তি তোমার সাথে আল্লাহর নাফরমানীমূলক ব্যবহার করে, তুমি তাকে আল্লাহর আনুগত্যের প্রতি আহ্বান কর।” এতে যৌক্তিকতা ও পরিণামদর্শিতা এই রয়েছে যে, ফলে সে হয় তো ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়বে এবং আল্লাহ তাকে হিদায়াত নসীব করবেন।

ইরশাদ হচ্ছে-আল্লাহ সৎকর্মশীদের ভালবাসেন। অর্থাৎ যারা অপরের দুর্ব্যবহার ক্ষমা করতঃ তার সাথে সৎ ব্যবহার করে, এরূপ লোককে আল্লাহ খুবই ভালবাসেন। কাতাদাহ্ (রঃ) বলেন যে, দুর্ব্যবহারকারীকে ক্ষমা করে দেয়ার হুকুম জিহাদের আয়াত দ্বারা মানসূখ বা রহিত হয়ে গেছে।

ঘোষণ করা হচ্ছে-খ্রীষ্টানদের নিকট থেকেও আমি অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলাম যে, তারা আমার প্রেরিত রাসূল (সঃ)-এর উপর ঈমান আনবে, তাঁকে সাহায্য করবে এবং তার আনুগত্য স্বীকার করবে। কিন্তু ইয়াহূদীদের মত তারাও অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে। এর শাস্তি স্বরূপ আমি তাদের পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি করে দিয়েছি এবং তা কিয়ামত পর্যন্ত জারী থাকবে। তারা আজ দলে দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একদল অপর দলকে কাফির ও অভিশপ্ত বলছে এবং নিজেদের উপাসনালয়েও আসতে দেয় না। মালেকিয়াহ দল ইয়াকুবিয়্যাহ দলকে খোলাখুলিভাবে কাফির বলছে। এরূপ সমস্ত দলই করতে রয়েছে।

আল্লাহ পাক বলেনঃ অচিরেই আল্লাহ তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে সংবাদ দেবেন। এ কথা দ্বারা খ্রীষ্টানদেরকে শাস্তির ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে। কেননা, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর মিথ্যা আরোপ করেছে। তারা মহান আল্লাহর স্ত্রী ও সন্তান সাব্যস্ত করেছে (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক)। কিয়ামতের দিন তাদেরকে কঠিনভাবে পাকড়াও করা হবে। আল্লাহ তো হচ্ছেন এক ও অদ্বিতীয়, তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন। তাঁর কোন সন্তান নেই এবং তিনিও কারও সন্তান নন। আর তাঁর সমতুল্য ও সমকক্ষ কেউই নেই।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।