আল কুরআন


সূরা আল-মায়েদা (আয়াত: 11)

সূরা আল-মায়েদা (আয়াত: 11)



হরকত ছাড়া:

يا أيها الذين آمنوا اذكروا نعمة الله عليكم إذ هم قوم أن يبسطوا إليكم أيديهم فكف أيديهم عنكم واتقوا الله وعلى الله فليتوكل المؤمنون ﴿١١﴾




হরকত সহ:

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوا اذْکُرُوْا نِعْمَتَ اللّٰهِ عَلَیْکُمْ اِذْ هَمَّ قَوْمٌ اَنْ یَّبْسُطُوْۤا اِلَیْکُمْ اَیْدِیَهُمْ فَکَفَّ اَیْدِیَهُمْ عَنْکُمْ ۚ وَ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَ عَلَی اللّٰهِ فَلْیَتَوَکَّلِ الْمُؤْمِنُوْنَ ﴿۱۱﴾




উচ্চারণ: ইয়া আইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানুযকুরূনি‘মাতাল্লা-হি ‘আলাইকুম ইযহাম্মা কাওমুন আইঁ ইয়াবছুতূদ্মইলাইকুম আইদিইয়াহুম ফাকাফফা আইদিয়াহুম ‘আনকুম ওয়াত্তাকুল্লা-হা ওয়া‘আলাল্লা-হি ফালইয়াতাওয়াক্কালিল মু’মিনূন।




আল বায়ান: হে মুমিনগণ, তোমরা স্মরণ কর তোমাদের উপর আল্লাহর নিআমত, যখন একটি কওম তোমাদের প্রতি তাদের হাত প্রসারিত করতে মনস্থ করল; কিন্তু তিনি তাদের হাতকে তোমাদের থেকে নিবৃত্ত রাখলেন। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আল্লাহর উপরই মুমিনরা যেন তাওয়াক্কুল করে।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১১. হে মুমিনগণ! তোমাদের প্রতি আল্লাহর নেয়ামত স্মরণ কর যখন এক সম্প্রদায় তোমাদের বিরুদ্ধে তাদের হাত প্রসারিত করতে চেয়েছিল, অতঃপর আল্লাহ তাদের হাত তোমাদের থেকে নিবৃত রাখলেন আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর। আল্লাহর উপরই যেন মুমিনগণ তাওয়াক্কুল করে।(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: হে মু’মিনগণ! তোমরা আল্লাহর নি‘আমাতের কথা স্মরণ কর যখন একটি সম্প্রদায় তোমাদের বিরুদ্ধে তাদের হস্ত উত্তোলন করতে চেয়েছিল, তখন তিনি তোমাদের থেকে তাদের হাত নিবৃত্ত করেছিলেন। আল্লাহকে ভয় কর, আর মুমিনগণ যেন আল্লাহরই উপর ভরসা করে।




আহসানুল বায়ান: (১১) হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের প্রতি আল্লাহর নিয়ামত স্মরণ কর, যখন এক সম্প্রদায় তোমাদের বিরুদ্ধে হস্ত প্রসারিত করতে উদ্যত হয়েছিল, তখন আল্লাহ তোমাদের উপর থেকে তাদের হস্তকে প্রতিহত করেছিলেন[1] এবং আল্লাহকে ভয় কর। আর বিশ্বাসীগণের উচিত, কেবল আল্লাহর উপরেই ভরসা করা।



মুজিবুর রহমান: হে মু’মিনগণ! তোমাদের প্রতি যে আল্লাহর অনুগ্রহ রয়েছে তা স্মরণ কর, যখন এক সম্প্রদায় এই চিন্তায় ছিল যে, তোমাদের দিকে তাদের হস্ত প্রসারিত করবে, কিন্তু আল্লাহ তাদের হাতকে তোমাদের দিক থেকে থামিয়ে দিয়েছেন, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, এবং মু’মিনদের আল্লাহর উপরই ভরসা করা উচিত।



ফযলুর রহমান: হে ঈমানদারগণ! তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কথা স্মরণ করো, যখন একটি সমপ্রদায় তোমাদের দিকে তাদের হাত বাড়াতে চেয়েছিল, কিন্তু তিনি তাদের হাত তোমাদের থেকে নিবৃত্ত করেছিলেন। আর আল্লাহকে ভয় কর। ঈমানদাররা যেন আল্লাহর ওপরই নির্ভর করে।



মুহিউদ্দিন খান: হে মুমিনগণ, তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর, যখন এক সম্প্রদায় তোমাদের দিকে স্বীয় হস্ত প্রসারিত করতে সচেষ্ট হয়েছিল, তখন তিনি তাদের হস্ত তোমাদের থেকে প্রতিহত করে দিলেন। আল্লাহকে ভয় কর এবং মুমিনদের আল্লাহর উপরই ভরসা করা উচিত।



জহুরুল হক: ওহে যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপরে আল্লাহ্‌র নিয়ামত স্মরণ করো -- যখন একটি দল দৃঢ়সঙ্কল্প করেছিল তোমাদের দিকে তাদের হাত বাড়াতে, কিন্তু তিনি তোমাদের বিরুদ্ধে তাদের হাত ঠেকিয়ে রেখেছিলেন, কাজেই আল্লাহ্‌কে ভয়-শ্রদ্ধা করো। আর আল্লাহ্‌র উপরেই তবে নির্ভর করুক মুমিন সব।



Sahih International: O you who have believed, remember the favor of Allah upon you when a people determined to extend their hands [in aggression] against you, but He withheld their hands from you; and fear Allah. And upon Allah let the believers rely.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১১. হে মুমিনগণ! তোমাদের প্রতি আল্লাহর নেয়ামত স্মরণ কর যখন এক সম্প্রদায় তোমাদের বিরুদ্ধে তাদের হাত প্রসারিত করতে চেয়েছিল, অতঃপর আল্লাহ তাদের হাত তোমাদের থেকে নিবৃত রাখলেন আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর। আল্লাহর উপরই যেন মুমিনগণ তাওয়াক্কুল করে।(১)


তাফসীর:

(১) এ আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, শক্ররা বার বার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলিমদেরকে হত্যা, লুন্ঠন ও ধরাপৃষ্ঠ থেকে মুছে ফেলার যেসব পরিকল্পনা করে, সেগুলো আল্লাহ ব্যর্থ করে দেন। ইসলামের ইতিহাসে সামগ্রিকভাবে কাফেরদের পরিকল্পনা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হওয়ার অসংখ্য ঘটনা রয়েছে। তাফসীরবিদগণ এ আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে কিছু সংখ্যক বিশেষ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাও উল্লেখ করেছেন। সে সবগুলোই আলোচ্য আয়াতের সাক্ষী হতে পারে। আয়াতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলিমদের অদৃশ্য হেফাযতের কথা উল্লেখ করার পর প্রথমতঃ বলা হয়েছে যে, আল্লাহর নেয়ামত লাভ করার জন্য তাকওয়া ও আল্লাহর উপর নির্ভর করা জরুরী। যে কোন জাতি অথবা ব্যক্তি যে কোন সময় বা কোন স্থানে এ দুটি গুণ অবলম্বন করবে, আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে তারই এভাবে হেফাযত ও সংরক্ষণ করা হবে। [বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন, তাফসীর ইবন কাসীর]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১১) হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের প্রতি আল্লাহর নিয়ামত স্মরণ কর, যখন এক সম্প্রদায় তোমাদের বিরুদ্ধে হস্ত প্রসারিত করতে উদ্যত হয়েছিল, তখন আল্লাহ তোমাদের উপর থেকে তাদের হস্তকে প্রতিহত করেছিলেন[1] এবং আল্লাহকে ভয় কর। আর বিশ্বাসীগণের উচিত, কেবল আল্লাহর উপরেই ভরসা করা।


তাফসীর:

[1] এই আয়াতের শানে নুযুল বা অবতীর্ণের কারণ সম্পর্কে কুরআনের ভাষ্যকারগণ বিভিন্ন ঘটনা উল্লেখ করেছেন যেমন; (ক) একজন বেদুঈনের ঘটনা, কোন এক সফর থেকে প্রত্যাবর্তনের সময় রসূল (সাঃ) কোন এক গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন এবং তরবারিটিকে গাছে ঝুলিয়ে রেখেছিলেন। (সুযোগ বুঝে) ঐ বেদুঈন (তাঁর দিকে ধাবিত হয়ে) তরবারিটি হস্তগত করে ফেলল। অতঃপর তাঁর দিকে তরবারি উঁচিয়ে বলল, ‘হে মুহাম্মাদ! আমার কবল থেকে কে তোমাকে রক্ষা করবে?’ রসূল (সাঃ) নিশ্চিন্তে উত্তর দিলেন; ‘আল্লাহ।’ (অর্থাৎ আল্লাহ রক্ষা করবেন।) শুধু এতটুকু কথা বলতে যত দেরী, (অদৃশ্য শক্তির ইঙ্গিতে) তার হাত থেকে তরবারিটি পড়ে গেল। (খ) আবার কেউ বলেন যে, কা’ব বিন আশরাফ ও তার সহযোগীরা রসূল (সাঃ) ও তাঁর সাহাবা (রাঃ)গণের বিরুদ্ধে প্রতারণা ও ছল-চাতুরী করে তাঁদের ক্ষতি করার ষড়যন্ত্র করেছিল; যখন তিনি ও সাহাবাগণ তার বাড়িতে পৌঁঁছেছিলেন। কিন্তু তাদের এ ষড়যন্ত্র আল্লাহ তাআলা যথাসময়ে তাঁর রসূল (সাঃ)-কে অবগত করে ব্যর্থ করে দেন। (গ) আবার কেউ বলেন যে, একজন মুসলমানের হাতে ভুলক্রমে আ’মেরী গোত্রের দুই ব্যক্তি খুন হয়েছিল। আল্লাহর রসূল (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) সহ রক্তপণ আদায়ের ব্যাপারে সন্ধিচুক্তি মোতাবেক সহযোগিতার কামনায় ইয়াহুদীদের গোত্র বানী নাযবীরের বস্তীতে গমন করেন। তিনি একটি দেওয়ালের সাথে হেলান দিয়ে বসেন। অপর দিকে তারা ষড়যন্ত্র করেছিল যে, উপর থেকে যাঁতার একটি পাথর ফেলে তাঁকে হত্যা করা হবে। আল্লাহ তাআলা তাঁর রসূল (সাঃ)-কে অহীর মাধ্যমে (তাদের সংকল্পের কথা) জানিয়ে দেন এবং তৎক্ষণাৎ তিনি সেখান থেকে প্রস্থান করেন। সম্ভবতঃ উক্ত সমস্ত ঘটনার পরেই এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। কেননা একটি আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার ব্যাপারে বিভিন্ন কারণ ও পটভূমিকা থাকতে পারে। (তাফসীরে ইবনে কাসীর, আইসারুত তাফাসীর ও ফাতহুল ক্বাদীর)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৮-১১ নং আয়াতের তাফসীর:



আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদের সম্বোধন করে বলেন, তোমরা কেবল তাঁর জন্যই হকের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো এবং ন্যায়পরায়ণতার সাথে সাক্ষ্য দাও। আর কোন সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে অবিচার করতে প্ররোচিত না করে। সর্বদা সকলের সাথে সুবিচার কর, কোনক্রমেই পার্থিব স্বার্থে কিংবা স্বজন-প্রীতি করে অবিচার করবে না, সে শত্র“ হোক আর মিত্র হোক। এটাই কল্যাণকর ও তাক্বওয়ার কাজ। এ সম্পর্কে সূরা নিসার ১৩৫ নং আয়াতেও আলোচনা করা হয়েছে।



নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট ন্যায্য সাক্ষীর কত গুরুত্ব ছিল, তা এ ঘটনার দ্বারা অনুমান করা যায়। নুমান বিন বাশির (রাঃ) বলেন: আমার পিতা আমাকে কিছু হাদিয়া (দান) দিলেন। তা দেখে আমার মা বললেন: এ হাদিয়ার ব্যাপারে যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সাক্ষী না রাখবেন ততক্ষণ পর্যন্ত আমি সন্তুষ্ট হব না। এতে আমার পিতা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে সমস্ত ঘটনা খুলে বললেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: তুমি তোমার সব সন্তানদের হাদিয়া দিয়েছ? উত্তরে তিনি বললেন: না। তারপর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় কর এবং সন্তানদের মাঝে সুবিচার কর। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরো বললেন: আমি জুলুমের ব্যাপারে সাক্ষী হতে পারব না।



বর্ণনাকারী বলেন: অতঃপর আমার পিতা ফিরে আসলেন এবং সে হাদিয়া বাতিল করে দিলেন। (সহীহ বুখারী হা: ২৫৮৬)



সুতরাং সত্যের পক্ষে সাক্ষ্য দেয়া, সত্য সাক্ষ্য গোপন না করা এবং মিথ্যাকে সত্য বলে উপস্থাপন না করা ঈমানদারদের বৈশিষ্ট্য। পরীক্ষার নম্বর, সনদ, নির্বাচনে ভোট দান করা এবং কারো বাদী হয়ে পক্ষে কথা বলা সবই সাক্ষ্যের শামিল। সবক্ষেত্রে সততা ও নিষ্ঠার পরিচয় দেয়াটাই হল মু’মিনের একান্ত কর্তব্য।



(يأَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوا اذْكُرُوْا نِعْمَتَ اللّٰهِ.... )



আয়াতের শানে নুযূল:



এ আয়াত নাযিলের ব্যাপারে কয়েকটি বর্ণনা পাওয়া যায়:



১. জাবের (রাঃ) হতে বর্ণিত। (কোন এক সফর থেকে ফেরার পথে) নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কোন এক স্থানে অবতরণ করলেন। আর সাহাবাগণ বিভিন্ন গাছের ছায়ায় আরাম করছিলেন। নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর তরবারী গাছের সাথে ঝুলিয়ে রেখেছিলেন। এমন সময় হঠাৎ একজন বেদুঈন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর তরবারী নিয়ে কোষমুক্ত করে ফেলল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দিকে অগ্রসর হয়ে বলল: আমার হাত থেকে তোমাকে কে রক্ষা করবে? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: আল্লাহ। এভাবে বেদুঈন কয়েক বার বলল। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রত্যেকবার একই জবাব দিলেন। তখন লোকটির হাত থেকে তরবারী পড়ে গেল। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবীদের ডেকে এ সংবাদ জানালেন। লোকটি পাশে বসা ছিল, কিন্তু কেউ তাকে ভর্ৎসনা করেনি। (সহীহ বুখারী হা: ৪১৩৫)



২. আবূ মালিক (রহঃ) বলেন: আয়াতটি কাব বিন আশরাফের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। যখন কাব ও তার অনুসারীরা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও সাহাবাদের ব্যাপারে ষড়যন্ত্র করছিল। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে অবগত করে তাদের এ ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দেন। এ ব্যাপারে উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয়। এছাড়াও আরো বর্ণনা পাওয়া যায়। (ইবনে কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)



সুতরাং যে আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের দুর্বলতা দূর করে শক্তি সামর্থ দান করেছেন এবং ভয় দূর করে দিয়েছেন সে আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় কর এবং সর্বক্ষেত্রে তাঁরই ওপর ভরসা কর। কারণ তিনি দুর্বলদেরকে সাহায্য করেন এবং যারা তাঁর ওপর ভরসা করে তাকে পূর্ণতা দান করেন।



আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. সর্বদা সকলের ক্ষেত্রে সত্য সাক্ষ্য দেয়া আবশ্যক।

২. কথা, কাজ ও সাক্ষীর ক্ষেত্রে ন্যায়পরায়ণতা অবলম্বন করা জরুরী।

৩. আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করাতে বারংবার গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে।

৪. মু’মিনদের সর্বদা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার ওপর ভরসা করা উচিত।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৭-১১ নং আয়াতের তাফসীর:

এ বিরাট ধর্ম এবং এ মহান রাসূল (সঃ)-কে পাঠিয়ে আল্লাহ তা'আলা এ উম্মতের উপর যে ইহসান করেছেন সেটাই তিনি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। আর সেই অঙ্গীকারের উপর দৃঢ় থাকার জন্যে তাদেরকে হিদায়াত করেছেন, যে অঙ্গীকার মুসলমানরা করেছিল, তারা আল্লাহর রাসূলের (সঃ) অনুগত হবে, তাঁকে সর্ব প্রকারের সাহায্য করবে, দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে, নিজেরা তা কবুল করবে এবং অপরের নিকটও তা পৌছিয়ে দেবে। ইসলাম গ্রহণের সময় প্রতিটি মুমিন স্বীয় বায়আতে উক্ত জিনিসগুলো স্বীকার করতো। সাহাবায়ে কিরাম নিম্নলিখিত ভাষায় বলেছিলেনঃ “আমরা আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর নিকট বায়আত গ্রহণ করছি যে, আমরা শুনতে থাকবো, মানতে থাকবো। আমাদের মনের চাহিদা হোক বা না-ই হোক অথবা অন্যদেরকে আমাদের উপর প্রাধান্য দেয়া হোক না কেন। কোন যোগ্য লোকের নিকট থেকে আমরা কোন কাজ ছিনিয়ে নেবো না।`

ইরশাদ হচ্ছে-তোমরা ঈমান আনছো না কেন? অথচ রাসূলুল্লাহ (সঃ) তোমাদেরকে তোমাদের প্রভুর উপর ঈমান আনার আহ্বান জানাচ্ছেন! আর তিনি তোমাদের নিকট অঙ্গীকারও নিয়েছেন, যদি তোমাদের বিশ্বাস হয়। এটাও বলা হয়েছে যে, এ আয়াতে ইয়াহদীদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয়া হচ্ছে তাদেরকে বলা হচ্ছে- তোমরা তো রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আনুগত্য স্বীকারের কথা দিয়েছো, এরপরেও তাঁকে মান্য না করার কি অর্থ হতে পারে? একথাও বলা হয়েছে যে, হযরত আদমের পৃষ্ঠ থেকে বের হবার পর আল্লাহ তা'আলা বানু আদমের নিকট থেকে যে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন- আমি কি তোমাদের প্রভু নই? সবাই স্বীকারোক্তি করেছিল-হা, আমরা এর উপর সাক্ষী থাকলাম। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী প্রকাশমান। সুদ্দী (রঃ) ও হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এটাই বর্ণিত আছে। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) একে পছন্দনীয় বলেছেন। সর্বাবস্থায় মানুষের আল্লাহকে ভয় করা উচিত। তিনি অন্তরের ও বক্ষের গোপনীয় কথাও পূর্ণভাবে অবগত রয়েছেন।

ঘোষিত হচ্ছে-হে মুমনিগণ! লোকদেরকে দেখাবার জন্যে নয়, বরং আল্লাহর জন্যে সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক এবং ইনসাফের সাথে সঠিক সাক্ষী হয়ে যাও। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত নোমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ আমার পিতা আমাকে একটি দান দিয়ে রেখেছিলেন। তখন আমার মা উমরাহ বিনতে রাওয়াহা (রাঃ) বলেনঃ “আমি এ পর্যন্ত নিশ্চিন্ত হতে পারি না যে পর্যন্ত না রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এর উপর সাক্ষী বানানো হয়।' এ কথা শুনে আমার পিতা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হাযির হয়ে ঘটনাটি বর্ণনা করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার পিতাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমার অনান্য সন্তানদেরকেও কি এরূপ দান দিয়ে রেখেছো?” আমার পিতা উত্তরে বললেনঃ ‘না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “আল্লাহকে ভয় কর এবং স্বীয় সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ কায়েম কর। যাও, আমি কোন অত্যাচারের উপর সাক্ষী হতে পারি না। আমার পিতা তখন ঐ দান আমার নিকট হতে ফিরিয়ে নেন।

ইরশাদ হচ্ছে- কোন সম্পদায়ের শত্রুতা যেন তোমাদেরকে আদল ও ইনসাফের পথ থেকে সরিয়ে না দেয়। (এখানে কওম' দ্বারা ইয়াহূদকে বুঝানো হয়েছে। তারা নবী (সঃ)-কে হত্যা করার ইচ্ছা করেছিল। যেমন ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। আর সুহাইলী বলেন যে, এখানে কওম’ দ্বারা গাওরাস ইবনে হারিস গাতফানীকে বুঝানো হয়েছে) বন্ধু হোক বা শত্রু হোক, তোমাদের ইনসাফের পক্ষ অবলম্বন করা উচিত। এটাই হচ্ছে তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী। এখানে (আরবী) ঐ (আরবী)-এর উপর (আরবী) করেছে যার দিকে (আরবী) টি ফিরেছে। এ নযীর কুরআন মাজীদে আরও রয়েছে। আরবদের কথাতেও এর ব্যবহার দেখা যায়। কুরআন কারীমের এক জায়গায় রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ তোমরা যদি কোন বাড়ীতে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা কর, “আর সে সময় তোমাদেরকে বলা হয়- ফিরে যাও, তাহলে তোমরা ফিরে যাবে, এটাই তোমাদের জন্যে অধিক পবিত্র থাকার কারণ হবে।”(২৪:২৮) সুতরাং এখানেও (আরবী) -এর (আরবী) -এর উল্লেখ করা হয়নি, কিন্তু (আরবী) এর (আরবী) বিদ্যমান রয়েছে। অর্থাৎ ফিরে যাওয়া। অনুরূপভাবে আয়াতেও এ (আরবী) অর্থাৎ “ইনসাফ করা বিদ্যমান রয়েছে। এটাও স্মরণীয় বিষয় যে, এখানে শব্দটি (আরবী) -এর রূপ। এটা এমন জায়গায় রয়েছে যে অন্যদিকে আর কিছুই নেই। যেমনঃ (আরবী) (২৫ ২৪)-এ আয়াতটিতে রয়েছে। আর যেমন এক মহিলার হযরত উমার (রাঃ)-কে (আরবী) -এ কথা বলা। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, নিশ্চয়ই তিনি তোমাদের আমল সম্বন্ধে পূর্ণ ওয়াকিফহাল। তিনি ভাল ও মন্দের পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করবেন। তিনি মুমিনদের পাপ ক্ষমা করে তাদেরকে মহান পুরস্কার অর্থাৎ জান্নাত দান করার অঙ্গীকার করেছেন। যদিও প্রকৃতপক্ষে তারা এ রহমত একমাত্র আল্লাহর অনুগ্রহের ফলেই লাভ করবে, কিন্তু এ রহমতের প্রতি মনোযোগ দেয়ার কারণ হবে তাদের আমল। অতএব, প্রকৃতপক্ষে সর্বপ্রকারের প্রশংসার যোগ্য একমাত্র আল্লাহ এবং সব কিছুই তারই অনুগ্রহ ও দয়া মাত্র। জ্ঞান ও ইনসাফের দাবী তো এটাই যে, মুমিন ও সৎ লোকদেরকে জান্নাত দেয়া হোক এবং কাফির ও মিথ্যা প্রতিপন্নকারীদেরকে জাহান্নামে প্রবিষ্ট করা হোক। সুতরাং হবেও তাই।

তারপর আল্লাহ পাক নিজের আর একটি নিয়ামতের কথা মুমিনদেরকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। যার বিস্তারিত বিবরণ নিম্নরূপঃ

হযরত জাবির (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, কোন এক সফরে নবী (সঃ) একটি মনযিলে অবতরণ করেন। জনগণ ছায়াযুক্ত বৃক্ষরাজির খোঁজে বিচ্ছিন্নভাবে এদিক ওদিক ঘোরাফেরা করছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় হাতিয়ার একটি গাছে লটকিয়ে রাখেন। এমন সময় এক বেদুঈন এসে তাঁর তরবারীখানা হাতে টেনে নিয়ে বলে, আপনাকে এখন আমার হাত থেকে কে বাঁচাতে পারে? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আমাকে বাঁচাবেন)।” সে দ্বিতীয়বার এ প্রশ্নই করলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) পুনরায় এ উত্তরই দিলেন। বেদুঈন তৃতীয়বার বললো, “আপনাকে আমা থেকে রক্ষা করবে কে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ আল্লাহ। বর্ণনাকারী বলেন যে, এ কথা বলার সাথে সাথে বেদুঈনের হাত থেকে তরবারী পড়ে গেল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে ডাক দিলেন। তাঁরা এসে গেলে তিনি তাঁদের কাছে বেদুঈনের ঘটনাটি বর্ণনা করলেন। সে তখনও তার পার্শ্বে উপবিষ্ট ছিল। কিন্তু তিনি তার কোন প্রতিশোধ নিলেন না। কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, কতগুলো তোক প্রতারণা করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে হত্যা করতে চেয়েছিল এবং তারাই ঐ বেদুঈনকে গুপ্তঘাতক হিসেবে তাঁর নিকট পাঠিয়েছিল। কিন্তু মহান আল্লাহ তাদের পরিকল্পনা এভাবে ব্যর্থ করে দেন। সহীহ হাদীস দ্বারা জানা যায় যে, ঐ বেদুঈনের নাম ছিল গাওরাস ইবনে হারিস। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ইয়াহূদীরা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও তাঁর সাহাবীদেরকে হত্য করার উদ্দেশ্যে খাদ্যে বিষ মিশিয়ে তাদেরকে দাওয়াত করে। কিন্তু মহান আল্লাহ এ সংবাদ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জানিয়ে দেন। সুতরাং তারা বেঁচে যান। একথাও বলা হয়েছে যে, কা'ব ইবনে আশরাফ এবং তার ইয়াহূদী সঙ্গীরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বাড়ীতে ডেকে নিয়ে কষ্ট দিতে চেয়েছিল। এটা ঐ সময়ের ঘটনা, যখন নবী (সঃ) আমেরী লোকদের দিয়াত গ্রহণের জন্যে তাদের নিকট গিয়েছিলেন। ঐ সময় দুষ্টেরা আমর ইবনে জাহাশ ইবনে কা'বকে উত্তেজিত করতঃ বলেছিল- “আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে নীচে দাঁড় করিয়ে রেখে আলোচনায় লিপ্ত করিয়ে রাখবো, এ সুযোগে তুমি উপর থেকে তার উপর পাথর ফেলে দিয়ে তাঁকে দুনিয়া হতে বিদায় করে দেবে।” কিন্তু মহান আল্লাহ স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে পথেই তাদের দুষ্টামির কথা জানিয়ে দেন। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণসহ সেখান হতে ফিরে আসেন। এ আয়াতে ঐ ঘটনারই উল্লেখ রয়েছে।

ইরশাদ হচ্ছে-মুমিনদের আল্লাহর উপর ভরসা করা উচিত। বিপদ আপদ থেকে রক্ষাকারী একমাত্র তিনিই। এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) মহান আল্লাহর নির্দেশক্রমে বানূ নাযীরের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী নিয়ে অগ্রসর হন। তাদের কিছু সংখ্যক লোককে হত্যা করেন এবং কতক লোককে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেন।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।