সূরা আল-মায়েদা (আয়াত: 108)
হরকত ছাড়া:
ذلك أدنى أن يأتوا بالشهادة على وجهها أو يخافوا أن ترد أيمان بعد أيمانهم واتقوا الله واسمعوا والله لا يهدي القوم الفاسقين ﴿١٠٨﴾
হরকত সহ:
ذٰلِکَ اَدْنٰۤی اَنْ یَّاْتُوْا بِالشَّهَادَۃِ عَلٰی وَجْهِهَاۤ اَوْ یَخَافُوْۤا اَنْ تُرَدَّ اَیْمَانٌۢ بَعْدَ اَیْمَانِهِمْ ؕ وَ اتَّقُوا اللّٰهَ وَ اسْمَعُوْا ؕ وَ اللّٰهُ لَا یَهْدِی الْقَوْمَ الْفٰسِقِیْنَ ﴿۱۰۸﴾
উচ্চারণ: যা-লিকা আদনা-আইঁ ইয়া’তূবিশশাহা-দাতি ‘আলা-ওয়াজহিহাআও ইয়াখা-ফূআন তুরাদ্দা আইমা-নুম বা‘দা আইমা-নিহিম ওয়াত্তাকুল্লা-হা ওয়াছমা‘ঊ ওয়াল্লা-হু লাইয়াহদিল কাওমাল ফা-ছিকীন।
আল বায়ান: এটি নিকটতম যে, তারা সাক্ষ্য সঠিকভাবে উপস্থাপন করবে অথবা তারা (মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদানকারীরা) ভয় করবে যে, তাদের (নিকটাত্মীয়দের) কসমের পর (পূর্বোক্ত) কসম প্রত্যাখ্যান করা হবে। আর আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং শুন! আর আল্লাহ ফাসিক কওমকে হিদায়াত করেন না।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১০৮. এ পদ্ধতিই(১) বেশী নিকটতর যে, তারা সাক্ষ্য সঠিকভাবে উপস্থাপন করবে অথবা তারা (মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদানকারীরা) ভয় করবে যে, তাদের (নিকটাত্মীয়দের) শপথের পর (পূর্বোক্ত) শপথ প্রত্যাখ্যান করা হবে। আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং শুন(২); আল্লাহ ফাসেক সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না।
তাইসীরুল ক্বুরআন: এ পন্থায় বেশি সম্ভাবনা আছে যে, লোকে ঠিকভাবে সাক্ষ্যদান করবে, কিংবা অন্ততঃপক্ষে তারা এ ভয় অবশ্যই করবে যে, তাদের কসম করার পর অপর কোন কসম দ্বারা তাদের প্রতিবাদ করা না হয়। আল্লাহকে ভয় কর আর শোন; আল্লাহ সত্য পরিত্যাগকারী সম্প্রদায়কে সঠিক পথে পরিচালিত করেন না।
আহসানুল বায়ান: (১০৮) এ পদ্ধতিতেই লোকের যথাযথ সাক্ষ্যদানের অধিকতর সম্ভাবনা আছে অথবা তারা ভয় করবে যে, শপথের পর আবার তাদেরকে শপথ করানো হবে।[1] আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং শ্রবণ কর। অধিকন্তু আল্লাহ সত্যত্যাগী সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না।
মুজিবুর রহমান: এটাই এ বিষয়ে অতীব সহজ পন্থা যে, তারা ঘটনা যথাযথভাবে প্রকাশ করে দিবে, অথবা এই ভয় করবে যে, তাদের শপথ গ্রহণ করার পর (পুনঃ) শপথ করানো হবে; আল্লাহকে ভয় কর এবং (বিধানসমূহ) শ্রবণ কর, আর আল্লাহ ফাসিকদেরকে পথ দেখাবেননা।
ফযলুর রহমান: এতেই অধিকতর সম্ভাবনা আছে যে, তারা সঠিকভাবে সাক্ষ্য দেবে অথবা তাদের শপথের পর আবার শপথ নেওয়ার আশঙ্কা করবে। আল্লাহকে ভয় করো এবং (তাঁর কথা) শোন। আল্লাহ ফাসেকদেরকে পথ প্রদর্শন করেন না।
মুহিউদ্দিন খান: এটি এ বিষয়ের নিকটতম উপায় যে, তারা ঘটনাকে সঠিকভাবে প্রকাশ করবে অথবা আশঙ্কা করবে যে, তাদের কাছ থেকে কসম নেয়ার পর আবার কসম চাওয়া হবে। আল্লাহকে ভয় কর এবং শুন, আল্লাহ দুরাচারীদেরকে পথ-প্রদর্শন করবেন না।
জহুরুল হক: এইভাবে এটি অধিক সম্ভবপর যে তারা সাক্ষ্য দেবে তাদের মুখের উপর, অথবা তারা আশংকা করবে যে অন্য শপথ তাদর শপথকে পরবর্তীকালে বাতিল ক’রে দেবে। আর আল্লাহ্কে ভয়ভক্তি করো ও শোন। আর আল্লাহ্ হেদায়ত করেন না অবাধ্য লোকদের।
Sahih International: That is more likely that they will give testimony according to its [true] objective, or [at least] they would fear that [other] oaths might be taken after their oaths. And fear Allah and listen; and Allah does not guide the defiantly disobedient people.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১০৮. এ পদ্ধতিই(১) বেশী নিকটতর যে, তারা সাক্ষ্য সঠিকভাবে উপস্থাপন করবে অথবা তারা (মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদানকারীরা) ভয় করবে যে, তাদের (নিকটাত্মীয়দের) শপথের পর (পূর্বোক্ত) শপথ প্রত্যাখ্যান করা হবে। আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং শুন(২); আল্লাহ ফাসেক সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না।
তাফসীর:
(১) অর্থাৎ সন্দেহের সময় সাক্ষীদেরকে সালাতের পরে শপথ করানো এবং তাদের মধ্যে শপথ ভঙ্গের সম্ভাবনা প্রাপ্ত হলে তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ না করাটা হচ্ছে সঠিকভাবে সাক্ষ্য উপস্থাপনে লোকদের বাধ্য করার সবচেয়ে সুন্দর পদ্ধতি। হয় তারা আখেরাতের শাস্তির ভয়ে সঠিক সাক্ষ্য দিবে, না হয় দুনিয়ায় মৃত ব্যক্তির নিকটাত্মীয়দের পাল্টা শপথের মাধ্যমে তাদের সাক্ষ্যের অগ্রহণযোগ্যতা প্রকাশিত হওয়ার মত অপমানের ভয়ে তারা সঠিক সাক্ষ্য প্রদানে উদ্বুদ্ধ হবে। [মুয়াসসার]
(২) অর্থাৎ আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর, মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান করো না। তোমাদের মিথ্যা সাক্ষীর মাধ্যমে কোন হারাম সম্পদ কুক্ষিগত করো না। আর তোমাদেরকে যে উপদেশ দেয়া হচ্ছে তা ভালভাবে শোন এবং সেটা অনুযায়ী আমল কর। [মুয়াসসার]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১০৮) এ পদ্ধতিতেই লোকের যথাযথ সাক্ষ্যদানের অধিকতর সম্ভাবনা আছে অথবা তারা ভয় করবে যে, শপথের পর আবার তাদেরকে শপথ করানো হবে।[1] আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং শ্রবণ কর। অধিকন্তু আল্লাহ সত্যত্যাগী সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না।
তাফসীর:
[1] এখানে সেই উপকারিতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা উক্ত নির্দেশে নিহিত আছে। আর তা এই যে, উক্ত পদ্ধতি গ্রহণ করার ফলে যাদেরকে অসিয়ত করা হয়েছে তারা সঠিক সঠিক সাক্ষী দেবে। কেননা, তাদের এই আশঙ্কা হবে যে, যদি আমরা খেয়ানত করি অথবা মিথ্যা বলি, অথবা পরিবর্তন করি, তাহলে এর প্রতিক্রিয়া তাদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ সম্বন্ধে বুদাইল বিন আবী মারয়্যামের ঘটনা উল্লেখ করা হয়। তিনি ব্যবসার উদ্দেশ্যে শাম সফরে ছিলেন এবং সেখানে অসুস্থ তথা মরণোন্মুখ হয়ে পড়েন। তাঁর সাথে মাল-পত্র ও চাঁদির একটি পিয়ালা ছিল; যা তিনি দুজন খ্রিষ্টানকে সমর্পণ করে নিজ আত্মীয়দের নিকট পৌঁছে দেওয়ার অসিয়ত করেন। অতঃপর তিনি মারা যান। উক্ত অসী দুইজন চাঁদির পিয়ালা বিক্রি করে অর্থ ভাগ করে নেয় এবং ফিরে এসে বাকী মাল-পত্র তাঁর ওয়ারেসদেরকে প্রত্যর্পণ করে। ঐ মাল-পত্রে একটি চিঠিও ছিল; যাতে মাল-পত্রের একটি তালিকাও ছিল। যার ভিত্তিতে চাঁদির পিয়ালা বিদ্যমান ছিল না। তাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হলে তারা মিথ্যা কসম খেয়ে তা আত্মসাৎ না করার কথা বলল। কিন্তু পরে জানা গেল যে, তারা ঐ পিয়ালা অমুক মুদ্রা-ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করেছে। সুতরাং তাঁর ওয়ারেসরা ঐ অমুসলিমদের বিরুদ্ধে কসম খেয়ে ঐ পিয়ালার মূল্য আদায় করে নিল। এ বর্ণনা সনদের দিক থেকে যয়ীফ। (তিরমিযী ৩০৫৯নং) কিন্তু অন্য সনদ দ্বারা ইবনে আববাস (রাঃ) কর্তৃকও সংক্ষিপ্তাকারে উক্ত ঘটনা বর্ণিত আছে। যাকে আল্লামা আলবানী সহীহ বলেছেন। (সহীহ তিরমিযী ২৪৪৯নং)
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১০৬-১০৮ নং আয়াতের তাফসীর:
শানে নুযূল:
ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, তামীম আদ-দারী ও আদী বিন বাদ্দার ও তাদের সাথে বানী সাহাম গোত্রের একজন লোক সফরে বের হল। পথিমধ্যে এমন জায়গায় বানী সাহাম গোত্রের লোকটি মারা গেল যেখানে কোন মুসলিম ব্যক্তি ছিল না।
যখন উভয় জন (তামীম আদ্ দারী ও আদী) তার পরিত্যক্ত সম্পদ নিয়ে আগমন করল তখন তারা রৌপ্যের একটি পেয়ালা হারিয়ে ফেলেছিল যা ছিল স্বর্ণ দ্বারা প্রলেপ দেয়া। (যখন জমা দিতে লাগল) তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দু’জনের কাছ থেকে এ বিষয়ে শপথ নিয়েছিলেন। অতঃপর মক্কায় এ পেয়ালাটি পাওয়া গেল। জিজ্ঞাসা করা হলে তারা বলল, আমরা তামীম ও আদীর কাছ থেকে কিনে নিয়েছি। তখন মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশদার থেকে দু’জন আল্লাহ তা‘আলার নামে শপথ করে বলল: তাদের থেকে আমাদের উভয়ের সাক্ষ্য অধিক সত্য। পেয়ালাটি আমাদের মৃত ব্যক্তির। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: এদের ব্যাপারে এ আয়াতগুলো নাযিল হয়। (সহীহ তিরযিমী হা: ২৭৮০)
কোন ব্যক্তি মুমূর্ষু অবস্থায় কিছু অসিয়ত করতে চাইলে তার উচিত, সেই অসিয়ত লিখে রাখা এবং এ বিষয়ে দু’জন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিকে সাক্ষী রাখা। আর যদি সফরে থাকে এমনতাবস্থায় কোন মুসলিমকে কাছে না পায় তাহলে ইয়াহূদ, খ্রিস্টান বা অন্য কোন ধর্মের অনুসারী ব্যক্তিকে সাক্ষী রাখবে।
যদি অসিয়তকারী মৃত ব্যক্তি তার ওয়ারিশগণের ব্যাপারে সন্দেহ করেন যে, যাদেরকে অসিয়ত করা হয়েছে তাদের সাথে খিয়ানত অথবা অসিয়ত পরিবর্তন করতে পারে এমতাবস্থায় সালাতের পর সমস্ত মানুষের সামনে তাদেরকে আল্লাহ তা‘আলার নামে শপথ করানো হবে, তারা বলবে আমরা এ শপথের বিনিময়ে দুনিয়ার কোন মূল্য গ্রহণ করব না এবং গোপনও করব না।
(فَاِنْ عُثِرَ عَلٰٓی اَنَّھُمَا اسْتَحَقَّآ اِثْمًا)
‘যদি এটা প্রকাশ পায় যে, তারা দু’জন অপরাধে লিপ্ত হয়েছে’ অর্থাৎ যদি বুঝা যায় তারা উভয়ে মিথ্যা শপথ করেছে, সম্পদে খিয়ানত করেছে, তাহলে যারা ওয়ারিশ তাদের মধ্য হতে দু’জন সাক্ষী থাকবে আর বলবে: তারা (পূর্বে যারা সাক্ষী ছিল) উভয়ে খিয়ানত করেছে তাদের সাক্ষীর চেয়ে আমাদের সাক্ষী অধিক মজবুত।
(ذٰلِكَ أَدْنٰٓي أَنْ يَّأْتُوْا بِالشَّهَادَةِ)
‘এ পদ্ধতিতেই অধিকতর সম্ভাবনা আছে লোকেরা যথাযথ সাক্ষ্যদান করবে’অর্থাৎ এখানে যে উপকারিতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে যা উক্ত নির্দেশে নিহিত আছে। আর তা এই যে, উক্ত পদ্ধতি গ্রহণ করার ফলে যাদেরকে অসিয়ত করা হয়েছে তারা সঠিক সাক্ষী দেবে। কেননা তাদের এ আশঙ্কা হবে যে, যদি আমরা খিয়ানত করি অথবা মিথ্যা বলি অথবা পরিবর্তন করি তাহলে এর প্রতিক্রিয়া তাদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. সফরে অসিয়ত করা শরীয়তসম্মত।
২. অসিয়তে সাক্ষী রাখা ওয়াজিব।
৩. মুসলিম না পাওয়া গেলে অমুসলিমকে সাক্ষী বানানো যাবে।
৪. সংশয় হলে সাক্ষীকে শপথ করানো যাবে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১০৬-১০৮ নং আয়াতের তাফসীর:
এ আয়াতে কারীমা স্বাভাবিক হুকুমের অন্তর্ভুক্ত। এ কথাও বলা হয়েছে যে, এ আয়াতটি মানসূখ’ বা রহিত হয়ে গেছে। তারকীবে নাহবীর দিক দিয়ে (আরবী) শব্দটি বা বিধেয়। আর (আরবী) বাক্যের মধ্যে (আরবী) বা উদ্দেশ্য হবে। অর্থাৎ বাক্যটি (আরবী) এরূপ ছিল। দ্বিতীয় (আরবী) শব্দটি (আরবী) রূপে ছিল যা লোপ করা হয়েছে এবং (আরবী) অর্থাৎ (আরবী) শব্দটিকেই ওর স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে। আবার এ কথাও বলা হয়েছে যে, এরূপ মনে করতে হবে। এ অবস্থায় (আরবী) শব্দটি (আরবী) শব্দের (আরবী) বা বিশেষণ হবে। (আরবী) দ্বারা (আরবী) বুঝানো হয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, দ্বারা অসিয়ত কারীদেরকে বুঝানো হয়েছে। আর (আরবী) দ্বারা (আরবী) বা আহলে কিতাবদেরকে বুঝানো হয়েছে। (এটা বলেছেন ইবনে জারীর (রঃ)) অর্থাৎ অসিয়তকারীর গোত্রের মধ্য হতে দু’জন সাক্ষী এবং আর দু’জন সাক্ষী হবে অন্য গোত্রের মধ্য হতে। (আরবী) -এর ভাবার্থ হচ্ছে-যখন তোমরা সফরে থাকবে এবং ঐ অবস্থায় তোমাদের মৃত্যু এসে যাবে তখন তোমরা মুসলমানদের মধ্য হতে দু’জন সাক্ষী রাখবে। আর মুসলমান পাওয়া না গেলে অমুসলিম হলেও চলবে। এখানে এ কথা বের হচ্ছে যে, সফরে অসিয়তের সময় মুসলমান বিদ্যমান না থাকলে যিম্মীদেরকে সাক্ষী বানানো যেতে পারে। শুরাইহ্ (রঃ) বলেন যে, সফর ও অসিয়তের সময় ছাড়া অন্য কোন সময় ইয়াহুদী ও নাসারাদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে না। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) হতেও এরূপই বর্ণিত আছে। আইম্মায়ে সালাসা বা ইমাম আবূ হানীফা (রঃ) ছাড়া বাকী তিনজন ইমাম এর বিপরীত মত পোষণ করেন। তারা বলেন যে, কোন অবস্থাতেই মুসলিমের উপর অমুসলিমের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) যিম্মীর উপর যিম্মীর সাক্ষ্য বৈধ বলেছেন।
ইমাম যুহরী (রঃ)-এর উক্তি নকল করে ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, বাসস্থানে বা সফরে কাফিরের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য না হওয়াই সুন্নাত তরীকা। সাক্ষ্য প্রদানের অধিকার শুধু মুসলমানেরই রয়েছে। ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি ঐ সময় অবতীর্ণ হয় যখন একটি লোক মারা গিয়েছিল এবং সেখানে সে সময় কোন মুসলমান বিদ্যমান ছিল না। ওটা ছিল ইসলামের প্রাথমিক যুগের ঘটনা। ঐ সময় সমস্ত শহর ছিল অমসলিমদের দখলে এবং সব লোকই ছিল কাফির। উত্তরাধিকারের কোন নিয়ম-কানুনও তখন চালু ছিল না। ওটা অসিয়ত হিসেবে বন্টিত হতো। তারপর অসিয়ত মানসূখ হয়ে যায় এবং ফারায়েয (উত্তরাধিকারীদের অংশ) ফরয করা হয়। অতঃপর লোকেরা উত্তরাধিকারের নিয়ম-কানুনের উপর আমল করতে শুরু করে। এ বিষয়ে চিন্তাভাবনার অবকাশ রয়েছে। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা দু’জন ওসীকে বুঝানো হয়েছে, কি দু’জন সাক্ষীকে বুঝানো হয়েছে এ ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, যদি লোক সফরে থাকে এবং তার সাথে মালধন থাকে, এমতাবস্থায় তার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসে, তবে মুসলমানদের মধ্যে দুটি লোককে পেলে সে স্বীয় পরিত্যক্ত সম্পদ তাদের কাছে সমর্পণ করবে এবং দু’জন মুসলমানকে ওর উপর সাক্ষীও রাখবে। এটা ছিল ওসী নিযুক্ত করার অবস্থা। (আরবী) -এর ভাবার্থ এই যে, এ দু’জন মুসলমান সাক্ষী নিযুক্ত হবে। আয়াতে কারীমার পূর্ব সম্পর্ক দ্বারা এটাই প্রকাশ পাচ্ছে। সুতরাং যদি এ দু’জন মুসলমানের সাথে তৃতীয় কোন মুসলমান উপস্থিত না থাকে তবে অসিয়ত ও সাক্ষ্য এ বিশেষণও এ দু'জনের মধ্যেই একত্রিত হয়ে যাবে। যেমন তামীমুদ্দারী ও আদী ইবনে বিদার কাহিনীতে সত্বরই এর বর্ণনা আসছে ইনশাআল্লাহ।
(আরবী) ‘তোমরা ঐ দু'জনকে নামাযের পর রুখে নাও। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর দ্বারা আসর নামায বুঝানো হয়েছে। ইমাম যুহরী (রাঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে ঐ দু’জন মুসলমানের মাযহাবী নামায। ভাবার্থ এই যে, এ দু’জন সাক্ষী নামাযের পর একত্রিত হবে যাতে বেশী লোকের সমাবেশে এ সাক্ষ্যদান কার্য সম্পন্ন হতে পারে। (আরবী) অর্থাৎ সাক্ষীদ্বয় সাক্ষ্যদানের সময় আল্লাহর নামে শপথ করবে। (আরবী) অর্থাৎ যদি তোমাদের সন্দেহ হয় যে, তারা দু'জন ভুল বর্ণনা দেবে বা খিয়ানত করবে, তবে ঐ সাক্ষীদ্বয়কে সেই সময় আল্লাহর নামে শপথ করে বলতে হবেঃ আমরা মিথ্যা শপথের বিনিময়ে এই নশ্বর জগতের সামান্য অর্থ উপার্জন করবো না, যদিও আমাদের এ শপথের কারণে আমাদের নিকট আত্মীয়েরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। (আরবী) অর্থাৎ আমরা আল্লাহর (আদিষ্ট) সাক্ষ্যকে গোপন করবো না। সাক্ষ্যদান কার্যের গুরুত্ব বুঝাবার জন্যেই সাক্ষ্যের সম্বন্ধ আল্লাহর সঙ্গে লাগানো হয়েছে।
(আরবী) অর্থাৎ যদি আমরা সাক্ষ্যে কোন প্রকার পরিবর্তন করি অথবা সম্পূর্ণরূপে তা গোপন করি তবে আমরা পাপীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবো।
(আরবী) অর্থাৎ যদি ঐ দু’জন সাক্ষী ও ওসীর ব্যাপারে এটা প্রমাণিত হয় যে, তারা খিয়ানত করেছে এবং মৃত ব্যক্তির মাল উত্তরাধিকারীদের নিকট পৌছাতে গিয়ে কিছু আত্মসাৎ করেছে তবে যাদের প্রাপ্য নষ্ট হয়েছে তাদের মধ্য হতে দু’জন সাক্ষী পূর্ববর্তী স্বাক্ষীদ্বয়ের স্থানে দাঁড়িয়ে যাবে। অর্থাৎ যখন সঠিক সংবাদ দ্বারা এটা প্রমাণিত হয়ে যাবে যে, পূর্ববর্তী দু’জন সাক্ষী খিয়ানত করেছে, তবে মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীদের মধ্য হতে দ’জন অতি নিকটবর্তী উত্তরাধিকারী দাড়িয়ে যাবে এবং আল্লাহর নামে শপথ করে বলবেঃ “আমাদের সাক্ষ্য তাদের (পূর্ববর্তী সাক্ষীদ্বয়ের) সাক্ষ্যের তুলনায় বিশুদ্ধতর। তারা দুজন বাস্তবিকই খিয়ানত করেছে এবং এ দোষারোপ করাতে আমরা মোটেই বাড়াবাড়ি করছি না। যদি আমরা মিথ্যা অপবাদ দেই তবে অবশ্যই আমরা পাপীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবো।` এটা যেন উত্তরাধিকারীদের পক্ষ হতে শপথ। যেমন হত্যাকারীদের পক্ষ হতে বেঈমানী সাব্যস্ত হলে নিহত ব্যক্তির অভিভাবকরা শপথ করে থাকে। এটা আহকামের বাবুল কাসামাতে স্থিরীকৃত হয়েছে।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, বানী সাহম গোত্রের একটি লোক তামীমুদ্দারী ও আদী ইবনে বিদার সঙ্গে সফরে বেরিয়েছিল। অতঃপর সাহমী লোকটি এমন এক জায়গায় মৃত্যুবরণ করে যেখানে কোন মুসলমান ছিল না। যখন তারা দু'জন তার পরিত্যক্ত সম্পদ নিয়ে স্বদেশে ফিরে আসে তখন সাহমীর পরিবারের লোকেরা রৌপ্য নির্মিত একটি পেয়ালা অনুপস্থিত দেখে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের দুজনের শপথ গ্রহণ করেন। এরপর পেয়ালাটি মক্কায় পাওয়া যায়। তাদেরকে ঐ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তারা বলেঃ “আমরা এটা তামীম ও আদীর নিকট হতে ক্রয় করে নিয়েছি। তারপর সাহমীর অভিভাবকদের মধ্য হতে দু’জন লোক দাঁড়িয়ে যায় এবং শপথ করে বলেঃ “নিশ্চয়ই আমাদের দুজনের শপথ এদের দু'জনের শপথ অপেক্ষা বেশী সত্য। নিশ্চয়ই পেয়ালাটি আমাদের সঙ্গীরই বটে।` তাদের ব্যাপারেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) ও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) তাখরীজ করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন) আবু জাফর ইবনে জারীর (রঃ) শাবী (রঃ) হতে যে ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন তা এ ঘটনাটির সত্যতা প্রমাণ করে। ঘটনাটি এই যে, বিদেশে একজন মুসলমানের মৃত্যু ঘটে। ওসী নিযুক্ত করার মত কোন মুসলমান সেখানে ছিল না। তখন মৃত্যুশয্যায় শায়িত লোকটি আহলে কিতাবের মধ্য হতে দু’জন লোককে ওসী নিযুক্ত করে। ঐ লোক দুটি কুফায় হযরত আবূ মূসা আশআরী (রাঃ)-এর নিকট হাযির হয় এবং মৃত লোকটির পরিত্যক্ত সম্পদ তাঁর নিকট পেশ করে। এ দেখে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) বলেনঃ “এরূপই একটি ঘটনা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সময় ঘটেছিল। এখন এটা হচ্ছে দ্বিতীয় ঘটনা।” সুতরাং আসরের নামাযের পর লোক দু'টিকে শপথ করানো হয়। তারা শপথ করে বলেঃ “আমরা না খিয়ানত করেছি, না মিথ্যা বলছি, না কিছু আত্মসাৎ করেছি, বরং এটাই হচ্ছে মৃত ব্যক্তির সম্পদ।” তখন তাদের শপথকে সত্য বলে মেনে নেয়া হয় এবং তাদের সাক্ষ্য অনুযায়ীই হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) ফায়সালা করেন। নবী (সঃ)-এর যুগে এরূপই ঘটনা দ্বারা তামীম ও আদীর ঘটনাকে বুঝানো হয়েছে। বলা হয়েছে, তামীমুদ্দারী (রাঃ)-এর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা হচ্ছে নবম হিজরীর। আর আশআরী (রাঃ) সম্পৰ্কীয় ঘটনাটি হচ্ছে অন্য ঘটনা। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
এ আয়াতে নির্দেশ রয়েছে যে, মরণশয্যায় শায়িত ব্যক্তি দু’জন ওসী নিযুক্ত করবে এবং দু’জন মুসলমানকে সাক্ষী রাখবে। এটা হচ্ছে বাড়ীতে অবস্থানরত সময়ের মাসআলা।
(আরবী) এ আয়াতের উপর ভিত্তি করেই একথা বলা হচ্ছে। আর সফরের ব্যাপারে বলা হয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ যদি তোমরা সফরে থাক এবং সেই সময় তোমাদের মৃত্যু নিকটবর্তী হয়, আর কোন মুসলমান সেখানে উপস্থিত না থাকে তবে সে যেন ইয়াহূদী, নাসারা যা মাজুসীদের মধ্যে হতে দু’জন লোককে ওসী নিযুক্ত করে এবং পরিত্যক্ত সম্পদ তাদের নিকট সমর্পণ করে। এখন যদি মৃত ব্যক্তির ওয়ারিসরা ঐ ওসীদ্বয়কে স্বীকার করে নেয় তবে তো ভালোই। নচেৎ বাদশাহর কাছে মোকাদ্দমা পেশ করতে হবে। এমতাবস্থায় আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ হচ্ছে- (আরবী) অর্থাৎ যদি তাদের সাক্ষ্যের সত্যতায় তোমাদের সন্দেহ হয় তবে নামাযের পর তাদেরকে শপথ করিয়ে নাও। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ মৃত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজন খ্রীষ্টান সাক্ষীদ্বয়কে অস্বীকার করেছিল এবং তাদেরকে ভয় দেখিয়েছিল ও ধমকিয়ে ছিল। তখন আবু মূসা (রাঃ) ঐ। স্বাক্ষীদ্বয়কে আসরের নামাযের পর শপথ করিয়েছিলেন। তখন আমি বলেছিলাম- তাদের কাছে আমাদের নামাযের মর্যাদা কি আছে? তাদেরকে তো তাদের নামাযের শপথ করানো উচিত। সুতরাং তারা দু'জন তাদের মাযহাবের নিময় অনুযায়ী নামায পড়ার পর শপথ করে বললোঃ “আমরা সামান্য শপথের জন্য আমাদের কসমকে বিক্রি করবো না, নতুবা আমরা পাপী হয়ে যাবো। তোমাদের সঙ্গী এ অসিয়তই করেছিল এবং এটাই তার পরিত্যক্ত সম্পদ। শপথ করার পর্বে ইমাম তাদেরকে বলে দিয়েছিলেন- “যদি তোমরা গোপন করে রাখো বা খিয়ানত কর তবে স্বীয় কওমের নিকট তোমরা অপদস্ত হবে এবং এরপর আর কখনও তোমাদের সাক্ষ্য কবুল করা হবে না। আর তোমাদেরকে শাস্তিও দেয়া হবে।”
(আরবী) অর্থাৎ এটাই এমন এক পন্থা যে, এতে সাক্ষী ঘটনা অনুযায়ী তার সাক্ষ্য প্রদান করবে এবং তার এ ভয় থাকবে যে, যদি সে ঘটনা অনুযায়ী সাক্ষ্য প্রদান না করে তবে মুসলমানদের সাক্ষ্য প্রদানের মাধ্যমে তাদের শপথকে বাতিল করে দেয়া হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যদি জানতে পারা যায় যে, তারা অবৈধ পন্থায় সত্যকে গোপন করেছে। তবে তাদের স্থলে যাদের হক নষ্ট হয়েছে তাদের মধ্য হতে দু’জন সাক্ষী দাড়িয়ে যাবে এবং তারা শপথ করে বলবে যে, কাফিরদের শপথ বাতিল এবং তারা বাড়াবাড়ি করছে না। এখন কাফিরদের সাক্ষ্য বাতিল করে দিয়ে মৃত ব্যক্তির অলীদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে। অধিকাংশ আইম্মায়ে তাবেঈন, পূর্ববর্তী গুরুজন এবং ইমাম আহমাদ (রঃ) প্রমুখের এটাই মাযহাব।
(আরবী) অর্থাৎ এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যে, তারা আল্লাহর শপথের সম্মানার্থে এবং অপদস্ত হওয়ার ভয়ে যে মতের ওয়ারিসরা তাদের কসমের মাধ্যমে তাদের কসমকে রদ করে দেবে এবং তাদেরকে শাস্তিও প্রদান করা হবে। তারা সত্য কথাই বলবে।
অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তোমরা তোমাদের সমস্ত কাজে আল্লাহকে ভয় কর এবং (আরবী) অর্থাৎ তার আনুগত্য স্বীকার করে চল।
(আরবী) অর্থাৎ যারা আল্লাহর আনুগত্য ও শরীয়তের অনুসরণ হতে বেরিয়ে যায় তিনি তাদেরকে সুপথ লাভের তাওফীক দেন না।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।