সূরা আল-মুজাদালা (আয়াত: 8)
হরকত ছাড়া:
ألم تر إلى الذين نهوا عن النجوى ثم يعودون لما نهوا عنه ويتناجون بالإثم والعدوان ومعصية الرسول وإذا جاءوك حيوك بما لم يحيك به الله ويقولون في أنفسهم لولا يعذبنا الله بما نقول حسبهم جهنم يصلونها فبئس المصير ﴿٨﴾
হরকত সহ:
اَلَمْ تَرَ اِلَی الَّذِیْنَ نُهُوْا عَنِ النَّجْوٰی ثُمَّ یَعُوْدُوْنَ لِمَا نُهُوْا عَنْهُ وَ یَتَنٰجَوْنَ بِالْاِثْمِ وَ الْعُدْوَانِ وَ مَعْصِیَتِ الرَّسُوْلِ ۫ وَ اِذَا جَآءُوْکَ حَیَّوْکَ بِمَا لَمْ یُحَیِّکَ بِهِ اللّٰهُ ۙ وَ یَقُوْلُوْنَ فِیْۤ اَنْفُسِهِمْ لَوْ لَا یُعَذِّبُنَا اللّٰهُ بِمَا نَقُوْلُ ؕ حَسْبُهُمْ جَهَنَّمُ ۚ یَصْلَوْنَهَا ۚ فَبِئْسَ الْمَصِیْرُ ﴿۸﴾
উচ্চারণ: আলাম তারা ইলাল্লাযীনা নুহূ‘আনিন্নাজওয়া-ছু ম্মা ইয়া‘ঊদূ না লিমা-নুহূ ‘আনহু ওয়া ইয়াতানা-জাওনা বিলইছমি ওয়াল ‘উদওয়া-নি ওয়া মা‘সিয়াতিররাছূলি ওয়া ইযাজাঊকা হাইইয়াওকা বিমা-লাম ইউহায়িকা বিহিল্লা-হু ওয়া ইয়াকূলূনা ফী আনফুছিহিম লাওলা-ইউ‘আযযি বুনাল্লা-হু বিমা-নাকূলু হাছবুহুম জাহান্নামু ইয়াসলাওনাহা- ফাবি’ছাল মাসীর।
আল বায়ান: তুমি কি তাদের প্রতি লক্ষ্য করনি, যাদেরকে গোপন পরামর্শ করতে নিষেধ করা হয়েছিল? তারপরও তারা তারই পুনরাবৃত্তি করল যা করতে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছিল। আর তারা পাপাচার, সীমালঙ্ঘন ও রাসূলের বিরুদ্ধাচরণের জন্য গোপন পরামর্শ করে। আর তারা যখন তোমার কাছে আসে তখন তারা তোমাকে এমন (কথার দ্বারা) অভিবাদন জানায় যেভাবে আল্লাহ তোমাকে অভিবাদন করেননি। আর তারা মনে মনে বলে, ‘আমরা যা বলি তার জন্য আল্লাহ আমাদেরকে শাস্তি দেন না কেন? তাদের জন্য জাহান্নামই যথেষ্ট। তারা তাতে প্রবেশ করবে। আর তা কতইনা নিকৃষ্ট গন্তব্যস্থল!
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৮. আপনি কি তাদেরকে লক্ষ্য করেন না, যাদেরকে গোপন পরামর্শ করতে নিষেধ করা হয়েছিল? তারপর তারা যা নিষিদ্ধ তারই পুনরাবৃত্তি করে এবং পাপাচরণ, সীমালঙ্ঘন ও রাসূলের বিরুদ্ধাচরণের জন্য গোপন পরামর্শ করে।(১) আর তারা যখন আপনার কাছে আসে তখন তারা আপনাকে এমন কথা দ্বারা অভিবাদন করে যা দ্বারা আল্লাহ আপনাকে অভিবাদন করেননি। আর তারা মনে মনে বলে, আমরা যা বলি তার জন্য আল্লাহ্ আমাদেরকে শাস্তি দেন না কেন?(২) জাহান্নামই তাদের জন্য যথেষ্ট, যেখানে তারা দগ্ধ হবে, আর কত নিকৃষ্ট সে গন্তব্যস্থল!
তাইসীরুল ক্বুরআন: তুমি কি তাদেরকে দেখনি যাদেরকে গোপন পরামর্শ করতে নিষেধ করা হয়েছিল, অতঃপর তারা আবার তাই করল যা করতে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছিল, তারা গোপনে পরামর্শ করল পাপাচার, সীমালঙ্ঘন আর রসূলকে অমান্য করা নিয়ে। তারা যখন তোমার কাছে আসে তখন তারা তোমাকে এমনভাবে সম্ভাষণ করে যেমনভাবে আল্লাহ তোমাকে সম্ভাষণ করেননি। তারা মনে মনে বলে- ‘আমরা যা বলি তার জন্য আল্লাহ আমাদেরকে ‘আযাব দেন না কেন? জাহান্নামই তাদের জন্য যথেষ্ট, তাতে তারা জ্বলবে, কতই না নিকৃষ্ট সেই গন্তব্যস্থল!
আহসানুল বায়ান: (৮) তুমি কি তাদেরকে লক্ষ্য কর না, যাদেরকে গোপন পরামর্শ করতে নিষেধ করা হয়েছিল; অতঃপর তারা যা নিষিদ্ধ তারই পুনরাবৃত্তি করে[1] এবং পাপাচরণ, সীমালংঘন ও রসূলের বিরুদ্ধাচরণের জন্য কানাকানি করে।[2] তারা যখন তোমাকে এমন শব্দ দ্বারা অভিবাদন জানায়, যার দ্বারা আল্লাহ তোমাকে অভিবাদন জানাননি।[3] তারা মনে মনে বলে, ‘আমরা যা বলি তার জন্য আল্লাহ আমাদেরকে শাস্তি দেয় না কেন?’[4] জাহান্নামই তাদের উপযুক্ত শাস্তি; সেখানে তারা প্রবেশ করবে। [5] সুতরাং কত নিকৃষ্ট সেই আবাস!
মুজিবুর রহমান: তুমি কি তাদেরকে লক্ষ্য করনা, যাদেরকে গোপন পরামর্শ করতে নিষেধ করা হয়েছিল; অতঃপর তারা যা নিষিদ্ধ তারই পুনরাবৃত্তি করে এবং পাপাচরণ, সীমা লংঘন ও রাসূলের বিরুদ্ধাচরণের জন্য কানাকানি করে। তারা যখন তোমার নিকট আসে তখন তারা তোমাকে এমন কথা দ্বারা অভিবাদন করে যদ্বারা আল্লাহ তোমাকে অভিবাদন করেননি। তারা মনে মনে বলেঃ আমরা যা বলি উহার জন্য আল্লাহ আমাদেরকে শাস্তি দেননা কেন? জাহান্নামই তাদের উপযুক্ত শাস্তি, সেখানে তারা প্রবেশ করবে, কত নিকৃষ্ট সেই আবাস!
ফযলুর রহমান: তুমি কি তাদের কথা ভেবে দেখনি, যাদেরকে গোপন পরামর্শ করতে নিষেধ করা হয়েছিল? অতঃপর তাদেরকে যা নিষেধ করা হয়েছিল তারা আবার তাই করছে এবং পাপ, বৈরিতা ও রসূলের বিরুদ্ধাচরণের জন্য গোপন পরামর্শ করছে। আর তারা যখন তোমার কাছে আসে তখন এমন কথা দ্বারা তোমাকে অভিবাদন জানায় যা দ্বারা আল্লাহ তোমাকে অভিবাদন জানাননি; আর মনে মনে বলে, “আমরা যা বলি তার জন্য আল্লাহ আমাদেরকে শাস্তি দেন না কেন?” জাহান্নামই তাদের (শাস্তির) জন্য যথেষ্ট। তারা তাতে প্রবেশ করবে। কত খারাপ সেই গন্তব্য!
মুহিউদ্দিন খান: আপনি কি ভেবে দেখেননি, যাদেরকে কানাঘুষা করতে নিষেধ করা হয়েছিল অতঃপর তারা নিষিদ্ধ কাজেরই পুনরাবৃত্তি করে এবং পাপাচার, সীমালংঘন এবং রসূলের অবাধ্যতার বিষয়েই কানাঘুষা করে। তারা যখন আপনার কাছে আসে, তখন আপনাকে এমন ভাষায় সালাম করে, যদ্দ্বারা আল্লাহ আপনাকে সালাম করেননি। তারা মনে মনে বলেঃ আমরা যা বলি, তজ্জন্যে আল্লাহ আমাদেরকে শাস্তি দেন না কেন? জাহান্নামই তাদের জন্যে যথেষ্ট। তারা তাতে প্রবেশ করবে। কতই না নিকৃষ্ট সেই জায়গা।
জহুরুল হক: তুমি কি তাদের প্রতি লক্ষ্য কর নি যাদের নিষেধ করা হয়েছিল গোপন পরামর্শ-সভা পাততে, তারপর তারা ফিরে গিয়েছিল তাতে যা করতে তাদের নিষেধ করা হয়েছিল? আর তারা সলা-পরামর্শ করছে পাপাচরণে ও শত্রুতায় ও রসূলের প্রতি বিরুদ্ধাচরণের জন্য, আর যখন তারা তোমার কাছে আসে তখন তারা তোমাকে সম্ভাষণ করে এমনভাবে যেভাবে আল্লাহ্ তোমাকে সম্ভাষণ করেন না। আর তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করে -- "কেন আল্লাহ্ আমাদের শাস্তি দেন না আমরা যা বলি সেজন্য?" তাদের জন্য জাহান্নামই যথেষ্ট -- তারা তাতেই প্রবেশ করবে, সুতরাং কত নিকৃষ্ট এই গন্তব্যস্থল!
Sahih International: Have you not considered those who were forbidden from private conversation, then they return to that which they were forbidden and converse among themselves about sin and aggression and disobedience to the Messenger? And when they come to you, they greet you with that [word] by which Allah does not greet you and say among themselves, "Why does Allah not punish us for what we say?" Sufficient for them is Hell, which they will [enter to] burn, and wretched is the destination.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৮. আপনি কি তাদেরকে লক্ষ্য করেন না, যাদেরকে গোপন পরামর্শ করতে নিষেধ করা হয়েছিল? তারপর তারা যা নিষিদ্ধ তারই পুনরাবৃত্তি করে এবং পাপাচরণ, সীমালঙ্ঘন ও রাসূলের বিরুদ্ধাচরণের জন্য গোপন পরামর্শ করে।(১) আর তারা যখন আপনার কাছে আসে তখন তারা আপনাকে এমন কথা দ্বারা অভিবাদন করে যা দ্বারা আল্লাহ আপনাকে অভিবাদন করেননি। আর তারা মনে মনে বলে, আমরা যা বলি তার জন্য আল্লাহ্ আমাদেরকে শাস্তি দেন না কেন?(২) জাহান্নামই তাদের জন্য যথেষ্ট, যেখানে তারা দগ্ধ হবে, আর কত নিকৃষ্ট সে গন্তব্যস্থল!
তাফসীর:
(১) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যেখানে তোমরা তিনজন একত্রিত সেখানে দুইজন তৃতীয় জনকে ছেড়ে পরস্পরে কানাকানি ও গোপন কথাবার্তা বলবে না, যে পর্যন্ত আরও লোক না এসে যায়। কারণ, এতে সে মনঃক্ষুন্ন হবে, সে নিজেকে পর বলে ভাববে এবং তার বিরুদ্ধেই কথাবার্তা হচ্ছে বলে সে সন্দেহ করবে।” [মুসলিম: ২১৮৪]
(২) আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস বলেন, ইয়াহূদীরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে উপস্থিত হলে السلام عليكم বলার পরিবর্তে السَّامُ عَلَيْكُمْ বলত। سامٌ শব্দের অর্থ মৃত্যু। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এ আয়াত নাযিল হয়। ইয়াহুদীরা এভাবে সালাম করে চুপিসারে বলত, আমাদের এই গোনাহের কারণে আল্লাহ আমাদেরকে শাস্তি দেন না কেন? [মুসনাদে আহমাদ: ২/১৭০]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৮) তুমি কি তাদেরকে লক্ষ্য কর না, যাদেরকে গোপন পরামর্শ করতে নিষেধ করা হয়েছিল; অতঃপর তারা যা নিষিদ্ধ তারই পুনরাবৃত্তি করে[1] এবং পাপাচরণ, সীমালংঘন ও রসূলের বিরুদ্ধাচরণের জন্য কানাকানি করে।[2] তারা যখন তোমাকে এমন শব্দ দ্বারা অভিবাদন জানায়, যার দ্বারা আল্লাহ তোমাকে অভিবাদন জানাননি।[3] তারা মনে মনে বলে, ‘আমরা যা বলি তার জন্য আল্লাহ আমাদেরকে শাস্তি দেয় না কেন?”[4] জাহান্নামই তাদের উপযুক্ত শাস্তি; সেখানে তারা প্রবেশ করবে। [5] সুতরাং কত নিকৃষ্ট সেই আবাস!
তাফসীর:
[1] এ থেকে উদ্দেশ্য মদীনার ইয়াহুদী এবং মুনাফিকবরা। যখন মুসলিমরা তাদের পাশ দিয়ে পেরিয়ে যেতেন, তখন তারা আপোসে মাথায় মাথা লাগিয়ে এমনভাবে চুপে চুপে কানাকানি করত যে, মুসলিমরা মনে করতেন তারা মনে হয় তাঁদের বিরুদ্ধে কোন ষড়যন্ত্র করছে অথবা মুসলিমদের কোন সৈন্য দলের উপর শত্রুপক্ষ আক্রমণ করে তাদের ক্ষতি সাধন করেছে, যার খবর এদের কাছে পৌঁঁছে গেছে। এতে মুসলিমরা ভয় পেয়ে যেতেন। তাই রসূল (সাঃ) তাদেরকে কানাকানি করতে নিষেধ করে দিলেন। কিন্তু কিছু দিন পর তারা পুনরায় এই নিন্দনীয় কাজের পুনরাবৃত্তি করল। আয়াতে তাদের এই নিন্দনীয় কাজের কথাই বর্ণনা করা হচ্ছে।
[2] অর্থাৎ, তাদের কানাকানি কোন সৎকর্ম বা আল্লাহভীরুতার ব্যাপারে হত না; বরং তা হত পাপ, সীমালঙ্ঘন ও রসূল (সাঃ)-এর অবাধ্যতামূলক কাজে। যেমন, কারো গীবত করা, মিথ্যা অপবাদ দেওয়া, অশ্লীল কথা-বার্তা এবং একে অপরকে রসূল (সাঃ)-এর অবাধ্যতা করার উপর উস্কানি দেওয়া ইত্যাদি।
[3] অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা অভিবাদন জানানো বা সালাম দেওয়ার তরীকা এইভাবে শিখিয়েছেন যে, তোমরা বলবে, السَّلاَمُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللهِ কিন্তু এই ইয়াহুদীরা নবী করীম (সাঃ)-এর কাছে উক্ত সালামের পরিবর্তে বলত, السَّامُ عَلَيْكُمْ অথবা السَّامُ عَلَيْكَ (তোমার উপর মৃত্যু আসুক)। তাই রসূল (সাঃ) তাদের সালামের উত্তরে কেবল বলতেন, وَعَلَيْكُمْ অথবা وَعَلَيْكَ (আর তোমারদের উপরেও) এবং মুসলিমদেরকেও তাকীদ করলেন যে, আহলে কিতাবদের কেউ তোমাদেরকে সালাম করলে, তোমরা উত্তরে কেবল বলবে, وَعَلَيْكَ। (মুসলিম, আদব অধ্যায়)
[4] অর্থাৎ, তারা আপোসে অথবা মনে মনে বলত যে, যদি মুহাম্মাদ সত্য নবী হত, তাহলে নিশ্চয় আল্লাহ আমাদের এই জঘন্য আচরণের কারণে আমাদেরকে অবশ্যই পাকড়াও করত।
[5] আল্লাহ বলেন, যদি আল্লাহ তাঁর ইচ্ছা ও পূর্ণ কৌশলের ভিত্তিতে দুনিয়াতে তাদেরকে সত্বর পাকড়াও না করেন, এ জন্য কি তারা জাহান্নামের আযাব থেকেও বেঁচে যাবে? না, কক্ষনো না। জাহান্নাম তাদের অপেক্ষায় আছে, যাতে তারা প্রবেশ করবে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৮-১০ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
মু’মিনের সকল কাজ হবে সৎ ও তাক্বওয়ার সাথে, এমনকি কোন বিষয়ে গোপন পরামর্শ করার প্রয়োজন হলেও কেননা গুনাহ ও অবাধ্যতার কাজে গোপন পরামর্শ করা মু’মিনের বৈশিষ্ট্য নয় বরং তা শয়তানের কাজ।
النَّجْوٰي (নাজওয়া) বলা হয় দুই বা ততোধিক ব্যক্তি মিলে গোপন পরামর্শ করা। এটা ভালও হতে পারে আবার খারাপও হতে পারে। আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদেরকে ভালকাজে গোপন পরামর্শ করতে অনুমতি প্রদান করেছেন আর খারাপ কাজে গোপন পরামর্শ করা নিষেধ করেছেন। তবে তিন বা ততোধিকের উপস্থিতিতে দুইজনে আলাদা হয়ে গোপন পরামর্শ করা নিষেধ, তা কোন ভাল কাজে হলেও। কারণ এতে তৃতীয়জন কষ্ট পায় ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : যখন তিনজন থাকবে তখন তৃতীয়জনকে বাদ দিয়ে দু জনে গোপন পরামর্শ করবে না। (সহীহ বুখারী হা. ৬২৮৮)
(نُهُوْا عَنِ النَّجْوٰي)
এখানে মদীনার ইয়াহূদী ও মুনাফিকদেরকে বুঝানো হযেছে। তাদের পাশ দিয়ে কোন মুসলিম অতিক্রম করে গেলে তারা বসে গোপন পরামর্শ করত। ফলে মু’মিনরা ধারণা করতো যে, তারা হয়তো আমাদের হত্যা করার জন্য গোপন পরামর্শ করছে। তাই মু’মিনরা এরূপ অবস্থা দেখলে ভয়ে পথ বর্জন করত। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের এরূপ কার্যকলাপ থেকে নিষেধ করলেন কিন্তু তারা উপেক্ষা করে তাতেই লিপ্ত হয়, তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (ইবনু কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)
ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন : আয়াতটি ইয়াহূদী ও খ্রিস্টানদের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে। তারা নিজেরা পরস্পর গোপন পরামর্শ করত আর মু’মিনদের দিকে তাকাত ও চোখ টিপ মারত। মু’মিনরা মনে করত তাদের কাছে হয়তো আমাদের ভাইদের কোন হত্যা, মসিবত বা দুঃসংবাদ পৌঁছেছে তাই তারা এরূপ করছে। এতে মু’মিনরা খুব কষ্ট অনুভব করত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে অধিক হারে অভিযোগ করতে লাগল, তিনি তাদেরকে বারণ করলেন কিন্তু তারা মানল না, তখন এ আয়াতগুলো নাযিল হয় (কুরতুবী)।
(وَإِذَا جَا۬ءُوْكَ حَيَّوْكَ....)
‘তোমার কাছে আসে তখন তারা তোমাকে এমন শব্দে অভিবাদন করে, যার দ্বারা আল্লাহ তোমাকে অভিবাদন করেননি’ ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন : ইয়াহূদীরা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলত : اَلسَّامُ عَلَيْكَ আপনার মৃত্যু হোক। এর মাধ্যমে তারা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে গালি দিত। আর বলত : আমাদের কথার কারণে যদি আল্লাহ তা‘আলা আমাদের শাস্তি না দিত! তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (আহমাদ২/১৭০, বায়হাকী ৭/১২১ হাসান)
আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : জনৈক ইয়াহূদী রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট আগমন করল এবং বলল
السام عليك يا ابا القاسم
হে আবূল কাসেম! তোমার মৃত্যু হোক। আয়িশাহ (রাঃ) বললেন :
عليك السام واللعنة
তোমার মৃত্যু হোক এবং তোমার ওপর আল্লাহ তা‘আলার লা‘নত। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন : হে আয়িশাহ আল্লাহ তা‘আলা খারাপ ও যারা খারাপ কাজ করে তাদেরকে ভালবাসেন না। আয়িশাহ (রাঃ) বলছেন : আপনি কি তাদের কথা শোনেননি তারা আপনার মৃত্যু কামনা করছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন : তুমি কি শোননি, আমি তাদের জবাবে কী বলেছি? অর্থাৎ তোমাদেরও এরূপ হোক। তখন আল্লাহ তা‘আলা এ আয়াত নাযিল করলেন। (সহীহ বুখারী হা. ৬২৫৬)
সুতরাং একজন মু’মিন অন্য মু’মিনকে এমন শব্দ দ্বারা অভিবাদন করবে যা আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শিখিয়েছেন। অমুসলিমদের তৈরি করা অভিবাদন বা শরীয়ত গর্হিত শব্দ দ্বারা অভিবাদন জানানো মুসলিমদের আচরণ নয়।
(وَيَقُوْلُوْنَ فِيْٓأَنْفُسِهِمْ لَوْلَا يُعَذِّبُنَا اللّٰهُ بِمَا نَقُوْلُ)
‘আর তারা মনে মনে বলে : কেন আল্লাহ আমাদের শাস্তি দেন না, আমরা যা বলি তার কারণে’ তারা বলে, যদি মুহাম্মাদ সত্য নাবী হত তাহলে আমরা যা বলি সেজন্য আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে শাস্তি দিতেন, আল্লাহ তা‘আলা কেন শাস্তি দিচ্ছেন না? আরো বলত, তিনি সত্য নাবী হলে তার দ্‘ুআ কবুল হয়ে যেত; ফলে আমরা মরে যেতাম। এটা তাদের জন্য আশ্চর্যজনক কথা। কারণ তারা আহলে কিতাব, তারা জানে নাবীরা কারো প্রতি রাগ করলেই তাদের জন্য দ্রুত আযাব কামনা করেন না। বরং তাদের কর্মের জন্য জাহান্নামই যথেষ্ট।
(وَيَتَنَاجَوْنَ بِالْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَمَعْصِيَتِ الرَّسُوْلِ)
‘গোপন পরামর্শ করে পাপকার্যে, সীমালঙ্ঘনে ও রাসূলের অবাধ্যাচরণে’ অর্থাৎ নিজেদের মাঝে এমন পাপ কাজের শলাপরামর্শ করত যা নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
(إِنَّمَا النَّجْوٰي مِنَ الشَّيْطٰنِ)
অর্থাৎ পাপাচার, সীমালঙ্ঘন ও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অবাধ্যতার বিষয়ে গোপন পরামর্শ করা হল শয়তানের কাজ। শয়তান তাদেরকে এ গোপন পরামর্শ করায় মু’মিনদেরকে কষ্ট দেওয়ার জন্য। তারা মু’মিনদের কোন প্রকার কষ্ট বা ক্ষতি করতে পারবে না আল্লাহ তা‘আলা ইচ্ছা না করলে। অতঃপর মু’মিনদের উচিত শয়তানের প্ররোচনায় প্রভাবিত না হয়ে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার ওপর ভরসা করা। মু’মিনরা কষ্ট পায় এমন বিষয় বা প্রেক্ষাপটে গোপন পরামর্শ করা নিষেধ। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন :
إذَا كَانُوا ثَلاَثَةٌ، فَلاَ يَتَنَاجَي اثْنَانِ دُونَ الثَّالِث فَإِنَّ ذَلِكَ يَحْزُنُهُ
যখন তোমরা তিনজন থাকবে তখন দ্বিতীয়জনকে বাদ দিয়ে গোপন পরামর্শ করিও না কেননা এতে সে চিন্তায় পতিত হবে। (সহীহ বুখারী হা. ৬২৯০)
সুতরাং মু’মিনদের প্রত্যেক কাজ হবে কল্যাণকর ও তাকওয়াপূর্ণ। তারা কখানো মানুষের ক্ষতি করবে না এবং ক্ষতি করার জন্য কাউকে গোপনে পরামর্শও দেবে না। বরং যারা অপরের ক্ষতি করার জন্য পরামর্শ দেয় তারা শয়তানের অনুসারী।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. পাপকাজ, সীমালঙ্ঘন ও রাসূলের অবাধ্য কাজে গোপন পরামর্শ করা নিষেধ।
২. সৎকাজে গোপন পরামর্শ করা বৈধ।
৩. অসৎকাজে গোপন পরামর্শ করা শয়তানের কাজ।
৪. কোন স্থানে তিনজন থাকলে একজনকে রেখে দু জন মিলে গোপন পরামর্শ করা নিষেধ, যতক্ষণ না তৃতীয়জনের অনুমতি নেয়া হয়।
৫. ভরসা করতে হবে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার ওপর, অন্য কারো ওপর নয়।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৮-১০ নং আয়াতের তাফসীর:
মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, যাদেরকে গোপন পরামর্শ করতে নিষেধ করা হয়েছিল তারা ছিল ইয়াহূদী। মুকাতিল ইবনে হাইয়ান (রঃ) বলেন যে, নবী (সঃ) ও ইয়াহুদীদের মাঝে যখন চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হয় তখন ইয়াহুদীরা এই কাজ করতে শুরু করে যে, যেখানেই তারা কোন মুসলমানকে দেখতে এবং যেখানেই কোন মুসলমান তাদের কাছে যেতো তখন তারা এদিকে-ওদিকে একত্রিত হয়ে চুপে-চুপে এবং ইশারা-ইঙ্গিতে এমনভাবে কানাকানি করতো যে, যে মুসলমান একাকী তাদের কাছে থাকতো সে ধারণা করতো যে, তারা তাকে হত্যা করারই চক্রান্ত করছে। তার আরো ধারণা হতো যে, তারা তার বিরুদ্ধে এবং অন্যান্য মুসলমানদের বিরুদ্ধে গোপন সড়যন্ত্রে লিপ্ত হচ্ছে। সুতরাং সে তাদের কাছে যেতেও ভয় কর তো। যখন সাধারণভাবে এসব অভিযোগ রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর কানে পৌছতে লাগলো তখন তিনি তাদেরকে এই ঘৃণ্য কাজে বাধা দিলেন এবং চরমভাবে নিষেধ করলেন। কিন্তু এর পরেও তারা আবার এ কাজে লেগে পড়লো।
হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেন, তিনি (তাঁর দাদা) বলেনঃ “আমরা রাত্রে পালাক্রমে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর খিতমতে হাযির হতাম, উদ্দেশ্য এই যে, রাত্রে তাঁর কোন কাজের প্রয়োজন হলে আমরা তা করে দিবো। একদা রাত্রে যাদের পালা ছিল তারা এসে গেল এবং আরো কিছু লোক সওয়াবের নিয়তে এসে পড়লো। লোক খুব বেশী একত্রিত হওয়ার কারণে আমরা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে এদিকে-ওদিকে বসে পড়লাম। প্রত্যেক দল নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করতে লাগলো। ইতিমধ্যে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) এসে পড়লেন। তিনি বললেনঃ “তোমরা কি গোপন পরামর্শ করছো? আমি কি তোমাদেরকে এর থেকে নিষেধ করিনি?” উত্তরে আমরা বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা আল্লাহর নিকট তাওবা করছি। আমরা মাসীহ দাজ্জালের আলোচনা করছিলাম। কেননা, তার ব্যাপারে আমাদের মনে খটকা লাগছে। তিনি একথা শুনে বললেনঃ “আমি তোমাদের উপর তার চেয়েও যে বিষয়ে বেশী ভয় করি তার খবর কি তোমাদেরকে দিবো না?” আমরা বললামঃ হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদেরকে আপনি ঐ খবর দিন! তিনি বললেনঃ “তা হলো গোপন শিরক। তা এই ভাবে যে, একটি লোকে দাড়িয়ে গেল এবং লোকদেরকে দেখাবার জন্যে কোন (ইবাদতের) কাজ করলো।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর ইসনাদ গারীব এবং এতে কোন কোন বর্ণনাকারী দুর্বল রয়েছেন)
এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ তারা পাপাচরণ, সীমালংঘন ও রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণের জন্যে কানাকানি করে। অর্থাৎ তারা হয়তো পাপের কাজের উপর কানাকানি করে যাতে তাদের নিজেদেরই ক্ষতি হয়, কিংবা হয়তো যুলুমের কাজে কানাকানি করে যাতে তারা অন্যদের ক্ষতি সাধনের ষড়যন্ত্র করে, অথবা তারা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণের উপর কানাকানি করে এবং তার বিরুদ্ধাচরণ করতে একে অপরকে পাকিয়ে তোলে।
আল্লাহ্ তা'আলা ঐ পাপী ও বদ লোকদের আর একটি জঘন্য আচরণের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তারা সালামের শব্দের পরিবর্তন ঘটিয়ে থাকে। তারা রাসূল (সঃ)-কে এমন কথা দ্বারা অভিবাদন করে যদদ্বারা আল্লাহ্ তাঁকে অভিবাদন করেননি।
হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা কয়েকজন ইয়াহূদী রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে বলেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আবুল কাসেম (সঃ)! তোমার মৃত্যু হোক (তাদের উপর আল্লাহর লা'নত বর্ষিত হোক!)” তখন হযরত আয়েশা (রাঃ) প্রতি উত্তরে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের মৃত্যু হোক।” একথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “হে আয়েশা (রাঃ)! নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা মন্দ বচন ও কঠোর উক্তিকে অপছন্দ করেন। হযরত আয়েশা (রাঃ)! তখন বলেনঃ “আপনি কি শুনেননি যে, তারা আপনাকে (আরবী) বলেছে?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “তুমি কি শুননি যে, আমি তাদেরকে (আরবী) বলেছি?” তখন আল্লাহ্ তা'আলা ... (আরবী)আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। (এ হাদীসটিও ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
সহীহ্ এর মধ্যে অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেছিলেনঃ (আরবী)
এবং রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছিলেনঃ “তাদের ব্যাপারে আমাদের দু'আ কবুল হয়েছে এবং আমাদের ব্যাপারে তাদের দু'আ কবূল হয়নি।”
হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁর সাহাবীবর্গসহ বসেছিলেন এমতাবস্থায় একজন ইয়াহূদী এসে তাদেরকে সালাম করলো। তারা তার সালামের উত্তর দিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “সে কি বললো তা কি তোমরা জান?” তাঁরা উত্তরে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সে তো সালাম করলো।” তিনি বললেনঃ “বরং সে (আরবী) বলেছে। অর্থাৎ ‘তোমাদের ধর্ম মিটে যাক’ বা ‘তোমাদের ধর্মের পরাজয় ঘটুক।” অতঃপর তিনি বললেনঃ “তাকে ডেকে আনেনা।” তখন সহাবীগণ (রাঃ) তাকে ডেকে আনলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তখন তাকে বললেনঃ “তুমি কি বলেছো?” সে উত্তরে বললোঃ “হ্যাঁ।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবাদেরকে বললেনঃ “যদি আলে কিতাবদের কেউ তোমাদেরকে সালাম দেয় তবে তোমরা বলবেঃ অর্থাৎ ‘তোমার উপরও ওটাই যা তুমি বললে'।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সহীহ্ গ্রন্থেও এ হাদীসটি হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে অনুরূপ বর্ণিত আছে)
ঐ লোকগুলো নিজেদের কৃতকর্মের উপর খুশী হয়ে মনে মনে বলতোঃ যদি ইনি সত্যি আল্লাহর নবী হতেন তবে আমাদের এই চক্রান্তের কারণে আল্লাহ তা'আলা অবশ্যই দুনিয়াতেই আমাদেরকে শাস্তি দিতেন। কেননা, আল্লাহ তা'আলা তো আমাদের ভিতরের অবস্থা সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল।
তাই আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেন যে, তাদের জন্যে পরকালের শাস্তিই যথেষ্ট, যেখানে তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। কত নিকৃষ্ট সেই আবাস!
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এই আয়াতের শানে নুযূল হলো ইয়াহূদের এই ভাবে সালাম দেয়ার পদ্ধতি। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মুনাফিকরা এভাবেই সালাম দিতো।
এরপর আল্লাহ্ তা'আলা মুমিনদেরকে আদব শিক্ষা দিচ্ছেন। বলছেনঃ হে মুমিনগণ! তোমরা এই মুনাফিক ও ইয়াহূদীদের মত কাজ করো না। তোমরা যখন গোপনে পরামর্শ কর তখন সেই পরামর্শ যেন পাপাচরণ, সীমালংঘন ও রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণ সম্পর্কে না হয়। তোমরা কল্যাণকর কাজ ও তাকওয়া অবলম্বনের পরামর্শ করবে। তোমাদের সদা-সর্বদা আল্লাহকে ভয় করে চলা উচিত যার কাছে তোমাদের সকলকেই একত্রিত হতে হবে, যিনি ঐ সময় তোমাদেরকে প্রত্যেক পুণ্য ও পাপের পুরস্কার ও শাস্তি প্রদান করবেন। আর তোমাদের সমস্ত কাজ-কর্ম ও কথাবর্তা সম্পর্কে তোমাদেরকে তিনি অবহিত করবেন। তোমরা যদিও ভুলে গেছো, কিন্তু তাঁর কাছে সবই রক্ষিত ও বিদ্যমান রয়েছে।
হযরত সাফওয়ান (রঃ) বলেনঃ “আমি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)-এর হাত ধারণ করেছিলাম এমন সময় একটি লোক এসে তাকে জিজ্ঞেস করলোঃ “কিয়ামতের দিন যে আল্লাহ্ তা'আলার সাথে মুমিনদের কানাকানি হবে এ সম্পর্কে আপনি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হতে কি শুনেছেন?” হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে উমার (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, আল্লাহ তাআলা মুমিনকে নিজের কাছে ডেকে নিবেন এবং তাকে তার এমনই কাছে করবেন যে, স্বীয় হস্ত তার উপর রেখে দিবেন এবং লোকেদের হতে তাকে পর্দা করবেন। অতঃপর তাঁকে গুনাহসমূহ স্বীকার করিয়ে নিবেন। তাকে তিনি জিজ্ঞেস করবেনঃ “তোমার অমুক অমুক পাপ কর্মের কথা মনে আছে কি?” এভাবে তিনি তাকে প্রশ্ন করতে থাকবেন এবং সে স্বীকার করতে থাকবে। আর সে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার চিন্তায় ভীত-বিহ্বল হয়ে পড়বে। ইতিমধ্যে মহান আল্লাহ্ তাকে বলবেনঃ “দেখো, দুনিয়ায় আমি তোমার এসব গুনাহ্ ঢেকে রেখেছিলাম এবং আজ আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম।” অতঃপর তাকে তার পুণ্যসমূহের আমলনামা প্রদান করা হবে। কিন্তু কাফির ও মুনাফিকদের ব্যাপারে সাক্ষীগণ ঘোষণা করবেঃ “এরা হলো ঐ সব লোক যারা তাদের প্রতিপালকের উপর মিথ্যা আরোপ করতো, জেনে রেখো যে, অত্যাচারীদের উপর আল্লাহর লা'নত'।` (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) তাঁদের সহীহ্ গ্রন্থে কাতাদাহ (রঃ)-এর হাদীস হতে এটা তাখরীজ করেছেন)
এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ শয়তানের প্ররোচনায় হয় এই গোপন পরামর্শ, মুমিনদেরকে দুঃখ দেয়ার জন্যে। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার এই যে, আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত শয়তান বা অন্য কেউ তাদের সমান্যতম ক্ষতি সাধনেও সক্ষম নয়। মুমিনরা যদি এরূপ কোন কার্যকলাপের আভাস পায় তবে তারা যেন (আরবী) পাঠ করে ও আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে এবং তাঁরই উপর ভরসা করে। এরূপ করলে ইনশাআল্লাহ্ শয়তান তাদের কোনই ক্ষতি করতে পারবে না।
যে কানাকানির কারণে কোন মুসলমানের মনে কষ্ট হয় এবং সে তা অপছন্দ করে এরূপ কানাকানি হতে হাদীসে নিষেধ করা হয়েছে। যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তোমরা তিনজন থাকবে তখন যেন দুইজন একজনকে বাদ দিয়ে কানাকানি না করে, কেননা এতে ঐ তৃতীয় ব্যক্তির মনে কষ্ট হয়।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) আমাশ (রঃ)-এর হাদীস হতে এটা তাখরীজ করেছেন)
হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যখন তোমরা তিনজন থাকবে তখন যেন দুইজন তৃতীয় জনের অনুমতি ছাড়া তাকে বাদ দিয়ে কানাকানি করে। কেননা, এতে সে মনে দুঃখ ও ব্যথা পায়।” (এ হাদীসটি আবদুর রাযযাক (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন)
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।