আল কুরআন


সূরা আল-হাদীদ (আয়াত: 28)

সূরা আল-হাদীদ (আয়াত: 28)



হরকত ছাড়া:

يا أيها الذين آمنوا اتقوا الله وآمنوا برسوله يؤتكم كفلين من رحمته ويجعل لكم نورا تمشون به ويغفر لكم والله غفور رحيم ﴿٢٨﴾




হরকত সহ:

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللّٰهَ وَ اٰمِنُوْا بِرَسُوْلِهٖ یُؤْتِکُمْ کِفْلَیْنِ مِنْ رَّحْمَتِهٖ وَ یَجْعَلْ لَّکُمْ نُوْرًا تَمْشُوْنَ بِهٖ وَ یَغْفِرْ لَکُمْ ؕ وَ اللّٰهُ غَفُوْرٌ رَّحِیْمٌ ﴿ۚۙ۲۸﴾




উচ্চারণ: ইয়া আইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানুত্তাকুল্লা-হা ওয়া আ-মিনূবিরাছুলিহী ইউ’তিকুম কিফলাইনি মির রাহমাতিহী ওয়া ইয়াজ‘আল্লাকুম নূরান তামশূনা বিহী ওয়া ইয়াগফির লাকুম ওয়াল্লা-হু গাফূরুর রাহীম।




আল বায়ান: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আন, তিনি স্বীয় রহমতে তোমাদেরকে দ্বিগুণ পুরস্কার দেবেন, আর তোমাদেরকে নূর দেবেন যার সাহায্যে তোমরা চলতে পারবে এবং তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২৮. হে মুমিনগণ! আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং তার রাসূলের উপর ঈমান আন। তিনি তার অনুগ্রহে তোমাদেরকে দেবেন দ্বিগুণ পুরস্কার(১) এবং তিনি তোমাদেরকে দেবেন নূর, যার সাহায্যে তোমরা চলবে।(২) এবং তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।




তাইসীরুল ক্বুরআন: ওহে মু’মিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর আর তাঁর রসূলের প্রতি ঈমান আন, তিনি তাঁর অনুগ্রহে তোমাদেরকে দ্বিগুণ পুরস্কার দিবেন আর তিনি তোমাদের জন্য আলোর ব্যবস্থা করবেন যা দিয়ে তোমরা পথ চলবে, আর তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিবেন। আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু।




আহসানুল বায়ান: (২৮) হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁর রসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর; তিনি তোমাদেরকে তাঁর অনুগ্রহ দ্বিগুণ দান করবেন[1] এবং তিনি তোমাদেরকে দেবেন আলো, যার সাহায্যে তোমরা চলাফেরা করবে এবং তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। আর আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।



মুজিবুর রহমান: হে মু’মিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর। তিনি তাঁর অনুগ্রহে তোমাদেরকে দিবেন দ্বিগুণ পুরস্কার এবং তিনি তোমাদেরকে দিবেন আলো, যার সাহায্যে তোমরা চলবে এবং তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।



ফযলুর রহমান: হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং তাঁর রসূলকে বিশ্বাস কর। তাহলে স্বীয় অনুগ্রহে তিনি তোমাদেরকে দ্বিগুণ (প্রতিদান) দেবেন এবং তোমাদেরকে এমন এক আলো দান করবেন যার সাহায্যে তোমরা পথ চলতে পারবে। আর তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।



মুহিউদ্দিন খান: মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁর রসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর। তিনি নিজে অনুগ্রহের দ্বিগুণ অংশ তোমাদেরকে দিবেন, তোমাদেরকে দিবেন জ্যোতি, যার সাহায্যে তোমরা চলবে এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়াময়।



জহুরুল হক: ওহে যারা ঈমান এনেছ! আল্লাহ্‌কে ভয়ভক্তি করো এবং তাঁর রসূলের প্রতি বিশ্বাসস্থাপন করো, তিনি তাঁর করুণা থেকে দুটি অংশ তোমাদের প্রদান করবেন, আর তোমাদের জন্য তিনি একটি আলোক স্থাপন করবেন যার মধ্যে তোমরা পথ চলতে পারো, এবং তিনি তোমাদের পরিত্রাণ করতে পারেন। আর আল্লাহ্ পরিত্রাণকারী, অফুরন্ত ফলদাতা --



Sahih International: O you who have believed, fear Allah and believe in His Messenger; He will [then] give you a double portion of His mercy and make for you a light by which you will walk and forgive you; and Allah is Forgiving and Merciful.



তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।


তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ২৮. হে মুমিনগণ! আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং তার রাসূলের উপর ঈমান আন। তিনি তার অনুগ্রহে তোমাদেরকে দেবেন দ্বিগুণ পুরস্কার(১) এবং তিনি তোমাদেরকে দেবেন নূর, যার সাহায্যে তোমরা চলবে।(২) এবং তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।


তাফসীর:

(১) এই আয়াতে ঈসা আলাইহিস সালাম-এর প্রতি ঈমানদার কিতাবী মুমিনগণকে সম্বোধন করা হয়েছে। যদিও (يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا) বলে কেবল মুসলিমগণকে সম্বোধন করাই পবিত্র কুরআনের সাধারণ রীতি। কিন্তু আলোচ্য আয়াতে এই সাধারন রীতির বিপরীতে নাসারাদের জন্য (يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। সম্ভবতঃ এর রহস্য এই যে, পরবর্তী বাক্যে তাদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি ঈমান আনার আদেশ দেয়া হয়েছে। কারণ, এটাই ঈসা আলাইহিস সালাম-এর প্রতি বিশুদ্ধ ঈমানের দাবী। তারা যদি তা করে, তবে তারা উপরোক্ত সম্বোধনের যোগ্য হয়ে যাবে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করলে তাদেরকে দ্বিগুণ পুরস্কার ও সওয়াব দানের ওয়াদা করা হয়েছে। [দেখুন: ফাতহুল কাদীর; কুরতুবী]


(২) অর্থাৎ পৃথিবীতে জ্ঞান ও দূরদৃষ্টির এমন ‘নূর’ দান করবেন যার আলোতে তোমরা প্রতি পদক্ষেপে স্পষ্ট দেখতে পাবে জ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাহেলিয়াতের বাঁকা পথ -সমূহের মধ্যে ইসলামের সরল সোজা পথ কোনটি। আর আখেরাতে এমন ‘নূর’ দান করবেন যার মাধ্যমে পুল সিরাতের অন্ধকার রাস্তা পার হয়ে জান্নাতে যেতে পারবে। [দেখুন: কুরতুবী]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (২৮) হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁর রসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর; তিনি তোমাদেরকে তাঁর অনুগ্রহ দ্বিগুণ দান করবেন[1] এবং তিনি তোমাদেরকে দেবেন আলো, যার সাহায্যে তোমরা চলাফেরা করবে এবং তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। আর আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।


তাফসীর:

[1] এই দ্বিগুণ প্রতিদান সেই ঈমানদাররা লাভ করবেন, যাঁরা নবী (সাঃ)-এর পূর্বে কোন রসূলের উপর ঈমান রাখতেন। অতঃপর নবী করীম (সাঃ)-এর উপরেও ঈমান আনয়ন করেন। যেমন, এ কথা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। (বুখারীঃ ইলম অধ্যায়, মুসলিমঃ ঈমান অধ্যায়) অন্য এক ব্যাখ্যানুযায়ী জানা যায় যে, যখন কিতাবধারীরা এ কথার উপর অহংকার প্রদর্শন করল যে, তারা দ্বিগুণ সওয়াব লাভ করবে, তখন মহান আল্লাহ মুসলিমদের ক্ষেত্রে এই আয়াত অবতীর্ণ করলেন।

(বিস্তারিত জানার জন্য দ্রষ্টব্য, তাফসীর ইবনে কাসীর)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ২৮-২৯ নম্বর আয়াতের তাফসীর :



অত্র আয়াতদ্বয়ে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর প্রতি ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনা এবং তাঁকে ভয় করে চলার ফযীলত বর্ণনা করছেন। ইবনু আব্বাস (রাঃ) ও যহহাক (রহঃ) বলেন : আয়াতে উল্লিখিত ফযীলত ঐ সকল আহলে কিতাবদের জন্য যারা তাদের নাবী মূসা ও ঈসা (আঃ)-এর প্রতি ঈমান এনেছিল, তাওরাত ও ইঞ্জিল অনুপাতে আমল করত, অতঃপর নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আগমনের পর তাঁর প্রতি ঈমান আনল ও তাঁর অনুসরণ করল। ইবনু জারীর (রহঃ) এ মত সমর্থন করেছেন।



হাদীসে এসেছে তিন শ্রেণির মানুষকে দ্বিগুণ প্রতিদান প্রদান করা হবে, তার মধ্যে একশ্রেণি হল ঐ আহলে কিতাব যে তার নাবীর প্রতি ঈমান এনেছে এবং নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি ঈমান এনেছে। (সহীহ বুখারী হা. ৮২, সহীহ মুসলিম হা. ২৪১)



তবে অধিকাংশ মুফাসসিরগণ এ মত পোষণ করেছেন যে, অত্র আয়াতে উল্লিখিত ফযীলত এ উম্মতের মু’মিন মুত্তাকীদের জন্য। আহলে কিতাবদের মু’মিনদেরকে দ্বিগুণ প্রতিদান দেওয়া হবে সে সম্পর্কে সূরা কাসাসের ৫২-৫৫ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করা আছে। সাঈদ বিন যুবাইর (রহঃ) বলেন : যখন আহলে কিতাবগণ এ গর্ব করতে লাগল যে, তাদেরকে দ্বিগুণ প্রতিদান দেওয়া হবে তখন এ উম্মতের জন্য অত্র আয়াত নাযিল করলেন। (ইবনু কাসীর)



আল্লামা শানকিতী (রহঃ) বলেন : যারা অত্র আয়াতকে আহলে কিতাবদের ফযীলত হিসাবে উল্লেখ করে তারা ভুল করে। (আযওয়াউল বায়ান)



সুতরাং উম্মাতে মুহাম্মাদির কোন মু’মিন ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করলে এবং সঠিক ঈমান ও আমল করলে আহলে কিতাবের চেয়ে বেশি নেকী দেবেন। হাদীসে আহলে কিতাবের চেয়ে উম্মতে মুহাম্মাদির অনেক বেশি ফযীলত বর্ণিত হয়েছে। অন্যতম একটি হাদীস হল সহীহ বুখারীর এই হাদীস-



>مَثَلُكُمْ وَمَثَلُ أَهْلِ الْكِتَابَيْنِ كَمَثَلِ رَجُلٍ اسْتَأْجَرَ أُجَرَاءَ فَقَالَ مَنْ يَعْمَلُ لِي مِنْ غُدْوَةَ إِلَي نِصْفِ النَّهَارِ عَلَي قِيرَاطٍ فَعَمِلَتْ الْيَهُودُ ثُمَّ قَالَ مَنْ يَعْمَلُ لِي مِنْ نِصْفِ النَّهَارِ إِلَي صَلَاةِ الْعَصْرِ عَلَي قِيرَاطٍ فَعَمِلَتْ النَّصَارَي ثُمَّ قَالَ مَنْ يَعْمَلُ لِي مِنْ الْعَصْرِ إِلَي أَنْ تَغِيبَ الشَّمْسُ عَلَي قِيرَاطَيْنِ فَأَنْتُمْ هُمْ فَغَضِبَتْ الْيَهُودُ وَالنَّصَارَي فَقَالُوا مَا لَنَا أَكْثَرَ عَمَلًا وَأَقَلَّ عَطَاءً قَالَ هَلْ نَقَصْتُكُمْ مِنْ حَقِّكُمْ قَالُوا لَا قَالَ فَذَلِكَ فَضْلِي أُوتِيهِ مَنْ أَشَاءُ-



তোমরা ও উভয় আহলে কিতাব (ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টান)-এর উদাহরণ হল এমন এক ব্যক্তির মতো, যে কয়েকজন মজদুরকে কাজে নিয়োগ করে বলল, সকাল হতে দুপুর পর্যন্ত এক কিরাত পারিশ্রমিকের বিনিময়ে আমার কাজ কে করবে? তখন ইয়াহুদী কাজ করে দিল। তারপর সে ব্যক্তি বলল, কে আছ যে দুপুর হতে আসর পর্যন্ত এক কিরাতের বিনিময়ে কাজ করে দেবে? তখন খ্রিষ্টান কাজ করে দিল। তারপর সে ব্যক্তি বলল, কে আছ যে আসর হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত দুই কিরাত পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কাজ করবে? আর তোমরাই হলে (মুসলমান) তারা (যারা অল্প পরিশ্রমে অধিক পারিশ্রমিক লাভ করলে) তাতে ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানরা রাগান্বিত হল। তারা বলল, এটা কেমন কথা, আমরা কাজ করলাম বেশি, অথচ পারিশ্রমিক পেলাম কম? তখন সে ব্যক্তি (নিয়োগকর্তা) বলল, আমি তোমাদের প্রাপ্য কম দিয়েছি? তারা বলল, না। তখন সে বলল, সেটা তো আমার অনুগ্রহ, যাকে ইচ্ছা দান করি। (বুখারী ২২৬৮ নম্বর হাদীস)



(وَيَجْعَلْ لَّكُمْ نُوْرًا تَمْشُوْنَ بِه۪)



‘তিনি তোমাদেরকে আলো দেবেন’ অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা তোমাদেরকে জ্ঞান, হিদায়াত ও সুষ্পষ্ট বর্ণনা দেবেন যার দ্বারা অজ্ঞতার অন্ধকারে চলতে পারবে, ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন : নূর হল কুরআন। আবার বলা হয় এমন আলো যার দ্বারা আখিরাতে পুলসিরাতে হাঁটবে। আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।



(لِّئَلَّا يَعْلَم) এখানের لا (লা) অক্ষরটি অতিরিক্ত, মূল ইবারতটি হল



ليعلم اهل الكتاب انهم لا يقدرون علي ان ينالوا شيءا من فضل الله



কিতাবীগণ যেন জানতে পারে, আল্লাহ তা‘আলার সামান্যতম অনুগ্রহের ওপরও তাদের কোন অধিকার নেই। সকল অনুগ্রহ আল্লাহ তা‘আলার হাতে, তিনি যাকে ইচ্ছা দান করেন। সুতরাং তোমাদের ওপর উম্মাতে মুহাম্মাদীকে বেশি মর্যাদা দেওয়া হয়েছে এতে হিংসা-বিদ্বেষের কোন কারণ নেই। হাদীসে এসেছে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : তোমাদের পূর্বে যারা বসবাস করেছে তাদের তুলনায় দুনিয়াতে তোমাদের অবস্থান হল তেমন আছরের পর থেকে সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত যতটুকু সময়। তাওরাত ধারীদেরকে তাওরাত প্রদান করা হয়েছে তারা তাওরাত অনুযায়ী অর্ধদিন আমল করেছে, তারপর আমল করতে অপারগ হয়ে গেছে। ফলে তাদের আমলের বিনিময়ে এক কিরাত পারিশ্রমিক প্রদান করা হয়েছে। তারপর ইঞ্জিল ধারীদেরকে ইঞ্জিল প্রদান করা হয়েছে, তারা ইঞ্জিল অনুপাতে আছর পর্যন্ত আমল করেছে, তারপর অপারগ হয়ে গেছে। ফলে তাদের পারিশ্রমিক এক কিরাত প্রদান করা হয়েছে। তারপর তোমাদেরকে কুরআন প্রদান করা হয়েছে, তোমরা কুরআন অনুপাতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আমল করেছ। ফলে তোমাদেরকে দু কিরাত পারিশ্রমিক প্রদান করা হয়েছে। তাওরাতধারীরা বলল : হে আমাদের প্রভু! তারা কম সময় আমল করেছে, কিন্তু প্রতিদান পেয়েছে বেশি। আল্লাহ তা‘আলা বললেন : তোমাদের ওপর কি জুলুম করা হয়েছে। তারা বলল : না, আল্লাহ তা‘আলা বললেন : এটা হল আমার অনুগ্রহ, যাকে ইচ্ছা আমি তা দিয়ে থাকি। (সহীহ বুখারী হা. ৭৪৬৭)



উম্মাতে মুহাম্মাদীর মু’মিন ব্যক্তিরা কম সময় আমল করবে কিন্তু তাদের প্রতিদান পূর্ববর্তী আহলে কিতাবদের চেয়ে অনেক বেশি। সুতরাং আমাদের এ নেয়ামতের প্রশংসাসহ বেশি বেশি সৎআমল করা উচিত।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :



১. আল্লাহ তা‘আলা ও নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর সঠিক ঈমান এনে আল্লাহ তা‘আলার আদেশ পালন ও নিষেধ বর্জন করত তাঁকে যথাযথ ভয় করে চললে দ্বিগুণ প্রতিদান, সঠিক পথে চলতে পারলে আলোকবির্তকা ও অপরাধ ক্ষমা করে দেবেন।

২. সকল নেয়ামত ও অনুগ্রহের মালিক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা।

৩. উম্মাতে মুহাম্মাদীর অন্যতম একটি ফযীলত হল তারা সকল উম্মতের চেয়ে বেশি মর্যাদাবান, তারা কম সময় আমল করেও বেশি সময় আমলকারীদের চেয়ে অনেক বেশি প্রতিদান পাবে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ২৮-২৯ নং আয়াতের তাফসীর:

এর পূর্ববর্তী আয়াতে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ যে মুমিনদের বর্ণনা এখানে দেয়া হয়েছে এর দ্বারা আহলে কিতাবের মুমিনদেরকে বুঝানো হয়েছে এবং তারা দ্বিগুণ পুরস্কার লাভ করবে। যেমন সূরায়ে কাসাসের আয়াতে রয়েছে। আর যেমন একটি হাদীসে হযরত আবু মুসা। আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তিন ব্যক্তিকে। আল্লাহ দ্বিগুণ প্রতিদান প্রদান করবেন। (এক) ঐ আহলে কিতাব, যে তার নবী (আঃ)-এর উপর ঈমান এনেছে, তারপর আমার উপরও ঈমান আনয়ন করেছে। সে দ্বিগুণ বিনিময় লাভ করবে। (দুই) ঐ গোলাম, যে আল্লাহ তা'আলার হক আদায় করে এবং তার মনিবের হক আদায় করে। তার জন্যে রয়েছে দ্বিগুণ পুরস্কার। (তিন) ঐ ব্যক্তি, যে তার ক্রীতদাসীকে আদব শিক্ষা দিয়েছে এবং খুব ভাল আদব অর্থাৎ শরয়ী আদব শিখিয়েছে। অতঃপর তাকে আযাদ করে দিয়ে বিয়ে করে নিয়েছে। তার জন্যেও দ্বিগুণ প্রতিদান রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) তাখরীজ করেছেন)

হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেন যে, আহলে কিতাব যখন দ্বিগুণ প্রতিদান প্রাপ্তির কারণে গর্ব ও ফখর করতে শুরু করে তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। সুতরাং এই উম্মতকে দ্বিগুণ প্রতিদান প্রদানের পর হিদায়াতের নূর দেয়ারও ওয়াদা দেয়া হলো এবং সাথে সাথে ক্ষমা করে দেয়ারও ওয়াদা আল্লাহ। পাক করলেন। সুতরাং এই উম্মতকে নূর ও মাগফিরাত এ দু’টি অতিরিক্ত দেয়া হলো। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন) যেমন আল্লাহ তাআলা অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী)

অর্থাৎ “হে ঈমানদারগণ!. যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর তবে তিনি তোমাদের জন্যে ফুরকান (হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্যকারী) করবেন, তোমাদের অপরাধ মার্জনা করবেন ও তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিবেন এবং আল্লাহ বড় অনুগ্রহশীল।” (৮:২৯)।

হযরত সাঈদ ইবনে আবদিল আযীয (রঃ) বলেন যে, হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) ইয়াহূদীদের একজন বড় আলেমকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদেরকে একটি পুণ্যের বিনিময়ে সর্বাধিক কতগুণ প্রদান করা হয়?` সে উত্তরে বলেনঃ “সাড়ে তিনশগুণ পর্যন্ত।” তখন হযরত উমার (রাঃ) আল্লাহ তা'আলার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তোমাদের দ্বিগুণ দিয়েছেন।” হযরত সাঈদ (রঃ) এটা বর্ণনা করার পর মহামহিমান্বিত আল্লাহর
(আরবী)-এই উক্তিটিই তিলাওয়াত করেন।

হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের এবং ইয়াহূদী ও নাসারাদের দৃষ্টান্ত হলো ঐ ব্যক্তির ন্যায় যে তার কোন একটি কাজে কতকগুলো মজুর নিয়োগ করার ইচ্ছা করলো। অতঃপর সে ঘোষণা করলোঃ “এমন কেউ আছে কি যে আমার নিকট হতে এক কীরাত (এক আউন্সের চব্বিশ ভাগের এক ভাগ পরিমাণ ওজন) গ্রহণ করবে এবং এর বিনিময়ে ফজরের নামায হতে নিয়ে দুপুর পর্যন্ত আমার কাজ করবে?” তার এ ঘোষণা শুনে ইয়াহূদরা প্রস্তুত হয়ে গেল। সে আবার ঘোষণা করলোঃ “যে যোহর হতে আসর পর্যন্ত কাজ করবে তাকে আমি এক কীরাত প্রদান করবে।” এতে নাসারাগণ প্রস্তুত হলো এবং কাজ করলো (ও মজুরী নিলো)। পুনরায় লোকটি। ঘোষণা করলোঃ “আসর হতে মাগরিব পর্যন্ত যে কাজ করবে তাকে আমি দুই কীরাত প্রদান করবে।” তখন তোমরা (মুসলমানরা) কাজ করলে। এই ইয়াহূদী ও নাসারারা খুবই অসন্তুষ্ট হলো। তারা বলতে লাগলোঃ “আমরা কাজ করলাম বেশী এবং পারিশ্রমিক পেলাম কম, তারা কাজ করলো কম এবং পারিশ্রমিক পেলো বেশী।” তখন তাদেরকে বলা হলো তোমাদের হক কি নষ্ট করা হয়েছে?” তারা উত্তরে বললোঃ “না, আমাদের হক নষ্ট করা হয়নি বটে।” তখন তাদেরকে বলা হলোঃ “তাহলে এটা হলো আমার অনুগ্রহ, আমি যাকে ইচ্ছা এটা প্রদান করে থাকি।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

হযরত আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেন, মুসলমান এবং ইয়াহুদী ও নাসারাদের দৃষ্টান্ত হলো ঐ ব্যক্তির মত যে তার কোন কাজে কতকগুলো লোককে নিয়োগ করলো এবং পারিশ্রমিক নির্ধারণ করলো। আর বললোঃ “তোমরা সারা দিন কাজ করবে। তারা কাজে লেগে গেল। কিন্তু অর্ধদিন কাজ করার পর তারা বললোঃ “আমরা আর কাজ করবে না এবং যেটুকু কাজ করেছি পারিশ্রমিকও নিবো না।” লোকটি তাদেরকে বুঝিয়ে বললোঃ “এরূপ করো না, বরং কাজ পূর্ণ কর এবং মজুরীও নিয়ে নাও।” কিন্তু তারা পরিষ্কারভাবে অস্বীকার করলো এবং আধা কাজ ফেলে দিয়ে মজুরী না নিয়ে চলে গেল। সে তখন অন্য লোকদেরকে কাজে লাগিয়ে দিলো এবং বললোঃ “তোমরা সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করবে এবং পুরো এক দিনেরই মজুরী পাবে।” এ লোকগুলো কাজে লেগে গেল। কিন্তু আসরের সময়েই তারা কাজ ছেড়ে দিয়ে বললোঃ “আমরা আজ কাজ করতে পারবো না এবং মজুরীও নিবো না। লোকটি খুব বুঝালো এবং বললোঃ “দেখো, এখন দিনের তো আর বেশী অংশ বাকী নেই। তোমরা কাজ কর এবং পারিশ্রমিক নিয়ে নাও।” কিন্তু তারা মানলো না এবং মজুরী না নিয়েই চলে গেল। লোকটি আবার অন্যদেরকে কাজে নিয়োগ করলো এবং বললোঃ “তোমরা মাগরিব পর্যন্ত কাজ করবে এবং পুরো দিনের মজুরী পাবে।” অতঃপর তারা মাগরিব পর্যন্ত কাজ করলো এবং পূর্বের দুটি দলের মজুরীও নিয়ে নিলো। সুতরাং এটা হলো তাদের দৃষ্টান্ত এবং ঐ নূরের দৃষ্টান্ত যা তারা কবুল করলো।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে)

এ জন্যেই আল্লাহ তাআলা এখানে বলেনঃ এটা এই জন্যে যে, কিতাবীগণ যেন জানতে পারে, আল্লাহর সামান্যতম অনুগ্রহের উপরেও তাদের কোন অধিকার নেই এবং এটাও যেন তারা জানতে পারে যে, অনুগ্রহ আল্লাহরই ইখতিয়ারে। তাঁর অনুগ্রহের হিসাব কেউই লাগাতে পারে না। তিনি তাঁর অনুগ্রহ যাকে ইচ্ছা দান করে থাকেন। আল্লাহ মহাঅনুগ্রহশীল।

ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, (আরবী) এখানে (আরবী) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর (আরবী) কিরআতে রয়েছে। অনুরূপভাবে হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) এবং হযরত আতা ইবনে আবদিল্লাহ (রঃ) হতেও এই কিরআতই বর্ণিত আছে। উদ্দেশ্য এটাই যে, আরবের কালামে (আরবী) শব্দটি (আরবী)-এর জন্যে এসে থাকে, যা কালামের শুরুতে ও শেষে আসে এবং তখন অস্বীকৃতি উদ্দেশ্য হয় না। যেমন আল্লাহ পাকের (আরবী) এবং (আরবী) -এই উক্তিগুলোতে রয়েছে।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।