সূরা আল-হাদীদ (আয়াত: 21)
হরকত ছাড়া:
سابقوا إلى مغفرة من ربكم وجنة عرضها كعرض السماء والأرض أعدت للذين آمنوا بالله ورسله ذلك فضل الله يؤتيه من يشاء والله ذو الفضل العظيم ﴿٢١﴾
হরকত সহ:
سَابِقُوْۤا اِلٰی مَغْفِرَۃٍ مِّنْ رَّبِّکُمْ وَ جَنَّۃٍ عَرْضُهَا کَعَرْضِ السَّمَآءِ وَ الْاَرْضِ ۙ اُعِدَّتْ لِلَّذِیْنَ اٰمَنُوْا بِاللّٰهِ وَ رُسُلِهٖ ؕ ذٰلِکَ فَضْلُ اللّٰهِ یُؤْتِیْهِ مَنْ یَّشَآءُ ؕ وَ اللّٰهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِیْمِ ﴿۲۱﴾
উচ্চারণ: ছা-বিকূইলা-মাগফিরাতিম মির রাব্বিকুম ওয়া জান্নাতিন ‘আরদুহা-কা‘আরদিছ ছামাই ওয়াল আরদি উ‘ইদ্দাত লিল্লাযীনা আ-মানূবিল্লা-হি ওয়া রুছুলিহী যা-লিকা ফাদলুল্লা-হি ইউ’তীহি মাইঁ ইয়াশাউ ওয়াল্লা-হু যুল ফাদলিল ‘আজীম।
আল বায়ান: তোমরা তোমাদের রবের পক্ষ থেকে ক্ষমা ও সেই জান্নাতের দিকে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হও, যার প্রশস্ততা আসমান ও যমীনের প্রশস্ততার মত। তা প্রস্তত করা হয়েছে যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলদের প্রতি ঈমান আনে তাদের জন্য। এটা আল্লাহর অনুগ্রহ। তিনি যাকে ইচ্ছা তা দান করেন। আর আল্লাহ মহা অনুগ্রহশীল।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২১. তোমরা অগ্রণী হও তোমাদের রবের ক্ষমা ও সে জান্নাত লাভের প্রয়াসে, যা প্রশস্ততায় আসমান ও যমীনের প্রশস্ততার মত(১), যা প্ৰস্তুত করা হয়েছে তাদের জন্য যারা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলগণের প্রতি ঈমান আনে। এটা আল্লাহ্র অনুগ্রহ, যাকে ইচ্ছে তিনি এটা দান করেন(২); আর আল্লাহ্ মহাঅনুগ্রহশীল।
তাইসীরুল ক্বুরআন: তোমরা এগিয়ে যাও তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা ও জান্নাত লাভের জন্য, যার প্রশস্ততা আসমান ও যমীনের প্রশস্ততার মত। তা প্রস্তুত রাখা হয়েছে তাদের জন্য যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলদের প্রতি ঈমান এনেছে। এটা আল্লাহর অনুগ্রহ, তিনি তা দেন যাকে ইচ্ছে করেন, আল্লাহ বড়ই অনুগ্রহশীল।
আহসানুল বায়ান: (২১) তোমরা অগ্রণী হও তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা[1] ও সেই জান্নাতের দিকে, যার প্রশস্ততা আকাশ ও পৃথিবীর প্রশস্ততার মত,[2] যা প্রস্তুত করা হয়েছে আল্লাহ ও তাঁর রসূলগণে বিশ্বাসীদের জন্য। এটা আল্লাহর অনুগ্রহ, যাকে ইচ্ছা তিনি তাকে তা দান করেন। [3] আর আল্লাহ মহা অনুগ্রহশীল। [4]
মুজিবুর রহমান: তোমরা অগ্রণী হও তোমাদের রবের ক্ষমা ও সেই জান্নাত লাভের প্রয়াসে যা প্রশস্ততায় আকাশ ও পৃথিবীর মত, যা প্রস্তুত করা হয়েছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণে বিশ্বাসীদের জন্য। এটা আল্লাহর অনুগ্রহ যাকে ইচ্ছা তিনি এটা দান করেন; আল্লাহ মহা অনুগ্রহশীল।
ফযলুর রহমান: তোমরা তোমাদের প্রভুর ক্ষমা ও সেই জান্নাতের দিকে ধাবিত হওয়ার প্রতিযোগিতা করো যা আসমান ও জমিনের ন্যায় প্রশস্ত এবং তৈরী করা হয়েছে তাদের জন্য যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে। এটা আল্লাহর কৃপা। তিনি যাকে ইচ্ছা তা দান করেন। আল্লাহ মহান কৃপার অধিকারী।
মুহিউদ্দিন খান: তোমরা অগ্রে ধাবিত হও তোমাদের পালনকর্তার ক্ষমা ও সেই জান্নাতের দিকে, যা আকাশ ও পৃথিবীর মত প্রশস্ত। এটা প্রস্তুত করা হয়েছে আল্লাহ ও তাঁর রসূলগণের প্রতি বিশ্বাসস্থাপনকারীদের জন্যে। এটা আল্লাহর কৃপা, তিনি যাকে ইচ্ছা, এটা দান করেন। আল্লাহ মহান কৃপার অধিকারী।
জহুরুল হক: তোমরা প্রতিযোগিতা করো তোমাদের প্রভুর কাছ থেকে পরিত্রাণ লাভের জন্য এবং এমন এক জান্নাতের জন্য যার বিস্তার হচ্ছে মহাকাশ ও পৃথিবীর বিস্তৃতির মতো, -- এটি তৈরি করা হয়েছে তাদের জন্য যারা আল্লাহ্তে ও তাঁর রসূলের প্রতি ঈমান আনে। এ হচ্ছে আল্লাহ্র অনুগ্রহ প্রাচুর্য, তিনি তা প্রদান করেন যাকে তিনি ইচ্ছা করেন। বস্তুত আল্লাহ্ বিরাট করুণাভান্ডারের অধিকারী।
Sahih International: Race toward forgiveness from your Lord and a Garden whose width is like the width of the heavens and earth, prepared for those who believed in Allah and His messengers. That is the bounty of Allah which He gives to whom He wills, and Allah is the possessor of great bounty.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ২১. তোমরা অগ্রণী হও তোমাদের রবের ক্ষমা ও সে জান্নাত লাভের প্রয়াসে, যা প্রশস্ততায় আসমান ও যমীনের প্রশস্ততার মত(১), যা প্ৰস্তুত করা হয়েছে তাদের জন্য যারা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলগণের প্রতি ঈমান আনে। এটা আল্লাহ্–র অনুগ্রহ, যাকে ইচ্ছে তিনি এটা দান করেন(২); আর আল্লাহ্– মহাঅনুগ্রহশীল।
তাফসীর:
(১) সারমর্ম এই যে, অক্ষমতা ও মৃত্যু আসার আগেই তুমি সৎকাজের পুঁজি সংগ্ৰহ করে নাও, যাতে জান্নাতে পৌছতে পার। অগ্ৰে ধাবিত হওয়ার দ্বিতীয় অর্থ এই যে, সৎকাজে অপরের অগ্রণী হওয়ার চেষ্টা কর। আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু তার উপদেশাবলীতে বলেনঃ তুমি মসজিদে সর্বপ্রথম গমণকারী এবং সর্বশেষ নিৰ্গমণকারী হও। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, সালাতের জামাতে প্রথম তকবিরে উপস্থিত থাকার চেষ্টা কর। [দেখুন, ফাতহুল কাদীর] জান্নাতের পরিধি প্রসঙ্গে বলা হয়েছেঃ এর প্রস্থ আকাশ ও পৃথিবীর সমান। সূরা আলে-ইমরানে এই বিষয়বস্তুর আয়াতে سموات বহুবচন শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এতে বুঝা যায় যে, সপ্ত আকাশ ও পৃথিবীর বিস্তৃতি একত্রিত করলে জান্নাতের প্রস্থ হবে। বলাবাহুল্য, প্রত্যেক বস্তুর দৈর্ঘ্য প্রস্থ অপেক্ষা বেশী হয়। এতে প্রমাণিত হয় যে, জান্নাতের বিস্তৃতি সপ্ত আকাশ ও পৃথিবীর বিস্তৃতির চাইতে বেশী। তাছাড়া عرض শব্দটি কোনো সময় কেবল বিস্তৃতি অর্থে ব্যবহৃত হয়। তখন দৈর্ঘ্যের বিপরীত অর্থ বোঝানো উদ্দেশ্য থাকে না। উভয় অবস্থাতেই জান্নাতের বিশাল বিস্তৃতিই বোঝা যায়। [দেখুন: কুরতুবী]
(২) অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলার অনুগ্রহ ও কৃপার বদৌলতেই মানুষ জান্নাতে প্রবেশ করবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ তোমাদের আমল তোমাদের কাউকে মুক্তি দিতে পারে না। সাহাবায়ে-কেরাম আরয করলেনঃ আপনিও কি তদ্রূপ? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ, আমিও আমার আমল দ্বারা জান্নাত লাভ করতে পারি না-আল্লাহ তা'আলার দয়া ও অনুকম্প হলেই লাভ করতে পারি। [বুখারী: ৫৬৭৩, মুসলিম: ২৮১৬]
তাছাড়া জান্নাত যেমন একমাত্র আল্লাহর অনুগ্রহে লাভ করা যায় তেমনিভাবে আল্লাহর ইবাদত করার সৌভাগ্য ও আল্লাহর আনুগত্যে প্রতিযোগিতা করার সামৰ্থ কেবল তাঁরই অনুগ্রহে লাভ করা যায়। তিনি যাকে এ ব্যাপারে সুযোগ দিবেন তিনিই কেবল তা লাভ করতে পারে। সুতরাং তাঁর কাছেই এ ব্যাপারে সার্বক্ষণিক তৌফিক চাইতে হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুআয ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহুকে সালাতের পরে এ কথাটি স্মরণ করে বলার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “হে মুআয! আমি তোমাকে ভালবাসি, সুতরাং তুমি সালাতের পরে اللَّهُمَّ أعِنَّا عَلَى ذِكْرِكَ، وَشُكْرِكَ، وَحُسْنِ عِبَادَتِكَ হে আল্লাহ্! আমাকে আপনার যিকর, শুকর এবং সুন্দর পদ্ধতিতে ইবাদত করার তৌফিক দিন। [আবু দাউদ: ১৫২২]
অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট অসচ্ছল সাহাবীগণ এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! ধনীরা উঁচু মর্যাদা ও স্থায়ী নেয়ামতের অধিকারী হয়ে গেল। রাসূল বললেন, সেটা কি করে? তারা বললেন, আমরা যেমন সালাত আদায় করি তারাও তা করে, আমরা সাওম পালন করি, তারাও করে, অধিকন্তু তারা সাদাকাহ দেয়। কিন্তু আমরা তা দিতে পারি না। তারা দাসমুক্ত করে আমরা তা পারি না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমাদেরকে কি আমি এমন বস্তু বলে দিব না যা করলে তোমরা অন্যদের প্রতিযোগিতায় অগ্রণী হয়ে যাবে? কেউ তোমাদের থেকে শ্রেষ্ঠ হতে পারবেনা। তবে যদি কেউ তোমাদের মত কাজ করে সেটা ভিন্ন কথা। তোমরা প্রতি সালাতের পরে তেত্রিশ বার করে তাসবীহ, তাকবীর ও তাহমীদ করবে। (সুবহানাল্লাহ, আল্লাহু আকবার ও আলহামদুলিল্লাহ পড়বে)। পরবর্তীতে অসচ্ছল সাহাবাগণ ফিরে এসে বললেন, আমাদের পয়সাওয়ালা ভাইরা আমরা যা করছি তা শুনে ফেলেছে এবং তারাও তা করতে আরম্ভ করেছে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এটা আল্লাহর অনুগ্রহ, তিনি যাকে ইচ্ছা তা দান করেন। [বুখারী: ৮৪৩, মুসলিম: ৫৯৫]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (২১) তোমরা অগ্রণী হও তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা[1] ও সেই জান্নাতের দিকে, যার প্রশস্ততা আকাশ ও পৃথিবীর প্রশস্ততার মত,[2] যা প্রস্তুত করা হয়েছে আল্লাহ ও তাঁর রসূলগণে বিশ্বাসীদের জন্য। এটা আল্লাহর অনুগ্রহ, যাকে ইচ্ছা তিনি তাকে তা দান করেন। [3] আর আল্লাহ মহা অনুগ্রহশীল। [4]
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, সৎকর্ম ও নিষ্ঠাপূর্ণ তওবার দিকে অগ্রণী হও। কেননা, এ জিনিসগুলোই প্রতিপালকের ক্ষমা লাভের মাধ্যম ও উপকরণ।
[2] আর যার প্রশস্ততা বা প্রস্থ এত, তার দৈর্ঘ্যের পরিমাপ কত হবে? কেননা, দৈর্ঘ্য প্রস্থের তুলনায় সাধারণতঃ বেশীই হয়।
[3] আর এ কথা পরিষ্কার যে, তিনি তারই জন্য ইচ্ছা করেন, যে কুফরী ও পাপাচার থেকে তওবা করে ঈমান ও সৎকর্মের জীবন গড়ে তুলে। সুতরাং তিনি এই ধরনের লোকদেরকে ঈমান গ্রহণ ও সৎকর্ম করার তওফীক দানে ধন্য করেন।
[4] তিনি যাকে চান, তাকে স্বীয় অনুগ্রহ দান করেন। যাকে তিনি কিছু দিতে চান, তা কেউ রোধ করতে পারে না। আর যা তিনি রোধ করে নেন, তা কেউ দিতে পারে না। যাবতীয় কল্যাণ তাঁরই হাতে। তিনিই এমন অনুকম্পাশীল এবং প্রকৃত মহাদাতা যে, তাঁর মাঝে কৃপণতা কল্পনাই করা যায় না।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ২০-২১ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
আলোচ্য আয়াতদ্বয়ে আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়ার সম্পূর্ণ জীবনের একটি দৃষ্টান্ত উল্লেখ করছেন। মানুষ জন্মের পর তার শিশু ও শৈশবকাল অতিবাহিত করে খেল-তামাশায়, তারপর যৌবনকাল পোশাক-পরিচ্ছেদ, খাবার-দাবার ইত্যাদিতে চাকচিক্য পছন্দ করে, তারপর বৈবাহিক জীবনে সন্তান ও সম্পদের প্রাচুর্য নিয়ে প্রতিযোগিতা করে, এভাবেই তো মানুষ তাদের মূল্যবান জীবন অতিবাহিত করে। যারা এভাবে দুনিয়ার মোহে মোহিত হয়ে দীন-ধর্মের তোয়াক্কা না করে দুনিয়ার জীবন অতিবাহিত করে তাদের উদাহরণ হল সে বৃষ্টির মত যা নাযিল হয়ে কৃষকের ফসল খুব সবুজ শ্যামল ও তরতাজা করে তুলে যা দেখে কৃষকের মন জুড়িয়ে যায়। তারপর তা হঠাৎ শুকিয়ে গিয়ে পীতবর্ণ ধারণ করে, অতঃপর তা টুকরো টুকরো হয়ে খড় কুটোয় পরিণত হয়। কৃষকের আশা যেমন নিরাশায় পরিণত হয়ে যায় তেমনি দুনিয়াকে নিয়ে যারা সন্তুষ্ট তাদের অবস্থাও ঠিক তা-ই।
(وَفِی الْاٰخِرَةِ عَذَابٌ شَدِیْدٌ)
অর্থাৎ যারা দীন-ধর্ম উপেক্ষা করে দুনিয়ার ক্রীড়া ও কৌতুকেই মগ্ন থাকে তাদের জন্য আখিরাতেও রয়েছে মহা শাস্তি। পক্ষান্তরে মু’মিনদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি।
(سَابِقُوْآ إِلٰي مَغْفِرَةٍ)
এরূপ তাফসীর সূরা আলি ইমরানের ১৩৩ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে।
(ذٰلِكَ فَضْلُ اللّٰهِ يُؤْتِيْهِ)
‘এটা আল্লাহর অনুগ্রহ, যাকে ইচ্ছা তিনি এটা দান করেন’ একদা দরিদ্র মুহাজির বলল : হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! সম্পদশালী লোকেরা তো জান্নাতের উচ্চশ্রেণি ও চিরস্থায়ী নেয়ামতরাজির অধিকারী হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন : কিভাবে? তারা বললেন : সালাত, সিয়াম ও অন্যান্য ইবাদত তারাও করে এবং আমরাও করে থাকি। কিন্তু তারা সদকা করতে পারে আমরা তা করতে পারি না। তারা গোলাম আযাদ করে, আমরা করতে পারি না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন : আমি কি তোমাদেরকে এমন একটি আমলের সন্ধান দেব, যা করলে তোমাদের নেকী সম্পদশালীদের আগে চলে যাবে? ঐরূপ যারা করবে তারা ছাড়া তোমাদের সমান কেউ হবে না। তা হল : প্রত্যেক সালাতের পর ৩৩ বার তাসবীহ (সুবহানাল্লাহ) ৩৩ বার তাকবীর (আল্লাহু আকবার) ও ৩৩ বার আল হামদুলিল্লাহ পাঠ করবে। পরবর্তীতে তারা বললেন : আমাদের সম্পদশালী ভাইগণ এটা শুনে আমাদের মত আমল করতে লেগে গেছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন : এটা (সম্পদ) আল্লাহ তা‘আলার অনুগ্রহ তিনি যাকে ইচ্ছা প্রদান করেন। (সহীহ মুসলিম হা. ৮৪৩)
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. দুনিয়া অতি তুচ্ছ ও নগণ্য বস্তু, তাই দুনিয়ার ধোঁকা থেকে সতর্ক থাকা উচিত।
২. সৎকাজে প্রতিযোগিতা করা ভাল।
৩. জান্নাতের প্রশস্ততার বিবরণ জানলাম।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ২০-২১ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করছেন যে, দুনিয়ার সবকিছুই অতি ঘৃণ্য, তুচ্ছ ও নগণ্য। এখানে দুনিয়াবাসীর জন্যে রয়েছে শুধুমাত্র ক্রীড়া-কৌতুক, শান-শওকত, পারস্পরিক গর্ব ও অহংকার এবং ধন-দৌলত ও সন্তান-সন্ততিতে প্রাচুর্য লাভের প্রতিযোগিতা। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ
(আরবী) অর্থাৎ “নারী, সন্তান, রাশিকৃত স্বর্ণ রৌপ্য আর চিহ্নিত অশ্বরাজি, গবাদি পশু এবং ক্ষেত-খামারের প্রতি আসক্তি মানুষের নিকট মনোরম করা হয়েছে। এই সব ইহজীবনের ভোগ্যবস্তু। আর আল্লাহ, তাঁর নিকট উত্তম আশ্রয়স্থল।” (৩:১৪)
এরপর পার্থিব জীবনের দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হচ্ছে যে, এর শ্যামল-সজীবতা ধ্বংসশীল, এখানকার নিয়ামতরাশি নশ্বর ও ক্ষণস্থায়ী। (আরবী) বলা হয় ঐ বৃষ্টিকে যা মানুষের নৈরাশ্যের পর বর্ষিত হয়। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তিনিই আল্লাহ যিনি মানুষের নৈরাশ্যের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করে থাকেন। সুতরাং যেমন বৃষ্টির কারণে যমীনে শস্য উৎপাদিত হয়, ক্ষেতের শস্য আন্দোলিত হতে থাকে এবং কৃষকদেরকে চমৎকৃত করে, অনুরূপভাবে দুনিয়াবাসী দুনিয়ার মাল-ধন, পণ্যদ্রব্য এবং মূল্যবান সামগ্রী লাভ করে অহংকারে ফুলে ওঠে। কিন্তু পরিণাম এই দাঁড়ায় যে, ক্ষেতের ঐ সবুজ-শ্যামল ও নয়ন তৃপ্তিকর শস্য শুকিয়ে যায় এবং শেষে খড় কুটায় পরিণত হয়। ঠিক তদ্রুপ দুনিয়ার সজীবতা ও চাকচিক্য এবং ভোগ্যবস্তু সবই একদিন মাটির সাথে মিশে যাবে। দুনিয়ার জীবনও তাই। প্রথমে আসে যৌবন, এর পরে অর্ধবয়স এবং শেষে বার্ধক্যে উপনীত হয়। স্বয়ং মানুষের অবস্থাও ঠিক অনুরূপ। তার শৈশব, কৈশর, যৌবন, প্রৌঢ়ত্ব এবং বার্ধক্য, এসব অবস্থার কথা চিন্তা করলে বিস্মিত হতে হয়! কোথায় সেই যৌবনাবস্থার রক্তের গরম এবং শক্তির দাপট, আর কোথায় বার্ধক্যাবস্থার দুর্বলতা, কোমরের বক্রতা ও অস্থির শক্তিহীনতা! যেমন আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা করেনঃ (আরবী)
অর্থাৎ “আল্লাহ তিনিই যিনি তোমাদেরকে দুর্বলতার অবস্থায় সৃষ্টি করেছেন, তারপর ঐ দুর্বলতার পরে শক্তি দান করেছেন, আবার ঐ শক্তির পর দিয়েছেন দুর্বলতা ও বার্ধক্য, তিনি যা চান সৃষ্টি করে থাকেন, তিনি সর্বজ্ঞ ও ক্ষমতাবান।” (৩০:৫৪)।
এই দৃষ্টান্ত দ্বারা দুনিয়ার অস্থায়ীত্ব ও নশ্বরতার বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা আখিরাতের দু’টি দৃশ্য প্রদর্শন করে একটি হতে ভয় দেখাচ্ছেন ও অপরটির প্রতি উৎসাহিত করছেন। তিনি বলেনঃ সত্বরই কিয়ামত সংঘটিত হতে যাচ্ছে এবং ওটা নিজের সাথে নিয়ে আসছে আল্লাহর আযাব ও শাস্তি এবং তার ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। সুতরাং তোমরা এমন কাজ কর যদদ্বারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি হতে বাঁচতে পার এবং তাঁর সন্তুষ্টি লাভ করতে পার, রক্ষা পেতে পার তার শাস্তি হতে এবং হকদার হতে পার তার ক্ষমার! দুনিয়া তো শুধু প্রতারণার বেড়া। যে এর প্রতি আকৃষ্ট হয় তার অবস্থা এমনই হয় যে, এই দুনিয়া ছাড়া অন্য কিছুর প্রতি সে খেয়ালই করে না। দিনরাত্রি ওরই চিন্তাতেই। সে ডুবে থাকে। এই নশ্বর ও ধ্বংসশীল জগতকে সে আখিরাতের উপর প্রাধান্য দিয়ে থাকে। শেষ পর্যন্ত এমন অবস্থাও তার দাঁড়িয়ে যায় যে, সে আখিরাতকে অস্বীকার করে বসে।
হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতে একটি চাবুক রাখার জায়গা দুনিয়া ও ওর মধ্যে যা কিছু আছে তার সব থেকে উত্তম। তোমরা পাঠ করঃ (আরবী) অর্থাৎ “পার্থিব জীবন ছলনার ভোগ ব্যতীত কিছুই নয়।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। আয়াতটির উল্লেখ ছাড়া হাদীসটি সহীহ গ্রন্থেও রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)
হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের প্রত্যেকের জন্যে জান্নাত জুতার তাসমার (চামড়ার লম্বা অংশের) চেয়েও বেশী নিকটবর্তী, জাহান্নামও অনুরূপ।” (ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম বুখারী (রঃ) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন) সুতরাং জানা যাচ্ছে যে, ভাল ও মন্দ মানুষের খুবই নিকটে রয়েছে। তাই মানুষের উচিত মঙ্গলের দিকে অগ্রণী হওয়া এবং মন্দ হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়া যাতে পাপ ও অন্যায় মাফ হয়ে যায় এবং পুণ্য ও মর্যাদা উঁচু হয়। এ জন্যেই এর পরপরই আল্লাহ পাক বলেনঃ তোমরা অগ্রণী হও তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা ও সেই জান্নাত লাভের প্রয়াসে যা প্রশস্ততায় আকাশ ও পৃথিবীর মত। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা দৌড়িয়ে যাও তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে এবং এমন জান্নাতের দিকে যার প্রশস্ততা হলো আকাশ ও পৃথিবী (তুল্য) যা তৈরী করা হয়েছে মুত্তাকীদের জন্যে।” (৩:১৩৩)
এ লোকগুলো আল্লাহ তা'আলার এই অনুগ্রহ লাভের যোগ্য ছিল। এ জন্যেই পরম করুণাময় আল্লাহ এদের প্রতি তাঁর পূর্ণ অনুগ্রহ দান করেছেন।
পূর্বে একটি বিশুদ্ধ হাদীস গত হয়েছে যে, একবার মুহাজিরদের মধ্য হতে দরিদ্র লোকেরা আরয করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সম্পদশালী লোকেরা তো জান্নাতের উচ্চশ্রেণী ও চিরস্থায়ী নিয়ামত রাশির অধিকারী হয়ে গেলেন! রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “এটা কিরূপে?” উত্তরে তারা বললেনঃ “নামায, রোযা তো তারা ও আমরা সবাই করি। কিন্তু মাল-ধনের কারণে তারা দান খায়রাত ও গোলাম আযাদ করে থাকেন। কিন্তু আমরা দারিদ্রের কারণে এ কাজ করতে পারি না।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “এসো, আমি তোমাদেরকে এমন একটি কাজের কথা বলে দিচ্ছি, যদি তোমরা তা কর তবে তোমরা সবারই আগে বেড়ে যাবে। তবে তাদের উপর তোমরা প্রাধান্য লাভ করতে পারবে না যারা নিজেরাও এ কাজ করতে শুরু করে দিবে। তাহলে এই যে, তোমরা প্রত্যেক ফরয নামাযের পরে তেত্রিশবার সুবহানাল্লাহ, তেত্রিশবার আল্লাহু আকবার এবং তেত্রিশবার আলহামদুলিল্লাহ পাঠ করবে।` কিছুদিন পর ঐ মহান ব্যক্তিবর্গ পুনরায় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে আরয করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের এই অযীফার খবর আমাদের ধনী ভাইয়েরাও পেয়ে গেছেন এবং তাঁরাও এটা পড়তে শুরু করেছেন!` তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “এটা আল্লাহর অনুগ্রহ, যাকে ইচ্ছা তিনি এটা দান করেন।”
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।