সূরা আল-হাদীদ (আয়াত: 17)
হরকত ছাড়া:
اعلموا أن الله يحيي الأرض بعد موتها قد بينا لكم الآيات لعلكم تعقلون ﴿١٧﴾
হরকত সহ:
اِعْلَمُوْۤا اَنَّ اللّٰهَ یُحْیِ الْاَرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا ؕ قَدْ بَیَّنَّا لَکُمُ الْاٰیٰتِ لَعَلَّکُمْ تَعْقِلُوْنَ ﴿۱۷﴾
উচ্চারণ: ই‘লামূআন্নাল্লা-হা ইউহয়িল আরদা বা‘দা মাওতিহা- কাদ বাইয়ান্না-লাকুমুল আ-য়াতি লা‘আল্লাকুম তা‘কিলূন।
আল বায়ান: তোমরা জেনে রাখ যে, আল্লাহ্ যমীনকে তার মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করেন। আমি নিদর্শনসমূহ তোমাদের কাছে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছি, আশা করা যায় তোমরা বুঝতে পারবে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৭. জেনে রাখা যে, আল্লাহই যমীনকে তার মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করেন। আমরা নিদর্শনগুলো তোমাদের জন্য সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছি যাতে তোমরা বুঝতে পার।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: জেনে রেখ, আল্লাহই যমীনকে তার মৃত্যুর পর আবার জীবিত করেন। আমি তোমাদের কাছে সুস্পষ্টভাবে নিদর্শন বর্ণনা করেছি যাতে তোমরা বুঝতে পার।
আহসানুল বায়ান: (১৭) তোমরা জেনে রেখো যে, আল্লাহই পৃথিবীকে ওর মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করেন। আমি নিদর্শনগুলি তোমাদের জন্য বিশদভাবে ব্যক্ত করেছি; যাতে তোমরা বুঝতে পার।
মুজিবুর রহমান: জেনে রেখ, আল্লাহই ধরিত্রীকে ওর মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করেন। আমি নিদর্শনগুলি তোমাদের জন্য বিশদভাবে ব্যক্ত করেছি যাতে তোমরা বুঝতে পার।
ফযলুর রহমান: জেনে রাখ, আল্লাহ জমিনকে তার মৃত্যুর পর জীবিত করেন। আমি তোমাদের জন্য নিদর্শনসমূহ বর্ণনা করেছি, যাতে তোমরা বুঝতে পার।
মুহিউদ্দিন খান: তোমরা জেনে রাখ, আল্লাহই ভূ-ভাগকে তার মৃত্যুর পর পুনরুজ্জীবিত করেন। আমি পরিস্কারভাবে তোমাদের জন্যে আয়াতগুলো ব্যক্ত করেছি, যাতে তোমরা বোঝ।
জহুরুল হক: তোমরা জেনে রাখো যে আল্লাহ্ পৃথিবীটাকে তার মৃত্যুর পরে প্রাণ সঞ্চার করেন। আমরা তো তোমাদের জন্য নির্দেশাবলী সুস্পষ্ট করে দিয়েছি যেন তোমরা বুঝতে পার।
Sahih International: Know that Allah gives life to the earth after its lifelessness. We have made clear to you the signs; perhaps you will understand.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১৭. জেনে রাখা যে, আল্লাহই যমীনকে তার মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করেন। আমরা নিদর্শনগুলো তোমাদের জন্য সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছি যাতে তোমরা বুঝতে পার।(১)
তাফসীর:
(১) এখানে যে প্রসঙ্গে একথাটি বলা হয়েছে তা ভালভাবে বুঝে নেয়া দরকার। কুরআন মজীদে বেশ কিছু জায়গায় নবুওয়াত ও কিতাব নাযিলকে বৃষ্টির বরকতের সাথে তুলনা করা হয়েছে। কেননা, ভূ-পৃষ্ঠের ওপর বৃষ্টিপাত যে কল্যাণ বয়ে আনে নবুওয়াত এবং কিতাবও মানবজাতির জন্য সে একই রকমের কল্যাণ বয়ে আনে। মৃত ভূ-পৃষ্ঠে যেমন রহমতের বৃষ্টির এক বিন্দু পড়তেই শস্য শ্যামল হয়ে ওঠে। ঠিক তেমনি আল্লাহর রহমতে যে দেশে নবী প্রেরিত হন এবং অহী ও কিতাব নাযিল হওয়া শুরু হয় সেখানে মৃত মানবতা অকস্মাৎ জীবন লাভ করে। [দেখুন: ইবন কাসীর; কুরতুবী]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১৭) তোমরা জেনে রেখো যে, আল্লাহই পৃথিবীকে ওর মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করেন। আমি নিদর্শনগুলি তোমাদের জন্য বিশদভাবে ব্যক্ত করেছি; যাতে তোমরা বুঝতে পার।
তাফসীর:
-
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১৬-১৯ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
পূর্বের আয়াতে মু’মিন ও মুনাফিকদের পারলৌকিক অবস্থা বর্ণনা করার পর এখানে মু’মিনদেরকে তাঁর স্মরণে আরো বেশি মনোযোগী হওয়া ও কুরআন থেকে নিদের্শনা গ্রহণের প্রেরণা দিচ্ছেন।
خشوع অর্থ : নরম অন্তরে আল্লাহ তা‘আলার দিকে ঝুঁকে পড়া। حق (সত্য) হলো কুরআনুল কারীম। এ আয়াত থেকে একশ্রেণির দরবেশ, ফকীর ও পীর বুজুর্গরা দলীল গ্রহণ করে সালাত, সিয়াম, খাবার, পোশাক পরিচ্ছেদ ও সংসার সব বর্জন করে আল্লাহ তা‘আলার যিকিরের নামে নিজেদের তৈরি করা ভণ্ডামী হৈ-হুল্লায় মগ্ন থাকে যা ইসলামী শরীয়ত সমর্থিত নয়। মূলত আয়াতে এরূপ কিছু নির্দেশ দেওয়া হয়নি, কারণ আয়াতগুলো নাযিল হয়েছে মূসা ও ঈসা (আঃ)-এর অনুসারী মু’মিনদের ব্যাপারে যারা তাদের নাবীদের ওপর ঈমান এনেছে কিন্তু নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি ঈমান আনেনি। এ আয়াতটি (وَالَّذِيْنَ اٰمَنُوْا بِاللّٰهِ وَرُسُلِه۪) ‘যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের প্রতি ঈমান আনে’ এ আয়াতের পরে এসেছে। অর্থাৎ যারা তাওরাত ও ইঞ্জিলের প্রতি ঈমান এনেছে তাদের কি এখনো সময় হয়নি যে, তাদের অন্তর কুরআনের জন্য নম্র হবে (কুরতুবী)।
তারপর মু’মিনদেরকে ইয়াহূদ ও খ্রিস্টানদের মত হতে নিষেধ করছেন যাদের ওপর দিয়ে বহুকাল অতিক্রম হয়ে যাওয়ার পর স্বহস্তে আল্লাহ তা‘আলার কিতাব পরিবর্তন করেছে এবং তা পেছনে নিক্ষেপ করে ধর্ম যাজকদেরকে মা‘বূদ বানিয়ে নিয়েছে। ফলে তাদের অন্তর কঠিন হয়ে গিয়েছিল। কোন ওয়াজ নসিহত তাদের কাজে আসেনি।
(يُحْيِي الْأَرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا)
‘আল্লাহই পৃথিবীকে তার মৃত্যুর পর জীবন দান করেন’ এ অংশ প্রমাণ করছে আল্লাহ যেমন মৃত জমিনকে বৃষ্টির পানি দ্বারা পুনরায় জীবিত করতে পারেন তেমনি মানুষকে পথভ্রষ্টের পর হিদায়াত দিতে পারেন, দুঃখের পর সুখ দিতে পারেন, কঠিন অন্তরকেও নরম করে দিতে পারেন এবং মানুষের মুত্যৃর পর পুনঃজীবিত করতে পারেন। মৃত্যুর পর হিসাব-নিকাশ করে মু’মিনদেরকে জান্নাত আর কাফিরদেরকে জাহান্নাম দেওয়ার জন্য অবশ্যই সকলকে পুনরুত্থিত করবেন।
(يُّضَاعَفُ لَهُمْ)
অর্থাৎ এক-এর বদলে কমপক্ষে দশগুণ এবং তার চেয়েও বেশি সাতশত গুণ বরং তার থেকেও অধিক মাত্রায়। যেমন আল্লাহ বলেন :
(مَثَلُ الَّذِیْنَ یُنْفِقُوْنَ اَمْوَالَھُمْ فِیْ سَبِیْلِ اللہِ کَمَثَلِ حَبَّةٍ اَنْۭبَتَتْ سَبْعَ سَنَابِلَ فِیْ کُلِّ سُنْۭبُلَةٍ مِّائَةُ حَبَّةٍﺚ وَاللہُ یُضٰعِفُ لِمَنْ یَّشَا۬ئُﺚ وَاللہُ وَاسِعٌ عَلِیْمٌ)
“যারা আল্লাহর পথে তাদের মাল খরচ করে তাদের উদাহরণ হচ্ছে একটি শস্যদানা যা সাতটি শীষ উৎপন্ন করে। প্রত্যেক শীষে এক শত শস্যদানা থাকে আর আল্লাহ যাকে চান তাকে বাড়িয়ে দেন। আল্লাহ প্রশস্তকারী, মহাজ্ঞানী।”
(هُمُ الصِّدِّيْقُوْنَ)
এ আয়াতের তাফসীর মুফাসসিরে কেরাম দু’ভাবে করেছেন :
১. আল্লামা ইবনু কাসীর ও সা‘দী (রহঃ)-সহ অনেকে বলেছেন : আয়াতটি
(هُمُ الصِّدِّيْقُوْنَ)
এখানে পরিপূর্ণ। ইবনু আব্বাস (রাঃ)-ও এ কথা বলেছেন। অর্থ হল : যারা আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূলের প্রতি সত্যিকার ঈমান এনেছে তারা সিদ্দীক। আর শহীদরা তাদের প্রতিপালকের নিকট শহীদের মর্যাদায় রয়েছে শহীদের মর্যাদা সম্পর্কে যেভাবে হাদীসে বলা হয়েছে।
২. আল্লামা ইবনু জারীর (রহঃ) বলেন : আয়াতটি
(لَهُمْ أَجْرُهُمْ وَنُوْرُهُمْ)
এখানে পরিপূর্ণ। অর্থ হল : যারা আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূলের প্রতি সত্যিকার ঈমান এনেছে তারা সিদ্দিক ও শহীদ। তাদের জন্য রয়েছে তাদের প্রাপ্য পুরস্কার ও জ্যোতি। যেমন হাদীসে এসেছে : জান্নাতে একশতটির মত মর্তবা রয়েছে। এক মর্তবা থেকে অন্য মর্তবার দূরত্ব হল আকাশ-জমিনের মত দূরত্ব। এসব আল্লাহ তা‘আলা তাঁর পথে জিহাদকারীদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন। প্রথমটি অধিক সঠিক, কারণ প্রত্যেক সত্যিকার মু’মিন সিদ্দিক হতে পারে কিন্তু শহীদ হতে পারে না। (আল্লাহ তা‘আলাই ভাল জানেন)
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. বেশি বেশি আল্লাহ তা‘আলার যিকির করা উচিত।
২. আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় দান করার ফযীলত জানলাম।
৩. যারা প্রকৃত ঈমানদার তারাই সিদ্দিক। যেহেতু তারা আল্লাহ তা‘আলা, রাসূল ও দীনের সব কিছু সত্য বলে স্বীকার করে নিয়েছে।
৪. শহীদদের মর্যাদা জানতে পারলাম।
৫. শরীয়ত গর্হিত পন্থায় ইবাদত করলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১৬-১৭ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা'আলা বলছেনঃ মুমিনদের জন্যে কি এখন পর্যন্ত ঐ সময় আসেনি যে, তারা আল্লাহর যিকির, নসীহত, কুরআনের আয়াতসমূহ এবং নবী (সঃ)-এর হাদীসসমূহ শুনে তাদের হৃদয় বিগলিত হয়? তারা শুনে ও মানে, আদেশসমূহ পালন করে এবং নিষিদ্ধ জিনিস হতে বিরত থাকে?
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, কুরআন কারীম অবতীর্ণ হতে হতে তেরো বছর অতিক্রান্ত হয়ে যায়, এরপরেও মুসলমানদের অন্তর ইসলামের প্রতি পুরোপুরি আকৃষ্ট হয়নি, এখানে এরই অভিযোগ করা হয়েছে।
হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “চার বছর অতিক্রান্ত হতেই আমাদেরকে এ ব্যাপারে নিন্দে করে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়।`
সাহাবীগণ (রাঃ) দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের নিকট কিছু বর্ণনা করুন।” তখন (আরবী) অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ “ (হে নবী সঃ)! আমি তোমার নিকট উত্তম কাহিনী বর্ণনা করছি ।` (১২-৩) কিছুদিন পর আবার তারা এই আরজই করলে আল্লাহ তা'আলা (আরবী) অবতীর্ণ করেন। অর্থাৎ “আল্লাহ উত্তম বাণী অবতীর্ণ করেছেন।” (৩৯:২৩) আরো কিছুদিন পর পুনরায় তাঁরা একথাই বললে আল্লাহ তা'আলা ... (আরবী)-এ আয়াত অবতীর্ণ করেন।
হযরত শাদ্দাদ ইবনে আউস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মানুষের মধ্য হতে প্রথম (ভাল বিষয়) যা উঠে যাবে তা হবে এই বিনয়-নম্রতা।”
এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছিল তাদের মত যেন এরা না হয়, বহুকাল অতিক্রান্ত হয়ে গেলে যাদের অন্তঃকরণ কঠিন হয়ে পড়েছিল। আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে ইয়াহুদী নাসারার মত হতে নিষেধ করছেন। তারা আল্লাহর কিতাবকে পরিবর্তন করে ফেলেছিল। স্বল্প মূল্যের বিনিময়ে ওকে বিক্রি করে দিয়েছিল। কিতাবুল্লাহকে পৃষ্ঠের পিছনে নিক্ষেপ করে নিজেদের মনগড়া মত ও কিয়াসের পিছনে পড়ে গিয়েছিল। নিজেদের আবিষ্কৃত উক্তিগুলো তারা মানতে থাকে। আল্লাহর দ্বীনে তারা অন্যদের অন্ধ অনুকরণ করতে থাকে। নিজেদের আলেম ও দরবেশদের সনদ বিহীন কথাগুলো তারা দ্বীনের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দেয়। এই দুস্কার্যের শাস্তি হিসেবে আল্লাহ তাআলা তাদের হৃদয় কঠোর করে দেন। আল্লাহ তা'আলার হাজারো কথা শুনালেও তাদের অন্তর নরম হয় না। কোন ওয়াজ নসীহত তাদের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। কোন প্রতিশ্রুতি ও ভীতি প্রদর্শন তাদের অন্তরকে আল্লাহর দিকে ফিরাতে সক্ষম হয় না। তাদের অধিকাংশই ফাসেক ও প্রকাশ্য দুষ্কৃতিকারী হয়ে যায়। তাদের অন্তর অপবিত্র এবং আমল অপরিপক্ক হয়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী)
অর্থাৎ “তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গের কারণে আমি তাদের উপর অভিসম্পাত নাযিল করেছি ও তাদের অন্তর কঠোর করে দিয়েছি, তারা কথাগুলো স্বস্থান হতে ফিরিয়ে দেয় এবং আমার উপদেশাবলী তারা ভুলে যায়।” (৫:১৩) অর্থাৎ তাদের অন্তর নষ্ট হয়ে যায়। তাই তারা আল্লাহর কথাগুলোর পরিবর্তন ঘটায়, সৎকার্যাবলী পরিত্যাগ করে এবং অসৎকার্যে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এ জন্যেই রাব্দুল আ’লামীন এই উম্মতকে সতর্ক করছেনঃ সাবধান! তোমরা ইয়াহুদী ও নাসারাদের মত হয়ো না। সর্বদিক দিয়েই তাদের হতে পৃথক থাকো।
হযরত রাবী ইবনে আবি উমাইলা (রাঃ) বলেন, কুরআন হাদীসের মিষ্টত্ব তো অনস্বীকার্য বটেই, কিন্তু আমি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে একটি খুবই প্রিয় ও মধুর কথা শুনেছি যা আমাকে অত্যন্ত মুগ্ধ করেছে। তিনি বলেছেনঃ “যখন বানী ইসরাঈলের আসমানী কিতাবের উপর কয়েক যুগ অতিবাহিত হলো তখন তারা কিছু কিতাব নিজেরাই রচনা করে নিলো এবং তাতে ঐ মাসআলাগুলো লিপিবদ্ধ করলো যেগুলো তাদের নিকট পছন্দনীয় ছিল। ওগুলো ছিল তাদের নিজেদেরই মস্তিষ্ক প্রসূত। এখন তারা সানন্দে জিহ্বা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ওগুলো পড়তে লাগলো। ওগুলোর অধিকাংশ মাসআলা আল্লাহর কিতাবের বিপরীত ছিল। যেসব হুকুম মানতে তাদের মন চাইতো না তা তারা পরিবর্তন করে দিতো এবং নিজেদের রচিত কিতাবে নিজেদের চাহিদা মত মাসআলা জমা করে নিতো। ঐগুলোর উপরই তারা আমল করতো। এখন তারা জনগণকেও মানতে উদ্বুদ্ধ করলো। তাদেরকে তারা এরই দাওয়াত দিলো এবং জোরপূর্বক মানাতে শুরু করলো। এমনকি যারা মানতে অস্বীকার করতে তাদেরকে তারা শাস্তি দিতো, কষ্ট দিতো, মারপিঠ করতো এবং হত্যা করে। ফেলতেও কুণ্ঠিত হতো না। তাদের মধ্যে একজন আল্লাহওয়ালা, আলেম ও মুত্তাকী লোক ছিলেন। তিনি তাদের শক্তি ও বাড়াবাড়িতে ভীত হয়ে আল্লাহর। কিতাবকে একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম জিনিসে লিখে একটি শিঙ্গায় ভরে দেন এবং ঐ শিঙ্গাটিকে স্বীয় স্কন্ধে লটকিয়ে দেন। তাদের দুষ্কার্য ও হত্যাকাণ্ড দিন দিন বেড়েই চললো। শেষ পর্যন্ত তারা ঐ লোকদেরকে হত্যা করে ফেললো যারা আল্লাহর কিতাবের উপর আমলকারী ছিলেন। অতঃপর তারা পরস্পর পরামর্শ করলোঃ “দেখো, এভাবে এক এক করে কতজনকে আর হত্যা করতে থাকবে? এদের বড় আলেম, আমাদের এই কিতাবকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকারকারী এবং সমস্ত বানী ইসরাঈলের মধ্যে সবচেয়ে বেশী আল্লাহর কিতাবের উপর আমলকারী অমুক আলেম রয়েছেন, তাঁকে ধরে নিয়ে এসো এবং তার সামনে তোমাদের এই কিতাব পেশ কর। যদি তিনি মেনে নেন তবে তো আমাদের জন্যে সোনায় সোহাগা হবে। আর যদি না মানেন তবে তাকে হত্যা করে ফেলে। তাহলে তোমাদের এই কিতাবের বিরোধী আর কেউ থাকবে না। আর অন্যেরা সবাই আমাদের এই কিতাবকে কবুল করে নিবে এবং মানতে শুরু করবে। এই পরামর্শ অনুযায়ী ঐ লোকগুলো আল্লাহর কিতাবের আলেম ও আমেল ঐ বুযুর্গ ব্যক্তিকে ধরে আনলো এবং বললোঃ “দেখুন, আমাদের এই কিতাবের সব কিছুই আপনি মানেন তো? না, মানেন না? এর উপর আপনার ঈমান আছে, না নেই?” উত্তরে ঐ আল্লাহওয়ালা আলেম লোকটি বললেনঃ “তোমরা এতে যা লিখেছো তা আমাকে শুনিয়ে দাও।” তারা শুনিয়ে দেয়ার পর বললোঃ “এটা আপনি মানেন তো?” ঐ ব্যক্তির জীবনের ভয় ছিল, এ কারণে সাহসিকতার সাথে মানি না' এ কথা সরাসরি বলতে পারলেন না, বরং তাঁর ঐ শিঙ্গার দিকে ইশারা করে বললেনঃ “আমার এর উপর ঈমান রয়েছে। তারা বুঝলো যে, তার ঈমান তাদের কিতাবের উপরই রয়েছে। তাই তারা তাঁকে কষ্ট দেয়া হতে বিরত থাকলো। তথাপিও তারা তাঁর কাজ কারবার দেখে সন্দেহের মধ্যেই ছিল। শেষ পর্যন্ত যখন তার মৃত্যু হলো তখন তারা তদন্ত শুরু করলো যে, না জানি হয় তো তার কাছে আল্লাহর কিতাবের ও সত্য মাসআলার কোন গ্রন্থ রয়েছে। অবশেষে তারা তার ঐ শিঙ্গাটি উদ্ধার করলো। পড়ে দেখলো যে, ওর মধ্যে আল্লাহর কিতাবের আসল মাসআলাগুলো বিদ্যমান রয়েছে। এখন তারা কথা বানিয়ে নিয়ে বললোঃ “আমরা তো কখনো এই মাসআলাগুলো শুনিনি। এরূপ কথা আমাদের ধর্মে নেই।” ফলে ভীষণ হাঙ্গামার সৃষ্টি হলো। তারা বাহাত্তরটি দলে বিভক্ত হয়ে পড়লো। এই বাহাত্তরটি দলের মধ্যে যে দলটি সত্যের উপর ছিল সেটা হলো ঐ দল, যারা ঐ শিঙ্গাযুক্ত মাসআলাগুলোর উপর আমলকারী ছিল।” হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এই ঘটনাটি বর্ণনা করার পর বলেনঃ “হে জনমণ্ডলী! তোমাদের মধ্যে যারা বাকী থাকবে তারা অনুরূপ সমস্যারই সম্মুখীন হবে এবং হবে সম্পূর্ণরূপে শক্তিহীন ও নিরুপায়। সুতরাং এই অক্ষমতা, অসহায়তা ও শক্তিহীনতার সময়েও তাদের অবশ্য কর্তব্য হবে আল্লাহর দ্বীনের উপর স্থির ও অটল থাকা এবং আল্লাহদ্রোহীদেরকে ঘৃণার চক্ষে দেখা।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
ইবরাহীম (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইত্রীস ইবনে উরকূব (রাঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর নিকট এসে বলেনঃ “হে আবদুল্লাহ (রাঃ)! যে ব্যক্তি ভাল কাজের আদেশ করে না এবং মন্দ কাজ হতে নিষেধ করে না সে তো ধ্বংস হয়ে যাবে।” একথা শুনে হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ “ধ্বংস হবে ঐ ব্যক্তি যে অন্তরে ভালকে ভাল ও মন্দর্কে মন্দ বলে জানে না।” অতঃপর তিনি বানী ইসরাঈলের উপরোক্তে ঘটনাটি বর্ণনা করেন।” (এটা ইমাম আবু জাফর তাবারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ ‘জেনে রেখো যে, আল্লাহই ধরিত্রীকে ওর মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করেন। এতে ইঙ্গিত রয়েছে ঐ বিষয়ের দিকে যে, আল্লাহ তাআলা কঠোর হৃদয়কে কঠোরতার পরেও নরম করে দিতে সক্ষম। পথভ্রষ্টদেরকে তাদের পথভ্রষ্টতার পরেও তিনি সরল সঠিক পথে আনয়নের ক্ষমতা রাখেন। বৃষ্টি যেমন শুষ্ক ভূমিকে সিক্ত করে থাকে, তেমনই আল্লাহ তাআলা মৃত হৃদয়কে জীবিত করতে পারেন। অন্তর যখন গুমরাহীর অন্ধকারে ছেয়ে যায় তখন আল্লাহর কিতাবের আলো আকস্মিকভাবে ঐ অন্তরকে আলোকোজ্জ্বল করে তুলে। আল্লাহর অহী অন্তরের তালা চাবি স্বরূপ। সত্য ও সঠিক হিদায়াতকারী হলেন একমাত্র আল্লাহ। তিনিই পথভ্রষ্টতার পর সরল সঠিক পথে আনয়নকারী। তিনি যা চান তাই করে থাকেন। তিনি বিজ্ঞানময়, সূক্ষদর্শী, সম্যক অবগত এবং শ্রেষ্ঠত্ব ও উচ্চতার অধিকারী। তিনি মহান, সর্বোচ্চ মর্যাদাবান।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।