আল কুরআন


সূরা আর-রাহমান (আয়াত: 59)

সূরা আর-রাহমান (আয়াত: 59)



হরকত ছাড়া:

فبأي آلاء ربكما تكذبان ﴿٥٩﴾




হরকত সহ:

فَبِاَیِّ اٰلَآءِ رَبِّکُمَا تُکَذِّبٰنِ ﴿۵۹﴾




উচ্চারণ: ফাবিআইয়ি আ-লাই রাব্বিকুমা- তুকাযযিবা-ন ।




আল বায়ান: সুতরাং তোমাদের রবের কোন্ নিআমতকে তোমরা উভয়ে অস্বীকার করবে ?




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৫৯. কাজেই তোমরা উভয়ে তোমাদের রবের কোন অনুগ্রহে মিথ্যারোপ করবে?




তাইসীরুল ক্বুরআন: অতএব (হে জ্বিন ও মানুষ!) তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কোন্ কোন্ নি‘মাতকে অস্বীকার করবে?




আহসানুল বায়ান: (৫৯) অতএব তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন্ কোন্ অনুগ্রহকে মিথ্যাজ্ঞান করবে?



মুজিবুর রহমান: সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের রবের কোন্ অনুগ্রহ অস্বীকার করবে?



ফযলুর রহমান: অতএব, তোমরা তোমাদের প্রভুর কোন্‌ নেয়ামতটি অস্বীকার করবে?



মুহিউদ্দিন খান: অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের পালনকর্তার কোন কোন অবদানকে অস্বীকার করবে?



জহুরুল হক: অতএব তোমাদের প্রভুর কোন্ অনুগ্রহ তোমরা উভয়ে অস্বীকার করবে?



Sahih International: So which of the favors of your Lord would you deny?



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৫৯. কাজেই তোমরা উভয়ে তোমাদের রবের কোন অনুগ্রহে মিথ্যারোপ করবে?


তাফসীর:

-


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৫৯) অতএব তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন্ কোন্ অনুগ্রহকে মিথ্যাজ্ঞান করবে?


তাফসীর:

-


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৪৬-৭৮ নম্বর আয়াতের তাফসীর :



পূর্বের আয়াতে জাহান্নামীদের দুর্ভোগের কথা আলোচনার পর এখানে জান্নাতীদের পরম সুখ সাচ্ছন্দ্যের কথা তুলে ধরেছেন।



(وَلِمَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّه۪ جَنَّتٰنِ)



‘আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে, তার জন্য রয়েছে দু‘টি জান্নাত’ ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন : যে ব্যক্তি এ ভয় করে যে, কিয়ামতের দিন স্বীয় প্রতিপালকের সামনে দাঁড়িয়ে হিসাব দিতে হবে সে আল্লাহ তা‘আলার অবাধ্য কাজ হতে বিরত থাকে এবং নিজেকে কু-প্রবৃত্তি হতে হেফাযত করে, দুনিয়াকে প্রাধান্য না দিয়ে আখিরাতকে প্রাধান্য দেয় এবং সে জানে আখিরাতই শ্রেষ্ঠ। ফলে শরীয়তের ফরযগুলো যথাযথ আদায় করে, হারাম কাজ থেকে বিরত থাকে তার জন্য কিয়ামত দিবসে দু’টি জান্নাত। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : দু’টি জান্নাত হবে রৌপ্যের এবং তার আসবাবপত্রসহ তার ভেতরে যা কিছু আছে সব।



আর দুটি জান্নাত হবে স্বর্ণের এবং তার আসবাবপত্র ও তার ভেতরে যা আছে সব। জান্নাতবাসী ও আল্লাহর দীদারের মাঝে কোন প্রতিবন্ধকতা থাকবে না কেবলমাত্র তাঁর কিবরিয়ার চাঁদর যা তাঁর চেহারার ওপর, থাকবে। এটা থাকবে আদন নামক জান্নাতে। (সহীহ বুখারী হা. ৪৮৮০, সহীহ মুসলিম, অনুচ্ছেদ : মু’মিনরা কিয়ামতের দিন আল্লাহকে দেখবে)



আবূ দারদা (রাঃ) একদা নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে মিম্বারে বর্ণনা করতে শুনলেন



(وَلِمَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّه۪ جَنَّتٰنِ)



‘আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে, তার জন্য রয়েছে দু‘টি জান্নাত’ আমি বললাম : হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! সে যদি ব্যভিচার করে ও চুরি করে? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দ্বিতীয়বার উক্ত আয়াত তেলাওয়াত করলেন। আমি দ্বিতীয়বার বললাম : হে আল্লাহর রাসূল! সে যদি ব্যভিচার করে ও চুরি করে? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তৃতীয়বার প্রাগুক্ত আয়াত তেলাওয়াত করলেন। আমি তৃতীয়বার বললাম : হে আল্লাহর রাসূল! সে যদি ব্যভিচার করে ও চুরি করে? তিনি বলেন, যদিও আবূ দারদার নাক ধূলায় ধূসরিত হয়। (সনদ সহীহ, আহমাদ হা. ৮৬৮৩)



(ذَوَاتَآ أَفْنَانٍ) ‘উভয়টি বহু শাখাপল্লববিশিষ্ট বৃক্ষে ফলমূল দ্বারা ভরপুর’ أَفْنَانٍ শব্দটি فن এর বহুবচন, অর্থ ডালপালা। এখানে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, তাতে ছায়া হবে ঘন ও সুনিবিড়। অনুরূপ ফলও হবে অধিক হারে। প্রতিটি ডাল ফলে পরিপূর্ণ থাকার কারণে ডালগুলো ঝুঁকে পড়বে। (ইবনু কাসীর)



রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : নিশ্চয়ই জান্নাতে একটি গাছ রয়েছে, একজন আরোহী দ্রুতগতিসম্পন্ন একটি ঘোড়ায় চড়ে ১০০ বছর চলেও তা অতিক্রম করতে পারবে না। অন্য বর্ণনায় রয়েছে একজন আরোহী তার ছায়ার নীচ দিয়ে একশত বছর অতিক্রম করেও শেষ করতে পারবে না। (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম হা. ২৮২৮, ২৮২৬)



(فِيْهِمَا عَيْنَانِ تَجْرِيٰنِ)



‘উভয়টিতে রয়েছে সদা প্রবহমান দু‘টি ঝর্ণাধারা’ দু’টি প্রস্রবণের একটি হলো “তাসনীম” অপরটি হলো “সাল সাবিল” এ উক্তি হাসান বাসরী (রহঃ)। (ইবনু কাসীর)



(فِيْهِمَا مِنْ كُلِّ فَاكِهَةٍ زَوْجٰنِ)



‘উভয় বাগানে রয়েছে প্রত্যেক ফল দুই প্রকার’ অর্থাৎ প্রত্যেক শ্রেণির ফল হবে দুপ্রকারের। প্রত্যেকটির স্বাদ ও রং হবে ভিন্ন তবে সবই সুস্বাদু ও মিষ্টি। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, দুনিয়াতে কোন মিষ্টি বা টক গাছ নেই যার অনুরূপ জান্নাতে নেই এমনকি মাকালফল গাছও জান্নাতে থাকবে তবে তাও মিষ্টি হবে (কুরতুবী)।



(مُتَّكِئِيْنَ عَلٰي فُرُشٍۭ بَطَآئِنُهَا....)



‘সেখানে তারা হেলান দিয়ে বসবে” এটা হলো জান্নাতীদের জন্য তৈরি করে রাখা বিছানার বৈশিষ্ট্য। জান্নাতীরা আরাম ও আয়েশের জন্য সে সব বিছানায় রাজা বাদশাদের মতো হেলান দিয়ে বসে থাকবে- এখানে জান্নাতী বিছানার শুধু ভেতরের সৌন্দর্যের কথা বলা হয়েছে। বাহ্যিক সৌন্দর্য কেমন হবে তা আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া কেউ জানে না। শব্দটি بطانة এর বহুবচন, যা অভ্যন্তরে থাকে, ভেতর দিক। মোটা রেশমী কাপড়কে إِسْتَبْرَقٍ বলা হয়।



(وَجَنَي الْجَنَّتَيْنِ دَانٍ)



অর্থাৎ জান্নাতের ফল এত নিকটবর্তী হবে যে, বসে বসে এমনকি শুয়ে শুয়ে পাড়তে পারবে। আল্লাহ বলেন :



(وَدَانِيَةً عَلَيْهِمْ ظِلَالُهَا وَذُلِّلَتْ قُطُوْفُهَا تَذْلِيْلًا)



“জান্নাতের বৃক্ষছায়া তাদের ওপর ঝুঁকে থাকবে এবং ওর ফলমূল সম্পূর্ণরূপে তাদের আয়ত্তাধীন থাকবে।” (সূরা দাহর ৭৬ : ১৪)



যেমন আল্লাহ বলেন : (قُطُوْفُهَا دَانِيَةٌ)



“যার ফল-ফলাদি অতি নিকটে নাগালের মধ্যে থাকবে।” (সূরা হাক্কাহ্ ৬৯ : ২৩)



(فِيْهِنَّ قٰصِرٰتُ الطَّرْفِ.....)



‘‘সেখানে রয়েছে বহু আনতনয়না স্ত্রীগণ....” সে সকল বিছানায় রয়েছে এমন নারী যারা তাদের দৃষ্টিকে নিজ স্বামী ছাড়া অন্যদের থেকে অবনত রাখে। ইবনু জায়েদ বলেন : বর্ণিত আছে যে, জান্নাতী প্রত্যেক নারী তার স্বামীকে লক্ষ্য করে বলবে : আল্লাহর শপথ! আপনার চেয়ে উত্তম জান্নাতে আর কিছু দেখছি না। জান্নাতে আপনার চেয়ে আমার নিকট প্রিয় আর কিছুই নেই। তাই আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা যিনি আপনাকে আমার ভাগে দিয়েছেন। (ইবনু কাসীর)



(لَمْ يَطْمِثْهُنَّ إِنْسٌ.....)



অর্থাৎ তারা হবে কুমারী, নব-যুবতী ও অবিবাহিতা যাদের সাথে কোন পুরুষ বা জিন সহবাস করেনি। এ আয়াত প্রমাণ করছে যে, জিন মু‘মিনরাও জান্নাতে যাবে, যেমন মানুষ মু’মিনরা জান্নাতে যাবে।



এ সকল জান্নাতী নারীদের আরো বৈশিষ্ট্য হল :



(كَأَنَّهُنَّ الْيَاقُوْتُ وَالْمَرْجَانُ)



অর্থাৎ মণিমুক্তা যেমন পরিস্কার স্বচ্ছ, তারাও ঠিক এমন।



রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : জান্নাতী নারীরা এমন যে, তার পদনালীর শুভ্রতা সত্তরটি রেশমের হুল্লার (পোশাক বিশেষ) মধ্য হতেও দেখা যাবে, এমনকি ভেতরের মজ্জাও দৃষ্টি-গোচর হবে। (তিরমিযী হা. ২৫৩৩, সহীহ)



অতঃপর তিনি



(كَأَنَّهُنَّ الْيَاقُوْتُ وَالْمَرْجَانُ)



‘তারা যেন হীরা ও মতি’ আয়াতটি তিলাওয়াত করেন এবং বলেন : ইয়াকুত একটি পাথর বটে কিন্তু যদি ওর মধ্যে সুতো পরিয়ে দেয়া হয় তবে বাইরে থেকে তা দেখা যাবে। (তিরমিযী হা. ২৫৩৩, হাসান সহীহ)



এ ছাড়াও জান্নাতী নারীদের সৌন্দর্য ও স্বামীর প্রতি তাদের ভালবাসার গভীরতার ব্যাপারে অনেক সহীহ হাদীস রয়েছে।



(هَلْ جَزَا۬ءُ الْإِحْسَانِ)



‘উত্তম কাজের পুরস্কার উত্তম (জান্নাত) ব্যতীত আর কী হতে পারে?’ আয়াতের প্রথম إحسان ইহসান এর অর্থ হলো : সৎ কর্ম ও আল্লাহ তা‘আলার আনুগত্য। আর দ্বিতীয় إحسان এর অর্থ হলো : প্রতিদান। অর্থাৎ যারা সৎকর্ম ও আল্লাহ তা‘আলার আনুগত্য করে তাদের জন্য উত্তম প্রতিদান ছাড়া আরো কিছু আছে কি? না, তাদের জন্য উত্তম প্রতিদানই রয়েছে।



(وَمِنْ دُوْنِهِمَا جَنَّتٰنِ)



অর্থাৎ এ জান্নাত দু’টি মর্যাদা ও ফযীলতের দিক দিয়ে সমান, এছাড়াও আরো দু’টি জান্নাত রয়েছে। যেমন ৪৬ নম্বর আয়াতের তাফসীরে হাদীস গত হয়েছে। অন্য একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে স্বর্ণের জান্নাত مقربين তথা নৈকট্যশীলদের জন্য আর রৌপ্যের জান্নাত ডানপন্থীদের জন্য।



আব্দুল্লাহ ইবনু কায়েস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : (জান্নাতের মধ্যে) দুটি বাগান থাকবে। এ দুটির সকল পাত্র এবং এর ভেতর সকল বস্তু রৌপ্য নির্মিত হবে এবং (জান্নাতে) আরো দুটি বাগান থাকবে- এ দুটির সকল পাত্র এবং ভেতরের সকল বস্তু স্বর্ণের তৈরি হবে। জান্নাতে আদনের মধ্যে জান্নাতী লোকেরা তাদের প্রতিপালকের দর্শন লাভ করবে। এ জান্নাতবাসী এবং তাদের প্রতিপালকের এ দর্শনের মাঝে আল্লাহ তা‘আলার সত্তার ওপর জড়ানো তাঁর বড়ত্বের চাদর ছাড়া আর কোন অন্তরাল থাকবে না। (সহীহ বুখারী হা. ৪৮৭৮, সহীহ মুসলিম হা. ৭৪৪৪)



(مُدْهَآمَّتٰنِ)



অর্থাৎ অত্যধিক সতেজ ও সবুজ হওয়ার কারণে তা কালোর মতো দেখাবে।



(نَضَّاخَتٰنِ) অর্থাৎ فوارثان বা উচ্ছলিত।



(فِيْهِنَّ خَيْرَاتٌ حِسَانٌ)



‘সে সকলের মাঝে রয়েছে উত্তম চরিত্রের সুন্দরীগণ’ অধিকাংশ বিদ্বান বলেন : সতী সাধ্বী মহিলা যারা উত্তম চরিত্র ও অবয়বের অধিকারিণী। আবার বলা হয় জান্নাতে অনেক কল্যাণ রয়েছে (ইবনু কাসীর)।



(حُوْرٌ مَّقْصُوْرَاتٌ فِي الْخِيَامِ)



‘তাঁবুতে থাকবে সুরক্ষিত হূর’ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : জান্নাতে মতির তাঁবু হবে। তার প্রস্থ হবে ৬০ মাইল। তার প্রতি কোণে থাকবে জান্নাতী স্ত্রী। এক কোণের লোকদের অপর কোণের লোকেরা দেখতে পাবে না। মু’মিনরা তাতে বিচরণ করবে। (সহীহ বুখারী হা. ৩২৪৩)



( مُتَّكِئِيْنَ عَلٰي رَفْرَفٍ.....)



‘তারা হেলান দিয়ে বসবে এমন সবুজ আসনে এবং সুন্দর গালিচা’ অর্থ মসনদ, বালিশ, গালিচা অথবা এ ধরণের উৎকৃষ্ট বিছানা।



عَبْقَرِيٍّ প্রত্যেক উৎকৃষ্ট ও মূল্যবান জিনিসকে বলা হয়। নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘উমার (রাঃ)-এর ক্ষেত্রে এ শব্দ ব্যবহার করেছিলেন। আমি কোন প্রভাবশালী ব্যক্তি এমন দেখিনি যে, ‘উমারের মতো কাজ করতে পারে। (সহীহ বুখারী হা. ৩৬৮২, সহীহ মুসলিম, অনুচ্ছেদ : ‘উমার (রাঃ)-এর ফযীলত) অর্থাৎ জান্নাতীরা এমন আসনে হেলান দিয়ে উপবেশন করবে, যার ওপর সবুজ রঙের মসনদ, গালিচা এবং কারুকার্য খচিত উৎকৃষ্টমানের বিছানা বিছানো থাকবে।



(تَبَارَكَ اسْمُ رَبِّكَ ذِي الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ)



‘বরকতময় তোমার প্রতিপালকের নাম যিনি মহিমান্বিত ও সম্মানিত’ ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) বলেন : রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সালাত শেষে এ দু‘আ পরিমাণ বসতেন :



اللّٰهُمَّ أَنْتَ السَّلَامُ وَمِنْكَ السَّلَامُ، تَبَارَكْتَ ذَا الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ



হে আল্লাহ তা‘আলা আপনি সালাম (শান্তি) আপনার পক্ষ থেকেই শান্তি আসে, আপনি বরকতময় হে মহিমান্বিত ও সম্মানিত। (সহীহ মুসলিম হা. ৫৯১)



সুতরাং প্রত্যেক মু‘মিন ব্যক্তির অবশ্যই এমন নেয়ামতপূর্ণ জান্নাতে প্রবেশ আশা করা উচিত। শুধু আশা করলেই হবে না, সাথে সাথে সে নেয়ামতপূর্ণ জান্নাতের পাথেয় সংগ্রহ করতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে তাঁর নেয়ামতপূর্ণ জান্নাতে প্রবেশের পাথেয় সংগ্রহ করার তাওফীক দান করুন! আমীন।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :



১. নেয়ামতে ভরপুর জান্নাতের বিবরণ পেলাম।

২. জান্নাতীদের আরাম-আয়েশ ইত্যাদি সম্পর্কে অবগত হলাম।

৩. জান্নাতী নারীদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানলাম।

৪. দুনিয়াতে ঈমানের সাথে সৎ আমল করলে আখিরাতে এ নেয়ামতপূর্ণ জান্নাত লাভ করবে।

৫. মহিয়ান গরিয়ান বরকতময় আল্লাহ তা‘আলা প্রদত্ত আমাদের ওপর প্রতিনিয়ত অসংখ্য নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা উচিত।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৫৪-৬১ নং আয়াতের তাফসীর:

আল্লাহ তাআলা বলেনঃ জান্নাতী লোকেরা বালিশে হেলান দিয়ে থাকবে, শুয়েই থাকুক বা আরামে বসেই থাকুক। তাদের বিছানাও এমন উন্নত মানের হবে যে, ওর ভিতরের আস্তরও হবে খুঁটি মোটা রেশমের তৈরী। তাহলে উপরটা কেমন হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। মালিক ইবনে দীনার (রঃ) এবং সুফিয়ান সাওরী (রঃ) বলেন যে, আস্তর যদি এরূপ হয় তাহলে বাইরের অংশ তো অবশ্যই নূরানী বা জ্যোতির্ময় হবে যা সরাসরি রহমতের বহিঃপ্রকাশ ও নূর হবে। তারপর তাতে কত যে সুন্দর সুন্দর শিল্প ও কারুকার্য করা থাকবে তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। এই জান্নাতের ফলগুলো জান্নাতীদের খুবই নিকটে থাকবে। যখন চাইবে এবং যে অবস্থায় চাইবে সেখান হতেই নিয়ে নিবে। শুয়ে থাকলে বসার এবং বসে থাকলে দাঁড়াবার প্রয়োজন হবে না। ডালগুলো নিজে নিজেই ঝুঁকে পড়বে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যার ফলগুলো অবনমিত থাকবে নাগালের মধ্যে।” (৬৯:২৩) আরো বলেনঃ “ফল অত্যন্ত নিকটে থাকবে, নিতে মোটেই কষ্ট করতে হবে না। স্বয়ং শাখাগুলো ঝুঁকে পড়বে ও তাকে ফল প্রদান করবে। সুতরাং হে দানব ও মানব! তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে।”

ফরাশের বর্ণনা দেয়া হয়েছে বলে আল্লাহ তা'আলা এরপর বলছেন যে, ঐ জান্নাতীদের সাথে ফরাশের উপর আয়তনয়না হ্রীরা থাকবে যাদেরকে পূর্বে কোন মানুষ অথবা জ্বিন স্পর্শ করেনি। তারা তাদের জান্নাতী স্বামীদের ছাড়া আর কারো দিকে তাকাবে না এবং তাদের জান্নাতী স্বামীরাও তাদের প্রতি চরমভাবে আসক্ত থাকবে। এই জান্নাতী হুরীরাও তাদের এই মুমিন স্বামীদের অপেক্ষা উত্তম আর কাউকেও পাবে না। এটাও বর্ণিত হয়েছে যে, এই হরীরা তাদের জান্নাতী স্বামীদেরকে বলবেঃ “আল্লাহর শপথ! সারা জান্নাতের মধ্যে আপনাদের চেয়ে আমাদের জন্যে উত্তম আর কিছুই নেই। আল্লাহ জানেন যে, আমাদের অন্তরে জান্নাতের কোন জিনিসের প্রতি চাহিদা ও ভালবাসা তেমন নেই যেমন আপনাদের প্রতি রয়েছে। তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ জান্নাতী স্বামীকে বলবেঃ ‘আমি আল্লাহ তা'আলার শুকরিয়া আদায় করছি যে, তিনি আপনাকে আমার অংশে ফেলেছেন এবং আমাকে আপনার খিদমত করার সুযোগে দিয়ে গৌরবের অধিকারিণী করেছেন।

মহান আল্লাহ বলেন, এই হ্রীদেরকে পূর্বে কোন মানুষ অথবা জ্বিন স্পর্শ করেনি। এ আয়াতটিও মুমিন জ্বিনদের জান্নাতে যাওয়ার দলীল।

হযরত যমরাহ ইবনে হাবীব (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ “মুমিন জ্বিনও কি জান্নাতে যাবে?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “হ্যাঁ, মহিলা জ্বিনদের সাথে তাদের বিয়ে হবে যেমন মানুষ নারীর সাথে মানুষের বিয়ে হবে।” অতঃপর তিনি এ আয়াতটি পাঠ করেন।

এরপর ঐ হ্রদের গুণাবলীর বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তারা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যে এমন যেমন ইয়াকূত (প্রবাল) এবং মারজান (পদ্মরাগ)। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার দিক দিয়ে ইয়াকূতের সাথে এবং শুভ্রতার দিক দিয়ে মারজানের সাথে তুলনা করা হয়েছে। সুতরাং এখানে মারজান দ্বারা মুক্তাকে বুঝানো হয়েছে।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতীদের স্ত্রীদের প্রত্যেকে এমনই যে, তার পদনালীর শুভ্রতা সত্তরটি রেশমের হুল্লার (পোশাক বিশেষ) মধ্য হতেও দেখা যাবে, এমন কি ভিতরের মজ্জাও দৃষ্টিগোচর হবে।” অতঃপর তিনি আয়াতটি তিলাওয়াত করেন এবং বলেনঃ “দেখো, ইয়াকূত একটি পাথর বটে, কিন্তু আল্লাহ তা'আলা ওতে স্বচ্ছতা ও ঔজ্জ্বল্য এতই দান করেছেন যে, যদি ওর মধ্যে সূতা পরিয়ে দেয়া হয় তবে বাহির হতে তা দেখা যাবে।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এ রিওয়াইয়াতটি জামে তিরমিযীতেও হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকেই সঠিকতর বলেন)

হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক জান্নাতবাসীর দুটি করে স্ত্রী এই গুণ বিশিষ্ট হবে যে, তারা সত্তরটি করে হুল্লা পরিধান করে থাকা সত্ত্বেও তাদের পদনালীর ঝলক বা ঔজ্জ্বল্য বাইরে প্রকাশিত হয়ে পড়বে এবং অধিক স্বচ্ছতার কারণে ওর ভিতরের মজ্জাও দেখতে পাওয়া যাবে।” (ইমাম আহমাদ (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন)

মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন (রঃ) বলেনঃ গৌরব হিসেবে অথবা আলোচনা হিসেবে এই তর্ক-বিতর্ক হয় যে, জান্নাতে পুরুষের সংখ্যা বেশী হবে, না নারীর সংখ্যা বেশী হবে? তখন হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন, আবুল কাসেম (সঃ) কি এ উক্তি করেননি? তিনি বলেছেনঃ “প্রথম যে দলটি জান্নাতে যাবে তারা চন্দ্রের ন্যায় উজ্জ্বল চেহারা বিশিষ্ট হবে। তাদের পরবর্তী দলটি হবে আকাশের উজ্জ্বলতম নক্ষত্রের ন্যায় চেহারা বিশিষ্ট। তাদের প্রত্যেকেরই এমন দুটি করে স্ত্রী হবে যাদের পদনালীর মজ্জা গোশত ভেদ করে দৃষ্টিগোচর হবে। আর জান্নাতে কেউই শ্রীবিহীন থাকবে না।” (এ হাদীসটি সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে। এর আসল সহীহ বুখারীতেও রয়েছে)

হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহর পথে একটি সকাল বা একটি সন্ধ্যা (ব্যয় করা) দুনিয়া এবং এর মধ্যে যা কিছু আছে তার সব থেকে উত্তম। জান্নাতে যে জায়গা তোমরা লাভ করবে ওর মধ্যে একটি কামান বা একটি চাবুক রাখার জায়গা দুনিয়া এবং ওর মধ্যে যা কিছু আছে তার সব থেকে উত্তম। যদি জান্নাতের স্ত্রীলোকদের মধ্যে কোন একজন স্ত্রীলোকে দুনিয়ায় উকি মারে তবে যমীন ও আসমান আলোকিত হয়ে উঠবে এবং তার সুগন্ধিতে সারা জগত সুগন্ধময় হয়ে উঠবে। তাদের হালকা ও ছোট দোপাট্টাও দুনিয়া এবং ওর মধ্যে যা কিছু আছে তার সব থেকে উত্তম।` (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

মহান আল্লাহ বলেনঃ উত্তম কাজের জন্যে উত্তম পুরস্কার ছাড়া কি হতে পারে? অর্থাৎ ভাল কাজের জন্যে ভাল পুরস্কার ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা সৎকর্মশীল তাদের জন্যে কল্যাণ রয়েছে এবং আরো অতিরিক্ত রয়েছে।” (১০:২৬) অর্থাৎ জান্নাতে দীদারে বারী তা'আলা। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ আয়াতটি তিলাওয়াত করার পর স্বীয় সাহাবীদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের প্রতিপালক কি করেছেন তা তোমরা জান কি?` তারা উত্তরে বললেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভাল জানেন।” তিনি উত্তরে বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি যাকে তাওহীদের অনুগ্রহ (দুনিয়ায়) দান করেছি তার প্রতিদান জান্নাত। যেহেতু এটা একটা খুব বড় নিয়ামত এবং যা প্রকৃতপক্ষে কোন আমলের বিনিময় নয়, সেই হেতু এর পর পরই বলেনঃ সুতরাং হে দানব ও মানব! তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে?

যে ব্যক্তি আল্লাহর সম্মুখে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে তার শুভ সংবাদ সম্পর্কে জামে তিরমিযীতে বর্ণিত হাদীসটিও লক্ষ্যণীয় যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ভয় করলো সে রাত্রির অন্ধকারেই বেরিয়ে পড়লো এবং যে অন্ধকার রাত্রে বেরিয়ে পড়লো সে গন্তব্যস্থলে পৌছে গেল। সাবধান! আল্লাহর পণ্যদ্রব্য খুবই মূল্যবান। জেনে রেখো যে, ঐ পণ্যদ্রব্য হলো জান্নাত। (ইমাম তিরমিযী (রঃ) এ হাদীসটিকে গারীব বলেছেন)

হযরত আবু দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি মিম্বরের উপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহর সম্মুখে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে তার জন্যে রয়েছে দুটি উদ্যান। তখন তিনি বলেনঃ “যদিও সে ব্যভিচার করে ও চুরি করে?” হাদীসের অবশিষ্টাংশ উপরে বর্ণিত হয়েছে।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।