আল কুরআন


সূরা আল-কামার (আয়াত: 45)

সূরা আল-কামার (আয়াত: 45)



হরকত ছাড়া:

سيهزم الجمع ويولون الدبر ﴿٤٥﴾




হরকত সহ:

سَیُهْزَمُ الْجَمْعُ وَ یُوَلُّوْنَ الدُّبُرَ ﴿۴۵﴾




উচ্চারণ: ছাইউহযামুল জাম‘উ ওয়া ইউওয়াললূনাদ্দুবুর।




আল বায়ান: সংঘবদ্ধ দলটি শীঘ্রই পরাজিত হবে এবং পিঠ দেখিয়ে পালাবে।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪৫. এ দল তো শীঘ্রই পরাহিত হবে এবং পিঠ দেখিয়ে পালাবে(১),




তাইসীরুল ক্বুরআন: এ সংঘবদ্ধ দল শীঘ্রই পরাজিত হবে আর পিছন ফিরে পালাবে।




আহসানুল বায়ান: (৪৫) এই দল তো শীঘ্রই পরাজিত হবে এবং পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে।[1]



মুজিবুর রহমান: এই দলতো শীঘ্রই পরাজিত হবে এবং পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে,



ফযলুর রহমান: (তাদের) এ দল শিগগিরই পরাজিত হবে এবং তারা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে (পালিয়ে যাবে)।



মুহিউদ্দিন খান: এ দল তো সত্ত্বরই পরাজিত হবে এবং পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে।



জহুরুল হক: শীঘ্রই এ লোকদল বিধবস্ত হবে এবং পৃস্প্রদর্শন করে ফিরে যাবে।



Sahih International: [Their] assembly will be defeated, and they will turn their backs [in retreat].



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৪৫. এ দল তো শীঘ্রই পরাহিত হবে এবং পিঠ দেখিয়ে পালাবে(১),


তাফসীর:

(১) এটা একটি সুস্পষ্ট ভবিষ্যতবাণী। অর্থাৎ কুরাইশদের সংঘবদ্ধ শক্তি, যা নিয়ে তাদের গর্ব ছিল অচিরেই মুসলিমদের কাছে পরাজিত হবে। [কুরতুবী; ইবন কাসীর] আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাসের ছাত্র ইকরিমা বর্ণনা করেন যে, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, যে সময় সূরা ক্বামারের এ আয়াত নাযিল হয় তখন আমি অস্থির হয়ে পড়েছিলাম যে, এটা কোন সংঘবদ্ধ শক্তি যা পরাজিত হবে? কিন্তু বদর যুদ্ধে যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বর্ম পরিহিত অবস্থায় সামনের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন এবং তার পবিত্র জবান থেকে (سَيُهْزَمُ الْجَمْعُ وَيُوَلُّونَ الدُّبُرَ) উচ্চারিত হচ্ছে তখন আমি বুঝতে পারলাম এ পরাজয়ের খবরই দেয়া হয়েছিল। [দেখুন: বুখারী: ৪৮৭৫]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৪৫) এই দল তো শীঘ্রই পরাজিত হবে এবং পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে।[1]


তাফসীর:

[1] আল্লাহ তাদের ভ্রান্ত ধারণার খন্ডন করলেন। জামাআত তথা দল বলতে মক্কার কাফেরদেরকে বুঝানো হয়েছে। সুতরাং বদরের যুদ্ধে তাদের পরাজয় হয় এবং তারা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে পলায়ন করে। শিরক ও কুফরীর নেতাদেরকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়। বদর যুদ্ধের সময় যখন নবী করীম (সাঃ) স্বীয় তাঁবুতে কাকুতি-মিনতি সহকারে দু’আয় মগ্ন ছিলেন, তখন আবূ বাকর (রাঃ) বললেন, حَسْبُكَ يَا رَسُوْلَ اللهِ! أَلْحَحْتَ عَلَى رَبِّكَ। ‘‘যথেষ্ট হয়েছে হে আল্লাহর রসূল! আপনি আপনার প্রতিপালকের নিকট অনুনয়-বিনয় খুব করলেন।’’ অতঃপর তিনি যখন তাঁবুর বাইরে এলেন, তখন তাঁর পবিত্র জবানে এই আয়াতটিই আবৃত্ত হচ্ছিল। (বুখারীঃ তাফসীর সূরা ক্বামার)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৪১-৪৬ নম্বর আয়াতের তাফসীর :



পরপর কয়েকজন নাবীর অবাধ্য জাতি ও তাদের শাস্তির কথা আলোকপাতের পর এখানে আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আঃ)-ও তাঁর প্রধান শত্র“ ফির‘আউনের কথা তুলে ধরেছেন। যে সর্বদা মূসা (আঃ)-এর বিরোধিতা করেছিল।



আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আঃ)-কে অনেক নিদর্শন দিয়ে ফির‘আউন ও তার পরিষদের কাছে প্রেরণ করেছিলেন। কিন্তু সে তা মিথ্যা প্রতিপন্ন করে নিজের দাম্ভিকতার ওপর বহাল ছিল। এর পরিণামস্বরূপ আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে সমুদ্রে ডুবিয়ে মারলেন।



এসব বড় বড় মিথ্যুক ও কাফিরদের পরিণতি উল্লেখ করার পর আল্লাহ মক্কার কুরাইশদেরকে প্রশ্ন করছেন যে, পূর্বের ঐ সকল কাফিরদের চেয়ে তোমরা কি উত্তম? কখনো না, তোমরা তাদের চেয়ে নিকৃষ্ট। অতএব তোমরা কিভাবে আযাব হতে মুক্তি লাভের আশা করো?



زُّبُرِ বলতে পূর্ববর্তী নাবীদের ওপর অবতীর্ণ কিতাবগুলোকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ পূর্বের কিতাবগুলোতে কি এ কথা লেখা আছে যে, কুরাইশ বা আরবরা যা ইচ্ছা করুক, তাদের ওপর কোন আযাব আসবে না। ইমাম কুরতুবী বলেন زُّبُرِ অর্থ লাওহে মাহফুজ।



مُّنْتَصِرٌ অর্থ অপরাজেয়, যারা হার মানে না।



(سَيُهْزَمُ الْجَمْعُ وَيُوَلُّوْنَ الدُّبُرَ)



‘এই দল শ্রীঘ্রই পরাজিত হবে এবং পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে’ আল্লাহ তা‘আলা তাদের ভ্রান্ত ধারণাকে খণ্ডন করলেন। দল বলতে মক্কার কাফিরদেরকে বুঝানো হয়েছে।



ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন : বদর যুদ্ধের দিন নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছোট্ট একটি তাবুতে অবস্থান করে এ দু‘আ করছিলেন, হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে তোমার ওয়াদা ও অঙ্গীকার পূরণ কামনা করছি। হে আল্লাহ ! যদি তুমি চাও, আজকের পর আর কখনো তোমার ইবাদত না করা হোক....। ঠিক এ সময় আবূ বকর (রাঃ) রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর হাত ধরে বললেন : হে আল্লাহর রাসূল! যথেষ্ট হয়েছে। আপনি আপনার প্রতিপালকের কাছে অনুনয়- বিনয়ের সঙ্গে বহু দু’আ করেছেন। এ সময় তিনি লৌহবর্ম পরে ছিলেন। এরপর তিনি এ আয়াত পড়তে পড়তে তাঁবু থেকে বের হয়ে এলেন,



(سَیُھْزَمُ الْجَمْعُ وَیُوَلُّوْنَ الدُّبُرَ)



অর্থাৎ এই দল তো শ্রীঘ্রই পরাজিত হবে এবং পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে। অধিকন্তু কিয়ামত তাদের শাস্তির নির্ধারিত কাল এবং কিয়ামত হবে কঠিনতর ও তিক্ততর। (সহীহ বুখারী হা. ৪৮৭৭)



‘আয়িশাহ্ (রাঃ) বলেন : আয়াতটি নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর মক্কায় অবতীর্ণ হয়, তখন আমি এমন বালিকা ছিলাম যে, আমি খেলা করতাম। (সহীহ বুখারী হা. ৪৮৭৬)



أَدْهٰي শব্দটি دهاء থেকে গঠিত, অর্থ : কঠিন অপমানকারী। أَمَرّ শব্দটি مرارة থেকে গঠিত, অর্থ অতি তিক্ত। অর্থাৎ দুনিয়াতে এদেরকে যে হত্যা, বন্দী ইত্যাদি করা হয়েছে, এটাই শেষ শাস্তি নয়, বরং এর থেকেও আরো কঠিন শাস্তি তাদেরকে কিয়ামতের দিন দেয়া হবে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :



১. যুগে যুগে নাবীদের মিথ্যা প্রতিপন্নকারী কাফিরদের কী দুর্দশা হয়েছিল তা দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট।

২. হক্বের বিরুদ্ধে লড়াইকারীরা যত শক্তিশালীই হোক সর্বশেষ তাদের পরিণাম দুনিয়াতে পরাজয় আর আখিরাতে অনন্ত যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।

৩. কিয়ামতের দিন কাফিরদের জন্য প্রতিশ্র“ত দিবস।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৪১-৪৬ নং আয়াতের তাফসীর:

আল্লাহ তা'আলা ফিরাউন ও তার সম্প্রদায়ের ঘটনা এখানে বর্ণনা করছেন। তাদের কাছে আল্লাহর রাসূল হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত হারূন (আঃ) এই খবর শুনাতে আসলেন যে, তারা ঈমান আনলে তাদের জন্যে (জান্নাতের) সুসংবাদ রয়েছে এবং কুফরী করলে (জাহান্নামের) ভয় রয়েছে। তাদেরকে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে বড় বড় মু'জিযা ও নিদর্শন প্রদান করা হয়। ওগুলো ছিল তাদের নবুওয়াতের সত্যতার পুরোপুরি দলীল। কিন্তু তারা সবকিছুই অবিশ্বাস করে। ফলে তাদের উপর আল্লাহর শাস্তি নেমে আসে এবং তাদেরকে সমূলে ধ্বংস করে দেয়া হয়।

এরপর বলা হচ্ছেঃ হে কুরায়েশ মুশরিকের দল! তোমরা কি ঐ ফিরাউন ও তার সম্প্রদায় অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ? না, বরং তারাই তোমাদের অপেক্ষা বহুগুণে শক্তিশালী ছিল। তাদের দলবলও ছিল তোমাদের চেয়ে বহুগুণে বেশী। তারাও যখন আল্লাহর আযাব হতে পরিত্রাণ পায়নি, তখন তোমরা আবার কি? তোমাদেরকে ধ্বংস করা তাঁর কাছে অতি সহজ। তোমরা কি ধারণা করছে যে, আল্লাহর কিতাবসমূহে তোমাদের মুক্তিদানের কথা লিখিত রয়েছে? কিতাবে কি এটা লিখা আছে যে, তাদের কুফরীর কারণে তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে এবং তোমরা কুফরী করতে থাকবে, আর তোমাদেরকে কোনই শাস্তি দেয়া হবে না? তোমরা কি মনে করছে যে, তোমরা দলের দল রয়েছে, সুতরাং তোমাদের সংখ্যাধিক্যের কারণে তোমাদের কোনই ক্ষতি হবে না?

মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ বলেনঃ এই দল তো শীঘ্রই পরাজিত হবে প্রদর্শন করবে।

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, বদরের যুদ্ধের দিন নবী (সঃ) দু'আ করছিলেনঃ “হে আল্লাহ! আমি আপনাকে আপনার প্রতিজ্ঞা ও অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি! হে আল্লাহ! যদি আপনার ইচ্ছা এটাই থাকে যে, আজকের দিনের পর ভূ-পৃষ্ঠে আপনার ইবাদত আর কখনো করা হবে না।” তিনি এটুকুই বলেছিলেন এমতাবস্থায় হযরত আবু বকর (রাঃ) তাঁর হাতখানা ধরে ফেলেন এবং বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যথেষ্ট হয়েছে। আপনি আপনার প্রতিপালকের কাছে খুবই অনুনয় বিনয় করেছেন।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁবু হতে বেরিয়ে আসলেন এবং তাঁর মুখে (আরবী) -এ দু’টি আয়াত উচ্চারিত হচ্ছিল। হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “এ আয়াত অবতীর্ণ হবার সময় এর দ্বারা কোন্ জামাআতকে বুঝানো হয়েছে তা আমি চিন্তা করছিলাম। বদরের যুদ্ধের দিন যখন আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বর্ম পরিহিত হয়ে স্বীয় শিবির হতে বের হতে দেখলাম তখন ঐ আয়াতের তাফসীর আমার বোধগম্য হয়।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “যে সময় আমি অতি অল্প কসের বালিকা ছিলাম এবং আমার সঙ্গীনিদের সাথে খেলা করতাম ঐ সময় (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।` (ইমাম বুখারী (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। এটা সহীহ বুখারীতে ফাযায়েলুল কুরআনের অধ্যায়ে দীর্ঘভাবে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তাখরীজ করেননি)





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।