সূরা আল-কামার (আয়াত: 40)
হরকত ছাড়া:
ولقد يسرنا القرآن للذكر فهل من مدكر ﴿٤٠﴾
হরকত সহ:
وَ لَقَدْ یَسَّرْنَا الْقُرْاٰنَ لِلذِّکْرِ فَهَلْ مِنْ مُّدَّکِرٍ ﴿۴۰﴾
উচ্চারণ: ওয়ালাকাদ ইয়াছছারনাল কুরআ-না লিযযি করি ফাহাল মিমমুদ্দাকির।
আল বায়ান: আর আমি তো কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি, উপদেশ গ্রহণের জন্য। অতএব কোন উপদেশ গ্রহণকারী আছে কি?
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪০. আর অবশ্যই আমরা কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি উপদেশ গ্রহণের জন্য; অতএব উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি?
তাইসীরুল ক্বুরআন: আমি কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি উপদেশ গ্রহণের জন্য। উপদেশ গ্রহণের কেউ আছে কি?
আহসানুল বায়ান: (৪০) নিশ্চয় আমি কুরআনকে উপদেশ গ্রহণের জন্য সহজ করে দিয়েছি।[1] অতএব উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি?
মুজিবুর রহমান: আমি কুরআন সহজ করে দিয়েছি উপদেশ গ্রহণের জন্য; অতএব উপদেশ গ্রহণকারী কেহ আছে কি?
ফযলুর রহমান: আমি তো উপদেশ গ্রহণের জন্য কোরআনকে সহজ করে দিয়েছি। অতএব, উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি?
মুহিউদ্দিন খান: আমি কোরআনকে বোঝবার জন্যে সহজ করে দিয়েছি। অতএব, কোন চিন্তাশীল আছে কি?
জহুরুল হক: আর আমরা তো নিশ্চয়ই কুরআনকে উপদেশ গ্রহণের জন্য সহজবোধ্য করে দিয়েইছি, কিন্তু কে আছে যে উপদেশপ্রাপ্তদের মধ্যেকার?
Sahih International: And We have certainly made the Qur'an easy for remembrance, so is there any who will remember?
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৪০. আর অবশ্যই আমরা কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি উপদেশ গ্রহণের জন্য; অতএব উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি?
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৪০) নিশ্চয় আমি কুরআনকে উপদেশ গ্রহণের জন্য সহজ করে দিয়েছি।[1] অতএব উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি?
তাফসীর:
[1] এই সূরার মধ্যে تيسير قرآن তথা কুরআন সহজ করে দেওয়ার কথাটা বারবার উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হল, এই কুরআন বোঝা ও তা মুখস্থ করা সহজ বানিয়ে দেওয়া মহান আল্লাহর একটি বড় অনুগ্রহ। তাই তাঁর কৃতজ্ঞতা থেকে উদাসীন হওয়া মানুষের উচিত নয়।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৩৩-৪০ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
আলোচ্য আয়াতগুলোতে লূত (আঃ)-এর অবাধ্য জাতি সম্পর্কে আলোকপাত করা হচ্ছে। এদের অপরাধ ছিল- যৌন চাহিদা মেটানোর জন্য নারীর কাছে গমন না করে পুরুষের কাছে আসত। যা পৃথিবীতে তাদের পূর্বে কেউ/কোন জাতি করেনি। লূত (আঃ) তাদেরকে বারংবার নিষেধ করা সত্ত্বেও তারা এ হতে বিরত হয়নি। বরং তারা লূত (আঃ)-কে হত্যা করার হুমকি দিয়েছে।
(أَرْسَلْنَا عَلَيْهِمْ حَاصِبًا)
‘আমি তাদের ওপর প্রেরণ করেছিলাম প্রস্তর বর্ষণকারী প্রবল বাতাস’ তাদের শাস্তিস্বরূপ আল্লাহ এমন ঝড়ো হাওয়া প্রেরণ করেছিলেন যা তাদের ওপর কংকর নিক্ষেপ করছিল। অর্থাৎ তাদের জনপদকে এমনভাবে উল্টে দেয়া হয়েছিল যে, তার ওপর অংশ নীচে এবং নীচের অংশ ওপরে চলে গিয়েছিল। অতঃপর তাদের ওপর পাথরের বৃষ্টি বর্ষণ করা হয়েছিল। এদের বসবাস ছিল বর্তমান ইসরাঈলের সীমান্তবর্তী এলাকায় সাগরের বেলাভূমিতে যা ‘ডেড সী’ নামে পরিচিত। প্রতœতাত্তিকগণ এসব এলাকা থেকে মানুষের কংকাল সংগ্রহ করে নিশ্চিত জানতে পেরেছে যে, এখানে এ প্রচন্ড প্রস্তর বর্ষণকারী বাতাস বয়েছিল। এ সম্পর্কে সূরা হূদে আরো আলোচনা করা হয়েছে।
(إِلَّآ اٰلَ لُوْطٍ نَجَّيْنٰهُمْ)
‘কিন্তু লূত পরিবারের ওপর নয়’ লূত (আঃ)-এর পরিবার বলতে যারা তাঁর প্রতি ঈমান এনেছিল তারা। এদের মধ্যে লূত (আঃ)-এর স্ত্রী শামিল নয়। কারণ সে মু‘মিনা ছিল না, লূতের প্রতি ঈমান আনেনি। আল্লাহ তা‘আলা লূত (আঃ)-সহ তাঁর অনুসারীদেরকে রাতের শেষভাগে আপতিত আযাব থেকে রক্ষা করেছেন।
(نِّعْمَةً مِّنْ عِنْدِنَا)
অর্থাৎ তাদেরকে আযাব থেকে মুক্তি দেয়াটা ছিল তাদের ওপর আল্লাহ তা‘আলার দয়া ও অনুগ্রহ। যারা আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ঈমান আনে ও আনুগত্য করে তিনি তাদেরকে এভাবেই প্রতিদান দিয়ে থাকেন।
(فَتَمَارَوْا بِالنُّذُرِ)
‘কিন্তু তারা সতর্কবাণী সম্বন্ধে বিতর্ক শুরু করল’ অর্থাৎ লূত (আঃ) যখন তাদেরকে আল্লাহ তা‘আলার আযাব সম্পর্কে সতর্ক করলেন তখন তারা ভীতি প্রদর্শনকে কোন পরোয়া করেনি, বরং সন্দেহ পোষণ করেছিল এবং ভীতি প্রদর্শনকারীর সাথে বিবাদে লিপ্ত হয়েছিল।
(وَلَقَدْ رَاوَدُوْهُ عَنْ ضَيْفِه۫)
‘তারা মেহমানদের জন্য লূতকে ফুসলিয়েছিল’ رَاوَدُ শব্দের অর্থ কাম প্রবৃত্তি চরিতার্থ করার জন্য কাউকে ফুলসানো। অর্থাৎ একদা রাতে লূত (আঃ)-এর নিকট জিবরীল, মিকাঈল, ইসরাফীল (আঃ) সুন্দর সুন্দর নব যুবকের আকৃতিতে মেহমান হিসেবে আগমন করেন। লূতের বাড়িতে মেহমান এসেছে এ কথা জানতে পেরে লূত (আঃ)-এর সম্প্রদায় তাঁর বাড়িতে এসে পীড়াপীড়ি করতে লাগল মেহমানদের সাথে তাদের ঘৃণিত আচরণ চরিতার্থ করার জন্য। তখন জিবরীল (আঃ) তাঁর ডানার একটি অংশ তাদের ওপর মারলেন, ফলে তাদের চোখ বেরিয়ে গেল। কেউ বলেছেন শুধু চোখের দৃষ্টি নষ্ট হয়ে ছিল। সকাল বেলা বিরামহীন শাস্তি দ্বারা আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে ধ্বংস করে দেন (কুরতুবী)। অতএব আল্লাহ তা‘আলা পূর্ববর্তী অবাধ্য জাতিসমূহের ওপর আপতিত শাস্তির বিশদ বিবরণ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার জন্য তিনি কুরআনকে সহজ করে দিয়েছেন। তাই আমাদের তাদের থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত আমরাও যেন তাদের মত অবাধ্য না হই।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. পৃথিবীতে সর্বপ্রথম সমকামিতায় লিপ্ত হয়েছিল লূত (আঃ)-এর জাতি।
২. আল্লাহ তা‘আলার কৃতজ্ঞ বান্দাদের মর্যাদা জানতে পারলাম যে, তিনি তাদেরকে সকল বালা-মসিবত থেকে হিফাযত করেন।
৩. নাবীদের আনুগত্য বর্জন করার পরিণতি কী তা জানতে পারলাম।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৩৩-৪০ নং আয়াতের তাফসীর:
হযরত লূত (আঃ)-এর কওমের খবর দেয়া হচ্ছে যে, কিভাবে তারা তাদের রাসূলদেরকে অস্বীকার করেছিল এবং কিভাবে তাদের বিরুদ্ধাচরণ করে এমন জঘন্য কার্যে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল। যে কাজ তাদের পূর্বে কেউ কখনো করেনি, অর্থাৎ মেয়েদেরকে ছেড়ে ছেলেদের সাথে কুকার্যে লিপ্ত হওয়ায় তাদের ধ্বংসের অবস্থাটাও ছিল তাদের কাজের মতই অসাধারণ ও অদ্ভুত। আল্লাহ তা'আলার নির্দেশক্রমে হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাদের বস্তীটিকে আকাশের কাছে উঠিয়ে নেন এবং সেখান হতে উল্টোভাবে নীচে নিক্ষেপ করেন। আর আকাশ হতে তাদের নামে নামে পাথর বর্ষাতে থাকেন। কিন্তু হযরত লুত (আঃ)-এর অনুসারীদেরকে প্রত্যুষে অর্থাৎ রাত্রির শেষ ভাগে বাচিয়ে নেন। তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল যে, তারা যেন ঐ বস্তী ছেড়ে চলে যান। হযরত লূত (আঃ)-এর কওমের কেউই ঈমান আনেনি। এমন কি স্বয়ং হযরত লুত (আঃ)-এর স্ত্রীও বে-ঈমান ছিল। তাঁর কওমের একটি লোকও ঈমান আনয়নের সৌভাগ্য লাভ করেনি। সুতরাং আল্লাহর আযাব হতেও কেউই রক্ষা পায়নি। তাঁর কওমের সাথে সাথে তাঁর স্ত্রীও ধ্বংস হয়ে যায়। শুধুমাত্র তিনি ও তাঁর কন্যাগণ এই ভয়াবহ শাস্তি হতে রক্ষা পান। মহান আল্লাহ এভাবেই তার কৃতজ্ঞ বান্দাদেরকে বিপদের সময় রক্ষা করে থাকেন এবং তাদেরকে তাদের কৃতজ্ঞতার সুফল প্রদান করেন।
শাস্তি আসার পূর্বেই হযরত লূত (আঃ) স্বীয় কওমকে সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু তারা তাঁর কথায় মোটেই কর্ণপাত করেনি। বরং তারা সন্দেহ পোষণ করে তাঁর সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হয়েছিল। আর তার মেহমানদেরকে তাঁর নিকট হতে ছিনতাই করতে চেয়েছিল। হযরত জিবরাঈল (আঃ), হযরত মীকাঈল (আঃ), হযরত ইসরাফীল (আঃ) প্রমুখ মর্যাদাসম্পন্ন ফেরেশতাগণ মানুষের রূপ ধরে হযরত লূত (আঃ)-এর বাড়ীতে মেহমান হয়ে এসেছিলেন। তারা অত্যন্ত সুন্দর চেহারা ও সুঠাম দেহ বিশিষ্ট তরুণ যুবকদের রূপ ধারণ করেছিলেন। এদিকে রাত্রিকালে তারা হযরত লুত (আঃ)-এর বাড়ীতে অবতরণ করেছেন, আর ওদিকে তার বে-ঈমান স্ত্রী কওমকে খবর দিয়ে দেয় যে, হযরত লূত (আঃ)-এর বাড়ীতে সুদৃশ্য যুবকদের দল মেহমান রূপে আগমন করেছেন। এ খবর পেয়েই ঐ দুশ্চরিত্র লোকগুলো দৌড়িয়ে আসে এবং হযরত লূত (আঃ)-এর বাড়ী ঘিরে ফেলে। হযরত লূত (আঃ) তখন দরযা বন্ধ করে দেন। কিভাবে এই মেহমানদেরকে হাতে পাওয়া যায় এই সুযোগের অপেক্ষায় ঐ লোকগুলো ওঁৎ পেতে থাকে। যখন এসব কাণ্ড চলছিল তখন ছিল সন্ধ্যাকাল। হযরত লূত (আঃ) তাদেরকে বুঝাবার চেষ্টা করছিলেন। তিনি তাদেরকে বলছিলেনঃ “আমার এই কন্যাগুলো অর্থাৎ তোমাদের স্ত্রীগুলো বিদ্যমান রয়েছে। তোমরা এই দুষ্কার্য পরিত্যাগ করে তোমাদের হালাল স্ত্রীদের দ্বারা তোমাদের কাম বাসনা চরিতার্থ কর।” কিন্তু ঐ দুবৃত্তের দল জবাবে বলেছিলঃ “আপনি তো জানেন যে, স্ত্রীদের প্রতি আমাদের কোন আকর্ষণ নেই। আমরা যে কি চাই তা তো আপনার অজানা নয়। আপনি আপনার মেহমানদেরকে আমাদের হাতে সমর্পণ করে দিন!” যখন এই তর্ক-বিতর্কে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয় এবং ঐ লোকগুলো আক্রমণোদ্যত হয় এবং হযরত লুত (আঃ) তাদের এই দুর্ব্যবহারে অত্যন্ত অতিষ্ঠ হয়ে উঠেন তখন হযরত জিবরাঈল (আঃ) বেরিয়ে আসেন এবং তাঁর পাখা তাদের চোখের উপর দিয়ে ফিরিয়ে দেন। ফলে তারা সবাই অন্ধ হয়ে যায়। তাদের দৃষ্টিশক্তি সম্পূর্ণরূপে লোপ পায়। তারা তখন দেয়াল হাতড়াতে হাতড়াতে এবং হযরত লূত (আঃ)-কে গালমন্দ দিতে দিতে সকালের ওয়াদা দিয়ে পশ্চাদপদে ফিরে যায়। কিন্তু সকালেই তাদের উপর আল্লাহর শাস্তি এসে পড়ে, যা হতে না তারা পালাতে পারলো, না শাস্তি দূর করতে সক্ষম হলো। তাই তো মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ বলেনঃ ‘আস্বাদন কর আমার শাস্তি এবং সতর্কবাণীর পরিণাম। হযরত লুত (আঃ)-এর উপদেশবাণীর প্রতি কর্ণপাত না করার শাস্তি তারা আস্বাদন করলো ।
এই কুরআন কারীম খুবই সহজ, যে কেউই ইচ্ছা করলে এটা হতে উপদেশ গ্রহণ করতে পারে। অতএব উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি?
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।