আল কুরআন


সূরা আয-যারিয়াত (আয়াত: 44)

সূরা আয-যারিয়াত (আয়াত: 44)



হরকত ছাড়া:

فعتوا عن أمر ربهم فأخذتهم الصاعقة وهم ينظرون ﴿٤٤﴾




হরকত সহ:

فَعَتَوْا عَنْ اَمْرِ رَبِّهِمْ فَاَخَذَتْهُمُ الصّٰعِقَۃُ وَ هُمْ یَنْظُرُوْنَ ﴿۴۴﴾




উচ্চারণ: ফা‘আতাও ‘আন আমরি রাব্বিহিম ফাআখাযাতহুমুসসা-‘ইকাতুওয়া হুম ইয়ানজুরূন।




আল বায়ান: অতঃপর তারা তাদের রবের আদেশ সম্পর্কে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করল। ফলে বজ্রাঘাত তাদেরকে পাকড়াও করল, আর তারা তা দেখছিল।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪৪. অতঃপর তারা তাদের রবের আদেশ মানতে অহংকার করল; ফলে তাদেরকে পাকড়াও করল বজ্র(১) এবং তারা তা দেখছিল।




তাইসীরুল ক্বুরআন: কিন্তু তারা ধৃষ্টতার সঙ্গে তাদের প্রতিপালকের আদেশ অমান্য করল। ফলে বজ্রাঘাত তাদেরকে পাকড়াও করল যা তারা চেয়ে চেয়ে দেখছিল।




আহসানুল বায়ান: (৪৪) কিন্তু তারা তাদের প্রতিপালকের আদেশ অমান্য করল; ফলে তাদের প্রতি বজ্রাঘাত হল[1] এবং তারা দেখছিল।



মুজিবুর রহমান: কিন্তু তারা তাদের রবের আদেশ অমান্য করল; ফলে তাদের প্রতি বজ্রাঘাত হল এবং তারা তা দেখতে ছিল।



ফযলুর রহমান: অতঃপর তারা তাদের প্রভুর আদেশ অমান্য করে; যার ফলে তারা বজ্রাঘাতের কবলে পড়ে, আর তারা তা দেখছিল।



মুহিউদ্দিন খান: অতঃপর তারা তাদের পালনকর্তার আদেশ অমান্য করল এবং তাদের প্রতি বজ্রঘাত হল এমতাবস্থায় যে, তারা তা দেখেছিল।



জহুরুল হক: তথাপি তাদের প্রভুর আদেশের বিরুদ্ধে তারা দাঁড়িয়েছিল, ফলে এক বজ্রনাদ তাদের পাকড়ালো, আর তারা তাকিয়ে রয়েছিল।



Sahih International: But they were insolent toward the command of their Lord, so the thunderbolt seized them while they were looking on.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৪৪. অতঃপর তারা তাদের রবের আদেশ মানতে অহংকার করল; ফলে তাদেরকে পাকড়াও করল বজ্র(১) এবং তারা তা দেখছিল।


তাফসীর:

(১) সামূদ জাতির উপর আপতিত এ আযাবের কথা বুঝাতে কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। কোথাও একে رجفة (ভীতি প্রদর্শনকারী ও প্রকম্পিত্যকারী বিপদ) বলা হয়েছে। [সূরা আল-আরাফ: ৭৮] কোথাও একে صيحة (বিস্ফোরণ ও বজ্রধ্বনি) বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। [সূরা হূদ: ৬৭] কোথাও একে বুঝাতে طاغية (কঠিনতম বিপদ) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। [সূরা আল-হাক্কাহ: ৫] আর এখানে একেই صاعقة বলা হয়েছে, যার অর্থ বিদ্যুতের মত অকস্মাৎ আগমনকারী বিপদ এবং কঠোর বজ্রধ্বনি উভয়ই। সম্ভবত: এ আযাব এমন এক ভূমিকম্পের আকারে এসেছিলো যার সাথে আতংক সৃষ্টিকারী শব্দও ছিল। [দেখুন: ইরাব আল-কুরআন]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৪৪) কিন্তু তারা তাদের প্রতিপালকের আদেশ অমান্য করল; ফলে তাদের প্রতি বজ্রাঘাত হল[1] এবং তারা দেখছিল।


তাফসীর:

[1] এই صَاعِقَةٌ (বজ্রাঘাত)টি ছিল আসমানী বিকট এক প্রকার শব্দ এবং তার সাথে নিম্নদেশ থেকে ছিল رَجْفَةٌ (ভূমিকম্পন)। যেমন, সূরা আ’রাফের ৭৮নং আয়াতে আছে।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৩৮-৪৬ নম্বর আয়াতের তাফসীর :



আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা তিনটি জাতির কথা তুলে ধরেছেন যাদেরকে তাদের অবাধ্যতার কারণে বিভিন্নভাবে শাস্তি দিয়েছেন।



প্রথমেই মূসা (আঃ)-এর জাতির কথা তুলে ধরেছেন। তাঁকে সুস্পষ্ট প্রমাণসহ প্রেরণ করেছিলেন ফির‘আউনের কাছে।



فِيْ مُوْسٰي অর্থাৎ মূসার ঘটনায় নিদর্শন রেখে দিয়েছি।



কিন্তু ফির‘আউন (فَتَوَلّٰي بِرُكْنِهِ)



অর্থাৎ সে তার দলবলসহ ঈমান আনা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলো। আর মূসা (আঃ)-কে বলতে লাগল যে, সে একজন জাদুকর অথবা পাগল। ফলে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে সমুদ্রে ডুবিয়ে মারলেন।



তারপর নিয়ে আসলেন হূদ (আঃ)-এর জাতির কথা। যাদেরকে ধ্বংস করেছেন প্রচণ্ড বাতাস দিয়ে।



(الرِّيحَ الْعَقِيمَ)



বলা হয় এমন বাতাসকে যাতে কোন কল্যাণ নেই। এ বাতাস যার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে তাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়ে গেছে।



অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা উল্লেখ করলেন সালেহ (আঃ)-এর জাতির কথা, যখন তারা তাদের দাবী করা অলৌকিক উটকে হত্যা করল, তখন আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে কিছু দিনের জন্য অবকাশ দিয়েছিলেন। পরে বজ্রাঘাত দ্বারা শাস্তি দিলেন যা তারা প্রত্যক্ষ করেছিল। তাদেরকে এমন শাস্তি দিয়েছিলেন যে, পালানো তো দূরের কথা তারা উঠার সুযোগও পায়নি।



এ তিন জাতির পূর্বে ছিল নূহ (আঃ)-এর জাতি। তারাও ছিল পাপিষ্ঠ জাতি, তাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা মহাপ্লাবন দ্বারা ডুবিয়ে মেরেছিলেন। পূর্ববর্তী নাবী ও তাদের অবাধ্য জাতিদের এসব ঘটনা বর্ণনার মধ্য দিয়ে যেমন নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নবুওয়াতের সত্যতার প্রমাণ মেলে তেমনি সতর্কতার ইঙ্গিত বহণ করে যে, যারাই তাদের মত অবাধ্যতা প্রকাশ করবে তাদের পরিণতি তাদের মতই হবে।



আয়াত হতে শিক্ষ¬ণীয় বিষয় :



১. কুরআনে পূর্ববর্তী জাতিদের আলোচনা নিয়ে আসার উদ্দেশ্য সে সব ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা।

২. যারাই আল্লাহ তা‘আলা ও নাবীদের বিরোধিতা করেছে তারাই ধ্বংস হয়েছে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৩৮-৪৬ নং আয়াতের তাফসীর:

আল্লাহ তাআলা বলেনঃ হযরত লুত (আঃ)-এর কওমের পরিণাম দেখে মানুষ যেমন উপদেশ ও শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে, অনুরূপভাবে ফিরাউন ও তার লোকদের ঘটনার মধ্যেও তাদের জন্য শিক্ষা ও উপদেশ রয়েছে। আমি তাদের কাছে আমার পয়গাম্বর হযরত মূসা (আঃ)-কে পাঠিয়েছিলাম। তাকে আমি উজ্জ্বল ও সুস্পষ্ট দলীল-প্রমাণসহ প্রেরণ করেছিলাম। কিন্তু তাদের নেতা অহংকারী ফিরাউন সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে ও ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করে এবং আমার ফরমান হতে বেপরোয়া হয়ে যায়। আল্লাহর এই শক্র স্বীয় শক্তির দাপট দেখিয়ে এবং সেনাবাহিনীর ক্ষমতার গর্বে গর্বিত হয়ে তার ফরমানের অসম্মান করে। সে তার অনুসারীদেরকে সাথে নিয়ে হযরত মূসা (আঃ)-এর ক্ষতি সাধনে ও বিরধিতায় উঠে পড়ে লেগে যায়। হযরত মূসা (আঃ) সম্পর্কে সে মন্তব্য করে যে, তিনি যাদুকর অথবা পাগল। সুতরাং এই অহংকারী, পাপী, কাফির এবং উদ্ধত ব্যক্তিকে আল্লাহ তা'আলা তার লোক লশকরসহ সমুদ্রে ডুবিয়ে দেন। সে তো ছিল তিরস্কারযোগ্য।

মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ বলেনঃ নিদর্শন রয়েছে আ’দের ঘটনায়, যখন আমি প্রেরণ করেছিলাম তাদের বিরুদ্ধে অকল্যাণকর বায়ু। এটা যা কিছুর উপর দিয়ে। বয়ে গিয়েছিল তাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করেছিল। ওটা সড়াপচা হাড়ের মত হয়ে গিয়েছিল।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “বায়ু দ্বিতীয় যমীনে প্রবাহিত হয়। আল্লাহ তা'আলা যখন আ’দ জাতিকে ধ্বংস করার ইচ্ছা করেন তখন বায়র রক্ষক (ফেরেশতা)কে নির্দেশ দেন। যে, তিনি যেন তাদেরকে (আ’দ জাতিকে ধ্বংস করার জন্যে বায়ু প্রবাহিত করেন। ফেরেশতা তখন আরয করেনঃ “আমি বাতাসের ভাণ্ডারে কি ততটুকু ছিদ্র করে দিবো যতটুকু ছিদ্র গরুর নাকে রয়েছে?” উত্তরে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “বায়ুর ভাণ্ডারে যদি তুমি ততটুকু ছিদ্র কর তবে তো ওটা যমীনকে এবং ওর মধ্যস্থিত সবকিছুকেই ওলট-পালট করে দিবে। বরং তুমি ওতে অঙ্গুরীর। বৃত্তের সমান ছিদ্র কর।” এটা ছিল ঐ বায়ু যার কথা আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ “এটা যা কিছুর উপর দিয়ে বয়ে গিয়েছিল তাকেই চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছিল। (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এই ফরমান রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে হওয়া অস্বীকৃত। এটাই বুঝা যাচ্ছে যে, এটা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ)-এর উক্তি। ইয়ারমুকের যুদ্ধে তিনি আহলে কিতাবের কিতাবগুলোর দুটি থলে পেয়েছিলেন। সম্ভবতঃ ওগুলো হতেই তিনি এটা বর্ণনা করেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই। সবচেয়ে ভাল জানেন) এটা ছিল দক্ষিণা বায়ু। সহীহ হাদীসে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাকে পূবালী বায়ু দ্বারা সাহায্য করা হয়েছে, আর আ’দ সম্প্রদায়কে পশ্চিমা বায়ু দ্বারা ধ্বংস করা হয়েছিল।”

প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ ‘আরো নিদর্শন রয়েছে সামূদের বৃত্তান্তে, যখন তাদেরকে বলা হয়েছিলঃ ভোগ করে নাও স্বল্পকাল। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ ‘তোমাদের নির্দিষ্ট সময় শেষ হওয়া পর্যন্ত তোমরা সুখসম্ভার ভোগ করে নাও।' এটা প্রকাশমান যে, এটা আল্লাহ তাআলার নিম্নের উক্তির মতঃ (আরবী)

অর্থাৎ “সামূদ সম্প্রদায়কে আমি হিদায়াত দিয়েছিলাম, কিন্তু তারা হিদায়াতের উপর অন্ধত্বকে পছন্দ করেছিল, সুতরাং লাঞ্ছনাকর শাস্তিরূপ বজাঘাত তাদেরকে পাকড়াও করলো।” (৪১:১৭) অনুরূপভাবে এখানে আল্লাহ পাক বলেনঃ ‘আরো নিদর্শন রয়েছে সামূদের বৃত্তান্তে, যখন তাদেরকে বলা হয়েছিলঃ ভোগ করে নাও স্বল্পকাল। কিন্তু তারা তাদের প্রতিপালকের আদেশ অমান্য করলো, ফলে তাদের প্রতি বজ্রাঘাত হলো এবং তারা তা দেখছিল।

তিন দিন পর্যন্ত তারা শাস্তির লক্ষণ দেখতে থাকে। অবশেষে চতুর্থ দিন অকস্মাৎ তাদের উপর শাস্তি আপতিত হয়ে যায়। তারা অচেতন ও বোধশূন্য হয়ে পড়ে। এতোটুকু তাদেরকে অবকাশ দেয়া হয়নি যে, দাঁড়িয়ে পালাবার চেষ্টা করতে পারে অথবা অন্য কোন উপায়ে জীবন রক্ষার চিন্তা করতে পারে। তাই তো প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ তারা উঠে দাঁড়াতে পারলো না এবং তা প্রতিরোধ করতে পারলো না।

এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি ধ্বংস করেছিলাম এদের পূর্বে নূহ। (আঃ)-এর সম্প্রদায়কে, তারা ছিল সত্যত্যাগী সম্প্রদায়।

ফিরাউন, আ’দ, সামূদ এবং হযরত নূহ (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের বিস্তারিত ঘটনাবলী ইতিপূর্বে কয়েকটি সূরার তাফসীরে বর্ণিত হয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।