সূরা আয-যারিয়াত (আয়াত: 39)
হরকত ছাড়া:
فتولى بركنه وقال ساحر أو مجنون ﴿٣٩﴾
হরকত সহ:
فَتَوَلّٰی بِرُکْنِهٖ وَ قَالَ سٰحِرٌ اَوْ مَجْنُوْنٌ ﴿۳۹﴾
উচ্চারণ: ফাতাওয়াল্লা-বিরুকনিহী ওয়াকা-লা ছা-হিরুন আও মাজনূন।
আল বায়ান: কিন্তু সে তার দলবলসহ মুখ ফিরিয়ে নিল এবং বলল, ‘এ ব্যক্তি যাদুকর অথবা উম্মাদ।’
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩৯. তখন সে ক্ষমতার অহংকারে মুখ ফিরিয়ে নিল(১) এবং বলল, এ ব্যক্তি হয় এক জাদুকর, না হয় এক উন্মাদ।
তাইসীরুল ক্বুরআন: তখন সে তার ক্ষমতার দাপটে মুখ ফিরিয়ে নিল আর বলল- ‘এ লোক একটা যাদুকর না হয় পাগল।’
আহসানুল বায়ান: (৩৯) তখন সে ক্ষমতার দম্ভে মুখ ফিরিয়ে নিল[1] এবং বলল, ‘এই ব্যক্তি হয় এক যাদুকর, না হয় এক পাগল।’
মুজিবুর রহমান: তখন সে ক্ষমতা দম্ভে মুখ ফিরিয়ে নিল এবং বললঃ এই ব্যক্তি হয় এক যাদুকর, না হয় উম্মাদ।
ফযলুর রহমান: কিন্তু সে তার শক্তির জোরে মুখ ফিরিয়ে নিল আর (মূসার কথা) বলল, “(হয় সে) যাদুকর, না হয় পাগল।”
মুহিউদ্দিন খান: অতঃপর সে শক্তিবলে মুখ ফিরিয়ে নিল এবং বললঃ সে হয় যাদুকর, না হয় পাগল।
জহুরুল হক: কিন্ত সে ফিরে গিয়েছিল তার শক্তিমত্তার দিকে এবং বলেছিল -- "একজন জাদুকর অথবা একজন পাগল।"
Sahih International: But he turned away with his supporters and said," A magician or a madman."
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৩৯. তখন সে ক্ষমতার অহংকারে মুখ ফিরিয়ে নিল(১) এবং বলল, এ ব্যক্তি হয় এক জাদুকর, না হয় এক উন্মাদ।
তাফসীর:
(১) ركن শব্দের অর্থ খুঁটি। আবার নিজ পার্শ্বশক্তির অর্থেও ব্যবহৃত হয়। মুফাসসিরগণ এখানে দুটি অর্থ বর্ণনা করেছেন। এক. সে তার শক্তির অহংকারে মত্ত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল। দুই. সে তার শক্তিশালী দলবল ও সেনাবাহিনীসহ মুখ ফিরিয়ে নিল। [দেখুন, কুরতুবী]।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৩৯) তখন সে ক্ষমতার দম্ভে মুখ ফিরিয়ে নিল[1] এবং বলল, ‘এই ব্যক্তি হয় এক যাদুকর, না হয় এক পাগল।”
তাফসীর:
[1] শক্তিশালী দিককে ‘রুকন’ বলে। এখানে তার নিজস্ব ক্ষমতা এবং সৈন্যকে বুঝানো হয়েছে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৩৮-৪৬ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা তিনটি জাতির কথা তুলে ধরেছেন যাদেরকে তাদের অবাধ্যতার কারণে বিভিন্নভাবে শাস্তি দিয়েছেন।
প্রথমেই মূসা (আঃ)-এর জাতির কথা তুলে ধরেছেন। তাঁকে সুস্পষ্ট প্রমাণসহ প্রেরণ করেছিলেন ফির‘আউনের কাছে।
فِيْ مُوْسٰي অর্থাৎ মূসার ঘটনায় নিদর্শন রেখে দিয়েছি।
কিন্তু ফির‘আউন (فَتَوَلّٰي بِرُكْنِهِ)
অর্থাৎ সে তার দলবলসহ ঈমান আনা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলো। আর মূসা (আঃ)-কে বলতে লাগল যে, সে একজন জাদুকর অথবা পাগল। ফলে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে সমুদ্রে ডুবিয়ে মারলেন।
তারপর নিয়ে আসলেন হূদ (আঃ)-এর জাতির কথা। যাদেরকে ধ্বংস করেছেন প্রচণ্ড বাতাস দিয়ে।
(الرِّيحَ الْعَقِيمَ)
বলা হয় এমন বাতাসকে যাতে কোন কল্যাণ নেই। এ বাতাস যার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে তাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়ে গেছে।
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা উল্লেখ করলেন সালেহ (আঃ)-এর জাতির কথা, যখন তারা তাদের দাবী করা অলৌকিক উটকে হত্যা করল, তখন আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে কিছু দিনের জন্য অবকাশ দিয়েছিলেন। পরে বজ্রাঘাত দ্বারা শাস্তি দিলেন যা তারা প্রত্যক্ষ করেছিল। তাদেরকে এমন শাস্তি দিয়েছিলেন যে, পালানো তো দূরের কথা তারা উঠার সুযোগও পায়নি।
এ তিন জাতির পূর্বে ছিল নূহ (আঃ)-এর জাতি। তারাও ছিল পাপিষ্ঠ জাতি, তাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা মহাপ্লাবন দ্বারা ডুবিয়ে মেরেছিলেন। পূর্ববর্তী নাবী ও তাদের অবাধ্য জাতিদের এসব ঘটনা বর্ণনার মধ্য দিয়ে যেমন নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নবুওয়াতের সত্যতার প্রমাণ মেলে তেমনি সতর্কতার ইঙ্গিত বহণ করে যে, যারাই তাদের মত অবাধ্যতা প্রকাশ করবে তাদের পরিণতি তাদের মতই হবে।
আয়াত হতে শিক্ষ¬ণীয় বিষয় :
১. কুরআনে পূর্ববর্তী জাতিদের আলোচনা নিয়ে আসার উদ্দেশ্য সে সব ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা।
২. যারাই আল্লাহ তা‘আলা ও নাবীদের বিরোধিতা করেছে তারাই ধ্বংস হয়েছে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৩৮-৪৬ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তাআলা বলেনঃ হযরত লুত (আঃ)-এর কওমের পরিণাম দেখে মানুষ যেমন উপদেশ ও শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে, অনুরূপভাবে ফিরাউন ও তার লোকদের ঘটনার মধ্যেও তাদের জন্য শিক্ষা ও উপদেশ রয়েছে। আমি তাদের কাছে আমার পয়গাম্বর হযরত মূসা (আঃ)-কে পাঠিয়েছিলাম। তাকে আমি উজ্জ্বল ও সুস্পষ্ট দলীল-প্রমাণসহ প্রেরণ করেছিলাম। কিন্তু তাদের নেতা অহংকারী ফিরাউন সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে ও ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করে এবং আমার ফরমান হতে বেপরোয়া হয়ে যায়। আল্লাহর এই শক্র স্বীয় শক্তির দাপট দেখিয়ে এবং সেনাবাহিনীর ক্ষমতার গর্বে গর্বিত হয়ে তার ফরমানের অসম্মান করে। সে তার অনুসারীদেরকে সাথে নিয়ে হযরত মূসা (আঃ)-এর ক্ষতি সাধনে ও বিরধিতায় উঠে পড়ে লেগে যায়। হযরত মূসা (আঃ) সম্পর্কে সে মন্তব্য করে যে, তিনি যাদুকর অথবা পাগল। সুতরাং এই অহংকারী, পাপী, কাফির এবং উদ্ধত ব্যক্তিকে আল্লাহ তা'আলা তার লোক লশকরসহ সমুদ্রে ডুবিয়ে দেন। সে তো ছিল তিরস্কারযোগ্য।
মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ বলেনঃ নিদর্শন রয়েছে আ’দের ঘটনায়, যখন আমি প্রেরণ করেছিলাম তাদের বিরুদ্ধে অকল্যাণকর বায়ু। এটা যা কিছুর উপর দিয়ে। বয়ে গিয়েছিল তাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করেছিল। ওটা সড়াপচা হাড়ের মত হয়ে গিয়েছিল।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “বায়ু দ্বিতীয় যমীনে প্রবাহিত হয়। আল্লাহ তা'আলা যখন আ’দ জাতিকে ধ্বংস করার ইচ্ছা করেন তখন বায়র রক্ষক (ফেরেশতা)কে নির্দেশ দেন। যে, তিনি যেন তাদেরকে (আ’দ জাতিকে ধ্বংস করার জন্যে বায়ু প্রবাহিত করেন। ফেরেশতা তখন আরয করেনঃ “আমি বাতাসের ভাণ্ডারে কি ততটুকু ছিদ্র করে দিবো যতটুকু ছিদ্র গরুর নাকে রয়েছে?” উত্তরে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “বায়ুর ভাণ্ডারে যদি তুমি ততটুকু ছিদ্র কর তবে তো ওটা যমীনকে এবং ওর মধ্যস্থিত সবকিছুকেই ওলট-পালট করে দিবে। বরং তুমি ওতে অঙ্গুরীর। বৃত্তের সমান ছিদ্র কর।” এটা ছিল ঐ বায়ু যার কথা আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ “এটা যা কিছুর উপর দিয়ে বয়ে গিয়েছিল তাকেই চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছিল। (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এই ফরমান রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে হওয়া অস্বীকৃত। এটাই বুঝা যাচ্ছে যে, এটা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ)-এর উক্তি। ইয়ারমুকের যুদ্ধে তিনি আহলে কিতাবের কিতাবগুলোর দুটি থলে পেয়েছিলেন। সম্ভবতঃ ওগুলো হতেই তিনি এটা বর্ণনা করেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই। সবচেয়ে ভাল জানেন) এটা ছিল দক্ষিণা বায়ু। সহীহ হাদীসে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাকে পূবালী বায়ু দ্বারা সাহায্য করা হয়েছে, আর আ’দ সম্প্রদায়কে পশ্চিমা বায়ু দ্বারা ধ্বংস করা হয়েছিল।”
প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ ‘আরো নিদর্শন রয়েছে সামূদের বৃত্তান্তে, যখন তাদেরকে বলা হয়েছিলঃ ভোগ করে নাও স্বল্পকাল। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ ‘তোমাদের নির্দিষ্ট সময় শেষ হওয়া পর্যন্ত তোমরা সুখসম্ভার ভোগ করে নাও।' এটা প্রকাশমান যে, এটা আল্লাহ তাআলার নিম্নের উক্তির মতঃ (আরবী)
অর্থাৎ “সামূদ সম্প্রদায়কে আমি হিদায়াত দিয়েছিলাম, কিন্তু তারা হিদায়াতের উপর অন্ধত্বকে পছন্দ করেছিল, সুতরাং লাঞ্ছনাকর শাস্তিরূপ বজাঘাত তাদেরকে পাকড়াও করলো।” (৪১:১৭) অনুরূপভাবে এখানে আল্লাহ পাক বলেনঃ ‘আরো নিদর্শন রয়েছে সামূদের বৃত্তান্তে, যখন তাদেরকে বলা হয়েছিলঃ ভোগ করে নাও স্বল্পকাল। কিন্তু তারা তাদের প্রতিপালকের আদেশ অমান্য করলো, ফলে তাদের প্রতি বজ্রাঘাত হলো এবং তারা তা দেখছিল।
তিন দিন পর্যন্ত তারা শাস্তির লক্ষণ দেখতে থাকে। অবশেষে চতুর্থ দিন অকস্মাৎ তাদের উপর শাস্তি আপতিত হয়ে যায়। তারা অচেতন ও বোধশূন্য হয়ে পড়ে। এতোটুকু তাদেরকে অবকাশ দেয়া হয়নি যে, দাঁড়িয়ে পালাবার চেষ্টা করতে পারে অথবা অন্য কোন উপায়ে জীবন রক্ষার চিন্তা করতে পারে। তাই তো প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ তারা উঠে দাঁড়াতে পারলো না এবং তা প্রতিরোধ করতে পারলো না।
এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি ধ্বংস করেছিলাম এদের পূর্বে নূহ। (আঃ)-এর সম্প্রদায়কে, তারা ছিল সত্যত্যাগী সম্প্রদায়।
ফিরাউন, আ’দ, সামূদ এবং হযরত নূহ (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের বিস্তারিত ঘটনাবলী ইতিপূর্বে কয়েকটি সূরার তাফসীরে বর্ণিত হয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।