সূরা আয-যারিয়াত (আয়াত: 33)
হরকত ছাড়া:
لنرسل عليهم حجارة من طين ﴿٣٣﴾
হরকত সহ:
لِنُرْسِلَ عَلَیْهِمْ حِجَارَۃً مِّنْ طِیْنٍ ﴿ۙ۳۳﴾
উচ্চারণ: লিনুরছিলা ‘আলাইহিম হিজা-রাতাম মিন তীন।
আল বায়ান: ‘যাতে তাদের উপর মাটির শক্ত ঢেলা নিক্ষেপ করি’।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩৩. যাতে তাদের উপর নিক্ষেপ করি মাটির শক্ত ঢেলা,
তাইসীরুল ক্বুরআন: যেন তাদের উপর মাটির পাথর বর্ষণ করি
আহসানুল বায়ান: (৩৩) যাতে আমরা তাদের উপর মাটির শক্ত ঢেলা নিক্ষেপ করি।[1]
মুজিবুর রহমান: তাদের উপর নিক্ষেপ করার জন্য মাটির শক্ত ঢেলা,
ফযলুর রহমান: “এজন্য যে, আমরা তাদের ওপর শক্ত মাটির ঢিলা নিক্ষেপ করব,”
মুহিউদ্দিন খান: যাতে তাদের উপর মাটির ঢিলা নিক্ষেপ করি।
জহুরুল হক: "যেন তাদের উপরে আমরা বর্ষণ করতে পারি মাটির পাথর,
Sahih International: To send down upon them stones of clay,
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৩৩. যাতে তাদের উপর নিক্ষেপ করি মাটির শক্ত ঢেলা,
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৩৩) যাতে আমরা তাদের উপর মাটির শক্ত ঢেলা নিক্ষেপ করি।[1]
তাফসীর:
[1] নিক্ষেপ করার অর্থ সে কাঁকর দিয়ে তাদেরকে হত্যা করা। এই কাঁকরগুলো না ছিল খাঁটি পাথরের, আর না ছিল শিলাবৃষ্টি। বরং এগুলি ছিল পোড়া মাটির তৈরী।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ২৪-৩৭ নং আয়াতের তাফসীর :
ইবরাহীম (আঃ) ও লূত (আঃ) সমকালীন নাবী। তারা উভয়ে চাচাতো বা খালাতো ভাই। লূত (আঃ)-এর জাতি পৃথিবীর বুকে সর্বপ্রথম সমকামিতায় লিপ্ত হয়। তাদেরকে লূত (আঃ) বার বার বারণ করার পরেও যখন বিরত থাকল না। তখন আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে শাস্তি দেয়ার জন্য ফেরেশতা প্রেরণ করলেন।
এ ফেরেশতাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা ইব্রাহীম (আঃ)-এর বাড়ি হয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কারণ (১) ইবরাহীম (আঃ)-কে তাঁর সন্তান ইসহাকের সুসংবাদ দেয়ার জন্য, (২) লূত (আঃ)-এর অবাধ্য সম্প্রদায়ের ওপর আযাবের কথা জানিয়ে দেয়ার জন্য।
ফেরেশতাগণ ইবরাহীম (আঃ)-এর বাড়িতে মেহমানের বেশে আগমন করলেন। তারা ইবরাহীম (আঃ)-কে সালাম দিলে ইবরাহীম (আঃ) সালামের জবাব দিয়ে বললেন- (قَوْمٌ مُّنْكَرُونَ) অর্থাৎ- আপনাদেরকে অপরিচিত মনে হচ্ছে। ইবরাহীম (আঃ) তাদেরকে চিনতে পারেননি যে, তারা ফেরেশতা। ইবরাহীম (আঃ) মেহমানদের আপ্যায়ন করার জন্য চুপিসারে স্ত্রীর কাছে গিয়ে ভূনা করা একটি গরুর বাছুর নিয়ে এসে খেতে বললেন। কিন্তু তারা খাচ্ছে না। এ অবস্থা দেখে তিনি ভয় পেয়ে গেলেন। তারা বললেন : আপনি ভয় করবেন না। যেমন অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
( فَلَمَّا رَآٰ اَیْدِیَھُمْ لَا تَصِلُ اِلَیْھِ نَکِرَھُمْ وَاَوْجَسَ مِنْھُمْ خِیْفَةًﺚ قَالُوْا لَا تَخَفْ اِنَّآ اُرْسِلْنَآ اِلٰی قَوْمِ لُوْطٍﮕوَامْرَاَتُھ۫ قَا۬ئِمَةٌ فَضَحِکَتْ فَبَشَّرْنٰھَا بِاِسْحٰقَﺫ وَمِنْ وَّرَا۬ئِ اِسْحٰقَ یَعْقُوْبَ)
“সে যখন দেখল তাদের হাত তার দিকে প্রসারিত হচ্ছে না, তখন তাদেরকে অবাঞ্ছিত মনে করল এবং তাদের সম্বন্ধে তার মনে ভীতি সঞ্চার হল। তারা বলল : ‘ভয় কর না, আমরা লূতের সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরিত হয়েছি।’ আর তার স্ত্রী দণ্ডায়মান ছিল এবং সে হেসে ফেলল। অতঃপর আমি তাকে ইস্হাকের ও ইস্হাকের পরবর্তী ইয়া‘কূবের সুসংবাদ দিলাম। (সূরা হূদ ১১ :৭০-৭১)
তারপর তারা ইবরাহীম (আঃ)-কে ইসহাক (আঃ)-এর সুসংবাদ দিলেন। ইবরাহীম (আঃ)-এর স্ত্রী অবাক, আমি বন্ধ্যা ও বৃদ্ধা, কিভাবে আমার সন্তান হবে। তারা বললেন : তোমার প্রতিপালক এরূপই বলেছেন।
তারপর ইবরাহীম (আঃ) তাদেরকে বললেন, তাহলে আপনাদের আসার উদ্দেশ্য কী? তখন ফেরেশতাগণ আয়াতে বর্ণিত কথাগুলো বললেন।
(فَمَا وَجَدْنَا فِيْهَا غَيْرَ بَيْتٍ مِّنَ الْمُسْلِمِيْنَ)
‘এবং সেখানে একটি পরিবার (লূত এর পরিবার) ব্যতীত কোন মুসলিম আমি পাইনি।’ এ ঘরটি ছিল লূত (আঃ)-এর। সেখানে তাঁর দু’কন্যা এবং তাঁর ওপর ঈমান আনয়নকারী কিছু লোক ছিল। বলা হয় এরা মোট তেরজন ছিল। এদের মধ্যে লূত-এর স্ত্রী শামিল ছিল না। বরং সে ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতির অন্তর্ভুক্ত ছিল। (আয়সারুত্ তাফাসীর- অত্র আয়াতের তাফসীর)
এসব কিছুর মাঝে রয়েছে তাদের জন্য নিদর্শন যারা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তিকে ভয় করে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নবুওয়াতের স্বীকৃতি পাওয়া গেল। কারণ একজন উম্মি ব্যক্তির জন্য ওয়াহীর মাধ্যম ছাড়া এসব ঘটনা জানা সম্ভব না।
২. ইবরাহীম (আঃ)-অতিথিপরায়ণ ছিলেন, এমনকি অপরিচিত লোকদের ক্ষেত্রেও মেজবানের যথার্থ পরিচয় দিতেন ।
৩. আল্লাহ তা‘আলা যাকে যখন ইচ্ছা সন্তান দান করতে পারেন।
৪. লূত (আঃ)-এর সম্প্রদায় সর্বপ্রথম সমকামিতার অপরাধে লিপ্ত হয়, যার কারণে তাদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হয়।
৫. অপরিচিত লোক মেহমান হলে তাকে সম্মানের সাথে মেহমানদারী করা উচিত।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৩১-৩৭ নং আয়াতের তাফসীর:
ইতিপূর্বে গত হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত ইবরাহীম (আঃ) সম্পর্কে সংবাদ দিতে গিয়ে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতঃপর যখন ইবরাহীম (আঃ)-এর ভীতি দূরীভূত হলো এবং তার নিকট সুসংবাদ আসলো তখন সে লূত (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের সম্বন্ধে আমার সাথে বাদানুবাদ করতে লাগলো। ইবরাহীম (আঃ) তো অবশ্যই সহনশীল, কোমল হৃদয়, সতত আল্লাহ অভিমুখী। হে ইবরাহীম (আঃ)! এটা হতে তুমি বিরত হও। তোমার প্রতিপালকের বিধান এসে পড়েছে; তাদের উপর তো শাস্তি আসবে যা অনিবার্য।` (১১:৭৪-৭৬)
আর এখানে আল্লাহ তা'আলা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর উক্তি উদ্ধৃত করেন যে, তিনি ফেরেশতাদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে প্রেরিত দূতগণ! আপনাদের বিশেষ কাজ কি?' অর্থাৎ আপনাদের শুভাগমনের উদ্দেশ্য কি? ফেরেশতাগণ জবাবে বলেনঃ আমাদেরকে এক অপরাধী সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরণ করা হয়েছে। এই সম্প্রদায় দ্বারা তারা হযরত লূত (আঃ)-এর সম্প্রদায়কে বুঝিয়েছেন। তারা আরো বলেনঃ “আমরা আদিষ্ট হয়েছি যে, আমরা যেন তাদের উপর মাটির শক্ত ঢেলা নিক্ষেপ করি; যা সীমালংঘনকারীদের জন্যে আপনার প্রতিপালকের নিকট হতে চিহ্নিত।' অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার নির্দেশক্রমে ঐ পাপীদের নাম ঢেলাগুলোর উপর পূর্ব হতেই লিখিত আছে। প্রত্যেকের জন্যে পৃথক পৃথক ঢেলা নির্দিষ্ট করা হয়েছে। সূরায়ে আনকাবুতে রয়েছেঃ (আরবী)
অর্থাৎ “সে (ইবরাহীম আঃ) বললোঃ এই জনপদে তো লূত (আঃ) রয়েছে। তারা বললোঃ সেথায় কারা আছে তা আমরা ভাল জানি, আমরা তো দূত (আঃ)-কে ও তার পরিজনবর্গকে রক্ষা করবেই, তার স্ত্রী ব্যতীত; সে তো পশ্চাতে অবস্থানকারীদের অন্তর্ভুক্ত।` (২৯:৩২)
অনুরূপভাবে এখানেও আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ‘সেখানে যেসব মুমিন ছিল আমি তাদেরকে উদ্ধার করেছিলাম। এর দ্বারাও হযরত লূত (আঃ) এবং তাঁর পরিবার পরিজনকে বুঝানো হয়েছে। তার স্ত্রী ব্যতীত, যে ঈমান আনয়ন করেনি। মহান আল্লাহ বলেনঃ ‘সেখানে একটি পরিবার ব্যতীত কোন অত্মিসমর্পণকারী আমি পাইনি।' এ আয়াত দু’টি ঐ লোকদের দলীল যারা বলেন যে, ঈমানের নামই ইসলাম। কেননা, এখানে যাদেরকে মুমিন বলা হয়েছে তাদেরকেই মুসলিম বলা হয়েছে। মুতাজিলাদের মাযহাবও এটাই যে, ঈমান ও ইসলাম একই জিনিস। কিন্ত তাদের এ দলীল খুবই দুর্বল। কেননা, এ লোকগুলো মুমিন ছিলেন। আর আমরাও তো এটা স্বীকার করি যে, প্রত্যেক মুমিনই মুসলিম হয়। কিন্তু প্রত্যেক মুসলিম মুমিন হয় না। সুতরাং অবস্থার বিশেষত্বের কারণে তাঁদেরকে মুমিন ও মুসলিম বলা হয়েছে। এর দ্বারা সাধারণভাবে এটা প্রমাণিত হয় না যে, প্রত্যেক মুসলিম মুমিন হয়ে থাকে। হযরত ইমাম বুখারী (রঃ) এবং অন্যান্য মুহাদ্দিসদের মাযহাব এই যে, যখন ইসলাম প্রকত ও সঠিক হয় তখন ঈমান ও ইসলাম একই হয়। তবে ইসলাম প্রকৃত ও বাস্তবরূপী না হলে ঈমান ও ইসলামের পার্থক্য অবশ্যই হবে।
এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এই কাফিরদেরকে ধ্বংস করে দেয়ার মধ্যে ঐ লোকদের জন্যে অবশ্যই নিদর্শন, শিক্ষা ও উপদেশ রয়েছে যারা আল্লাহর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তিকে ভয় করে। তারা ঐ সব লোকের কৃতকর্মের পরিণাম দেখে যথেষ্ট শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।