সূরা কাফ (আয়াত: 33)
হরকত ছাড়া:
من خشي الرحمن بالغيب وجاء بقلب منيب ﴿٣٣﴾
হরকত সহ:
مَنْ خَشِیَ الرَّحْمٰنَ بِالْغَیْبِ وَ جَآءَ بِقَلْبٍ مُّنِیْبِۣ ﴿ۙ۳۳﴾
উচ্চারণ: মান খাশিয়ার রাহমা-না বিলগাইবি ওয়া জাআ বিকালবিম মুনীব।
আল বায়ান: যে না দেখেই রহমানকে ভয় করত এবং বিনীত হৃদয়ে উপস্থিত হত।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩৩. যারা গায়েব অবস্থায় দয়াময় আল্লাহ্কে ভয় করেছে এবং বিনীত চিত্তে উপস্থিত হয়েছে—
তাইসীরুল ক্বুরআন: যে না দেখেই দয়াময় (আল্লাহকে) ভয় করত, আর আল্লাহর নির্দেশ পালনের জন্য বিনয়ে অবনত অন্তর নিয়ে উপস্থিত হত।
আহসানুল বায়ান: (৩৩) যারা না দেখে পরম দয়াময়কে ভয় করে এবং (আল্লাহ)-অভিমুখী চিত্তে উপস্থিত হয়। [1]
মুজিবুর রহমান: যারা না দেখেই দয়াময় আল্লাহকে ভয় করে এবং বিনীত চিত্তে উপস্থিত হয় –
ফযলুর রহমান: যে না দেখেও করুণাময় আল্লাহকে ভয় করে এবং বিনীত অন্তর নিয়ে (তাঁর সামনে) উপস্থিত হয়।
মুহিউদ্দিন খান: যে না দেখে দয়াময় আল্লাহ তা’আলাকে ভয় করত এবং বিনীত অন্তরে উপস্থিত হত।
জহুরুল হক: "যে পরম করুণাময়কে ভয় করত সংগোপনে, আর উপস্থিত হত বিনয়-নম্র হৃদয় নিয়ে।
Sahih International: Who feared the Most Merciful unseen and came with a heart returning [in repentance].
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৩৩. যারা গায়েব অবস্থায় দয়াময় আল্লাহ্–কে ভয় করেছে এবং বিনীত চিত্তে উপস্থিত হয়েছে—
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৩৩) যারা না দেখে পরম দয়াময়কে ভয় করে এবং (আল্লাহ)-অভিমুখী চিত্তে উপস্থিত হয়। [1]
তাফসীর:
[1] مُنِيْبٌ আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী, অভিমুখী ও তাঁর আনুগত্যশীল অন্তর। কিংবা অর্থ سَلِيْمٍ শিরক এবং পাপাচারের অপবিত্রতা থেকে পবিত্র অন্তর।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৩০-৩৫ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
মহান আল্লাহ বলেন :
(لَأَمْلَئَنَّ جَهَنَّمَ مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِيْنَ)
“আমি অবশ্যই জিন ও মানুষ উভয়কে দিয়েই জাহান্নাম পরিপূর্ণ করব।” (আস্ সাজদাহ্ ৩২ :১৩) এ অঙ্গীকার অনুযায়ী মহান আল্লাহ কাফির জিন ও মানুষ জাতিকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করে জিজ্ঞাসা করবেন, তুই ভরে গেছিস, না ভরিসনি? সে উত্তরে বলবে, আরো আছে কি? অর্থাৎ যদিও আমি ভরে গেছি কিন্তু হে আল্লাহ! তোমার শত্র“দের জন্য আমার উদরে আরো ঢুকোনোর মতো স্থান আছে। জাহান্নামের সাথে আল্লাহ তা‘আলার এ কথোপকথন এবং জাহান্নামের উত্তর প্রদান আল্লাহ তা‘আলার ক্ষমতার কাছে মোটেও কোন অসম্ভব ব্যাপার না। হাদীসে এসেছে : জাহান্নামে মানুষকে নিক্ষেপ করা হবে আর জাহান্নাম বলবে : আরো আছে কি? এমনকি জাহান্নামে মহান আল্লাহ পা রাখবেন ফলে জাহান্নাম বলবে : ব্যাস্ ব্যাস্। (সহীহ বুখারী হা. ৪৮৪৮)
জাহান্নামে মহান আল্লাহ তাঁর পা রাখবেন ফলে জাহান্নাম বলবে, ব্যাস্ ব্যাস্ এরূপ ৬টির অধিক হাদীস রযেছে। (দেখুন :ইবনু কাসীর- এ আয়াতের তাফসীর)
সে দিন জান্নাত মুত্তাকীদের নিকটবর্তী করে দেয়া হবে। কোন দূরত্ব থাকবে না। আবার এর অর্থ কেউ এভাবে বলেছেন যে, যেদিন জান্নাত মুত্তাকিদের নিকটবর্তী করা হবে সে দিন দূরে নয়, কেননা তা অবশ্যই সংঘটিত হবে। আর
كل ما هو ات فهو قريب
প্রত্যেক যা কিছু আসার তা নিকটবর্তী। (ইবনু কাসীর- এ আয়াতের তাফসীর)
(وَلَدَيْنَا مَزِيدٌ)
‘আমার নিকট রয়েছে তারও অধিক’ অর্থাৎ জান্নাতীগণ জান্নাতে যা কিছু চাইবে সব পাবে। এমনকি তারা যা চাইবে আল্লাহ তা‘আলার কাছে তার চেয়ে আরো বেশি আছে। বেশি যা দেবেন মুহাদ্দিসগণ তার তাফসীর করেছেন- আল্লাহ তা‘আলার দীদার। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(لِلَّذِيْنَ أَحْسَنُوا الْحُسْنٰي وَزِيَادَةٌ ط وَلَا يَرْهَقُ وُجُوْهَهُمْ قَتَرٌ وَّلَا ذِلَّةٌ )
“যারা কল্যাণকর কাজ করে তাদের জন্য আছে কল্যঅণ এবং আরও অধিক। কলঙ্ক ও হীনতা তাদের মুখমণ্ডলকে আচ্ছন্ন করবে না।” (সূরা ইউনুস ১০ :২৬)
মু’মিনরা পরকালে আল্লাহ তা‘আলাকে দেখতে পাবে এ সম্পর্কে অনেক সহীহ হাদীস রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন :
إِنَّكُمْ سَتَرَوْنَ رَبَّكُمْ، كَمَا تَرَوْنَ هَذَا القَمَرَ، لاَ تُضَامُّونَ فِي رُؤْيَتِهِ، فَإِنِ اسْتَطَعْتُمْ أَنْ لاَ تُغْلَبُوا عَلَي صَلاَةٍ قَبْلَ طُلُوعِ الشَّمْسِ وَقَبْلَ غُرُوبِهَا فَافْعَلُوا
তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে অবশ্যই দেখতে পাবে যেমন এ চাঁদকে দেখতে পাচ্ছ। তা দেখতে তোমাদের কোন অসুবিধা হচ্ছে না। (এরূপ সুস্পষ্টভাবেই আল্লাহ তা‘আলাকে দেখতে পাবে) সুতরাং তোমরা যদি পার সূর্যোদয়ের পূর্বের সালাত ও সূর্যাস্তের পূর্বের সালাত আদায় করতে পরাজয় বরণ করবে না তাহলে তাই কর। (সহীহ বুখারী হা. ৫৫৪, সহীহ মুসলিম হা. ৬৩৩) এ সম্পর্কে পূর্বে একাধিক স্থানে আলোচনা করা হয়েছে।
অন্য হাদীসে এসেছে : যখন জান্নাতীগণ জান্নাতে প্রবেশ করবে তখন আল্লাহ তা‘আলা বলবেন : তোমরা কি আরো কিছু চাও, আমি বৃদ্ধি করে দেব? জান্নাতীগণ বলবে : আপনি কি আমাদের চেহারা উজ্জ্বল করেননি? আমাদেরকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করেননি? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : তখন আল্লাহ তা‘আলা পর্দা তুলে দেবেন এবং জান্নাতীরা আল্লাহ তা‘আলাকে দেখতে পাবে। তাদেরকে জান্নাতে যা দেয়া হয়েছে তা এত প্রিয় হবে না যত প্রিয় হবে আল্লাহ তা‘আলাকে দর্শন করা। (সহীহ মুসলিম হা. ৪৬৭)
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. আল্লাহ তা‘আলা ও জাহান্নামের মাঝে কথোপকথন হবে। কথা বলা আল্লাহর একটি গুণ।
২. আল্লাহ তা‘আলার “পা” রয়েছে তার প্রমাণ পেলাম।
৩. জান্নাত মুত্তাকীদের অতি নিকটবর্তী করে দেয়া হবে।
৪. মু’মিন জান্নাতে আল্লাহ তা‘আলাকে দেখতে পাবে, কোন অন্তরায় থাকবে না। এর দ্বারা আল্লাহ তা‘আলার আকার সাব্যস্ত হয়। তবে এর ধরণ সম্পর্কে তিনিই সম্যক অবগত।
৫. জান্নাতে যাওয়ার উপকরণ ও জাহান্নাম থেকে বাঁচার উপায় জানলাম।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৩০-৩৫ নং আয়াতের তাফসীর:
যেহেতু আল্লাহ তা'আলা জাহান্নামকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তিনি ওকে পূর্ণ করবেন, সেহেতু কিয়ামতের দিন যেসব দানব ও মানব ওর যোগ্য হবে তাদেরকে ওর মধ্যে নিক্ষেপ করা হবে এবং আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ওকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “তুমি পূর্ণ হয়েছে কি?” উত্তরে জাহান্নাম বলবেঃ “যদি আরো কিছু পাপী বাকী থাকে তবে তাদেরকেও আমার মধ্যে নিক্ষেপ করুন!” সহীহ বুখারী শরীফে এই আয়াতের তাফসীরে এই হাদীস রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “পাপীদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে এবং সে আরো বেশী চাইতে থাকবে। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা স্বীয় পা তাতে রাখবেন, তখন সে বলবেঃ “যথেষ্ট হয়েছে, যথেষ্ট হয়েছে।” মুসনাদে আহমাদে এটাও রয়েছে যে, ঐ সময় জাহান্নাম সংকুচিত হয়ে যাবে এবং বলবেঃ আপনার ইযযতের কসম! এখন যথেষ্ট হয়েছে।” আর জান্নাতে জায়গা ফাঁকা থেকে যাবে, শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা একটা নতুন মাখলুক সৃষ্টি করে ঐ জায়গা আবাদ করবেন।
সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, একবার জানাত ও জাহানামের মধ্যে কথোপকথন হয়। জাহান্নাম বলেঃ “আমাকে প্রত্যেক অহংকারী ও উদ্ধত ব্যক্তির জন্যে তৈরী করা হয়েছে।” আর জান্নাত বলেঃ “আমার অবস্থা এই যে, যারা দুর্বল লোক, যাদেরকে দুনিয়ায় সম্মানিত মনে করা হতো না তারাই আমার মধ্যে প্রবেশ করবে।” আল্লাহ তাআলা জান্নাতকে বলেনঃ “তুমি আমার রহমত। আমি আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা এই রহমত দান করবে।” আর জাহান্নামকে তিনি বলবেনঃ “তুমি আমার শাস্তি। তোমার মাধ্যমে আমি যাকে ইচ্ছা শাস্তি প্রদান করবে। যা, তোমরা উভয়েই পূর্ণ হয়ে যাবে।” তখন জাহান্নাম তো পূর্ণ হবে না, শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা স্বীয় পদ ওতে রাখবেন। তখন সে বলবেঃ “যথেষ্ট হয়েছে, যথেষ্ট হয়েছে।” ঐ সময় ওটা ভরে যাবে এবং ওর সমস্ত জোড় পর পর সংকুচিত হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মাখলুকের কারো প্রতি কোন যুলুম করবেন না। জান্নাতে যে জায়গা বেঁচে যাবে ওটা পূর্ণ করার জন্যে মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য মাখলুক সৃষ্টি করবেন।
মুসনাদে আহমাদে জাহান্নামের উক্তি নিম্নরূপ রয়েছেঃ “ঔদ্ধত্য প্রকাশকারী ও অহংকারী বাদশাহ ও শরীফ লোকেরা আমার মধ্যে প্রবেশ করবে।” মুসনাদে আবূ ইয়ালায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা আমাকে তাঁর সত্তার পরিচিতি প্রদান করবেন। আমি তখন সিজদায় পড়ে যাবো। আল্লাহ তা'আলা তাতে খুবই সন্তুষ্ট হবেন। তারপর আমি তার এমন প্রশংসা করবে যে, তিনি অত্যন্ত খুশী হবেন। এরপর আমাকে শাফাআত করার অনুমতি দেয়া হবে। অতঃপর আমার উম্মত জাহান্নামের উপরের পুল অতিক্রম করতে শুরু করবে। কেউ কেউ তো চোখের পলকে পার হয়ে যাবে। কেউ কেউ তা অতিক্রম করবে দ্রুতগামী ঘোড়ার চেয়েও দ্রুত গতিতে। এমন কি এক ব্যক্তি হাঁটুর ভরে চলতে চলতে তা অতিক্রম করবে এবং এটা হবে আমল অনুযায়ী। আর জাহান্নাম আরো বেশী চাইতে থাকবে। শেষ পর্যন্ত তাল্লাহ তা'আলা তাতে তার পা রেখে দিবেন। তখন সে সংকুচিত হয়ে যাবে এবং বলবেঃ যথেষ্ট হয়েছে, যথেষ্ট হয়েছে। আমি হাউযের উপর থাকবো।” সহাবীগণ (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হাউয কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “আল্লাহর কসম! ওর পানি দুধের চেয়েও সাদা, মধুর চেয়েও মিষ্ট, বৰফের চেয়েও ঠাণ্ডা এবং মৃগনাভী অপেক্ষাও সুগন্ধময়। তথায় বরতন থাকবে ত`কাশের তারকার চেয়েও বেশী। যে ব্যক্তি ওর পানি পেয়ে যাবে সে কখনো তৃষ্ণার্ত হবে না। আর যে ব্যক্তি ওর থেকে বঞ্চিত থাকবে সে কোন জায়গাতেই পান পাবে যদদ্বারা সে পরিতৃপ্ত হতে পারে।”
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, জাহান্নাম বলবেঃ “আমার মধ্যে কোন জায়গা আছে কি যে, আমার মধ্যে আরো বেশী (সংখ্যক দানব ও মানবের অবস্থানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে?” হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, জাহান্নাম বলবেঃ “আমার মধ্যে একজনেরও আসার জায়গা আছে কি? আমি তো পরিপূর্ণ হয়ে গেছি।” হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, ওর মধ্যে জাহান্নামীদেরকে নিক্ষেপ করা হবে, শেষ পর্যন্ত সে বলবেঃ “আমি পূর্ণ হয়ে গেছি।” সে আরো বলবে? “আমার মধ্যে বেশীর জায়গা আছে কি?” ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) প্রথম উক্তিটিকেই গ্রহণ করেছেন। এই দ্বিতীয় উক্তিটির ভাবার্থ এই যে, যেন ঐ গুরুজনদের মতে এই প্রশ্ন এর পরে হবে যে, আল্লহ তা'আলা স্বীয় পদ ওর মধ্যে রেখে দিবেন। এরপর যখন তাকে প্রশ্ন করা হবে, “তুমি কি পরিপূর্ণ হয়েছে?” সে তখন জবাব দিবেঃ “আমার মধ্যে এমন কোন জায়গা বাকী আছে কি যে, কেউ সেখানে আসতে পারে?” অর্থাৎ একটুও জায়গা ফাকা নেই।
হযরত আউফী (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেনঃ এটা ঐ সময় হবে যখন তাতে একটা সুচ পরিমাণ জায়গাও ফাকা থাকবে না। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
মহান আল্লাহ বলেনঃ জান্নাতকে নিকটস্থ করা হবে অর্থাৎ কিয়ামতের দিন যা দূরে নয়। কেননা, যার আগমন নিশ্চিত সেটাকে দূরে মনে করা হয় না।
(আরবী)-এর অর্থ হলোঃ প্রত্যাবর্তনকারী, তাওবাকারী ও গুনাহর কাজ হতে দূরে অবস্থানকারী। হলো ঐ ব্যক্তি যে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে এবং তা ভঙ্গ করে। হযরত উসায়েদ ইবনে উমায়ের (রাঃ) বলেন যে, (আরবী)হলো ঐ ব্যক্তি যে কোন মজলিস হতে উঠে না যে পর্যন্ত না ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং যে পরম করুণাময় আল্লাহকে না দেখেই ভয় করে অর্থাৎ নির্জনেও আল্লাহর ভয় অন্তরে রাখে। হাদীসে আছে যে, ঐ ব্যক্তিও কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ছায়ায় স্থান পাবে যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তার চক্ষু হতে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।
মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যারা না দেখে দয়াময় আল্লাহকে ভয় করে এবং বিনীত চিত্তে উপস্থিত হয় তাদেরকে বলা হবেঃ শান্তির সাথে তোমরা ওতে অর্থাৎ জান্নাতে প্রবেশ কর। আল্লাহর সমস্ত শাস্তি হতে তোমরা নিরাপত্তা লাভ করলে। আর ভাবার্থ এও হবে যে, ফেরেশতারা তাদেরকে সালাম করবেন।
এটা অনন্ত জীবনের দিন অর্থাৎ তোমরা জান্নাতে যাচ্ছ চিরস্থায়ীভাবে বসবাসের জন্যে, যেখানে কখনো মৃত্যু হবে না, যেখান হতে কখনো বের করে দেয়ার কোন আশংকা থাকবে না এবং স্থানান্তরও করা হবে না।
মহান আল্লাহ বলেনঃ সেথায় তারা যা কামনা করবে তাই পাবে এবং আমার নিকট রয়েছে তারো অধিক।
হযরত কাসীর ইবনে মুররাহ (রঃ) বলেনঃ -এর মধ্যে এও রয়েছে যে, জান্নাতবাসীর পার্শ্বদিয়ে একখণ্ড মেঘ চলবে যার মধ্য থেকে শব্দ আসবেঃ ‘তোমরা কি চাও? তোমরা যা চাইবে তাই বর্ষিয়ে দিবো।' সুতরাং তারা যা কামনা করবে তাই বর্ষিত হবে। হযরত কাসীর (রঃ) বলেনঃ যদি আল্লাহ তা'আলা আমার নিকট ঐ মেঘ হাযির করে এবং আমি কি চাই তা জিজ্ঞেস করা হয় তবে আমি অবশ্যই বলবেঃ সুন্দর পোশাক পরিহিতা সুন্দরী কুমারী যুবতী মহিলা বর্ষণ করা হোক।
রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমাদের যে পাখীরই গোশত খাওয়ার ইচ্ছা হবে, তৎক্ষণাৎ ওটা ভাজা অবস্থায় তোমাদের সামনে হাযির হয়ে যাবে।”
মুসনাদে আহমাদের মারফু হাদীসে রয়েছেঃ “জান্নাতবাসী যদি সন্তান চায় তবে একই সময়ে গর্ভধারণ, সন্তান প্রসব ও সন্তানের যৌবনাবস্থা হয়ে যাবে।” (এ হাদীসটি হযরত আবু সাইদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন) জামে তিরমিযীতে রয়েছেঃ “সে যেভাবে চাইবে সেভাবেই হয়ে যাবে।
মহান আল্লাহ বলেনঃ আমার নিকট রয়েছে আরো অধিক। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা ভাল কাজ করেছে তাদের জন্যে উত্তম পুরস্কার রয়েছে এবং আরো অধিক রয়েছে।” (১০:২৬)
সুহায়েব ইবনে সিনান রূমী (রঃ) বলেন যে, এই আধিক্য হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার দর্শন। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) বলেন যে, জান্নাতবাসীরা প্রত্যেক শুক্রবারে আল্লাহর দর্শন লাভ করবে। (আরবী)-এর অর্থ এটাই।
হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট একটি সাদা দর্পণ নিয়ে আগমন করেন যার মধ্যস্থলে একটি বিন্দু ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “এটা কি?' উত্তরে হযরত জিবরাঈল (আঃ) বলেনঃ “এটা জুমআর দিন, যা খাস করে আপনাকে ও আপনার উম্মতকে দান করা হয়েছে, যাতে সবাই আপনাদের পিছনে রয়েছে, ইয়াহূদীরাও এবং খৃষ্টানরাও। এতে বহু কিছু কল্যাণ ও বরকত রয়েছে। এতে এমন এক সময় রয়েছে যে, ঐ সময় আল্লাহর নিকট যা চাওয়া হয় তা পাওয়া যায়। আমাদের ওখানে এর নাম হলো , (আরবী) বা আধিক্যের দিন।” নবী (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে জিবরাঈল (আঃ)! (আরবী)কি?” জিবরাঈল (আঃ) উত্তরে বললেনঃ “আপনার প্রতিপালক জান্নাতুল ফিরদাউসে একটি প্রশস্ত ময়দান বানিয়েছেন যাতে মৃগনাভির টিলা রয়েছে। জুমআর দিন আল্লাহ তা'আলা স্বীয় ইচ্ছানুযায়ী ফেরেশতাদেরকে অবতীর্ণ করেন। ওর চতুর্দিকে আলোর মিম্বরসমূহ থাকে যেগুলোতে নবীগণ (আঃ) উপবেশন করেন। শহীদ ও সিদ্দীকগণ তাঁদের পিছনে ঐ মৃগনাভীর টিলাগুলোর উপর থাকবেন। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলবেনঃ “আমি তোমাদের সাথে কৃত ওয়াদা সত্যে পরিণত করেছি। এখন তোমরা আমার নিকট যা ইচ্ছা চাও, পাবে।” তাঁরা সবাই বলবেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনার সন্তুষ্টি চাই।” তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “আমি তো তোমাদের উপর সন্তুষ্ট হয়েই গেছি। এ ছাড়াও তোমরা চাও, পাবে। আমার নিকট আরো অধিক রয়েছে। তারা তখন জুমআর দিনকে পছন্দ করবেন। কেননা, ঐ দিনেই তারা বহু কিছু নিয়ামত লাভ করেন। এটা ঐ দিন যেই দিন আপনার প্রতিপালক আরশের উপর সমাসীন হবেন। ঐ দিনেই হযরত আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করা হয়। ঐ দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে।” (এ হাদীসটি মুসনাদে ইমাম শাফেয়ীতে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম শাফেয়ী (রঃ) তাঁর কিতাবুল উম্মের কিতাবুল জুমআর মধ্যেও এ হাদীসটি আনয়ন করেছেন)
ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এই আয়াতের তাফসীরে একটি খুব বড় ‘আসার’ আনয়ন করেছেন যাতে বহু কথাই গারীব বা দুর্বল।
হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতী ব্যক্তি জান্নাতের মধ্যে সত্তর বছর পর্যন্ত এক দিকেই মুখ করে বসে থাকবে। অতঃপর একজন হুর আসবে যে তার স্কন্ধে হাত রেখে তার দৃষ্টি নিজের দিকে ফিরিয়ে দিবে। সে এমন সুন্দরী হবে যে, সে তার গণ্ডদেশে তার চেহারা এমনভাবে দেখতে পাবে যেমনভাবে আয়নায় দেখা যায়। সে যেসব অলংকার পরে থাকবে ওগুলোর এক একটি ক্ষুদ্র মুক্তা এমন হবে যে, ওর কিরণে সারা দুনিয়া উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। সে সালাম দিবে, তখন ঐ জান্নাতী উত্তর দিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করবেঃ “তুমি কে?” সে উত্তরে বলবেঃ “আমি হলাম সে-ই যাকে কুরআনে বলা হয়েছে। তার গায়ে সত্তরটি হুল্লা (পোশাক বিশেষ) থাকবে, এতদসত্ত্বেও তার সৌন্দর্য ও ঔজ্জ্বল্যের কারণে বাহির হতেই তার পদনালীর মজ্জা দৃষ্টিগোচর হবে। তার মাথায় মণি-মুক্তা বসানো মুকুট থাকবে যার সমান্যতম মুক্তা পূর্ব ও পশ্চিমকে আলোকিত করার পক্ষে যথেষ্ট হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ বর্ণনা করেছেন)
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।