আল কুরআন


সূরা আন-নিসা (আয়াত: 8)

সূরা আন-নিসা (আয়াত: 8)



হরকত ছাড়া:

وإذا حضر القسمة أولو القربى واليتامى والمساكين فارزقوهم منه وقولوا لهم قولا معروفا ﴿٨﴾




হরকত সহ:

وَ اِذَا حَضَرَ الْقِسْمَۃَ اُولُوا الْقُرْبٰی وَ الْیَتٰمٰی وَ الْمَسٰکِیْنُ فَارْزُقُوْهُمْ مِّنْهُ وَ قُوْلُوْا لَهُمْ قَوْلًا مَّعْرُوْفًا ﴿۸﴾




উচ্চারণ: ওয়া ইযা-হাদরাল কিছমাতা ঊলুল কুরবা- ওয়াল ইয়াতা-মা- ওয়াল মাছা-কীনু ফারযুকূহুম মিনহু ওয়াকূলূহুম কাওলাম মা‘রূফা-।




আল বায়ান: আর যদি বণ্টনে নিকটাত্মীয় এবং ইয়াতীম ও মিসকীনরা উপস্থিত হয়, তাহলে তোমরা তাদেরকে তা থেকে আহার দেবে এবং তাদের সাথে তোমরা উত্তম কথা বলবে।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৮. আর সম্পত্তি বন্টনকালে আত্মীয়, ইয়াতীম এবং অভাবগ্রস্ত লোক উপস্থিত থাকলে তাদেরকে তা থেকে কিছু দিবে এবং তাদের সাথে সদালাপ করবে(১)।




তাইসীরুল ক্বুরআন: (সম্পত্তি) বণ্টনকালে স্বজন, ইয়াতীম এবং মিসকীন উপস্থিত থাকলে তাদেরকেও তাত্থেকে কিছু দিয়ে দেবে, তাদের সঙ্গে দয়ার্দ্র ন্যায়ানুগ কথা বলবে।




আহসানুল বায়ান: (৮) আর সম্পত্তি বণ্টনকালে আত্মীয়-স্বজন, পিতৃহীন এবং অভাবগ্রস্ত লোক উপস্থিত থাকলে, তাদেরকে তা হতে কিছু দান কর এবং তাদের সাথে সদালাপ কর। [1]



মুজিবুর রহমান: বন্টনের সময়ে যখন স্বজনগণ, ইয়াতীমগণ এবং দরিদ্রগণ উপস্থিত হয় তখন তা হতে তাদেরকেও জীবিকা দান কর এবং তাদের সাথে সদ্ভাবে কথা বল।



ফযলুর রহমান: (সম্পত্তি) বন্টনকালে আত্মীয়-স্বজন ও এতিম-মিসকীনরা উপস্থিত থাকলে তা থেকে তাদেরকে কিছু দিও এবং তাদের সাথে ভালভাবে কথাবার্তা বলো।



মুহিউদ্দিন খান: সম্পতি বন্টনের সময় যখন আত্নীয়-স্বজন, এতীম ও মিসকীন উপস্থিত হয়, তখন তা থেকে তাদের কিছু খাইয়ে দাও এবং তাদের সাথে কিছু সদালাপ করো।



জহুরুল হক: আর ভাগাভাগির সময়ে যখন উপস্থিত থাকে আ‌ত্মীয়-স্বজন ও এতীমরা ও গরীবরা, তখন তা থেকে তাদের দান করো, আর তাদের সঙ্গে ভালোভাবে কথাবার্তা বলো।



Sahih International: And when [other] relatives and orphans and the needy are present at the [time of] division, then provide for them [something] out of the estate and speak to them words of appropriate kindness.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৮. আর সম্পত্তি বন্টনকালে আত্মীয়, ইয়াতীম এবং অভাবগ্রস্ত লোক উপস্থিত থাকলে তাদেরকে তা থেকে কিছু দিবে এবং তাদের সাথে সদালাপ করবে(১)।


তাফসীর:

(১) ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, এ আয়াত মুহকাম, এ আয়াত রহিত হয় নি। অর্থাৎ এর উপর আমল করতে হবে। [বুখারী ৪৫৭৬] অন্য বর্ণনায় ইবন আব্বাস বলেন, আল্লাহ্‌ তা’আলা মুমিনগণকে তাদের মীরাস বন্টনের সময় আত্মীয়তার সম্পর্কে প্রতিষ্ঠা, ইয়াতীমদের তত্ত্বাবধান এবং মিসকীনদের জন্য যদি মৃত ব্যক্তির কোন অসীয়ত থেকে থাকে, তবে সে অসীয়ত থেকে প্রদান করতে হবে। আর যদি অসীয়ত না থাকে, তবে তাদেরকে মীরাস থেকে কিছু পৌছাতে হবে। [তাবারী]

অন্য বর্ণনায় এসেছে, আবদুর রহমান ইবন আবী বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর মীরাস বন্টনের সময় আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা তখনও জীবিত- আব্দুর রহমানের সন্তান আবদুল্লাহ ঘরে ইয়াতীম, মিসকীন, আত্মীয়স্বজন সবাইকে তার পিতার মীরাস থেকে কিছু কিছু প্রদান করেন, এ হিসেবে যে, এখানে (الْقِسْمَةَ) শব্দের অর্থ, বন্টন। তারপর সেটা ইবন আব্বাসকে জিজ্ঞেস করলে, তিনি বললেন, ঠিক করে নি। কারণ এটা অসীয়ত করার প্রতি নির্দেশ। এ আয়াতটিতে অসীয়তের কথাই বলা হয়েছে। যখন মাইয়্যেত তার সম্পদের ব্যাপারে অসীয়ত করতে চাইবে সে যেন নিঃস্ব, ইয়াতীম স্বজনদের না ভুলে সে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। [আত-তাফসীরুস সহীহ] সে হিসেবে এটি মৃত্যুর আগেই সম্পদের মালিকের করণীয় নির্দেশ করছে।


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৮) আর সম্পত্তি বণ্টনকালে আত্মীয়-স্বজন, পিতৃহীন এবং অভাবগ্রস্ত লোক উপস্থিত থাকলে, তাদেরকে তা হতে কিছু দান কর এবং তাদের সাথে সদালাপ কর। [1]


তাফসীর:

[1] এ নির্দেশকে উলামাদের কেউ কেউ মীরাসের আয়াত দ্বারা রহিত বলে গণ্য করেছেন। কিন্তু সঠিক হল তা রহিত নয়। বরং এতে রয়েছে অতি গুরুত্বপূর্ণ এক নৈতিক কর্তব্যের উপর তাকীদ। আর তা হল, সাহায্যের অধিকারী আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে যারা মীরাসের অংশীদার নয়, তাদেরকেও বণ্টনের সময় কিছু দিয়ে দিও। আর তাদের সাথে কথা বল স্নেহ ও ভালবাসাজড়িত কণ্ঠে। ধন-সম্পদ আসতে দেখে ক্বারুন ও ফিরাউন হয়ে যেও না।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৭ হতে ১০ নং আয়াতের তাফসীর:



ইসলাম-পূর্বযুগে আরব ও অনারব জাতিসমূহের মধ্যে প্রভাবশালী ও ক্ষমতাসীনদের অন্যতম একটি জুলুম ছিল যে, তারা দুর্বল শ্রেণি, মহিলা, ইয়াতীম ও ছোট বাচ্চাদেরকে ওয়ারিশ দিত না। প্রথমত: তাদের কোন উত্তরাধিকার স্বীকারই করত না, দ্বিতীয়তঃ অধিকার স্বীকার করা হলেও পুরুষদের থেকে তা আদায় করে নিতে পারত না। আরবদের নিয়মই ছিল- যারা অশ্বারোহণ করে এবং যুদ্ধে শত্র“র মোকাবেলা করতে সক্ষম, কেবল তারাই সমস্ত মালের অধিকারী হবে।



ইসলাম সর্বপ্রথম নারী-পুরুষ, ইয়াতীম, ছোট-বড় ও দুর্বল নির্বিশেষে সকলের ন্যায্য অধিকার প্রদান করে। এ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলে দিলেন, পুুরুষের মত মহিলা ও ছোট ছেলে-মেয়েরাও তাদের পিতা-মাতার এবং আত্মীয়দের সম্পদের উত্তরাধিকারী হবে। সে সম্পদ কম হোক আর বেশি হোক। কম সম্পদ তুচ্ছ মনে করে মহিলা বা ছোটদেরকেও উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না, আর বেশি সম্পদের লোভ সামলাতে না পেরে তাদেরকে বঞ্চিত করা যাবে না। সুতরাং নারী-পুরুষ সকলেই উত্তরাধিকার থেকে বণ্টননীতি অনুযায়ী সম্পদ পাবে।



রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগে এমন একটি ঘটনা ঘটেছে, তা হল- আউস বিন সাবেত (রাঃ) স্ত্রী, দু’কন্যা ও একটি নাবালেগ পুত্র রেখে মারা যান। পূর্বের নীতি অনুযায়ী তার দুই চাচাত ভাই এসে তার সম্পত্তি দখল করে নেয় এবং সন্তান ও স্ত্রীকে বঞ্চিত করে। আউসের স্ত্রী নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে অভিযোগ জানালেন যে, তার চাচাত ভায়েরা সমস্ত সম্পদ দখল করে নিয়েছে। আমাকে ও আমার সন্তানকে বঞ্চিত করেছে, অথচ সম্পদ ছাড়া তাদেরকে বিবাহ দেয়া যাবে না। তখন পর্যন্ত উত্তরাধিকার সম্পর্কে কোন আয়াত অবতীর্ণ হয়নি। ফলে তিনি উত্তর দিতে বিলম্ব করলেন এবং পরে আয়াত নাযিল হলে জানিয়ে দিলেন যে, সমস্ত সম্পদের এক অষ্টমাংশ স্ত্রী পাবে, অবশিষ্ট সম্পদ কন্যার দ্বিগুণ ছেলেকে দেবে। আর চাচাত ভাই সন্তানদের তুলনায় নিকটবর্তী ছিল না তাই তারা বঞ্চিত হল।



(وَإِذَا حَضَرَ الْقِسْمَةَ)



‘আর যখন তা বণ্টনের সময়ে’ কেউ কেউ এ আয়াতকে মীরাসের আয়াত দ্বারা রহিত বলে গণ্য করেছেন। সঠিক কথা হল, তা রহিত হয়নি। বরং এতে রয়েছে অতি গুরুত্বপূর্ণ এক নৈতিক কর্তব্যের ওপর তাকীদ। তা হল, সাহায্যের অধিকারী আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে যারা মীরাসের অংশীদার নয়, তাদেরকে বণ্টনের সময় কিছু দিয়ে দাও। আর তাদের সাথে কথা বল স্নেহ ও ভালবাসা জড়িত কণ্ঠে, ধন-সম্পদ আসতে দেখে কারূণ ও ফিরআউন হয়ে যেও না।



ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: লোকেদের ধারণা উক্ত আয়াতটি মানসূখ হয়ে গেছে; কিন্তু আল্লাহ তা‘আলার কসম! আয়াতটি মানসূখ হয়নি; বরং লোকেরা এর ওপর আমল করতে অনীহা প্রকাশ করছে। আত্মীয় দু’ ধরণের: (এক) এমন আত্মীয় যারা ওয়ারিশ হয় এবং তারা উপস্থিতদের কিছু দেবে। (দুই) এমন আত্মীয় যারা ওয়ারিশ নয়, তারা উপস্থিতদের সঙ্গে সদালাপ করবে এবং বলবে তোমাদের কিছু দেয়ার ব্যাপারে আমাদের কোন অধিকার নেই। (সহীহ বুখারী হা: ২৭৫৯, সহীহ মুসলিম হা: ৫৮)



(وَلْيَخْشَ الَّذِيْنَ لَوْ تَرَكُوْا)



‘আর যারা নিজেদের পশ্চাতে নিজেদের অসমর্থ সন্তানদেরকে ছেড়ে যাবে...’ এখানে কাকে সম্বোধন করা হয়েছে এ নিয়ে কয়েকটি মতামত পাওয়া যায়।



১. কেউ বলেন: যাদেরকে অসীয়ত করা হয় তাদেরকে বুঝানো হয়েছে। যে ব্যক্তি মুমূর্ষু অবস্থায় অসীয়ত করে তাকে নির্দেশ দেবে যাতে ন্যায়সঙ্গতভাবে অসিয়ত করে। কোন অবস্থাতেই যেন এক তৃতীয়াংশের বেশি অসীয়ত না করে।



২. কেউ বলেন: এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল ইয়াতীম, ছোট বাচ্চা, দুর্বল শ্রেণিদের অভিভাবক ইত্যাদি। তারা এ সকল ইয়াতীম দুর্বলদের জন্য সদা কল্যাণকর কাজে সচেষ্ট হবে।



যেন তারা তাদের সম্পদ ব্যয় করে দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতের কল্যাণের জন্য কাজ করে। যেমন নিজেদের সন্তানের সর্বদা কল্যাণ কামনা করে। (তাফসীর সা‘দী: পৃঃ ১৪৬)



(إِنَّمَا يَأْكُلُوْنَ فِيْ بُطُوْنِهِمْ نَارًا)



‘তারা তো নিজেদের পেটে কেবল আগুনই ভক্ষণ করে’ অর্থাৎ যখন বিনা কারণে ইয়াতীমদের সম্পদ খাবে তখন যেন জাহান্নামের আগুনই খেলো, কিয়ামাতের দিন তা তাদের পেটে উত্তপ্ত করা হবে।



আবূ হুরাইরাহ (রাঃ)‎ হতে বর্ণিত তিনি বলেন, নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্বক অপরাধ থেকে বেঁচে থাক। ১. আল্লাহ তা‘আলার সাথে শরীক করা, ২. জাদু করা, ৩. অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা করা, ৪. সুদ খাওয়া, ৫. ইয়াতীমের মাল খাওয়া, ৬. যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে আসা, ৭. সতী-সাধ্বী মুসলিম নারীকে ব্যভিচারের অপবাদ দেয়া। (সহীহ বুখারী হা: ২৫৬৩)



সুতরাং উত্তরাধিকারের নির্ধারিত অংশ আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে মীমাংসিত, তা উপেক্ষা করে চলার কোন সুযোগ নেই। বরং আল্লাহ তা‘আলার এ বিধানের মধ্যে সকলের কল্যাণ নিহিত।



আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. ইসলাম সর্বপ্রথম সুষ্ঠু উত্তরাধিকার ব্যবস্থা চালু করেছে।

২. উত্তরাধিকার বণ্টনের সময় যে সকল আত্মীয় অংশ পায় না, তাদের কিছু দেয়া মুস্তাহাব।

৩. মুমূর্ষু ব্যক্তিকে সৎ দিক-নির্দেশনা দেয়া উচিত।

৪. অন্যায়ভাবে ইয়াতিমের সম্পদ খেলে কী শাস্তি হবে তা জানতে পারলাম।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৭-১০ নং আয়াতের তাফসীর:

আরবের মুশরিকরদের প্রথা ছিল এই যে, কেউ মারা গেলে তার বড় সন্তানেরা তার সমস্ত মাল পেয়ে যেতো। তার ছোট সন্তানেরা ও স্ত্রীরা সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত হয়ে যেতো। ইসলাম এ নির্দেশ জারী করে সবারই জন্যে সমান অধিকার প্রতিষ্ঠিত করে। বলা হয় যে, উত্তরাধিকারী সবাই হবে, প্রকৃত আত্মীয়তাই হোক বা বিবাহ বন্ধনের কারণেই হোক বা আযাদী সম্পর্কীয় কারণেই হোক না কেন, অংশ সবাই পাবে- অংশ কমই হোক আর বেশীই হোক।

হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত উম্মে কাজ্জাহ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হয়ে আরয করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার দুটি ছেলে আছে। তাদের পিতা মারা গেছে এবং তাদের নিকট কিছুই নেই। এ হাদীসটি অন্য শব্দে উত্তরাধিকারের অন্য দু’টি আয়াতের তাফসীরেও ইনশাআল্লাহ অতিসত্বরই আসবে। দ্বিতীয় আয়াতের ভাবার্থ হচ্ছে- যখন কোন মৃত ব্যক্তির মীরাস বন্টন হতে থাকবে, সে সময় যদি তার কোন দূর সম্পর্কীয় আত্মীয়ও এসে পড়ে যার কোন অংশ নেই এবং ইয়াতিম ও মিসকীনেরাও এসে যায় তবে তাদেরকেও কিছু কিছু প্রদান কর।'

ইসলামের প্রাথমিক যুগে তো এটা ওয়াজিব ছিল এবং কারও কারও মতে এটা মুসতাহাব ছিল, আর এখনও এ হুকুম বাকী আছে কি না সে বিষয়ে দুটি উক্তি রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর মতে এ হুকুম এখনও বাকী আছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত আৰূ মূসা (রাঃ), হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর (রাঃ), হযরত আবুল আলিয়া (রঃ), হযরত শাবী (রঃ) , হযরত হাসান বসরী (রঃ), হযরত ইবনে সীরীন (রঃ), হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (রঃ), হযরত মাকল (রঃ), হযরত ইবরাহীম নাখঈ (রঃ), হযরত আতা’ ইবনে আবি রিবাহ্ (রঃ), হযরত যুহরী (রঃ) এবং হযরত ইয়াহইয়া ইবনে মুআম্মারও (রঃ) একথাই বলেছেন। এমনকি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ছাড়া এসব পণ্ডিত এ হুকুমকে ওয়াজিব বলেছেন।

হযরত আবু উবাইদাহ (রাঃ) এক অসিয়তের অভিভাবকত্ব করেন। তিনি একটি ছাগী যবেহ করেন এবং ঐ তিন প্রকারের লোককে ডেকে ভোজন করিয়ে দেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ ‘এ আয়াতটি না থাকলে এটাও আমার মালই ছিল।' হযরত উরওয়া (রাঃ) হযরত মুসআব (রাঃ)-এর মাল বন্টনের সময়েও এটা প্রদান করেন। হযরত যুহরীরও রঃ) উক্তি এই যে, এ আয়াতটি মুহকাম'- মানসুখ নয়। একটি বর্ণনায় হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এটা অসিয়তের উপর নির্ভরশীল। সুতরাং আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর (রাঃ)-এর ইন্তিকালের পর যখন তার ছেলে হযরত আবদুল্লাহ তাঁর পিতার মীরাস বন্টন করেন তখন তিনি পরিবারের সকল মিসকীন ও আত্মীয়-স্বজনকে প্রদান করেন এবং এ আয়াতটিই পাঠ করেন। আর সে সময় উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) বিদ্যমান ছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এটা জানতে পেরে বলেনঃ “তিনি ঠিক করেননি। এ আয়াতের ভাবার্থ হচ্ছে এই যে, এটা তখনই কার্যকরী হবে যখন মৃত ব্যক্তি অসিয়ত করে যাবে। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম)

কোন কোন মনীষীর উক্তি এই যে, এ আয়াতটি রহিতই হয়ে গেছে। যেমন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি রহিত এবং একে রহিতকারী হচ্ছে (আরবী)-এ আয়াতটি। অংশ নির্ধারিত হওয়ার পূর্বে এ নির্দেশ ছিল। অতঃপর হকদারকে যখন আল্লাহ পাক হক পৌছিয়ে দেন তখন সাদকা শুধু ওটাই থাকে যা মৃত ব্যক্তি বলে যায়। হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়াবও (রঃ) এটাই বলেন যে, যদি ঐ লোকদের জন্যে অসিয়ত থাকে তবে সেটা অন্য কথা নচেৎ এ আয়াতটি মানসুখই বটে।

জমহুর ও ইমাম চতুষ্টয়ের এটাই মাযহাব। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এখানে এক বিস্ময়কর উক্তি করেছেন। তাঁর দীর্ঘ ও কয়েকবারের লিখার সার কথা হচ্ছে নিম্নরূপঃ ‘অসিয়তের মাল বন্টনের সময় মৃত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজন এসে গেলে তাদেরকেও দাও এবং তথায় আগত মিসকীনদের সঙ্গে তার সাথে কথা বল ও উত্তর প্রদান কর'। কিন্তু এটা বিবেচ্য বিষয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ মনীষী বলেন যে, এখানে বন্টনের অর্থ হচ্ছে মীরাসের বন্টন। সুতরাং এ উক্তিটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর উক্তির বিপরীত। এ আয়াতের সঠিক ভাবার্থ হচ্ছেঃ মৃত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পদ বন্টনের সময় যদি এসব দরিদ্র লোক উপস্থিত হয়ে যায় এবং তোমরা নিজ নিজ অংশ পৃথক করে ফেল আর এ বেচারারা তোমাদের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে তখন তাদেরকে শূন্য হস্তে ফিরিয়ে দিও না। তাদেরকে তথা হতে নিরাশ করে শূন্য হস্তে ফিরিয়ে দেয়াকে পরম দয়ালু ও দাতা আল্লাহ পছন্দ করেন না। সুতরাং আল্লাহর পথে সাদকা হিসেবে তাদেরকে কিছু প্রদান কর যেন তারা খুশী হয়ে যায়।

যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ পাকের ঘোষণা রয়েছেঃ “তোমরা তার ফল হতে খাও যখন তিনি ফল দান করেন এবং শস্য কর্তনের দিন তার হক আদায় কর। ক্ষুধার্ত ব্যক্তি ও দরিদ্র লোকদের ভয়ে যারা তাদেরকে না জানিয়ে গোপনে ক্ষেত্রের ফসল কেটে নেয় এবং গাছের ফল নামিয়ে থাকে তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা নিন্দে করেছেন। যেমন সূরা-ই-নূন-এ রয়েছে যে, এক বাগানের মালিকের মৃত্যুর পর তার ছেলেরা দরিদ্র ও মিসকীনদেরকে বঞ্চিত করার। নিয়তে একদা রাত্রিকালে অতি সন্তর্পণে বাগানের ফল নামিয়ে আনার উদ্দেশ্যে বাড়ী হতে রওনা হয়। তাদের পৌছার পূর্বেই তথায় আল্লাহ তা'আলার শাস্তি নেমে আসে এবং সমস্ত বাগান পুড়ে ভষ্ম হয়ে যায়। অন্যের হক নষ্টকারীদের পরিণতি এরূপই হয়ে থাকে। হাদীস শরীফে রয়েছে যে, যে মালে সাদকা মিলিত হয় অর্থাৎ, যে ব্যক্তি স্বীয় মালের যাকাত প্রদান করে না, তার মাল সে কারণে ধ্বংস হয়ে যায়।

অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“যারা নিজেদের পশ্চাতে নিজেদের অসমর্থ সন্তানদেরকে ছেড়ে যাবে তাদের উপর যে ভীতি আসবে তজ্জন্য তাদের শংকিত হওয়া উচিত।' অর্থাৎ যে ব্যক্তি স্বীয় মৃত্যুর সময় অসিয়ত করে যাচ্ছে এবং সেই অসিয়তে তার উত্তরাধিকারীদের ক্ষতি হচ্ছে এমতাবস্থায় যে তা শ্রবণ করছে তার আল্লাহকে ভয় করতঃ ঐ অসিয়তকারীকে সঠিক পথ-প্রদর্শন করা উচিত এবং তার কর্তব্য এই যে, সে যেন ঐ অসিয়তকারীর মঙ্গল কামনা করে যেমন সে নিজের উত্তরাধিকারীদের মঙ্গল কামনা করে থাকে, যখন তাদের ক্ষতির ও ধ্বংসের আশংকা থাকে।

সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত সা'দ ইবনে আবি ওক্কাস (রাঃ)-এর রোগাক্রান্ত অবস্থায় তাকে দেখতে যান। সে সময় হযরত সা'দ (রাঃ) তাঁকে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার বহু মাল রয়েছে এবং আমার একটি মাত্র কন্যা আছে। আমি আমার দুই তৃতীয়াংশ মাল আল্লাহর পথে দান করে দেই। আপনি আমাকে এর অনুমতি দিচ্ছেন কি? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ না।' তিনি বলেন :“আচ্ছা, অর্ধেকের অনুমতি আছে কি?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ না।' তিনি বলেনঃ “তাহলে এক তৃতীয়াংশের অনুমতি দিন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আচ্ছা, ঠিক আছে, কিন্তু এক তৃতীয়াংশও বেশী। তুমি যদি তোমার পিছনে তোমার উত্তরাধিকারীদেরকে সম্পদশালী রূপে ছেড়ে যাও তবে এটা ওটা হতে উত্তম যে, তুমি তাদেরকে দরিদ্ররূপে ছেড়ে যাবে এবং তারা অন্যের কাছে হাত পেতে বেড়াবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, মানুষ যদি এক তৃতীয়াংশেরও কম অর্থাৎ এক চতুর্থাংশের অসিয়ত করে তবে ওটাই উত্তম। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক তৃতীয়াংশকেও বেশী বলেছেন।

ধর্মশাস্ত্রবিদগণ বলেন যে, মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারী যদি ধনী হয় তবে তো এক তৃতীয়াংশের অসিয়ত করা মুসতাহাব। আর যদি উত্তরাধিকারী দরিদ্র হয় তবে তার চেয়ে কমের অসিয়ত করাই মুসতাহাব। এ আয়াতের দ্বিতীয় ভাবার্থ নিম্নরূপও বর্ণনা করা হয়েছেঃ “তোমরা ইয়াতিমদের প্রতি এরূপই খেয়াল রাখ যেমন তুমি তোমার মৃত্যুর পর তোমার ছোট সন্তানদের প্রতি অন্য লোকদের খেয়াল রাখার কামনা কর। তুমি যেমন চাও না যে, তাদের মাল অন্যেরা অন্যায়ভাবে খেয়ে নিক এবং তারা বয়ঃপ্রাপ্ত হয়ে দরিদ্র থেকে যাক, তদ্রুপ তুমিও অন্যদের সন্তানগণের মাল খেয়ো না।' এ ভাবার্থও খুব উত্তম বটে। এ কারণেই এর পরেই পিতৃহীনদের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণকারীদের শাস্তির কথা বলা হয় যে, এ লোকগুলো নিজেদের পেটে অগ্নি ভক্ষণ করছে এবং তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে ।

সহীহ বুখারী ও মুসলিমে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘সাতটি এমন পাপ হতে তোমরা বেঁচে থাকো যা ধ্বংসের কারণ হয়ে থাকে। তিনি জিজ্ঞাসিত হনঃ পাপগুলো কি কি? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ (১) আল্লাহর সাথে অংশী স্থাপন, (২) যাদু, (৩) অন্যায়ভাবে হত্যা, (৪) সুদ ভক্ষণ, (৫) পিতৃহীনদের মাল ভক্ষণ, (৬) জিহাদ হতে মুখ ফিরানো এবং (৭) সতী সাধ্বী সরলা মুসলিম নারীর প্রতি অপবাদ দেয়া।

সুনান-ই-ইবনে আবি হাতিমের মধ্যে রয়েছে যে, সাহাবীগণ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে মিরাজের রাত্রের ঘটনা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “আমি বহু লোককে দেখেছি যে, তাদের ওষ্ঠ নীচে ঝুলতে রয়েছে এবং ফেরেশতাগণ তাদেরকে হেঁচড়িয়ে টেনে তাদের মুখ খুলে দিচ্ছেন। অতঃপর জাহান্নামের গরমপাথর তাদের মুখের ভেতরে ঢুকিয়ে দিচ্ছেন যা তাদের মুখের ভেতর দিয়ে ডুকে পিছনের রাস্তা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে এবং তারা ভীষণভাবে চীৎকার করছে। আমি হযরত জিবরাঈল (আঃ)-কে জিজ্ঞেস করিঃ এরা কারা?' তিনি বলেনঃ ‘এরা ইয়াতিমদের মাল ভক্ষণকারী যারা তাদের পেটের ভেতর আগুন ভরতে রয়েছে। অতিসত্বরই তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে।

হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেনঃ “পিতৃহীনদের মাল ভক্ষণকারী ব্যক্তি কিয়ামতের দিন তার কবর হতে এমনভাবে উঠবে যে, তার মুখ দিয়ে, চক্ষু দিয়ে, নাক দিয়ে এবং কান দিয়ে অগ্নিশিখা বের হতে থাকবে! প্রত্যেক ব্যক্তি দেখেই চিনে নেবে যে, সে কোন পিতৃহীনের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করেছে। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর একটি মারফু হাদীসেও এ বিষয়েরই কাছাকাছি বর্ণিত আছে। অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি তোমাদেরকে অসিয়ত করছি যে, তোমরা ঐ দু' দুর্বলের মাল পৌছিয়ে দাও, স্ত্রীদের মাল এবং পিতৃহীনদের মাল। তোমরা তাদের মাল হতে বেঁচে থাকো।”

সূরা-ই-বাকারায় এটা বর্ণিত হয়েছে যে, যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন যাঁদের কাছে পিতৃহীনেরা লালিত পালিত হচ্ছিল তারা তাদের আহার্য এবং পানীয় পর্যন্ত পৃথক করে দেন। তখন অবস্থা প্রায় এই দাঁড়ালো যে, যদি ঐ পিতৃহীনদের খানা পানির কোন কিছু বেঁচে যেতো তখন হয় তারা নিজেরাই ঐ বাসী জিনিস খেয়ে নিতে না হয় তা পচে নষ্ট হয়ে যেতো। বাড়ীর লোকেরা কেউ তাতে হাতও লাগাতো না। এটা উভয় দিক দিয়েই অপছন্দনীয় হলো। নবী (সঃ)-এর সামনেও এটা আলোচিত হলো। তখনঃ (আরবী) (২:২২০)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হলো। এর ভাবার্থ এই যে, যে কাজে তোমরা পিতৃহীনদের মঙ্গল বুঝতে পারো তাই কর। ফলে এর পরে খানা-পিনা এক সাথেই হতে থাকে।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।