সূরা আন-নিসা (আয়াত: 135)
হরকত ছাড়া:
يا أيها الذين آمنوا كونوا قوامين بالقسط شهداء لله ولو على أنفسكم أو الوالدين والأقربين إن يكن غنيا أو فقيرا فالله أولى بهما فلا تتبعوا الهوى أن تعدلوا وإن تلووا أو تعرضوا فإن الله كان بما تعملون خبيرا ﴿١٣٥﴾
হরকত সহ:
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا کُوْنُوْا قَوّٰمِیْنَ بِالْقِسْطِ شُهَدَآءَ لِلّٰهِ وَ لَوْ عَلٰۤی اَنْفُسِکُمْ اَوِ الْوَالِدَیْنِ وَ الْاَقْرَبِیْنَ ۚ اِنْ یَّکُنْ غَنِیًّا اَوْ فَقِیْرًا فَاللّٰهُ اَوْلٰی بِهِمَا ۟ فَلَا تَتَّبِعُوا الْهَوٰۤی اَنْ تَعْدِلُوْا ۚ وَ اِنْ تَلْوٗۤا اَوْ تُعْرِضُوْا فَاِنَّ اللّٰهَ کَانَ بِمَا تَعْمَلُوْنَ خَبِیْرًا ﴿۱۳۵﴾
উচ্চারণ: ইয়াআইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানূকূনূকাওওয়া-মীনা বিলকিছতিশুহাদাআ লিল্লা-হি ওয়া লাও ‘আলাআনফুছিকুম আবিল ওয়া-লিদাইনি ওয়ালআকরাবীনা ইয়ঁইয়াকুন গানিইইয়ান আও ফাকীরান ফাল্লা-হু আওলা-বিহিমা- ফালা-তাত্তাবি‘উল হাওয়া আন তা‘দিলূ ওয়া ইন তালউআও তু‘রিদূ ফাইনাল্লা-হা কা-না বিমা-তা‘মালূনা খাবীরা-।
আল বায়ান: হে মুমিনগণ, তোমরা ন্যায়ের উপর সুপ্রতিষ্ঠিত থাকবে আল্লাহর জন্য সাক্ষীরূপে। যদিও তা তোমাদের নিজদের কিংবা পিতা-মাতার অথবা নিকটাত্মীয়দের বিরুদ্ধে হয়। যদি সে বিত্তশালী হয় কিংবা দরিদ্র, তবে আল্লাহ উভয়ের ঘনিষ্ঠতর। সুতরাং ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে তোমরা প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না। আর যদি তোমরা ঘুরিয়ে- পেঁচিয়ে কথা বল কিংবা এড়িয়ে যাও তবে আল্লাহ তোমরা যা কর সে বিষয়ে সম্যক অবগত।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৩৫. হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায়বিচারে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাকবে আল্লাহর সাক্ষীস্বরূপ; যদিও তা তোমাদের নিজেদের বা পিতা-মাতা এবং আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে হয়; সে বিত্তবান হোক বা বিত্তহীন হোক আল্লাহ্ উভয়েরই ঘনিষ্টতর। কাজেই তোমরা ন্যায়বিচার করতে প্রবৃত্তির অনুগামী হয়ে না। যদি তোমরা পেঁচালো কথা বল বা পাশ কাটিয়ে যাও তবে তোমরা যা কর আল্লাহ তো তার সম্যক খবর রাখেন।
তাইসীরুল ক্বুরআন: হে ঈমানদারগণ! ন্যায়ের প্রতি সুপ্রতিষ্ঠ ও আল্লাহর জন্য সাক্ষ্যদাতা হও যদিও তা তোমাদের নিজেদের কিংবা মাতা-পিতা এবং আত্মীয়গণের বিরুদ্ধে হয়, কেউ ধনী হোক বা দরিদ্র হোক, আল্লাহ উভয়েরই ঘনিষ্ঠতর। অতএব প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না যাতে তোমরা ন্যায়বিচার করতে পার এবং যদি তোমরা বক্রভাবে কথা বল কিংবা সত্যকে এড়িয়ে যাও তবে নিশ্চয় তোমরা যা করছ, আল্লাহ সে বিষয়ে সম্পূর্ণ অবগত।
আহসানুল বায়ান: (১৩৫) হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা ন্যায় বিচারে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাক, তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে সাক্ষ্য দাও; যদিও তা তোমাদের নিজেদের অথবা পিতা-মাতা এবং আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে হয়। [1] সে বিত্তবান হোক অথবা বিত্তহীনই হোক, আল্লাহ উভয়েরই যোগ্যতর অভিভাবক।[2] সুতরাং তোমরা ন্যায়-বিচার করতে খেয়াল-খুশীর অনুগামী হয়ো না। [3] যদি তোমরা পেঁচালো কথা বল অথবা পাশ কেটে চল, [4] তাহলে (জেনে রাখ) যে, তোমরা যা কর, আল্লাহ তার খবর রাখেন।
মুজিবুর রহমান: হে মু’মিনগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশে সাক্ষ্য দানকারী, সুবিচার প্রতিষ্ঠাতা হও এবং যদিও এটা তোমাদের নিজের অথবা মাতা-পিতা ও আত্মীয়-স্বজনের প্রতিকূল হয়, যদিও সে সম্পদশালী কিংবা দরিদ্র হয় তাহলে আল্লাহই তাদের জন্য যথেষ্ট; অতএব সুবিচারে স্বীয় প্রবৃত্তির অনুসরণ করনা, আর তোমরা যদি ঘুরিয়ে পেচিয়ে কথা বল কিংবা পাশ কাটিয়ে যাও তাহলে নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সমস্ত কর্মের পূর্ণ সংবাদ রাখেন।
ফযলুর রহমান: হে ঈমানদারগণ! তোমাদের নিজেদের কিংবা পিতামাতা ও আত্মীয়-স্বজনের বিপক্ষে গেলেও তোমরা আল্লাহর (পক্ষে) সাক্ষী হিসেবে ন্যায়ের ওপর অটল থাকবে। (সাক্ষ্য যার বিরুদ্ধে যাবে) সে ধনী হোক বা গরীব হোক আল্লাহই উভয়ের ভাল রক্ষক। অতএব, তোমরা প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না, পাছে (ন্যায় থেকে) বিচ্যুত হও। আর যদি তোমরা (সাক্ষ্য) ঘুরিয়ে দাও কিংবা এড়িয়ে যাও তাহলে (জেনে রাখবে) তোমরা যা কিছু করো আল্লাহ তা অবগত আছেন।
মুহিউদ্দিন খান: হে ঈমানদারগণ, তোমরা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক; আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্যদান কর, তাতে তোমাদের নিজের বা পিতা-মাতার অথবা নিকটবর্তী আত্নীয়-স্বজনের যদি ক্ষতি হয় তবুও। কেউ যদি ধনী কিংবা দরিদ্র হয়, তবে আল্লাহ তাদের শুভাকাঙ্খী তোমাদের চাইতে বেশী। অতএব, তোমরা বিচার করতে গিয়ে রিপুর কামনা-বাসনার অনুসরণ করো না। আর যদি তোমরা ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কথা বল কিংবা পাশ কাটিয়ে যাও, তবে আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় কাজ কর্ম সম্পর্কেই অবগত।
জহুরুল হক: ওহে যারা ঈমান এনেছ! বিশ্বাস স্থাপন করো আল্লাহ্তে ও তাঁর রসূলে, ও কিতাবে যা তিনি নাযিল করেছেন তাঁর রসূলের কাছে, আর যে গ্রন্থ তিনি অবতারণ করেছিলেন এর আগে। আর যে কেউ অবিশ্বাস করে আল্লাহ্তে ও তাঁর ফিরিশ্তাগণে, ও তাঁর কিতাবসমূহে, ও তাঁর রসূলগণে, ও আখেরাতের দিনে, -- সে তাহলে নিশ্চয়ই চলে গেছে সুদূর বিপথে।
Sahih International: O you who have believed, be persistently standing firm in justice, witnesses for Allah, even if it be against yourselves or parents and relatives. Whether one is rich or poor, Allah is more worthy of both. So follow not [personal] inclination, lest you not be just. And if you distort [your testimony] or refuse [to give it], then indeed Allah is ever, with what you do, Acquainted.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১৩৫. হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায়বিচারে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাকবে আল্লাহর সাক্ষীস্বরূপ; যদিও তা তোমাদের নিজেদের বা পিতা-মাতা এবং আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে হয়; সে বিত্তবান হোক বা বিত্তহীন হোক আল্লাহ্– উভয়েরই ঘনিষ্টতর। কাজেই তোমরা ন্যায়বিচার করতে প্রবৃত্তির অনুগামী হয়ে না। যদি তোমরা পেঁচালো কথা বল বা পাশ কাটিয়ে যাও তবে তোমরা যা কর আল্লাহ তো তার সম্যক খবর রাখেন।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১৩৫) হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা ন্যায় বিচারে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাক, তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে সাক্ষ্য দাও; যদিও তা তোমাদের নিজেদের অথবা পিতা-মাতা এবং আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে হয়। [1] সে বিত্তবান হোক অথবা বিত্তহীনই হোক, আল্লাহ উভয়েরই যোগ্যতর অভিভাবক।[2] সুতরাং তোমরা ন্যায়-বিচার করতে খেয়াল-খুশীর অনুগামী হয়ো না। [3] যদি তোমরা পেঁচালো কথা বল অথবা পাশ কেটে চল, [4] তাহলে (জেনে রাখ) যে, তোমরা যা কর, আল্লাহ তার খবর রাখেন।
তাফসীর:
[1] এই আয়াতে মহান আল্লাহ ঈমানদারকে সুবিচার প্রতিষ্ঠিত করার এবং ন্যায় অনুযায়ী সাক্ষ্য দেওয়ার প্রতি তাকীদ করছেন, যদিও তার কারণে তাকে অথবা তার পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনদেরকে ক্ষতির শিকার হতে হয় তবুও। কেননা, সব কিছুর উপর সত্যের থাকে কর্তৃত্ব ও প্রাধান্য।
[2] কোন ধনবানের ধন এবং কোন দরিদ্রের দরিদ্রতার ভয় যেন তোমাদেরকে সত্য কথা বলার পথে বাধা না দেয়। বরং আল্লাহ এদের তুলনায় তোমাদের অনেক কাছে এবং তাঁর সন্তুষ্টি সবার ঊর্ধ্বে।
[3] অর্থাৎ, প্রবৃত্তির অনুসরণ, পক্ষপাতিত্ব অথবা বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে সুবিচার করতে বাধা না দেয়। যেমন, মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেছেন,[وَلا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَى أَلَّا تَعْدِلُوا اعْدِلُوا] অর্থাৎ, কোন সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদেরকে যেন কখনও সুবিচার না করাতে প্ররোচিত না করে। সুবিচার কর---। (সূরা মায়েদাঃ ৮)
[4] تَلْوُوْا শব্দটি لَي ধাতু থেকে গঠিত, যার অর্থ পরিবর্তন করা এবং জেনে-শুনে মিথ্যা বলা। অর্থাৎ, পরিবর্তন-পরিবর্ধন এবং পাশ কাটিয়ে যাওয়া বলতে (সত্য) সাক্ষ্য গোপন করা ও তা পরিত্যাগ করা। এই দু’টি জিনিস থেকেও বাধা প্রদান করা হয়েছে। এই আয়াতে ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা করার প্রতি তাকীদ করা হয়েছে এবং এর জন্য যা যা প্রয়োজন তার প্রতি যত্ন নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেমনঃ-
* সর্বাবস্থায় সুবিচার প্রতিষ্ঠা কর, তা থেকে পাশ কাটিয়ে যেয়ো না এবং কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কার অথবা অন্য কোন চাপ বা প্রবর্তনা যেন এ পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। বরং এর প্রতিষ্ঠার জন্য তোমরা একে অপরের সাহায্যকারী হও।
* তোমাদের কেবল লক্ষ্য হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ। যেহেতু এ রকম হলে পরিবর্তন, হেরফের এবং গোপন করা থেকে তোমরা বিরত থাকবে। ফলে তোমাদের বিচার-ফায়সালা ন্যায়-নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত হবে।
* ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষতি যদি তোমার অথবা তোমার পিতা-মাতার কিংবা তোমার আত্মীয়-স্বজনের উপর আসে, তবুও তুমি কোন পরোয়া না করে নিজের ও তাদের স্বার্থ রক্ষার তুলনায় সুবিচারের দাবীসমূহকে অধিক গুরুত্ব দাও।
* ধনের কারণে কোন ধনীর খাতির করো না এবং কোন দরিদ্রের প্রতি দরিদ্রতার ফলে মায়া প্রদর্শন করবে না। কেননা, আল্লাহই জানেন তাদের উভয়ের কল্যাণ কিসে আছে?
* সুবিচার কায়েম করার পথে প্রবৃত্তি, পক্ষপাতিত্ব এবং শত্রুতা যেন বাধা না হয়, বরং এ সব কিছুকে পরিহার করে বাধাহীন সুবিচার করো।
যে সমাজে এই সুবিচারের যত্ন নেওয়া হবে, সে সমাজ হবে নিরাপত্তা ও শান্তির আধার এবং আল্লাহর পক্ষ হতে সেখানে অজস্র রহমত ও বরকত অবতীর্ণ হবে। সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) এ বিষয়টিকে খুব ভালোভাবেই হৃদয়ঙ্গম করে নিয়েছিলেন। সুতরাং আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ) সম্পর্কে এসেছে যে, রসূল (সাঃ) তাঁকে খায়বারের ইয়াহুদীদের নিকট পাঠালেন, সেখানকার ফলসমূহ ও ফসলাদি অনুমান করে দেখে আসার জন্য। ইয়াহুদীরা তাঁকে ঘুষ পেশ করল; যাতে তিনি তাদের ব্যাপারে একটু শিথিলতা প্রদর্শন করেন। তিনি বললেন, ‘আল্লাহর কসম! আমি তাঁর পক্ষ হতে প্রতিনিধি হয়ে এসেছি যিনি দুনিয়ায় আমার কাছে সব থেকে বেশী প্রিয়তম এবং তোমরা আমার নিকট সর্বাধিক অপ্রিয়। কিন্তু স্বীয় প্রিয়তমের প্রতি আমার ভালোবাসা এবং তোমাদের প্রতি আমার শত্রুতা আমাকে তোমাদের ব্যাপারে সুবিচার না করার উপর উদ্বুদ্ধ করতে পারবে না।’ এ কথা শুনে তারা বলল, ‘এই সুবিচারের কারণেই আসমান ও যমীনের শৃঙ্খলা ও ব্যবস্থাপনা সুপ্রতিষ্ঠিত রয়েছে।’ (ইবনে কাসীর)
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১৩৫ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা‘আলা এখানে মু’মিনদেরকে ন্যায়ের ওপর সর্বদা প্রতিষ্ঠিত থাকতে নির্দেশ দিচ্ছেন। কোন অবস্থাতেই যেন ন্যায় থেকে বিচ্যুত হয়ে ডান-বামে সরে না যায় এবং ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে যেন কোন ভর্ৎসনাকারীর ভর্ৎসনা প্রভাবিত না করে।
(شُھَدَا۬ئَ لِلہِ)
‘আল্লাহর সাক্ষীস্বরূপ’ অর্থাৎ ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকা ও ন্যায় সাক্ষ্য প্রদান করা যেন একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাকে খুশি করার জন্য হয়। যদিও এ ন্যায় সাক্ষ্য নিজের পিতা-মাতা ও আত্মীয় স্বজনের বিরুদ্ধে যায়।
(فَاللّٰهُ أَوْلٰي بِهِمَا)
‘আল্লাহ উভয়েরই ঘনিষ্ঠতর’অর্থাৎ কোন ধনভাণ্ডারের ধন ও কোন দরিদ্রের দারিদ্রতার ভয় যেন তোমাদেরকে সত্য কথা বলার পথে বাঁধা না দেয়। আল্লাহ তা‘আলা তাদের তত্ত্বাবধায়ক, তাদের কল্যাণের ব্যাপারে তিনি ভাল জানেন।
(فَلَا تَتَّبِعُوا الْهَوٰٓي)
‘সুতরাং তোমরা প্রবৃত্তির অনুসরণ কর না’প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না অর্থাৎ প্রবৃত্তির অনুসরণ যেন তোমাদেরকে পক্ষপাতিত্ব বা বিদ্বেষ করতে বাধ্য না করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(يیٰٓاَیُّھَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللہَ وَاٰمِنُوْا بِرَسُوْلِھ۪ یُؤْتِکُمْ کِفْلَیْنِ مِنْ رَّحْمَتِھ۪ وَیَجْعَلْ لَّکُمْ نُوْرًا تَمْشُوْنَ بِھ۪ وَیَغْفِرْ لَکُمْﺚ وَاللہُ غَفُوْرٌ رَّحِیْمٌﭫ)
“হে মু’মিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আন, তিনি তাঁর অনুগ্রহে তোমাদেরকে দ্বিগুণ পুরস্কার দেবেন এবং তিনি তোমাদেরকে দেবেন আলো, যার সাহায্যে তোমরা চলবে এবং তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”(সূরা হাদীদ ৫৭:২৮)
আর যদি প্রবৃত্তির অনুসরণ করে সাক্ষ্য বিকৃতি ও পরিবর্তন কর তাহলে জেনে রেখ তোমরা যা কর আল্লাহ তা‘আলা সব জানেন। অতএব সাক্ষ্য ও বিচারের ক্ষেত্রে ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকা সর্বস্তরের মু’মিনদের জন্যই আবশ্যক।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. বিচার ফায়সালা ও সাক্ষ্য দানে ন্যায়ের অনুসরণ করা ওয়াজিব।
২. মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া হারাম।
৩. সাক্ষ্য নিজের বিপক্ষে গেলেও সত্য কথা বলা উচিত।
৪. কোন কিছুর লোভ বা ভয় যেন সত্য সাক্ষ্য প্রদান থেকে বিচ্যুত না করে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন ন্যায়ের উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকে। সেটা থেকে যেন এক ইঞ্চি পরিমাণও এদিক ওদিক সরে না পড়ে। এরূপ যেন না হয় যে তারা কারও ভয়ে, কোন লোভে, কারও তোষামোদে, কারও প্রতি দয়া দেখিয়ে এবং কারও সুপারিশে ইনসাফকে ছেড়ে দেয়। তারা সম্মিলিতভাবে যেন ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত করে। এ ব্যাপারে যেন তারা। একে অপরের সহযোগিতা করতঃ আল্লাহ তা'আলার সৃষ্টির মধ্যে ন্যায় বিচার কায়েম করে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তোমরা সাক্ষ্য প্রদান কর। (৬৫:২) সাক্ষ্য আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হলেই তা হবে সম্পূর্ণ সঠিক, ন্যায় ভিত্তিক ও সত্য। তাতে থাকবে না কোন পরিবর্তন ও গোপন করার প্রবণতা। এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তোমরা স্পষ্ট ও সত্য সাক্ষ্য প্রদান কর যদিও তা তোমাদের নিজেদের প্রতিকূল হয়। তোমরা সত্য কথা বলা হতে বিরত হয়ো না এবং বিশ্বাস রেখো যে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় অনুগত দাসদের মুক্তির বহু উপায় বের করে থাকেন। তোমাদের মুক্তি যে মিথ্যা সাক্ষ্যের উপরই নির্ভর করে এমন কোন কথা নয়।
তারপর বলা হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ যদিও সত্য সাক্ষ্য পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের বিপক্ষে হয় তথাপি তোমরা সত্য সাক্ষ্য প্রদান হতে হাত মুখ ফিরিয়ে নিও না। কেননা, সত্য প্রত্যেকের উপর বিচারক। সাক্ষ্য প্রদানের সময় ধনীর প্রতি কোন লক্ষ্য রেখো না বা গরীবের উপরও দয়া প্রদর্শন করো না। তাদের মঙ্গলের বিবেচনা তোমাদের অপেক্ষা তাঁরই বেশী রয়েছে। তোমরা সর্বাবস্থায় সত্য সাক্ষ্যই প্রদান কর। চিন্তা করো, কারও ক্ষতি করতে গিয়ে নিজেরই ক্ষতি সাধন করো না, প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে কারও প্রতি শত্রুতা করতঃ ন্যায় ও সাম্য হাত ছাড়া করো না। সদা-সর্বদা ন্যায়ের উপর অটল থাক। যেমন অন্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “কোন সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদেরকে অন্যায় করতে উত্তেজিত না করে, তোমরা সুবিচার করতে থাক, এটাই হচ্ছে মুত্তাকী হওয়ার খুবই নিকটবর্তী।” (৫:৮)
রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ)-কে যখন খাইবারবাসীদের ক্ষেত্র ও শস্য পরিমাপের জন্যে প্রেরণ করেন তখন খাইবারবাসী তাকে এ জন্যে ঘুষ প্রদান করতে চায় যে, তিনি যেন পরিমাণ কম বলেন। তখন তিনি তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা জেনে রেখো যে, আল্লাহর শপথ! সমস্ত মাখলুকের মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয়, পক্ষান্তরে তোমরা আমার নিকট কুকুর ও শূকর হতেও জঘন্য। কিন্তু এতদসত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রেমে পড়ে বা তোমাদের শত্রুতাকে সামনে রেখে আমি যে সুবিচার হতে সরে পড়বো ও তোমাদের প্রতি অন্যায় করবো, এটা সম্ভব নয়।” একথা শুনে তারা বলে, “এর দ্বারাই তো আকাশ ও পৃথিবী প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। এ পূর্ণ হাদীসটি সূরা-ই-মায়েদার তাফসীরে ইনশাআল্লাহ আসবে।
অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন-তোমরা যদি সাক্ষ্যে পরিবর্তন আনয়ন কর, মিথ্যা কথা দ্বারা কার্য সাধন কর, প্রকৃত ঘটনার বিপরীত সাক্ষ্য দান কর, জিহ্বা বাঁকা করে পেঁচযুক্ত কথা বলে ঘটনা কম-বেশী কর, কিছু গোপন কর ও কিছু প্রকাশ কর তবে জেনে রেখো যে সর্বজ্ঞ মহাবিচারক আল্লাহ তাআলার সামনে কোন কৌশলে কাজ দেবে না। সেখানে গিয়ে এর প্রতিদান পাবে এবং শাস্তি ভোগ করবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঘোষণা করেনঃ সর্বোত্তম সাক্ষী হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যে জিজ্ঞাসার পূর্বেই সত্য সাক্ষ্য প্রদান করে।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।