আল কুরআন


সূরা আন-নিসা (আয়াত: 108)

সূরা আন-নিসা (আয়াত: 108)



হরকত ছাড়া:

يستخفون من الناس ولا يستخفون من الله وهو معهم إذ يبيتون ما لا يرضى من القول وكان الله بما يعملون محيطا ﴿١٠٨﴾




হরকত সহ:

یَّسْتَخْفُوْنَ مِنَ النَّاسِ وَ لَا یَسْتَخْفُوْنَ مِنَ اللّٰهِ وَ هُوَ مَعَهُمْ اِذْ یُبَیِّتُوْنَ مَا لَا یَرْضٰی مِنَ الْقَوْلِ ؕ وَ کَانَ اللّٰهُ بِمَا یَعْمَلُوْنَ مُحِیْطًا ﴿۱۰۸﴾




উচ্চারণ: ইয়াছতাখফূনা মিনান্না-ছি ওয়ালা-ইয়াছতাখফূনা মিনাল্লা-হি ওয়া হুওয়া মা‘আহুম ইয ইউবাইয়িতূনা মা-লা-ইয়ারদা-মিনাল কাওলি ওয়া কা-নাল্লা-হু বিমা-ইয়া‘মালূনা মুহীতা-।




আল বায়ান: তারা মানুষের কাছ থেকে লুকাতে চায়, আর আল্লাহর কাছ থেকে লুকাতে চায় না। অথচ তিনি তাদের সাথেই থাকেন যখন তারা রাতে এমন কথার পরিকল্পনা করে যা তিনি পছন্দ করেন না। আর আল্লাহ তারা যা করে তা পরিবেষ্টন করে আছেন।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১০৮.তারা মানুষ থেকে গোপন করতে চায় কিন্তু আল্লাহর থেকে গোপন করে না, অথচ তিনি তাদের সংগেই আছেন রাতে যখন তারা, তিনি যা পছন্দ করেন না- এমন বিষয়ে পরামর্শ করে এবং তারা যা করে আল্লাহ তা পরিবেষ্টন করে আছেন।




তাইসীরুল ক্বুরআন: তারা মানুষ হতে গোপন করে থাকে, কিন্তু তারা আল্লাহ হতে গোপন করতে পারে না; কেননা যে সময়ে তারা রাত্রে এমন বিষয়ে পরামর্শ করে যা আল্লাহ পছন্দ করেন না, তখনও তিনি তাদের সঙ্গেই থাকেন; আল্লাহ তাদের সমুদয় কার্যকলাপকে বেষ্টন করে আছেন।




আহসানুল বায়ান: (১০৮) এরা মানুষকে লজ্জা করে (মানুষের দৃষ্টি থেকে গোপনীয়তা অবলম্বন করে), কিন্তু আল্লাহকে লজ্জা করে না (তাঁর দৃষ্টি থেকে গোপনীয়তা অবলম্বন করতে পারে না) অথচ তিনি তাদের সঙ্গে থাকেন, যখন রাত্রে তারা তাঁর (আল্লাহর) অপছন্দনীয় কথা নিয়ে পরামর্শ করে। আর তারা যা করে, তা সর্বতোভাবে আল্লাহর জ্ঞানায়ত্ত।



মুজিবুর রহমান: তারা মানব হতে গোপন করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ হতে গোপন করতে পারেনা; এবং তিনি তাদের সঙ্গে রয়েছেন যখন তারা রজনীতে এমন বিষয়ে পরামর্শ করে যাতে তিনি সম্মত নন; এবং তারা যা করছে আল্লাহ তার পরিবেষ্টনকারী।



ফযলুর রহমান: তারা মানুষের কাছ থেকে (চক্রান্ত) গোপন করতে চায়, কিন্তু আল্লাহর কাছ থেকে গোপন করতে পারে না; কারণ তারা যখন রাতে লুকিয়ে লুকিয়ে এমনসব কথা বলে যা আল্লাহ পছন্দ করেন না তখন তিনি তাদের সাথেই থাকেন। আল্লাহ তাদের কাজকর্ম পরিবেষ্টন করে আছেন।



মুহিউদ্দিন খান: তারা মানুষের কাছে লজ্জিত হয় এবং আল্লাহর কাছে লজ্জিত হয় না। তিনি তাদের সাথে রয়েছেন, যখন তারা রাত্রে এমন বিষয়ে পরামর্শ করে, যাতে আল্লাহ সম্মত নন। তারা যাকিছু করে, সবই আল্লাহর আয়ত্তাধীণ।



জহুরুল হক: আহা রে! তোমরাই তারা যারা তাদের পক্ষে এই দুনিয়ার জীবনে বিতর্ক করছ, কিন্তু কে আল্লাহ্‌র কাছে তাদের পক্ষে বিতর্ক করবে কিয়ামতের দিনে? অথবা কে হবে তাদের পক্ষে উকিল?



Sahih International: They conceal [their evil intentions and deeds] from the people, but they cannot conceal [them] from Allah, and He is with them [in His knowledge] when they spend the night in such as He does not accept of speech. And ever is Allah, of what they do, encompassing.



তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।


তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১০৮.তারা মানুষ থেকে গোপন করতে চায় কিন্তু আল্লাহর থেকে গোপন করে না, অথচ তিনি তাদের সংগেই আছেন রাতে যখন তারা, তিনি যা পছন্দ করেন না- এমন বিষয়ে পরামর্শ করে এবং তারা যা করে আল্লাহ তা পরিবেষ্টন করে আছেন।


তাফসীর:

-


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১০৮) এরা মানুষকে লজ্জা করে (মানুষের দৃষ্টি থেকে গোপনীয়তা অবলম্বন করে), কিন্তু আল্লাহকে লজ্জা করে না (তাঁর দৃষ্টি থেকে গোপনীয়তা অবলম্বন করতে পারে না) অথচ তিনি তাদের সঙ্গে থাকেন, যখন রাত্রে তারা তাঁর (আল্লাহর) অপছন্দনীয় কথা নিয়ে পরামর্শ করে। আর তারা যা করে, তা সর্বতোভাবে আল্লাহর জ্ঞানায়ত্ত।


তাফসীর:

-


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১০৫-১০৯ নং আয়াতের তাফসীর:



শানে নুযূল:



এ আয়াতের শানে নুযূল সম্পর্কে দীর্ঘ একটি বর্ণনা উল্লেখ করা হয়। ঘটনার সারসংক্ষেপ হল: আনসারদের যুফার গোত্রের তোমা অথবা বাশীর নামক এক ব্যক্তি অপর এক আনসারী ব্যক্তির বর্ম চুরি করে। যখন এ চুরির কথা ছড়াছড়ি হতে লাগল এবং সে বুঝতে পারল যে, তার চুরির কথা ফাঁস হয়ে যাবে তখন চুরিকৃত বর্মটি একজন ইয়াহূদীর বাড়িতে রেখে আসে। এখন যুফার গোত্রের লোক সকলে মিলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে লাগল: ঐ ইয়াহূদী চুরি করেছে।

ইয়াহূদী বলল: বাশীর চুরি করে আমার বাড়িতে রেখে গেছে। যুফার গোত্রের লোকেরা বাশীর বা তোমার সম্পর্কে প্রথমেই সতর্ক ছিল। তাই বার বার নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বুঝাতে চেষ্টা করল যে, চুরি ইয়াহূদী করেছে। নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের চমৎকার কথাবার্তায় প্রভাবিত হয়ে (তিনি প্রকৃত ঘটনা জানেন না) ইয়াহূদীকে অপরাধী সাব্যস্ত করলেন। তখন নাযিল হল:



(خَصِيْمًا.... إِنَّآ أَنْزَلْنَآ إِلَيْكَ الْكِتٰبَ) ।



(তিরমিযী হা: ৩০৩৬, হাসান)



(بِمَآ أَرَاكَ اللّٰهُ)



‘আল্লাহ তোমাকে যা জানিয়েছেন’ এ আয়াত দ্বারা অনেক আলেম বলে থাকেন যে, নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ইজতিহাদ করে ফায়সালা দেয়ার অনুমতি আছে।



রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: তোমরা আমার নিকট বিচার-ফায়সালার জন্য নিয়ে আস। আমি একজন মানুষ। হয়তো তোমাদের কেউ তার প্রমাণ পেশ করতে অধিক বাকপটু। আমি যা শুনি তার ভিত্তিতে তোমাদেরকে ফায়সালা দেই। অতএব আমার ফায়সালা দ্বারা কোন মুসলিম ব্যক্তির অংশ কেটে দিলে সে যেন তা গ্রহণ না করে। কেননা আমি তাকে একটি আগুনের টুকরা কেটে দিলাম। (আবূ দাঊদ হা: ৩৫৮৫, দারাকুতনী হা: ২৩৯, হাসান)



পরের আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে ক্ষমা চাওয়ার নির্দেশ প্রদান করেছেন। কারণ তিনি যাচাই-বাছাই না করে নিরপরাধ ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফায়সালা দিয়ে দিয়েছেন।



অতঃপর এসব খিয়ানতকারীদের পক্ষে কথা বলতে আল্লাহ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নিষেধ করছেন। কেননা আল্লাহ তা‘আলা খিয়ানতকারীদেরকে ভালবাসেন না।



এসব মুনাফিকরা এমন কথা নিয়ে রাতে শলাপরামর্শ করে যাতে আল্লাহ তা‘আলা অসন্তুষ্ট। তারা মানুষ থেকে গোপন রাখতে পারে কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা তো তাদের সাথেই আছেন।



অতএব যে কোন কাজ সেটা বড় হোক আর ছোট হোক তা যাচাই বাছাই করে ফায়সালা প্রদান করা উচিত।



আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. সঠিক ঘটনা জেনে বিচার-ফায়সালা করা উচিত।

২. এ ঘটনা থেকে বুঝা যায় নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) গায়েব জানতেন না।

৩. নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একজন সাধারণ মানুষ। তিনিও ভুল করতেন।

৪. প্রত্যেক যুগেই এসব খিয়ানতকারী বিদ্যমান।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১০৫-১০৯ নং আয়াতের তাফসীর:

আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেন-হে নবী (সঃ)! আমি তোমার উপর যে কুরআন কারীম অবতীর্ণ করেছি তার আদি হতে অন্ত পর্যন্ত সবই সত্য। ওর খবর সত্য এবং ওর নির্দেশ সত্য। তারপরে বলা হচ্ছে-‘যেন তুমি জনগণের মধ্যে ঐ ন্যায় বিচার করতে পার যা আল্লাহ তোমাকে শিখিয়েছেন।

কোন কোন নীতিশাস্ত্রবিদ এর দ্বারা দলীল নিয়েছেন যে, নবী (সঃ)-কে ইজতিহাদ দ্বারা ফায়সালা করার অধিকার দেয়া হয়েছিল। এর দলীল ঐ হাদীসটিও বটে যা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর দরজার উপর বিবাদে লিপ্ত দু’ব্যক্তির কণ্ঠস্বর শুনে বলেনঃ “জেনে রেখো যে, আমি একজন মানুষ। যা শুনি সে অনুযায়ী ফায়সালা করে থাকি। খুব সম্ভব যে, এক ব্যক্তি খুব যুক্তিবাদী এবং বাকপটু, আমি তার কথা সঠিক মনে করে হয়তো তার অনুকূলেই মীমাংসা করে দেবো, কিন্তু যার অনুকূলে মীমাংসা করবো সে হয়তো প্রকৃত হকদার নয়। সে যেন এটা বুঝে নেয় যে, ওটা তার জন্যে জাহান্নামের আগুনের একটি খণ্ড। এখন তার অধিকার রয়েছে যে, হয় সে তা গ্রহণ করবে, না হয় ছেড়ে দেবে।'

মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, দু’জন আনসারী একটা উত্তরাধিকারের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট মামলা নিয়ে উপস্থিত হন। তাদের কারো কোন প্রমাণ ছিল না। সে সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের নিকট উপরোক্ত হাদীসটিই বর্ণনা করেন এবং বলেনঃ “কেউ যেন আমার ফায়সালার উপর ভিত্তি করে তার ভাই-এর সামান্য হকও গ্রহণ না করে। যদি এরূপ করে তবে কিয়ামতের দিন সে স্বীয় স্কন্ধে জাহান্নামের আগুন বুঝিয়ে নিয়ে আসবে।” তখন ঐ দু’জন মনীষী ক্রন্দনে ফেটে পড়েন এবং প্রত্যেকেই বলেনঃ “আমার নিজের হকও আমি আমার ভাইকে দিয়ে দিচ্ছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা যখন একথাই বলছো তখন যাও এবং তোমাদের বিবেচনায় যতদূর সম্ভব হয় ঠিকভাবে অংশ ফেলে দাও। তারপর নির্বাচনের গুটিকা নিক্ষেপ করতঃ নিজ নিজ অংশ নিয়ে নাও। অতঃপর প্রত্যেকেই স্বীয় ভ্রাতার অনিচ্ছাকৃতভাবে গৃহীত হক ক্ষমা করে দাও।”

সূনান-ই-আবি দাউদের মধ্যেও এ হাদীসটি রয়েছে। তাতে এ শব্দগুলোও রয়েছেঃ “আমি তোমাদের মধ্যে স্বীয় বিবেকবুদ্ধি অনুযায়ী ঐ সব বিষয়ে ফায়সালা করে থাকি যেসব বিষয়ে কোন অহী অবতীর্ণ হয় না।”

তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে যে, আনসারদের একটি দল এক যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে ছিলেন। তথায় এক ব্যক্তির একটি বর্ম চুরি হয়ে যায়। লোকটি ধারণা করেন যে, তামা ইবনে উবাইরিক বর্মটি চুরি করেছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে ঘটনাটি পেশ করা হয়। চোরটি ঐ বর্ম এক ব্যক্তির ঘরে তার অজান্তে ফেলে দেয় এবং স্বীয় গোত্রীয় লোকদেরকে বলেঃ “আমি বর্মটি অমুকের ঘরে ফেলে দিয়েছি। তোমরা তার নিকটে পাবে।” তার গোত্রীয় লোকগুলো তখন নবী (সঃ)-এর নিকট গমন করে বলে, “হে আল্লাহর নবী (সঃ)! আমাদের সঙ্গী তো চোর নয় বরং চোর হচ্ছে অমুক ব্যক্তি। আমরা অনুসন্ধান নিয়ে জেনেছি যে, বর্মটি তার ঘরেই বিদ্যমান রয়েছে। সুতরাং আপনি জন সম্মুখে আমাদের সঙ্গীটির নির্দোষিতা ঘোষণা করতঃ তাকে রক্ষা করুন। নচেৎ ভয় আছে যে, সে ধ্বংস হয়ে যায় না কি!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন দাড়িয়ে জনগণের সামনে তাকে দোষমুক্ত বলে ঘোষণা করেন। তখন উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। আর যে লোকগুলো মিথ্যা গোপন রেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসেছিল তাদের ব্যাপারে (আরবী) হতে দুটি আয়াত অবতীর্ণ হয়। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-(আরবী) অর্থাৎ যে কেউ অপরাধ অথবা পাপ অর্জন করে, তৎপর ওর অপবাদ কোন নিরপরাধ ব্যক্তির প্রতি আরোপ করে, তবে সে নিজেই সেই অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপ বহন করবে। এর দ্বারাও এ লোকগুলোকেই বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ চোর এবং চোরের পক্ষ হতে বিতর্ককারীদের ব্যাপারেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। কিন্তু এ বর্ণনাটি গারীব ও দুর্বল।

কোন কোন মনীষী হতে বর্ণিত আছে যে, এ আয়াতটি বানূ উবাইরিকের চোরের সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়। এ ঘটনাটি জামিউত তিরমিযীর কিতাবুত তাফসীরের মধ্যে হযরত কাতাদাহ্ ইবনে নোমান (রাঃ)-এর ভাষায় সুদীর্ঘভাবে বর্ণিত আছে। হযরত কাতাদাহ ইবনে নোমান (রাঃ) বলেনঃ “আমার গোত্রের মধ্যে বাশার, বাশীর ও মুবাশশার নামক তিনজন লোক ছিল যাদেরকে বান্ উবাইরিক বলা হতো। বাশীর ছিল একজন মুনাফিক। সে কবিতা রচনা করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণের দুর্নাম করতো। অতঃপর সে কোন একজন আরবীর দিকে ঐ কবিতার সম্বন্ধ লাগিয়ে দিয়ে বেশ আগ্রহ সহকারে পাঠ করতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণ জানতেন যে, এ খাবীসই হচ্ছে এ কবিতাগুলোর রচয়িতা। এ লোকগুলো অজ্ঞতার যুগ হতেই ছিল দরিদ্র ও অভাবী। মদীনার লোকদের সাধারণ খাবার ছিল যব ও খেজুর। তবে ধনী লোকেরা সিরিয়া হতে আগত যাত্রীদের নিকট হতে ময়দা ক্রয় করতে যা তারা নিজেদের জন্যে নির্দিষ্ট করে নিতো। বাড়ীর অন্যান্য লোকেরা সাধারণতঃ যব ও খেজুরই ভক্ষণ করতো। আমার চাচা রিফাআ ইবনে যায়েদও (রাঃ) সিরিয়া হতে আগত যাত্রীদলের নিকট হতে এক বোঝা ময়দা ক্রয় করেন এবং তা তাঁর এক কক্ষে রেখে দেন যেখানে অস্ত্র শস্ত্র, লৌহবর্ম এবং তরবারী ইত্যাদিও রক্ষিত ছিল। রাত্রে চোরেরা নীচ দিয়ে সিদ কেটে ময়দাও বের করে নেয় এবং অস্ত্র-শস্ত্রগুলোও উঠিয়ে নেয়। সকালে আমার চাচা আমার নিকট এসে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করে। তখন আমরা অনুসন্ধান চালিয়ে জানতে পারি যে, আজ রাত্রে বানূ উবাইরিকের ঘরে আগুন জ্বলছিল এবং তারা কিছু খাদ্য রান্না করছিল। আমাদেরকে বলা হয়ঃ ‘সম্ভবতঃ আপনাদের বাড়ী হতেই তারা খাদ্য চুরি করে এনেছিল। এর পূর্বে আমরা যখন আমাদের পরিবারের লোকদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করছিলাম তখন ঐ গোত্রের লোকেরা আমাদেরকে বলেছিল, ‘তোমাদের চোর হচ্ছে লাবীদ ইবনে সহল। আমরা জানতাম যে, একাজ লাবীদের নয়, সে ছিল একজন বিশ্বস্ত খাটি মুসলমান। হযরত লাবীদ (রাঃ) এ সংবাদ পেয়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। তরবারী নিয়ে বানূ উবাইরিকের নিকট এসে বলেনঃ “তোমরা আমার চুরি সাব্যস্ত কর, নতুবা তোমাদেরকে হত্যা করে দেবো।' তখন তারা তাঁর নির্দোষিতা স্বীকার করে এবং তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে। আমরা পূর্ণ তদন্তের পর বুঝতে পারি যে, বানূ উবাইরিকই চুরি করেছে। আমার চাচা আমাকে বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গিয়ে তুমি তাকে সংবাদটা দিয়ে এসো। আমি গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করি এবং একথাও বলি যে, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি আমাদেরকে অস্ত্র-শস্ত্রগুলো আদায় করে দিন। খাদ্য ফিরিয়ে দেয়ার প্রয়োজন নেই। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেনঃ “আচ্ছা, আমি তদন্ত করে দেখছি।'

বানূ উবাইরিকের নিকট এ সংবাদ পৌছলে তারা হযরত উসায়েদ ইবনে উরওয়া (রাঃ) নামক এক ব্যক্তিকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট প্রেরণ করে। তিনি এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এতো জুলুম হচ্ছে, বানূ উবাইরিক তো সৎ ও ইসলামপন্থী লোক। তাদের উপর কাতাদাহ্ ইবনে নোমান (রাঃ) ও তাঁর চাচা চুরির অপবাদ দিচ্ছেন! অতঃপর আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হলে তিনি আমাকে বলেনঃ “তুমি তো এটা ভাল কাজ করছে না যে, দ্বীনদার ও ভাল লোকদের উপর চুরির অপবাদ দিচ্ছ, অথচ তোমার নিকট কোন প্রমাণও নেই। আমি নিরুত্তর হয়ে চলে আসি এবং মনে মনে খুব লজ্জিত ও হতবুদ্ধি হয়ে পড়ি। আমার ধারণা হয় যে, ঐ মাল সম্বন্ধে যদি নীরব থাকতাম এবং নবী (সঃ)-এর সঙ্গে কোন আলোচনাই না করতাম তাহলেই ভাল হতো। এমন সময় আমার চাচা এসে আমাকে জিজ্ঞেস করেন, তুমি কি করে আসলে?' আমি তার নিকট সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করি। শুনে তিনি বলেন, আমরা আল্লাহ তাআলার নিকটই সাহায্য প্রার্থনা করছি।' তিনি চলে যাওয়ার পর পরই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। সুতরাং (আরবী) দ্বারা বানূ উবারিককেই বুঝানো হয়েছে। হযরত কাতাদাহ (রাঃ)-কে তিনি যে কথা বলেছিলেন তার জন্যে তাকে আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে বলা হয় এবং এ কথাও বলা হয় যে, এলোকগুলো যদি ক্ষমা প্রার্থনা করে তবে আল্লাহ পাক তাদেরকে ক্ষমা করবেন। তারপর আল্লাহ তা'আলা (আরবী) পর্যন্ত এবং (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। এগুলো হযরত লাবীদ (রাঃ)-এর ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়। কেননা, বানূ উবাইরিক তাঁর উপর চুরির অপবাদ দিয়েছিল, অথচ তিনি ওটা হতে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন। এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বানূ উবাইরিকের নিকট হতে আমাদের অস্ত্র-শস্ত্রগুলো আদায় করে দেন। আমি ঐগুলো নিয়ে আমার চাচার নিকট গমন করি। তিনি এত বৃদ্ধ ছিলেন যে, চোখেও কম দেখতেন। তিনি আমাকে বলেন, হে আমার ভ্রাতুস্পুত্র! এ অস্ত্রগুলো তুমি আল্লাহ তা'আলার নামে দান করে দাও।' এতদিন পর্যন্ত আমার চাচার প্রতি আমার কিছুটা বদ ধারণা ছিল যে, তিনি অন্তরের সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে ইসলামের মধ্যে প্রবেশ করেননি। কিন্তু এ ঘটনাটি আমার অন্তর হতে এ কু-ধারণা দূর করে দেয়। তখন আমি তাঁকে খাটি মুসলমানরূপে স্বীকার করে নেই। বাশীর এ আয়াতগুলো শুনে মুশরিকদের সাথে মিলিত হয়ে যায় এবং সালাফা বিনতে সাদ ইবনে সুমিয়্যার নিকটে অবস্থান করে। তারই ব্যাপারে (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত পরবর্তী আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।

হযরত হাসসান (রাঃ) স্বীয় কবিতার মাধ্যমে বাশীরের এ জঘন্য কার্যের নিন্দে করেন। এ কবিতাগুলো শুনে সালাফা নামী স্ত্রীলোকটি খুবই লজ্জিতা হয় এবং বাশীরের সমস্ত আসবাবপত্র মস্তকে বহন করে নিয়ে গিয়ে আবতাহ' নামক মাঠে নিক্ষেপ করে এবং তাকে বলে, তুমি কোন মঙ্গল নিয়ে আমার নিকট আসনি, বরং হযরত হাসসান (রাঃ)-এর কবিতাগুলো নিয়ে এসেছে। আমি তোমাকে আমার নিকট স্থান দেবো না। এ বর্ণনা বহু কিতাবে বহু সনদে দীর্ঘাকারে ও সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণিত আছে।

অতঃপর আল্লাহ তাআলা এ মুনাফিকদের জ্ঞানের স্বল্পতার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তারা তাদের মন্দ কার্যাবলী জনগণের নিকট গোপন করছে বটে কিন্তু এতে লাভ কি? তারা সেটা আল্লাহ তাআলা হতে গোপন করতে পারবে না। অতঃপর তাদেরকে সম্বোধন করে বলেন-“মানলাম যে, এভাবে তোমাদের কার্যকলাপ গোপন করতঃ তোমরা পৃথিবীর বিচারকদের নিকট হতে বেঁচে গেলে, কেননা তারা বাহ্যিকের উপর ফায়সালা দিয়ে থাকে। কিন্তু কিয়ামতের দিন তোমরা সেই আল্লাহ তা'আলার সামনে কি উত্তর দেবে যিনি প্রকাশ্য ও গোপনীয় সবই জানেন? তথায় তোমরা তোমাদের মিথ্যা দাবীকে সত্যরূপে প্রমাণ করার জন্যে কাকে উকিল করে পাঠাবে? মোটকথা সে দিন তোমাদের কোন কৌশলই ফলদায়ক হবে না।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।