আল কুরআন


সূরা আল-হুজুরাত (আয়াত: 1)

সূরা আল-হুজুরাত (আয়াত: 1)



হরকত ছাড়া:

يا أيها الذين آمنوا لا تقدموا بين يدي الله ورسوله واتقوا الله إن الله سميع عليم ﴿١﴾




হরকত সহ:

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا لَا تُقَدِّمُوْا بَیْنَ یَدَیِ اللّٰهِ وَ رَسُوْلِهٖ وَ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ اِنَّ اللّٰهَ سَمِیْعٌ عَلِیْمٌ ﴿۱﴾




উচ্চারণ: ইয়াআইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানূলা-তুকাদ্দিমূবাইনা ইয়াদাইল্লা-হি ওয়া রাছূলিহী ওয়াত্তাকুল্লা-হা ইন্নাল্লা-হা ছামী‘উন ‘আলীম।




আল বায়ান: হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সামনে অগ্রবর্তী হয়ো না এবং তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর, নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১. হে ঈমানদারগণ(১) আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সমক্ষে তোমরা কোন বিষয়ে অগ্রণী হয়ো না আর তোমরা আল্লাহ্‌র তাকওয়া অবলম্বন কর; নিশ্চয় আল্লাহ্‌ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।




তাইসীরুল ক্বুরআন: ওহে মু’মিনগণ! তোমরা (কোন বিষয়েই) আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আগে বেড়ে যেয়ো না, আল্লাহকে ভয় কর, আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।




আহসানুল বায়ান: (১) হে বিশ্বাসীগণ! আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সামনে তোমরা কোন বিষয়ে অগ্রণী হয়ো না[1] এবং আল্লাহকে ভয় কর, নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।



মুজিবুর রহমান: হে মু’মিনগণ! আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সামনে তোমরা কোন বিষয়ে অগ্রনী হয়োনা এবং আল্লাহকে ভয় কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।



ফযলুর রহমান: হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সামনে কোন কিছু এগিয়ে দিও না (অর্থাৎ তাদের আগে কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিও না)। আর আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছু শোনেন, সবকিছু জানেন।



মুহিউদ্দিন খান: মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ ও রসূলের সামনে অগ্রণী হয়ো না এবং আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু শুনেন ও জানেন।



জহুরুল হক: ওহে যারা ঈমান এনেছ! আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের সামনে তোমরা আগবাড়বে না, আর আল্লাহ্‌কে ভয়ভক্তি করো। নিঃসন্দেহ আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞাতা।



Sahih International: O you who have believed, do not put [yourselves] before Allah and His Messenger but fear Allah. Indeed, Allah is Hearing and Knowing.



তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।


তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১. হে ঈমানদারগণ(১) আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সমক্ষে তোমরা কোন বিষয়ে অগ্রণী হয়ো না আর তোমরা আল্লাহ্–র তাকওয়া অবলম্বন কর; নিশ্চয় আল্লাহ্– সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।


তাফসীর:

(১) আলোচ্য আয়াতসমূহ নাযিল হওয়ার ঘটনা এই যে, একবার বনী তামীম গোত্রের কিছু লোক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খেদমতে উপস্থিত হয়। এই গোত্রের শাসনকর্তা কাকে নিযুক্ত করা হবে তখন এ বিষয়েই আলোচনা চলছিল। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু কাকা’ ইবন মা'বাদ ইবন যুরারাহর নাম প্রস্তাব করলেন এবং উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু আকরা’ ইবন হাবিসের নাম প্রস্তাব করলেন এবং আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু ও উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর মধ্যে মজলিসেই কথাবার্তা হলো এবং ব্যাপারটি শেষ পর্যন্ত কথা কাটাকাটিতে উন্নীত হয়ে উভয়ের কণ্ঠস্বর উঁচু হয়ে গেল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আলোচ্য আয়াতসমূহ নাযিল হয় ৷ [বুখারী: ৪৮৪৭]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১) হে বিশ্বাসীগণ! আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সামনে তোমরা কোন বিষয়ে অগ্রণী হয়ো না[1] এবং আল্লাহকে ভয় কর, নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।


তাফসীর:

[1] এর অর্থ হলো, দ্বীনের ব্যাপারে নিজে থেকে কোন ফায়সালা করো না (কোন সিদ্ধান্ত নিয়ো না, কোন ফতোয়া দিয়ো না)। এবং স্বীয় বিবেক-বুদ্ধিকে তার উপর প্রাধান্য দিয়ো না। বরং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর। নিজের পক্ষ থেকে দ্বীনের সাথে কোন কিছু সংযোজন বা বিদআত রচনা হল আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে অতিক্রম করার এমন দুঃসাহসিকতা, যা কোন ঈমানদারের জন্য শোভনীয় নয়। অনুরূপ কুরআন ও হাদীস নিয়ে যথাযথ গবেষণা ও চিন্তা-ভাবনা না করে কোন ফতোয়া দেওয়া যাবে না এবং ফতোয়া দেওয়ার পর যদি এ কথা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, তা শরীয়তের সুস্পষ্ট বিধির প্রতিকূল, তবে তার উপর অটল থাকাও এই আয়াতে বর্ণিত নির্দেশের পরিপন্থী। মু’মিনের কর্তব্যই হল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশাবলীর সামনে আনুগত্যের মস্তক নত করে দেওয়া। নিজের কথা অথবা কোন ইমামের মতের উপর অনড় থাকা তার কর্তব্য নয়।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: নামকরণ :



الْحُجُرَات শব্দটি حُجْرَةٌ এর বহুবচন, অর্থ হলো কক্ষসমূহ, কামরা, রুম ইত্যাদি। অত্র সূরার ৪ নং আয়াতে الْحُجُرَاتِ শব্দটি উল্লেখ রয়েছে, তাছাড়া এ সংক্রান্ত একটি ঘটনাও উক্ত আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। তাই উক্ত নামে সূরার নামকরণ করা হয়েছে। সূরার মূল আলোচনা ও শিক্ষার প্রতি লক্ষ্য রেখে একে



سورة الأخلاق والأدب



বা শিষ্টাচারের সূরাও বলা হয়। সূরাটি মদীনায় অবতীর্ণ হয়।



সূরা হুজরাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সূরা। এতে সামাজিক বিধি-বিধানসহ ধর্মীয় বিভিন্ন দিক আলোচনা করা হয়েছে। সামাজিক আচার-আচরণ ও শিষ্টাচার তুলে ধরা হয়েছে, বয়োজ্যেষ্ঠ ও ধর্মীয় আলেমদের সাথে কিরূপ আদব রেখে কথা বলতে হবে, নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নামে মিথ্যা হাদীস তৈরির ভয়াবহতা, সংবাদ সংগ্রহ ও তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা, মু’মিনদের মাঝে আপোষে কোন বিষয়ে দ্বন্দ্ব হলে করণীয়, মুসলিমদের সম্মানের মূল্য ও তা যেন ক্ষুণœ না হয় সেজন্য বর্জনীয় আচরণ থেকে বিরত থাকা এবং যারা তাতে লিপ্ত হবে তাদের অপরাধের ভয়াবহতা, ঈমান ও ইসলামের মাঝে পার্থক্য এবং প্রকৃত সত্যবাদীদের পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে।



১-৩ নম্বর আয়াতের তাফসীর :



শানে নূযুল :



আবদুল্লাহ বিন যুবাইর (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন : বনু তামীম গোত্রের একটি কাফিলা (তাদের নেতা নির্বাচনে) নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দরবারে আগমন করে। আবূ বাকর (রাঃ) বললেন : কা‘কা‘ বিন মা‘বাদকে তাদের আমীর নিযুক্ত করে দিন। উমার (রাঃ) বললেন : আকরা বিন হাবেসকে নিযুক্ত করে দিন। আবূ বকর (রাঃ) বললেন : (হে উমার) তুমি আমার বিরোধিতা করতে চাচ্ছ! উমার (রাঃ) বললেন : আমি আপনার বিরোধিতা করতে চাইনি। এভাবে কথা কাটাকাটি করতে করতে একপর্যায়ে তাদের আওয়াজ উঁচু হয়ে যায়। তখন



(یٰٓاَیُّھَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا لَا تُقَدِّمُوْا بَیْنَ یَدَیِ اللہِ وَرَسُوْلِھ۪ وَاتَّقُوا اللہَ)



আয়াতটি অবতীর্ণ হয়ে মু’মিনদেরকে সতর্ক করা হয় তারা যেন রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উপস্থিতিতে উঁচু আওয়াজে কথা না বলে। (সহীহ বুখারী হা. ৪৮৪৭) এ ছাড়াও উক্ত আয়াতের কয়েকটি শানে নূযুল পাওয়া যায়। (ইবনু কাসীর, লুবাবুন নুকূল ফী আসবাবে নুযূল)



সূরার শুরুতেই আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদেরকে সতর্ক করে বললেন : “হে মু’মিনগণ!” এর অর্থ হল আল্লাহ তা‘আলা পরবর্তী যে আদেশ বা নিষেধ করছেন তা খুব সতর্কতার সাথে খেয়াল করা। ইবনু মাসঊদ (রাঃ) বলেন : যখন তুমি আল্লাহ তা‘আলাকে বলতে শুনবে, “হে মু’মিনগণ!” তাহলে তুমি তা খুব খেয়াল করে শুনবে। কারণ হয়তো মহান আল্লাহ কোন কল্যাণের নির্দেশ দেবেন অথবা কোন অকল্যাণ থেকে নিষেধ করবেন। সুতরাং আমাদের কতটুকু সতর্ক হওয়া উচিত।



মুফাসসিরগণ (لَا تُقَدِّمُوْا) ‘তোমরা অগ্রবর্তী হয়ো না’ আয়াতের এ অংশের তিন ধরনের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, তন্মধ্যে অধিক সঠিক ও সুস্পষ্ট ব্যাখ্যাটি হল : (لَا تُقَدِّمُوْا) এ শব্দটি ভবিষ্যতমূলক অকর্মক ক্রিয়া (فعل لازم), যার অর্থ হল অগ্রবর্তী হয়ো না। (আযওয়াউল বায়ান ৭/৩৬২) অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সামনে অগ্রবর্তী হয়ো না। কিন্তু কোন ক্ষেত্রে অগ্রবর্তী হতে নিষেধ করা হয়েছে তা বলে নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়নি। তাই এতে ব্যাপকতার প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। অর্থাৎ যে কোন কাজ ও কথায় আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অগ্রবর্তী হয়ো না। বরং নির্দেশ বা অনুমতির অপেক্ষা কর এবং যে কাজ ও কথা থেকে নিষেধ করেন তা বর্জন কর। এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর।



ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন :



(لَا تُقَدِّمُوْا بَيْنَ يَدَيِ اللّٰهِ)



অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কথা বলাকালীন কথা বলতে নিষেধ করা হচ্ছে। (ফাতহুল কাদীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)



সুতরাং দীনের ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা যা দেননি ও নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যা বলেননি, করেননি এবং অনুমোদনও দেননি তা করা ও বলা স¤পূর্ণ হারাম। কারণ এসব করা ও বলা আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অগ্রণী হওয়ার শামিল। এখান থেকে আরো শিক্ষা হল- যারা জ্ঞানে বড় তাদের সাথে শিষ্টাচার বর্হিভূত আচরণ করা অন্যায়। বরং শ্রদ্ধা রেখে শালীন আচরণ করতে হবে।



(وَاتَّقُوا اللّٰهَ) ‘আল্লাহকে ভয় কর’ অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলার আদেশ বাস্তবায়ন ও নিষেধ থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে তাঁকে ভয় কর। তাহলে ইহকালীন শান্তি ও সমৃদ্ধি আসবে আর পরকালে জাহান্নাম থেকে নাজাত পাবে। আল্লাহ তা‘আলা পূর্ববর্তী জাতিকেও তাকওয়ার অসিয়ত করেছিলেন। (সূরা নিসা ৪ : ১৩১)



আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন : যখন



(يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ.....)



ওহে ‘যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের আওয়াজ নাবীর আওয়াজের চেয়ে উঁচু কর‎ না’ আয়াতটি অবতীর্ণ হল তখন সাবেত বিন কায়েস বিন শামমাস বললেন : আমি নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আওয়াজের ওপর আমার আওয়াজকে উঁচু করেছিলাম। আমার সকল আমল বাতিল হয়ে গেছে। আমি জাহান্নামবাসী। তিনি তাঁর বাড়িতে চিন্তিত অবস্থায় বসে রইলেন। একদা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে অনেক সময় ধরে পাচ্ছেন না। কিছু মানুষ তাঁর কাছে গেল। তারা বলল : আপনাকে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পাচ্ছেন না। আপনার কী হয়েছে? তিনি বললেন : আমি নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আওয়াজের ওপর আমার আওয়াজকে উঁচু করেছিলাম। আমার সকল আমল বাতিল হয়ে গেছে। আমি তো জাহান্নামী হয়ে গেছি। তারা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে এসে এ খবর জানালো। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন : না বরং সে জান্নাতবাসী। তারপর তিনি ইয়ামামার যুদ্ধে শহীদ হন। (সহীহ বুখারী হা. ৪৮৪৬)



لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ))



‘তোমাদের আওয়াজ নাবীর আওয়াজের চেয়ে উঁচু কর‎ না’ অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা পুনরায় মু’মিনদেরকে সতর্ক করার জন্য হে ঈমানদারগণ বলে সম্বোধন করেছেন, যাতে তারা বিষয়টির প্রতি গুরুত্বারোপ করে। আল্লাহ তা‘আলা বলছেন ‘তোমাদের আওয়াজ নাবীর আওয়াজের চেয়ে উঁচু কর‎ না’ এখানে এ শিক্ষা ও নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সম্মান ও মর্যাদার প্রতি সতর্ক থাকে। তাদেরকে নিষেধ করছেন যেন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কণ্ঠস্বর থেকে তাদের কন্ঠস্বর উঁচু না করে এবং নিজেদের মাঝে যেমন পরস্পর আওয়াজ করে কথা বলে তেমনভাবে তাঁর সাথে আওয়াজ করে কথা বলবে না। আর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে এমনভাবে সম্বোধন করবে না যেমনভাবে তোমরা একে অপরকে সম্বোধন করে থাক। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নাম ধরে ডাকবে না বরং তাঁর মর্যাদা ও সম্মানের সাথে উপযোগী হয় এমন ভাষায় সম্বোধন করবে। যেমন হে আল্লাহ তা‘আলার নাবী, হে আল্লাহ তা‘আলার রাসূল ইত্যাদি।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন :



(لَا تَجْعَلُوْا دُعَا۬ءَ الرَّسُوْلِ بَيْنَكُمْ كَدُعَا۬ءِ بَعْضِكُمْ بَعْضًا)



রাসূলের আহ্বানকে তোমরা তোমাদের একে অপরের প্রতি আহ্বানের মত গণ্য কর না (সূরা নূর ২৪ : ৬৩)। আল্লাহ তা‘আলা কুরআনের কোথাও নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে তাঁর নাম ধরে আহ্বান করেননি। কখনো হে নাবী (সূরা আনফাল ৮ : ৬৪) কখনো হে রাসূল (সূরা মায়িদা ৫ : ৪১) ইত্যাদি ভূষণে আহ্বান করেছেন। যেখানে তাঁর নাম উল্লেখ করেছেন সেখানে সম্মানজনক উপাধিও উল্লেখ করেছেন। কিন্তু অন্যান্য নাবীদেরকে আল্লাহ তা‘আলা নাম নিয়ে সম্বোধন করেছেন। সুতরাং নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সম্মান ও মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য রেখে তাঁকে সম্বোধন করা ও নিচু আওয়াজে কথা বলা আবশ্যক। অনুরূপ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কবরের সামনে বেশি উঁচুস্বরে সালাম ও কালাম করা নিষিদ্ধ। কারণ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সম্মান করা তাঁর মৃত্যুর পরও ওয়াজিব। তদনুরূপ যে মজলিসে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর হাদীস পাঠ করা হয় সেখানে উঁচু আয়াজে কথা বলা নিষেধ। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উত্তরাধিকারী আলেম ও ধর্মীয় নেতাদের সাথেও এ আদবের প্রতি লক্ষ্য রাখা উচিত। তবে আদব দেখাতে গিয়ে যেন সীমালংঘন না হয়।



সুতরাং নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সামনে উঁচু আওয়াজে কথা না বলার জন্য এতো কঠিনভাবে নিষেধ করা হয় তাহলে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নিয়ে কটুক্তি করা, ব্যঙ্গ করা, তাঁর নামে মিথ্যা হাদীস তৈরি কত বড় অপরাধ হতে পারে!



দু’টি মাসআলা :



(১) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সম্মান প্রদর্শন না করে তাঁর মানহানীকর কোন কথা ও কাজ করা, তাঁকে হেয় প্রতিপন্ন করা এবং তাঁকে নিয়ে ঠাট্টা করা কুফরী কাজ এবং যে তা করে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে। তাবূক যুদ্ধ ফেরত যে সকল মুনাফিকরা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও সাহাবীদের নিয়ে ঠাট্টা করেছিল তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা বলেন :



(وَلَئِنْ سَاَلْتَھُمْ لَیَقُوْلُنَّ اِنَّمَا کُنَّا نَخُوْضُ وَنَلْعَبُﺚ قُلْ اَبِاللہِ وَاٰیٰتِھ۪ وَرَسُوْلِھ۪ کُنْتُمْ تَسْتَھْزِءُوْنَﮐ لَا تَعْتَذِرُوْا قَدْ کَفَرْتُمْ بَعْدَ اِیْمَانِکُمْ‏)‏



“এবং তুমি তাদেরকে প্রশ্ন করলে তারা নিশ্চয়ই বলবে : ‘আমরা তো আলাপ-আলোচনা ও ক্রীড়া-কৌতুক করছিলাম।’ বল : ‎ ‘তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর নিদর্শন ও তাঁর রাসূলকে নিয়ে বিদ্রূপ করছিলে? ‘তোমরা ওজর পেশ কর না। তোমরা ঈমান আনার পর কুফরী করেছ।” (সূরা তাওবা ৯ : ৬৫)



(২) আল্লাহ তা‘আলার হক ও বান্দার হকের মাঝে পার্থক্য নির্ণয় করা প্রত্যেক ব্যক্তির ওপর ওয়াজিব যাতে এক জনের হক অপরজনকে প্রদান না করে। আল্লাহ তা‘আলার হক হল একমাত্র তাঁর ইবাদত করা আর বান্দার হকের মধ্যে নাবীর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর হক হল তাঁকে নাবী হিসেবে গ্রহণ করত তাঁর নির্দেশ পালন করা এবং নিষেধ থেকে বিরত থাকা এবং তিনি ইবাদত করার যে পথ ও রীতি দিয়ে গেছেন সে পথ ও রীতিতে ইবাদত করা। সুতরাং নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করতে গিয়ে যেন ইলাহের মর্যাদায় পৌঁছে না দেই সে দিকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে।



(أَنْ تَحْبَطَ أَعْمَالُكُمْ وَأَنْتُمْ لَا تَشْعُرُوْنَ)



‘এমন করলে তোমাদের আমল বরবাদ হয়ে যাবে আর তোমরা টেরও পাবে না’ অর্থাৎ নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সামনে উঁচ আওয়াজে কথা বলা থেকে নিষেধের কারণ হল, তাঁর সাথে এমন বেআদবীমূলক আচরণ করার কারণে হয়তো তিনি নারাজ হবেন ফলে আল্লাহ তা‘আলাও নারাজ হয়ে তোমাদের আমল বাতিল করে দিবেন কিন্তু তোমরা তা বুঝতেও পারবে না।

অতঃপর সেসব লোকেদের প্রশংসা করছেন যারা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট আওয়াজকে নিচু করে। ‎আল্লাহ তা‘আলা‎ তাদের অন্তরকে তাকওয়ার জন্য পরীক্ষা করে নিয়েছেন। তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহা প্রতিদান।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :



১. দীনের ব্যাপারে কোন ব্যক্তির জন্য বৈধ নয় কুরআন ও সুন্নাহর ওপর নিজের মতকে প্রাধান দেয়া।

২. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে কথাবার্তা বলার শিষ্টাচার জানতে পারলাম।

৩. যেখানে হাদীসের দারস হয় সেখানে উঁচু আওয়াজে কথা বলা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সামনে উঁচু আওয়াজে কথা বলার নামান্তর।

৪. দীনে বিদ‘আত সৃষ্টি করা আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলের অগ্রগামী হওয়ার শামিল।

৫. আলেম-উলামা ও ধর্মীয় নেতাদের সম্মান করতে হবে তবে সম্মান করতে গিয়ে যেন বাড়াবাড়ি না হয় সেদিকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১-৩ নং আয়াতের তাফসীর:

এই আয়াতসমূহে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মুমিন বান্দাদেরকে তাঁর নবী। (সঃ)-এর ব্যাপারে আদব শিক্ষা দিচ্ছেন যে, নবী (সঃ)-এর মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য রাখা তাদের একান্ত কর্তব্য। সমস্ত কাজ-কর্মে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর পিছনে থাকা তাদের উচিত। তাদের উচিত আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য করা।

রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন হযরত মু'আয (রাঃ)-কে ইয়ামনে প্রেরণ করেন তখন তাঁকে প্রশ্ন করেনঃ “তুমি কিসের মাধ্যমে ফায়সালা করবে?` উত্তরে তিনি বলেনঃ “আল্লাহর কিতাবের মাধ্যমে। আবার তিনি প্রশ্ন করেনঃ “যদি আল্লাহর কিতাবে পাও?` জবাবে তিনি বলেনঃ “তাহলে সুন্নাতে রাসূল (সঃ)-এর মাধ্যমে ফায়সালা করবে।” পুনরায় তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “যদি তাতেও না পাও?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “তাহলে আমি চিন্তা-গবেষণা করবে এবং ওরই মাধ্যমে ফায়সালা করবে।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার বুকে হাত মেরে বললেনঃ “আল্লাহর জন্যেই সমস্ত প্রশংসা যিনি তাঁর রাসূল (সঃ)-এর দূতকে এমন বিষয়ের তাওফীক দিয়েছেন যাতে তাঁর রাসূল (সঃ) সন্তুষ্ট। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) এখানে এ হাদীসটি আনয়নের উদ্দেশ্য আমাদের এই যে, হযরত মুআয (রাঃ) স্বীয় ইজতিহাদকে কিতাবুল্লাহ ও সুন্নাতে রাসূলিল্লাহ (সঃ)-এর পরে স্থান দিয়েছেন। সুতরাং স্বীয় মতকে কিতাব ও সুন্নাতের আগে স্থান দেয়াই হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আগে বেড়ে যাওয়া।

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, একথার ভাবার্থ হচ্ছেঃ “কিতাব ও সুন্নাতের বিপরীত কথা তোমরা বলো না।' হযরত আওফী (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কথার উপর কথা বলো না।' হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ “কোন বিষয় সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে পর্যন্ত কোন কিছু না বলেন সেই পর্যন্ত তোমরাও কিছুই বলে না, বরং নীরবতা অবলম্বন করো।' হযরত যহহাক (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছেঃ ‘আমরে দ্বীন ও আহকামে শরয়ীর ব্যাপারে তোমরা আল্লাহর কালাম ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর হাদীস ছাড়া অন্য কিছু দ্বারা ফায়সালা করো না।' হযরত সুফিয়ান সাওরী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ “তোমরা কোন কথায় ও কাজে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর অগ্রণী হয়ো না।' হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলোঃ “তোমরা ইমামের পূর্বে দু'আ করো না।

এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ তোমরা আল্লাহকে ভয় কর’ অর্থাৎ আল্লাহর হুকুম প্রতিপালনের ব্যাপারে মনে আল্লাহর ভয় রাখো। ‘আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ, অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদের কথা শুনে থাকেন এবং তোমাদের ইচ্ছা ও উদ্দেশ্যের খবর তিনি রাখেন।

এরপর আল্লাহ তা'আলা তার মুমিন বান্দাদেরকে আর একটি আদব বা দ্রতা শিক্ষা দিচ্ছেন যে, তারা যেন নবী (সঃ)-এর কণ্ঠস্বরের উপর নিজেদের কণ্ঠস্বর উঁচু না করে। এ আয়াতটি হযরত আবু বকর (রাঃ) ও হযরত উমার (রাঃ)-এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়।

হযরত আবূ মুলাইকা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল যে, দুই মহান ব্যক্তি অর্থাৎ হযরত আবূ বকর (রাঃ) ও হযরত উমার (রাঃ) যেন প্রায় ধ্বংসই হয়ে যাবেন, যেহেতু তাঁরা নবী (সঃ)-এর সামনে তাঁদের কণ্ঠস্বর উঁচু করেছিলেন যখন বানী তামীম গোত্রের প্রতিনিধি হাযির হয়েছিলেন। তাদের একজন হযরত হাবিস ইবনে আকরার (রাঃ) প্রতি ইঙ্গিত করেন এবং অপরজন ইঙ্গিত করেন অন্য একজনের প্রতি, বর্ণনাকারী নাফে’ (রাঃ)-এর তাঁর নাম মনে নেই। তখন হযরত আবূ বকর (রাঃ) হযরত উমার (রাঃ)-কে বলেনঃ “আপনি তো সব সময় আমার বিরধিতাই করে থাকেন?” উত্তরে হযরত উমার (রাঃ) হযরত আবু বকর (রাঃ)-কে বলেনঃ “আপনার এটা ভুল ধারণা।` এই ভাবে উভয়ের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয় এবং তাদের কণ্ঠস্বর উঁচু হয়। তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত ইবনে যুবায়ের (রাঃ) বলেনঃ “এরপর হযরত উমার (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (রাঃ)-এর সাথে এতো নিম্নস্বরে কথা বলতেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে দ্বিতীয়বার তাকে জিজ্ঞেস করতে হতো।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত আবু বকর (রাঃ) বলছিলেনঃ “হযরত কাকা ইবনে মা'বাদ (রাঃ)-কে আমীর নিযুক্ত করুন। আর হযরত উমার (রাঃ) বলছিলেনঃ হযরত আকরা ইবনে হাবিস (রাঃ)-কে আমীর বানানো হোক।” এই মতভেদের কারণে উভয়ের মধ্যে কিছু উচ্চবাচ্য হয় এবং তাঁদের কণ্ঠস্বর উঁচু হয়। (আরবী) তখন পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটিও ইমাম বুখারী (রঃ) স্বীয় ‘সহিহ’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন) যখন (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন হযরত আবু বকর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এখন হতে আমি আপনার সাথে এমনভাবে কথা বলবে যেমনভাবে কেউ কানে কানে কথা বলে।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত সাবিত ইবনে কায়েস (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মজলিসে কয়েক দিন পর্যন্ত দেখা যায়নি। একটি লোক বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনাকে আমি তার সম্পর্কে খবর দিবো।” অতঃপর লোকটি হযরত সাবিত ইবনে কায়েস (রাঃ)-এর বাড়ীতে গিয়ে দেখেন যে, তিনি মাথা ঝুঁকানো অবস্থায় বসে আছেন। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “আচ্ছা বলুন তো আপনার অবস্থা কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “আমার অবস্থা খুব খারাপ। আমি নবী (সঃ)-এর কণ্ঠস্বরের উপর নিজের কণ্ঠস্বর উঁচু করতাম। আমার আমল বিনষ্ট হয়ে গেছে এবং আমি জাহান্নামী হয়ে গেছি।” লোকটি তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গিয়ে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলেন। তখন ঐ লোকটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখ হতে এক অতি বড় সুসংবাদ নিয়ে দ্বিতীয়বার হযরত সাবিত ইবনে কায়েস (রাঃ)-এর নিকট গমন করলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) লোকটিকে বলেছিলেন, তুমি সাবিত ইবনে কায়েস (রাঃ)-এর কাছে গিয়ে বললাঃ “আপনি জাহান্নামী নন, বরং জান্নাতী।` (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) স্বীয় সহীহ' গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)

হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন হতে পর্যন্ত আয়াত অবতীর্ণ হয়, আর হযরত সাবিত ইবনে কায়েস ইবনে শামাস (রাঃ) ছিলেন উচ্চ কণ্ঠস্বর বিশিষ্ট লোক, সুতরাং তিনি তখন বলেনঃ “আমি আমার কণ্ঠস্বর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর উঁচু করতাম, কাজেই আমি জাহান্নামী হয়ে গেছি এবং আমার আমল নিষ্ফল হয়ে গেছে। তাই তিনি চিন্তিত অবস্থায় বাড়ীতেই বসে পড়েন এবং নবী (সঃ)-এর মজলিসে উঠাবসা ছেড়ে দেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর খোঁজ নিলে কওমের কোন একজন লোক তার কাছে গিয়ে তাকে বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) আপনাকে তার মজলিসে না পেয়ে আপনার খোঁজ নিয়েছেন। তখন তিনি বলেনঃ “আমি আমার কণ্ঠস্বর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কণ্ঠস্বরের উপর উঁচু করেছি। সুতরাং আমি জাহান্নামী হয়ে গেছি এবং আমার কর্ম নিষ্ফল হয়ে গেছে।” লোকটি তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে এ খবর দেন। তখন নবী (সঃ) বলেনঃ “না, বরং সে জান্নাতী।” হযরত আনাস (রাঃ) বলেনঃ “অতঃপর আমরা হযরত সাবিত ইবনে কায়েস (রাঃ)-কে জীবিত অবস্থায় চলাফেরা করতে দেখতাম এবং জানতাম যে, তিনি জান্নাতবাসী। অতঃপর ইয়ামামার যুদ্ধে যখন অমরা কিছুটা ভগ্নোৎসাহ হয়ে পড়ি তখন আমরা দেখি যে, হযরত সাবিত ইবনে কায়েস (রাঃ) সুগন্ধময় কাফন পরিহিত হয়ে শত্রুদের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন এবং বলতে রয়েছেনঃ “হে মুসলিমবৃন্দ! তোমরা তোমাদের পরবর্তীদের জন্যে মন্দ নমুনা ছেড়ে যেয়ো না।” এ কথা বলে তিনি শত্রুদের মধ্যে ঢুকে পড়েন এবং বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে শহীদ হয়ে যান (আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন)। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)

সহীহ মুসলিমে রয়েছে, হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) বলেন যে, (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত সা'দ ইবনে মু'আয (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আবূ আমর (রাঃ)! সাবিত (রাঃ)-এর খবর কি? সে কি অসুস্থ?” হযরত সা'দ (রাঃ) জবাবে বলেনঃ “হযরত সাবিত (রাঃ) আমার প্রতিবেশী। কিন্তু তিনি যে অসুস্থ এটা তো আমার জানা নেই।” অতঃপর হযরত সা’দ হযরত সাবিত (রাঃ)-এর নিকট গমন করে তাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কথা শুনিয়ে দেন। তখন হযরত সাবিত (রাঃ) তাঁকে বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা এ আয়াত নাযিল করেছেন, আর আপনারা তো জানেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কণ্ঠস্বরের উপর আপনাদের সবারই চেয়ে আমার কণ্ঠস্বর বেশী উঁচু। সুতরাং আমি তো জাহান্নামী হয়ে গেছি।” হযরত সা'দ (রাঃ) তখন নবী (সঃ)-কে হযরত সাবিত (রাঃ)-এর একথা শুনিয়ে দেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “না, বরং সে জান্নাতী।`

অন্যান্য রিওয়াইয়াতে হযরত সা'দ (রাঃ)-এর নাম উল্লেখ করা হয়নি। এর দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, এ রিওয়াইয়াতটি মুআল্লাল এবং এটাই সঠিক কথাও বটে। কেননা, হযরত সা'দ (রাঃ) ঐ সময় জীবিতই ছিলেন না। বানু কুরাইযার যুদ্ধের অল্প কিছুদিন পরেই তিনি ইন্তেকাল করেন। আর বানু কুরাইযার যুদ্ধ হয়েছিল হিজরী পঞ্চম সনে এবং এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় বানু তামীম গোত্রের প্রতিনিধির আগমনের সময়। আর ওটা হিজরী নবম সনের ঘটনা। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।

ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, যখন (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন হযরত সাবিত ইবনে কায়েস (রাঃ) রাস্তার উপর বসে পড়েন এবং কাঁদতে শুরু করেন।

এমতাবস্থায় বানু আজলান গোত্রের হযরত আসিম ইবনে আদ্দী (রাঃ) তাঁর পার্শ্ব দিয়ে গমন করেন এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনি কাঁদছেন কেন?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ায় আমি ভয় করছি যে, এটা হয়তো আমার ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়েছে। কেননা, আমার কণ্ঠস্বর খুব উঁচু।” তাঁর একথা শুনে হযরত আসিম ইবনে আদ্দী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গমন করেন, আর এদিকে হযরত সাবিত (রাঃ) কান্নায় একেবারে ভেঙ্গে পড়েন। তিনি বাড়ী গিয়ে তার স্ত্রী জামীলা বিনতু আবদিল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালকে বলেনঃ “আমি এখন বিছানার ঘরে (অর্থাৎ শয়ন কক্ষে) প্রবেশ করছি। তুমি বাহির হতে দরযা বন্ধ করে পেরেক মেরে দাও। অতঃপর তিনি বললেনঃ “আমি ঘর হতে বের হবো না। যে পর্যন্ত না আল্লাহ আমার মৃত্যু ঘটাবেন অথবা রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন। এদিকে তার এই অবস্থা হয়েছে। আর ওদিকে হযরত আসিম (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তার খবর দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন হযরত আসিম (রাঃ)-কে বলেনঃ “তুমি তার কাছে গিয়ে তাকে আমার কাছে ডেকে নিয়ে এসো।` হযরত আসিম (রাঃ) ঐ স্থানে গিয়ে তাঁকে না পেয়ে তার বাড়ী এবং তাঁকে তাঁর শয়নকক্ষে ঐ অবস্থায় পান। তাঁকে তিনি বলেনঃ “চলুন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আপনাকে ডাকছেন।” তখন তিনি হযরত আসিম (রাঃ)-কে বলেনঃ “পেরেক ভেঙ্গে ফেলুন।” অতঃপর তারা দু'জন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত সাবিত (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে সাবিত (রাঃ)! তুমি কাঁদছিলে কেন?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “আমার কণ্ঠস্বর উচ্চ এবং আমি ভয় করছি যে, এ আয়াতটি আমার ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়েছে। তাই আমার কান্না এসেছিল।” রাসললাহ (সঃ) তখন তাকে বলেনঃ “তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, তুমি প্রশংসিত অবস্থায় জীবন যাপন করবে, শহীদ রূপে মৃত্যুবরণ করবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করবে?” হযরত সাবিত (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর এই সুসংবাদ পেয়ে আমি খুবই খুশী হয়েছি এবং এর পরে আমি আর কখনো রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কণ্ঠস্বরের উপর আমার কণ্ঠস্বরকে উঁচু করবে না।” তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। এই ঘটনাটি এভাবে কয়েকজন তাবেয়ী হতেও বর্ণিত আছে। মোটকথা, আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূল (সঃ)-এর সামনে কণ্ঠস্বর উঁচু করতে নিষেধ করেছেন।

আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) মসজিদে নববী (সঃ)-এর মধ্যে দুইজন লোককে উচ্চস্বরে কথা বলতে শুনে তথায় গিয়ে তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা কোথায় রয়েছে তা কি জান?” অতঃপর তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমরা কোথাকার অধিবাসী?` উত্তরে তারা বললোঃ “আমরা তায়েফের অধিবাসী।” তখন তিনি তাদেরকে বলেনঃ “যদি তোমরা মদীনার অধিবাসী হতে তবে আমি তোমাদেরকে কঠিন শাস্তি দিতাম।”

উলামায়ে কিরামের উক্তি এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কবরের পার্শ্বেও উচ্চস্বরে কথা বলা মাকরূহ। যেমন তার জীবদ্দশায় তাঁর সামনে উচ্চস্বরে কথা বলা মাকরূহ ছিল। কেননা, তিনি যেমন জীবদ্দশায় সম্মানের পাত্র ছিলেন তেমনি সব সময় তিনি কবরেও সম্মানের পাত্র হিসেবেই থাকবেন।

এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ “হে মুমিনগণ! তোমরা তোমাদের নিজেদের মধ্যে যেভাবে উচ্চস্বরে কথা বলে থাকো, নবী (সঃ)-এর সাথে সেভাবে উচ্চস্বরে কথা বলো না, বরং তার সাথে অতি সম্মান ও আদবের সাথে কথা বলতে হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ (হে মুসলমানগণ!) তোমরা রাসূল (সঃ)-কে এমনভাবে ডাকবে না। যেমনভাবে তোমরা একে অপরকে ডেকে থাকো।''(২৪:৬৩)

এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ তোমাদেরকে নবী (সঃ)-এর কণ্ঠস্বরের উপর তোমাদের কণ্ঠস্বরকে উঁচু করতে নিষেধ করার কারণ এই যে, হয়তো এর কারণে কোন সময় নবী (সঃ) তোমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হবেন এবং এর ফলে তোমাদের অজ্ঞাতসারে তোমাদের কর্ম নিষ্ফল হয়ে যাবে। যেমন সহীহ হাদীসে আছে যে, মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টির এমন কোন কথা মুখেই উচ্চারণ করে যা তার। কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু ওটা আল্লাহ তা'আলার নিকট এতই পছন্দনীয় হয় যে, এ কারণে তিনি তাকে জান্নাতবাসী করে দেন। পক্ষান্তরে মানুষ আল্লাহর অসন্তুষ্টির এমন কোন কথা উচ্চারণ করে যা তার কাছে তেমন খারাপ কথা নয়, কিন্তু ওরই কারণে আল্লাহ তাকে জাহান্নামী করে দেন এবং তাকে জাহান্নামের এতো নিম্নস্তরে নামিয়ে দেন যে, ঐ গর্তটি আসমান ও যমীন হতেও গভীরতম।

অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্বর নীচু করার প্রতি উৎসাহিত করতে গিয়ে বলেনঃ যারা রাসূল (সঃ)-এর সামনে নিজেদের কণ্ঠস্বর নীচু করে আল্লাহ তাদের অন্তরকে তাকওয়ার জন্যে পরিশোধিত করেছেন। তাদের জন্যে রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।

ইমাম আহমাদ (রঃ) কিতাবুয যুহদের মধ্যে একটি রিওয়াইয়াত বর্ণনা করেছেন যে, হযরত উমার (রাঃ)-এর নিকট লিখিতভাবে ফতওয়া জিজ্ঞেস করা হয়ঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! এক ঐ ব্যক্তি যার অবাধ্যতামূলক কার্যকলাপের প্রবৃত্তি ও বাসনাই নেই এবং সে কোন অবাধ্যতামূলক কার্য করেও না এবং আর এক ব্যক্তি, যার অবাধ্যতামূলক কার্যকলাপের প্রবৃত্তি ও বাসনা রয়েছে, কিন্তু এসব অবাধ্যতামূলক কার্যকলাপ হতে সে দূরে থাকে, এদের দু'জনের মধ্যে কে বেশী উত্তম?` উত্তরে হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “যার অবাধ্যতামূলক কার্যকলাপের প্রবৃত্তি রয়েছে, তথাপি সে এসব কার্যকলাপ হতে বেঁচে থাকে সেই বেশী উত্তম। এ ধরনের লোক সম্পর্কেই আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আল্লাহ তাদের অন্তরকে তাকওয়ার জন্যে পরিশোধিত করেছেন। তাদের জন্যে রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।`





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।