সূরা আল-ফাতহ (আয়াত: 24)
হরকত ছাড়া:
وهو الذي كف أيديهم عنكم وأيديكم عنهم ببطن مكة من بعد أن أظفركم عليهم وكان الله بما تعملون بصيرا ﴿٢٤﴾
হরকত সহ:
وَ هُوَ الَّذِیْ کَفَّ اَیْدِیَهُمْ عَنْکُمْ وَ اَیْدِیَکُمْ عَنْهُمْ بِبَطْنِ مَکَّۃَ مِنْۢ بَعْدِ اَنْ اَظْفَرَکُمْ عَلَیْهِمْ ؕ وَ کَانَ اللّٰهُ بِمَا تَعْمَلُوْنَ بَصِیْرًا ﴿۲۴﴾
উচ্চারণ: ওয়াহুওয়াল্লাযী কাফফা আইদিয়াহুম ‘আনকুম ওয়াআইদিয়াকুম ‘আনহুম ব্বিাতনি মাক্কাতা মিম বা‘দি আন আজফারাকুম ‘আলাইহিম ওয়া কা-নাল্লা-হু বিমা-তা‘মালূনা বাসীরা-।
আল বায়ান: আর তিনিই মক্কা উপত্যকায় তোমাদেরকে তাদের উপর বিজয়ী করার পর তাদের হাত তোমাদের থেকে এবং তোমাদের হাত তাদের থেকে ফিরায়ে রেখেছেন। আর তোমরা যা আমল কর, আল্লাহ হলেন তার সম্যক দ্রষ্টা।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২৪. আর তিনি মক্কা উপত্যকায় তাদের হাত তোমাদের থেকে এবং তোমাদের হাত তাদের থেকে নিবারিত করেছেন তাদের উপর তোমাদেরকে বিজয়ী করার পর(১), আর তোমরা যা কিছু করা আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা।
তাইসীরুল ক্বুরআন: মক্কা উপত্যকায় তিনিই তাদের হাত তোমাদের থেকে আর তোমাদের হাত তাদের থেকে বিরত রেখেছিলেন তোমাদেরকে তাদের উপর বিজয়ী করার পর। তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ তা দেখেন।
আহসানুল বায়ান: (২৪) তিনি মক্কা উপত্যকায় তাদের হাত তোমাদের হতে এবং তোমাদের হাত তাদের হতে নিবারিত করেছেন তাদের উপর তোমাদেরকে বিজয়ী করবার পর।[1] আর তোমরা যা কিছু কর, আল্লাহ তা দেখেন।
মুজিবুর রহমান: তিনি মাক্কা উপত্যকায় তাদের হাত তোমাদের হতে এবং তোমাদের হাত তাদের হতে নিবারিত করেছেন তাদের উপর তোমাদেরকে বিজয়ী করার পর। তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ তা দেখেন।
ফযলুর রহমান: তাদের ওপর তোমাদেরকে বিজয়ী করার পর তিনিই মক্কার অভ্যন্তরে তাদের হাত তোমাদের থেকে এবং তোমাদের হাত তাদের থেকে নিবৃত্ত রেখেছেন। তোমরা যা কিছু করো আল্লাহ তা দেখতে পান।
মুহিউদ্দিন খান: তিনি মক্কা শহরে তাদের হাত তোমাদের থেকে এবং তোমাদের হাত তাদের থেকে নিবারিত করেছেন তাদের উপর তোমাদেরকে বিজয়ী করার পর। তোমরা যা কিছু কর, আল্লাহ তা দেখেন।
জহুরুল হক: আর তিনিই সেইজন যিনি মক্কা উপত্যকায় তাদের হাতগুলো তোমাদের থেকে আর তোমাদের হাতগুলো তাদের থেকে ঠেকিয়ে রেখেছিলেন, তাদের উপরে তিনি তোমাদের বিজয় দান করার পরে। আর তোমরা যা করছ আল্লাহ্ সে-সবের সম্যক দ্রষ্টা।
Sahih International: And it is He who withheld their hands from you and your hands from them within [the area of] Makkah after He caused you to overcome them. And ever is Allah of what you do, Seeing.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ২৪. আর তিনি মক্কা উপত্যকায় তাদের হাত তোমাদের থেকে এবং তোমাদের হাত তাদের থেকে নিবারিত করেছেন তাদের উপর তোমাদেরকে বিজয়ী করার পর(১), আর তোমরা যা কিছু করা আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা।
তাফসীর:
(১) হাদীসে এসেছে, একবার মক্কার আশি জন কাফের রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে অতর্কিতে হত্যা করার ইচ্ছা নিয়ে তানয়ীম পাহাড় থেকে নীচে অবতরন করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে জীবিত গ্রেফতার করেন এবং মুক্তিপণ ব্যতিরেকেই মুক্ত করে দেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সুরা ফাতহের এ আয়াত অবতীর্ণ হয়ঃ (وَهُوَ الَّذِي كَفَّ أَيْدِيَهُمْ عَنْكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ عَنْهُمْ بِبَطْنِ مَكَّةَ) [মুসলিমঃ ১৮০৮]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (২৪) তিনি মক্কা উপত্যকায় তাদের হাত তোমাদের হতে এবং তোমাদের হাত তাদের হতে নিবারিত করেছেন তাদের উপর তোমাদেরকে বিজয়ী করবার পর।[1] আর তোমরা যা কিছু কর, আল্লাহ তা দেখেন।
তাফসীর:
[1] যখন নবী করীম (সাঃ) এবং সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) হুদাইবিয়াতে ছিলেন, তখন কাফেররা ৮০ জনের একটি সশস্ত্র বাহিনীকে এই উদ্দেশ্য প্রেরণ করে যে, যদি তারা কোন সুযোগ পেয়ে যায়, তবে অতর্কিতে নবী করীম (সাঃ) এবং সাহাবা (রাঃ)গণের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। সুতরাং এই সশস্ত্র বাহিনী তানঈম পাহাড়ের নিকট দিয়ে হুদাইবিয়ায় উপস্থিত হল। এ দিকে মুসলিমরাও তাদের এই দুরভিসন্ধির কথা জানতে পারলেন এবং তাঁরা সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে তাদের সবাইকে বন্দী করে নবী করীম (সাঃ)-এর সামনে উপস্থিত করলেন। তাদের অপরাধ ছিল বড় কঠিন। যে শাস্তিই তাদেরকে দেওয়া হত, তা সঠিক হত। কিন্তু এতে আশঙ্কা এটাই ছিল যে, এতে যুদ্ধ অনিবার্যভাবে বেধে যেত। অথচ নবী (সাঃ) এ সময় যুদ্ধের পরিবর্তে সন্ধি চাচ্ছিলেন। কেননা, এতেই ছিল মুসলিমদের জন্য কল্যাণ। তাই তিনি তাদের সবাইকে ক্ষমা করে মুক্ত করে দিলেন। (সহীহ মুসলিমঃ জিহাদ অধ্যায়) بطن مكة হল হুদাইবিয়া। অর্থাৎ, হুদাইবিয়ায় আমি তোমাদেরকে কাফেরদের সাথে এবং কাফেরদেরকে তোমাদের সাথে লড়াই করা থেকে বিরত রাখি। এই কথাটা মহান আল্লাহ অনুগ্রহ হিসাবে উল্লেখ করেছেন।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ২০-২৪ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
হুদায়বিয়ার পরের বছর ৭ম হিজরীতে সংঘটিত খায়বারের যুদ্ধ ও তার গনীমতের ব্যাপারে এখানে আলোচনা করা হয়েছে।
(وَعَدَكُمُ اللّٰهُ مَغَانِمَ كَثِيْرَةً)
‘আল্লাহ তোমাদেরকে বিপুল পরিমাণ গনীমতের মাল দেয়ার ওয়াদা করছেন’ মুজাহিদ (রহঃ) বলেন : আজ পর্যন্ত মুসলিমরা যত গনীমত পেয়েছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত যত গনীমত পাবে সব এতে শামিল। (ইবনু কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)
(فَعَجَّلَ لَكُمْ هَذِهِ)
‘এটা তিনি তোমাদের জন্য তরান্বিত করেছেন’ অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা খায়বার বিজয় করে দিয়ে নগদ তার গনীমতগুলো দিলেন।
(وَكَفَّ أَيْدِيَ النَّاسِ عَنْكُمْ)
‘আর তিনি মানুষের হাত তোমাদের (ওপর প্রসারিত করা) থেকে বিরত রেখেছেন’ অর্থাৎ তোমাদেরকে শত্র“দের অনিষ্ট থেকে হিফাযত করেছেন। যে অনিষ্ট করার জন্য তারা মনে মনে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার পরিকল্পনা করেছিল। এরা হল উআইনা বিন হিচন আল ফাযারী, আউফ বিন মালেক ও তাদের সাথে আরও যারা খায়বারের ইয়াহূদীদের সাহায্য করার জন্য এসেছিল। কিন্তু আল্লাহ তাদের অন্তরে ভয় সৃষ্টি করে দেন ফলে তারা তাদেরকে সহযোগিতা করেনি।
(وَلِتَكُوْنَ اٰيَةً لِّلْمُؤْمِنِيْنَ)
‘যাতে মু’মিনদের জন্য এটা নিদর্শন হয়ে থাকে’ অর্থাৎ খায়বারের গনীমতের মাল প্রদান করলেন মু’মিনদের জন্য একটি নিদর্শনস্বরূপ যে, আল্লাহ তা‘আলা যে সংবাদ দেন তা সত্য, তিনি যে প্রতিশ্রুতি দেন তা সত্য এবং প্রতিদান দেবেন তাও সত্য।
(وَأُخْرٰي لَمْ تَقْدِرُوا عَلَيْهَا)
‘এ ছাড়া আরও গনীমতের মাল (তোমাদের দেয়ার ওয়াদা তিনি করেছেন), যা এখনো তোমরা লাভ করতে পারনি’ অর্থাৎ আরও গনীমতের প্রতিশ্রুতি আল্লাহ তা‘আলা দিয়েছেন যা সে সময় তোমরা অর্জন করতে সক্ষম হওনি, কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা তা তোমাদের আয়ত্তে এনে দিয়েছেন। তা আল্লাহ তা‘আলার কর্তৃতাধীন। আল্লাহ ওয়াদা দিয়েছেন তা তোমাদের হস্তগত করে দেবেন। অতএব অবশ্যই তোমরা তা পাবে। এটা কোন গনীমত তা নিয়ে মতভেদ বিদ্যমান।
ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন : তা হল খায়বার। কাতাদাহ বলেন : তা হল মক্কা বিজয়, হাসান বাসরী (রহঃ) বলেন : তা হল ফারেস ও রোম বিজয়। ইবনু জারীর এ মত পছন্দ করেছেন।
মুজাহিদ (রহঃ) বলেন : কিয়ামত পর্যন্ত যত বিজয় ও গনীমত পাওয়া যাবে তার সবই এতে শামিল। (ইবনু কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)
এটা আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে মু’মিনদের জন্য একটি সুসংবাদ যে, তিনি মু’মিনদেরকে তাদের শত্র“দের বিরুদ্ধে সহযোগিতা করবেন। কাফিররা মুসলিমদের বিরুদ্ধে মোকাবেলা ও যুদ্ধ করতে আসলে যুদ্ধে টিকে থাকতে পারবে না বরং মুসলিমদের শক্তি ও সাহস দেখে পেছনে পলায়ন করবে। সুতরাং মুসলিমদেরকে কাফিরদের শক্তি ও সংখ্যা দেখে ভয় করার কিছুই নেই। মুসলিমরা যদি সাহাবীদের মত ঈমানের শক্তিতে বলিয়ান হয় এবং দুনিয়ার ওপর পরকালকে প্রাধান্য দেয় তাহলে আল্লাহর এ কথার সত্যতা সাহাবীরা যেমন দেখেছেন বর্তমান মুসলিমরাও দেখতে পাবে।
بطن مكة - ‘বাতনে মাক্কা’ বলতে হুদায়বিয়া নামক স্থানকে বুঝানো হয়েছে।
(وَهُوَ الَّذِيْ كَفَّ أَيْدِيَهُمْ عَنْكُمْ)
শানে নুযুল :
আনাস (রাঃ) বলেন : মক্কার ৮০ জনের মত লোক তানইমের পাহাড় হতে নাবী ও সাহাবীদের ওপর হামলা করার জন্য অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত অবস্থায় আগমন করে। আমরা তাদের সহজেই ধরে ফেললাম এবং আমরা লজ্জাবোধ করলাম তখন এ আয়াত নাযিল হয়। (সহীহ মুসলিম হা. ১৮০৮)
মুসনাদ আহমাদের বর্ণনায় এসেছে- আব্দুল্লাহ বিন মুগাফফাল বলেন : আমরা হুদায়বিয়ায় নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে সে গাছের নিচে ছিলাম যে গাছের কথা কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। একদা ত্রিশজন যুবক অস্ত্রসজ্জিত হয়ে আমাদের ওপর আক্রমণ চালালে রাসূলুল্লাহ তাদের ওপর বদ দু‘আ করলেন ফলে আল্লাহ তাদের চক্ষু ছিনিয়ে নিলেন। আল্লাহর রাসূল তাদেরকে বললেন : তোমরা কি কারো ওয়াদা করে এসেছ অথবা তোমাদেরকে কি কেউ নিরাপত্তা দিয়েছে? তারা বলল : না, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের ছেড়ে দিলেন। তখন এ আয়াত নাযিল হয়। (মুসনাদ আহমাদ হা. ১৬৮০০, সহীহ)
অতএব আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদের ওপর তাঁর অনুগ্রহের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলছেন যে, তিনি তোমাদেরকে মক্কার কাফিরদের হাত থেকে রক্ষা করেছেন এবং তারাও তোমাদের আয়ত্তে আসার পরেও রক্ষা পেয়ে গেছে। এরা ছিল মক্কার সেই মুশরিকরা যারা হুদায়বিয়ার দিন মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য বের হয়েছিল, মুসলিমরা তাদেরকে ধরে ফেলেছিল কিন্তু ছেড়ে দিয়েছে, যুদ্ধ করেনি, তারা আনুমানিক ৮০ জনের মত। (তাফসীর মুয়াসসার পৃঃ ৫১৪)
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. আল্লাহ তা‘আলার প্রতিশ্রুতি সত্যে পরিণত হয়েছিল রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জীবদ্দশায় ও তার ইনতেকালের পরেও।
২. মু’মিনদের ওপর আল্লাহ তা‘আলার অনুগ্রহ।
৩. আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদেরকে শত্র“দের বিরুদ্ধে সাহায্য করেন।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ২০-২৪ নং আয়াতের তাফসীর:
যুদ্ধে লভ্য বিপুল সম্পদ দ্বারা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর যুগের এবং পরবর্তী সব যুগেরই গানীমাতকে বুঝানো হয়েছে। ত্বরান্বিতকৃত গানীমাত দ্বারা খায়বারের গানীমাত এবং হোদায়বিয়ার সন্ধি উদ্দেশ্য। আল্লাহ্ তা'আলার এটাও একটি অনুগ্রহ যে, তিনি কাফিরদের মন্দ বাসনা পূর্ণ হতে দেননি, না তিনি মক্কার কাফিরদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করেছেন এবং না তিনি ঐ মুনাফিকদের মনের বাসনা পূর্ণ করেছেন যারা মুসলমানদের সাথে যুদ্ধে গমন না করে বাড়ীতেই রয়ে গিয়েছিল। তারা মুসলমানদের উপর না আক্রমণ চালাতে পেরেছে, না তাদের। সন্তানদেরকে শাসন-গর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। এটা এ জন্যে যে, একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলাই যে প্রকৃত রক্ষক ও সাহায্যকারী এ শিক্ষা যেন মুসলমানরা গ্রহণ করতে পারে। সুতরাং তারা যেন শত্ৰু সংখ্যার আধিক্য ও নিজেদের সংখ্যার স্বল্পতা দেখে সাহস হারিয়ে না ফেলে। তারা যেন এ বিশ্বাসও রাখে যে, প্রত্যেক কাজের পরিণাম আল্লাহ পাক অবগত রয়েছেন। বান্দাদের জন্যে এটাই উত্তম পন্থা যে, তারা আল্লাহ্ তা'আলার নির্দেশ অনুযায়ী আমল করবে এবং এতেই যে তাদের জন্যে মঙ্গল রয়েছে এ বিশ্বাস রাখবে। যদিও আল্লাহর ঐ নির্দেশ বাহ্যিক দৃষ্টিতে স্বভাব-বিরুদ্ধরূপে পরিলক্ষিত হয়। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হতে পারে যে, তোমরা যা অপছন্দ কর ওটাই তোমাদের জন্যে মঙ্গলজনক।” (২:২১৬)
মহান আল্লাহর উক্তি ও ‘আল্লাহ তোমাদেরকে পরিচালিত করেন সরল পথে। অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলা স্বীয় বান্দাদেরকে তাদের আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্যের কারণে সরল-সঠিক পথে পরিচালিত করেন এবং গানীমাত ও বিজয় ইত্যাদিও দান করেন, যা তাদের সাধ্যের বাইরে। কিন্তু আল্লাহ্ তাআলার ক্ষমতার বাইরে কিছুই নেই। তিনি স্বীয় মুমিন বান্দাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তাদের জন্যে কঠিন সহজ করে দিবেন। তাই তিনি বলেনঃ আরো বহু সম্পদ আছে যা এখনো তোমাদের অধিকারে আসেনি, ওটা তো আল্লাহর নিকট রক্ষিত আছে। আল্লাহ্ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান। তিনি তার মুমিন বান্দাদেরকে এমন জায়গা হতে রূযী দান করে থাকেন যা তারা ধারণাও করতে পারে না।
এই গানীমাত দ্বারা খায়বারের গানীমাতকে বুঝানো হয়েছে যার ওয়াদা হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় করা হয়েছিল। অথবা এর দ্বারা মক্কা বিজয় বা পারস্য ও রোমের সম্পদকে বুঝানো হয়েছে। কিংবা এর দ্বারা ঐ সমুদয় বিজয়কে বুঝানো হয়েছে যেগুলো কিয়ামত পর্যন্ত মুসলমানরা লাভ করতে থাকবে।
এরপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা শুভসংবাদ শুনাচ্ছেন যে, তাদের কাফিরদেরকে ভয় করা ঠিক নয়। কেননা, তারা যদি তাদের সাথে মুকাবিলা করতে আসে তবে পরিণামে তারা অবশ্যই পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে, তখন তারা কোন অভিভাবক ও সাহায্যকারী পাবে না। কারণ, এটা হবে তাদের আল্লাহ্ ও তার রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধে লড়াই। সুতরাং তারা যে পরাজিত হবে এতে সন্দেহের কোন অবকাশ থাকতে পারে কি?
অতঃপর প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ্ বলেনঃ আল্লাহর বিধান ও নীতি এটাই যে, যখন কাফির ও মুমিনদের মধ্যে মুকাবিলা হয় তখন তিনি মুমিনদেরকে কাফিরদের উপর জয়যুক্ত করে থাকেন এবং সত্যকে প্রকাশ করেন ও মিথ্যাকে দাবিয়ে দেন। যেমন বদরের যুদ্ধে তিনি মুমিনদেরকে কাফিরদের উপর জয়যুক্ত করেন। অথচ কাফিরদের সংখ্যাও ছিল মুমিনদের সংখ্যার কয়েকগুণ বেশী এবং তাদের যুদ্ধাস্ত্রও ছিল বহুগুণে অধিক।
এরপর মহান আল্লাহ্ বলেন:তোমরা আল্লাহ্ তা'আলার এই অনুগ্রহের কথাও ভুলে যেয়ো না যে, তিনি মক্কা উপত্যকায় মুশরিকদের হস্ত তোমাদের হতে নিবারিত করেন এবং তোমাদের হস্ত তাদের হতে নিবারিত করেন তাদের উপর তোমাদেরকে বিজয়ী করবার পর। অর্থাৎ তিনি মুশরিকদের হাত তোমাদের পর্যন্ত পৌঁছতে দেননি, তারা তোমাদেরকে আক্রমণ করেনি। আবার তোমাদেরকেও তিনি মসজিদে হারামের পার্শ্বে যুদ্ধ করা হতে ফিরিয়ে রাখেন এবং তোমাদের ও তাদের মধ্যে সন্ধি করিয়ে দেন। এটা তোমাদের জন্যে দুনিয়া ও আখিরাত উভয় দিক দিয়েই উত্তম। এই সূরারই তাফসীরে হযরত সালমা ইবনে আকওয়া (রাঃ) বর্ণিত যে হাদীসটি গত হয়েছে তা স্মরণ থাকতে পারে যে, যখন সত্তর জন কাফিরকে বেঁধে সাহাবীগণ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সামনে পেশ করেন তখন তিনি বলেনঃ “এদেরকে ছেড়ে দাও। মন্দের সূচনা এদের দ্বারাই হয়েছে এবং এর পুনরাবৃত্তিও এদের দ্বারাই হবে।” এ ব্যাপারেই (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হুদায়বিয়ার সন্ধির দিন মক্কার আশিজন কাফির সুযোগ পেয়ে অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত অবস্থায় তানঈম পাহাড়ের দিক হতে নেমে আসে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) অসতর্ক ছিলেন না। তিনি তৎক্ষণাৎ সাহাবীদেরকে (রাঃ) খবর দেন। সুতরাং তাদের সকলকেই গ্রেফতার করে নিয়ে আসা হয় এবং রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সামনে পেশ করা হয়। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) দয়া করে তাদের সবকেই ছেড়ে দেন। এরই বর্ণনা এই আয়াতে রয়েছে। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ)-ও এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন)
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মুগাফফাল আল মুযানী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি। বলেনঃ “যে গাছটির কথা কুরআন কারীমের মধ্যে বর্ণিত হয়েছে ঐ গাছটির নীচে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) অবস্থান করছিলেন। আমরাও তাঁর চতুম্পার্শ্বে ছিলাম। ঐ গাছটির শাখাগুলো রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর কোমর পর্যন্ত লটকে ছিল। তার সামনে হযরত আলী (রাঃ) বিদ্যমান ছিলেন এবং সুহাইল ইবনে আমরও তাঁর সামনে ছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত আলী (রাঃ)-কে বলেনঃ “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ লিখো। এ কথা শুনে সুহাইল রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর হাত ধরে নেয় এবং বলেঃ “রহমান ও রাহীমকে আমরা চিনি না। আমাদের এই সন্ধিপত্রটি আমাদের দেশপ্রথা অনুযায়ী লিখিয়ে নিন।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তখন হযরত আলী (রাঃ)-কে বলেনঃ (আরবী) “লিখো।” তারপর লিখলেনঃ “এটা ঐ জিনিস যার উপর আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ (সঃ) মক্কাবাসীর সাথে সন্ধি করেছেন।” এ কথায় সুহাইল পুনরায় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাত ধরে নেয় এবং বলেঃ “আপনি যদি আল্লাহর রাসূল (সঃ)-ই হন তাহলে তো আমরা আপনার উপর যুলুম করেছি। এই সন্ধি নামায় ঐ কথাই লিখিয়ে নিন। যা আমাদের মধ্যে প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে।” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত আলী (রাঃ)-কে বললেনঃ “লিখো, এটা ঐ জিনিস যার উপর মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ্ (সঃ) মক্কাবাসীর সাথে সন্ধি করেছেন। ইতিমধ্যে অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত ত্রিশজন কাফির যুবক এসে পড়ে। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদের বিরুদ্ধে বদ দু'আ করেন। আল্লাহ্ তাদেরকে বধির করে দেন। সাহাবীগণ (রাঃ) উঠে তখন তাদেরকে পাকড়াও করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদেরকে কেউ কি নিরাপত্তা দান করেছে, না তোমরা কারো দায়িত্বের উপর এসেছো?” তারা উত্তরে বলেঃ “না।” এতদসত্ত্বেও নবী (সঃ) তাদেরকে ক্ষমা করে দেন এবং ছেড়ে দেন। তখন আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা .... (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত ইবনে ইযী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) যখন কুরবানীর জন্তু সঙ্গে নিয়ে চললেন এবং যুলহুলাইফা নামক স্থান পর্যন্ত পৌছে গেলেন তখন হযরত উমার (রাঃ) আরয করলেনঃ “হে আল্লাহর নবী (সঃ)! আপনি এমন এক কওমের পল্লীতে যাচ্ছেন যাদের বহু যুদ্ধাস্ত্র রয়েছে, আর আপনি এ অবস্থায় যাচ্ছেন যে, আপনার কাছে অস্ত্র-শস্ত্র কিছুই নেই।” হযরত উমার (রাঃ)-এর একথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তোক পাঠিয়ে মদীনা হতে অস্ত্র-শস্ত্র এবং সমস্ত আসবাবপত্র আনিয়ে নিলেন। যখন তিনি মক্কার নিকটবর্তী হলেন তখন মুশরিকরা তাকে বাধা দিলো এবং বললো যে, তিনি যেন মক্কায় না যান। তিনি সফর অব্যাহত রাখলেন এবং মিনায় গিয়ে অবস্থান করলেন। তার গুপ্তচর এসে তাকে খবর দিলেন যে, ইকরামা ইবনে আবু জেহেল পাচশ' সৈন্য নিয়ে তার উপর আক্রমণ করতে আসছে। তিনি তখন হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রাঃ)-কে বলেনঃ “হে খালিদ (রাঃ)! তোমার চাচাতো ভাই সেনাবাহিনী নিয়ে আমাদের উপর হামলা করতে আসছে, এখন কি করবে?” উত্তরে হযরত খালিদ (রাঃ) বলেনঃ “তাতে কি হলো? আমি তো আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর তরবারী?` সেই দিন হতেই তাঁর উপাধি দেয়া হয় সাইফুল্লাহ্ (আল্লাহর তরবারী)। অতঃপর হযরত খালিদ (রাঃ) বলেনঃ “আপনি আমাকে যেখানে ইচ্ছা এবং যার সাথে ইচ্ছা মুকাবিলা করতে পাঠিয়ে দিন।” এরপর হযরত খালিদ (রাঃ) ইকরামা (রাঃ)-এর মুকাবিলায় বেরিয়ে পড়েন। যুদ্ধ ঘাঁটিতে উভয়ের মধ্যে মুকাবিলা হয়। হযরত খালিদ (রাঃ) তাঁকে এমন কঠিনভাবে আক্রমণ করেন যে, তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে টিকতে না পেরে মক্কায় ফিরে যেতে বাধ্য হন। হযরত খালিদ (রাঃ) ইকরামা (রাঃ)-কে মক্কার গলি পর্যন্ত পৌছিয়ে দিয়ে ফিরে আসেন। কিন্তু ইকরামা (রাঃ) পুনরায় নতুনভাবে সজ্জিত হয়ে মুকাবিলায় এগিয়ে আসেন। এবারও তিনি পরাজিত হয়ে মক্কার গলি পর্যন্ত পৌছে যান। ইকরামা (রাঃ) তৃতীয়বার আবার আসেন। এবারও একই অবস্থা হয়। এরই বর্ণনা ...(আরবী)-এই আয়াতে রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সফলতা সত্ত্বেও কাফিরদেরকেও বাঁচিয়ে নেন যাতে মক্কায় অবস্থানরত দুর্বল মুসলমানরা ইসলামী সেনাবাহিনী কর্তৃক আঘাতপ্রাপ্ত না হয়। (ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)
কিন্তু এই রিওয়াইয়াতের ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। এটা হুদায়বিয়ার ঘটনা হওয়া অসম্ভব। কেননা, তখন পর্যন্ত হযরত খালিদ (রাঃ)-ই তো মুসলমান হননি। বরং ঐ সময় তিনি মুশরিকদের সেনাবাহিনীর সেনাপতি ছিলেন, যেমন এটা সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। এও হতে পারে যে, এটা উমরাতুল কাযার ঘটনা। কেননা, হুদায়বিয়ার সন্ধিনামায় এটাও একটা শর্ত ছিল যে, আগামী বছর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উমরা করার উদ্দেশ্যে মক্কায় আসবেন এবং তিন দিন পর্যন্ত তথায় অবস্থান করবেন। সুতরাং এই শর্ত মুতাবেক যখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) মক্কায় আগমন করেন তখন মক্কাবাসী মুশরিকরা তাকে বাধাও দেয়নি এবং তার সাথে যুদ্ধ-বিগ্রহেও লিপ্ত হয়নি।
অনুরূপভাবে এটা মক্কা বিজয়ের ঘটনাও হতে পারে না। কেননা, ঐ বছর রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুরবানীর জন্তু সঙ্গে নিয়ে যাননি। ঐ সময় তো তিনি যুদ্ধের উদ্দেশ্যে গিয়েছিলেন। সুতরাং এই রিওয়াইয়াতে বড়ই গোলমাল রয়েছে। এটা অবশ্যই ত্রুটিমুক্ত নয়। সুতরাং এ ব্যাপারে চিন্তা-গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর গোলাম হযরত ইকরামা (রাঃ) বলেন যে, কুরায়েশরা চল্লিশ বা পঞ্চাশজন লোককে এই উদ্দেশ্যে প্রেরণ করে যে, তারা যেন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সেনাবাহিনীর চতুর্দিকে ঘোরাফেরা করে এবং সুযোগ পেলে যেন তাদের ক্ষতি সাধন করে কিংবা যেন কাউকেও গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। এদের সকলকেই পাকড়াও করা হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) সবকেই ক্ষমা করেন ও ছেড়ে দেন। তারা তার সেনাবাহিনীর উপর কিছু পাথর এবং তীরও নিক্ষেপ করেছিল।
এটাও বর্ণিত আছে যে, ইবনে যানীম (রাঃ) নামক একজন সাহাবী হুদায়বিয়ার একটি ছোট পাহাড়ের উপর আরোহণ করেছিলেন। মুশরিকরা তার প্রতি তীর নিক্ষেপ করে তাঁকে শহীদ করে দেয়। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁর কিছু অশ্বারোহীকে তাদের পশ্চাদ্ধাবনে পাঠিয়ে দেন। তারা তাদের সবকেই গ্রেফতার করে আনেন। তারা ছিল বারো জন অশ্বারোহী। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আমার পক্ষ থেকে তোমাদেরকে কোন নিরাপত্তা দেয়া হয়েছে কি?” তারা উত্তরে বলেঃ “না।” তিনি আবার প্রশ্ন করেনঃ “কোন অঙ্গীকার ও চুক্তি আছে কি?” তারা জবাব দেয়ঃ “না।” কিন্তু এতদসত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে ছেড়ে দেন। এই ব্যাপারেই (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।