সূরা মুহাম্মাদ (আয়াত: 30)
হরকত ছাড়া:
ولو نشاء لأريناكهم فلعرفتهم بسيماهم ولتعرفنهم في لحن القول والله يعلم أعمالكم ﴿٣٠﴾
হরকত সহ:
وَ لَوْ نَشَآءُ لَاَرَیْنٰکَهُمْ فَلَعَرَفْتَهُمْ بِسِیْمٰهُمْ ؕ وَ لَتَعْرِفَنَّهُمْ فِیْ لَحْنِ الْقَوْلِ ؕ وَ اللّٰهُ یَعْلَمُ اَعْمَالَکُمْ ﴿۳۰﴾
উচ্চারণ: ওয়া লাও নাশাউ লাআরাইনা-কাহুম ফালা‘আরাফতাহুম বিছীমা-হুম ওয়া লাতা‘রিফান্নাহুম ফী লাহনিল কাওলি ওয়াল্লা-হু ইয়া‘লামুআ‘মা-লাকুম।
আল বায়ান: আর যদি আমি চাইতাম তবে আমি তোমাকে এদের দেখিয়ে দিতে পারতাম। ফলে লক্ষণ দেখেই তুমি তাদের চিনতে পারতে। তবে তুমি অবশ্যই কথার ভঙ্গিতে তাদের চিনতে পারবে। আল্লাহ তোমাদের আমলসমূহ জানেন।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩০. আর আমরা ইচ্ছে করলে আপনাকে তাদের পরিচয় দিতাম; ফলে আপনি তাদের লক্ষণ দেখে তাদেরকে চিনতে পারতেন। তবে আপনি অবশ্যই কথার ভঙ্গিতে তাদেরকে চিনতে পারবেন। আর আল্লাহ্ তোমাদের যাবতীয় আমল সম্পর্কে জানেন।
তাইসীরুল ক্বুরআন: আমি যদি ইচ্ছে করতাম তাহলে আমি তোমায় ওদেরকে দেখিয়ে দিতাম। তুমি তাদের মুখ দেখে অবশ্যই চিনতে পারবে আর তাদের কথাবার্তার ধরন দেখে তুমি তাদেরকে অবশ্যই অবশ্যই চিনতে পারবে। আল্লাহ তোমাদের ‘আমাল সম্পর্কে ভালভাবেই জানেন।
আহসানুল বায়ান: (৩০) আমি ইচ্ছা করলে তোমাকে তাদেরকে দেখিয়ে দিতাম, ফলে তুমি তাদের লক্ষণ দেখে তাদেরকে চিনতে পারতে,[1] তবে তুমি অবশ্যই কথার ভঙ্গিতে তাদেরকে চিনতে পারবে।[2] আর আল্লাহ তোমাদের কর্ম সম্পর্কে অবগত।
মুজিবুর রহমান: আমি ইচ্ছা করলে তোমাকে তাদের পরিচয় দিতাম। ফলে তুমি তাদের লক্ষণ দেখে তাদেরকে চিনতে পারতে, তুমি অবশ্যই কথার ভঙ্গিতে তাদেরকে চিনতে পারবে। আল্লাহ তোমাদের কাজ সম্পর্কে অবগত।
ফযলুর রহমান: আমি যদি চাইতাম তাহলে তোমাকে অবশ্যই তাদেরকে দেখিয়ে দিতাম। তখন তুমি তাদের চিহ্ন দেখেই তাদেরকে চিনতে পারতে। তবে কথার স্বরে অবশ্যই তুমি তাদেরকে চিনতে পারবে। আল্লাহ তোমাদের কর্মসমূহ অবগত আছেন।
মুহিউদ্দিন খান: আমি ইচ্ছা করলে আপনাকে তাদের সাথে পরিচিত করে দিতাম। তখন আপনি তাদের চেহারা দেখে তাদেরকে চিনতে পারতেন এবং আপনি অবশ্যই কথার ভঙ্গিতে তাদেরকে চিনতে পারবেন। আল্লাহ তোমাদের কর্মসমূহের খবর রাখেন।
জহুরুল হক: আর আমরা যদি চাইতাম তবে আমরা নিশ্চয়ই তোমাকে তাদের দেখাতাম, তখন তুমি আলবৎ তাদের চিনতে পারতে তাদের চেহারার দ্বারা। আর তুমি তো অবশ্যই তাদের চিনতে পারবে তাদের কথার ধরনে। আর আল্লাহ্ জানেন তোমাদের কাজকর্ম।
Sahih International: And if We willed, We could show them to you, and you would know them by their mark; but you will surely know them by the tone of [their] speech. And Allah knows your deeds.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৩০. আর আমরা ইচ্ছে করলে আপনাকে তাদের পরিচয় দিতাম; ফলে আপনি তাদের লক্ষণ দেখে তাদেরকে চিনতে পারতেন। তবে আপনি অবশ্যই কথার ভঙ্গিতে তাদেরকে চিনতে পারবেন। আর আল্লাহ্– তোমাদের যাবতীয় আমল সম্পর্কে জানেন।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৩০) আমি ইচ্ছা করলে তোমাকে তাদেরকে দেখিয়ে দিতাম, ফলে তুমি তাদের লক্ষণ দেখে তাদেরকে চিনতে পারতে,[1] তবে তুমি অবশ্যই কথার ভঙ্গিতে তাদেরকে চিনতে পারবে।[2] আর আল্লাহ তোমাদের কর্ম সম্পর্কে অবগত।
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, এক একজনকে এমনভাবে চিহ্নিত করে দিতাম যে, প্রত্যেক মুনাফিককে প্রকাশ্যে চেনা যেত। কিন্তু সমস্ত মুনাফিকদের জন্য আল্লাহ এ রকম এই জন্য করেননি যে, এটা তাঁর গোপনকারী গুণের বিপরীত। তিনি সাধারণতঃ (মানুষের পাপ-রহস্য) গোপন রাখেন; প্রকাশ করেন না। দ্বিতীয়তঃ তিনি মানুষের বাহ্যিক অবস্থার ভিত্তিতে বিচার করার এবং গোপনীয় ব্যাপারকে আল্লাহর উপর ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
[2] অবশ্য তাদের কথা বলার ধরণ ও বাচনভঙ্গি এমন হয় যে, তা তাদের মনের খবর প্রকাশ করে দেয়। যার দ্বারা পয়গম্বর তো তাদেরকে অবশ্যই চিনতে পারেন। এটা সাধারণতঃ দেখা যায় যে, মানুষের অন্তরে যা কিছু হয়, সেটাকে সে যতই গোপন করার চেষ্টা করুক না কেন, তার কথার ঢঙ, হাবভাব, ভাবভঙ্গি, গতিবিধি এবং কোন কোন বিশেষ অবস্থা তার অন্তরের গোপন রহস্যকে উদঘাটন করে দেয়।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ২৯-৩১ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
أَضْغَانَهُمْ শব্দটি ضغن এর বহুবচন। যার অর্থ হিংসা ও বিদ্বেষ। মুনাফিকরা নিজেদেরকে মুসলিম দাবী করত এবং বাহ্যতঃ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি ভালবাসা প্রকাশ করত, কিন্তু অন্তরে শত্র“তা ও বিদ্বেষ পোষণ করত। আলোচ্য আয়াতে তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, তারা আল্লাহ তা‘আলাকে আলিমুল গায়িব জানা সত্ত্বেও এ ব্যাপারে এমন নিশ্চিত যে, আল্লাহ তা‘আলা তাদের অন্তরের গোপন ভেদ ও বিদ্বেষ মানুষের সামনে প্রকাশ করে দেবেন না। বরং তাদের অন্তরে ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে হিংসা-বিদ্বেষ ছিল আল্লাহ তা‘আলা তা প্রকাশ করে দেবেন, সে কথাই এখানে বলা হয়েছে।
(فَلَعَرَفْتَهُمْ بِسِيمَاهُمْ)
‘যাতে তুমি তাদের চেহারা দেখেই চিনে নিতে পার’ অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা ইচ্ছা করলে কারা কারা মুনাফিক তিনি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে তা দেখিয়ে দিতেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদেরকে তাদের বাহ্যিক আলামত ও কথাবার্তা দ্বারা চিনতে পারতেন।
আল্লাহ তা‘আলা তা করেননি; কারণ তিনি মানুষের বাহ্যিক অবস্থার ভিত্তিতে বিচার করেন এবং গোপনীয় বিষয়গুলো নিজের দিকে ফিরিয়ে নেন।
(وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ حَتّٰي نَعْلَمَ الْمُجَاهِدِينَ)
‘আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব’ এ আয়াতের অনুরূপ তাফসীর সূরা বাকারার ২১৪, তাওবার ১১, আনকাবূতের ২-৩ আয়াতে এবং আলি ইমরানে গত হয়েছে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ২৯-৩১ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তাআলা বলেনঃ মুনাফিকদের ধারণা এই যে, আল্লাহ পাক তাদের অভিসন্ধি, ষড়যন্ত্র এবং প্রতারণার কথা মুসলমানদের নিকট প্রকাশ করবেন না। কিন্তু তাদের ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। আল্লাহ তাআলা তাদের ষড়যন্ত্র ও প্রতারণা এমনভাবে প্রকাশ করবেন যে, প্রত্যেক জ্ঞানী ব্যক্তি ওগুলো জানতে পারবে এবং তাদের অভ্যন্তরীণ দুক্রিয়া হতে তারা বেঁচে থাকবে। তাদের বহু কিছু অবস্থার কথা সূরায়ে বারাআতে বর্ণিত হয়েছে এবং সেখানে তাদের কপটতাপূর্ণ বহু অভ্যাসের উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি এই সূরার অপর নাম ফাযেহা' বা অপমানকারী রেখে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ এটা হলো মুনাফিকদেরকে অপমানকারী সূরা ।
(আরবী) শব্দটি (আরবী) শব্দের বহুবচন। (আরবী) বলা হয় হিংসা ও শক্রতাকে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমি ইচ্ছা করলে তোমাকে (নবী সঃ-কে) তাদের (মুনাফিকদের) পরিচয় দিতাম। তখন তুমি খোলাখুলিভাবে তাদেরকে জেনে নিতে। কিন্তু আমি এরূপ করিনি। সমস্ত মুনাফিকের পরিচয় আমি প্রদান করিনি, যাতে মাখলুকের উপর তাদের পর্দা পড়ে থাকে। মানুষের কাছে যেন তাদের দোষ ঢাকা থাকে। প্রত্যেকের নিকট যেন তারা লাঞ্ছিত রূপে ধরা না পড়ে। ইসলামী বিষয়গুলো বাহ্যিকতার উপরই বিচার্য। আভ্যন্তরীণ বিষয়ের হিসাব রয়েছে মহান আল্লাহর কাছে। তিনি প্রকাশ্য ও গোপনীয় সবকিছুই জানেন। তবে মুনাফিকদেরকে তাদের কথা বলার ধরন দেখে চেনা যাবে।
আমীরুল মুমিনীন হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি মনের মধ্যে কোন কিছু গোপন রাখে, আল্লাহ তা'আলা তার মুখমণ্ডলে ও কথায় তা প্রকাশ করে দেন। অর্থাৎ তার চেহারায় ও কথাবার্তায় তা প্রকাশ পেয়ে যায়।”
হাদীসে এসেছেঃ “যে ব্যক্তি কোন রহস্য গোপন রাখে, আল্লাহ তা'আলা তা প্রকাশ করে দেন, ভাল হলে ভাল এবং মন্দ হলে মন্দ।” মানুষের কাজে, কথায় ও বিশ্বাসে যে কপটতা প্রকাশ পায় তা আমরা সহীহ বুখারীর শরাহর প্রারম্ভে পূর্ণভাবে বর্ণনা করেছি। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন। হাদীসে মুনাফিকদের একটি দলকে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। হযরত উকবা ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদের মধ্যে ভাষণ দান করেন। আল্লাহ তাআলার হামদ ও সানার পর তিনি বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে কতক লোক মুনাফিক রয়েছে। আমি যাদের নাম নিবো তারা যেন দাঁড়িয়ে যায়।” অতঃপর তিনি বলেনঃ “হে অমুক ব্যক্তি! তুমি দাঁড়াও, হে অমুক লোক! তুমি দাঁড়িয়ে যাও।” শেষ পর্যন্ত তিনি ছত্রিশটি লোকের নাম নিলেন। তারপর বললেনঃ “তোমাদের মধ্যে অথবা তোমাদের মধ্য হতে কতক মুনাফিক রয়েছে, সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর।” এরপরে এই লোকদের মধ্যে একজনের সামনে দিয়ে হযরত উমার (রাঃ) গমন করেন। ঐ সময় লোকটি কাপড় দিয়ে তার মুখ ঢেকে রেখেছিল। হযরত উমার (রাঃ) লোকটিকে খুব ভালরূপে চিনতেন। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “ব্যাপার কি?” উত্তরে সে উপরোক্ত হাদীসটি বর্ণনা করলো। তখন হযরত উমার (রাঃ) তাকে বললেনঃ “সারা দিন তোমার জন্যে দুর্ভোগ (অর্থাৎ তুমি ধ্বংস হও)।` (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)
এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ আমি হুকুম আহকাম দিয়ে বাধা-বিঘ্ন সৃষ্টি করে তোমাদেরকে পূর্ণরূপে পরীক্ষা করবো এবং এভাবে জেনে নিবো যে, তোমাদের মধ্যে আল্লাহর পথে জিহাদকারী কারা এবং ধৈর্যশীল কারা? আমি তোমাদের অবস্থা পরীক্ষা করতে চাই।
সমস্ত মুসলমান তো এটা জানে যে, অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা আল্লাহ প্রত্যেক জিনিস এবং প্রত্যেক মানুষ ও তার আমল প্রকাশিত হবার পূর্বেই ওগুলো সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল। তাহলে এখানে তিনি জেনে নিবেন’ এর ভাবার্থ হলোঃ তিনি তা দুনিয়ার সামনে খুলে দিবেন এবং ঐ অবস্থা দেখবেন ও দেখাবেন। এজন্যেই হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এরূপ স্থলে -এর অর্থ করতেন অর্থাৎ যাতে আমি দেখে নিই।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।