সূরা মুহাম্মাদ (আয়াত: 16)
হরকত ছাড়া:
ومنهم من يستمع إليك حتى إذا خرجوا من عندك قالوا للذين أوتوا العلم ماذا قال آنفا أولئك الذين طبع الله على قلوبهم واتبعوا أهواءهم ﴿١٦﴾
হরকত সহ:
وَ مِنْهُمْ مَّنْ یَّسْتَمِعُ اِلَیْکَ ۚ حَتّٰۤی اِذَا خَرَجُوْا مِنْ عِنْدِکَ قَالُوْا لِلَّذِیْنَ اُوْتُوا الْعِلْمَ مَاذَا قَالَ اٰنِفًا ۟ اُولٰٓئِکَ الَّذِیْنَ طَبَعَ اللّٰهُ عَلٰی قُلُوْبِهِمْ وَ اتَّبَعُوْۤا اَهْوَآءَهُمْ ﴿۱۶﴾
উচ্চারণ: ওয়া মিনহুম মাইঁ ইয়াছতামি‘উ ইলাইকা হাত্তা-ইযাখারাজূমিন ‘ইনদিকা কা-লূ লিল্লাযীনা ঊতুল ‘ইল মা মা-যা কা-লা আ-নিফান উলাইকাল্লাযীনা তাবা‘আল্লাহু ‘আলা-কুলূবিহিম ওয়াত্তাবা‘ঊআহওয়াআহুম।
আল বায়ান: আর তাদের মধ্যে এমন কতক রয়েছে, যারা তোমার প্রতি মনোযোগ দিয়ে শুনে। অবশেষে যখন তারা তোমার কাছ থেকে বের হয়ে যায় তখন তারা যাদের জ্ঞান দান করা হয়েছে তাদের উদ্দেশ্যে বলে, ‘এই মাত্র সে কী বলল?’ এরাই তারা, যাদের অন্তরসমূহে আল্লাহ মোহর মেরে দিয়েছেন এবং তারা নিজদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করেছে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৬. আর তাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক আপনার কথা মনোযোগের সাথে শুনে, অবশেষে আপনার কাছ থেকে বের হয়ে যারা জ্ঞানপ্রাপ্ত তাদেরকে বলে, এ মাত্র সে কী বলল? এরাই তারা, যাদের অন্তরসমূহে আল্লাহ্ মোহর করে দিয়েছেন এবং তারা অনুসরণ করেছে নিজেদের খেয়াল-খুশীর।
তাইসীরুল ক্বুরআন: তাদের মধ্যে কতক লোক তোমার কথা শুনে, অতঃপর যখন তারা তোমার কাছ থেকে বেরিয়ে যায়, তখন যাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছে তাদেরকে বলে- এই মাত্র সে কী বলল? এদের অন্তরে আল্লাহ মোহর মেরে দিয়েছেন আর তারা নিজেদের খেয়ালখুশির অনুসরণ করে।
আহসানুল বায়ান: (১৬) তাদের মধ্যে কতক তোমার কথা মন দিয়ে শোনে, অতঃপর তোমার নিকট হতে বের হয়ে জ্ঞানবানদেরকে বলে, ‘এই মাত্র সে কি বলল?’ [1] ওরাই তারা যাদের অন্তরে আল্লাহ মোহর মেরে দেন এবং তারা নিজেদের খেয়াল-খুশীরই অনুসরণ করে।
মুজিবুর রহমান: তাদের মধ্যে কতক তোমার কথা শ্রবণ করে, অতঃপর তোমার নিকট হতে বের হয়ে যারা জ্ঞানবান তাদেরকে বলেঃ এই মাত্র সে কি বলল? এদের অন্তরের উপর আল্লাহ মোহর মেরে দিয়েছেন এবং তারা নিজেদের খেয়াল খুশীরই অনুসরণ করে।
ফযলুর রহমান: তাদের মধ্যে কেউ কেউ আছে, যারা তোমার কথায় কান পাতে। অতঃপর যখন তোমার কাছ থেকে বের হয় তখন যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে তাদের কাছে বলে, “এইমাত্র উনি কি বললেন?” ওরাই তারা, যাদের অন্তরে আল্লাহ মোহর মেরে দিয়েছেন এবং যারা নিজেদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে।
মুহিউদ্দিন খান: তাদের মধ্যে কতক আপনার দিকে কান পাতে, অতঃপর যখন আপনার কাছ থেকে বাইরে যায়, তখন যারা শিক্ষিত, তাদেরকে বলেঃ এইমাত্র তিনি কি বললেন ? এদের অন্তরে আল্লাহ মোহর মেরে দিয়েছেন এবং তারা নিজেদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে।
জহুরুল হক: আর তাদের মধ্যে কিছু লোক আছে যারা তোমার কথা শোনে, তারপর তারা যখন তোমার কাছ থেকে বেরিয়ে যায় তখন যাদের জ্ঞান দেওয়া হয়েছে তাদের বলে, "সে এইমাত্র কী বললে!" এরাই তারা যাদের হৃদয়ের উপরে আল্লাহ্ মোহর মেরে দিয়েছেন, আর তারা নিজেদের খেয়ালখুশিরই অনুসরণ করে।
Sahih International: And among them, [O Muhammad], are those who listen to you, until when they depart from you, they say to those who were given knowledge, "What has he said just now?" Those are the ones of whom Allah has sealed over their hearts and who have followed their [own] desires.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১৬. আর তাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক আপনার কথা মনোযোগের সাথে শুনে, অবশেষে আপনার কাছ থেকে বের হয়ে যারা জ্ঞানপ্রাপ্ত তাদেরকে বলে, এ মাত্র সে কী বলল? এরাই তারা, যাদের অন্তরসমূহে আল্লাহ্– মোহর করে দিয়েছেন এবং তারা অনুসরণ করেছে নিজেদের খেয়াল-খুশীর।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১৬) তাদের মধ্যে কতক তোমার কথা মন দিয়ে শোনে, অতঃপর তোমার নিকট হতে বের হয়ে জ্ঞানবানদেরকে বলে, ‘এই মাত্র সে কি বলল?” [1] ওরাই তারা যাদের অন্তরে আল্লাহ মোহর মেরে দেন এবং তারা নিজেদের খেয়াল-খুশীরই অনুসরণ করে।
তাফসীর:
[1] এখানে মুনাফিকদের কথা আলোচনা করা হচ্ছে। তাদের নিয়ত যেহেতু ভাল হত না, তাই নবী করীম (সাঃ)-এর কথাগুলোও বুঝতে পারত না। তারা মজলিস থেকে বেরিয়ে এসে সাহাবাদেরকে জিজ্ঞাসা করত যে, তিনি কি বললেন?
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১৪-১৯ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
যারা দীনের ওপর দলীল-প্রমাণসহ প্রতিষ্ঠিত তারা তাদের মত নয় যাদের জন্য শয়তান খারাপ আমলগুলো সুশোভিত করে দিয়েছে। শয়তান যেদিকে ডাকে সেদিকেই সে দৌড়ায়।
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা মু’মিন মুত্তাকীদের জন্য প্রস্তুত করে রাখা জান্নাতের চার প্রকার পানীয় বৈশিষ্ট্যসহ বর্ণনা দিচ্ছেন।
১. জান্নাতে থাকবে নির্মল পানির নদী :
غَيْرِ اٰسِنٍ -অর্থাৎ অপরিবর্তনীয়। তার স্বাদ ও ঘ্রাণে কোন পরিবর্তন আসবে না। বরং নির্মল, সুপেয় ও সুঘ্রাণযুক্ত পানির নদী থাকবে।
২. দুধের নদী :
দুনিয়ার উট, ছাগল, মহিষ ও ভেড়া ইত্যাদির স্তন থেকে দুধ দোহানোর কিছু সময় পর নষ্ট হয়ে যায়। খাওয়ার যোগ্য থাকে না। জান্নাতের দুধের স্বাদ কখনো নষ্ট হবে না।
৩. মদের নদী :
দুনিয়ার মদে ক্ষতিকর উপাদান রয়েছে। বিধায় তা হারাম করে দেয়া হয়েছে। মদ খেলে মানুষের নেশা এসে যায়, মাতাল হয়ে যায় ও জ্ঞানশূন্য হয়ে যায়। কিন্তু জান্নাতের মদে কোন ক্ষতিকর উপাদান থাকবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(لَا فِيْهَا غَوْلٌ وَّلَا هُمْ عَنْهَا يُنْزَفُوْنَ )
“তাতে ক্ষতির উপাদানও থাকবে না এবং তাতে তারা মাতালও হবে না।” (সূরা সফফাত ৩৭ : ৪৭)
আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(لَّا يُصَدَّعُوْنَ عَنْهَا وَلَا يُنْزِفُوْنَ)
“সেই সুরা পানে তাদের মাথা ব্যথা হবে না, তারা জ্ঞানহারাও হবে না।” (সূরা ওয়াকিয়া ৫৬ : ১৯)
৪. মধুর নদী :
যা হবে নির্মল ও স্বচ্ছ। কারণ এ মধু দুনিয়ার মত মৌমাছি থেকে সংগৃহীত হবে না। বরং এর জন্য স্বয়ং একটি নদীই থাকবে।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : যখন তোমরা আল্লাহ তা‘আলার কাছে জান্নাত চাইবে তখন জান্নাতুল ফিরদাউস চাইবে। কেননা তা হল মধ্যবর্তী ও সর্বোচ্চ জান্নাত। সেখান থেকেই জান্নাতের নদীসমূহ প্রবাহিত হয় এবং তার উপরে রয়েছে দয়মায়ের আরশ। ( সহীহ বুখারী হা. ২৭৯০)
জান্নাতে মু’মিনদের নেয়ামতের কথা, তাদের রবের পক্ষ থেকে ক্ষমার কথা আলোচনার পর জাহান্নামীদের আলোচনা করেছেন। জাহান্নামীরা জাহান্নামে জান্নাতীদের বিপরীতে এমন ফুটন্ত পানি পান করবে যার ফলে নাড়ী-ভুঁড়ি ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে।
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা মুনাফিকদের কথা তুলে ধরেছেন। যাদের নিয়ত ভাল না থাকার কারণে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কথাগুলো বুঝতে পারত না। তারা মজলিস থেকে বের হয়ে সাহাবীদেরকে জিজ্ঞাসা করত যে, তিনি কী বললেন? পক্ষান্তরে যারা হিদায়াতপ্রাপ্ত আল্লাহ তা‘আলা তাদের হিদায়াত আরো বৃদ্ধি করে দেন। এ সকল মিথ্যুক মুনাফিকরা চায় হঠাৎ কিয়ামত চলে আসুক, যাতে তারা না বুঝতে পারে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন : কিয়ামতের আলামত তো এসেই গেছে। যেমন নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজেই একটি কিয়ামতের আলামত। কারণ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পর আর কোন নাবী দুনিয়াতে আসবে না।
তারপর আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সত্যিকার মা‘বূদ সম্পর্কে জানার নির্দেশ প্রদান করেছেন। আল্লাহ তা‘আলার এককত্বের পরিচয় জানার অনেক মাধ্যম রয়েছে। তার মধ্যে :
১. আল্লাহ তা‘আলার নাম, গুণাবলী ও কার্যাবলী নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা যে, তাঁর নাম ও সব গুণাবলী পরিপূর্ণ আর তাঁর কাজগুলো হিকমতপূর্ণ।
২. সৃষ্টি ও পরিচালনা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই করেন। তাই তিনিই একমাত্র সকল ইবাদত পাওয়ার হকদার।
৩. বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ সকল নেয়ামত সম্পর্কে জানা ও চিন্তা করা।
তারপর নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নিজের ও মু’মিন নর ও নারীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার নির্দেশ দিচ্ছেন। আগে জ্ঞান অর্জন করতে হবে পরে আমল করতে হবে। তাই ইমাম বুখারী (রহঃ) অধ্যায় বেঁধেছেন : কথা ও কাজের পূর্বে জ্ঞানার্জন আবশ্যক। তারপর তিনি
(فَاعْلَمْ اَنَّه۫ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ)
আয়াতটি নিয়ে এসেছেন।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. প্রমাণসহ সত্যের অনুসারী আর প্রবৃত্তির অনুসারীরা সমান না।
২. মু’মিনদের জন্য জান্নাতের চার প্রকার পানীয়র কথা জানতে পারলাম। অপরপক্ষে জাহান্নামীদের জন্য থাকবে ফুটন্ত গরম পানিও পুঁজ।
৩. আল্লাহ তা‘আলা যার অন্তরে মোহর মেরে দিয়েছেন তার হিদায়াত পাওয়ার কোন পথ নেই।
৪. সর্বপ্রথম জ্ঞানার্জন অতঃপর সাথে সাথে আমল করতে হবে। জ্ঞান অর্জন ছাড়া আমল করলে যেমন পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে তেমনি জ্ঞান অর্জন করার পর আমল না করলে গুনাহ হবে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১৬-১৯ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা'আলা মুনাফিকদের মেধাহীনতা, অজ্ঞতা এবং নির্বুদ্ধিতার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তারা মজলিসে বসে আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর কালাম শ্রবণ করা সত্ত্বেও তারা কিছুই বুঝে না। মজলিস শেষে জ্ঞানী সাহাবীদেরকে (রাঃ) তারা জিজ্ঞেস করেঃ “এই মাত্র তিনি কি বললেন?” মহান আল্লাহ বলেন যে, এরা হচ্ছে ওরাই যাদের অন্তর আল্লাহ মোহর করে দিয়েছেন। এরা নিজেদের কু-প্রবৃত্তির পিছনে পড়ে রয়েছে। এদের সঠিক বোধশক্তি এবং সৎ উদ্দেশ্যই নেই।
মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যারা সৎপথ অবলম্বন করে আল্লাহ তাদের সৎপথে চলার শক্তি বৃদ্ধি করেন এবং তাদেরকে আল্লাহভীরু হবার তাওফীক দান করেন।
আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ কিয়ামতের লক্ষণ তো এসেই পড়েছে। অর্থাৎ কিয়ামত যে নিকটবর্তী হয়ে গেছে এর বহু লক্ষণ প্রকাশিত হয়েছে। যেমন অন্য জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটা প্রথম ভয় প্রদর্শকদের মধ্য হতে একজন ভয় প্রদর্শক এবং নিকটবর্তী হওয়ার ব্যাপারটি নিকটবর্তী হয়েছে।”(৫৩:৫৬) আর এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “কিয়ামত আসন্ন, চন্দ্র বিদীর্ণ হয়েছে।”(৫৪:১) আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহর আদেশ আসবেই, সুতরাং ওটা ত্বরান্বিত করতে চেয়ো না।” (১৬:১) অন্য এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ মানুষের হিসাব নিকাশের সময় আসন্ন, কিন্তু তারা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে রয়েছে।”(২১:১)
সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দুনিয়ায় রাসূলরূপে আগমন হচ্ছে কিয়ামতের নিদর্শনসমূহের মধ্যে একটি নিদর্শন। কেননা, তিনি রাসূলদেরকে সমাপ্তকারী। আল্লাহ তা'আলা তার দ্বারা দ্বীনকে পূর্ণ করেছেন এবং স্বীয় মাখলুকের উপর স্বীয় হুজ্জত পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) কিয়ামতের শর্তগুলো এবং নিদর্শনগুলো এমনভাবে বর্ণনা করে দিয়েছেন যে, তার পূর্বে কোন নবী এতো স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেননি। যেমন স্ব-স্ব স্থানে এগুলো বর্ণিত হয়েছে।
হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আগমন কিয়ামতের শর্তসমূহের অন্তর্ভুক্ত। এ জন্যেই নবী (সঃ)-এর নাম হাদীসে এরূপ এসেছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তিনি তাওবার নবী, (আরবী) অর্থাৎ লোকদেরকে তাঁর পায়ের উপর একত্রিত করা হবে, (আরবী) অর্থাৎ তার পরে আর কোন নবী আসবেন না।
হযরত সাহল ইবনে সা'দ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় মধ্যমা অঙ্গুলি এবং ওর পার্শ্বের অঙ্গুলির প্রতি ইশারা করে বলেনঃ “আমি এবং কিয়ামত এই অঙ্গুলিদ্বয়ের মত (অর্থাৎ এরূপ কাছাকাছি)।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ কিয়ামত এসে পড়লে তারা উপদেশ গ্রহণ করবে কেমন করে! অর্থাৎ কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাওয়ার পর উপদেশ ও শিক্ষাগ্রহণ বৃথা। যেমন আল্লাহ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন মানুষ উপদেশ গ্রহণ করবে, কিন্তু তখন তার জন্যে উপদেশ গ্রহণের সময় কোথায়?” (৮৯:২৩) অর্থাৎ এই দিনের উপদেশ গ্রহণে কোনই লাভ নেই। আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা ঐ সময় বলবেঃ আমরা এই কুরআনের উপর ঈমান আনলাম, কিন্তু এই দূরবর্তী স্থান হতে এই ক্ষমতা লাভ কি করে হতে পারে?” (৩৪:৫২) অর্থাৎ ঐ সময় তাদের ঈমান আনয়ন লাভজনক নয়।
এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি জেনে রেখো যে, আল্লাহ তাআলাই সত্য মা’রূদ। তিনি ছাড়া কোনই মাবুদ নেই। একথা দ্বারা আল্লাহ তা'আলা প্রকৃতপক্ষে স্বীয় একত্ববাদের সংবাদ দিয়েছেন। এর অর্থ এটা নয় যে, আল্লাহ পাক স্বীয় নবী (সঃ)-কে এটা জানার নির্দেশ দিচ্ছেন। এ জন্যেই এর উপর সংযোগ স্থাপন করে বলেনঃ “তুমি তোমার ও মুমিন নর-নারীদের ত্রুটির জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কর।' সহীহ হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমার পাপ, আমার অজ্ঞতা, আমার কাজে আমার সীমালংঘন বা বাড়াবাড়ি, প্রত্যেক ঐ জিনিস যা আপনি আমার চেয়ে বেশী জানেন, এগুলো আপনি ক্ষমা করে দিন! হে আল্লাহ! আপনি আমার অনিচ্ছাকৃত পাপ, ইচ্ছাকৃত পাপ, আমার দোষ-ত্রুটি এবং আমার কামনা-বাসনা ক্ষমা করে দিন! এগুলো সবই আমার মধ্যে রয়েছে।”
সহীহ হাদীসে আরো রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নামায শেষে বলতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমি যেসব গুনাহ পূর্বে করেছি, পরে করেছি, গোপনে করেছি, প্রকাশ্যে করেছি, যা কিছু বাড়াবাড়ি করেছি এবং যা আপনি আমার চেয়ে বেশী জানেন, সবই মাফ করে দিন! আপনিই আমার মা’রূদ, আপনি ছাড়া কোন মা'বুদ নেই।”
অন্য সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে জনমণ্ডলী! তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই আমি আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রত্যহ সত্তর বারেরও বেশী তাওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকি।”
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সারভাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি (একদা) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করি এবং তার সাথে তার খাদ্য হতে ভক্ষণ করি। তারপর আমি বলিঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন! তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তোমাকেও মাফ করুন।” আমি বললামঃ আমি কি আপনার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবো? তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যা, এবং তোমার নিজের জন্যেও করবে।” অতঃপর তিনি (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করলেন। তারপর আমি তার ডান ও বাম স্কন্ধের প্রতি লক্ষ্য করলাম, তখন দেখি যে, একটা জায়গা একটু উঁচু হয়ে রয়েছে, যেন ওটা তিল বা আঁচিল।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ)-এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা (আরবী) পাঠকে নিজেদের জন্যে অবধারিত করে নাও এবং এ দু'টিকে খুব বেশী বেশী পাঠ করো। কেননা ইবলীস বলেঃ “আমি জনগণকে পাপের দ্বারা ধ্বংস করেছি এবং তারা আমাকে এ দু'টি কালেমা দ্বারা ধ্বংস করেছে। আমি যখন এটা দেখলাম তখন তাদেরকে কু-প্রবৃত্তির পিছনে লাগিয়ে দিলাম। সুতরাং তারা তখন মনে করে যে, তারা হিদায়াতের উপর রয়েছে।” (এ হাদীসটি আবূ ইয়ালা (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
অন্য একটি আসারে আছে যে, শয়তান বলেঃ “হে আল্লাহ! আপনার সম্মান ও মর্যাদার শপথ! যতক্ষণ পর্যন্ত কারো দেহে তার আত্মা থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমি তাকে বিভ্রান্ত করতে থাকবো।” তখন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আমিও আমার ইযযত ও জালালের শপথ করে বলছি যে, যতক্ষণ পর্যন্ত সে আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমি তাকে ক্ষমা করতে থকিবো।” ফযীলত সম্বলিত আরো বহু হাদীস রয়েছে।
আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ “আল্লাহ তোমাদের গতিবিধি এবং অবস্থান সম্বন্ধে সম্যক অবগত আছেন। যেমন অন্য আয়াতে আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ তিনিই যিনি রাত্রে তোমাদের মৃত্যু ঘটিয়ে দেন এবং দিনে তোমরা যা কিছু কর তা তিনি জানেন।”(৬:৬০) অন্য এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ভূ-পৃষ্ঠে বিচরণকারী সবারই জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহরই; তিনি ওদের স্থায়ী ও অস্থায়ী অবস্থিতি সম্বন্ধে অবহিত; সুস্পষ্ট কিতাবে সবকিছুই আছে।”(১১:৬) ইবনে জুরায়েজ (রঃ)-এর উক্তি এটাই এবং ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর দ্বারা দুনিয়ার গতিবিধি এবং আখিরাতের অবস্থানকে বুঝানো হয়েছে।
সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলো আল্লাহ তা'আলা দুনিয়ায় তোমাদের গতিবিধি এবং কবরে তোমাদের অবস্থান সম্বন্ধে সম্যক অবগত আছেন। তবে প্রথম উক্তিটিই বেশী উত্তম ও প্রকাশমান। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।