আল কুরআন


সূরা মুহাম্মাদ (আয়াত: 15)

সূরা মুহাম্মাদ (আয়াত: 15)



হরকত ছাড়া:

مثل الجنة التي وعد المتقون فيها أنهار من ماء غير آسن وأنهار من لبن لم يتغير طعمه وأنهار من خمر لذة للشاربين وأنهار من عسل مصفى ولهم فيها من كل الثمرات ومغفرة من ربهم كمن هو خالد في النار وسقوا ماء حميما فقطع أمعاءهم ﴿١٥﴾




হরকত সহ:

مَثَلُ الْجَنَّۃِ الَّتِیْ وُعِدَ الْمُتَّقُوْنَ ؕ فِیْهَاۤ اَنْهٰرٌ مِّنْ مَّآءٍ غَیْرِ اٰسِنٍ ۚ وَ اَنْهٰرٌ مِّنْ لَّبَنٍ لَّمْ یَتَغَیَّرْ طَعْمُهٗ ۚ وَ اَنْهٰرٌ مِّنْ خَمْرٍ لَّذَّۃٍ لِّلشّٰرِبِیْنَ ۬ۚ وَ اَنْهٰرٌ مِّنْ عَسَلٍ مُّصَفًّی ؕ وَ لَهُمْ فِیْهَا مِنْ کُلِّ الثَّمَرٰتِ وَ مَغْفِرَۃٌ مِّنْ رَّبِّهِمْ ؕ کَمَنْ هُوَ خَالِدٌ فِی النَّارِ وَ سُقُوْا مَآءً حَمِیْمًا فَقَطَّعَ اَمْعَآءَهُمْ ﴿۱۵﴾




উচ্চারণ: মাছালুল জান্নাতিল্লাতী উ‘ইদাল মুত্তাকূনা ফীহাআনহা-রুম মিম্মাইন গাইরি আ-ছিনিও ওয়া আন হা-রুম মিল্লাবানিল লাম ইয়াতাগাইইয়ার তা‘মুহূ ওয়া আন হা-রুম মিন খামরিল লাযযাতিল লিশশা-রিবীনা ওয়া আন হা-রুম মিন ‘আছালিম মুসাফফাওঁ ওয়ালাহুম ফীহা-মিন কুলিছছামারা-তি ওয়া মাগফিরাতুমমির রাব্বিহিম কামান হুওয়া খা-লিদুন ফিন্না-রি ওয়া ছুকূমাআন হামীমান ফাকাত্তা‘আ আম‘আআহুম।




আল বায়ান: মুত্তাকীদেরকে যে জান্নাতের ওয়াদা দেয়া হয়েছে তার দৃষ্টান্ত হল, তাতে রয়েছে নির্মল পানির নহরসমূহ, দুধের ঝর্নাধারা, যার স্বাদ পরিবর্তিত হয়নি, পানকারীদের জন্য সুস্বাদু সুরার নহরসমূহ এবং আছে পরিশোধিত মধুর ঝর্নাধারা। তথায় তাদের জন্য থাকবে সব ধরনের ফলমূল আর তাদের রবের পক্ষ থেকে ক্ষমা। তারা কি তাদের ন্যায়, যারা জাহান্নামে স্থায়ী হবে এবং তাদেরকে ফুটন্ত পানি পান করানো হবে ফলে তা তাদের নাড়িভুঁড়ি ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দেবে?




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৫. মুত্তাকীদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে তার দৃষ্টান্ত: তাতে আছে নির্মল পানির নহরসমূহ, আছে দুধের নহরসমূহ যার স্বাদ অপরিবর্তনীয়, আছে পানকারীদের জন্য সুস্বাদু সুরার নহরসমূহ, আছে পরিশোধিত মধুর নহরসমূহ(১) এবং সেখানে তাদের জন্য থাকবে প্রত্যেক প্রকারের ফলমূল। আর তাদের রবের পক্ষ থেকে ক্ষমা। তারা (মুত্তাকীরা) কি তাদের ন্যায় যারা জাহান্নামে স্থায়ী হবে এবং যাদেরকে পান করানো হবে ফুটন্ত পানি ফলে তা নাড়ীভুঁড়ি ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দিবে?




তাইসীরুল ক্বুরআন: মুত্তাক্বীদেরকে যে জান্নাতের ও‘য়াদা দেয়া হয়েছে তার উপমা হলঃ তাতে আছে নির্মল পানির ঝর্ণা, আর আছে দুধের নদী যার স্বাদ অপরিবর্তণীয়, আছে পানকারীদের জন্য সুস্বাদু মদের নদী আর পরিশোধিত মধুর নদী। তাদের জন্য সেখানে আছে সব রকম ফলমূল আর তাদের প্রতিপালকের নিকট হতে ক্ষমা। (এরা কি) তাদের মত যারা চিরকাল থাকবে জাহান্নামে যাদেরকে পান করতে দেয়া হবে গরম পানীয় যা তাদের নাড়িভুঁড়ি ছিন্ন ভিন্ন করে ফেলবে?




আহসানুল বায়ান: (১৫) সাবধানীদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তার দৃষ্টান্ত হলঃ ওতে আছে নির্মল পানির নদীমালা,[1] আছে দুধের নদীমালা যার স্বাদ অপরিবর্তনীয়,[2] আছে পানকারীদের জন্য সুস্বাদু সুরার নদীমালা,[3] আছে পরিশোধিত মধুর নদীমালা।[4] আর সেখানে তাদের জন্য আছে বিবিধ ফল-মূল ও তাদের প্রতিপালকের ক্ষমা। সাবধানীরা কি তাদের মত, যারা জাহান্নামে স্থায়ী হবে এবং যাদেরকে পান করতে দেওয়া হবে ফুটন্ত পানি; যা তাদের নাড়ী-ভুঁড়ি ছিন্ন-ভিন্ন করে দেবে? [5]



মুজিবুর রহমান: মুত্তাকীদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে তার দৃষ্টান্তঃ ওতে আছে নির্মল পানির নহর; আছে দুধের নহর যার স্বাদ অপরিবর্তনীয়, আছে পানকারীদের জন্য সুস্বাদু সুরার নহর এবং পরিশোধিত মধুর নহর। সেখানে তাদের জন্য থাকবে বিবিধ ফলসমূহ ও তাদের রবের ক্ষমা। মুত্তাকীরা কি তাদের ন্যায় যারা জাহান্নামে স্থায়ী হবে এবং যাদেরকে পান করতে দেয়া হবে ফুটন্ত পানি যা তাদের নাড়িভুড়ি ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে দিবে?



ফযলুর রহমান: মোত্তাকীদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তার বর্ণনা: তাতে আছে বিশুদ্ধ পানির নহর, স্বাদ পরিবর্তন হয়নি এমন দুধের নহর, পানকারীদের জন্য সুস্বাদু শরাবের নহর ও পরিশোধিত মধুর নহর। সেখানে তাদের জন্য আরো আছে সবরকমের ফলমূল ও তাদের প্রভুর ক্ষমা। (এই মোত্তাকীরা কি) তাদের মত, যারা চিরকাল জাহান্নামে থাকবে এবং যাদেরকে ফুটন্ত পানি পান করতে দেওয়া হবে, যা তাদের নাড়ীভুঁড়ি ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দেবে?



মুহিউদ্দিন খান: পরহেযগারদেরকে যে জান্নাতের ওয়াদা দেয়া হয়েছে, তার অবস্থা নিম্নরূপঃ তাতে আছে পানির নহর, নির্মল দুধের নহর যারা স্বাদ অপরিবর্তনীয়, পানকারীদের জন্যে সুস্বাদু শরাবের নহর এবং পরিশোধিত মধুর নহর। তথায় তাদের জন্যে আছে রকমারি ফল-মূল ও তাদের পালনকর্তার ক্ষমা। পরহেযগাররা কি তাদের সমান, যারা জাহান্নামে অনন্তকাল থাকবে এবং যাদেরকে পান করতে দেয়া হবে ফুটন্ত পানি অতঃপর তা তাদের নাড়িভূঁড়ি ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে দেবে?



জহুরুল হক: ধর্মভীরুদের জন্য যে জান্নাতের ওয়াদা করা হয়েছে তার উপমা হচ্ছে -- তাতে রয়েছে ঝরনারাজি এমন পানির যা পরিবর্তিত হয় না, আর দুধের নদীসমূহ যার স্বাদ বদলায় না, আর সুরার স্রোত যা পানকারীদের জন্য সুস্বাদু, আর ছাঁকা মধুর নদীগুলো। আর তাদের জন্য সে-সবে রয়েছে সব রকমের ফলফসল, আর তাদের প্রভুর কাছ থেকে রয়েছে পরিত্রাণ। তার মতো যে আগুনের মধ্যে অবস্থানকারী, অথবা যাদের পান করানো হবে ফুটন্ত পানি, ফলে তাদের নাড়িভুঁড়ি তা ছিড়ে ফেলবে?



Sahih International: Is the description of Paradise, which the righteous are promised, wherein are rivers of water unaltered, rivers of milk the taste of which never changes, rivers of wine delicious to those who drink, and rivers of purified honey, in which they will have from all [kinds of] fruits and forgiveness from their Lord, like [that of] those who abide eternally in the Fire and are given to drink scalding water that will sever their intestines?



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১৫. মুত্তাকীদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে তার দৃষ্টান্ত: তাতে আছে নির্মল পানির নহরসমূহ, আছে দুধের নহরসমূহ যার স্বাদ অপরিবর্তনীয়, আছে পানকারীদের জন্য সুস্বাদু সুরার নহরসমূহ, আছে পরিশোধিত মধুর নহরসমূহ(১) এবং সেখানে তাদের জন্য থাকবে প্রত্যেক প্রকারের ফলমূল। আর তাদের রবের পক্ষ থেকে ক্ষমা। তারা (মুত্তাকীরা) কি তাদের ন্যায় যারা জাহান্নামে স্থায়ী হবে এবং যাদেরকে পান করানো হবে ফুটন্ত পানি ফলে তা নাড়ীভুঁড়ি ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দিবে?


তাফসীর:

(১) হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, জান্নাতে রয়েছে পানির সাগর, মধুর সাগর, দুধের সাগর এবং মদের সাগর। তারপর সেগুলো থেকে আরো নালাসমূহ প্রবাহিত করা হবে। [তিরমিযী: ২৫৭১]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১৫) সাবধানীদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তার দৃষ্টান্ত হলঃ ওতে আছে নির্মল পানির নদীমালা,[1] আছে দুধের নদীমালা যার স্বাদ অপরিবর্তনীয়,[2] আছে পানকারীদের জন্য সুস্বাদু সুরার নদীমালা,[3] আছে পরিশোধিত মধুর নদীমালা।[4] আর সেখানে তাদের জন্য আছে বিবিধ ফল-মূল ও তাদের প্রতিপালকের ক্ষমা। সাবধানীরা কি তাদের মত, যারা জাহান্নামে স্থায়ী হবে এবং যাদেরকে পান করতে দেওয়া হবে ফুটন্ত পানি; যা তাদের নাড়ী-ভুঁড়ি ছিন্ন-ভিন্ন করে দেবে? [5]


তাফসীর:

[1] آسِنٍ এর অর্থঃ পরিবর্তনীয়। غير آسن এর অর্থঃ অপরিবর্তনীয়। অর্থাৎ, পৃথিবীতে পানি যদি কোন এক স্থানে কিছুক্ষণের জন্য পড়ে থাকে, তবে তার রঙ পরিবর্তন হয়ে যায় এবং তার গন্ধ ও স্বাদে এমন বিকৃতি ঘটে যে, তা সবাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। কিন্তু জান্নাতের পানির এমন বৈশিষ্ট্য হবে যে, তাতে কোন পরিবর্তন ঘটবে না। অর্থাৎ, তার গন্ধ ও স্বাদ অপরিবর্তিত অবস্থায় থাকবে। যখনই পান করবে, তখনই তা টাটকা, তৃপ্তিদায়ক ও স্বাস্থ্যকর হবে। পৃথিবীর পানি যেহেতু খারাপ বা নষ্টযোগ্য, তাই এই পানির ব্যাপারে শরীয়তের বিধান হল, ততক্ষণ পর্যন্ত তা পবিত্র বলে গণ্য হবে, যতক্ষণ না তার রঙ বা গন্ধ পরিবর্তন হবে। কেননা, গন্ধ বা রঙের বিকৃতি ঘটলেই পানি নাপাক হয়ে যায়।

[2] দুনিয়াতে উট, গাই, মহিষ ও ছাগলের স্তন থেকে দোহানো দুধ কিছুকাল পরে খারাপ হয়ে যায়; কিন্তু জান্নাতের দুধ যেহেতু কোন পশুর স্তন থেকে এইভাবে নির্গত হবে না, বরং তার নহর থাকবে, সেহেতু সে দুধ যেমন সুস্বাদু হবে, তেমনি তা খারাপ হওয়া থেকেও সুরক্ষিত থাকবে।

[3] পৃথিবীতে যে সুরা বা মদ পাওয়া যায়, তা সাধারণতঃ অত্যন্ত ঝাঁঝালো, বদ-মজাদার ও দুর্গন্ধময় হয়। এ ছাড়া তা পান করে মানুষ সাধারণতঃ বোধশক্তি হারিয়ে ফেলে, আবোল-তাবোল বকে এবং নিজের দেহের ব্যাপারেও কোন খেয়াল থাকে না। কিন্তু জান্নাতের সুরা দেখতে হবে সুন্দর,স্বাদে হবে অতুলনীয় এবং তা হবে অতীব সুবাসিত। তা পান করে না কোন মানুষ জ্ঞানশূন্য হবে, আর না অস্বস্তি বোধ করবে। বরং এমন তৃপ্তি ও আনন্দ বোধ করবে যে, তা এই দুনিয়াতে কল্পনা করাও সম্ভব নয়। যেমন, মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেছেন, {لا فِيهَا غَوْلٌ وَلا هُمْ عَنْهَا يُنْزَفُونَ} (الصافات:৪৭) ‘‘ওতে ক্ষতিকর কিছুই থাকবে না এবং ওতে তারা নেশাগ্রস্তও হবে না।’’ (আরো দেখুনঃ সূরা ওয়াকিআহ ১৯ আয়াত)

[4] অর্থাৎ, মধুতে সাধারণতঃ যে সব জিনিসের মিশ্রণ ঘটানোর সম্ভাবনা থাকে; যেমন দুনিয়াতে ব্যাপকহারে দেখা যায়, জান্নাতে এ রকম কোন আশঙ্কা থাকবে না। তা একেবারে নির্মল ও স্বচ্ছ হবে। কারণ, এ মধু দুনিয়ার মত মৌমাছি থেকে সংগৃহীত হবে না। বরং তারও খাস নহর হবে। এই জন্য হাদীসে এসেছে, নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, ‘‘যখন তোমরা চাইবে, তখন জান্নাতুল ফিরদাউস চাইবে। কেননা, তা হল মধ্যবর্তী ও সর্বোচ্চ জান্নাত। সেখান থেকেই জান্নাতের নহরগুলো প্রবাহিত হয় এবং তার উপরে রয়েছে পরম দয়াময়ের আরশ।’’ (বুখারী, জিহাদ অধ্যায়)

[5] অর্থাৎ, যে জান্নাতে পূর্বে উল্লিখিত সুউচ্চ মর্যাদা লাভ করবে, সে কি এমন জাহান্নামীদের সমান, যাদের এই অবস্থা হবে? পরিষ্কার কথা যে, এমন হবে না। বরং একজন উন্নত মর্যাদায় থাকবে, আর অপরজন থাকবে জাহান্নামে। একজন জান্নাতের নিয়ামতসমূহে আমোদ-প্রমোদে মেতে থাকবে, আর অপরজন জাহান্নামের শাস্তির কঠিন কষ্ট ভোগ করবে। একজন আল্লাহর অতিথি হবে, যার সম্মানার্থে বিভিন্ন প্রকারের জিনিস প্রস্তুত থাকবে। আর অপরজন আল্লাহর বন্দী হবে, যাকে খেতে দেওয়ার জন্য যাক্কুমের মত তিক্ত ও বদ-মজাদার খাদ্য এবং পান করার জন্য ফুটন্ত পানি দেওয়া হবে।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১৪-১৯ নম্বর আয়াতের তাফসীর :



যারা দীনের ওপর দলীল-প্রমাণসহ প্রতিষ্ঠিত তারা তাদের মত নয় যাদের জন্য শয়তান খারাপ আমলগুলো সুশোভিত করে দিয়েছে। শয়তান যেদিকে ডাকে সেদিকেই সে দৌড়ায়।



অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা মু’মিন মুত্তাকীদের জন্য প্রস্তুত করে রাখা জান্নাতের চার প্রকার পানীয় বৈশিষ্ট্যসহ বর্ণনা দিচ্ছেন।



১. জান্নাতে থাকবে নির্মল পানির নদী :



غَيْرِ اٰسِنٍ -অর্থাৎ অপরিবর্তনীয়। তার স্বাদ ও ঘ্রাণে কোন পরিবর্তন আসবে না। বরং নির্মল, সুপেয় ও সুঘ্রাণযুক্ত পানির নদী থাকবে।



২. দুধের নদী :



দুনিয়ার উট, ছাগল, মহিষ ও ভেড়া ইত্যাদির স্তন থেকে দুধ দোহানোর কিছু সময় পর নষ্ট হয়ে যায়। খাওয়ার যোগ্য থাকে না। জান্নাতের দুধের স্বাদ কখনো নষ্ট হবে না।



৩. মদের নদী :



দুনিয়ার মদে ক্ষতিকর উপাদান রয়েছে। বিধায় তা হারাম করে দেয়া হয়েছে। মদ খেলে মানুষের নেশা এসে যায়, মাতাল হয়ে যায় ও জ্ঞানশূন্য হয়ে যায়। কিন্তু জান্নাতের মদে কোন ক্ষতিকর উপাদান থাকবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :



(لَا فِيْهَا غَوْلٌ وَّلَا هُمْ عَنْهَا يُنْزَفُوْنَ ‏)‏



“তাতে ক্ষতির উপাদানও থাকবে না এবং তাতে তারা মাতালও হবে না।” (সূরা সফফাত ৩৭ : ৪৭)



আল্লাহ তা‘আলা বলেন :



(لَّا يُصَدَّعُوْنَ عَنْهَا وَلَا يُنْزِفُوْنَ‏)‏



“সেই সুরা পানে তাদের মাথা ব্যথা হবে না, তারা জ্ঞানহারাও হবে না।” (সূরা ওয়াকিয়া ৫৬ : ১৯)



৪. মধুর নদী :



যা হবে নির্মল ও স্বচ্ছ। কারণ এ মধু দুনিয়ার মত মৌমাছি থেকে সংগৃহীত হবে না। বরং এর জন্য স্বয়ং একটি নদীই থাকবে।



রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : যখন তোমরা আল্লাহ তা‘আলার কাছে জান্নাত চাইবে তখন জান্নাতুল ফিরদাউস চাইবে। কেননা তা হল মধ্যবর্তী ও সর্বোচ্চ জান্নাত। সেখান থেকেই জান্নাতের নদীসমূহ প্রবাহিত হয় এবং তার উপরে রয়েছে দয়মায়ের আরশ। ( সহীহ বুখারী হা. ২৭৯০)



জান্নাতে মু’মিনদের নেয়ামতের কথা, তাদের রবের পক্ষ থেকে ক্ষমার কথা আলোচনার পর জাহান্নামীদের আলোচনা করেছেন। জাহান্নামীরা জাহান্নামে জান্নাতীদের বিপরীতে এমন ফুটন্ত পানি পান করবে যার ফলে নাড়ী-ভুঁড়ি ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে।



অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা মুনাফিকদের কথা তুলে ধরেছেন। যাদের নিয়ত ভাল না থাকার কারণে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কথাগুলো বুঝতে পারত না। তারা মজলিস থেকে বের হয়ে সাহাবীদেরকে জিজ্ঞাসা করত যে, তিনি কী বললেন? পক্ষান্তরে যারা হিদায়াতপ্রাপ্ত আল্লাহ তা‘আলা তাদের হিদায়াত আরো বৃদ্ধি করে দেন। এ সকল মিথ্যুক মুনাফিকরা চায় হঠাৎ কিয়ামত চলে আসুক, যাতে তারা না বুঝতে পারে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন : কিয়ামতের আলামত তো এসেই গেছে। যেমন নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজেই একটি কিয়ামতের আলামত। কারণ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পর আর কোন নাবী দুনিয়াতে আসবে না।



তারপর আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সত্যিকার মা‘বূদ সম্পর্কে জানার নির্দেশ প্রদান করেছেন। আল্লাহ তা‘আলার এককত্বের পরিচয় জানার অনেক মাধ্যম রয়েছে। তার মধ্যে :



১. আল্লাহ তা‘আলার নাম, গুণাবলী ও কার্যাবলী নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা যে, তাঁর নাম ও সব গুণাবলী পরিপূর্ণ আর তাঁর কাজগুলো হিকমতপূর্ণ।

২. সৃষ্টি ও পরিচালনা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই করেন। তাই তিনিই একমাত্র সকল ইবাদত পাওয়ার হকদার।

৩. বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ সকল নেয়ামত সম্পর্কে জানা ও চিন্তা করা।



তারপর নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নিজের ও মু’মিন নর ও নারীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার নির্দেশ দিচ্ছেন। আগে জ্ঞান অর্জন করতে হবে পরে আমল করতে হবে। তাই ইমাম বুখারী (রহঃ) অধ্যায় বেঁধেছেন : কথা ও কাজের পূর্বে জ্ঞানার্জন আবশ্যক। তারপর তিনি



(فَاعْلَمْ اَنَّه۫ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ)



আয়াতটি নিয়ে এসেছেন।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :



১. প্রমাণসহ সত্যের অনুসারী আর প্রবৃত্তির অনুসারীরা সমান না।

২. মু’মিনদের জন্য জান্নাতের চার প্রকার পানীয়র কথা জানতে পারলাম। অপরপক্ষে জাহান্নামীদের জন্য থাকবে ফুটন্ত গরম পানিও পুঁজ।

৩. আল্লাহ তা‘আলা যার অন্তরে মোহর মেরে দিয়েছেন তার হিদায়াত পাওয়ার কোন পথ নেই।

৪. সর্বপ্রথম জ্ঞানার্জন অতঃপর সাথে সাথে আমল করতে হবে। জ্ঞান অর্জন ছাড়া আমল করলে যেমন পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে তেমনি জ্ঞান অর্জন করার পর আমল না করলে গুনাহ হবে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১৪-১৫ নং আয়াতের তাফসীর:

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর দ্বীনে বিশ্বাসের সোপান পর্যন্ত পৌঁছে যাবে, যে অন্তর্চক্ষু লাভ করেছে, যার মধ্যে বিশুদ্ধ প্রকৃতির সাথে সাথে হিদায়াত ও ইলমও রয়েছে সেই ব্যক্তি কি ঐ ব্যক্তির সমান যে দুষ্কর্মকে সৎকর্ম মনে করে নিয়েছে এবং নিজের কু-প্রবৃত্তির পিছনে পড়ে রয়েছে? এই দুই ব্যক্তি কখনো সমান হতে পারে না। আল্লাহ পাকের এ উক্তিটি তার নিম্নের উক্তিগুলোর মতইঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী সঃ)! তোমার উপর তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে যা অবতীর্ণ হয়েছে এটাকে যে সত্য বলে জানে সে কি অন্ধের মত?”(১৩:১৯) অর্থাৎ সে ও অন্ধ কখনো সমান হতে পারে না। আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “জাহান্নামের অধিবাসী ও জান্নাতের অধিবাসী সমান নয়। জান্নাতবাসীরাই সফলকাম।”(৫৯:২০)

এরপর মহান আল্লাহ জান্নাতের গুণাবলী বর্ণনা করছেন যে, তাতে পানির প্রস্রবণ রয়েছে, যা কখনো নষ্ট হয় না এবং তাতে কোন পরিবর্তনও আসে না। এ পানি কখনো পচে দুর্গন্ধময় হয় না। এটা অত্যন্ত নির্মল পানি। মুক্তার মত স্বচ্ছ ও পরিষ্কার। এতে কোন খড়কুটা পড়ে না।

হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, জান্নাতী নদীগুলো মেশক বা মৃগনাভির পাহাড় হতে প্রবাহিত হয়। জান্নাতে পানি ছাড়া দুধের নহরও রয়েছে, যার স্বাদ কখনো পরিবর্তন হয় না। খুবই সাদা ও খুবই মিষ্ট। অত্যন্ত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। একটি মারফু হাদীসে আছে যে, এটা জন্তুর স্তনের দুধ নয়, বরং কুদরতী দুধ। আর তাতে রয়েছে সুস্বাদু সুরার নহর। এটা পানে মনে তৃপ্তি আসে এবং মস্তিষ্ক ঠাণ্ডা হয়। এ সুরা দুর্গন্ধময়ও নয় এবং তিক্তও নয়। এটা দেখতেও খারাপ নয়। বরং দেখতে অত্যন্ত সুন্দর। এটা পানেও সুস্বাদু এবং অতি সুগন্ধময়। এটা পানে জ্ঞানও লোপ পাবে না এবং মস্তিষ্ক বিকৃতও হবে না। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাতে ক্ষতিকর কিছুই থাকবে না এবং তাতে তারা মাতালও হবে ।”(৩৭:৪৭) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই সুরা পানে তাদের শিরঃপীড়া হবে না, তারা জ্ঞান হারাও হবে।” (৫৬:১৯) আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “শুভ্র উজ্জ্বল যা হবে পানকারীদের জন্যে সুস্বাদু।”(৩৭:৪৬) মার’ হাদীসে এসেছে যে, ঐ সুরা মানুষের হাতের নিংড়ানো নির্যাস নয়, বরং ওটা আল্লাহর হুকুমে তৈরী। ওটা সুস্বাদু ও সুদৃশ্য।

আর জান্নাতে আছে পরিশোধিত মধুর নহর, যা সুগন্ধময় ও অতি সুস্বাদু। মারফু হাদীসে এসেছে যে, এটা মধুমক্ষিকার পেট হতে বহির্ভূত নয়।

হযরত হাকীম ইবনে মুআবিয়া (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, তাঁর পিতা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “জান্নাতে দুধ, পানি, মধু ও সুরার সমুদ্র রয়েছে। এগুলো হতে এসবের নহর ও ঝরণা প্রবাহিত হয়।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন)

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে কায়েস (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এই নহরগুলো জান্নাতে আদন হতে বের হয়, 'তারপর একটি হাউযে আসে এবং সেখান হতে অন্যান্য নহরগুলোর মাধ্যমে সমস্ত জান্নাতে যায়।”

সহীহ হাদীসে রয়েছেঃ “তোমরা আল্লাহ তাআলার কাছে প্রার্থনা করলে ফিরদাউস জান্নাতের জন্যে প্রার্থনা করো। এটা সর্বাপেক্ষা উত্তম ও সর্বোচ্চ জান্নাত। ওটা হতেই জান্নাতের নহরগুলো প্রবাহিত হয়ে থাকে এবং ওর উপর রহমানের (আল্লাহর) আরশ রয়েছে।”

হযরত লাকীত ইবনে আমির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি প্রতিনিধি হিসেবে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! জান্নাতে কি রয়েছে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “জান্নাতে আছে পরিষ্কার ও পরিশোধিত মধুর নহর, শিরঃপীড়া হবে না ও জ্ঞান লোপ পাবে না এমন সুরার নহর, অপরিবর্তনীয় স্বাদ বিশিষ্ট দুধের নহর, নির্মল পানির নহর, বিবিধ ফলমূল এবং পবিত্র সহধর্মিণী।” হযরত লাকীত ইবনে আমির পুনরায় জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সেখানে আমাদের জন্যে কি সতী স্ত্রীরা রয়েছে?” জবাবে তিনি বলেনঃ “সৎ পুরুষরা সতী নারী লাভ করবে। দুনিয়ার উপভোগের মত সেখানে তারা তাদেরকে উপভোগ করবে, তবে সেখানে ছেলে মেয়ে জন্মগ্রহণ করবে না।” (এ হাদীসটি হাফিয আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) বলেনঃ “তোমরা হয়তো ধারণা করছো যে, জান্নাতের নহরগুলো পৃথিবীর নহরের মত খননকৃত যমীনে বা গর্তে প্রবাহিত হচ্ছে, কিন্তু তা নয়। আল্লাহর কসম! ওগুলো পরিষ্কার সমতল ভূমির উপর প্রবাহিত হচ্ছে। ওগুলোর ধারে ধারে মণি-মুক্তার তাবু রয়েছে এবং ওর মাটি হলো খাটি মৃগনাভি।` (এটা আবু বকর আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আবিদ দুনিয়া (রঃ) বর্ণনা করেছেন। আবু বকর ইবনে মিরদুওয়াইও (রঃ) এটা মার রূপে বর্ণনা করেছেন)

মহান আল্লাহ বলেনঃ সেখানে তাদের জন্যে থাকবে বিবিধ ফলমূল। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ অর্থাৎ “সেখানে তারা শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে সর্বপ্রকারের ফলের জন্যে ফরমায়েশ করবে।”(৪৪:৫৫) অন্য একটি আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “উভয় উদ্যানে (জান্নাতে) রয়েছে প্রত্যেক ফল দুই প্রকার।” (৫৫:৫২)

এসব নিয়ামতের সাথে সাথে এটা কত বড় নিয়ামত যে, তাদের প্রতিপালক তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তিনি তাদের জন্যে তার ক্ষমাকে বৈধ করেছেন। এখন তাদের কোন ভয় ও চিন্তার কারণ নেই। জান্নাতের এই ধুমধাম ও নিয়ামতরাশির বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তা'আলা জাহান্নামীদের অবস্থা বর্ণনা করছেন যে, তাদেরকে জাহান্নামে ফুটন্ত পানি পান করতে দেয়া হবে। পানি তাদের পেটের মধ্যে যাওয়া মাত্রই তাদের নাড়িভূড়ি ছিন্ন-বিছিন্ন করে দিবে। আল্লাহ আমাদেরকে রক্ষা করুন! এই জাহান্নামীরা এবং ঐ জান্নাতীরা কি কখনো সমান হতে পারে? কখনো নয়। কোথায় জান্নাতী আর কোথায় জাহান্নামী! কোথায় নিয়ামত এবং কোথায় যহমত!





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।