সূরা মুহাম্মাদ (আয়াত: 11)
হরকত ছাড়া:
ذلك بأن الله مولى الذين آمنوا وأن الكافرين لا مولى لهم ﴿١١﴾
হরকত সহ:
ذٰلِکَ بِاَنَّ اللّٰهَ مَوْلَی الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا وَ اَنَّ الْکٰفِرِیْنَ لَا مَوْلٰی لَهُمْ ﴿۱۱﴾
উচ্চারণ: যা-লিকা বিআন্নাল্লা-হা মাওলাল্লাযীনা আ-মানূওয়া আন্নাল কা-ফিরীনা লা-মাওলা-লাহুম।
আল বায়ান: তা এজন্য যে, নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের অভিভাবক। আর নিশ্চয় কাফিরদের কোন অভিভাবক নেই।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১১. এটা এজন্যে যে, নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের অভিভাবক এবং নিশ্চয় কাফিরদের কোন অভিভাবক নেই।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: এর কারণ এই যে, যারা ঈমান আনে আল্লাহ তাদের অভিভাবক আর কাফিরদের কোন অভিভাবক নেই।
আহসানুল বায়ান: (১১) এটা এ জন্য যে, আল্লাহ বিশ্বাসীদের অভিভাবক এবং অবিশ্বাসীদের কোন অভিভাবক নেই। [1]
মুজিবুর রহমান: এটা এ জন্য যে, আল্লাহ মু’মিনদের অভিভাবক এবং কাফিরদের কোন অভিভাবক নেই।
ফযলুর রহমান: তা এজন্য যে, আল্লাহ মুমিনদের অভিভাবক, আর কাফেরদের কোন অভিভাবক নেই।
মুহিউদ্দিন খান: এটা এজন্যে যে, আল্লাহ মুমিনদের হিতৈষী বন্ধু এবং কাফেরদের কোন হিতৈষী বন্ধু নাই।
জহুরুল হক: এমনটাই, কেননা যারা ঈমান এনেছে তাদের অভিভাবক নিশ্চয়ই আল্লাহ্, আর অবিশ্বাসীদের ক্ষেত্রে তো -- তাদের জন্য কোনো মুরব্বী নেই।
Sahih International: That is because Allah is the protector of those who have believed and because the disbelievers have no protector.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১১. এটা এজন্যে যে, নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের অভিভাবক এবং নিশ্চয় কাফিরদের কোন অভিভাবক নেই।(১)
তাফসীর:
(১) مولى শব্দটি অনেক অর্থে ব্যবহৃত হয়। এর অর্থ অভিভাবক। [মুয়াসসার, বাগভী] এখানে এই অর্থই বোঝানো হয়েছে। এর আরেক অর্থ মালিক। কুরআনের অন্যত্র কাফেরদের সম্পর্কে বলা হয়েছে: (ثُمَّ رُدُّوا إِلَى اللَّهِ مَوْلَاهُمُ الْحَقِّ) অতঃপর তাদেরকে (কাফেরদের) তাদের মাওলার কাছে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। [সূরা আল-আন’আম: ৬২]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১১) এটা এ জন্য যে, আল্লাহ বিশ্বাসীদের অভিভাবক এবং অবিশ্বাসীদের কোন অভিভাবক নেই। [1]
তাফসীর:
[1] তাই উহুদ যুদ্ধে কাফেরদের শ্লোগানের উত্তরে মুসলিমরা যে শ্লোগান বলেছিলেন তা আয়াতের বাস্তব রূপ। যেমন কাফেররা বলেছিল, أُعْلُ هُبَل، أُعْلُ هُبَل (হুবালের নাম উচ্চ হোক)। এর উত্তরে মুসলিমগণ বলেছিলেন, اللهُ أَعْلَى وأَجَلُّ (আল্লাহই সর্বোচ্চ ও সর্বমহান)। কাফেরদের আরো একটি শ্লোগান ছিল, لَنَا الْعُزَّى وَلاَ عُزَّى لَكُمْ (আমাদের উয্যা আছে, তোমাদের উয্যা নেই।) উত্তরে মুসলিমগণ বলেছিলেন, اللهُ مَوْلاَنَا وَلاَ مَوْلَى لَكُمْ (আল্লাহ আমাদের সাহায্যকারী, তোমাদের কোন সাহায্যকারী নেই।) (বুখারী)
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১০-১৩ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
পূর্ববর্তী যে-সকল জাতি আল্লাহ তা‘আলার সাথে কুফরী করেছে তাদের কী অশুভ পরিণতি হয়েছিল পৃথিবীতে ভ্রমণ করে তা দেখে শিক্ষা নেওয়ার কথা বলছেন আল্লাহ তা‘আলা। যদি আমরাও তাদের মত কুফরী করি তাহলে আমাদের পরিণতি তাদের মতই হবে।
(ذٰلِكَ بِأَنَّ اللّٰهَ مَوْلَي الَّذِينَ اٰمَنُوْا)
‘এর কারণ এই যে, যারা ঈমান এনেছে আল্লাহই তাদের সাহায্যকারী’ এ আয়াতটি উহুদ যুদ্ধে কাফিরদের শ্লোগানের উত্তরে মুসলিমরা যে শ্লোগান দিয়েছিল তার বাস্তবরূপ। কাফিররা বলেছিল :
اعل هبل، اعل هبل
হুবালের নাম উচ্চ হোক। উত্তরে মুসলিমরা বলেছিল :
الله أعلي و أجل
আল্লাহ তা‘আলাই সর্বোচ্চ ও সর্বমহান।
কাফিররা আরো একটি শ্লোগান বলে ছিল
لنا العزى ولا عزلكم –
‘আমাদের সহযোগিতার জন্য উযযা মা‘বূদ আছে, তোমাদের নেই।’ জবাবে মুসলিমরা বলেছিল :
الله مولانا و لامولي لكم
“আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সাহায্যকারী আছেন তোমাদের সাহায্যকারী নেই।” (সহীহ বুখারী হা. ৪০৪৩)
كما تاكل الانعام
- অর্থাৎ জীব জন্তুদের উদর পূর্ণ ও প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণ ছাড়া যেমন আর কোন কাজ থাকে না কাফিরদের অবস্থাও তেমনি। তাদের প্রকৃত কোন বোধশক্তি নেই এবং মর্যাদাও নেই। তাই তাদের বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ সকল কাজকর্মের উদ্দেশ্য কেবলমাত্র দুনিয়া। জীবজন্তুর যেমন খাওয়ার কোন নিয়ম-কানুন নেই, যত পারে তত খায় ঠিক কাফিররাও তেমন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : মু’মিনরা এক পাকস্থলিতে খায় আর কাফিররা সাত পাকস্থলিতে খায়। (সহীহ বুখারী হা. ৫৩৯৩)
অতএব মুসলিমদের অভিভাবক আল্লাহ তা‘আলা, কাফিরদের কোন অভিভাবক নেই। তাই মুসলিমরা সকল কাজকর্মে আল্লাহ তা‘আলার উপর ভরসা করবে এবং তাঁর নির্দেশাবলী মেনে চলবে তাহলেই দুনিয়াবী ও আখিরাতী সফলতা আসবে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. পূর্ববর্তী অবাধ্য জাতিদের পরিণতি কী হয়েছিল তা থেকে শিক্ষা নেয়ার জন্য জমিনে সফর করা বৈধ।
২. মু’মিনদের অভিভাবক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা।
৩. কাফিররা পশু বা তাদের চেয়েও নিকৃষ্ট।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১০-১৩ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যারা আল্লাহর শরীক স্থাপন করে এবং তাঁর রাসল (সঃ)-কে অবিশ্বাস করে তারা কি ভূ-পৃষ্ঠে ভ্রমণ করেনি? করলে তারা জানতে পারতো এবং স্বচক্ষে দেখে নিতো যে, তাদের পূর্বে যারা তাদের মত ছিল তাদের পরিণাম হয়েছিল খুবই মারাত্মক। তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়ে তাদের নাম ও নিশানা মিটিয়ে দেয়া হয়েছিল। তাদের মধ্যে শুধু মুসলমান ও মুমিনরাই পরিত্রাণ পেয়েছিল। কাফিরদের জন্যে এরূপই শাস্তি এসে থাকে।
মহান আল্লাহর উক্তিঃ ‘এটা এই জন্যে যে, আল্লাহ মুমিনদের অভিভাবক এবং কাফিরদের কোন অভিভাবক নেই। এ জন্যেই উহুদের যুদ্ধের দিন মুশরিকদের সরদার আবু সুফিয়ান সাখর ইবনে হারব যখন গর্বভরে নবী (সঃ) ও তাঁর দু’জন খলীফা (রাঃ) সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলো, কিন্তু কোন উত্তর পায়নি তখন বলেছিলোঃ “এরা সবাই ধ্বংস হয়ে গেছে।” তখন হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) জবাব দিলেনঃ “হে আল্লাহর শত্রু! তুমি মিথ্যা বললে। যাদের বেঁচে থাকা তোমার দেহে কাঁটার মত বিধছে তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা তোমার জন্যে বাঁচিয়ে রেখেছেন।” আবু সুফিয়ান (রাঃ) তখন বললোঃ “জেনে রেখো যে, এটা বদরের প্রতিশোধের দিন। আর যুদ্ধ তো বালতির মত (কখনো এই হাতে এবং কখনো ঐ হাতে)। তোমরা তোমাদের নিহতদের মধ্যে কতকগুলোকে নাক, কান ইত্যাদি কর্তিত অবস্থায় পাবে। আমি এরূপ করার হুকুম জারী করিনি, তবে এতে আমি অসন্তুষ্ট নই।” অতঃপর সে গর্ববোধক কবিতা পাঠ করতে শুরু করে। সে বলেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের হুবুল' দেবতা সমুন্নত হোক।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে (রাঃ) বলেনঃ “তোমরা উত্তর দিচ্ছ না কেন?” তারা তখন বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা কি বলবো?” তিনি জবাবে বললেনঃ “তোমরা বল, (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ অতি উচ্চ ও মহাসম্মানিত।” আবু সুফিয়ান (রাঃ) আবার বললঃ (আরবী) এই অর্থাৎ “আমাদের উম্ (দেবতা) রয়েছে এবং তোমাদের উ নেই।” রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ফরমান অনুযায়ী সাহাবীগণ (রাঃ)-এর জবাবে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ আমাদের অভিভাবক এবং তোমাদের কোন অভিভাবক
নেই।”
মহামহিমান্বিত আল্লাহ খবর দিচ্ছেন যে, যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তারা কিয়ামতের দিন জান্নাতে প্রবেশ করবে যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। পক্ষান্তরে যারা কুফরী করে ও ভোগ-বিলাসে মগ্ন থাকে তাদের জীবনের উদ্দেশ্য শুধু পানাহার ও পেট পূরণ করা। তারা জন্তু-জানোয়ারের মত উদরপূর্তি করে। অর্থাৎ জন্তু-জানোয়ার যেমন মুখের সামনে যা পায় তা-ই খায়, অনুরূপভাবে এ লোকগুলোও হারাম হালালের কোন ধার ধারে না। পেট পূর্ণ হলেই হলো। তাদের জীবনের উদ্দেশ্য শুধু এটাই। তাদের নিবাস হলো জাহান্নাম। সহীহ হাদীসে এসেছে যে, মু'মিন খায় একটি পাকস্থলীতে এবং কাফির খায় সাতটি পাকস্থলীতে। তাই তাদের কুফরীর প্রতিফল হিসেবে তাদের বাসস্থান হবে জাহান্নাম।
এরপর প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ মক্কার কাফিরদেরকে ধমকের সূরে বলছেন যে, তারা তাঁর নবী (সঃ)-কে তাঁর যে জনপদ হতে বিতাড়িত করেছে তা অপেক্ষা অতি শক্তিশালী কত জনপদ ছিল, ওগুলোর অধিবাসীদেরকে আল্লাহ তাআলা ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। কেননা, এদের মত তারাও তাঁর নবীদেরকে (আঃ) অবিশ্বাস করেছিল এবং তাঁর আদেশ নিষেধের বিরুদ্ধাচরণ করেছিল। সুতরাং এরা যে আল্লাহর প্রিয় রাসূল (সঃ)-কে অবিশ্বাস করছে এবং তাঁকে বিভিন্ন প্রকারের কষ্ট দিচ্ছে, এদের পরিণাম কি হতে পারে? এই নবী (সঃ) তো সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী! এটা স্বীকার করে নেয়া যেতে পারে যে, এই বিশ্বশান্তির দূত (সঃ)-এর কল্যাণময় অস্তিত্বের কারণে পার্থিব শাস্তি হয় তো এদের উপর আসবে না, কি পারলৌকিক ভীষণ শাস্তি হতে এরা কোনক্রমেই রক্ষা পেতে পারে না।
যখন মক্কাবাসী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তাঁর প্রিয় জন্মভূমি হতে বিতাড়িত করে এবং তিনি গুহায় এসে আত্মগোপন করেন, ঐ সময় তিনি মক্কার দিকে মুখ করে বলেনঃ “হে মক্কা! তুমি সমস্ত শহর হতে আল্লাহ তা'আলার নিকট অত্যধিক প্রিয় এবং অনুরূপভাবে আমার নিকটও তুমি সমস্ত শহর হতে অত্যন্ত প্রিয়। যদি মুশরিকরা আমাকে তোমার মধ্য হতে বের করে না দিতো তবে আমি কখনো তোমার মধ্য হতে বের হতাম না। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন) সুতরাং যারা সীমালংঘনকারী, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় সীমালংঘনকারী হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যে আল্লাহর সীমালংঘন করে, অথবা নিজের হন্তা ছাড়া অন্যকে হত্যা করে কিংবা অজ্ঞতা যুগের গোঁড়ামির উপর থেকে হত্যাকার্য চালিয়ে যায়। অতঃপর আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ)-এর উপর ... (আরবী)-এই আয়াত অবতীর্ণ করেন।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।