সূরা আল-আহকাফ (আয়াত: 22)
হরকত ছাড়া:
قالوا أجئتنا لتأفكنا عن آلهتنا فائتنا بما تعدنا إن كنت من الصادقين ﴿٢٢﴾
হরকত সহ:
قَالُوْۤا اَجِئْتَنَا لِتَاْفِکَنَا عَنْ اٰلِهَتِنَا ۚ فَاْتِنَا بِمَا تَعِدُنَاۤ اِنْ کُنْتَ مِنَ الصّٰدِقِیْنَ ﴿۲۲﴾
উচ্চারণ: কা-লূআজি’তানা-লিতা’ফিকানা-‘আন আ-লিহাতিনা- ফা’তিনা-বিমা-তা‘ইদুনা ইন কুনতা মিনাসসা-দিকীন।
আল বায়ান: তারা বলল, ‘তুমি কি আমাদেরকে আমাদের উপাস্যদের থেকে নিবৃত্ত করতে আমাদের নিকট এসেছ? তুমি যদি সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হও, তাহলে আমাদেরকে যার ভয় দেখাচ্ছ তা নিয়ে এসো’।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২২. তারা বলেছিল, তুমি কি আমাদেরকে আমাদের উপাস্যগুলো থেকে নিবৃত্ত করতে এসেছ? তুমি যদি সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাক তবে আমাদেরকে যার ওয়াদা করছি তা নিয়ে আস।
তাইসীরুল ক্বুরআন: লোকেরা বলেছিল- ‘তুমি কি আমাদেরকে আমাদের উপাস্যগুলো হতে সরিয়ে নেয়ার জন্য আমাদের কাছে এসেছ। কাজেই তুমি আমাদেরকে যে শাস্তির ভয় দেখাচ্ছ তা নিয়ে এসো আমাদের কাছে যদি তুমি সত্যবাদী হও।’
আহসানুল বায়ান: (২২) তারা বলেছিল, ‘তুমি আমাদেরকে আমাদের দেবতাগূলোর (পূজা) হতে নিবৃত্ত করতে এসেছ? [1] তুমি সত্যবাদী হলে আমাদেরকে যার ভয় দেখাচ্ছ, তা আনয়ন কর।’
মুজিবুর রহমান: তারা বলেছিলঃ তুমি আমাদেরকে আমাদের দেব দেবীগুলির পূজা হতে নিবৃত্ত করতে এসেছ? তুমি সত্যবাদী হলে আমাদেরকে যার ভয় দেখাচ্ছ তা আনয়ণ কর।
ফযলুর রহমান: তারা বলল, “তুমি কি আমাদেরকে আমাদের উপাস্যদের থেকে ফেরানোর জন্য এসেছো? ঠিক আছে, তুমি সত্যবাদী হলে আমাদেরকে যার (যে শাস্তির) ভয় দেখাচ্ছ তা নিয়ে এসো।”
মুহিউদ্দিন খান: তারা বলল, তুমি কি আমাদেরকে আমাদের উপাস্য দেব-দেবী থেকে নিবৃত্ত করতে আগমন করেছ? তুমি সত্যবাদী হলে আমাদেরকে যে বিষয়ের ওয়াদা দাও, তা নিয়ে আস।
জহুরুল হক: তারা বললে -- "তুমি কি আমাদের কাছে এসেছ আমাদের দেবদেবীর থেকে আমাদের ফিরিয়ে রাখতে? তাহলে আমাদের কাছে নিয়ে এস তো যা দিয়ে তুমি আমাদের ভয় দেখাচ্ছ, -- যদি তুমি সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাক।"
Sahih International: They said, "Have you come to delude us away from our gods? Then bring us what you promise us, if you should be of the truthful."
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ২২. তারা বলেছিল, তুমি কি আমাদেরকে আমাদের উপাস্যগুলো থেকে নিবৃত্ত করতে এসেছ? তুমি যদি সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাক তবে আমাদেরকে যার ওয়াদা করছি তা নিয়ে আস।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (২২) তারা বলেছিল, ‘তুমি আমাদেরকে আমাদের দেবতাগূলোর (পূজা) হতে নিবৃত্ত করতে এসেছ? [1] তুমি সত্যবাদী হলে আমাদেরকে যার ভয় দেখাচ্ছ, তা আনয়ন কর।”
তাফসীর:
[1] لِتَأْفِكَنَا এর অর্থ لِتَصْرِفَنَا অথবা لِتَمْنَعَنَا বা لِتُزِيْلَنَا সবগুলোরই অর্থ প্রায় কাছাকাছি; যাতে তুমি আমাদেরকে আমাদের উপাস্যদের পূজা হতে ফিরিয়ে দাও, থামিয়ে দাও, সরিয়ে দাও, নিবৃত্ত কর।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ২১-২৫ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
এ আয়াতগুলোতে ‘আদ সম্প্রদায় যাদের প্রতি হূদ (আঃ)-কে প্রেরণ করা হয়েছিল। তিনি তাদেরকে তাওহীদের দিকে আহ্বান করেছিলেন কিন্তু তারা অবাধ্য হয় এবং তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করে।
الْأَحْقَافِ ইয়ামান এলাকায় অবস্থিত একটি জনপদ। এ এলাকায় ছিল আদ জাতির বসবাস।
(وَقَدْ خَلَتِ النُّذُرُ)
অর্থাৎ হূদের পূর্বে ও পরে অনেক নাবী প্রেরণ করেছি যারা সবাই এক আল্লাহ তা‘আলার ইবাদতের দিকে আহ্বান করেছেন এবং কিয়ামতের কঠিন শাস্তি সম্পর্কে অবগত করেছেন।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِيْ كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُوْلًا أَنِ اعْبُدُوا اللّٰهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوْتَ)
“আল্লাহর ‘ইবাদত করার ও তাগূতকে বর্জন করার নির্দেশ দেবার জন্য আমি প্রত্যেক জাতির মধ্যেই রাসূল পাঠিয়েছি।” (সূরা নাহাল ১৬ : ৩৬)
কিন্তু হূদ (আঃ)-এর জাতি অবাধ্য হয়ে বলল : তুমি কি আমাদের মা‘বূদদের থেকে আমাদেরকে ফিরিয়ে রাখার জন্য এসেছ? তুমি যদি সত্যবাদী হয়ে থাক তাহলে তুমি যে আযাবের ভয় দেখাচ্ছ তা নিয়ে এসো। হূদ (আঃ) তাদের কথার সুন্দরভাবে জবাব দিলেন, বললেন : আযাব কখন আসবে তা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা জানেন, আমি কেবল আমার দায়িত্ব পালন করছি। আর তা হচ্ছে এর সংবাদ তোমাদের জানিয়ে দেওয়া।
(فَلَمَّا رَأَوْهُ عَارِضًا)
অর্থাৎ যখন তারা দেখতে পেল মেঘমালা তাদের দিকেই আসছে তখন তারা খুব খুশী হল যে, তাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষণ হবে, কিন্তু বাস্তবে তা ছিল তাদের কর্মের শাস্তি। বাতাস দিয়ে এ জাতিকে আল্লাহ তা‘আলা ধ্বংস করে দেন।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(وَأَمَّا عَادٌ فَأُهْلِكُوا بِرِيحٍ صَرْصَرٍ عَاتِيَةٍ سَخَّرَهَا عَلَيْهِمْ سَبْعَ لَيَالٍ وَّثَمٰنِيَةَ أَيَّامٍ لا حُسُوْمًا فَتَرَي الْقَوْمَ فِيْهَا صَرْعٰي كَأَنَّهُمْ أَعْجَازُ نَخْلٍ خَاوِيَةٍ ج فَهَلْ تَرٰي لَهُمْ مِّنْمبَاقِيَةٍ )
“আর আ’দ সম্প্রদায়, তাদেরকে ধ্বংস করা হয়েছিল এক প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড় দ্বারা। যা তিনি তাদের ওপর প্রবাহিত করেছিলেন বিরামহীনভাবে সাত রাত ও আট দিন, তুমি (উপস্থিত থাকলে) সেই সম্প্রদায়কে দেখতে খেজুর কাণ্ডের ন্যায় সেখানে ছিন্ন ভিন্নভাবে পড়ে আছে। তুমি কি তাদের কাউকেও অবশিষ্ট দেখতে পাও?” (সূরা হাক্কাহ ৬৯ : ৬-৮)
এ সম্পর্কে সূরা আ‘রাফের ৬৫-৭২ নং আয়াতেও আলোচনা করা হয়েছে।
আয়িশাহ (রাঃ) একদা রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞাসা করলেন : লোকেরা মেঘ দেখে আনন্দিত হয় যে, বৃষ্টি হবে। কিন্তু আপনার মুখমণ্ডলে এর বিপরীত চিন্তা ও অস্থিরতা লক্ষ্য করা যায়? তিনি বললেন : এ মেঘে যে আযাব নেই তার কি কোন নিশ্চয়তা আছে? এক জাতিকে তো বাতাসের আযাব দ্বারা ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। তারাও মেঘ দেখে বলেছিল, এ মেঘ আমাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষণ করবে। (সহীহ বুখারী হা. ৪৮২৯)
অন্য বর্ণনায় এসেছে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন বাতাস পেতেন তখন এ দু‘আ পড়তেন
اللّٰهُمَّ إِنَّا نَسْأَلُكَ مِنْ خَيْرِ هَذِهِ الرِّيحِ وَخَيْرِ مَا فِيهَا وَخَيْرِ مَا أُمِرَتْ بِهِ، وَنَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ هَذِهِ الرِّيحِ وَشَرِّ مَا فِيهَا وَشَرِّ مَا أُمِرَتْ بِهِ
হে আল্লাহ তা‘আলা আমি তোমার কাছে এর কল্যাণ ও এর মধ্যে যে কল্যাণ রয়েছে এবং যে কল্যাণ দিয়ে তা প্রেরণ করেছ তার সব চাই। আর তার অকল্যাণ ও তার মধ্যে যে অকল্যাণ রয়েছে এবং যে অকল্যাণ নিয়ে তা প্রেরিত হয়েছে তার সব কিছু থেকে আশ্রয় চাই। (সহীহ মুসলিম, কিতাবুস সালাত)
সুতরাং আল্লাহ তা‘আলার ও রাসূলের অবাধ্যতার পরিণাম কী হয়েছিল তা পূর্ববর্তী জাতিদের থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত। আমরাও যেন নিজের পায়ে কুড়াল মেরে বিপদ ডেকে না নিয়ে আসি।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. পূর্ববর্তী অবাধ্য জাতিদের থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত যে, তাদের অবাধ্যতার পরিণাম কেমন হয়েছিল?
২. বৃষ্টি-বাতাসের আগমনে যে দু‘আ পড়তে হয় তা জানতে পারলাম।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ২১-২৫ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তোমার সম্প্রদায় যদি তোমাকে অবিশ্বাস ও মিথ্যা প্রতিপন্ন করে তবে তুমি তোমার পূর্ববর্তী নবীদের (আঃ) ঘটনাবলী স্মরণ কর যে, তাদের সম্প্রদায়ও তাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল।
আ’দ সম্প্রদায়ের ভাই দ্বারা হযরত হূদ (আঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তাঁকে আ’দে উলার (প্রথম আ’দের) নিকট পাঠিয়েছিলেন, যারা আহকাফ নামক স্থানে বসবাস করতো। (আরবী) শব্দটি (আরবী) শব্দের বহু বচন। ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) হলো বালুকার পাহাড়। ইকরামা (রঃ) বলেন যে, আহকাফ হচ্ছে পাহাড় ও গুহা। হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) বলেন যে, আহকাফ হলো হাযরে মাউতের একটি উপত্যকা, যাকে বারহূত বলা হয় এবং যাতে কাফিরদের রূহগুলো নিক্ষেপ করা হয়। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, ইয়ামনে সমুদ্রের তীরে বালুকার টিলায় একটি জায়গা রয়েছে, যার নাম শাহার, সেখানেই এ লোকগুলো বসতি স্থাপন করেছিল।
ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) একটি বাব বা অনুচ্ছেদ,বেঁধেছেন যে, যখন কেউ দু'আ করবে তখন যেন সে নিজ হতেই শুরু করে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ আমাদের প্রতি ও আ’দ সম্প্রদায়ের ভাই এর প্রতি দয়া করুন।”
এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আল্লাহ তাদের চতুষ্পর্শ্বের শহরগুলোতেও স্বীয় রাসূল প্রেরণ করেছিলেন। যেমন আল্লাহ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তবুও তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে বলঃ আমি তো তোমাদেরকে সতর্ক করছি এক ধ্বংসকর শাস্তির, আ’দ ও সামূদের অনুরূপ শাস্তির। যখন তাদের নিকট রাসূলগণ এসেছিল তাদের সম্মুখ ও পশ্চাৎ হতে এবং বলেছিলঃ তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদত করো না।” (৪১:১৩-১৪)
হযরত হূদ (আঃ)-এর এ কথার জবাবে তার সম্প্রদায় তাকে বললোঃ “তুমি আমাদেরকে আমাদের দেব-দেবীগুলোর পূজা হতে নিবৃত্ত করতে এসেছো? তুমি সত্যবাদী হলে আমাদেরকে যে শাস্তির ভয় দেখাচ্ছ তা আনয়ন কর। তারা মহান আল্লাহর শাস্তিকে অসম্ভব মনে করতো বলেই বাহাদুরী দেখিয়ে শাস্তি চেয়ে বসেছিল। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা ঈমান আনেনি তারা আল্লাহর শাস্তি তাড়াতাড়ি আসার কামনা করেছিল।”(৪২:১৮)
হযরত হুদ (আঃ) তার কওমের কথার উত্তরে বলেনঃ এর জ্ঞান তো শুধু। আল্লাহরই নিকট আছে। যদি তিনি তোমাদের এ শাস্তিরই যোগ্য মনে করেন। তবে অবশ্যই তিনি তোমাদের উপর শাস্তি আপতিত করবেন। আমার দায়িত্ব ততা শুধু এটুকুই যে, আমি আমার প্রতিপালকের রিসালাত তোমাদের নিকট পৌঁছিয়ে থাকি। কিন্তু আমি জানি যে, তোমরা সম্পূর্ণরূপে জ্ঞান-বিবেকহীন লোক।
অতঃপর আল্লাহর আযাব তাদের উপর এসেই গেল। তারা লক্ষ্য করলো যে, একখণ্ড কালো মেঘ তাদের উপত্যকার দিকে চলে আসছে। ওটা ছিল অনাবৃষ্টির বছর। কঠিন গরম ছিল। তাই মেঘ দেখে তারা খুবই খুশী হলো যে, মেঘ তাদেরকে বৃষ্টি দান করবে। কিন্তু আসলে মেঘের আকারে ওটা ছিল আল্লাহর গযব যা তারা তাড়াতাড়ি কামনা করছিল। তাতে ছিল ঐ শাস্তি যা তাদের বস্তীগুলোর ঐ সব জিনিসকে তচনচ করে চলে আসছিল যেগুলো ধ্বংস হওয়ার ছিল। আল্লাহ ওকে এরই হুকুম দিয়েছিলেন। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “যে জিনিসের উপর দিয়ে ওটা যেতো, ক্ষয়প্রাপ্ত জিনিসের মত ওটাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিতো।”(৫১:৪২) এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তাদের পরিণাম এই হলো যে, তাদের বসতিগুলো ছাড়া আর কিছুই রইলো না। এই ভাবে আমি অপরাধী সম্প্রদায়কে প্রতিফল দিয়ে থাকি।
হযরত আবূ ওয়ায়েল (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত হারিস বিকরী (রাঃ) বলেনঃ “একদা আমি আলা ইবনে হারামীর (রাঃ) অভিযোগ নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে হাযির হবার জন্যে যাত্রা শুরু করি। রাবজাহর পার্শ্ব দিয়ে গমনকালে বানী তামীম গোত্রের একটি বৃদ্ধা মহিলার সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়। তার কাছে সওয়ারী ছিল না। তাই সে আমাকে বলেঃ “হে আল্লাহর বান্দা! আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর সাথে আমার সাক্ষাতের প্রয়োজন আছে। তুমি কি আমাকে দয়া করে তাঁর কাছে পৌঁছিয়ে দিবে?” আমি স্বীকার করলাম এবং তাকে আমার সওয়ারীর উপর বসিয়ে নিলাম। এভাবে আমরা উভয়েই মদীনায় পৌঁছলাম। আমি দেখলাম যে, মসজিদে নববীতে (সঃ) বহু লোকের সমাবেশ হয়েছে। তথায় কালো রঙ এর পতাকা আন্দোলিত হচ্ছে। হযরত বিলাল (রাঃ) তরবারী ঝুলিয়ে দিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে দণ্ডায়মান রয়েছেন। আমি জনগণকে জিজ্ঞেস করলামঃ ব্যাপার কি? উত্তরে তারা বললেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আমর ইবনুল আস (রাঃ)-কে কোন দিকে প্রেরণ করতে চাচ্ছেন।” আমি তখন একদিকে বসে পড়লাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় মনজিলে অথবা তাঁবুতে প্রবেশ করলেন। আমিও তখন তাঁর কাছে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করলাম। অনুমতি পেয়ে আমি তার কাছে হাযির হলাম এবং সালাম করলাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমাদের মধ্যে ও বানু তামীম গোত্রের মধ্যে কোন বিবাদ ছিল কি?” আমি উত্তরে বললামঃ জ্বী, হ্যাঁ, ছিল এবং আমরাই তাদের উপর জয়যুক্ত হয়েছিলাম। আমার এই সফরে বানু তামীম গোত্রের এক বৃদ্ধা মহিলার সাথে পথে আমার সাক্ষাৎ হয়। তার কাছে কোন সওয়ারী ছিল না। সে আমার কাছে আবেদন করলো যে, আমি যেন তাকে আমার সওয়ারীতে উঠিয়ে নিয়ে আপনার দরবারে পৌঁছিয়ে দিই। সুতরাং আমি তাকে আমার সাথে নিয়ে এসেছি এবং সে দরযায় দাড়িয়ে অপেক্ষা করছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাকেও ডেকে নিলেন। সে আসলে আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যদি আপনি আমাদের মধ্যে ও বানী তামীমের মধ্যে কোন প্রতিবন্ধকতার ব্যবস্থা করতে পারেন তবে এর দ্বারাই করুন! আমার একথা শুনে বৃদ্ধা মহিলাটি রাগান্বিতা হয়ে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে এই নিঃসহায় ব্যক্তি আশ্রয় নিবে কোথায়?” আমি তখন বললামঃ সুবহানাল্লাহ! আমার দৃষ্টান্ত তো ঐ ব্যক্তির মতই হলো যে ব্যক্তি নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মেরেছে। এই বৃদ্ধা আমার সাথেই শত্রুতা করবে এটা পূর্বে জানলে কি আর আমি একে সঙ্গে করে নিয়ে আসি? আল্লাহ না করুন যে, আমিও আ’দ সম্প্রদায়ের দুতের মত হয়ে যাই! রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন আমাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “আ’দ সম্প্রদায়ের দূতের ঘটনাটি কি?” যদিও এ ঘটনা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার চেয়ে বেশী ওয়াকিফহাল ছিলেন তথাপি আমাকে তিনি এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করায় আমি বলতে শুরু করলামঃ আ’দ সম্প্রদায়ের বসতিগুলোতে যখন কঠিন দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় এবং বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যায় তখন তারা তাদের একজন দূতকে প্রেরণ করে, যার নাম ছিল কাবল। এ লোকটি পথে মুআবিয়া ইবনে বিকরের বাড়ীতে এসে অবস্থান করে এবং তার বাড়ীতে মধ্যপানে ও তার ‘জারাদাতান’ নামক দু'জন দাসীর গান শুনতে এমনভাবে মগ্ন হয়ে পড়ে যে, সেখানেই তার একমাস কেটে যায়। অতঃপর সে জিবালে মুহরায় গিয়ে দু'আ করেঃ “হে আল্লাহ! আপনি তো খুব ভাল জানেন যে, আমি কোন রোগীর ওষুধের জন্যে অথবা কোন বন্দীর মুক্তিপণ আদায়ের জন্যে আসিনি। হে আল্লাহ! আ’দ সম্প্রদায়কে ওটা পান করান যা আপনি পান করিয়ে থাকেন।” অতঃপর কালো রঙ এর কয়েক খণ্ড মেঘ উঠলো। ওগুলো হতে শব্দ আসলোঃ “তুমি যেটা চাও পছন্দ করে নাও।” তখন সে কঠিন কালো মেঘখণ্ডটি পছন্দ করলো। তৎক্ষণাৎ ওর মধ্য হতে শব্দ আসলোঃ “ওকে ছাই ও মাটিতে পরিণতকারী করে দাও, যাতে আ’দ সম্প্রদায়ের একজনও বাকী না থাকে।” আমি যতটুকু জানতে পেরেছি তা এই যে, তাদের উপর শুধু আমার এই অঙ্গুরীর বৃত্ত পরিমাণ জায়গা দিয়ে বায়ু প্রবাহিত হয়েছিল এবং তাতেই তারা সবাই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।” হযরত আবু ওয়ায়েল (রঃ) বলেন যে, এটা সম্পূর্ণ সঠিক বর্ণনা। আরবে এই প্রথা ছিল যে, যখন তারা কোন দূত পাঠাতো তখন তাকে বলতোঃ “তুমি আ’দ সম্প্রদায়ের দূতের মত হয়ো না।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা খুবই দুর্বল বর্ণনা। যেমন সূরায়ে আ'রাফের তাফসীরে গত হয়েছে)
হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কখনো এমনভাবে খিলখিল করে হাসতে দেখিনি যে, তাঁর দাঁতের মাড়ি দেখা যায়। তিনি মুচকি হাসতেন। যখন আকাশে মেঘ উঠতো এবং ঝড় বইতে শুরু করতো তখন তার চেহারায় চিন্তার চিহ্ন প্রকাশিত হতো। একদিন আমি তাকে বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মেঘ ও বাতাস দেখে তো মানুষ খুশী হয় যে, মেঘ হতে বৃষ্টি বর্ষিত হবে। কিন্তু আপনার অবস্থা সম্পূর্ণ বিপরীত হয় কেন? উত্তরে তিনি বললেনঃ “হে আয়েশা (রাঃ)! ঐ মেঘের মধ্যে যে শাস্তি নেই এ ব্যাপারে আমি কি করে নিশ্চিন্ত হতে পারি? একটি সম্প্রদায়কে বাতাস দ্বারাই ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। একটি সম্প্রদায় শাস্তির মেঘ দেখে বলেছিলঃ এটা মেঘ, যা আমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করবে।”
হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন আকাশের কোন প্রান্তে মেঘ উঠতে দেখতেন তখন তিনি তাঁর সমস্ত কাজ ছেড়ে দিতেন, যদিও নামাযের মধ্যে থাকতেন। আর ঐ সময় তিনি নিম্নের দু'আটি পড়তেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! এর মধ্যে যে অকল্যাণ রয়েছে তা হতে আমি আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও এ হাদীসটি অন্য সনদে বর্ণিত হয়েছে) আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেলে তিনি মহামহিমান্বিত আল্লাহর প্রশংসা করতেন। আর ঐ মেঘ হতে বৃষ্টি বর্ষিত হলে তিনি নিম্ন লিখিত দুআটি পাঠ করতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট এর কল্যাণ, এর মধ্যে যা আছে তার কল্যাণ এবং এর সাথে যা পাঠানো হয়েছে তার কল্যাণ প্রার্থনা করছি। আর আপনার নিকট এর অমঙ্গল, এর মধ্যে যা আছে তার অমঙ্গল এবং এর সাথে যা পাঠানো হয়েছে তার অমঙ্গল ও অনিষ্ট হতে আপনার নিকট আশ্রয় চাচ্ছি।”
যখন আকাশে মেঘ উঠতো তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর রঙ পরিবর্তন হয়ে যেতো। কখনো তিনি ঘর হতে বাইরে যেতেন এবং কখনো বাহির হতে ভিতরে আসতেন। যখন বৃষ্টি বর্ষিত হয়ে যেতো তখন তার এই বিচলিত ভাব ও উদ্বেগ দূর হতো। হযরত আয়েশা (রাঃ) এটা বুঝতে পারতেন। একবার তিনি তাঁকে এ সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি উত্তরে বললেনঃ “হে আয়েশা (রাঃ)! আমি এই ভয় করি যে, না জানি হয়তো এটা ঐ মেঘই হয় না কি যে সম্পর্কে আ’দ সম্প্রদায় বলেছিলঃ এটা তো মেঘ, আমাদেরকে বৃষ্টি দান করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) সূরায়ে আ'রাফে আ’দ সম্প্রদায়ের ধ্বংসলীলার এবং হযরত হূদ (আঃ)-এর পূর্ণ ঘটনা অতীত হয়েছে। সুতরাং আমরা এখানে ওটার আর পুনরাবৃত্তি করছি না।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আ’দ সম্প্রদায়ের উপর অঙ্গুরীর বৃত্ত পরিমাণ জায়গা দিয়ে বাতাস প্রবাহিত হয়েছিল। এই বাতাস প্রথমে গ্রামবাসীর উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। অতঃপর তা প্রবাহিত হয় শহরবাসীর উপর। এদেখে তারা বলেঃ ‘এটা অবশ্যই আমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করবে। কিন্তু ওর মধ্যে আসলে ছিল জংলী লোকেরা। তাদেরকে ঐ শহরবাসীদের উপর নিক্ষেপ করা হয়। ফলে তারা সবাই ধ্বংস হয়ে যায়। ঐ সময় বাতাসের খাজাঞ্চীর উপর ওর ঔদ্ধত্য এতো তীব্র ছিল যে, ওটা দরযার ছিদ্র দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছিল। এসব ব্যাপারে মহান আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।