সূরা আল-জাসিয়া (আয়াত: 22)
হরকত ছাড়া:
وخلق الله السماوات والأرض بالحق ولتجزى كل نفس بما كسبت وهم لا يظلمون ﴿٢٢﴾
হরকত সহ:
وَ خَلَقَ اللّٰهُ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضَ بِالْحَقِّ وَ لِتُجْزٰی کُلُّ نَفْسٍۭ بِمَا کَسَبَتْ وَ هُمْ لَا یُظْلَمُوْنَ ﴿۲۲﴾
উচ্চারণ: ওয়া খালাকাল্লা-হুছ ছামা-ওয়াতি ওয়াল আরদাবিলহাক্কি ওয়া লিতুজযা-কুল্লুনাফছিম বিমা-কাছাবাত ওয়া হুম লা-ইউজলামূন।
আল বায়ান: আর আল্লাহ আসমানসমূহ ও যমীনকে যথার্থভাবে সৃষ্টি করেছেন এবং যাতে প্রত্যেক ব্যক্তি সে যা উপার্জন করেছে তদনুযায়ী প্রতিদানপ্রাপ্ত হয়, আর তারা সামান্যতমও যুলমের শিকার না হয়।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২২. আর আল্লাহ আসমানসমূহ ও যমীনকে সৃষ্টি করেছেন যথাযথভাবে এবং যাতে প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার কাজ অনুযায়ী ফল দেয়া যেতে পারে। আর তাদের প্রতি যুলুম করা হবে না।
তাইসীরুল ক্বুরআন: আল্লাহ আকাশ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন এক সত্যিকার লক্ষ্যে যাতে প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার কৃতকর্ম অনুযায়ী প্রতিফল দেয়া যেতে পারে, আর তাদের প্রতি কোন যুলম করা হবে না।
আহসানুল বায়ান: (২২) আল্লাহ যথাযথভাবে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন; যাতে প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার কর্মানুযায়ী ফল দেওয়া যেতে পারে। আর তাদের প্রতি যুলুম করা হবে না। [1]
মুজিবুর রহমান: আল্লাহ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন যথাযথভাবে এবং যাতে প্রত্যেক ব্যক্তি তার কাজ অনুযায়ী ফল পেতে পারে, আর তাদের প্রতি যুলম করা হবে না।
ফযলুর রহমান: আল্লাহ যথাযথভাবে আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন, যাতে প্রত্যেকেই তার কর্মের ফল পায়। তাদের প্রতি (কোন) জুলুম করা হবে না।
মুহিউদ্দিন খান: আল্লাহ নভোমন্ডল ও ভূ-মন্ডল যথাযথভাবে সৃষ্টি করেছেন, যাতে প্রত্যেক ব্যক্তি তার উপার্জনের ফল পায়। তাদের প্রতি যুলুম করা হবে না।
জহুরুল হক: আর আল্লাহ্ মহাকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন সত্যের সাথে, আর যাতে প্রত্যেক সত্ত্বাকে প্রতিফল দেওয়া হয় সে যা অর্জন করেছে তাই দিয়ে, আর তাদের প্রতি অন্যায় করা হবে না।
Sahih International: And Allah created the heavens and earth in truth and so that every soul may be recompensed for what it has earned, and they will not be wronged.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ২২. আর আল্লাহ আসমানসমূহ ও যমীনকে সৃষ্টি করেছেন যথাযথভাবে এবং যাতে প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার কাজ অনুযায়ী ফল দেয়া যেতে পারে। আর তাদের প্রতি যুলুম করা হবে না।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (২২) আল্লাহ যথাযথভাবে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন; যাতে প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার কর্মানুযায়ী ফল দেওয়া যেতে পারে। আর তাদের প্রতি যুলুম করা হবে না। [1]
তাফসীর:
[1] আর এটাই সুবিচার যে, কিয়ামতের দিন কোন পক্ষপাতিত্ব ছাড়াই ফায়সালা হবে এবং প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার আমল অনুযায়ী ভাল অথবা মন্দ প্রতিদান দেওয়া হবে। এ রকম হবে না যে, তিনি সৎ ও অসৎ উভয়ের সাথে একই ধরনের আচরণ করবেন; যেমন কাফেরদের ভ্রান্ত ধারণা। তাদের এই ধারণার খন্ডন পূর্বের আয়াতেও করা হয়েছে। কেননা, উভয়কে সমান সমান অবস্থায় রাখা যুলুম; অর্থাৎ, সুবিচারের বিপরীত এবং স্বতঃসিদ্ধ ও সর্বস্বীকৃত বিষয় তথা বাস্তব-বিরোধীও বটে। তাই যেমন নিমগাছ লাগিয়ে আঙ্গুর ফল অর্জন করা যায় না, অনুরূপ অন্যায় কাজ সম্পাদন করে সেই মর্যাদা লাভ করা যাবে না, যা আল্লাহ ঈমানদারদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ২১-২৩ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
কাফির-মুশরিকরা মনে করে যে, মৃত্যুর পর তাদের আর কোনই শাস্তি হবে না। তারা বলে, মৃত্যুর পর আমরা সবাই মাটিতে মিশে যাব, এর বেশি আর কিছুই হবে না। অথবা, যেভাবে দুনিয়াতে ওরা সমান সমান ছিল, অনুরূপ পরকালেও সমান সমান থাকবে। মরে সবাই শেষ হয়ে যাব। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা বলেন যে- না, এরূপ কখনোই হবে না। বরং মৃত্যুর পর পাপীদেরকে শাস্তি দেয়া হবে আর মু’মিনদেরকে পুরস্কৃত করা হবে। উভয়কে সমান সমান করা হবে না। কারণ মু’মিনগণ তাদের তুলনায় অধিক উত্তম। আল্লাহ তা‘আলার বাণী :
(لَا يَسْتَوِيْٓ أَصْحٰبُ النَّارِ وَأَصْحٰبُ الْجَنَّةِ ط أَصْحٰبُ الْجَنَّةِ هُمُ الْفَا۬ئِزُوْنَ)
“জাহান্নামের অধিবাসী এবং জান্নাতের অধিবাসী সমান নয়। জান্নাতবাসীরাই সফলকাম।” (সূরা হাশর ৫৯ : ২০)
আর এজন্যই আল্লাহ তা‘আলা বলেন, তারা যে সিদ্ধান্ত নেয় তা কতই না মন্দ সিদ্ধান্ত। কারণ তিনি আকাশ ও জমিন সৃষ্টিই করেছেন এ জন্য যে, তিনি তাদের মধ্যে সঠিকভাবে ফায়সালা করবেন। যে ব্যক্তি যেমন আমল করবে তাকে তদ্রƒপ প্রতিদান দেয়া হবে, কোন প্রকার জুলুম বা অত্যাচার করা হবে না।
এরপর আল্লাহ তা‘আলা একটি উপমা বর্ণনা করেছেন ঐ ব্যক্তির, যে নিজের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করে। যার ফলে সে হক ও বাতিলের পার্থক্য করতে পারে না, বরং তার প্রবৃত্তি যেটাকে ভাল মনে করে সেটাকেই সে ভাল মনে করে, আর প্রবৃত্তি যেটাকে খারাপ মনে করে সেটাকেই খারাপ মনে করে। আল্লাহ তা‘আলা এবং তাঁর রাসূলের বিধি-বিধানের ওপর সে তার প্রবৃত্তিকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। আর এ কারণেই আল্লাহ তা‘আলা তাকে বিভ্রান্ত করেছেন। কারণ তিনি জানেন যে, সে এ ভ্রষ্টতারই উপযুক্ত। যার ফলে ভাল কথা শ্রবণ করা থেকে তার কান এবং হিদায়াত গ্রহণ করা হতে তার অন্তর বঞ্চিত হয়ে গেছে। আর তার চোখের ওপর পড়ে গেছে আবরণ যার কারণে সে সত্য জিনিস দেখতে পায় না। কারণ আল্লাহ জানেন সে এ পথেরই উপযুক্ত। আর আল্লাহ তা‘আলা যাকে বিভ্রান্ত করেন সে কখনো সঠিক পথ পায় না। আল্লাহ তা‘আলার বাণী :
(مَنْ يُّضْلِلِ اللّٰهُ فَلَا هَادِيَ لَه۫ ط وَيَذَرُهُمْ فِيْ طُغْيَانِهِمْ يَعْمَهُوْنَ)
“আল্লাহ যাদেরকে পথভ্রষ্ট করেন তাদের কোন পথপ্রদর্শক নেই, আর তাদেরকে তিনি তাদের অবাধ্যতায় উদ্ভ্রান্তের ন্যায় ঘুরে বেড়াতে ছেড়ে দেন।” (সূরা আ‘রাফ ৭ : ১৮৬)
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. সৎ কর্মপরায়ণ ও অসৎ কর্মপরায়ণ ব্যক্তির প্রতিদান কখনো সমান হতে পারে না।
২. প্রত্যেককে তার যথাযথ প্রাপ্য দেয়া হবে, কারো প্রতি বিন্দু পরিমাণ জুলুম করা হবে না।
৩. নিজের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করা যাবে না। কেননা প্রবৃত্তি কখনো ভাল কাজ করতে সম্মতি দেয় না।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ২১-২৩ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, মুমিন ও কাফির সমান নয়। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “জাহান্নামের অধিবাসী এবং জান্নাতের অধিবাসী সমান নয়। জান্নাতবাসীরাই সফলকাম।`(৫৯:২০) এখানেও আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ এরূপ হতে পারে না যে, কাফির ও দুষ্কৃতিকারী এবং মুমিন ও সৎকর্মশীল মরণ ও জীবনে এবং দুনিয়া ও আখিরাতে সমান হয়ে যাবে। যারা এটা মনে করে যে, আমি জীবন ও মৃত্যুর দিক দিয়ে দুষ্কৃতিকারী ও মুমিনদেরকে সমান গণ্য করবো, তাদের সিদ্ধান্ত কতইনা মন্দ!
হযরত আবু যার (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা স্বীয় দ্বীনের ভিত্তি চারটি স্তম্ভের উপর স্থাপন করেছেন। যে ব্যক্তি এগুলো হতে সরে যাবে এবং এগুলোর উপর আমল করবে না সে পাপাসক্ত অবস্থায় আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে।” জিজ্ঞেস করা হলোঃ “হে আবু যার (রাঃ)! ঐগুলো কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “এই বিশ্বাস রাখতে হবে যে, হালাল ও হারাম এবং আদেশ ও নিষেধ এ চারটি বিষয় আল্লাহ তাআলারই অধিকারভুক্ত। তার হালালকে হালাল মেনে নেয়া, হারামকে হারাম বলেই স্বীকার করা, তার আদেশকে আমলযোগ্য ও স্বীকারযোগ্য রূপে মেনে নেয়া এবং তার নিষিদ্ধ কার্য হতে বিরত থাকা। হালাল, হারাম, আদেশ এবং নিষেধের মালিক একমাত্র আল্লাহকেই মনে করা। এগুলোই হলো দ্বীনের মূল। আবুল কাসেম (সঃ) বলেছেনঃ “বাবলা গাছ হতে যেমন আঙ্গুর ফল লাভ করা যায় না, ঠিক তেমনই অসৎপরায়ণ ব্যক্তি সৎকর্মশীল ব্যক্তির মর্যাদা লাভ করতে পারে না।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু ইয়ালা বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি গারীব বা দুর্বল)
মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ)-এর সীরাত গ্রন্থে রয়েছে যে, কাবা শরীফের ভিত্তির মধ্যে একটি পাথর পাওয়া গিয়েছিল। তাতে লিখিত ছিলঃ “তোমরা দুষ্কর্ম করছো, আর কল্যাণ লাভের আশা রাখছে। এটা ঠিক ঐরূপ যেমন কেউ কোন কন্টকযুক্ত গাছ হতে আঙ্গুর ফলের আশা করে।”
বর্ণিত আছে যে, হযরত তামীম দারী (রাঃ) সারারাত ধরে তাহাজ্জুদের নামাযে বার বার ... (আরবী)-এই আয়াতটি পড়তে থাকেন, শেষ পর্যন্ত ফজর হয়ে যায়। (এটা ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
এজন্যেই আল্লাহ বলেনঃ “তাদের সিদ্ধান্ত কতই না মন্দ!’ এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন যথাযথভাবে। তিনি প্রত্যেককে তার কৃতকর্মের প্রতিফল প্রদান করবেন। কারো প্রতি বিন্দুমাত্র যুলুম করা হবে না।
মহান আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি তার প্রতিও লক্ষ্য করেছে, যে তার খেয়াল-খুশীকে তার মা'বুদ বানিয়ে নিয়েছে। তার যে কাজ করতে মন চেয়েছে। তা সে করেছে। আর যে কাজ করতে তার মন চায়নি তা পরিত্যাগ করেছে।
এ আয়াতটি মু'তাযিলা সম্প্রদায়ের এই মূল নীতিকে খণ্ডন করেছে যে, ভাল কাজ ও মন্দ কাজ হলো জ্ঞান সম্পকীয় ব্যাপার। ইমাম মালিক (রঃ) এই আয়াতের তাফসীর করতে গিয়ে বলেনঃ যার ইবাদতের খেয়াল তার মনে জাগ্রত হয় তারই সে ইবাদত করতে শুরু করে। এর পরবর্তী বাক্যটির দু’টি অর্থ হবে। (প্রথম) আল্লাহ তাআলা স্বীয় জ্ঞানের ভিত্তিতে তাকে বিভ্রান্তির যোগ্য মনে করে তাকে বিভ্রান্ত করে দেন। (দ্বিতীয়) তার কাছে জ্ঞান, যুক্তি-প্রমাণ এবং দলীল-সনদ এসে যাওয়ার পর আল্লাহ তাআলা তাকে বিভ্রান্ত করেন। এই দ্বিতীয় অর্থটি প্রথম অর্থটিকে অপরিহার্য করে এবং প্রথম অর্থ দ্বিতীয় অর্থকেও অপরিহার্য করে।
মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তার কর্ণে মোহর রয়েছে, তাই সে শরীয়তের কথা শুনেই না এবং তার হৃদয়েও মোহর রয়েছে, তাই হিদায়াতের কথা তার হৃদয়ে স্থান পায় না। তার চক্ষুর উপর পর্দা পড়ে আছে, তাই সে কোন দলীল-প্রমাণ দেখতে পায় না। অতএব, আল্লাহর পরে কে তাকে পথ-নির্দেশ করবে? তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?” যেমন আল্লাহ তাআলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন তার কোন পথ-প্রদর্শক নেই এবং তিনি তাদেরকে তাদের অবাধ্যতায় বিভ্রান্তের ন্যায় ঘুরে বেড়াতে দেন।”(৭:১৮৬)
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।