সূরা আদ-দুখান (আয়াত: 3)
হরকত ছাড়া:
إنا أنزلناه في ليلة مباركة إنا كنا منذرين ﴿٣﴾
হরকত সহ:
اِنَّاۤ اَنْزَلْنٰهُ فِیْ لَیْلَۃٍ مُّبٰرَکَۃٍ اِنَّا کُنَّا مُنْذِرِیْنَ ﴿۳﴾
উচ্চারণ: ইন্নাআনযালনা-হূফী লাইলাতিম মুবা-রাকাতিন ইন্না-কুন্না-মুনযিরীন।
আল বায়ান: নিশ্চয় আমি এটি নাযিল করেছি বরকতময় রাতে; নিশ্চয় আমি সতর্ককারী।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩. নিশ্চয় আমরা এটা নাযিল করেছি এক মুবারক রাতে(১); নিশ্চয় আমরা সতর্ককারী।
তাইসীরুল ক্বুরআন: আমি একে অবতীর্ণ করেছি এক বরকতময় রাতে, (কেননা) আমি (মানুষকে) সতর্ককারী।
আহসানুল বায়ান: (৩) নিশ্চয় আমি এ (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি এক বরকতময় (আশিসপূত শবেকদর) রাতে;[1] নিশ্চয় আমি সতর্ককারী। [2]
মুজিবুর রহমান: আমি ইহা অবতীর্ণ করেছি এক মুবারাক রাতে, আমিতো সতর্ককারী।
ফযলুর রহমান: আমি একে (এই কোরআন) নাযিল করেছি এক বরকতময় রাতে (শবে কদরে)। নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী।
মুহিউদ্দিন খান: আমি একে নাযিল করেছি। এক বরকতময় রাতে, নিশ্চয় আমি সতর্ককারী।
জহুরুল হক: নিঃসন্দেহ আমরা এটি অবতারণ করেছি এক পবিত্র রাত্রিতে, নিঃসন্দেহ আমরা চির-সতর্ককারী।
Sahih International: Indeed, We sent it down during a blessed night. Indeed, We were to warn [mankind].
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৩. নিশ্চয় আমরা এটা নাযিল করেছি এক মুবারক রাতে(১); নিশ্চয় আমরা সতর্ককারী।
তাফসীর:
(১) গ্ৰহণযোগ্য তাফসীরবিদদের মতে এখানে কদরের রাত্ৰি বোঝানো হয়েছে, যা রমযান মাসের শেষ দশকে হয়। সূরা কদরে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, পবিত্র কুরআন শবে-কদরে নাযিল হয়েছে। এতে বোঝা গেল যে, এখানেও বরকতের রাত্রি বলে শবে-কদরই বোঝানো হয়েছে। এ রাত্রিকে “মোবারক” বলার কারণ এই যে, এ রাত্ৰিতে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে অসংখ্য কল্যাণ ও বরকত নাযিল হয়। এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন, দুনিয়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা পয়গম্বরগণের প্রতি যত কিতাব নাযিল করেছেন, তা সবই রমযান মাসেরই বিভিন্ন তারিখে নাযিল হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর সহীফাসমূহ রমযানের প্রথম তারিখে, তাওরাত ছয় তারিখে, যাবুর বার তারিখে, ইঞ্জল আঠার তারিখে এবং কুরআন চব্বিশ তারিখ অতিবাহিত হওয়ার পর (পঁচিশের রাত্ৰিতে) অবতীর্ণ হয়েছে। [মুসনাদে আহমাদ: ৪/১০৭]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৩) নিশ্চয় আমি এ (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি এক বরকতময় (আশিসপূত শবেকদর) রাতে;[1] নিশ্চয় আমি সতর্ককারী। [2]
তাফসীর:
[1] (لَيْلَةٌ مُبَارَكَةٌ) বরকতময় বা আশিসপূত রাত বলতে (لَيْلَةُ الْقَدْرِ) কদরের রাত (শবেক্বদরকে) বুঝানো হয়েছে। যেমন, অন্যত্র পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, {اِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ} অর্থাৎ, আমি এ কুরআন শবেক্বদরে (মহিয়সী রাতে) অবতীর্ণ করেছি। (সূরা কদর) আর এই শবেক্বদর রমযানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোর মধ্যে কোন একটি রাত; যেমন হাদীসে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। সুতরাং কুরআন অবতীর্ণ হয় রমযান মাসে। যেমন মহান আল্লাহ বলেন, {شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِيْ أُنْزِلَ فِيْهِ الْقُرْآنُ} অর্থাৎ, রমযান মাসে কুরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে। (সূরা বাক্বারাহ ১৮৫) এই আয়াতে কদরের এই রাতকে বরকতময় রাত গণ্য করা হয়েছে। আর এই বরকতময় হওয়াতে সন্দেহই বা কি? প্রথমতঃ এ রাতে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। দ্বিতীয়তঃ এ রাতে বহু ফিরিশতা সহ জিবরীল আমীনও অবতরণ করেন। তৃতীয়তঃ সারা বছরে সংঘটিত হবে এমন ঘটনাবলীর ফায়সালা করা হয়। (যে কথা পরে আসছে।) চতুর্থতঃ এই রাতের ইবাদত হাজার মাস (৮৩ বছর ৪ মাস) এর ইবাদতের থেকেও উত্তম। শবেকদর বা বরকতময় রাতে কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার অর্থ হল, এই রাত থেকে নবী (সাঃ)-এর উপর কুরআন অবতীর্ণ হওয়া আরম্ভ হয়। অর্থাৎ, সর্বপ্রথম এই রাতেই তাঁর উপর কুরআন অবতীর্ণ হয়। অথবা অর্থ হল, এই রাতে ‘লাওহে মাহফুয’ থেকে কুরআনকে ‘বায়তুল ইয্যাহ’তে অবতীর্ণ করা হয়, যা নিকটতম আসমানে অবস্থিত। অতঃপর সেখান থেকে প্রয়োজন ও ঘটনাঘটনের চাহিদা অনুযায়ী ২৩ বছরের বিভিন্ন সময়ে নবী করীম (সাঃ)-এর উপর অবতীর্ণ করা হয়। কেউ কেউ لَيلَة مُبارَكَة ‘বরকতময় রাত’ বলতে শা’বান মাসের ১৫ তারীখের রাত (শবেবরাত)-কে বুঝিয়েছেন। কিন্তু এ কথা সঠিক নয়। যখন কুরআনের স্পষ্ট উক্তি দ্বারা এ কথা সুসাব্যস্ত যে, কুরআন শবেক্বদরে অবতীর্ণ হয়েছে, তখন এ থেকে শবেবরাত অর্থ নেওয়া কোনভাবেই ঠিক নয়। তাছাড়া শবেবরাত (শা’বান মাসের ১৫ তারীখের রাত) এর ব্যাপারে যতগুলো বর্ণনা এসেছে, যাতে এ রাতের মাহাত্ম্য ও ফযীলতের কথা বর্ণিত হয়েছে অথবা যাতে এ রাতকে ভাগ্য নির্ধারণের রাত বলা হয়েছে, সে সমস্ত বর্ণনাগুলো সনদের দিক দিয়ে জাল অথবা দুর্বল। অতএব সে (বর্ণনা)গুলো কুরআনের সুস্পষ্ট বর্ণনার মোকাবেলা কিভাবে করতে পারে?
[2] অর্থাৎ, কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার উদ্দেশ্য হল, মানুষকে শরয়ী উপকার-অপকার সম্পর্কে অবহিত ও সতর্ক করা, যাতে তাদের উপর হুজ্জত কায়েম হয়ে যায়।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: নামকরণ ও ফযীলত :
(الدُّخَانُ) দুখান শব্দের অর্থ ধোঁয়া। কিয়ামত সংঘঠিত হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে এর আলামতস্বরূপ আকাশ সম্পূর্ণরূপে ধোঁয়ায় আচ্ছাদিত হয়ে যাবে, সেদিন আকাশে ধোঁয়া ব্যতীত আর কিছুই দেখতে পাওয়া যাবে না। অত্র সূরার ১০ নম্বর আয়াতে উল্লেখিত দুখান শব্দ থেকে এ নামে সূরার নামকরণ করা হয়েছে।
এ সূরার ফযীলতের ব্যাপারে যত বর্ণনা রয়েছে প্রায় সকল বর্ণনাই ত্র“টিযুক্ত। সুতরাং তা উল্লেখ করা থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়।
১-৮ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
حٰمٓ (হা-মীম) এ জাতীয় “হুরূফুল মুক্বাত্বআত” বা বিচ্ছিন্ন অক্ষর সম্পর্কে সূরা আল বাকারার শুরুতে আলোচনা করা হয়েছে। এগুলোর সঠিক উদ্দেশ্য ও অর্থ একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই ভাল জানেন।
এরপর আল্লাহ তা‘আলা সুস্পষ্ট কিতাব তথা পবিত্র কুরআনের শপথ করে বলেন, নিশ্চয়ই আমি এ কুরআন অবতীর্ণ করেছি বরকতময় রাতে। এ বরকতময় রাতটি হলো রমাযান মাসের কদরের রাত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِيْٓ أُنْزِلَ فِيْهِ الْقُرْاٰنُ هُدًي لِّلنَّاسِ وَبَيِّنٰتٍ مِّنَ الْهُدٰي وَالْفُرْقَانِ)
“রমাযান তো সেই মাস যে মাসে কুরআন নাযিল করা হয়েছে, যা মানুষের জন্য পথপ্রদর্শক এবং হিদায়াতের স্পষ্ট নিদর্শন ও ফুরকান (সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী)।” (সূরা বাকারাহ্ ২ : ১৮৫)
কদরের রাতে কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(إِنَّآ أَنْزَلْنٰهُ فِيْ لَيْلَةِ الْقَدْرِ)
“নিশ্চয়ই আমি একে (কুরআন) নাযিল করেছি কদরের রাতে।” (সূরা ক্বাদ্র ৯৭ : ১)
আর এ শবে কদর রমাযানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোর মধ্যে কোন একটি রাত।
ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : তোমরা লাইলাতুল কদর অšে¦ষণ করো রমাযানের শেষ দশকে। (সহীহ বুখারী হা. ২০২১)
সুতরাং কুরআন অবতীর্ণ হয় রমাযান মাসের কদরের রাতে, যা বরকতময় রাত হিসেবে এ আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। এ রাত বরকতময় এ জন্য যে :
১. এ রাতে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে।
২. এ রাতে বহু ফেরেশতাসহ জিবরীল আমীন পৃথিবীতে অবতরণ করেন।
৩. সারা বছরে সংঘটিত হবে এমন কার্যের ফায়সালা করা হয়।
৪. এ রাতের ইবাদত হাজার মাসের ইবাদত অপেক্ষা উত্তম।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : ইবরাহীম (আঃ)-এর সহীফাসমূহ রমাযানের প্রথম তারিখে, তাওরাত ছয় তারিখে, যাবূর বার তারিখে, ইঞ্জিল আঠার তারিখে এবং কুরআন চব্বিশ তারিখে অবতীর্ণ হয়েছে। (সিলসিলা সহীহাহ হা. ১৫৭৫)
কুরআন শবে কদরে নাযিল হওয়ার অর্থ এই যে, লাওহে মাহফূয থেকে সমগ্র কুরআন দুনিয়ার আকাশে এ রাতেই নাযিল হয়েছে। অতঃপর নবুওয়াতের তেইশ বছরে প্রয়োজনানুপাতে খণ্ড খণ্ড করে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি নাযিল করা হয়েছে। কেউ বলেছেন, প্রতি বছর যতটুকু কুরআন নাযিল হওয়া প্রয়োজন ছিল, ততটুকুই শবে কদরে দুনিয়ার আকাশে নাযিল হয়েছে। (কুরতুবী)
কেউ কেউ (لَيْلَةٌ مُبَارَكَةٌ) (বরকতময় রাত) বলতে শা‘বান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতকে বলে থাকেন। এ কথা সঠিক নয়। কুরআনের স্পষ্ট উক্তি দ্বারা এ কথা সাব্যস্ত যে, কুরআন কদরের রাতে অবতীর্ণ হয়েছে, আর কদরের রাত রমাযান মাসে হয়, শাবান মাসে নয়। সুতরাং সূরা কদর ও সূরা বাকারার ১৮৫ নম্বর আয়াত বলে দিচ্ছে- এ বরকতময় রাত্রি হচ্ছে কদরের রাত, এ থেকে শবে বরাত অর্থ নেয়া কোনক্রমেই সঠিক নয়। তাছাড়া শবে বরাত এর ব্যাপারে যে-সব বর্ণনাতে মাহাত্ম্য ও ফযীলতের কথা বর্ণিত হয়েছে অথবা এ রাতকে ভাগ্য নির্ধারণের রাত বলা হয়েছে, সে সমস্ত বর্ণনাগুলো সনদের দিক থেকে জাল ও বানোয়াট। অতএব কুরআন কদরের রাতে অবতীর্ণ হয়েছে; এটাই সঠিক কথা। যারা বলবে, কুরআন শবে বরাতের রাতে অবতীর্ণ হয়েছে তাদের কথা বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।
এরপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন, আর এ রাত্রিতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ফায়সালা করা হয়। অর্থাৎ লাওহে মাহফূয হতে লেখক ফেরেশতাদের ওপর দায়িত্ব অর্পণ করা হয়।
সারা বছরের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেমন বয়স, জীবিকা এবং পরবর্তী বছর পর্যন্ত যা ঘটবে ইত্যাদি স্থিরীকৃত হয়। সাহাবা ও তাবেঈগণ উক্ত আয়াতের এরূপ ব্যাখ্যাই করেছেন। আর এ সমস্ত কার্য-কলাপ একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশক্রমেই হয়ে থাকে। এমন কোনই কার্য সম্পাদন হয় না যা তিনি জানেন না।
(رَحْمَةً مِّنْ رَّبِّکَ)
এখানে রহমত বলতে যা বুঝোনো হয়েছে তা হলো, গ্রন্থসমূহ অবতীর্ণ করার সাথে সাথে রাসূলগণকে প্রেরণ করা। যাতে নাবী-রাসূলগণ উক্ত কিতাবের বিধি-বিধানগুলো স্পষ্টভাবে মানুষের নিকট বর্ণনা করে দেন।
এরপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন, তিনিই আকাশসমূহ ও জমিনের মালিক এবং এতদুভয়ের মধ্যে যা কিছু রয়েছে তারও। আর তিনিই একমাত্র ইলাহ, যিনি জীবন দান করেন এবং মৃত্যু ঘটান। এ সম্পর্কে সূরা আল আ‘রাফ-এর ১৫৮ নম্বর আয়াতেও আলোচনা করা হয়েছে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. কুরআন শবে কদরে অবতীর্ণ হয়েছে, শবে বরাতে নয়।
২. শবে কদর একটি বরকতময় রাত, যে রাতের ইবাদত হাজার মাসের ইবাদত অপেক্ষা উত্তম।
৩. শবে কদরে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত করা হয়।
৪. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হলেন সকলের জন্য রহমতস্বরূপ।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি রাত্রে সূরায়ে হা-মীম আদ দুখান পাঠ করে, সকাল পর্যন্ত তার জন্যে সত্তর হাজার ফেরেশতা ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন।` (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি গারীব। এর আমর ইবনে খুশউম নামক একজন বর্ণনাকারী দুর্বল। ইমাম বুখারী (রঃ) তাকে মুনকারুল হাদীস বলেছেন)
হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি হা-মীম আদ দুখান জুমআর রাত্রে পাঠ করে তার গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়।” (এ হাদীসটিও ইমাম তিরমিযী বর্ণনা করেছেন। এটাও গারীব হাদীস। এর আবুল মিকদাম হিশাম নামক একজন বর্ণনাকারী দুর্বল এবং দ্বিতীয় বর্ণনাকারী হাসানের হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে শোনা সাব্যস্ত নয়)
হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা ইবনে সাইয়াদের সামনে সূরায়ে দুখানকে নিজের অন্তরে গোপন রেখে তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আমার অন্তরে কি আছে বল তো?” উত্তরে সে বললোঃ (আরবী) রয়েছে।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “তুমি ধ্বংস হও। তুমি ব্যর্থ মনোরথ হয়েছে। আল্লাহ যা চান তাই হয়। অতঃপর তিনি সেখান হতে ফিরে আসেন।” (এ হাদীসটি মুসনাদে বাযযারে বর্ণিত হয়েছে)
১-৮ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, এই কুরআন কারীমকে তিনি কল্যাণময় রাত্রিতে অর্থাৎ কদরের রাত্রিতে অবতীর্ণ করেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি এটা অবতীর্ণ করেছি মহিমান্বিত রজনীতে।”(৯৭:১) অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “ঐ রমযান মাস যাতে কুরআন অবতীর্ণ করা হয়।”(২:১৮৫) সূরায়ে বাকারায় এর তাফসীর গত হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন।
কোন কোন লোক এ কথাও বলেছেন যে, যে মুবারক রজনীতে কুরআন কারীম অবতীর্ণ হয় তা হলো শাবান মাসের পঞ্চদশ তম রাত্রি। কিন্তু এটা সরাসরি কষ্টকর উক্তি। কেননা, কুরআনের স্পষ্ট ও পরিষ্কার কথা দ্বারা কুরআনের রমযান মাসে নাযিল হওয়া সাব্যস্ত হয়েছে। আর যে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, শা'বান মাসে পরবর্তী শা'বান মাস পর্যন্ত সমস্ত কাজ নির্ধারণ করে দেয়া হয়, এমনকি বিবাহ হওয়া, সন্তান হওয়া এবং মৃত্যু বরণ করাও নির্ধারিত হয়ে যায়, ঐ হাদীসটি মুরসাল। এরূপ হাদীস দ্বারা কুরআন কারীমের স্পষ্ট কথার বিরোধিতা করা যায় না।
আল্লাহ পাক বলেনঃ “আমি তো সতর্ককারী অর্থাৎ আমি মানুষকে ভাল ও মন্দ এবং পাপ ও পুণ্য সম্পর্কে অবহিতকারী, যাতে তাদের উপর যুক্তিপ্রমাণ। সাব্যস্ত হয়ে যায় এবং তারা শরীয়তের জ্ঞান লাভ করতে পারে। এই রজনীতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়। অর্থাৎ লাওহে মাহফুয হতে লেখক ফেরেশতাদের দায়িত্বে অর্পণ করা হয়। সারা বছরের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেমন বয়স, জীবিকা ইত্যাদি স্থিরীকৃত হয়। (আরবী) শব্দের অর্থ হলো মুহকাম বা মযবূত, যার পরিবর্তন নেই। সবই আল্লাহর নির্দেশক্রমে হয়ে থাকে। তিনি রাসূল প্রেরণ করে থাকেন যেন তারা তাঁর নিদর্শনাবলী তার বান্দাদেরকে শুনিয়ে দেন, যেগুলোর তারা খুবই প্রয়োজন বোধ করে।
এটা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর অনুগ্রহ স্বরূপ। তিনি তো সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ যিনি আকাশমণ্ডলী, পৃথিবী এবং এগুলোর মধ্যস্থিত সবকিছুরই প্রতিপালক এবং সবকিছুরই অধিকর্তা। সবারই সৃষ্টিকর্তা তিনিই। মানুষ যদি বিশ্বাসী হয় তবে তাদের বিশ্বাসযোগ্য যথেষ্ট কারণ বিদ্যমান রয়েছে।
মহান আল্লাহ বলেনঃ তিনিই একমাত্র মাবুদ। তিনি ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই। তিনিই জীবন দান করেন এবং তিনিই মৃত্যু ঘটিয়ে থাকেন। তিনিই তোমাদের প্রতিপালক এবং তোমাদের পূর্বপুরুষদেরও প্রতিপালক।
এ আয়াতটি আল্লাহ তাআলার নিম্নের উক্তির মতঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী সঃ)! তুমি ঘোষণা করে দাও- হে লোক সকল! আমি তোমাদের সবারই নিকট ঐ আল্লাহর রাসূল রূপে প্রেরিত হয়েছি যার রাজত্ব হচ্ছে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীব্যাপী, তিনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই। তিনিই জীবন দান করেন এবং তিনিই মৃত্যু ঘটিয়ে থাকেন।”(৭:১৫৮)।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।