আল কুরআন


সূরা আয-যুখরুফ (আয়াত: 53)

সূরা আয-যুখরুফ (আয়াত: 53)



হরকত ছাড়া:

فلولا ألقي عليه أسورة من ذهب أو جاء معه الملائكة مقترنين ﴿٥٣﴾




হরকত সহ:

فَلَوْ لَاۤ اُلْقِیَ عَلَیْهِ اَسْوِرَۃٌ مِّنْ ذَهَبٍ اَوْ جَآءَ مَعَهُ الْمَلٰٓئِکَۃُ مُقْتَرِنِیْنَ ﴿۵۳﴾




উচ্চারণ: ফালাওলাউলকিয়া ‘আলাইহি আছবিরাতুমমিনযাহাবিন আও জাআ মা‘আহুল মালাইকাতুমুকতারিনীন।




আল বায়ান: ‘তবে তাকে কেন স্বর্ণবলয় প্রদান করা হল না অথবা দলবদ্ধভাবে ফেরেশতাগণ তার সাথে কেন আসল না?’




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৫৩. তবে তাকে (মুসা) কেন দেয়া হল না স্বৰ্ণ-বলয় অথবা তার সংগে কেন আসল না ফেরেশতাগণ দলবদ্ধভাবে?




তাইসীরুল ক্বুরআন: (সে যদি আল্লাহর রসূলই হয়ে থাকে) তাহলে তাঁকে কেন স্বর্ণ কঙ্কন দেয়া হল না? অথবা সারিবদ্ধভাবে ফেরেশতারা কেন তার সাথে আসল না?




আহসানুল বায়ান: (৫৩) সে নবী হলে তাকে স্বর্ণের বালা দেওয়া হল না কেন[1] অথবা তার সঙ্গে দলবদ্ধভাবে ফিরিশতাগণ এল না কেন?’ [2]



মুজিবুর রহমান: মূসাকে কেন দেয়া হল না স্বর্ণ বলয়, অথবা তার সাথে কেন এলো না মালাইকা/ফেরেশতা দলবদ্ধভাবে?



ফযলুর রহমান: “(সে যদি আল্লাহর নবীই হবে) তাহলে কেন তাকে সোনার কঙ্কণ দেওয়া হল না? কেনই বা তার সাথে দল বেঁধে ফেরেশতারা এল না?”



মুহিউদ্দিন খান: তাকে কেন স্বর্ণবলয় পরিধান করানো হল না, অথবা কেন আসল না তার সঙ্গে ফেরেশতাগণ দল বেঁধে?



জহুরুল হক: তবে কেন সোনার কঙ্কন তার প্রতি ছোড়া হল না, অথবা তার সঙ্গে কেন ফিরিশতারা এল না সারিবদ্ধভাবে।



Sahih International: Then why have there not been placed upon him bracelets of gold or come with him the angels in conjunction?"



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৫৩. তবে তাকে (মুসা) কেন দেয়া হল না স্বৰ্ণ-বলয় অথবা তার সংগে কেন আসল না ফেরেশতাগণ দলবদ্ধভাবে?


তাফসীর:

-


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৫৩) সে নবী হলে তাকে স্বর্ণের বালা দেওয়া হল না কেন[1] অথবা তার সঙ্গে দলবদ্ধভাবে ফিরিশতাগণ এল না কেন?” [2]


তাফসীর:

[1] সে যুগে মিসর ও পারস্যের বাদশাহরা (জনসাধারণের উপর) পৃথক মর্যাদা ও বিশেষ সম্মানকে বিকশিত করার জন্য সোনার বালা পরিধান করত। অনুরূপ গোত্রের সর্দারদের হাতেও সোনার বালা এবং গলায় সোনার হার ও চেন পরিয়ে দেওয়া হত। আর এগুলোকে তাদের সর্দারির নিদর্শন মনে করা হত। এই জন্যই ফিরআউন মূসা (আঃ) সম্পর্কে বলল যে, যদি তাঁর কোন মর্যাদা ও পৃথক কোন বৈশিষ্ট্য থাকত, তবে তাঁর হাতে সোনার বালা থাকা উচিত ছিল।

[2] যাঁরা এ কথার সত্যায়ন করতেন যে, এ (মূসা) হলেন আল্লাহর রসূল। অথবা বাদশাহদের মত তাঁর মান-মর্যাদাকে প্রকাশ করার জন্য তাঁর সাথে থাকতেন।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৪৬-৫৬ নম্বর আয়াতের তাফসীর :



আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আঃ)-কে সুস্পষ্ট দলীল ও নির্দশনসহ ফির‘আউন ও তার পরিষদবর্গের কাছে প্রেরণ করেন, যাতে তিনি তাদেরকে এক আল্লাহ তা‘আলার ‘ইবাদত করার জন্য আহ্বান করেন এবং তিনি ছাড়া অন্য কারো ‘ইবাদত করা থেকে বিরত থাকারও আহ্বান জানান। কিন্তু মূসা (আঃ) যখন এ দা‘ওয়াত নিয়ে তাদের নিকট আসলেন তখনই তারা তার প্রতি ঠাট্টা-বিদ্রূপ করল। তাদের এ ঠাট্টা-বিদ্রূপ করার ফলে তারা যখন শাস্তিপ্রাপ্ত হলো তখন বলল : হে জাদুকর! তুমি তোমার প্রভুর কাছে দু‘আ কর যদি তিনি আমাদেরকে এ সকল শাস্তি থেকে মুক্তি দেন তাহলে আমরা তোমার প্রতি ঈমান আনব। অতঃপর তাদের ওপর থেকে শাস্তি দুর করে দেয়া হলেও তারা ঈমান আনল না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন : “এবং যখন তাদের ওপর শাস্তি আসত তখন তারা বলত, ‘হে মূসা! তুমি তোমার প্রতিপালকের নিকট আমাদের জন্য প্রার্থনা কর- তোমার সাথে তিনি যে অঙ্গীকার করেছেন তদনুযায়ী, যদি তুমি আমাদের হতে শাস্তি অপসারিত কর তবে আমরা ঈমান আনবই এবং বানী ইস্রাঈলকেও তোমার সাথে অবশ্যই পাঠিয়ে দেব।’ আমি যখনই তাদের ওপর হতে শাস্তি অপসারিত করতাম এক নির্দিষ্ট কালের জন্য যা তাদের জন্য নির্ধারিত ছিল, তারা তখনই তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গ করত।” (সূরা আ‘রাফ ৭ : ১৩৪-১৩৫)



অবশেষে তারা ঈমান আনা থেকে বিরতই থাকল এবং তারা তাদের পূর্ব ধর্মেরই অনুসরণ করতে থাকল আর মূসা (আঃ)-কে অস্বীকার করল।



ফির‘আউন তার বড়ত্ত্ব ও মহত্ত্ব প্রকাশ করে পরিষদবর্গকে বলেছিল, হে আমার সম্প্রদায়! এ মিসরের রাজত্ব কি আমার নয়? এ নদী কি আমার পাদদেশে প্রবাহিত নয়? আর আমি কি ঐ ব্যক্তির থেকে উত্তম নই যে স্পষ্ট ভাষায় কথাও বলতে পারে না? তখন সে বিভিন্ন যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে তার সম্প্রদায়কে হতবুদ্ধি করে দিলো।



ফলে তারা মূসা (আঃ)-কে অস্বীকার করল এবং ফির‘আউনের অনুগামী হয়ে থাকল। এভাবেই তারা সত্য পথ হতে বিচ্যুত থাকল। অবশেষে তারা সমুদ্রে নিমজ্জিত হয়ে মৃত্যু বরণ করল।



সুতরাং দাওয়াতী কাজ দেশের শাসক শ্রেণিদের কাছেও পৌঁছাতে হবে, বরং তাদেরকেই আগে দেয়া উচিত, কারণ তাদের মাঝে পরিবর্তন আসলে সারা দেশে পরিবর্তন চলে আসবে। যেমন সুলাইমান (আঃ) দেশের রাণী বিলকিসকে দাওয়াত দিয়েছিলেন। নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রোম ও পারস্যের বাদশাদের কাছে দাওয়াতী পত্র প্রেরণ করেছিলেন।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :



১. একজন দাঈ মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করবে, কোন দল বা মতের দিকে নয়।

২. দাওয়াতী কাজে অনেক বাধা বিপত্তি আসতে পারে তাই বলে হাল ছেড়ে দিলে চলবে না।

৩. যেখানে বেশি উপকার হবে সেখানে প্রথমে দাওয়াত দেয়া উচিত।

৪. পূর্ববর্তী জাতিদের ইতিহাস বর্ণনা করা হয়েছে আমাদের শিক্ষা গ্রহণের জন্য।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৫১-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর:

আল্লাহ তা'আলা ফিরাউনের ঔদ্ধত্য ও আমিত্বের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, সে তার কওমকে একত্রিত করে ঘোষণা করলোঃ আমি কি একাই মিসরের বাদশাহ নই? আমার বাগ-বাগীচায় ও প্রাসাদে কি নদীগুলো প্রবাহিত নয়। তোমরা কি আমার শ্রেষ্ঠত্ব ও সাম্রাজ্য দেখতে পাচ্ছ না? আর মূসা (আঃ) এবং তার সঙ্গীদেরকে দেখো তো যে, তারা কেমন দুর্বল ও দরিদ্র! যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সে সবকে একত্রিত করে বললোঃ আমিই তোমাদের বড় প্রভু। ফলে, আল্লাহ তাকে আখিরাত ও দুনিয়ার শাস্তিতে গ্রেফতার করলেন।”(৭৯:২৩-২৫)

এখানে (আরবী) শব্দটি (আরবী) শব্দের অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। কোন কোন কারীর কিরআতে (আরবী) এরূপও রয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, যদি এই কিরআত শুদ্ধ ও সঠিক হয় তবে অর্থ সম্পূর্ণরূপে স্পষ্ট ও পরিষ্কার হয়ে যাবে। কিন্তু এই কিরআত সমস্ত শহরের কিরআতের বিপরীত। সব জায়গারই কিরআতে (আরবী) শব্দটি (আরবী) বা প্রশ্নবোধক রূপে রয়েছে। মোটকথা, অভিশপ্ত ফিরাউন নিজেকে হযরত মূসা (আঃ) অপেক্ষা উত্তম ও ভাল মনে করলো। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তার এটা মিথ্যা দাবী।

(আরবী) শব্দের অর্থ হলো ঘৃণ্য, দুর্বল, নির্ধন ও মান-সম্মানহীন। ফিরাউন বললো যে, মূসা (আঃ) ভালরূপে কথা বলতে জানেন না, তাঁর ভাষা অলংকার পূর্ণ নয় এবং তিনি বাকপট নন। তিনি তাঁর মনের কথা প্রকাশ করতে পারেন না।

কেউ কেউ বলেন যে, বাল্যকালে হযরত মূসা (আঃ) স্বীয় মুখে আগুনের অঙ্গার পুরে দিয়েছিলেন। ফলে তিনি তোতলা হয়ে গিয়েছিলেন।

আসলে এটাও ফিরাউনের প্রতারণামূলক ও মিথ্যা কথা। হযরত মূসা (আঃ) ছিলেন বাকপটু। তাঁর ভাষা ছিল অলংকারপূর্ণ। তিনি উচ্চ মান-মর্যাদার অধিকারী ও প্রভাবশালী ছিলেন। কিন্তু অভিশপ্ত ফিরাউন আল্লাহর নবী হযরত মূসা (আঃ)-কে কুফরীর চোখে দেখতো বলে তাকে ঐরূপ দেখতো। প্রকৃতপক্ষে সে। নিজেই ছিল ঘৃণ্য ও লাঞ্ছিত। বাল্যকালে হযরত মূসা (আঃ) তার মুখে আগুনের অঙ্গার পুরে দেয়ার কারণে তাঁর কথা যদিও তোতলা হতো, কিন্তু তার তোতলামি যেন দূর হয়ে যায় এজন্যে তিনি মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করেছিলেন। ফলে মহান আল্লাহর দয়ায় তাঁর ঐ তোতলামি ছুটে গিয়েছিল। কাজেই পরে তিনি সুন্দরভাবে তাঁর বক্তব্য জনগণের সামনে পেশ করতে পারতেন এবং তারা তাঁর কথা ভালভাবে বুঝতে পারতো। আর যদি এটা মেনে নেয়াও হয় যে, এরপরেও তাঁর যবানের কিছুটা ত্রুটি রয়ে গিয়েছিল, কেননা তিনি প্রার্থনায় শুধু এটুকুই বলেছিলেনঃ হে আমার প্রতিপালক! আমার জিহ্বার জড়তা আপনি দূর করে দিন, যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে, তবুও এটা কোন দোষের কথা নয়। আল্লাহ তা'আলা যাকে যেভাবে সৃষ্টি করেন সে সেভাবেই হয়ে থাকে, এতে দোষের এমন কি আছে? আসলে ফিরাউন একটা কথা বানিয়ে নিয়ে তার মূখ প্রজাদেরকে উত্তেজিত ও বিভ্রান্ত করতে চেয়েছিল। যেমন সে বলেছিলঃ মূসা (আঃ)-কে কেন দেয়া হলো না স্বর্ণ-বলয় অথবা তার সাথে কেন আসলো না ফেরেশতারা দলবদ্ধভাবে?' মোটকথা, সে বহু রকম চেষ্টা চালিয়ে তার প্রজাবর্গকে নির্বোধ বানিয়ে নেয় এবং তাদেরকে তারই মতাবলম্বী করে নেয়। সে নিজেই ছিল পাপী, অপরাধী ও লম্পট।

যখন সে মন খুলে আল্লাহর অবাধ্যাচরণ করেই চললো এবং আল্লাহ তার প্রতি চরমভাবে অসন্তুষ্ট হয়ে গেলেন তখন তার পিঠের উপর আল্লাহর চাবুক পড়লো। প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ তাকে তার সমুদয় কৃতকর্মের ফল প্রদান করলেন। তাকে সদলবলে সমুদ্রে নিমজ্জিত করা হলো। আর পরকালে সে জাহান্নামে জ্বলতে থাকবে।

হযরত উকবা ইবনে আমির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তুমি দেখো যে, আল্লাহ কোন মানুষকে ইচ্ছামত দিতে রয়েছেন, আর সে তার অবাধ্যাচরণ করতে রয়েছে তখন তুমি বুঝবে যে, আল্লাহ তাকে অবকাশ দিয়েছেন।” অতঃপর তিনি (আরবী) এই আয়াতটিই তিলাওয়াত করেন।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ)-এর সামনে হঠাৎ মৃত্যুর আলোচনা করা হলে তিনি বলেনঃ “মুমিনের উপর এটা খুব সহজ, কিন্তু কাফিরের উপর এটা দুঃখজনক।” তারপর এ আয়াতটি পাঠ করে শুনিয়ে দেন।

হযরত উমার ইবনে আবদিল আযীয (রঃ) বলেন যে, গাফলতি বা অমনোযোগিতার সাথে শাস্তি রয়েছে।

এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তৎপর পরবর্তীদের জন্যে আমি তাদেরকে করে রাখলাম অতীত ইতিহাস ও দৃষ্টান্ত। অর্থাৎ পরবর্তী লোকেরা যেন তাদের পরিণাম দেখে শিক্ষা গ্রহণ করে এবং নিজেদের পরিত্রাণ লাভের উপায় অনুসন্ধান করে।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।