আল কুরআন


সূরা আশ-শূরা (আয়াত: 52)

সূরা আশ-শূরা (আয়াত: 52)



হরকত ছাড়া:

وكذلك أوحينا إليك روحا من أمرنا ما كنت تدري ما الكتاب ولا الإيمان ولكن جعلناه نورا نهدي به من نشاء من عبادنا وإنك لتهدي إلى صراط مستقيم ﴿٥٢﴾




হরকত সহ:

وَ کَذٰلِکَ اَوْحَیْنَاۤ اِلَیْکَ رُوْحًا مِّنْ اَمْرِنَا ؕ مَا کُنْتَ تَدْرِیْ مَا الْکِتٰبُ وَ لَا الْاِیْمَانُ وَ لٰکِنْ جَعَلْنٰهُ نُوْرًا نَّهْدِیْ بِهٖ مَنْ نَّشَآءُ مِنْ عِبَادِنَا ؕ وَ اِنَّکَ لَتَهْدِیْۤ اِلٰی صِرَاطٍ مُّسْتَقِیْمٍ ﴿ۙ۵۲﴾




উচ্চারণ: ওয়া কাযা-লিকা আওহাইনাইলাইকা রূহাম মিন আমরিনা- মা-কুনতা তাদরী মাল কিতা-বুওয়ালাল ঈমা-নুওয়ালা-কিন জা‘আলনা-হু নূরান নাহদী বিহী মান নাশাউ মিন ‘ইবা-দিনা- ওয়া ইন্নাকা লা তাহদীইলা সিরা-তিম মুছতাকীম।




আল বায়ান: অনুরূপভাবে (উপরোক্ত তিনটি পদ্ধতিতে) আমি তোমার কাছে আমার নির্দেশ থেকে ‘রূহ’কে ওহী যোগে প্রেরণ করেছি। তুমি জানতে না কিতাব কী এবং ঈমান কী? কিন্তু আমি একে আলো বানিয়েছি, যার মাধ্যমে আমি আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দান করি। আর নিশ্চয় তুমি সরল পথের দিক নির্দেশনা দাও।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৫২. আর এভাবে(১) আমরা আপনার প্রতি আমাদের নির্দেশ থেকে রূহকে ওহী করেছি; আপনি তো জানতেন না কিতাব কি এবং ঈমান কি! কিন্তু আমরা এটাকে করেছি নূর, যা দ্বারা আমরা আমাদের বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছে হেদায়াত দান করি; আর আপনি তো অবশ্যই সরল পথের দিকে দিকনির্দেশ করেন—




তাইসীরুল ক্বুরআন: এভাবে (উপরোক্ত ৩টি উপায়েই) আমার নির্দেশের মূল শিক্ষাকে তোমার কাছে আমি ওয়াহী যোগে প্রেরণ করেছি। তুমি জানতে না কিতাব কী, ঈমান কী, কিন্তু আমি একে (অর্থাৎ ওয়াহী যোগে প্রেরিত কুরআনকে) করেছি আলো, যার সাহায্যে আমার বান্দাহদের মধ্য হতে যাকে ইচ্ছে আমি সঠিক পথে পরিচালিত করি। তুমি নিশ্চিতই (মানুষদেরকে) সঠিক পথের দিকে নির্দেশ করছ।




আহসানুল বায়ান: (৫২) এভাবে আমি নিজ নির্দেশে তোমার প্রতি অহী (প্রত্যাদেশ) করেছি আত্মা।[1] তুমি তো জানতে না গ্রন্থ কি, ঈমান (বিশ্বাস) কি।[2] পক্ষান্তরে আমি একে করেছি এমন আলো, যার দ্বারা আমি আমার দাসদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা পথ-নির্দেশ করি।[3] আর নিশ্চয়ই তুমি সরল পথ প্রদর্শন কর--



মুজিবুর রহমান: এভাবে আমি তোমার প্রতি প্রত্যাদেশ করেছি রূহ তথা আমার নির্দেশ; তুমিতো জানতেনা কিতাব কি ও ঈমান কি! পক্ষান্তরে আমি একে করেছি আলো যা দ্বারা আমি আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা পথ-নির্দেশ করি; তুমিতো প্রদর্শন কর শুধু সরল পথ –



ফযলুর রহমান: এভাবেই আমি তোমার কাছে আমার আদেশের একটি প্রাণ (কোরআন) পাঠিয়েছি। (এর আগে) তুমি তো জানতে না, কিতাব কি আর ঈমান কি। তবে আমি একে (এই কোরআনকে) একটি আলো করেছি, যার সাহায্যে আমি আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে চাই পথ দেখাই। তুমি তো (মানুষকে) সরল পথই প্রদর্শন করছ;



মুহিউদ্দিন খান: এমনিভাবে আমি আপনার কাছে এক ফেরেশতা প্রেরণ করেছি আমার আদেশক্রমে। আপনি জানতেন না, কিতাব কি এবং ঈমান কি? কিন্তু আমি একে করেছি নূর, যাদ্দ্বারা আমি আমার বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা পথ প্রদর্শন করি। নিশ্চয় আপনি সরল পথ প্রদর্শন করেন-



জহুরুল হক: আর এইভাবে আমরা তোমার কাছে আমাদের নির্দেশক্রমে প্রত্যাদেশ করেছি অনুপ্রাণিত গ্রন্থ। তুমি তো জানতে না গ্রন্থখানা কেমনতর, আর ধর্মবিশ্বাসও নয়, কিন্ত আমরা এটিকে বানিয়েছি এক আলোক, -- এর দ্বারা আমরা পথ দেখাচ্ছি আমাদের বান্দাদের যাদের আমরা ইচ্ছা করছি। আর তুমি তো নিশ্চয়ই পথ দেখাচ্ছ সঠিক পথের দিকে --



Sahih International: And thus We have revealed to you an inspiration of Our command. You did not know what is the Book or [what is] faith, but We have made it a light by which We guide whom We will of Our servants. And indeed, [O Muhammad], you guide to a straight path -



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৫২. আর এভাবে(১) আমরা আপনার প্রতি আমাদের নির্দেশ থেকে রূহকে ওহী করেছি; আপনি তো জানতেন না কিতাব কি এবং ঈমান কি! কিন্তু আমরা এটাকে করেছি নূর, যা দ্বারা আমরা আমাদের বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছে হেদায়াত দান করি; আর আপনি তো অবশ্যই সরল পথের দিকে দিকনির্দেশ করেন—


তাফসীর:

(১) “এভাবে” অর্থ শুধু শেষ পদ্ধতি নয়, বরং ওপরের আয়াতে যে তিনটি পদ্ধতি উল্লেখিত হয়েছে তার সব কটি। আর ‘রূহ’ অর্থ অহী [তাবারী] অথবা এখানে রূহ বলে কুরআনকে বোঝানো হয়েছে। কারণ, কুরআন হচ্ছে এমন রূহ যার দ্বারা অন্তরসমূহ জীবন লাভ করে। [জালালাইন]। কুরআন ও হাদীস থেকেই একথা প্রমাণিত যে, এই তিনটি পদ্ধতিতেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হিদায়াত দান করা হয়েছে। হাদীসে এসেছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে অহী আসার সূচনা হয়েছিলো সত্য স্বপ্নের আকারে। [বুখারী: ৩] এই ধারা পরবর্তী সময় পর্যন্ত জারি ছিল। তাই হাদীসে তার বহু সংখ্যক স্বপ্নের উল্লেখ দেখা যায়। যার মাধ্যমে হয় তাকে কোনো শিক্ষা দেয়া হয়েছে কিংবা কোনো বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে। তাছাড়া কুরআন মজীদে নবীর একটি স্বপ্নের সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে [সূরা আল-ফাতহ: ২৭]

তাছাড়া কতিপয় হাদীসে একথারও উল্লেখ আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আমার মনে অমুক বিষয়টি সৃষ্টি করে দেয়া হয়েছে, কিংবা আমাকে একথাটি বলা হয়েছে বা আমাকেই নির্দেশ দান করা হয়েছে অথবা আমাকে এ কাজ করতে নিষেধ করা হয়েছে। এ ধরনের সব কিছু অহীর প্রথমোক্ত শ্রেণীর সাথে সম্পর্কিত। বেশীর ভাগ হাদীসে কুদসী এই শ্রেণীরই অন্তর্ভুক্ত। মে'রাজে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দ্বিতীয় প্রকার অহী দ্বারা সম্মানিত করা হয়েছে। কতিপয় হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের নির্দেশ দেয়া এবং তা নিয়ে তার বারবার দরখাস্ত পেশ করার কথা যেভাবে উল্লেখিত হয়েছে তা থেকে স্পষ্ট বুঝা যায়, সে সময় কথাবার্তা হয়েছিলো যেমনটি তুর পাহাড়ের পাদদেশে মূসা আলাইহিস সালাম ও আল্লাহর মধ্যে হয়েছিলো। এরপর থাকে অহীর তৃতীয় শ্রেণী। এ ব্যাপারে কুরআন নিজেই সাক্ষ্য দান করে যে, কুরআনকে জিবরীল আমীনের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে পৌছানো হয়েছে [সূরা আল-বাকারাহ: ৯৭, সূরা আশ-শু'আরা: ১৯২–১৯৫]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৫২) এভাবে আমি নিজ নির্দেশে তোমার প্রতি অহী (প্রত্যাদেশ) করেছি আত্মা।[1] তুমি তো জানতে না গ্রন্থ কি, ঈমান (বিশ্বাস) কি।[2] পক্ষান্তরে আমি একে করেছি এমন আলো, যার দ্বারা আমি আমার দাসদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা পথ-নির্দেশ করি।[3] আর নিশ্চয়ই তুমি সরল পথ প্রদর্শন কর--


তাফসীর:

[1] رُوْحٌ (রূহ বা আত্মা)এর অর্থ এখানে কুরআন। অর্থাৎ, যেভাবে আমি তোমার পূর্বে অন্যান্য নবীদের প্রতি অহী প্রেরণ করেছি, অনুরূপ আমি তোমার প্রতি কুরআন অহী করেছি। কুরআনকে روح (আত্মা) বলে এই জন্য আখ্যায়িত করা হয়েছে যে, কুরআন দ্বারা অন্তঃকরণের জীবন লাভ হয়। যেমন, আত্মার মধ্যে মানুষের জীবন রহস্য লুক্কায়িত।

[2] ‘গ্রন্থ’ বা ‘কিতাব’ বলতে কুরআন। অর্থাৎ, নবুঅতের পূর্বে কুরআনের কোন জ্ঞান তোমার ছিল না। অনুরূপ ঈমানের বিস্তারিত জ্ঞানও তোমার ছিল না, যা শরীয়তে বাঞ্ছিত।

[3] অর্থাৎ, কুরআনকে নূর (জ্যোতি) বানিয়েছি। এর দ্বারা আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে চাই হিদায়াত দানে ধন্য করি। অর্থাৎ, কুরআন দ্বারা হিদায়াত কেবল তারাই পায়, যাদের মধ্যে ঈমানের খোঁজ ও তার প্রতি তীব্র আগ্রহ থাকে। তারা এটাকে হিদায়াত লাভের নিয়তে পড়ে, শোনে এবং চিন্তা-গবেষণা করে। তাই আল্লাহ এদের সাহায্য করেন এবং এদের জন্য হিদায়াতের পথ সুগম করে দেন। এই পথের উপরেই এরা চলতে থাকে। কিন্তু যারা নিজের চোখ বন্ধ করে নেয় ও কানে ছিপি লাগিয়ে নেয় এবং জ্ঞান-বুদ্ধিকে কাজে লাগায় না, তারা হিদায়াত কিভাবে পেতে পারে? যেমন মহান আল্লাহ বলেন,{ قُلْ هُوَ لِلَّذِيْنَ آمَنُوا هُدىً وَّشِفَاءٌ وَالَّذِيْنَ لاَيُؤْمِنُوْنَ فِي آذَانِهِمْ وَقْرٌ وَّهُوَ عَلَيْهِمْ عَمىً اُولَئِكَ يُنَادُوْنَ مِن مَّكَانٍ بَعِيْدٍ} অর্থাৎ, বল, বিশ্বাসীদের জন্য এ পথনির্দেশক ও ব্যাধির প্রতিকার। কিন্তু যারা অবিশ্বাসী তাদের কর্ণে রয়েছে বধিরতা এবং কুরআন হবে এদের জন্য অন্ধকারস্বরূপ। এরা এমন যে, যেন এদের বহু দূর হতে আহবান করা হয়। (সূরা হামীম সাজদাহ ৪৪ আয়াত)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৫১-৫৩ নম্বর আয়াতের তাফসীর :



আলোচ্য আয়াতসমূহের প্রথম আয়াত ইয়াহুদীদের এক হঠকারিতামূলক দাবীর জবাবে অবতীর্ণ হয়েছে। ইমাম বাগভী ও কুরতুবী (রহঃ) বলেন : ইয়াহুদীরা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলল, আপনি যদি নাবী হন তাহলে আল্লাহ তা‘আলার সাথে কথা বলেন না কেন, তাঁকে দেখেন না কেন, যেমন মুসা (আঃ) কথা বলেছেন এবং দেখেছেন? আপনি এরূপ না করা পর্যন্ত আমরা ঈমান আনব না। তখন নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন : মূসা (আঃ) আল্লাহ তা‘আলাকে দেখেননি। তখন এ আয়াত নাযিল হয়। (কুরতুবী, অত্র আয়াতের তাফসীর)



আয়াতগুলোতে কোন ব্যক্তির সাথে আল্লাহ তা‘আলার কথা বলার মাধ্যমগুলোর বর্ণনা দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা মানুষের সাথে তিনটি পদ্ধতিতে কথা বলেন :



(১) وَحْيًا ওয়াহী তথা কোন ফেরেশতার মাধ্যম ছাড়াই রাসূলের অন্তরে ওয়াহী ছুড়ে দেন। এরূপ পদ্ধতিকেنفث বলা হয়। যেমন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : জিবরীল (আঃ) আমার অন্তরে ছুড়ে দিয়েছে যে, কোন আত্মা তার রিযিক ও আয়ু পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত মারা যায় না। আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় কর ও উত্তম রিযিক তালাশ কর। যা হালাল তা গ্রহণ কর আর যা হারাম তা বর্জন কর। (সিলসিলা সহীহাহ হা. ২৮৬৬)



(২) জাগ্রত অবস্থায় পর্দার আড়াল থেকে সরাসরি কথা বলা। যেমন আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আঃ)-এর সাথে তূর পাহাড়ে কথা বলেছিলেন।



(৩) ফেরেশতার মাধ্যমে স্বীয় ওয়াহী প্রেরণ করা। যেমন জিবরীল (আঃ) ওয়াহী নিয়ে আগমন করতেন এবং নাবীদেরকে শুনাতেন।



সুতরাং দুনিয়াতে কোন মানুষ আল্লাহ তা‘আলার সাথে সামনা-সামনি কথা বলতে পারে না।



روح ‘ রূহ’ বলতে এখানে কুরআনকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ যেভাবে আমি তোমার পূর্বে অন্যান্য নাবীর প্রতি ওয়াহী প্রেরণ করেছিলাম, অনুরূপ তোমার প্রতি কুরআন ওয়াহী করেছি। কুরআনকে “রূহ্” বলে এ জন্য আখ্যায়িত করা হয়েছে যে, কুরআন দ্বারা অন্তঃকরণের জীবন লাভ হয়।



(مَا كُنْتَ تَدْرِيْ مَا الْكِتٰبُ وَلَا الْإِيْمَانُ)



‘তুমি তো জানতে না কিতাব কী ও ঈমান কী’ “কিতাব” দ্বারা কুরআন উদ্দেশ্য। অর্থাৎ নবুওয়াতের পূর্বে কুরআনের কোন জ্ঞান তোমার ছিল না। অনুরূপ ঈমান তথা ইসলামী শরীয়তের বিস্তারিত বিষয় সম্পর্কেও তোমার কোন জ্ঞান ছিল না। এগুলো ওয়াহী দ্বারা তোমাকে জানানো হয়েছে। (আযওয়াউল বায়ান, অত্র আয়াতের তাফসীর)



এরপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন : আমি এ কুরআনকে করেছি নূর বা জ্যোতি। এর দ্বারা আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে চাই হিদায়াত দান করি। অর্থাৎ কুরআন দ্বারা হিদায়াত কেবল তারাই পায় যাদের মধ্যে ঈমানের অনুসন্ধান ও তা গ্রহণের প্রতি তীব্র আগ্রহ থাকে, তারা এটাকে হিদায়াত লাভের নিয়্যাতে পড়ে থাকে। তাই আল্লাহ তা‘আলা এদের সাহায্য করেন এবং এদের জন্য হিদায়াতের পথ সুগম করে দেন। এ পথের ওপরই এরা চলতে থাকে। কিন্তু যারা নিজের চোখ বন্ধ করে নেয় ও কানে ছিপি লাগিয়ে নেয় এবং জ্ঞান-বুদ্ধিকে কাজে লাগায় না, তারা হিদায়াত কিভাবে পেতে পারে?



যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন :



(وَلَوْ جَعَلْنٰھُ قُرْاٰنًا اَعْجَمِیًّا لَّقَالُوْا لَوْلَا فُصِّلَتْ اٰیٰتُھ۫ﺛ ءَاَعْجَمِیٌّ وَّعَرَبِیٌّﺚ قُلْ ھُوَ لِلَّذِیْنَ اٰمَنُوْا ھُدًی وَّشِفَا۬ئٌﺚ وَالَّذِیْنَ لَا یُؤْمِنُوْنَ فِیْٓ اٰذَانِھِمْ وَقْرٌ وَّھُوَ عَلَیْھِمْ عَمًیﺚ اُولٰ۬ئِکَ یُنَادَوْنَ مِنْ مَّکَانٍۭ بَعِیْدٍ‏)‏



“আমি যদি আজমী (অনারবীয়) ভাষায় কুরআন অবতীর্ণ করতাম তবে তারা অবশ্যই বলত : এর আয়াতগুলো বিশদভাবে বর্ণিত হয়নি কেন? কী আশ্চর্য যে, এর ভাষা আজমী (অনারবীয়), অথচ রাসূল আরবীয়। বল : মু’মিনদের জন্য এটা পথ-নির্দেশ ও ব্যাধির প্রতিকার; কিন্তু যারা অবিশ্বাসী তাদের কর্ণে রয়েছে বধিরতা এবং কুরআন হবে তাদের জন্য অন্ধত্ব। তারা এমন যে, যেন তাদেরকে আহ্বান করা হয় বহু দূর হতে।” (সূরা হা-মীম আস্ সাজদাহ্ ৪১ : ৪৪)



(وَإِنَّكَ لَتَهْدِيْٓ إِلٰي صِرَاطٍ مُّسْتَقِيْمٍ)



‘তুমি অবশ্যই প্রদর্শন কর সরল পথ’ অর্থাৎ তুমি মানুষকে সিরাতুল মুসতাকিমের পথ দেখাও। এটাকে



(هداية الارشاد والدلالة)



বা পথ প্রদর্শন ও নির্দেশনামূলক হিদায়াত বলা হয়। নাবী-রাসূলসহ সকল মানুষ এ প্রকার হিদায়াত বা পথপ্রদর্শন করতে পারে। কিন্তু প্রথম হিদায়াত দ্বারা উদ্দেশ্য (هداية التوفيق) হিদায়াতুত তাওফীক : সরল সঠিক পথের দিশা দান করতঃ তার ওপর মজবুত ও অটুট থাকার তাওফীক দান করা। এ প্রকার হিদায়াত শুধুমাত্র আল্লাহ তা‘আলার হাতে।



সুতরাং আল্লাহ তা‘আলার কাছে সঠিক পথের হিদায়াত চাইতে হবে এবং তার ওপর বহাল থাকার জন্য বেশি বেশি এ দু‘আ করতে হবে-



يَا مُقَلِّبَ القُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَي دِينِكَ



হে অন্তরের পরিবর্তনকারী, আমার অন্তরকে দীনের ওপর অটল রাখ। স্বয়ং রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ দু‘আ বেশি বেশি পাঠ করতেন। কারণ কোন পীর, মুরশিদ ও বাবা হিদায়াতের মালিক নয়, যদি আল্লাহ তা‘আলা হিদায়াত না দেন।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :



১. মানুষের সাথে আল্লাহ তা‘আলার কথা বলার তিনটি পদ্ধতি জানতে পারলাম। এ তিনটি পদ্ধতির বাইরে কোন ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলার সাথে কথা বলার দাবী করলে সে মিথ্যাবাদী।

২. কুরআন মু’মিনের জন্য হিদায়াতস্বরূপ।

৩. আল্লাহ তা‘আলার কাছে হিদায়াত কামনা করব এবং তার ওপর অটল থাকার জন্য বেশি বেশি দু’আ করব।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৫১-৫৩ নং আয়াতের তাফসীর:

অহীর স্থান, স্তর ও অবস্থার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, ওটা কখনো কখনো রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অন্তরে ঢেলে দেয়া, যেটা আল্লাহর অহী হওয়া সম্পর্কে তাঁর মনে কোন সংশয় ও সন্দেহ থাকে না। যেমন ইবনে হিব্বানের (রঃ) সহীহ গ্রন্থে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “রূহুল কুদুস (আঃ) আমার অন্তরে এটা ফুকে দিয়েছেন যে, কোন ব্যক্তিই মৃত্যুবরণ করে না যে পর্যন্ত না তার রিযক ও সময় পূর্ণ হয়। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং উত্তমরূপে রুযী অনুসন্ধান কর।”

মহান আল্লাহ বলেনঃ ‘অথবা পর্দার অন্তরাল হতে তিনি কথা বলেন। যেমন তিনি হযরত মূসা (আঃ)-এর সাথে কথা বলেছিলেন। কেননা, তিনি কথা শুনার পর আল্লাহ তাআলাকে দেখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আল্লাহ তাআলা ছিলেন পর্দার মধ্যে।

সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ)-কে বলেনঃ “আল্লাহ পর্দার অন্তরাল ছাড়া কারো সাথে কথা বলেননি, কিন্তু তোমার পিতার সাথে তিনি সামনা সামনি হয়ে কথা বলেছেন। তিনি উহুদের যুদ্ধে কাফিরদের হাতে শহীদ হয়েছিলেন। কিন্তু এটা স্মরণ রাখা দরকার যে, এটা ছিল আলমে বারযাখের কথা আর এই আয়াতে যে কালামের কথা বলা হয়েছে তা হলো ভূ-পৃষ্ঠের উপরের কালাম।

মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ ‘অথবা এমন দূত প্রেরণ ব্যতিরেকে, যেই দূত তার অনুমতিক্রমে তিনি যা চান তা ব্যক্ত করে। যেমন হযরত জিবরাঈল (আঃ) প্রমুখ ফেরেশতা নবীদের (আঃ) নিকট আসতেন। তিনি সমুন্নত, প্রজ্ঞাময়।

এখানে রূহ দ্বারা কুরআনকে বুঝানো হয়েছে। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “আমি এই কুরআনকে অহীর মাধ্যমে তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি। তুমি তো জানতে না কিতাব কি ও ঈমান কি! কিন্তু আমি এই কুরআনকে করেছি আলো যা দ্বারা আমি আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা পথ-নির্দেশ করি।” যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি বলে দাও- এটা ঈমানদারদের জন্যে হিদায়াত ও আরোগ্য, আর যারা ঈমানদার নয় তাদের কানে আছে বধিরতা এবং চোখে আছে অন্ধত্ব।” (৪১:৪৪)

এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি তো প্রদর্শন কর শুধু সরল পথ- সেই আল্লাহর পথ যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে তার মালিক। প্রতিপালক তিনিই। সবকিছুর মধ্যে ব্যবস্থাপক ও হুকুমদাতা তিনিই। কেউই তাঁর কোন হুকুম অমান্য করতে পারে না। সকল বিষয়ের পরিণাম আল্লাহরই দিকে প্রত্যাবর্তন করে। তিনিই সব কাজের ফায়সালা করে থাকেন। তিনি পবিত্র ও মুক্ত ঐ সব দোষ হতে যা যালিমরা তার উপর আরোপ করে থাকে। তিনি সমুচ্চ, সমুন্নত ও মহান।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।