সূরা আশ-শূরা (আয়াত: 36)
হরকত ছাড়া:
فما أوتيتم من شيء فمتاع الحياة الدنيا وما عند الله خير وأبقى للذين آمنوا وعلى ربهم يتوكلون ﴿٣٦﴾
হরকত সহ:
فَمَاۤ اُوْتِیْتُمْ مِّنْ شَیْءٍ فَمَتَاعُ الْحَیٰوۃِ الدُّنْیَا ۚ وَ مَا عِنْدَ اللّٰهِ خَیْرٌ وَّ اَبْقٰی لِلَّذِیْنَ اٰمَنُوْا وَ عَلٰی رَبِّهِمْ یَتَوَکَّلُوْنَ ﴿ۚ۳۶﴾
উচ্চারণ: ফামাঊতীতুম মিন শাইয়িন ফমাতা-‘উল হায়া-তিদ্দুনইয়া- ওয়ামা-‘ইনদাল্লা-হি খাইরুওঁ ওয়া আব কা-লিল্লাযীনা আ-মানূওয়া ‘আলা-রাব্বিহিম ইয়াতাওয়াক্কালূন।
আল বায়ান: আর তোমাদেরকে যা কিছু দেয়া হয়েছে তা দুনিয়ার জীবনের ভোগ্য সামগ্রী মাত্র। আর আল্লাহর নিকট যা আছে তা উৎকৃষ্ট ও স্থায়ী তাদের জন্য যারা ঈমান আনে এবং তাদের রবের উপর তাওয়াক্কুল করে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩৬. সুতরাং তোমাদেরকে যা কিছু দেয়া হয়েছে তা দুনিয়ার জীবনের ভোগ্য সামগ্ৰী মাত্র। আর আল্লাহর কাছে যা আছে তা উত্তম ও স্থায়ী, তাদের জন্য যারা ঈমান আনে এবং তাদের রবের উপর নির্ভর করে।
তাইসীরুল ক্বুরআন: (এখানে) তোমাদেরকে যা কিছু দেয়া হয়েছে তা অস্থায়ী দুনিয়ার জীবনের (সামান্য) ভোগ্যবস্তু মাত্র। আল্লাহর নিকট যা আছে তা উৎকৃষ্ট এবং স্থায়ী (আর তা হল) তাদের জন্য যারা ঈমান আনে এবং তাদের প্রতিপালকের উপর নির্ভর করে।
আহসানুল বায়ান: (৩৬) বস্তুতঃ তোমাদেরকে যা কিছু দেওয়া হয়েছে, তা পার্থিব জীবনের ভোগ;[1] কিন্তু আল্লাহর নিকট যা আছে, তা উত্তম ও চিরস্থায়ী[2] তাদের জন্য, যারা বিশ্বাস করে ও তাদের প্রতিপালকের ওপর নির্ভর করে।
মুজিবুর রহমান: বস্তুতঃ তোমাদেরকে যা কিছু দেয়া হয়েছে তা পার্থিব জীবনের ভোগ। কিন্তু আল্লাহর নিকট যা আছে তা উত্তম ও স্থায়ী - তাদের জন্য, যারা ঈমান আনে ও তাদের রবের উপর নির্ভর করে।
ফযলুর রহমান: তোমাদেরকে যা কিছু দেওয়া হয়েছে তা শুধু পার্থিব জীবনের ভোগ। আর আল্লাহর কাছে যা আছে তা তাদের জন্য আরো ভাল ও বেশি দীর্ঘস্থায়ী যারা ঈমান এনেছে ও নিজেদের প্রভুর ওপর ভরসা রাখে,
মুহিউদ্দিন খান: অতএব, তোমাদেরকে যা দেয়া হয়েছে তা পার্থিব জীবনের ভোগ মাত্র। আর আল্লাহর কাছে যা রয়েছে, তা উৎকৃষ্ট ও স্থায়ী তাদের জন্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও তাদের পালনকর্তার উপর ভরসা করে।
জহুরুল হক: বস্তুতঃ তোমাদের যা-কিছু দেওয়া হয়েছে তা তো এই দুনিয়ার জীবনের ভোগবিলাস, আর যা আল্লাহ্র কাছে রয়েছে তা বেশী ভাল ও দীর্ঘস্থায়ী তাদের জন্য যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের প্রভুর উপরে নির্ভর করে থাকে, --
Sahih International: So whatever thing you have been given - it is but [for] enjoyment of the worldly life. But what is with Allah is better and more lasting for those who have believed and upon their Lord rely
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৩৬. সুতরাং তোমাদেরকে যা কিছু দেয়া হয়েছে তা দুনিয়ার জীবনের ভোগ্য সামগ্ৰী মাত্র। আর আল্লাহর কাছে যা আছে তা উত্তম ও স্থায়ী, তাদের জন্য যারা ঈমান আনে এবং তাদের রবের উপর নির্ভর করে।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৩৬) বস্তুতঃ তোমাদেরকে যা কিছু দেওয়া হয়েছে, তা পার্থিব জীবনের ভোগ;[1] কিন্তু আল্লাহর নিকট যা আছে, তা উত্তম ও চিরস্থায়ী[2] তাদের জন্য, যারা বিশ্বাস করে ও তাদের প্রতিপালকের ওপর নির্ভর করে।
তাফসীর:
[1] যা সামান্য এবং তুচ্ছ। যদিও কারূনের ধনভান্ডারও হয় (তবুও)। কাজেই তা পেয়ে ধোঁকায় পতিত হয়ো না। কেননা, তা হল ক্ষণস্থায়ী ও ধ্বংসশীল।
[2] অর্থাৎ, যাবতীয় নেক কাজের যে প্রতিদান আল্লাহর কাছে পাওয়া যাবে, তা পার্থিব ধন-সম্পদ থেকে অনেক গুণ বেশী উত্তম এবং চিরস্থায়ী। কারণ, তা নষ্টযোগ্য ও ধ্বংসশীল নয়। অতএব ইহকালকে পরকালের উপরে প্রাধান্য দিও না। এ রকম করলে অনুতপ্ত হতে হবে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৩৬-৩৯ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
আলোচ্য আয়াতগুলোতে দুনিয়ার ধন-সম্পদ আখিরাতের নেয়ামতের তুলনায় অতি নগণ্য বস্তু সে কথাই আল্লাহ তা‘আলা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন : দুনিয়াতে মানুষকে যা কিছু দেয়া হয়েছে তা অস্থায়ী, নশ্বর এবং তা তুচ্ছ বস্তু মাত্র। আর আখিরাতে মু’মিনদের জন্য আল্লাহ তা‘আলার নিকট যা কিছু জমা রয়েছে তা উত্তম এবং চিরস্থায়ী। যা কোন দিনও শেষ হবে না। অতএব মু’মিন কখনো দুনিয়াকে আখিরাতের ওপর প্রাধান্য দিতে পারে না। আখিরাতের অবিনশ্বর নেয়ামত পাওয়ার জন্য সে যেকোন সময় আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় নিজের সম্পদ ও জীবন বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত। আল্লাহ তা‘আলার বিধান পালন করতে তার কোন কষ্ট ও ইতস্ততবোধ হবে না।
এরপর আল্লাহ তা‘আলা সে উত্তম এবং চিরস্থায়ী নেয়ামত লাভ করার জন্য কিছু গুণাবলী উল্লেখ করেছেন, অবশ্যই মানুষকে সে গুণে গুণান্বিত হতে হবে। তবে সে সব গুণাবলীর পূর্বে সঠিক ঈমান আনতে হবে, কারণ ঈমান ছাড়া কোন সৎ আমল গ্রহণযোগ্য নয়।
প্রথম গুণ :
(وَعَلٰي رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُوْنَ)
অর্থাৎ সর্বকাজে ও সর্বাবস্থায় পালনকর্তার ওপর ভরসা রাখে। তিনি ব্যতীত অন্য কাউকে কার্যনির্বাহী মনে করে না। বিপদে পড়লে আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত অন্য কারো কাছে যায় না।
দ্বিতীয় গুণ :
(وَالَّذِيْنَ يَجْتَنِبُوْنَ كَبَا۬ئِرَ الْإِثْمِ وَالْفَوَاحِشَ)
অর্থাৎ যারা কবীরা গুনাহ বিশেষতঃ ব্যভিচার থেকে বেঁচে থাকে। কুরআনে প্রত্যেক স্থানে فَوَاحِشَ শব্দ ব্যভিচার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। কবীরা গুনাহর মধ্যে সকল গুনাহ শামিল তারপরেও কেন আলাদাভাবে ব্যভিচারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে? কারণ এটি একটি নির্লজ্জ কর্ম ও সংক্রামক ব্যাধি।
তৃতীয় গুণ :
(وَإِذَا مَا غَضِبُوْا هُمْ يَغْفِرُوْنَ)
অর্থাৎ তারা রাগান্বিত হয়েও মানুষকে ক্ষমাসুলভ দৃষ্টিতে দেখে। মানুষকে ক্ষমা করে দেয়া একটি মহৎ গুণের পরিচয়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজের জন্য কারো থেকে পরিশোধ নিতেন না, যদি আল্লাহ তা‘আলার সম্মান নষ্ট না করত। (সহীহ বুখারী হা. ৬৭৮৬)
চতুর্থ গুণ :
(وَالَّذِيْنَ اسْتَجَابُوْا لِرَبِّهِمْ وَأَقَامُوا الصَّلٰوةَ)
অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে কোন আদেশ পাওয়া মাত্রই বিনা দ্বিধায় তা কবূল করতে ও পালন করতে প্রস্তুত হয়ে যাওয়া। সে আদেশ মনের অনুকূলে হোক অথবা প্রতিকূলে হোক। এতে ইসলামের সকল ফরয কর্ম পালন এবং হারাম কর্ম থেকে বেঁচে থাকা শামিল। ফরয কর্মসমূহের মধ্যে সালাত সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। সালাত এমন একটি ইবাদত এটা পালন করলে অন্যান্য ফরয কর্ম পালন ও নিষিদ্ধ বিষয়াদি থেকে বেঁচে থাকা সহজ হয়।
পঞ্চম গুণ :
(وَأَمْرُهُمْ شُوْرٰي بَيْنَهُمْ)
অর্থাৎ পরামর্শের মাধ্যমে নিজেদের কার্য সম্পাদন করে। আল্লাহ তা‘আলার বাণী :
(وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ ج فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَي اللّٰهِط إِنَّ اللّٰهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّـلِيْنَ)
“এবং কার্য সম্পর্কে তাদের সাথে পরামর্শ কর; অতঃপর যখন তুমি (কোন বিষয়ে) সঙ্কল্প করছ তখন আল্লাহর প্রতি ভরসা কর এবং নিশ্চয়ই আল্লাহ নির্ভরশীলগণকে ভালবাসেন।” (সূরা আলি ‘ইমরান ৩ : ১৫৯)
তাই নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন কোন কাজ করতেন তখন সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করে কাজ করতেন যাতে তাদের আত্মতৃপ্তি লাভ হয়। পরবর্তী খলীফাগণও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অনুসরণে পরামর্শভিত্তিক কাজ করতেন। যেমন উমার (রাঃ) মৃত্যুর পূর্বে ছয় সদস্যবিশিষ্ট একটি শুরা কমিটি গঠন করে গিয়েছিলেন যারা পরবর্তী খলীফা নির্ধারণ করেছিলেন।
ষষ্ঠ গুণ :
(وَمِمَّا رَزَقْنٰهُمْ يُنْفِقُوْنَ)
অর্থাৎ তারা আল্লাহ প্রদত্ত রিযিক থেকে সৎ কাজে ব্যয় করে। ফরয যাকাত, নফল দান-সাদকাহ সবই এর মধ্যে শামিল। কিয়ামতের দিন সাত শ্রেণির লোক আল্লাহর আরশের ছায়াতলে ছায়া পাবে। তাদের এক শ্রেণি যারা আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় দান করে এমনভাবে যে তার ডান হাত কী দান করেছে বাম হাত জানে না। অর্থাৎ মানুষকে দেখানোর জন্য ব্যয় করে না।
সপ্তম গুণ :
(وَالَّذِيْنَ إِذَآ أَصَابَهُمُ الْبَغْيُ هُمْ يَنْتَصِرُوْنَ)
অর্থাৎ তারা অত্যাচারিত হয়ে সমান সমান প্রতিশোধ গ্রহণ করে এবং তাতে সীমালংঘন করে না। এটা প্রকৃতপক্ষে তৃতীয় গুণের ব্যাখ্যা ও বিবরণ। তবে এখানে আলাদাভাবে উল্লেখের কারণ হল কেউ অত্যাচারিত হয়ে প্রতিশোধ নিলে তিরস্কার করা যাবে না।
তারা প্রতিশোধ নিতে চাইলে নিতে পারে। কিন্তু শক্তি থাকা সত্ত্বেও তারা ক্ষমা করে দেয়াকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। যেমন ইউসুফ (আঃ) বলেছিলেন,
(قَالَ لَا تَثْرِيْبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ ط يَغْفِرُ اللّٰهُ لَكُمْ ز وَهُوَ أَرْحَمُ الرّٰحِمِيْنَ )
“সে বলল : ‘আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই। আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করুন এবং তিনিই শ্রেষ্ঠ দয়ালু।’’ (সূরা ইউসুফ ১২ : ৯২)
অতএব যারা আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করে সকল প্রকার কবীরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকবে, সালাত কায়েম করবে, পরামর্শ করে কাজ করবে এবং আল্লাহ তা‘আলার পথে ব্যয় করবে তাদের জন্য রয়েছে আখিরাতে অপরিমেয় নেয়ামত।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার আবাস ক্ষণস্থায়ী এবং তা ধ্বংসশীল।
২. পরস্পর পরামর্শের ভিত্তিতে কাজ করতে হবে, তবে তা অবশ্যই সৎ কাজ, মন্দ কাজ নয়।
৩. প্রতিশোধ গ্রহণ অপেক্ষা ক্ষমা করে দেয়া উত্তম।
৪. রাগের মুহূর্তে ধৈর্য ধারণ করতে হবে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৩৬-৩৯ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা'আলা দুনিয়ার অসারতা, তুচ্ছতা এবং নশ্বরতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন যে, এটা জমা করে কেউ যেন গর্বে ফুলে না উঠে। কেননা, এটাতো ক্ষণস্থায়ী। বরং মানুষের আখিরাতের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া উচিত। সকর্ম করে পুণ্য সঞ্চয় করা তাদের একান্ত কর্তব্য। কেননা, এটাই হচ্ছে চিরস্থায়ী। সুতরাং অস্থায়ীকে স্থায়ীর উপর এবং স্বল্পতাকে আধিক্যের উপর প্রাধান্য দেয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
অতঃপর মহান আল্লাহ এই পুণ্য লাভ করার পন্থা বলে দিচ্ছেন যে, ঈমান দৃঢ় হতে হবে, যাতে পার্থিব সুখ-সম্ভোগকে পরিত্যাগ করার উপর ধৈর্যধারণ করা যেতে পারে। আল্লাহ তা'আলার উপর পূর্ণ নির্ভরশীল হতে হবে যাতে ধৈর্যধারণে তাঁর নিকট হতে সাহায্য লাভ করা যায় এবং তাঁর আহকাম পালন করা এবং অবাধ্যচিরণ হতে বিরত থাকা সহজ হয়। আর যাতে কবীরা গুনাহ ও নির্লজ্জতা পূর্ণ কাজ হতে দূরে থাকা যায়। এই বাক্যের তাফসীর সূরায়ে আ'রাফে গত হয়েছে। ক্রোধকে সম্বরণ করতে হবে, যাতে ক্রোধের অবস্থাতেও সচ্চরিত্রতা এবং ক্ষমাপরায়ণতার অভ্যাস পরিত্যক্ত না হয়। যেমন সহীহ হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজের প্রতিশোধ কারো নিকট হতে কখনো গ্রহণ করেননি। হ্যা, তবে আল্লাহর আহকামের বেইজ্জতী হলে সেটা অন্য কথা। অন্য হাদীসে এসেছে যে, কঠিন ক্রোধের সময়েও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পবিত্র মুখ হতে নিম্নের কথাগুলো ছাড়া আর কিছুই বের হতো নাঃ “তার কি হয়েছে? তার হাত ধূলায় ধূসরিত হোক।”
ইবরাহীম (রঃ) বলেন যে, মুমিনরা লাঞ্ছিত হওয়া পছন্দ করতেন না বটে, কিন্তু আবার শত্রুদের উপর ক্ষমতা লাভ করলে প্রতিশোধ গ্রহণ করতেন না, বরং ক্ষমা করে দিতেন।
মহান আল্লাহ বলেনঃ (মুমিনদের আরো বিশেষণ এই যে,) তারা তাদের প্রতিপালকের আহ্বানে সাড়া দেয়, রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য করে, তার আদেশ ও নিষেধ মেনে চলে, নামায কায়েম করে যা হলো সবচেয়ে বড় ইবাদত এবং নিজেদের মধ্যে পরামর্শের মাধ্যমে নিজেদের কর্ম সম্পাদন করে। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “কাজে কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ কর।”(৩:১৫৯) এ জন্যেই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অভ্যাস ছিল যে, তিনি যুদ্ধ ইত্যাদির ক্ষেত্রে সাহাবীদের (রাঃ) সাথে পরামর্শ করতেন যাতে তাদের মন আনন্দিত হয়। এর ভিত্তিতেই আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার (রাঃ) আহত হওয়ার পর মৃত্যুর সম্মুখীন হলে ছয়জন লোককে নির্ধারণ করেন, যেন তারা পরস্পর পরামর্শ করে তার মৃত্যুর পরে কোন একজনকে খলীফা মনোনীত করেন। ঐ ছয় ব্যক্তি হলেনঃ হযরত উসমান (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ), হযরত তালহা (রাঃ), হযরত যুবায়ের (রাঃ), হযরত সা'দ (রাঃ) এবং হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ)। সুতরাং তারা সর্বসম্মতিক্রমে হযরত উসমান (রাঃ)-কে খলীফা মনোনীত করেন।
এরপর আল্লাহ তা'আলা মুমিনদের আর একটি বিশেষণ বর্ণনা করছেন যে, তারা যেমন আল্লাহর হক আদায় করেন, অনুরূপভাবে মানুষের হক আদায় করার। ব্যাপারেও তারা কার্পণ্য করেন না। তাঁদের সম্পদ হতে তারা দরিদ্র ও অভাবীদেরকেও কিছু প্রদান করেন এবং শ্রেণীমত নিজেদের সাধ্যানুযায়ী প্রত্যেকের সাথে সদ্ব্যবহার ও ইহসান করে থাকেন। তবে তারা এমন দুর্বল ও কাপুরুষ নন যে, যালিমদের হতে প্রতিশোধ গ্রহণ করেন না, বরং তাঁরা অত্যাচারিত হলে পুরোপুরিভাবে প্রতিশোধ গ্রহণ করে থাকেন। এভাবে তারা অত্যাচারিতদেরকে অত্যাচারীদের অত্যাচার হতে রক্ষা করেন। এতদসত্ত্বেও কিন্তু অনেক সময় ক্ষমতা লাভের পরেও তারা ক্ষমা করে থাকেন। যেমন হযরত ইউসুফ (আঃ) তাঁর ভাইদেরকে বলেছিলেনঃ
(আরবী) অর্থাৎ “আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই। আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করুন!”(১২:৯২) আর যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ আশিজন কাফিরকে ক্ষমা করে দেন যারা হুদাবিয়ার সন্ধির বছর সুযোগ খুঁজে চুপচাপ মুসলিম সেনাবাহিনীতে ঢুকে পড়েছিল। যখন তাদেরকে গ্রেফতার করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে পেশ করা হয় তখন তিনি তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়ে ছেড়ে দেন। আর যেমন তিনি গাওরাস ইবনে হারিস নামক লোকটিকেও ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। সে ছিল ঐ ব্যক্তি যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিদ্রিত অবস্থায় তাঁর তরবারীখানা হাতে উঠিয়ে নেয় এবং তাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) জেগে উঠেন এবং তরবারীখানা তার হাতে দেখে তাকে এক ধমক দেন। সাথে সাথে ঐ তরবারী তার হাত হতে পড়ে যায় এবং তিনি তা উঠিয়ে নেন। ঐ অপরাধী তখন গ্রীবা নীচু করে তার সামনে দাড়িয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে (রাঃ) ডেকে তাদেরকে এ দৃশ্য প্রদর্শন করেন এবং ঘটনাটিও বর্ণনা করেন। অতঃপর তাকে ক্ষমা করে দিয়ে ছেড়ে দেন। অনুরূপভাবে লাবীদ ইবনে আসম যখন তার উপর যাদু করে তখন তা জানা এবং প্রতিশোধ গ্রহণের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তাকে মাফ করে দেন। এভাবেই যে ইয়াহূদীনী তাঁকে বিষ পানে হত্যা করার ইচ্ছা করেছিল তার থেকেও তিনি প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। তার নাম ছিল যয়নব। সে মারাহাব নামক ইয়াহদীর ভগ্নী ছিল। যে ইয়াহূদীকে হযরত মাহমূদ ইবনে সালমা (রাঃ) খায়বারের যুদ্ধে হত্যা করেছিলেন। ঐ ইয়াহুদিনী বকরীর কাঁধের গোশতে বিষ মাখিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে পেশ করেছিল। স্বয়ং কাঁধের গোশতই নিজের বিষ মিশ্রিত হওয়ার কথা তাঁর নিকট প্রকাশ করেছিল। মহিলাটিকে তিনি ডেকে পাঠিয়ে এটা জিজ্ঞেস করলে সে তা স্বীকার করে। তাকে এর কারণ জিজ্ঞেস করা হলে সে বলেঃ “আমি মনে করেছিলাম যে, যদি আপনি সত্যই আল্লাহর নবী হন তবে এটা আপনার কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। আর যদি আপনি আপনার দাবীতে মিথ্যাবাদী হন তবে আপনার (আধিপত্য) হতে আমরা আরাম পাবো।” এটা জানতে পারা এবং তার উপর ক্ষমতা লাভের পরেও তিনি তাকে ক্ষমা করে দিয়ে ছেড়ে দেন। পরে অবশ্য তাকে হত্যা করা হয়েছিল। কেননা, ঐ বিষ মিশ্রিত খাদ্য খেয়েই হযরত বিশর ইবনে বারা (রাঃ) মারা গিয়েছিলেন। ফলে কিসাস হিসেবে ঐ মহিলাটিকেও হত্যা করা হয়েছিল। এ সম্পৰ্কীয় আরো বহু আসার ও হাদীস রয়েছে। এসব ব্যাপারে মহান আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।