সূরা আশ-শূরা (আয়াত: 17)
হরকত ছাড়া:
الله الذي أنزل الكتاب بالحق والميزان وما يدريك لعل الساعة قريب ﴿١٧﴾
হরকত সহ:
اَللّٰهُ الَّذِیْۤ اَنْزَلَ الْکِتٰبَ بِالْحَقِّ وَ الْمِیْزَانَ ؕ وَ مَا یُدْرِیْکَ لَعَلَّ السَّاعَۃَ قَرِیْبٌ ﴿۱۷﴾
উচ্চারণ: আল্লা-হুল্লাযীআনযালাল কিতা-বা বিলহাক্কিওয়াল মীযা-না ওয়ামা ইউদরীকা লা‘আল্লাছছা-‘আতা কারীব।
আল বায়ান: আল্লাহ, যিনি সত্যসহ কিতাব ও মীযান* নাযিল করেছেন। আর কিসে তোমাকে জানাবে, হয়ত কিয়ামত খুবই নিকটবর্তী?
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৭. আল্লাহ, যিনি নাযিল করেছেন সত্যসহকারে কিতাব এবং মীযান।(১) আর কিসে আপনাকে জানাবে যে, সম্ভবত কিয়ামত আসন্ন?
তাইসীরুল ক্বুরআন: তিনিই আল্লাহ যিনি সত্য ও ইনসাফের মানদন্ড সহকারে কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। তুমি কি জান, সম্ভবতঃ চূড়ান্ত ফয়সালার সময় নিকটবর্তী হয়ে গেছে।
আহসানুল বায়ান: (১৭) আল্লাহই সত্যসহ গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছেন এবং (অবতীর্ণ করেছেন) তুলাদন্ড।[1] আর তুমি কি জান, সম্ভবতঃ কিয়ামত আসন্ন? [2]
মুজিবুর রহমান: আল্লাহই অবতীর্ণ করেছেন সত্যসহ কিতাব এবং তুলাদন্ড। তুমি কি জান, সম্ভবতঃ কিয়ামাত আসন্ন?
ফযলুর রহমান: আল্লাহই সত্যসহ কিতাব (পবিত্র কোরআন) ও (সত্যের) মানদণ্ড নাযিল করেছেন। কেয়ামত হয়তো নিকটবর্তী, তুমি তা জানবে কীভাবে?
মুহিউদ্দিন খান: আল্লাহই সত্যসহ কিতাব ও ইনসাফের মানদন্ড নাযিল করেছেন। আপনি কি জানেন, সম্ভবতঃ কেয়ামত নিকটবর্তী।
জহুরুল হক: আল্লাহ্ই তিনি যিনি সত্যসহ এই গ্রন্থ অবতারণ করেছেন আর দাঁড়িপাল্লা। আর কী তোমাকে জানাতে পারে -- সম্ভবতঃ ঘড়িঘন্টা আসন্ন।
Sahih International: It is Allah who has sent down the Book in truth and [also] the balance. And what will make you perceive? Perhaps the Hour is near.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১৭. আল্লাহ, যিনি নাযিল করেছেন সত্যসহকারে কিতাব এবং মীযান।(১) আর কিসে আপনাকে জানাবে যে, সম্ভবত কিয়ামত আসন্ন?
তাফসীর:
(১) অতঃপর উল্লেখ করা হয়েছে যে, কুরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। এতে আল্লাহর হক ও বান্দার হকের জন্য পূর্ণাঙ্গ আইন-কানুন রয়েছে। (أَنْزَلَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ وَالْمِيزَانَ) এখানে ‘কিতাব’ বলে কুরআনসহ সমস্ত আসমানী গ্ৰন্থকে বোঝানো হয়েছে এবং হক বলতে পূর্বোক্ত সত্যদ্বীনকে বোঝানো হয়েছে। ميزان এর শাব্দিক অর্থ দাঁড়ি-পাল্লা। এটা যেহেতু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার এবং অধিকার পূর্ণ মাত্রায় দেয়ার একটি মানদণ্ড তাই ইবনে আব্বাস এর তাফসীর করেছেন ন্যায় বিচার। মুজাহিদ বলেন, মানুষ যে দাঁড়ি-পাল্লা ব্যবহার করে এখানে তাই বোঝানো হয়েছে। সুতরাং হক শব্দের মধ্যে আল্লাহর যাবতীয় হক এবং ميزان শব্দের মধ্যে বান্দার যাবতীয় হকের প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। আর তখন ‘হকসহকারে’ এর অর্থ হবে, হকের বর্ণনা সম্বলিত। কোন কোন মুফাসসির বলেন, এখানে মীযান অর্থ আল্লাহর শরীয়ত, যা দাঁড়িপাল্লার মত ওজন করে ভুল ও শুদ্ধ, হক ও বাতিল, জুলুম ও ন্যায়বিচার এবং সত্য ও অসত্যের পার্থক্য স্পষ্ট করে দেয়। ওপরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখ দিয়ে বলানো হয়েছে যে, “তোমাদের মধ্যে ইনসাফ করার জন্য আমাকে আদেশ দেয়া হয়েছে।” এখানে বলা হয়েছে যে, এই পবিত্ৰ কিতাব সহকারে সেই ‘মিযান’ এসে গেছে যার সাহায্যে এই ইনসাফ কায়েম করা যাবে। [তাবারী, কুরতুবী]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১৭) আল্লাহই সত্যসহ গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছেন এবং (অবতীর্ণ করেছেন) তুলাদন্ড।[1] আর তুমি কি জান, সম্ভবতঃ কিয়ামত আসন্ন? [2]
তাফসীর:
[1] الْكِتَابَ বলতে সকল কিতাব। অর্থাৎ, সমস্ত নবীদের উপর যত কিতাবই অবতীর্ণ হয়েছে, সে সবই ছিল সত্য। অথবা বিশেষভাবে কুরআন মাজীদকে বুঝানো হয়েছে এবং তার সত্যতাকে সুস্পষ্টরূপে তুলে ধরা হয়েছে। ‘মীযান’ (তুলাদন্ড বা দাঁড়িপাল্লা)র অর্থ, ন্যায়পরায়ণতা ও সুবিচার। ইনসাফকে দাঁড়িপাল্লা বলে এই জন্য আখ্যায়িত করা হয়েছে যে, তা হল সমতা ও সুবিচারের যন্ত্র। এর মাধ্যমেই মানুষের মাঝে সমতা বজায় রাখা সম্ভব। এরই সমর্থক হল (নিম্নের) এই আয়াতগুলো, {لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَاتِ وَأَنْزَلْنَا مَعَهُمْ الْكِتَابَ وَالْمِيْزَانَ لِيَقُوْمَ النَّاسُ بِالْقِسِ} অর্থাৎ, আমি আমার রসূলগণকে সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলীসহ প্রেরণ করেছি এবং তাদের সাথে অবতীর্ণ করেছি কিতাব এবং মীযান, যাতে মানুষ ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে।’’ (সূরা হাদীদ ২৫ আয়াত) {وَالسَّمَاءَ رَفَعَهَا وَوَضَعَ المِيْزَانَ، اَلاَّ تَطْغَوْا فِي الْمِيْزَانِ، وَأَقِيْمُوْا الْوَزَْنَ بِالْقِسْطِ وَلاَ تُخْسِرُوا الْمِيْزَانَ} অর্থাৎ, তিনি আকাশকে সমুন্নত এবং স্থাপন করেছেন তুলাদন্ড। যাতে তোমরা সীমলঙ্ঘন না কর তুলাদন্ডে। তোমরা ন্যায্য ওজন কায়েম কর এবং ওজনে কম দিয়ো না।’’ (সূরা রহমান ৭-৯ আয়াত)
[2] قريب ‘মুযাক্কার’ (পুংলিঙ্গ) এবং ‘মুআন্নাষ’ (স্ত্রীলিঙ্গ) উভয়েরই ‘সিফাত’ (বিশেষণ) হিসাবে ব্যবহার হয়; বিশেষ করে ‘মউসুফ’ (বিশেষ্য) যদি কোন প্রাণী না হয়। যেমনঃ {اِنَّ رَحْمَتَ اللهِ قَرِيْبٌ مِنَ الْمُحْسِنِيْنَ} (ফাতহুল ক্বাদীর)
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১৬-১৯ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
যে দীন দ্বারা আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে প্রেরণ করেছেন সে দীনের প্রতি আহ্বান করার পরেও যারা আল্লাহ তা‘আলা সম্পর্কে বিতর্ক করে, বিভিন্ন যুক্তি-তর্ক পেশ করে, তাদের যুক্তি মূলত ভিত্তিহীন ও বাতিল আর তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। কেননা তারা এ সকল বাতিল তর্ক-বিতর্কের ফলে আল্লাহ তা‘আলার ক্রোধের পাত্রে পরিণত হয়েছে। এর দ্বারা ঐ সকল মুশরিদেরকে বুঝানো হয়েছে যারা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ধর্মকে মেনে নিয়েছে এ উদ্দেশ্যে যে, যাতে করে তারা পুনরায় মু’মিনদেরকে সত্য পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারে অথবা এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ইয়াহূদী এবং খ্রিস্টানরা, যারা মুসলিমদের সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক করত এবং বলত : আমাদের ধর্ম তোমাদের ধর্মের চেয়ে উত্তম এবং আমাদের নাবী তোমাদের নাবীর পূর্বে এসেছিলেন। অতএব আমরা তোমাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।
دَاحِضَةٌ অর্থ হলো, দুর্বল, বাতিল, অসার, অনর্থক, ভিত্তিহীন ইত্যাদি। অর্থাৎ তাদের প্রমাণাদী আল্লাহ তা‘আলার কাছে অনর্থক।
الكِتٰبَ দ্বারা এখানে কুরআনসহ সমস্ত আসমানী কিতাবকে বুঝানো হয়েছে।
এরপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন : তিনি وَالْمِيْزَانَ দাঁড়িপাল্লা নাযিল করেছেন। অর্থাৎ দাঁিড়পাল্লা দিয়ে ওজন করে সঠিকভাবে মেপে দেয়া হয়, কারো প্রতি জুলুম করা হয় না, তাই ইবনু আব্বাস (রাঃ)-এর তাফসীর করেছেন ন্যায়বিচার। মুজাহিদ বলেন : মানুষ ওজন করতে যে দাঁড়িপাল্লা ব্যবহার করে এখানে তা-ই উদ্দেশ্য। ইবনু আব্বাস (রাঃ)-এর তাফসীর অনুযায়ী, মিযান হল ন্যায়বিচারের। কারণ মিযান বা দাঁড়িপাল্লা স্থাপনের প্রধান উদ্দেশ্য হল ন্যায়বিচার করা। অতএব এ দুয়ের মধ্যে কোন বিরোধ নেই।
আল্লাহ তা‘আলা কিতাব ও ন্যায় বিচারসহ নাবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন তার বর্ণনা দিয়ে অন্যত্র বলেন :
(لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنٰتِ وَأَنْزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتٰبَ وَالْمِيْزَانَ لِيَقُوْمَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ)
নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলদেরকে প্রেরণ করেছি স্পষ্ট প্রমাণসহ এবং তাদের সঙ্গে দিয়েছি কিতাব ও মানদণ্ড যাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে (সূরা হাদীদ ৫৭ : ২৫)
তাছাড়া মিযান দাঁড়িপাল্লা নামক যন্ত্রের নামও এসেছে, তবুও তার মূল উদ্দেশ্য হল ন্যায়বিচার করা। আল্লাহ আরো বলেন,
(وَالسَّمَا۬ءَ رَفَعَهَا وَوَضَعَ الْمِيْزَانَ أَلَّا تَطْغَوْا فِي الْمِيْزَانِ وَأَقِيْمُوا الْوَزْنَ بِالْقِسْطِ وَلَا تُخْسِرُوا الْمِيْزَانَ)
“আকাশকে সমুন্নত করেছেন এবং স্থাপন করেছেন (ন্যায়ের) মানদণ্ড, যাতে তোমরা পরিমাপে সীমালঙ্ঘন না কর। ওজনের ন্যায্য মান প্রতিষ্ঠিত কর এবং ওজনে কম দিও না।” (সূরা আর-রহমান ৫৫ : ৭-৯)
সুতরাং মানুষ লেনদেনের ক্ষেত্রে দাঁড়িপাল্লা ব্যবহার করে যেমন ইনসাফ করে থাকে, তেমনি এর মাঝে এই ইঙ্গিতও রয়েছে যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলা ইনসাফের দাঁড়িপাল্লা স্থাপন করবেন, প্রত্যেককে তার আমলের যথার্থ প্রতিদান দেবেন, কারো প্রতি জুলুম করবেন না।
(يَسْتَعْجِلُ بِهَا الَّذِيْنَ لَا يُؤْمِنُوْنَ بِهَا)
‘যারা এর প্রতি বিশ্বাস করে না তারাই এটার (কিয়ামত) জন্য তড়িঘড়ি করে’ এখানে তিনটি বিষয় আলোচনা করা হয়েছে : (১) কাফিররা কিয়ামতকে বিশ্বাস করে না, অস্বীকার করে বিধায় তাড়াতাড়ি সংঘটিত হওয়া কামনা করে। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা তাদেরক কথা তুলে ধরে বলেন : তারা বলে :
( مَتٰي هٰذَا الْوَعْدُ إِنْ كُنْتُمْ صٰدِقِيْنَ)
“তোমরা যদি সত্যবাদী হও (তবে বল : ) এ (কিয়ামতের) প্রতিশ্রুতি কখন বাস্তবায়িত হবে?” (সূরা সাবা ৩৪ : ২৯)
অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(يَسْأَلُكَ النَّاسُ عَنِ السَّاعَةِ ط قُلْ إِنَّمَا عِلْمُهَا عِنْدَ اللّٰهِ ط وَمَا يُدْرِيْكَ لَعَلَّ السَّاعَةَ تَكُوْنُ قَرِيْبًا )
“লোকেরা তোমাকে কিয়ামত সম্পর্কে প্রশ্ন করে। তুমি বলে দাও- এর জ্ঞান শুধু আল্লাহরই কাছে রয়েছে। তুমি কি করে জানবে যে, হয়ত ক্বিয়ামত শীঘ্রই সংঘটিত হবে।” (সূরা আহযাব ৩৩ : ৬৩)
(২) মু’মিনরা কিয়ামতকে খুব ভয় করে থাকে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(الَّذِيْنَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ بِالْغَيْبِ وَهُمْ مِّنَ السَّاعَةِ مُشْفِقُوْنَ)
“যারা না দেখেও তাদের প্রতিপালককে ভয় করে এবং তারা কিয়ামত সম্পর্কে ভীত-সন্ত্রস্ত।” (সূরা আম্বিয়া ২১ : ৪৯)
(৩) মু’মিনরা জানে কিয়ামত সত্য, তা অবশ্যই সংঘটিত হবে। এক সাহাবী রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞাসা করলেন : হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! কিয়ামত কখন হবে? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন : তোমার ধ্বংস হোক, তা অবশ্যই হবে, তুমি কিয়ামতের জন্য কী তৈরি করেছ? তিনি বললেন : আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূলের প্রতি ভালবাসা। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন : তুমি যাকে ভালবাস তার সাথেই তুমি থাকবে।
সুতরাং যারা কিয়ামত সম্পর্কে ঝগড়া করে তারা মূলত পথভ্রষ্টতার মধ্যে নিপতিত।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(بَلْ كَذَّبُوْا بِالسَّاعَةِ وَأَعْتَدْنَا لِمَنْ كَذَّبَ بِالسَّاعَةِ سَعِيْرًا )
“বরং তারা কিয়ামতকে অস্বীকার করেছে আর যারা কিয়ামতকে অস্বীকার করে তাদের জন্য আমি প্রস্তুত রেখেছি জ্বলন্ত অগ্নি।” (সূরা ফুরকান ২৫ : ১১)
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. যারা ইসলাম গ্রহণ করার পর তা আবার ত্যাগ করে তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি, আর তারা আল্লাহ তা‘আলার ক্রোধের পাত্র।
২. আল্লাহ তা‘আলা ন্যায়ের মানদণ্ড দ্বারা তাঁর বান্দাদের মধ্যে ন্যায় বিচার করবেন।
৩. কাফির ও মু’মিনের মধ্যে পার্থক্য জানা গেল।
৪. যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালবাসবে সে কিয়ামতের দিন রাসূলের সাথে থাকবে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১৬-১৮ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তাআলা ঐ লোকদেরকে ভয় প্রদর্শন করছেন যারা মুমিনদের সাথে বাজে যুক্তি-তর্কে লিপ্ত হয় এবং তাদেরকে হিদায়াত হতে বিভ্রান্ত করার ইচ্ছা করে এবং আল্লাহর দ্বীনে বিশৃংখলা সৃষ্টি করে। তাদের যুক্তি-তর্ক মিথ্যা ও অসার। তারা আল্লাহ তা'আলার ক্রোধের পাত্র। কিয়ামতের দিন তাদের জন্যে রয়েছে কঠিন শাস্তি। তাদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হওয়া অসম্ভব। তা এই যে, মুসলমানরা পুনরায় অজ্ঞতার দিকে ফিরে যাবে। অনুরূপভাবে ইয়াহুদী ও খৃষ্টানরাও বাজে তর্ক করতো এবং মুসলমানদেরকে বলতোঃ “আমাদের দ্বীন তোমাদের দ্বীন অপেক্ষা উত্তম, আমাদের নবী তোমাদের নবীর পূর্বে এসেছিলেন, আমরা তোমাদের চেয়ে উত্তম এবং আমরা আল্লাহ তাআলার নিকট তোমাদের চেয়ে প্রিয়। তারা এগুলো মিথ্যা বলেছিল।
মহান আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহই অবতীর্ণ করেছেন সত্যসহ কিতাব। অর্থাৎ তার নিকট হতে তাঁর নবীদের উপর অবতারিত কিতাবসমূহ। আর তিনি অবতীর্ণ করেছেন তুলাদণ্ড। তাহলে আদল ও ইনসাফ। আল্লাহ তাআলার এই উক্তিটি তাঁর নিম্নের উক্তির মতঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি আমার রাসূলদেরকে প্রকাশ্য দলীল প্রমাণাদিসহ প্রেরণ করেছি এবং তাদের সাথে অবতীর্ণ করেছি কিতাব ও তুলাদণ্ড, যাতে মানুষ ইনসাফের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে।”(৫৭:২৫) আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি আকাশকে করেছেন সমুন্নত এবং স্থাপন করেছেন মানদণ্ড, যাতে তোমরা ভারসাম্য লংঘন না কর। ওজনের ন্যায্য মান প্রতিষ্ঠিত কর এবং ওজনে কম দিয়ো না।”(৫৫:৭-৯)
এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ তুমি কি জান যে, কিয়ামত খুবই আসন্ন?’ এতে ভয় ও লোভ উভয়ই রয়েছে। আর এর দ্বারা দুনিয়ার প্রতি অনাসক্ত করাও উদ্দেশ্য।
অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যারা এটাকে (কিয়ামতকে) বিশ্বাস করে না তারাই এটা ত্বরান্বিত করতে চায় এবং বলে যে, কিয়ামত কেন আসে না? তারা আরো বলেঃ “যদি সত্যবাদী হও তবে কিয়ামত সংঘটিত কর।” কেননা, তাদের মতে কিয়ামত সংঘটিত হওয়া অসম্ভব। অপরপক্ষে মুমিনরা এর কথা শুনে কেঁপে ওঠে। কেননা, তাদের দৃঢ় বিশ্বাস আছে যে, বিচার দিবসের আগমন সুনিশ্চিত। তারা এই কিয়ামতকে ভয় করে এমন কর্ম করতে থাকে যা তাদের ঐদিনে কাজে লাগবে।
মুতাওয়াতিরের পর্যায়ে পড়ে এরূপ একটি বিশুদ্ধ হাদীসে আছে যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে উচ্চস্বরে ডাক দিয়ে বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! কিয়ামত কখন হবে?” এটা সফরের ঘটনা। লোকটি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে কিছু দূরে ছিল। তিনি উত্তরে বলেনঃ “হ্যা, হঁ্যা, কিয়ামত অবশ্যই সংঘটিত হবে, তুমি এর জন্যে কি প্রস্তুতি গ্রহণ করেছো তাই বল?” সে জবাব দিলোঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর মহব্বত।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তুমি তাদের সঙ্গেই থাকবে যাদেরকে তুমি মহব্বত কর।” আর একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক ব্যক্তি তার সঙ্গেই থাকবে যাকে সে মহব্বত করে।` এ হাদীসটি অবশ্যই মুতাওয়াতির। মোটকথা, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ লোকটির প্রশ্নের জবাবে কিয়ামতের সময় নির্দিষ্ট করে বলেননি, বরং তাকে কিয়ামতের জন্যে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে বলেন। সুতরাং কিয়ামতের সময়ের জ্ঞান আল্লাহ ছাড়া আর কারো নেই।
এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ কিয়ামত সম্পর্কে যারা বাক-বিতণ্ডা করে তারা ঘোর বিভ্রান্তিতে রয়েছে। অর্থাৎ কিয়ামতের ব্যাপারে যে ব্যক্তি তর্ক-বিতর্ক করে, ওকে অস্বীকার করে এবং ওটা সংঘটিত হওয়াকে অসম্ভব বলে বিশ্বাস রাখে সে নিরেট মূর্খ। তার সঠিক বোধশক্তি মোটেই নেই। সরল-সোজা পথ হতে সে বহু দূরে সরে পড়েছে। এটা বড়ই বিস্ময়কর ব্যাপার যে, তারা যমীন ও আসমানের প্রথম সৃষ্টিকর্তাকে স্বীকার করছে, অথচ মানুষের মৃত্যুর পর তাদেরকে পুনরায় যে তিনি জীবন দান করতে সক্ষম এটা স্বীকার করছে না। যিনি একবার বিনা নমুনায় সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি দ্বিতীয়বার কি সৃষ্টি করতে সক্ষম হবেন না? অথচ তখন তো পূর্বের কিছু কিছু অংশ কোন না কোন আকারে অবশ্যই থাকবে! এটাকে কেন্দ্র করে পুনরায় সৃষ্টি করা কি তাঁর পক্ষে কঠিন? স্থির জ্ঞানও এটা মেনে নেয় যে, তখন সৃষ্টি করা তো আরো সহজ।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।