আল কুরআন


সূরা গাফির (আল মু‘মিন) (আয়াত: 60)

সূরা গাফির (আল মু‘মিন) (আয়াত: 60)



হরকত ছাড়া:

وقال ربكم ادعوني أستجب لكم إن الذين يستكبرون عن عبادتي سيدخلون جهنم داخرين ﴿٦٠﴾




হরকত সহ:

وَ قَالَ رَبُّکُمُ ادْعُوْنِیْۤ اَسْتَجِبْ لَکُمْ ؕ اِنَّ الَّذِیْنَ یَسْتَکْبِرُوْنَ عَنْ عِبَادَتِیْ سَیَدْخُلُوْنَ جَهَنَّمَ دٰخِرِیْنَ ﴿۶۰﴾




উচ্চারণ: ওয়া কা-লা রাব্বুকুমুদ ‘ঊনীআছতাজিব লাকুম ইন্নাল্লাযীনা ইয়াছতাকবিরূনা ‘আন ‘ইবা-দাতী ছাইয়াদখুলূনা জাহান্নামা দা-খিরীন।




আল বায়ান: আর তোমাদের রব বলেছেন, ‘তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের জন্য সাড়া দেব। নিশ্চয় যারা অহঙ্কার বশতঃ আমার ইবাদাত থেকে বিমুখ থাকে, তারা অচিরেই লাঞ্ছিত অবস্থায় জাহান্নামে প্রবেশ করবে।’




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৬০. আর তোমাদের রব বলেছেন, তোমরা আমাকে ডাক(১), আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। নিশ্চয় যারা অহংকারবশে আমার ইবাদাত থেকে বিমুখ থাকে, তারা অচিরেই জাহান্নামে প্রবেশ করবে লাঞ্ছিত হয়ে।(২)




তাইসীরুল ক্বুরআন: তোমার প্রতিপালক বলেন- তোমরা আমাকে ডাকো, আমি (তোমাদের ডাকে) সাড়া দেব। যারা অহংকারবশতঃ আমার ‘ইবাদাত করে না, নিশ্চিতই তারা লাঞ্ছিত অবস্থায় জাহান্নামে প্রবেশ করবে।




আহসানুল বায়ান: (৬০) তোমাদের প্রতিপালক বলেন, ‘তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।[1] যারা অহংকারে আমার উপাসনায় বিমুখ, ওরা লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।’[2]



মুজিবুর রহমান: তোমাদের রাব্ব বললেনঃ তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিব। কিন্তু যারা অহংকারে আমার ইবাদাতে বিমুখ তারা অবশ্যই জাহান্নামে প্রবেশ করবে লাঞ্ছিত হয়ে।



ফযলুর রহমান: তোমার প্রভু বলেছেন, “তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। যারা অহংকারবশত আমার ইবাদত থেকে বিরত থাকে তারা লাঞ্ছিত অবস্থায় জাহান্নামে প্রবেশ করবে।”



মুহিউদ্দিন খান: তোমাদের পালনকর্তা বলেন, তোমরা আমাকে ডাক, আমি সাড়া দেব। যারা আমার এবাদতে অহংকার করে তারা সত্বরই জাহান্নামে দাখিল হবে লাঞ্ছিত হয়ে।



জহুরুল হক: আর তোমাদের প্রভু বলেন -- "তোমরা আমাকে আহ্বান করো, আমি তোমাদের প্রতি সাড়া দেব। নিঃসন্দেহ যারা আমাকে উপাসনা করার বেলা অহংকার বোধ করে তারা অচিরেই জাহান্নামে প্রবেশ করবে লাঞ্ছিত অবস্থায়।"



Sahih International: And your Lord says, "Call upon Me; I will respond to you." Indeed, those who disdain My worship will enter Hell [rendered] contemptible.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৬০. আর তোমাদের রব বলেছেন, তোমরা আমাকে ডাক(১), আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। নিশ্চয় যারা অহংকারবশে আমার ইবাদাত থেকে বিমুখ থাকে, তারা অচিরেই জাহান্নামে প্রবেশ করবে লাঞ্ছিত হয়ে।(২)


তাফসীর:

(১) দো’আর শাব্দিক অর্থ ডাকা, অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিশেষ কোন প্রয়োজনে ডাকার অর্থে ব্যবহৃত হয়। কখনও যিকরকেও দোআ বলা হয়। যেমন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আরাফাতে আমার দোআ ও পূর্ববর্তী সকল নবী-রাসূলগণের দোআ এই কালেমাঃ

لا إلَهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ المُلْكُ ؛ وَلَهُ الحَمْدُ ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ 

এতে যিকরকে দোআ বলা হয়েছে। কারণ, দো'আ দু' প্রকারঃ ১. প্রার্থনা বা কিছু পেতে দো'আ করা ও ইবাদাতের মাধ্যমে দো'আ করা। চাওয়া বা প্রার্থনার দোআ হল - আল্লাহর কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ চাওয়া। এতে চাওয়া আছে, যাচ্ঞা আছে। পক্ষান্তরে ইবাদাতের দো'আর মধ্যে চাওয়া নেই। শুধু নৈকট্য লাভের জন্য যা যা করা হয় তাই এ প্রকারের ইবাদত। নৈকট্য লাভের সকল প্রকাশ্য-অপ্ৰকাশ্য কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে; কেননা যে আল্লাহর ইবাদাত করে, সে স্বীয় কথা ও অবস্থার ভাষায় তার রবের কাছে উক্ত ইবাদাত কবুল করার এবং এর উপর সাওয়াব দেয়ার আবেদন করে থাকে। পবিত্র কুরআনে দোআর যত নির্দেশ এসেছে, আর আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে দো'আ করা থেকে যত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে এবং দো'আকারীদের যত প্ৰশংসা করা হয়েছে, সে সবই প্রার্থনার দো'আ ও ইবাদাতের দো’আকে শামিল করে থাকে।

যেমন, আল্লাহ বলেন, (فَادْعُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ) “সুতরাং আল্লাহকে ডাক তাঁর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে”। [সূরা গাফিরঃ ১৪] আরও বলেন, (وَأَنَّ الْمَسَاجِدَ لِلَّهِ فَلَا تَدْعُوا مَعَ اللَّهِ أَحَدًا) “আর মসজিদসমূহ আল্লাহরই জন্য। সুতরাং আল্লাহর সাথে তোমরা অন্য কাউকে ডেকো না”। সূরা আল জ্বিনঃ ১৮] নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার এক বাণীতে বলেছেন, ‘দো’আই ইবাদত। তারপর তিনি এ আয়াত পাঠ করলেন। [আবু দাউদ: ১৪৭৯, তিরমিযি: ২৯৬৯, ইবন মাজহ: ৩৮২৮] অর্থাৎ প্রত্যেক দোআই ইবাদত এবং প্রত্যেক ইবাদতই দো'আ। কারণ এই যে, ইবাদত বলা হয় কারও সামনে চুড়ান্ত দীনতা অবলম্বন করাকে। বলাবাহুল্য, নিজেকে কারও মুখাপেক্ষী মনে করে তার সামনে সওয়ালের হস্ত প্রসারিত করা বড় দীনতা, যা ইবাদতের অর্থ। এমনিভাবে প্রত্যেক ইবাদতের সারমর্মও আল্লাহর কাছে মাগফেরাত ও জান্নাত তলব করা এবং দুনিয়া ও আখেরাতের নিরাপত্তা প্রার্থনা করা। আলোচ্য আয়াতেও ‘দো’আ’ ও ‘ইবাদত’ শব্দ দু'টিকে সমর্থক শব্দ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। কেননা, প্রথম বাক্যাংশে যে জিনিসকে দোআ শব্দ দ্বারা প্রকাশ করা হয়েছে দ্বিতীয় বাক্যাংশে সে জিনিসকেই ইবাদাত শব্দ দ্বারা প্ৰকাশ করা হয়েছে। এ দ্বারা একথা পরিষ্কার হয়ে গেল যে, দো’আই ইবাদত আর ইবাদতই দোআ। ঠিক এ বিষয়টিকে আমরা পবিত্র কুরআনের অন্য আয়াতে লক্ষ্য করতে পারি। সেখানে আল্লাহ বলেনঃ

وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنْ يَدْعُو مِنْ دُونِ اللَّهِ مَنْ لَا يَسْتَجِيبُ لَهُ إِلَىٰ يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَهُمْ عَنْ دُعَائِهِمْ غَافِلُونَ ٭ وَإِذَا حُشِرَ النَّاسُ كَانُوا لَهُمْ أَعْدَاءً وَكَانُوا بِعِبَادَتِهِمْ كَافِرِينَ

“সে ব্যক্তি অপেক্ষা অধিক বিভ্রান্ত কে, যে আল্লাহর পরিবর্তে এমন কিছুকে আহবান করে যা কিয়ামত দিবস পর্যন্তও তার আহবানে সাড়া দিবে না? আর অবস্থা তো এরকম যে, এসব কিছু তাদের আহবান সম্পর্কে অবহিতও নয়। যখন (কিয়ামতের দিন) মানুষদেরকে একত্রিত করা হবে, তখন সে সকল কিছু হবে তাদের শত্রু এবং সেগুলো তাদের ইবাদাত অস্বীকার করবে”। [সূরা আল-আহকাফঃ ৫–৬]


(২) উম্মতে মুহাম্মদীয়ার বিশেষ সম্মানের কারণে এই আয়াতে তাদেরকে দো'আ করার আদেশ করা হয়েছে এবং তা কবুল করারও ওয়াদা করা হয়েছে। আর যারা দো'আ করে না, তাদের জন্যে শাস্তিবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে। আলোচ্য আয়াতে দো'আ অর্থ যদি ইবাদতের দোআ বোঝানো হয় তবে দো'আ বর্জনকারী অবশ্যই গুনাহগার এমনকি কাফেরও হবে। আর সে হিসেবেই ইবাদত বর্জনকারীকে জাহান্নামের শাস্তিবাণী শোনানো হয়েছে। আর যদি দোআ বলে “চাওয়া’ বা “যাচ্ঞা করা” উদ্দেশ্য হয় তখন দোআ না করলে জাহান্নামের শাস্তিবাণী ঐ সময়ই শুধু হবে যখন সে অহংকারবশত: তা বর্জন করে। কেননা, অহংকারবশত: দো'আ বর্জন করা কুফরের লক্ষণ, তাই সে জাহান্নামের যোগ্য হয়ে যায়। নতুবা সাধারণ দো'আ ফরয বা ওয়াজিব নয়। দোআ না করলে গোনাহ হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহর কাছে দোআ অপেক্ষা অধিক সম্মানিত কোন বিষয় নেই। তিরমিযি: ৩৩৭০] অন্য এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে তার প্রয়োজন প্রার্থনা করে না, আল্লাহ তার প্রতি রুষ্ট হন। [তিরমিযীঃ ৩৩৭৩]

উপরোক্ত আয়াতে ওয়াদা রয়েছে যে বান্দা আল্লাহর কাছে যে দো'আ করে, তা কবুল হয়। কিন্তু মানুষ মাঝে মাঝে দোআ কবুল না হওয়াও প্রত্যক্ষ করে। এর জওয়াব দুটি। এক, দো'আ কবুল হওয়ার উপায় তিনটি। তন্মধ্যে কোন না কোন উপায়ে দো'আ কবুল হয়। (এক) যা চাওয়া হয়, তাই পাওয়া (দুই) প্রার্থিত বিষয়ের পরিবর্তে আখেরাতের কোন সওয়াব ও পুরস্কার দান করা এবং (তিন) প্রার্থিত বিষয় না পাওয়া কিন্তু কোন সম্ভাব্য আপদ-বিপদ সরে যাওয়া। সুতরাং এর যে কোন একটি হলেই দো'আ কবুল হয়েছে ধরে নিতে হবে। দুই. নির্ভরযোগ্য হাদীসমূহে কোন বিষয়কে দো'আ কবুলের পথে বাধা বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এসব বিষয় থেকে বেঁচে থাকা জরুরী।

এক. হারাম খাবার ও হারাম পরিধেয় পরিধান: হাদীসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, কোন কোন লোক খুব সফর করে এবং আকাশের দিকে হাত তুলে ইয়া রব, ইয়া রব, বলে দো'আ করে; কিন্তু তাদের পানাহার ও পোশাক-পরিচ্ছেদ হারাম পন্থায় অর্জিত। এমতাবস্থায় তাদের দো'আ কিরূপে কবুল হবে? [মুসলিম: ১০১৫] দুই. অসাবধান বেপরোয়া ও অন্যমনস্কভাবে দো'আর বাক্যাবলী উচ্চারণ করলে তাও কবুল হয় না বলেও হাদীসে বর্ণিত আছে। [তিরমিযি: ৩৪৭৯] তিন. অন্যায় কোন দো'আ যেন না হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, মুসলিম আল্লাহর কাছে যে দো'আই করে, আল্লাহ তা দান করেন, যদি তা কোন গোনাহ অথবা সম্পর্কচ্ছেদের দোআ না হয়। [মুসলিম: ২৭৩৫]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৬০) তোমাদের প্রতিপালক বলেন, ‘তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।[1] যারা অহংকারে আমার উপাসনায় বিমুখ, ওরা লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।”[2]


তাফসীর:

[1] (অর্থাৎ, তোমরা আমার কাছে দু’আ কর, আমি তোমাদের দু’আ কবুল করব।) পূর্বোক্ত আয়াতে যেহেতু মহান আল্লাহ কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার কথা আলোচনা করেছেন, তাই এখন এই আয়াতে এমন পথের দিশা দেওয়া হচ্ছে, যা অবলম্বন করে মানুষ পরকালের সৌভাগ্য লাভ করতে পারে। আয়াতে উল্লিখিত ‘দু’আ’র অর্থ অধিকাংশ মুফাসসেরগণ ইবাদত নিয়েছেন। অর্থাৎ, কেবল এক আল্লাহরই ইবাদত কর। যেমন, হাদীসেও ‘দু’আ’কেই ইবাদত বলা হয়েছে। (الدُّعَاءُ هُوَ الْعِبَادَةُ ) (مسند أحمد: ৪/২৭১، السنن الأربعة، مشكاة ২২৩০) এ ছাড়াও পরে উল্লিখিত يَسْتَكْبِرُوْنَ عَنْ عِبَادَتِي থেকেও পরিষ্কার হয়ে যায় যে, এর অর্থ ইবাদত। কেউ কেউ বলেছেন, ‘দু’আ’ বলতে, দু’আ করাই বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, মঙ্গল অর্জন ও অমঙ্গল দূরীভূত করার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা। কারণ, দু’আর (আভিধানিক অর্থঃ ডাকা এবং) শরীয়তী ও প্রকৃত অর্থ হল, চাওয়া। দ্বিতীয় অর্থে তার ব্যবহার রূপক। এ ছাড়াও দু’আর প্রকৃত অর্থের দিক দিয়ে এবং উল্লিখিত হাদীসের ভিত্তিতে তার অর্থ, ইবাদতই। কেননা, কারণ-ঘটিত নয় এমন অস্বাভাবিক কিছু কারো কাছে চাওয়া ও প্রার্থনা করাই হল তার ইবাদত করা। (ফাতহুল ক্বাদীর) উভয় অবস্থাতেই উদ্দেশ্য একটাই। আর তা হল, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে প্রয়োজন পূরণ এবং সাহায্যের জন্য ডাকা জায়েয নয়। কেননা, কারণ-ঘটিত নয় এমন অস্বাভাবিক প্রয়োজন পূরণের জন্য কাউকে ডাকলে তা ইবাদত হয়। আর ইবাদত আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য জায়েয নয়।

[2] এটা হল আল্লাহর ইবাদতকে যারা অস্বীকার করে, তা থেকে যারা মুখ ফিরিয়ে নেয় অথবা তাতে যারা অন্যদেরকেও শরীক করে তাদের পরিণাম।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৬০-৬৫ নম্বর আয়াতের তাফসীর :



আল্লাহ তা‘আলা বলেন, তোমরা আমাকে ডাক আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। পূর্বোক্ত আয়াতে যেহেতু মহান আল্লাহ কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার কথা আলোচনা করেছেন, তাই এখন এ আয়াতে এমন পথের দিশা দেয়া হচ্ছে যা অবলম্বন করলে মানুষ পরকালের সৌভাগ্য লাভ করতে পারবে। বেশির ভাগ তাফসীরবিদগণ আয়াতে দু‘আর অর্থ করেছেন ইবাদত। অর্থাৎ কেবল এক আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করো। যেমন হাদীসেও দু‘আকে একটি ইবাদত বলা হয়েছে। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন :



الدعاء هوالعبادة



দু‘আ, সেটি হলো ইবাদত। (মুসনাদ আহমাদ ৪/২৭১, মিশকাত হা. ২২৩০)



এ ছাড়াও পরে উল্লিখিত



(يَسْتَكْبِرُوْنَ عَنْ عِبَادَتِيْ)



থেকে পরিস্কার হয়ে যায় যে, এর অর্থ ইবাদত। কেউ কেউ বলেন, দু‘আ বলতে দু‘আ করাই বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ মঙ্গল অর্জন ও অমঙ্গল দূরীভূত করার জন্য আল্লাহ তা‘আলার নিকট প্রার্থনা করা। তবে প্রথম অর্থটাই অধিক সঠিক ।



( اَللّٰهُ الَّذِيْ جَعَلَ لَكُمُ اللَّيْلَ.... مُبْصِرًا)



এ সম্পর্কে সূরা ফুরক্বান-এর ৪৭ নম্বর আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।



( اَللّٰهُ الَّذِيْ جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ.....)



অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর ক্ষমতা এবং তিনি বান্দার প্রতি যে অনুগ্রহ করেছেন সে কথা বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন : তিনি পৃথিবীকে করেছেন মানবজাতির জন্য বসবাস উপযোগী। যেখানে মানুষ বসবাস, চলাফেরা, কাজকর্ম এবং জীবন-যাপন করছে। পরিশেষে মৃত্যুবরণ করে কিয়ামত পর্যন্ত এরই মধ্যে সমাধিস্থ থাকবে। আর এ জমিনের ওপর তিনি আকাশকে করেছেন ছাদস্বরূপ। এবং তিনি তাদের সৃষ্টিকার্য সম্পন্ন করার পর তাদেরকে জীবিকা হিসেবে দিয়েছেন এমন সব খাদ্য যা সুস্বাদু ও পুষ্টিকর। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন :



(يٰٓأَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوْا رَبَّكُمُ الَّذِيْ خَلَقَكُمْ وَالَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُوْنَ لا-‏ الَّذِيْ جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ فِرَاشًا وَّالسَّمَا۬ءَ بِنَا۬ءً ص وَّأَنْزَلَ مِنَ السَّمَا۬ٓءِ مَآءً فَأَخْرَجَ بِه۪ مِنَ الثَّمَرَاتِ رِزْقًا لَّكُمْ ج فَلَا تَجْعَلُوْا لِلّٰهِ أَنْدَادًا وَّأَنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ)



“হে মানবমণ্ডলী! তোমরা তোমাদের রবের ইবাদত কর যিনি তোমাদেরকে ও তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে সৃষ্টি করেছেন যেন তোমরা তাক্বওয়া অবলম্বনকারী হও। যিনি তোমাদের জন্য জমিনকে বিছানা ও আকাশকে ছাদস্বরূপ করেছেন এবং যিনি আকাশ হতে পানি বর্ষণ করেন, অতঃপর তার দ্বারা তোমাদের জন্য জীবিকাস্বরূপ ফল উৎপাদন করেন, অতএব তোমরা জেনে শুনে আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক কর না।” (সূরা বাকারাহ্ ২ : ২১-২২)



এবং তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন সর্বোত্তম আকৃতিতে। জমিনে যত প্রকার সৃষ্টিজীব রয়েছে তার মধ্যে মানুষকে সবচেয়ে সুন্দর আকৃতি এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ অবয়ব দান করেছেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন,



(لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ فِيْ۬ أَحْسَنِ تَقْوِيْمٍ)‏



“আমি সৃষ্টি করেছি মানুষকে সুন্দরতর অবয়বে”। (সূরা আত্ তীন ৯৫ : ৪)



এগুলো এটা প্রমাণ করে যে, স্রষ্টা হিসেবে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই উপাস্য, অন্য কেউ নয়।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :



১. আল্লাহ তা‘আলাকে ডাকলে তিনি বান্দার ডাকে সাড়া দিয়ে থাকেন- এ কথা জানা গেল।

২. আল্লাহ তা‘আলার কতিপয় নেয়ামতের কথা জানতে পারলাম।

৩. একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করতে হবে, তার প্রশংসা করতে হবে এবং তাঁর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে হবে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলার এই অনুগ্রহ ও দয়ার উপর আমাদের জীবনকে উৎসর্গ করা উচিত যে, তিনি আমাদেরকে তাঁর নিকট প্রার্থনা করার জন্যে হিদায়াত করছেন এবং তা কবূল করার ওয়াদা করছেন! হযরত সুফিয়ান সাওরী (রঃ) বলতেন:“হে ঐ সত্তা, যাঁর কাছে ঐ বান্দা খুবই প্রিয়পাত্র হয় যে তার কাছে খুব বেশী প্রার্থনা করে এবং ঐ বান্দা খুবই মন্দ ও অপ্রিয় হয় যে তার কাছে প্রার্থনা করে না। হে আমার প্রতিপালক! এই গুণ তো একমাত্র আপনার মধ্যেই রয়েছে। কবি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহর মাহাত্ম্য এই যে, যদি তুমি তার কাছে চাওয়া পরিত্যাগ কর তবে তিনি অসন্তুষ্ট হন, পক্ষান্তরে আদম সন্তানের কাছে যখন চাওয়া হয় তখন সে অসন্তুষ্ট হয়।”

হযরত কা'বুল আহ্বার (রাঃ) বলেন, উম্মতে মুহাম্মাদ (সঃ)-কে এমন তিনটি জিনিস দেয়া হয়েছে যা পূর্ববর্তী কোন উম্মতকে দেয়া হয়নি। আল্লাহ তা'আলা যখন কোন নবী (আঃ)-কে পাঠাতেন তখন তাকে বলতেনঃ “তুমি তোমার উম্মতের উপর সাক্ষী থাকলে।” আর তোমাদেরকে (উম্মতে মুহাম্মাদী সঃ-কে) তিনি সমস্ত লোকের উপর সাক্ষী করেছেন। পূর্ববর্তী প্রত্যেক নবী (আঃ)-কে বলা হতোঃ “দ্বীনের ব্যাপারে তোমার উপর কোন বাধ্য-বাধকতা নেই। পক্ষান্তরে এই উম্মতকে বলা হয়েছেঃ “তোমাদের দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের উপর কোন বাধ্যবাধকতা নেই।” পূর্ববর্তী প্রত্যেক নবী (আঃ)-কে বলা হতোঃ “তুমি আমাকে ডাকো, আমি তোমার ডাকে সাড়া দিবো।” আর এই উম্মতকে বলা হয়েছেঃ “তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবো।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) নবী (সঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁকে বলেনঃ “চারটি স্বভাব রয়েছে, যেগুলোর মধ্যে একটি আমার জন্যে, একটি তোমার জন্যে, একটি আমার ও তোমার মাঝে এবং একটি তোমার ও অন্যান্য বান্দাদের মাঝে। যা আমার জন্যে তা এই যে আমারই ইবাদত করবে এবং আমার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করবে না। তোমার হক আমার উপর এই যে, আমি তোমাকে তোমার প্রতিটি ভাল কাজের পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করবো। যা তোমার ও আমার মাঝে তা এই যে, তুমি আমার কাছে প্রার্থনা করবে এবং আমি তোমার প্রার্থনা কবুল করবো। আর যা তোমার এবং আমার অন্যান্য বান্দাদের মাঝে তা এই যে, তুমি তাদের জন্যে ওটাই পছন্দ করবে যা তুমি নিজের জন্যে পছন্দ কর।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু ইয়ালা (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দু'আ হলো ইবাদত।” অতঃপর তিনি ... (আরবী)-এই আয়াতটি পাঠ করেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সুনানের মধ্যে এ হাদীসটি রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন। ইবনে হিব্বান (রঃ) এবং হাকিমও (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)

হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি মহামহিমান্বিত আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে না তিনি তার প্রতি রাগান্বিত হন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

হযরত মুহাম্মাদ ইবনে মুসাল্লামা আনসারীর (রাঃ) মৃত্যুর পর তাঁর তরবারীর কোষ হতে এক টুকরা কাগজ বের হয়। তাতে লিখিত ছিলঃ “তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের রহমত লাভের সুযোগ অন্বেষণ করতে থাকো। খুব সম্ভব যে, তোমরা কল্যাণের দু'আ করবে, আর ঐ সময় আল্লাহর রহমত উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠবে এবং তোমরা এমন সৌভাগ্য লাভ করবে যার পরে আর কখনো তোমাদেরকে দুঃখ ও আফসোস করতে হবে না।” (এটা হাফিয আবু মুহাম্মদ হাসান ইবনে আবদির রহমান রামহারামযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

এ আয়াতে ইবাদত দ্বারা দু'আ ও তাওহীদকে বুঝানো হয়েছে।

হযরত আমর ইবনে শুআয়েব (রাঃ) তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন অহংকারী লোকদেরকে পিঁপড়ার আকারে একত্রিত করা হবে। ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্রতম জিনিসও তাদের উপর থাকবে। তাদেরকে কূলাস নামক জাহান্নামের জেলখানায় নিক্ষেপ করা হবে। প্রজ্বলিত অগ্নি তাদের মাথার উপর থাকবে। তাদেরকে জাহান্নামীদের রক্ত, পুঁজ এবং প্রস্রাব-পায়খানা খেতে দেয়া হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)

অহীব ইবনুল অরদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তাঁকে একজন বুযুর্গ ব্যক্তি বলেছেন, রোমে আমি কাফিরদের হাতে বন্দী হয়েছিলাম। একদা আমি শুনতে পেলাম যে, এক অদৃশ্য আহ্বানকারী পর্বতের চূড়া হতে উচ্চস্বরে আহ্বান করে বলছেঃ “হে আমার প্রতিপালক! ঐ ব্যক্তির জন্যে বিস্মিত হতে হয় যে আপনাকে চেনা জানা সত্ত্বেও অন্যের সাথে তার আশা-আকাঙ্ক্ষার সম্পর্ক রাখতে চায়। হে আমার প্রতিপালক! ঐ ব্যক্তির জন্যে বিস্ময়বোধ হয় যে আপনার পরিচয় লাভ করা সত্ত্বেও নিজের প্রয়োজন পুরো করবার জন্যে অন্যের কাছে গমন করে!” এরপর কিছুক্ষণ থেমে থেকে আরো উচ্চস্বরে বললোঃ “আরো বেশী বিস্মিত হতে হয় ঐ ব্যক্তির জন্যে যে মহান আল্লাহর পরিচয় জানা সত্ত্বেও অন্যের সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে এমন কাজ করে যে কাজে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন।” একথা শুনে আমি উচ্চস্বরে ডাক দিয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করলামঃ তুমি কি দানব, না মানব? সে উত্তরে বললোঃ “মানব!” তারপর বললোঃ “ঐ সব কাজ হতে তুমি তোমার ধ্যান সরিয়ে নাও যাতে তোমার কোন উপকার নেই এবং যে কাজে তোমার উপকার আছে সেই কাজে মগ্ন হয়ে পড়।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।