সূরা গাফির (আল মু‘মিন) (আয়াত: 26)
হরকত ছাড়া:
وقال فرعون ذروني أقتل موسى وليدع ربه إني أخاف أن يبدل دينكم أو أن يظهر في الأرض الفساد ﴿٢٦﴾
হরকত সহ:
وَ قَالَ فِرْعَوْنُ ذَرُوْنِیْۤ اَقْتُلْ مُوْسٰی وَ لْیَدْعُ رَبَّهٗ ۚ اِنِّیْۤ اَخَافُ اَنْ یُّبَدِّلَ دِیْنَکُمْ اَوْ اَنْ یُّظْهِرَ فِی الْاَرْضِ الْفَسَادَ ﴿۲۶﴾
উচ্চারণ: ওয়া কা-লা ফির‘আওনুযারূনীআকতুল মুছা-ওয়াল ইয়াদ‘উ রাব্বাহূ ইন্নীআখা-ফু আইঁ ইউবাদ্দিলা দীনাকুম আও আইঁ ইউজহিরা ফিল আরদিল ফাছা-দ।
আল বায়ান: আর ফির‘আউন বলল, ‘আমাকে ছেড়ে দাও, আমি মূসাকে হত্যা করি এবং সে তার রবকে ডাকুক; নিশ্চয় আমি আশঙ্কা করি, সে তোমাদের দীন পাল্টে দেবে অথবা সে যমীনে বিপর্যয় ছড়িয়ে দেবে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২৬. আর ফিরআউন বলল, আমাকে ছেড়ে দাও আমি মূসাকে হত্যা করি এবং সে তার রবকে আহবান করুক। নিশ্চয় আমি আশংকা করি যে, সে তোমাদের দ্বীন পরিবর্তন করে দেবে অথবা সে যমীনে বিপর্যয় ছড়িয়ে দেবে।
তাইসীরুল ক্বুরআন: ফিরআউন বলল- ছেড়ে দাও আমাকে, আমি মূসাকে হত্যা করব, ডাকুক সে তার রব্বকে। আমি আশঙ্কা করছি, সে তোমাদের জীবন পদ্ধতিকে বদলে দেবে কিংবা দেশে বিপর্যয় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে।
আহসানুল বায়ান: (২৬) ফিরআউন বলল, আমাকে ছাড়ো, আমি মূসাকে হত্যা করি[1] এবং সে তার প্রতিপালকের শরণাপন্ন হোক।[2] আমি আশংকা করি যে, সে তোমাদের ধর্মের পরিবর্তন সাধন করবে অথবা সে পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে। [3]
মুজিবুর রহমান: ফির‘আউন বললঃ আমাকে ছেড়ে দাও, আমি মূসাকে হত্যা করি এবং সে তার রবের শরণাপন্ন হোক। আমি আশংকা করি যে, সে তোমাদের দীনের পরিবর্তন ঘটাবে অথবা সে পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে।
ফযলুর রহমান: ফেরাউন বলল, “তোমরা আমাকে ছাড়, আমি মূসাকে হত্যা করি আর সে তার প্রভুকে ডাকুক। (কারণ) আমার ভয় হয়, সে তোমাদের ধর্ম পরিবর্তন করে দেবে অথবা দুনিয়ায় অশান্তি ছড়াবে।”
মুহিউদ্দিন খান: ফেরাউন বলল; তোমরা আমাকে ছাড়, মূসাকে হত্যা করতে দাও, ডাকুক সে তার পালনকর্তাকে! আমি আশংকা করি যে, সে তোমাদের ধর্ম পরিবর্তন করে দেবে অথবা সে দেশময় বিপর্যয় সৃষ্টি করবে।
জহুরুল হক: আর ফিরআউন বলল -- "আমাকে ছেড়ে দাও যাতে আমি মূসাকে বধ করতে পারি, আর সে তার প্রভুকে ডাকতে থাকুক, নিঃসন্দেহ আমি আশঙ্কা করছি যে সে তোমাদের ধর্মমত বদলে দেবে, অথবা সে দেশের মধ্যে বিপর্যয়ের প্রসার করবে।
Sahih International: And Pharaoh said, "Let me kill Moses and let him call upon his Lord. Indeed, I fear that he will change your religion or that he will cause corruption in the land."
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ২৬. আর ফিরআউন বলল, আমাকে ছেড়ে দাও আমি মূসাকে হত্যা করি এবং সে তার রবকে আহবান করুক। নিশ্চয় আমি আশংকা করি যে, সে তোমাদের দ্বীন পরিবর্তন করে দেবে অথবা সে যমীনে বিপর্যয় ছড়িয়ে দেবে।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (২৬) ফিরআউন বলল, আমাকে ছাড়ো, আমি মূসাকে হত্যা করি[1] এবং সে তার প্রতিপালকের শরণাপন্ন হোক।[2] আমি আশংকা করি যে, সে তোমাদের ধর্মের পরিবর্তন সাধন করবে অথবা সে পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে। [3]
তাফসীর:
[1] এ কথা সম্ভবতঃ ফিরআউন তাদেরকে বলেছিল, যারা মূসা (আঃ)-কে হত্যা করতে নিষেধ করেছিল।
[2] এটা ছিল ফিরআউনের বড়ই ধৃষ্টতার প্রকাশ যে, আমি দেখব, তাঁর প্রভু তাঁকে কিভাবে বাঁচায়। তাঁকে আহবান করেই দেখে নিক। অথবা প্রতিপালককেই অস্বীকার করে বলল যে, তার আবার প্রভু কে আছে, যে তাকে বাঁচাবে। যেহেতু ফিরআউন তো নিজেকেই মহান প্রভু ভাবত।
[3] অর্থাৎ, গায়রুল্লাহর ইবাদত হতে সরিয়ে এনে আল্লাহর ইবাদতে লাগিয়ে দেবে। অথবা তাঁর কারণে ফাসাদ সৃষ্টি হয়ে যাবে। তার উদ্দেশ্য ছিল, তার দাওয়াত যদি আমার জাতির কিছু লোক গ্রহণ করে নেয়, তাহলে সে তাদের সাথে তর্ক-বিতর্ক করবে, যারা তা গ্রহণ করবে না। আর এতে তাদের আপোসে ঝগড়া সৃষ্টি হবে এবং তা ফাসাদের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। এইভাবে ফেরাঊন তাওহীদের দাওয়াতকে ফাসাদ ও বিপর্যয় এবং তাওহীদবাদীদেরকে ফাসাদী ও বিপর্যয় সৃষ্টিকারী গণ্য করল। অথচ প্রকৃতপ্রস্তাবে সে নিজেই ছিল ফাসাদী এবং গায়রুল্লাহর ইবাদতই হল বিপর্যয় ও ফাসাদের মূল উৎস।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ২৩-৪৬ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
এ আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর প্রিয় নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে পূর্ববর্তী নাবী মূসা (আঃ)-এর জীবন বৃত্তান্ত উল্লেখ করে সান্ত্বনা প্রদান করছেন যে, পূর্ববর্তী যুগে যেমন নাবী-রাসূলগণই বিজয়ী হয়েছিলেন তদ্রুপ তুমিও তোমার সময়ের কাফির-মুশরিকদের ওপর বিজয়ী হবে। সুতরাং তাদের কথা বার্তায়, কার্য-কলাপে চিন্তিত ও ভীত হওয়ার কোনই কারণ নেই।
মূসা (আঃ) ফির‘আউনকে যেভাবে দীনের দা‘ওয়াত দিয়েছিলেন তা হলো, ফির‘আউন ছিল মিশরে বসবাসকারী ক্বিবতীদের বাদশাহ। সে ছিল অত্যাচারী ও জালিম এবং সর্বোচ্চ রব হওয়ার দাবীদার। সে মূসা (আঃ)-এর সম্প্রদায় বানী ইসরাঈলকে দাস বানিয়ে রেখেছিল এবং তাদের ওপর নানাভাবে কঠোর নির্যাতন চালাত। হামান ছিল তার মন্ত্রী ও তার প্রধান উপদেষ্টা। আর কারূন ছিল তার যুগের বিরাট বিত্তশালী ব্যক্তি। আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আঃ)-কে রিসালাত দিয়ে তাদের নিকট পাঠালেন এবং বললেন : তুমি ফির‘আউন, হামান এদের নিকট দীনের দা‘ওয়াত পৌঁছে দাও। যখন মূসা (আঃ) আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশে তাদের নিকট আগমন করলেন তখন তারা তাঁকে জাদুকর ও পাগল বলে আখ্যায়িত করল। যেমন আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন,
(كَذٰلِكَ مَآ أَتَي الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِهِمْ مِّنْ رَّسُوْلٍ إِلَّا قَالُوْا سَاحِرٌ أَوْ مَجْنُوْنٌ قف- أَتَوَاصَوْا بِه۪ ج بَلْ هُمْ قَوْمٌ طَاغُوْنَ)
“এভাবে, তাদের পূর্ববর্তীদের নিকট যখনই কোন রাসূল এসেছে, তারা বলেছে : তুমি তো এক জাদুকর অথবা উন্মাদ। তারা কি একে অপরকে এই উপদেশই দিয়ে এসেছে? বস্তুত তারা এক সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়।” (সূরা আয্ যা-রিয়া-ত ৫১ : ৫২-৫৩)
এমনকি ফির‘আউন এ নির্দেশও দিলো যে, মূসা (আঃ)-সহ তাঁর সাথে যারা ঈমান এনেছে তাদের পুত্র সন্তানদেরকে হত্যা করো এবং এদের কন্যা সন্তানদেরকে জীবিত রাখো। এটি ছিল ঐ শাস্তি যে শাস্তি ফির‘আউন বানী ইসরাঈলকে দিয়েছিল মূসা (আঃ)-এর জন্মকে কেন্দ্র করে। এটা করার কারণ ছিল এই যে, যাতে করে বানী ইসরাঈলরা মূসা (আঃ)-এর আগমন নিজেদের জন্য মুসীবত ও অমঙ্গলের কারণ মনে করে। যেমন তারা তাই বলেছিল।
(قَالُوْآ أُوْذِيْنَا مِنْ قَبْلِ أَنْ تَأْتِيَنَا وَمِنْۭ بَعْدِ مَا جِئْتَنَا)
“তারা বলল : ‘আমাদের নিকট তোমার আসার পূর্বে আমরা নির্যাতিত হয়েছি এবং তোমার আসার পরেও।’’ (সূরা আ‘রাফ ৭ : ১২৯)
তখন ফির‘আউন মূসা (আঃ)-কে হত্যা করার জন্য উদ্ধত হয়ে বলল : আমাকে ছেড়ে দাও আমি মূসা-কে হত্যা করি যাতে সে তার রবের শরণাপন্ন হয়। আর বানী ইসরাঈলকে এ বলে সতর্ক করল যে, তাঁর থেকে সাবধান হও, সে তোমাদেরকে তোমাদের দীন হতে বিচ্যুত করবে অথবা সে জমিনে ফিৎনা-ফাসাদ সৃষ্টি করবে।
যখন মূসা (আঃ) এ কথা জানতে পারলেন যে, ফিরআউন তাঁকে হত্যা করার ইচ্ছা করছে, তখন তিনি আল্লাহ তা‘আলার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করলেন। আমাদের নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন শত্র“র ভয় করতেন তখন তিনি এ দু‘আ পড়তেন :
اللهم انا نجعلك في نحورهم ونعوذبك من شرورهم
অর্থ : হে আল্লাহ তা‘আলা আপনাকে আমরা তাদের মুখোমুখি করছি, তাদের অনিষ্ট থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাচ্ছি। (আবূ দাঊদ হা. ১৫৩৭)
এমতাবস্থায় ফির‘আউনের বংশের একজন মু’মিন ব্যক্তি যে তার ঈমানকে গোপন রেখেছিল সে বলল : তোমরা কি এক ব্যক্তিকে এজন্য হত্যা করবে যে, সে বলে : আমার রব হলেন একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা, আর সে এ বিষয়ে তোমাদের নিকট প্রমাণও উপস্থাপন করেছে? যদি তাঁর দাবী মিথ্যা হয় তাহলে এ জন্য সে দায়ী, আর যদি তার কথা সত্য হয় তাহলে তোমাদের তা পালন করতে বাধা কোথায়? সে ঈমানদার ব্যক্তি তাঁর সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে আরো বলল : আজ পৃথিবীতে তোমাদের কর্তৃত্ব, দেশে তোমরাই প্রবল। কিন্তু যখন আল্লাহ তা‘আলার শাস্তি এসে যাবে তখন কে এ শাস্তি থেকে রক্ষা করবে? তাঁর কথার উত্তরে ফির‘আউন বলল : আমি তোমাদেরকে সঠিক পথেরই দিক নির্দেশনা দিয়ে থাকি। তখন তারা ফির‘আউনেরই অনুসরণ করতে থাকল। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
( فَاتَّبَعُوْآ أَمْرَ فِرْعَوْنَ ج وَمَآ أَمْرُ فِرْعَوْنَ بِرَشِيْدٍ)
“কিন্তু তারা ফির‘আউনের কার্যকলাপের অনুসরণ করত আর ফির‘আউনের কার্যকলাপ ভাল ছিল না।” (সূরা হূদ ১১ : ৯৭)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
(وَأَضَلَّ فِرْعَوْنُ قَوْمَه۫ وَمَا هَدٰي)
“আর ফির‘আউন তার সম্প্রদায়কে পথভ্রষ্ট করেছিল এবং সৎ পথ দেখায়নি।” (সূরা ত্বা-হা- ২০ : ৭৯)
তখন মু’মিন ব্যক্তিটি পুনঃরায় তাঁর সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে বলল : আমি তোমাদের পূর্ববর্তী জাতি, ‘আদ, সামূদ, তুব্বা সম্প্রদায়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, তারা আল্লাহ তা‘আলার রাসূলের অবাধ্য হয়েছিল ফলে তাদের ওপর আল্লাহ তা‘আলার শাস্তি এসেছিল এবং আমি তোমাদের ব্যাপারে ভয় করি যে, তোমাদের অবস্থাও তেমনই হবে। আর আমি ভয় করি সেদিনের যেদিন তোমরা পশ্চাৎ ফিরে পলায়ন করতে চাইবে কিন্তু তোমরা সেদিন এ শাস্তি থেকে পলায়ন করতে পারবে না। এরপর সে (মু’মিন ব্যক্তি) তাঁর সম্প্রদায়ের পূর্ববর্তী কার্য-কলাপের কথা তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিলো এবং বলল : যারা এরূপ কার্য-কলাপ করে তারা মূলত অতিশয় ঘৃণিত মানুষ।
التناد এটি কিয়ামতের একটি নাম।
এ সকল উপদেশ শোনার পরও ফির‘আউন মূসা (আঃ)-এর রব অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলাকে উপহাস করণার্থে তার মন্ত্রী ও উপদেষ্টা হামানকে নির্দেশ দিলো যে, সে যেন ফির‘আউনের জন্য একটি সুউচ্চ প্রাসাদ নির্মাণ করে যাতে আরোহন করে আকাশ পর্যন্ত পৌঁছতে পারে এবং মহান আল্লাহকে উঁকি মেরে দেখতে পারে। যেমন অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(وَقَالَ فِرْعَوْنُ يٰٓأَيُّهَا الْمَلَأُ مَا عَلِمْتُ لَكُمْ مِّنْ إلٰهٍ غَيْرِيْ فَأَوْقِدْ لِيْ يٰهَامٰنُ عَلَي الطِّيْنِ فَاجْعَلْ لِّيْ صَرْحًا لَّعَلِّيْٓ أَطَّلِعُ إِلٰٓي إلٰهِ مُوْسٰي لا وَإِنِّيْ لَأَظُنُّه۫ مِنَ الْكٰذِبِيْنَ)
“ফির‘আউন বলল : ‘হে পরিষদবর্গ। আমি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন মা‘বূদ আছে বলে আমি জানি না। হে হামান! তুমি আমার জন্য ইট পোড়াও এবং একটি সুউচ্চ প্রাসাদ তৈরি কর; হয়ত আমি তাতে উঠে মূসার মা‘বূদকে দেখতে পাব। তবে আমি অবশ্যই মনে করি সে মিথ্যাবদী।’’ (সূরা আল ক্বাসাস ২৮ : ৩৮)
এবং সে এও বলল যে, আল্লাহ তা‘আলা বলতে কিছু নেই। মূসা যে দাবী উত্থাপন করেছে তা আমি মিথ্যা মনে করি। এভাবেই ফির‘আউন সৎ পথে আসতে নিজে বিরত থাকল এবং তার সম্প্রদায়কেও বাধা দিল। আর সে যে ষড়যন্ত্র করেছিল তাও ব্যর্থ হলো।
ঈমানদার লোকটি পুনরায় তাঁর সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে বলল : তোমরা আমার অনুসরণ করো, আমি তোমাদেরকে সৎ পথে পরিচালিত করব। তখন সে তাদেরকে পার্থিব জীবন যে নশ্বর এবং পরকালের জীবন চিরস্থাযী সে সম্পর্কে নসীহত করল। সে এও বললেন যে, যদি তোমরা দুনিয়াতে মন্দ কর্মে লিপ্ত হও তাহলে পরকালে তার প্রতিদান মন্দই পাবে, আর যদি ভাল আমল করো তাহলে তার প্রতিদান হিসেবে তোমরা পরকালে চিরস্থায়ী জান্নাতে প্রবেশ করবে আর সেখানে তোমরা পাবে অপরিমেয় রিযিক এবং তোমাদের মন যা চাইবে তা-ই।
ঈমানদার ব্যক্তিটি তাঁর সম্প্রদায়কে এ কথাও বলল যে, এটা কতই না আশ্চার্যজনক যে, আমি তোমাদেরকে আহ্বান করছি মুক্তির পথে, যে পথে চললে তোমরা নাজাত পাবে। আর তোমরা কিনা তার বদৌলতে আমাকে আহ্বান করছ জাহান্নামের দিকে। তোমরা আমাকে নির্দেশ দিচ্ছ যেন আমি এক আল্লাহ তা‘আলাকে অস্বীকার করি, আর তাঁর সাথে অংশীদার স্থাপন করি। আমি তোমাদেরকে আহ্বান করছি পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল এক আল্লাহর দিকে, আর তোমরা আমাকে আহ্বান করছ এমন এক ব্যক্তির অনুসরণ করার যে কিনা দুনিয়া ও পরকাল কোথাও অনুসরণের যোগ্য নয়। বস্তুত আমাদেরকে এক আল্লাহরই অনুসরণ করতে হবে যার দিকে আমরা সকলেই প্রত্যাবর্তিত হব।
সুতরাং যারা তাঁর অনুসরণ করবে না মূলত তারাই জাহান্নামী। সে এ সকল নসীহত করে সর্বশেষে বলল : আমি আমার রবের নিকট আমার ব্যাপার অর্পন করছি, তিনিই তা দেখবেন। আর তোমরা অচিরেই এ সকল কথা-বার্তা স্মরণ করবে অর্থাৎ তোমরা আমার এ সকল কথার সত্যতা ও প্রমাণ পেয়ে যাবে। এ সকল কথা বলে ঈমানদার লোকটি তাদের থেকে চলে গেল।
অবশেষে অবস্থা এমন হলো যে, আল্লাহ তা‘আলা ঐ মু’মিন ব্যক্তিকে ষড়যন্ত্রের অনিষ্টতা হতে রক্ষা করলেন এবং কঠিন শাস্তি পরিবেষ্টন করল ফির‘আউন ও তার সম্প্রদায়কে। অর্থাৎ তারা পানিতে ডুবে মৃত্যুমুখে পতিত হলো।
বারযাখ তথা কবরে ফির‘আউন ও তার দলবলের সামনে প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যায় শাস্তির আগুনের শিখা পেশ করা হয়। এ আয়াত থেকে কবরের আযাবের কথা প্রমাণ হয়। আয়িশাহ (রাঃ)-এর প্রশ্নের জবাবে একদা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন :
نعم عذاب القبر حق
হ্যাঁ, কবরের আযাব সত্য। (সহীহ বুখারী হা. ১৩৭২) অনুরূপ একটি হাদীসে বলা হয়েছে : “যখন তোমাদের মধ্যে কেউ মৃত্যু বরণ করে, তখন (কবরে) সকাল সন্ধ্যায় তাকে তার স্থান দেখানো হয়। অর্থাৎ সে জান্নাতী হলে জান্নাত এবং জাহান্নামী হলে তার সামনে জাহান্নাম পেশ করা হয় এবং বলা হয়- এটা হলো তোমার আসল ঠিকানা যেখানে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে পাঠাবেন। (সহীহ বুখারী হা. ১৩৭৯)
এ থেকে আরো পরিস্কার হয় যে, সকাল-সন্ধ্যায় তাদের সাথে শাস্তির আগুন পেশ করার ব্যাপারটা কিয়ামতের আগেই। আর কিয়ামতের পূর্বে বারযাখও কবরেরই জীবন। ال (ফির‘আউনের বংশধর) বলতে তার জাতি এবং তার সকল অনুসারী। আর যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে সেদিন ফেরেশতাদের নির্দেশ দেয়া হবে যে, ফির‘আউনসহ তার সম্প্রদায়কে কঠিন শাস্তিতে নিক্ষেপ করো। তথায় তাদেরকে চিরস্থাযী শাস্তিতে নিক্ষেপ করা হবে। যে শাস্তি থেকে তারা কোনদিন পরিত্রাণ পাবে না।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. এক আল্লাহ তা‘আলারই ইবাদত করতে হবে।
২. অন্ধের ন্যায় দলীল-প্রমাণ ব্যতীত কোন কিছু মানা যাবে না।
৩. সত্য জিনিস জানতে পারলে যত বাধাই আসুক মিথ্যা পরিহার করে সত্যকে গ্রহণ করতে হবে।
৪. গর্ব-অহংকার করা আল্লাহ তা‘আলা পছন্দ করেন না।
৫. পূর্ববর্তী জাতিসমূহের ঘটনা থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে।
৬. সৎ ব্যক্তিদেরকে সাহায্য করা আল্লাহ তা‘আলার দায়িত্ব।
৭. কবরের আযাব সত্য।
৮. আল্লাহ তা‘আলা সস্বত্তায় আরশের ওপর আছেন, এ কথা ফির‘আউনও জানত।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ২৩-২৭ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তাআলা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে সান্ত্বনা দেয়ার জন্যে তাঁর পূর্ববর্তী রাসূলদের (আঃ) বর্ণনা দিচ্ছেন যে, পরিণামে যেমন তারাই জয়যুক্ত ও সফলকাম হয়েছিলেন, অনুরূপভাবে তিনিও তার সময়ের কাফিরদের উপর বিজয়ী হবেন। সুতরাং তাঁর চিন্তিত ও ভীত হওয়ার কোনই কারণ নেই। যেমন হযরত মূসা ইবনে ইমরান (আঃ)-এর ঘটনা তার সামনে রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে দলীল প্রমাণাদিসহ কিবতীদের বাদশাহ ফিরাউনের নিকট, যে ছিল মিসরের সম্রাট, তার প্রধানমন্ত্রী হামানের নিকট এবং সেই যুগের সবচেয়ে ধনী এবং বণিকদের বাদশাহ নামে খ্যাত কারূনের নিকট প্রেরণ করেন। এই হতভাগারা এই মহান রাসূল (সঃ)-কে অবিশ্বাস করে এবং তাকে ঘৃণার, চোখে দেখে। তারা পরিষ্কারভাবে বলেঃ “এ ব্যক্তি যাদুকর এবং চরম মিথ্যাবাদী।” এই উত্তরই তাঁর পূর্ববর্তী নবীগণও পেয়েছিলেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এরূপই তাদের পূর্ববর্তী লোকদের নিকট কোন রাসূল (আঃ) আসলেই তারা বলতোঃ এ ব্যক্তি যাদুকর অথবা পাগল। তারা কি তার সম্পর্কে পরস্পরে এটাই স্থির করে নিয়েছে? না, বরং তারা হলো উদ্ধত সম্প্রদায়।”(৫১:৫২-৫৩)
মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আমার রাসূল মূসা (আঃ) যখন আমার নিকট হতে সত্য নিয়ে তাদের নিকট হাযির হলো তখন তারা তাকে দুঃখ-কষ্ট দিতে শুরু করলো। ফিরাউন হুকুম জারী করলোঃ “এই রাসূল (আঃ)-এর উপর যারা ঈমান এনেছে তাদের পুত্র সন্তানদেরকে হত্যা করে ফেলো এবং কন্যা সন্তানদেরকে জীবিত রাখো।” এর পূর্বেও সে এই নির্দেশ জারী করে রেখেছিল। কেননা, তার আশংকা ছিল যে, না জানি হয়তো হযরত মূসা (আঃ)-এর জন্ম হবে, অথবা হয়তো এ জন্যে যে, যেন বানী ইসরাঈলের সংখ্যা কমে যায়। ফলে যেন তারা দুর্বল ও শক্তিহীন হয়ে পড়ে। অথবা সম্ভবতঃ এ দু’টি যুক্তিই তার সামনে ছিল। এখন দ্বিতীয়বার সে এই হুকুম জারী করে। এর কারণও ছিল এটাই যে, যেন বানী ইসরাঈল দলটি বিজিত থাকে এবং তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি না পায়। আর তারা যেন লাঞ্ছিত অবস্থায় কালাতিপাত করে। আর বানী ইসরাঈলের মনে যেন এ ধারণা বদ্ধমূল হয় যে, তাদের এ বিপদের কারণ হলো হযরত মূসা (আঃ)। যেহেতু তারা হযরত মূসা (আঃ)-কে বলেও ছিলঃ “আপনি আসার পূর্বেও আমাদেরকে কষ্ট দেয়া হয়েছিল এবং আপনার আগমনের পরেও আমাদেরকে কষ্ট দেয়া হচ্ছে।” তিনি উত্তরে বলেছিলেনঃ “তাড়াতাড়ি করো না, খুব সম্ভব আল্লাহ তাআলা তোমাদের শত্রুদেরকে ধ্বংস করে দিবেন এবং তোমাদেরকে যমীনের প্রতিনিধি বানিয়ে দিবেন, অতঃপর তোমরা কেমন আমল কর তা তিনি দেখবেন।” কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এটা ছিল ফিরাউনের দ্বিতীয়বারের হুকুম।
মহান আল্লাহ বলেনঃ 'কাফিরদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হবেই।' অর্থাৎ ফিরাউন যে চক্রান্ত করেছিল যে, বানী ইসরাঈল ধ্বংস হয়ে যাবে তা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছিল।
অতঃপর ফিরাউনের ঘৃণ্য ইচ্ছার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সে হযরত মূসা (আঃ)-কে হত্যা করার ইচ্ছা করে এবং স্বীয় কওমকে বলেঃ “তোমরা আমাকে ছেড়ে দাও, আমি মূসা (আঃ)-কে হত্যা করে ফেলবো। সে তার প্রতিপালকের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করুক, আমি এর কোন পরোয়া করি না। আমি আশংকা করছি যে, যদি তাকে জীবিত ছেড়ে দেয়া হয় তবে সে তোমাদের দ্বীনের পরিবর্তন ঘটাবে অথবা সে পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে ।` এ জন্যেই আরবে নিম্নের প্রবাদ প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “ফিরাউনও উপদেশদাতা হয়ে গেল।” অনেকেই (আরবী)-এরূপ পড়েছেন। অন্যেরা (আরবী)-এরূপ পাঠ করেছেন। আর কেউ কেউ (আরবী) পড়েছেন।
হযরত মূসা (আঃ) যখন ফিরাউনের ঘৃণ্য উদ্দেশ্যের বিষয় জানতে পারলেন তখন তিনি বললেনঃ “যারা বিচার দিবসে বিশ্বাস করে না, ঐ সব উদ্ধত ও হঠকারী ব্যক্তি হতে আমি আমার ও (হে সম্বোধনকৃত ব্যক্তিরা) তোমাদের প্রতিপালকের শরণাপন্ন হয়েছি।”
এ জন্যেই হাদীসে এসেছেঃ হযরত আবু মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন কোন কওম হতে ভীত হতেন তখন বলতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমরা তাদের (শত্রুদের) অনিষ্ট হতে আপনার নিকট আশ্রয় চাচ্ছি এবং আপনাকে তাদের মুকাবিলায় (দাঁড়) করছি।”
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।