সূরা গাফির (আল মু‘মিন) (আয়াত: 19)
হরকত ছাড়া:
يعلم خائنة الأعين وما تخفي الصدور ﴿١٩﴾
হরকত সহ:
یَعْلَمُ خَآئِنَۃَ الْاَعْیُنِ وَ مَا تُخْفِی الصُّدُوْرُ ﴿۱۹﴾
উচ্চারণ: ইয়া‘লামুখাইনাতাল আ‘ইউনি ওয়ামা-তুখফিস সুদূর।
আল বায়ান: চক্ষুসমূহের খেয়ানত এবং অন্তরসমূহ যা গোপন রাখে তিনি তা জানেন।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৯. চোখসমূহের খেয়ানত এবং অন্তরসমূহ যা গোপন রাখে তা তিনি জানেন।
তাইসীরুল ক্বুরআন: আল্লাহ চক্ষুর অন্যায় কর্ম সম্পর্কেও অবগত, আর অন্তর যা গোপন করে সে সম্পর্কেও।
আহসানুল বায়ান: (১৯) চক্ষুর চোরা চাহনি ও অন্তরে যা গোপন আছে, সে সম্বন্ধে তিনি অবহিত। [1]
মুজিবুর রহমান: চক্ষুর অপব্যবহার ও অন্তরে যা গোপন আছে সেই সম্বন্ধে তিনি অবহিত।
ফযলুর রহমান: তিনি (আল্লাহ) চোখের চুরি (গোপন চাহনি) ও অন্তরের সব গোপন কথা জানেন।
মুহিউদ্দিন খান: চোখের চুরি এবং অন্তরের গোপন বিষয় তিনি জানেন।
জহুরুল হক: তিনি জানেন চোখগুলোর চুপিসারে চাওয়া আর যা বুকগুলো লুকিয়ে রাখে।
Sahih International: He knows that which deceives the eyes and what the breasts conceal.
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১৯. চোখসমূহের খেয়ানত এবং অন্তরসমূহ যা গোপন রাখে তা তিনি জানেন।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১৯) চক্ষুর চোরা চাহনি ও অন্তরে যা গোপন আছে, সে সম্বন্ধে তিনি অবহিত। [1]
তাফসীর:
[1] এতে মহান আল্লাহর পরিপূর্ণ জ্ঞানের বর্ণনা রয়েছে। তিনি সকল বস্তুরই জ্ঞান রাখেন; তাতে তা ছোট হোক বা বড়, সূক্ষ্ম হোক বা স্থুল, উচ্চ মানের হোক কিংবা তুচ্ছ। এই জন্য যখন আল্লাহর জ্ঞানের ও তাঁর (সবকিছুকে) পরিবেষ্টন করে রাখার অবস্থা হল এই, তখন মানুষের উচিত তাঁর অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকা এবং নিজেদের অন্তরে প্রকৃতার্থে তাঁর ভয় সৃষ্টি করা। চোখের খিয়ানত হল, আড়চোখে দেখা। পথ চলার সময় কোন সুন্দরী মহিলাকে চোরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখা। সেই কল্পনা ও চিন্তা ইত্যাদিও ‘বুকে যা গোপন আছে’ তার আওতাভুক্ত, যা মানুষের অন্তরে জন্ম নেয়। যতক্ষণ পর্যন্ত সেগুলো কল্পনাই থাকে অর্থাৎ, মুহূর্তে আসে আবার চলে যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত তার জন্য কোন ধরপাকড় হবে না। কিন্তু যখন তা দৃঢ় পরিকল্পনার আকার ধারণ করবে, তখন তার ধরপাকড় হতে পারে, যদিও মানুষ সে অনুযায়ী আমল করার সুযোগ না-ও পায় (তবুও)।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১৮-২০ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নাবীকে আহবান করে বলেন, তুমি জনবসতিকে আসন্ন কিয়ামতের দিন সম্পর্কে সতর্ক করে দাও। সেদিন অবস্থা এমন হবে যে, দুঃখ-কষ্টে তাদের প্রাণ কণ্ঠাগত হয়ে পড়বে। সেদিন জালিমদের জন্য কোন অন্তরঙ্গ বন্ধু থাকবে না এবং থাকবে না কোন সাহায্যকারী ও সুপারিশকারী। সেদিনের অবস্থা হবে খুবই ভয়াবহ। সেদিন কেউ বিন্দু পরিমাণ অপরাধ করলেও তা থেকে সে রেহাই পাবে না।
الْاٰزِفَةِ শব্দের অর্থ অতি নিকটে, অতি সত্বর আগমনকারী। এটি কিয়ামতের একটি নাম। কেননা কিয়ামত অতি নিকটবর্তী। আল্লাহ তা‘আলার বাণী :
(أَزِفَتِ الْاٰزِفَةُ ج - لَيْسَ لَهَا مِنْ دُوْنِ اللّٰهِ كَاشِفَةٌ)
“কিয়ামত আসন্ন, আল্লাহ ছাড়া কেউই এটা ব্যক্ত করতে সক্ষম নয়।” (সূরা আন্ নাজ্ম ৫৩ : ৫৭-৫৮)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন :
(اِقْتَرَبَتِ السَّاعَةُ وَانْشَقَّ الْقَمَرُ)
“কিয়ামত নিকটবর্তী হয়েছে, চন্দ্র ফেটে গেছে।” (সূরা আল ক্বামার ৫৪ : ১)
(يَعْلَمُ خَا۬ئِنَةَ الْأَعْيُنِ)
‘চক্ষুর অপব্যবহার ও অন্তরে যা গোপন আছে সে সম্বন্ধে তিনি অবহিত।’ এখানে মহান আল্লাহর জ্ঞানের পরিপূর্ণতা বর্ণনা করা হচ্ছে। তিনি সকল বস্তুরই জ্ঞান রাখেন, তা ছোট হোক বা বড় হোক, সূক্ষ্ম হোক বা স্থূল, উচ্চমানের হোক কিংবা তুচ্ছ। যেহেতু আল্লাহ তা‘আলা জ্ঞানের দ্বারা সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে আছেন, তখন মানুষের উচিত তাঁর অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকা এবং নিজেদের অন্তরে প্রকৃতার্থে তাঁর ভয় সৃষ্টি করা। চোখের খিয়ানত না করা, আর চোখের খিয়ানত হলো আড়চোখে দেখা, কোন মন্দ জিনিস দেখা ও তা নিয়ে মনে কল্পনা করা।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. আল্লাহ তা‘আলার সকল বিষয়ের ওপর জ্ঞান রয়েছে এ সম্পর্কে জানতে পারলাম।
২. কিয়ামতের মাঠে কাফিরদের অবস্থা কেমন হবে তা জানতে পারলাম।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১৮-২০ নং আয়াতের তাফসীর:
(আরবী) কিয়ামতের একটি নাম। কেননা, কিয়ামত খুবই নিকটবর্তী। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “কিয়ামত আসন্ন। আল্লাহ ছাড়া কেউই এটা ব্যক্ত করতে সক্ষম নয়।”(৫৩:৫৭-৫৮) মহামহিমান্বিত আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “কিয়ামত আসন্ন, চন্দ্র বিদীর্ণ হয়েছে।” (৫৪:১) মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ মানুষের হিসাব নিকাশের সময় আসন্ন।`(২১:১) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহর আদেশ আসবেই; সুতরাং এটা ত্বরান্বিত করতে চেয়ো না।” (১৬:১) অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন তারা ওটাকে নিকটবর্তী দেখবে তখন কাফিরদের চেহারা কালো হয়ে যাবে।” (৬৭:২৭) মোটকথা, নিকটবর্তী হওয়ার কারণে কিয়ামতের নাম (আরবী) হয়েছে।
প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যখন দুঃখ-কষ্টে তাদের প্রাণ কণ্ঠাগত হবে। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, ভয় ও সন্ত্রাসের কারণে তাদের কণ্ঠাগত প্রাণ হবে। সুতরাং তা বেরও হবে না এবং স্বস্থানে ফিরে যেতেও পারবে না। ইকরামা (রঃ) এবং সুদ্দীও (রঃ) একথাই বলেছেন। কারো মুখ দিয়ে কোন কথা সরবে না। সবাই থাকবে নীরব-নিস্তব্ধ। কার ক্ষমতা যে, মুখ খুলে! সবাই কাদতে থাকবে এবং হতবুদ্ধি অবস্থায় অবস্থান করবে। যারা আল্লাহর সঙ্গে শরীক স্থাপন করে নিজেদের উপর যুলুম করেছে তাদের সেই দিন কোন বন্ধু থাকবে না এবং তাদের দুঃখে কেউ সমবেদনা জানাবে না। তাদের জন্যে এমন কেউ সুপারিশকারী হবে না যার সুপারিশ কবূল করা হবে। সেই দিন মঙ্গল ও কল্যাণের উপায় উপকরণ সবই ছিন্ন হয়ে যাবে।
মহান আল্লাহর জ্ঞান সব কিছুকেই পরিবেষ্টন করে রয়েছে। ছোট-বড়, প্রকাশ্য-গোপনীয় এবং মোটা ও পাতলা সবই তার কাছে সমানভাবে প্রকাশমান। এমন ব্যাপক জ্ঞানের অধিকারী তিনি যে, তাঁর কাছে কোন কিছুই গোপন নেই। তাকে প্রত্যেকেরই ভয় করা উচিত এবং কারো এ ধারণা করা উচিত নয় যে, কোন এক সময় সে তার থেকে গোপন রয়েছে এবং তার অবস্থা সম্পর্কে তিনি অবহিত নন। বরং সদা-সর্বদা তার এ বিশ্বাস রাখা উচিত যে, তিনি তাকে দেখছেন। তাঁর জ্ঞান তাকে ঘিরে রয়েছে। সুতরাং সব সময় তাঁকে স্মরণ রাখা। উচিত এবং তার নিষিদ্ধ কাজ হতে বিরত থাকা একান্ত কর্তব্য।
মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ চক্ষুর অপব্যবহার এবং অন্তরে যা গোপন আছে সে সম্বন্ধে আল্লাহ অবহিত।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এই আয়াতে ঐ ব্যক্তি উদ্দেশ্য যে হয়তো কোন বাড়ীতে গেল যেখানে কোন সুন্দরী মহিলা রয়েছে, কিংবা সে হয়তো যাতায়াত করে থাকে। তখন ঐ লোকটি কোন আড়াল হতে ঐ মহিলাটির দিকে তাকায় যেখানে তাকে কেউ দেখতে পায় না। তার দিকে যখনই কারো দৃষ্টি পড়ে তখনই সে মহিলাটির দিক হতে চক্ষু ফিরিয়ে নেয়। আবার যখন সুযোগ পায় তখন পুনরায় তার দিকে তাকায়। তাই মহান আল্লাহ বলেন যে, বিশ্বাসঘাতক চক্ষুর বিশ্বাসঘাতকতা এবং অন্তরে যা গোপন আছে সে সম্বন্ধে তিনি অবহিত। অর্থাৎ তার অন্তরে হয়তো এটা রয়েছে যে, সম্ভব হলে সে মহিলাটির গুপ্তাঙ্গও দেখে নিবে। তার এই গোপন ইচ্ছাও আল্লাহ তাআলার অজানা নয়।
যহহাক (রঃ) বলেন যে, (আরবী)-এর অর্থ হলো চোখমারা, ইশারা করা এবং মানুষের বলাঃ “আমি দেখেছি।” অথচ সে দেখেনি এবং তার বলাঃ “আমি দেখিনি।” অথচ সে দেখেছে।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, দৃষ্টি যে নিয়তে নিক্ষেপ করা হয় তা আল্লাহ তাআলার কাছে উজ্জ্বল ও প্রকাশমান। আর অন্তরের মধ্যে এই লুক্কায়িত খেয়াল যে, যদি সুযোগ পায় এবং ক্ষমতা থাকে তবে নির্লজ্জতাপূর্ণ কাজ হতে সে বিরত থাকবে কি থাকবে না এটাও তিনি জানেন। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, অন্তরের কুমন্ত্রণা সম্পর্কেও আল্লাহ পূর্ণ ওয়াকিফহাল।
আল্লাহ তা'আলা সঠিকভাবে ও ন্যায়ের সাথে বিচার করে থাকেন। পুণ্যের বিনিময়ে পুরস্কার এবং পাপের বিনিময়ে শাস্তি দানে তিনি সক্ষম। তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যেন তিনি মন্দ লোকদেরকে তাদের কৃতকর্মের শাস্তি প্রদান করেন এবং সৎকর্মশীলদেরকে তাদের ভাল কাজের পুরস্কার প্রদান করেন।”(৫৩:৩১)
আল্লাহ তাআলা বলেনঃ আল্লাহর পরিবর্তে তারা যাদেরকে ডাকে, অর্থাৎ মূর্তি, প্রতিমা ইত্যাদি, তারা বিচার করতে অক্ষম। অর্থাৎ তারা কোন কিছুরই মালিক নয় এবং তাদের হুকুমত নেই, সুতরাং তারা বিচার ফায়সালা করবেই বা কি? আল্লাহ তাআলাই তাঁর সৃষ্টজীবের কথা শুনেন এবং তাদের অবস্থা দেখেন। যাকে ইচ্ছা তিনি পথ প্রদর্শন করেন এবং যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন। এর মধ্যেও তার পুরোপুরি ন্যায় ও ইনসাফ বিদ্যমান রয়েছে।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।