আল কুরআন


সূরা আলে-ইমরান (আয়াত: 97)

সূরা আলে-ইমরান (আয়াত: 97)



হরকত ছাড়া:

فيه آيات بينات مقام إبراهيم ومن دخله كان آمنا ولله على الناس حج البيت من استطاع إليه سبيلا ومن كفر فإن الله غني عن العالمين ﴿٩٧﴾




হরকত সহ:

فِیْهِ اٰیٰتٌۢ بَیِّنٰتٌ مَّقَامُ اِبْرٰهِیْمَ ۬ۚ وَ مَنْ دَخَلَهٗ کَانَ اٰمِنًا ؕ وَ لِلّٰهِ عَلَی النَّاسِ حِجُّ الْبَیْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ اِلَیْهِ سَبِیْلًا ؕ وَ مَنْ کَفَرَ فَاِنَّ اللّٰهَ غَنِیٌّ عَنِ الْعٰلَمِیْنَ ﴿۹۷﴾




উচ্চারণ: ফীহি আ-য়া-তুম বাইয়িনা-তুম মাকা-মুইবরা-হীমা ওয়া মান দাখালাহু কা-না আমিনাওঁ ওয়ালিল্লা-হি ‘আলান্না-ছি হিজ্জুল বাইতি মানিছতাতা-‘আ ইলাইহি ছাবীলাওঁ ওয়া মান কাফারা ফাইন্নাল্লা-হা গানিইয়ুন ‘আনিল ‘আ-লামীন।




আল বায়ান: তাতে রয়েছে স্পষ্ট নির্দশনসমূহ, মাকামে ইবরাহীম। আর যে তাতে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ হয়ে যাবে এবং সামর্থ্যবান মানুষের উপর আল্লাহর জন্য বায়তুল্লাহর হজ্জ করা ফরয। আর যে কুফরী করে, তবে আল্লাহ তো নিশ্চয় সৃষ্টিকুল থেকে অমুখাপেক্ষী।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৯৭. তাতে অনেক সুস্পষ্ট নিদর্শন আছে(১), যেমন মাকামে ইবরাহীম(২)। আর যে কেউ সেখানে প্রবেশ করে সে নিরাপদ(৩)। আর মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ঐ ঘরের হজ(৪) করা তার জন্য অবশ্য কর্তব্য(৫)। আর যে কেউ কুফরী করল সে জেনে রাখুক, নিশ্চয় আল্লাহ্‌ সৃষ্টিজগতের মুখাপেক্ষী নন।(৬)




তাইসীরুল ক্বুরআন: তাতে সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী রয়েছে (যেমন) মাক্বামে ইবরাহীম(ইবরাহীমের দাঁড়ানোর জায়গা)। যে কেউ তাতে প্রবেশ করবে নিরাপদ হবে। আল্লাহর জন্য উক্ত ঘরের হাজ্জ করা লোকেদের উপর আবশ্যক যার সে পর্যন্ত পৌঁছার সামর্থ্য আছে এবং যে ব্যক্তি অস্বীকার করবে, (সে জেনে রাখুক) নিঃসন্দেহে আল্লাহ বিশ্ব জাহানের মুখাপেক্ষী নন।




আহসানুল বায়ান: (৯৭) ওতে বহু সুস্পষ্ট নিদর্শন রয়েছে, (যেমন) মাক্বামে ইব্রাহীম (পাথরের উপর ইব্রাহীমের পদচিহ্ন)। যে কেউ সেখানে প্রবেশ করে, সে নিরাপত্তা লাভ করে।[1] মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ঐ গৃহের হজ্জ্ব করা তার (পক্ষে) অবশ্য কর্তব্য।[2] আর যে অস্বীকার করবে (সে জেনে রাখুক যে), আল্লাহ জগতের প্রতি অমুখাপেক্ষী। [3]



মুজিবুর রহমান: ওর মধ্যে প্রকাশ্য নিদর্শনসমূহ বিদ্যমান রয়েছে, মাকামে ইবরাহীম উক্ত নিদর্শনসমূহের অন্যতম। আর যে ওর মধ্যে প্রবেশ করে সে নিরাপত্তা প্রাপ্ত হয় এবং আল্লাহর উদ্দেশে এই গৃহের হাজ্জ করা সেই সব মানুষের কর্তব্য যারা সফর করার আর্থিক সামর্থ্য রাখে এবং যদি কেহ অস্বীকার করে তাহলে নিশ্চয়ই আল্লাহ সমগ্র বিশ্ববাসী হতে প্রত্যাশামুক্ত।



ফযলুর রহমান: এতে কতিপয় স্পষ্ট নিদর্শন আছে যেমন মাকামে ইবরাহীম (ইবরাহীমের পায়ের ছাপসম্বলিত পাথর)। এই ঘরে যে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ। ঐ ঘর পর্যন্ত যাওয়ার সামর্থ্য আছে এমন মানুষের জন্য আল্লাহর (সন্তুষ্টির) উদ্দেশ্যে সেখানে (হজ্জ করতে) যাওয়া কর্তব্য। কেউ অস্বীকার করলে (তার জানা উচিত,) আল্লাহ সৃষ্টিজগতের প্রয়োজন থেকে মুক্ত।



মুহিউদ্দিন খান: এতে রয়েছে মকামে ইব্রাহীমের মত প্রকৃষ্ট নিদর্শন। আর যে, লোক এর ভেতরে প্রবেশ করেছে, সে নিরাপত্তা লাভ করেছে। আর এ ঘরের হজ্ব করা হলো মানুষের উপর আল্লাহর প্রাপ্য; যে লোকের সামর্থ?2480;য়েছে এ পর্যন্ত পৌছার। আর যে লোক তা মানে না। আল্লাহ সারা বিশ্বের কোন কিছুরই পরোয়া করেন না।



জহুরুল হক: এতে আছে সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী -- মক্কামে ইব্রাহীম; আর যে কেউ এখানে প্রবেশ করবে সে হচ্ছে নিরাপদ, আর আল্লাহ্‌র উদ্দেশ্যে এই গৃহে হজ করা মানবগোষ্ঠীর জন্য আবশ্যিক -- যারই সেখানকার পাথেয় অর্জনের ক্ষমতা আছে। আর যে অবিশ্বাস পোষণ করে -- তাহলে নিঃসন্দেহ আল্লাহ্ সমস্ত সৃষ্ট জগতের থেকে স্বয়ং-সম্পূর্ণ।



Sahih International: In it are clear signs [such as] the standing place of Abraham. And whoever enters it shall be safe. And [due] to Allah from the people is a pilgrimage to the House - for whoever is able to find thereto a way. But whoever disbelieves - then indeed, Allah is free from need of the worlds.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৯৭. তাতে অনেক সুস্পষ্ট নিদর্শন আছে(১), যেমন মাকামে ইবরাহীম(২)। আর যে কেউ সেখানে প্রবেশ করে সে নিরাপদ(৩)। আর মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ঐ ঘরের হজ(৪) করা তার জন্য অবশ্য কর্তব্য(৫)। আর যে কেউ কুফরী করল সে জেনে রাখুক, নিশ্চয় আল্লাহ্– সৃষ্টিজগতের মুখাপেক্ষী নন।(৬)


তাফসীর:

(১) এ আয়াতে কা'বা গৃহের তিনটি বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে। প্রথমতঃ এতে আল্লাহর কুদরতের নিদর্শনাবলীর মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নিদর্শন রয়েছে, আর তা হচ্ছে মাকামে ইবরাহীম। দ্বিতীয়তঃ যে ব্যক্তি এতে প্রবেশ করে, সে নিরাপদ ও বিপদমুক্ত হয়ে যায়; তাকে হত্যা করা বৈধ নয়। তৃতীয়তঃ সারা বিশ্বের মুসলিমদের জন্য এতে হজ্জ পালন করা ফরয; যদি এ গৃহ পর্যন্ত পৌছার শক্তি ও সামর্থ্য থাকে। কা'বা গৃহ নির্মিত হওয়ার দিন থেকে অদ্যাবধি আল্লাহ তা'আলা এর বরকতে শত্রুর আক্রমণ থেকে মক্কাবাসীদের নিরাপদে রেখেছেন। বাদশাহ আবরাহা বিরাট হস্তীবাহিনীসহ কা'বা গৃহের প্রতি ধাবিত হয়েছিল। আল্লাহ স্বীয় কুদরতে পক্ষীকূলের মাধ্যমে তাদের নিশ্চিহ্ন করে দেন। মক্কার হারামে প্রবেশকারী মানুষ, এমনকি জীবজন্তু পর্যন্ত বিপদমুক্ত হয়ে যায়।


(২) কা'বাগৃহের বৈশিষ্ট্য ও নিদর্শনাবলীর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, মাকামে ইবরাহীম। যা একটি বড় নিদর্শন হওয়ার কারণেই কুরআনে একে স্বতন্ত্রভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। মাকামে ইবরাহীম একটি পাথরের নাম। এর উপরে দাঁড়িয়েই ইবরাহীম আলাইহিস সালাম কা'বা গৃহ নিৰ্মাণ করতেন। এ পাথরের গায়ে ইবরাহীম আলাইহিস সালামের গভীর পদচিহ্ন অদ্যাবধি বিদ্যমান। একটি পাথরের উপর পদচিহ্ন পড়ে যাওয়া আল্লাহর অপার কুদরতের নিদর্শন এবং এতে কা'বা গৃহের শ্রেষ্ঠত্বই প্রমাণিত হয়। এ পাথরটি কা'বা গৃহের নীচে দরজার নিকটে অবস্থিত ছিল।

যখন কুরআনে মাকামে ইবরাহীমে সালাত আদায় করার আদেশ নাযিল হয় তখন তওয়াফকারীদের সুবিধার্থে পাথরটি সেখান থেকে সরিয়ে কা'বা গৃহের সামনে সামান্য দূরে যমযম কুপের নিকট স্থাপন করা হয়। বর্তমানে মাকামে- ইবরাহীমকে সরিয়ে নিয়ে একটি কাঁচ-পাত্রে সংরক্ষিত করে দেয়া হয়েছে। তাওয়াফ-পরবর্তী নামায এর আশে পাশে পড়া উত্তম। কিন্তু শাব্দিক অর্থের দিক দিয়ে মাকামে ইবরাহীম সমগ্র মসজিদে হারামকেও বুঝায়। এ কারণেই ফিকহবিদগণ বলেনঃ মসজিদে হারামের যে কোন স্থানে তওয়াফ পরবর্তী সালাত পড়ে নিলেই তা আদায় হয়ে যাবে।


(৩) কা'বা গৃহের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য বর্ণনা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে যে, যে ব্যক্তি এতে প্রবেশ করে, সে নিরাপদ হয়ে যায়। এ নিরাপত্তা মুলতঃ সৃষ্টিগতভাবে। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টিগতভাবেই প্রত্যেক জাতি ও সম্প্রদায়ের অন্তরে কা'বা গৃহের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ নিহিত রেখেছেন। জাহেলিয়াত যুগের আরব ও তাদের বিভিন্ন গোত্র অসংখ্য পাপাচারে লিপ্ত থাকা সত্বেও কা'বা গৃহের সম্মান রক্ষার জন্যে প্রাণ উৎসর্গ করতেও কুষ্ঠিত ছিল না। হারামের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে গিয়ে তারা পিতার হত্যাকারীকে দেখেও কিছুই বলত না।

মক্কা বিজয়ের সময় আল্লাহর পক্ষ থেকে হারামের অভ্যন্তরে কিছুক্ষণ যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল কা'বা গৃহকে পবিত্র করা। বিজয়ের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেন যে, এ অনুমতি কা'বা গৃহকে পবিত্রকরণের উদ্দেশ্যে কয়েক ঘন্টার জন্যেই ছিল। এরপর পূর্বের ন্যায় চিরকালের জন্যে কাবার হারামে যুদ্ধ বিগ্রহ নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। তিনি আরও বলেনঃ আমার পূর্বে কারো জন্যে হারামের অভ্যন্তরে যুদ্ধ করা হালাল ছিল না, আমার পরেও কারো জন্যে হালাল নয়। আমাকেও মাত্র কয়েক ঘন্টার জন্যে অনুমতি দেয়া হয়েছিল, পরে আবার হারাম করে দেয়া হয়েছে। [বুখারী: ১৩৪৯; মুসলিম: ১৩৫৫]

তবে কাতাদা বলেন, হাসান বাসরী বলেছেন, হারাম শারীফ কাউকে আল্লাহ্‌র সুনির্দিষ্ট হদ বা শাস্তি বাস্তবায়নে বাধা দেয় না। যদি কেউ হারামের বাইরে অন্যায় করে হারামে প্রবেশ করে তবে তার উপর হদ বা শাস্তি কায়েম করতে কোন বাধা নেই। যদি কেউ হারামে চুরি করে কিংবা ব্যভিচার করে বা হত্যা করে তার উপর শরীআতের আইন অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে [তাবারী]।


(৪) হজ শব্দের অর্থ ইচ্ছা করা। শরীয়তের পরিভাষায় কা'বা গৃহ প্রদক্ষিণ, আরাফাত ও মুযদালিফায় অবস্থান ইত্যাদি ক্রিয়াকর্মকে হজ বলা হয়। হজের বিস্তারিত নিয়ম-পদ্ধতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৌখিক উক্তি ও কর্মের মাধ্যমে ব্যক্ত করেছেন।


(৫) আয়াতে কা'বা গৃহের তৃতীয় বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, আল্লাহ্ তাআলা মানব জাতির জন্য শর্তসাপেক্ষে কা'বা গৃহের হজ ফরয করেছেন। শর্ত এই যে, সে পর্যন্ত পৌছার সামর্থ্য থাকতে হবে। সামর্থ্যের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, সং ব্যক্তির হাতে সাংসারিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত এ পরিমাণ অর্থ থাকতে হবে, যা দ্বারা সে কা'বা গৃহ পর্যন্ত যাতায়াত ও সেখানে অবস্থানের ব্যয়ভার বহন করতে সক্ষম হয়। এছাড়া গৃহে প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত পরিবার-পরিজনের ভরণ-পোষণেরও ব্যবস্থা থাকতে হবে। দৈহিক দিক দিয়ে হাত পা ও চক্ষু কর্মক্ষম হতে হবে। কারণ, যাদের এসব অঙ্গ বিকল, তাদের পক্ষে স্বীয় বাড়ী ঘরে চলাফেরাই দুস্কর।

এমতাবস্থায় সেখানে যাওয়া ও হজের অনুষ্ঠানাদি পালন করা তার পক্ষে কিরূপে সম্ভব হবে? মহিলাদের পক্ষে মাহরাম ব্যক্তি ছাড়া সফর করা শরীয়ত মতে নাজায়েয। কাজেই মহিলাদের সামর্থ্য তখনই হবে, যখন তার সাথে কোন মাহরাম পুরুষ হজে থাকবে; নিজ খরচে করুক অথবা মহিলাই তার খরচ বহন করুক। এমনিভাবে কা'বা গৃহে পৌছার জন্যে রাস্তা নিরাপদ হওয়াও সামর্থ্যের একটি অংশ। যদি রাস্তা বিপজ্জনক হয় এবং জানমালের ক্ষতির প্রবল আশঙ্কা থাকে, তবে হজের সামর্থ্য নাই বলে মনে করা হবে। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, আয়াতে সামর্থ বলতে, বান্দার শারীরিক সুস্থতা এবং নিজের উপর কোন প্রকার কমতি না করে পাথেয় ও বাহনের খরচ থাকা বুঝায়। [তাবারী]


(৬) ইবনে আব্বাস বলেন, আয়াতে কুফর বলতে বোঝানো হয়েছে এমন ব্যক্তির কাজকে, যে হজ করাকে নেককাজ হিসেবে নিল না আর হজ ত্যাগ করাকে গোনাহের কাজ মনে করল না। [তাবারী] মুজাহিদ বলেন, কুফরী করার অর্থ, আল্লাহ ও আখেরাতকে অস্বীকার করল। [তাবারী] মোটকথা বান্দা বড়-ছোট যে ধরনের কুফরই করুক না কেন তার জানা উচিত যে, আল্লাহ তার মুখাপেক্ষী নয়। এ আয়াতে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে যে, আল্লাহ্ তা'আলা তার সৃষ্টির কোন কিছুর মুখাপেক্ষী নয়। যদি সমস্ত লোকই কাফের হয়ে যায় তবুও এতে তার রাজত্বে সামান্য হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটবে না।

পবিত্র কুরআনে বিভিন্ন স্থানে এ ঘোষণা দেয়া হয়েছে। যেমন, “তোমরা এবং পৃথিবীর সবাই যদি অকৃতজ্ঞ হও তারপরও আল্লাহ্ অভাবমুক্ত ও প্রশংসার যোগ্য।” [সূরা ইবরাহীম: ৮] আরও বলেন, “অতঃপর তারা কুফরী করল ও মুখ ফিরিয়ে নিল। আল্লাহও (তাদের ঈমানের ব্যাপারে) ভ্রুক্ষেপহীন হলেন; আর আল্লাহ অভাবমুক্ত, সপ্রশংসিত।” [সূরা আত-তাগাবুন: ৬] সুতরাং তার বান্দাদেরকে আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ বান্দাদের উপকারার্থেই দিয়ে থাকেন। এ জন্যে দেন না যে, বান্দার আনুগত্য বা অবাধ্যতা আল্লাহর কোন ক্ষতি বা উপকার করবে। [আদওয়াউল বায়ান]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৯৭) ওতে বহু সুস্পষ্ট নিদর্শন রয়েছে, (যেমন) মাক্বামে ইব্রাহীম (পাথরের উপর ইব্রাহীমের পদচিহ্ন)। যে কেউ সেখানে প্রবেশ করে, সে নিরাপত্তা লাভ করে।[1] মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ঐ গৃহের হজ্জ্ব করা তার (পক্ষে) অবশ্য কর্তব্য।[2] আর যে অস্বীকার করবে (সে জেনে রাখুক যে), আল্লাহ জগতের প্রতি অমুখাপেক্ষী। [3]


তাফসীর:

[1] যেহেতু এখানে যুদ্ধ, খুনাখুনি এবং শিকার করা --এমনকি গাছ কাটাও নিষিদ্ধ। (বুখারী-মুসলিম)

[2] ‘যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে’ অর্থাৎ, সম্পূর্ণ রাহা-খরচ পূরণ হওয়ার মত যথেষ্ট পাথেয় যার কাছে আছে। অনুরূপ রাস্তার ও জান-মালের নিরাপত্তা এবং শারীরিক সুস্থতা ইত্যাদিও সামর্থ্যের অন্তর্ভুক্ত। মহিলার জন্য মাহরাম (স্বামী অথবা যার সঙ্গে তার বিবাহ চিরতরে হারাম এমন কোন লোক) থাকাও জরুরী। (ফাতহুল ক্বাদীর) এই আয়াত প্রত্যেক সামর্থ্যবান ব্যক্তির উপর হজ্জ ফরয হওয়ার দলীল। হাদীস দ্বারা এ কথাও পরিষ্কার হয়ে যায় যে, হজ্জ জীবনে একবারই ফরয। (ইবনে কাসীর)

[3] সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হজ্জ না করাকে কুরআন ‘কুফরী’ (অস্বীকার) বলে আখ্যায়িত করেছে। এ থেকে হজ্জ ফরয হওয়ার এবং তা যে অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সে ব্যাপারে আর কোন সন্দেহের অবকাশ থাকে না। বহু হাদীসেও সাহাবীদের উক্তিতে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে হজ্জ করে না, তার ব্যাপারে কঠোর ধমক এসেছে। (ইবনে কাসীর)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৯৬-৯৭ নং আয়াতের তাফসীর:



এটা হল ইয়াহূদীদের দ্বিতীয় অভিযোগের উত্তর। তারা বলত, বায়তুল মুকাদ্দাস প্রথম নির্মিত ইবাদতখানা। দীর্ঘ ষোল-সতের মাস বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে ফিরে সালাত আদায় করে এখন মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং তাঁর অনুসারীরা নিজেদের কেবলা কেন পরিবর্তন করে নিল? এর উত্তর স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলা দিচ্ছেন- তাদের এ দাবি ভুল। ইবাদতের জন্য নির্মিত প্রথম ঘর হল বাইতুল্লাহ। তাতে অনেক নিদর্শন রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছেঃ ১. মাকামে ইবরাহীম, যে পাথরে দাঁড়িয়ে ইবরাহীম (আঃ) কাবা নির্মাণ করেছিলেন। ২. যে ব্যক্তি তাতে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ থাকবে অর্থাৎ জান ও মালের নিরাপত্তাসহ সকল প্রকার নিরাপত্তা পাবে ইত্যাদি।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّا جَعَلْنَا حَرَمًا اٰمِنًا وَّيُتَخَطَّفُ النَّاسُ مِنْ حَوْلِهِمْ)



“তারা কি দেখে না আমি ‘হারাম'কে নিরাপদ স্থান করেছি, অথচ তার চতুষ্পার্শ্বে যেসব মানুষ আছে, তাদেরকে ছিনিয়ে নেয়া হয় (হামলা করা হয়)।” (আনকাবুত ২৯:৬৭) অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(فَلْیَعْبُدُوْا رَبَّ ھٰذَا الْبَیْتِﭒﺫ الَّذِیْٓ اَطْعَمَھُمْ مِّنْ جُوْعٍﺃ وَّاٰمَنَھُمْ مِّنْ خَوْفٍ)



“অতএব তাদেরকে এ ঘরের প্রতিপালকেরই ইবাদত করা উচিত। যিনি ক্ষুধায় তাদের খাবার দান করেছেন এবং তাদেরকে ভয়-ভীতি থেকে নিরাপদ রেখেছেন।” (সূরা কুরাইশ ১০৬:৩-৪)



(وَلِلّٰهِ عَلَي النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ)



এ আয়াত দ্বারা হাজ্জ ফরয হয়। আর হাজ্জ জীবনে একবার মাত্র ফরয। আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, লোকেরা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! হাজ্জ কি প্রতি বছর করতে হবে? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, যদি বলতাম হ্যাঁ, তা হলে ওয়াজিব হয়ে যেত। আর যদি ওয়াজিব হয়ে যেত তাহলে তোমরা আদায় করতে সক্ষম হতে না। আর যদি আদায় করতে সক্ষম না হতে তাহলে তোমাদেরকে শাস্তি প্রদান করা হত। (ইবনে মাযাহ হা: ২৮৮৫, সহীহ)



سبيل যাতায়াতের পথ, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞাসা করা হল, হে আল্লাহর রাসূল! سبيل কী? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,



“الزاد و الراحلة”



পাথেয় ও বাহন। (তিরমিযী হা: ২৯৯৮, হাকিম: ১/৪৪২, সহীহ)



وَمَنْ كَفَرَ



যে ব্যক্তি হাজ্জ ফরয হওয়াকে অস্বীকার করবে সে যেন জেনে রাখে আল্লাহ তা‘আলা বিশ্ববাসী থেকে অমুখাপেক্ষী। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: আল্লাহ তা‘আলা বলেন, হে আমার বান্দা! তোমাদের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সমস্ত মানুষ ও জিন যদি একজন অধিক আল্লাহভীরু বান্দার অন্তরে পরিণত হয়ে যায় তা হলে আমার রাজত্বের কিছুই বৃদ্ধি পাবে না। হে আমার বান্দা! তোমাদের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সমস্ত মানুষ ও জিন যদি সবচেয়ে নিকৃষ্ট একজন পাপী ব্যক্তির অন্তরে পরিণত হয়ে যায় তা হলে আমার রাজত্বের কিছুই কমবে না। (সহীহ মুসলিম হা: ২৫৭৭)



সুতরাং আমরা সবাই ভাল হয়ে গেলে আল্লাহ তা‘আলার কোন উপকার হবে তা নয় এবং সবাই খারাপ হয়ে গেলেও আল্লাহ তা‘আলার কোন ক্ষতি হবে তা নয়; বরং আমরা ভাল হলে আমাদেরই ভাল হবে আর আমরা খারাপ হলে আমাদেরই ক্ষতি হবে।



আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. পৃথিবীতে ইবাদতের জন্য নির্মিত সর্বপ্রথম ঘর হল বাইতুল্লাহ। এটা বরকতময় ও নিদর্শনসম্বলিত।

২. যে ব্যক্তির ওপর হাজ্জ ফরয হয়েছে তার ওপর তাড়াতাড়ি হাজ্জ পালন করা উচিত, কারণ কারো জানা নেই কখন মৃত্যু আসবে।

৩. যারা হাজ্জ অস্বীকার করবে তারা কাফির হয়ে যাবে, আর যারা অবহেলাবশত আদায় করবে না তারা শাস্তি ভোগ করবে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৯৬-৯৭ নং আয়াতের তাফসীর:

অর্থাৎ মানবমণ্ডলীর ইবাদত, কুরবানী, তাওয়াফ, নামায, ই'তিকাফ ইত্যাদির জন্য আল্লাহর ঘর, যার নির্মাতা হচ্ছেন হযরত ইবরাহীম (আঃ), যে ঘরের আনুগত্যের দাবী ইয়াহুদী, খ্রীষ্টান, মুশরিক এবং মুসলমান সবাই করে থাকে ওটা ঐ ঘর যা সর্বপ্রথম মক্কায় নির্মিত হয়। আল্লাহ তা'আলার বন্ধু এ ইবরাহীম (আঃ)-ই ছিলেন হজ্বের ঘোষণাকারী। কিন্তু বড়ই বিস্ময় ও দুঃখের কথা এই যে, তারা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার দাবী করে, অথচ এ ঘরের সম্মান করে না, এখানে হজ্ব করতে আসে না, বরং নিজের কিবলা ও কা'বা পৃথক পৃথক করে বেড়ায়। এ বায়তুল্লাহ শরীফের মধ্যেই হিদায়াত নিহিত রয়েছে এবংএটা সারা বিশ্ববাসীর জন্যেই পথ-প্রদর্শক। হযরত আবু যার (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সর্বপ্রথম কোন্ মসজিদটি নির্মিত হয়েছে? তিনি বলেনঃ ‘মসজিদ-ই-হারাম।' তিনি পুনরায় প্রশ্ন করেনঃ তারপরে কোটি’? তিনি বলেনঃ ‘মসজিদ-ই-বায়তুল মুকাদ্দাস।হযরত আবু যার (রাঃ) আবার প্রশ্ন করেনঃ ‘এ দু’টি মসজিদের মধ্যে সময়ের ব্যবধান কত?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ চল্লিশ বছর। তারপরে হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ ‘এরপরে কোন মসজিদ?' তিনি বলেনঃ “যেখানেই নামাযের সময় হয়ে যাবে সেখানেই নামায পড়ে নেবে, সমস্ত ভূমিই মসজিদ'। (মুসনাদ-ই-আহমাদ এবং সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম) হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ “পূর্বে তো বহু ঘরই ছিল, কিন্তু বিশেষ করে আল্লাহর ইবাদতের ঘর সর্বপ্রথম এটাই।' কোন লোক তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ পৃথিবী পৃষ্ঠে কি সর্বপ্রথম এ ঘরটিই নির্মিত হয়েছে? তিনি উত্তরে বলেনঃ “না, তবে কল্যাণময়, মাকাম-ই-ইবরাহীম এবং নিরাপত্তার ঘর সর্বপ্রথম এটাই'। বায়তুল্লাহ শরীফ নির্মাণের পূর্ণ বর্ণনা সূরা-ই-বাকারা (আরবী) (২:১২৫)-এ আয়াতের তাফসীরে লিখিত হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তির কোন প্রয়োজন নেই। হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেনঃ ‘ভূ-পৃষ্ঠে সর্বপ্রথম এ ঘরটিই নির্মাণ করা হয়। কিন্তু হযরত আলী (রাঃ)-এর উক্তিটিই সঠিক। আর বায়হাকীর ঐ হাদীসটি, যার মধ্যে রয়েছে যে, হযরত আদম (আঃ) ও হযরত হাওয়া (আঃ) আল্লাহর নির্দেশক্রমে বায়তুল্লাহ শরীফ নির্মাণ করেন, তাওয়াফ করেন এবং আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ‘তুমি সর্বপ্রথম মানুষ এবং এটাই সর্বপ্রথম ঘর'। এ হাদীসটি ইবনে লাহীঅ। বর্ণনা করেছেন এবং তিনি বর্ণনাকারী হিসেবে দুর্বল। সম্ভবতঃ এটা হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমার (রাঃ)-এর নিজস্ব উক্তি এবং ইয়ারমুকের যুদ্ধে তিনি যে কিতাবীদের পুস্তকের দু’টি থলে পেয়েছিলেন ঐগুলোর মধ্যে এটাও লিখিত থাকবে। বাক্কা’ হচ্ছে মাক্কা শরীফের প্রসিদ্ধ নাম। বড় বড় স্বেচ্ছাচারী ব্যক্তির স্কন্ধ এখানে ভেঙ্গে যেত এবং প্রত্যেক সম্মানিত ব্যক্তির মস্তক এখানে শুয়ে পড়তে বলে একে মাক্কা বলা হয়েছে। একে মাক্কা বলার আর একটি কারণ এই যে, এখানে জনগণের ভীড় জমে থাকে। আরও একটি কারণ এই যে, এখানে মানুষ মিশ্রিত হয়ে পড়ে। এমনকি কখনো কখনো স্ত্রী লোকেরা সম্মুখে সালাত আদায় করতে থাকে এবং পুরুষ লোকেরা তাদের পিছনে হয়ে যায়, যা অন্য কোন জায়গায় হয়না। ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “ফাজ্জ হতে তানঈম পর্যন্ত হচ্ছে মাক্কা এবং বাইতুল্লাহ হতে বাতহা পর্যন্ত হচ্ছে বাক্কা। বায়তুল্লাহ এবং মসজিদকে বাক্কা বলা হয়েছে। বায়তুল্লাহ এবং ওর আশে-পাশের জায়গাকে বাক্কা, আর অবশিষ্ট শহরকে মক্কাও বলা হয়েছে। এর আরও বহু নাম রয়েছে। যেমন বায়তুল আতীক, বায়তুল হারাম, বালাদুল আমীন, বালাদুল মামূন, উম্মে রহাম, উম্মুল কুরা, সিলাহ, আরশ, কাদিস, মুকাদ্দাস, নাসেবাহ, নাগেসাহ, হাতেমাহ, রা’স কাউসা, আল বালাদাহ, আল বায়্যেনাহ এবং আল কা’বা। এর মধ্যে প্রকাশ্য নিদর্শনাবলী রয়েছে যা এর শ্রেষ্ঠত্ব ও মহামর্যাদার প্রমাণ বহন করে। এর দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহ পাকের ঘর এটাই। এখানে মাকাম-ই-ইবরাহীম (আঃ) রয়েছে যেখানে দাড়িয়ে তিনি হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর নিকট হতে পাথর নিয়ে নিয়ে কাবার দেয়াল উঁচু করতেন। এটা প্রথমে বায়তুল্লাহ শরীফের দেয়ালের সঙ্গে সংলগ্ন ছিল। কিন্তু হযরত উমার (রাঃ) স্বীয় খিলাফতের আমলে এটাকে সামান্য সরিয়ে পূর্বমুখী করে দিয়েছিলেন, যেন তাওয়াফ পূর্ণভাবে হতে পারে এবং তাওয়াফের পরে যারা মাকাম-ই-ইবরাহীমের পিছনে নামায পড়তে চান। তাদের যেন কোন অসুবিধা সৃষ্টি না হয়। ঐ দিকেই নামায পড়ার নির্দেশ রয়েছে এবং এ সম্পর্কীয় পূর্ণ তাফসীরও (আরবী) (২:১২৫) -এ আয়াতের তাফসীরে বর্ণিত হয়েছে।

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, প্রকাশ্য নিদর্শনাবলীর মধ্যে একটি নিদর্শন হচ্ছে মাকাম-ই-ইবরাহীম। অবশিষ্টগুলো হচ্ছে অন্যান্য নিদর্শন। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেছেন, মাকাম-ই-ইবরাহীমের উপর হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর যে পদচিহ্ন রয়েছে ওটাও একটি নিদর্শন। সম্পূর্ণ হারাম শরীফকে, হাতীমকে এবং হজ্বের সমুদয় রুকনকেও মুফাসসিরগণ মাকাম-ই-ইবরাহীমের তাফসীরের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

যারা এ ঘরে প্রবেশ করে তারা নিরাপত্তা লাভ করে। অজ্ঞতার যুগেও মক্কা নিরাপদ জায়গা হিসেবে গণ্য হতো। এখানে পিতৃহন্তাকে পেলেও তারা তাকে হত্যা করতো না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ ‘বায়তুল্লাহ আশ্রয়প্রার্থীকে আশ্রয় দিয়ে থাকে কিন্তু স্থান ও খানাপানি দেয় না।' কুরআন কারীমের মধ্যে অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা কি দেখে না যে, আমি হারামকে নিরাপত্তার জায়গা করেছি’? অন্য স্থানে রয়েছেঃ (২৯:৬৭)। (আরবী) অর্থাৎ তিনি তাদেরকে ভয় হতে নিরাপত্তা দান করেছেন। (১০৬:৪) শুধু যে মানবের জন্যেই নিরাপত্তা রয়েছে তা নয়, বরং তথায় শিকার করা, শিকারকে তথা হতে তাড়িয়ে দেয়া, তাকে ভীত-সন্ত্রস্ত করা, তাকে তার অবস্থান স্থল হতে বা বাসা হতে সরিয়ে দেয়া বা উড়িয়ে দেয়াও নিষিদ্ধ। তথাকার বৃক্ষ কেটে ফেলা এবং ঘাস উঠিয়ে ফেলাও বৈধ নয়। এ বিষয়ে আরও বহু হাদীস সূরা-ই-বাকারার তাফসীরে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং এখানে ওর পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন। মুসনাদ-ই-আহমাদ, জামেউত তিরমিযী ও সুনানে নাসাঈর মধ্যে একটি হাদীস রয়েছে যেটাকে ইমাম তিরমিযী (রঃ) হাসান সহীহ বলেছেন। তা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কার হারূরা বাজারে দাঁড়িয়ে বলেনঃ “হে মক্কা! তুমি আল্লাহ তা'আলার নিকট সমগ্র ভূমির মধ্যে উত্তম ও প্রিয় ভূমি। যদি আমাকে তোমার উপর হতে জোরপূর্বক বের করে দেয়া না হতো তবে আমি কখনও তোমাকে ছেড়ে যেতাম না।' এ আয়াতের একটি অর্থ এও আছে যে, সে জাহান্নাম হতে পরিত্রাণ পেয়ে গেল। বায়হাকীর একটি মারফু হাদীসে রয়েছেঃ “যে ব্যক্তি বায়তুল্লাহর মধ্যে প্রবেশ করলো সে পুণ্যের মধ্যে এসে গেল ও পাপ হতে দূর হলো এবং তার পাপ ক্ষমা করে দেয়া হলো। কিন্তু এর একজন বর্ণনাকারী হচ্ছেন আবদুল্লাহ ইবনে নাওমাল, যিনি বর্ণনাকারী হিসেবে বলিষ্ঠ নন। আয়াতের শেষাংশ হচ্ছে হজ্ব ফরয হওয়ার দলীল। কেউ কেউ বলেন যে, (আরবী) এ আয়াতটিই হচ্ছে হজ্জ ফরয হওয়ার দলীল। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই অধিকতর সঠিক। কয়েকটি হাদীসে এসেছে যে, হজ্ব ইসলামের রুকনসমূহের মধ্যে একটি রুকন। এটা যে ফরয এর উপর মুসলমানদের ইজমা রয়েছে। আর একথাও সাব্যস্ত যে, সমর্থ ব্যক্তিদের উপর জীবনে একবার হজ্ব করা ফরয। নবী (সঃ) স্বীয় ভাষণে বলেছিলেনঃ “হে মানবমণ্ডলী! আল্লাহ তা'আলা তোমাদের উপর হজ্ব ফরয করেছেন, সুতরাং তোমরা হজ্ব করবে। একটি লোক জিজ্ঞেস করেন- “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! প্রতি বছরই কি?' তিনি তখন নীরব হয়ে যান। লোকটি তিনবার ঐ প্রশ্নই করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “আমি যদি হাঁ বলতাম তবে প্রতি বছরই হজ্ব ফরয হয়ে যেতো। অতঃপর তোমরা পালন করতে পারতে না। আমি যা বলবো না তোমরা সে সম্বন্ধে জিজ্ঞাসাবাদ করবে না। তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা অধিক প্রশ্ন করার ফলে এবং নবীদের (আঃ) উপর মতানৈক্য সৃষ্টি করার কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে। আমার নির্দেশ সাধ্যানুসারে পালন কর এবং যে জিনিস হতে আমি নিষেধ করি তা হতে বিরত থাক’। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) সহীহ মুসলিম শরীফের এ হাদীসে এতটুকু বেশী রয়েছে যে, এ প্রশ্নকারী ব্যক্তি ছিলেন হযরত আকরা’ ইবনে হাবিস (রাঃ) এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে এ কথাও বলেছিলেন যে, একবার ফরয ও পরে নফল। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, ঐ প্রশ্ন সম্বন্ধেই (আরবী) আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) আর একটি বর্ণনায় রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ 'যদি আমি হাঁ' বলতাম ও প্রতি বছর হজ্ব ফরয হয়ে যেতো তবে তোমরা পালন করতে পারতে না, ফলে শাস্তি অবতীর্ণ হতো'। (সুনানে ইবনে মাজাহ) অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, নবী (সঃ) বিদায় হজ্বে স্বীয় সহধর্মিণীগণকে বলেছিলেনঃ হজ্ব হয়ে গেছে। এখন আর বাড়ী হতে বের হবে না। এখন বাকী থাকলো ক্ষমতা ও সামর্থ। ওটা কখনও কারও মাধ্যম ব্যতিরেকেই মানুষের হয়ে থাকে, আবার কখনও কারও মাধ্যমে হয়ে থাকে। যেমন আহকামের পুস্তকগুলোর মধ্যে এর বিস্তারিত বিবরণ বিদ্যমান রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ)-এর হাদীসে রয়েছে যে, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হাজী কে? তিনি বলেনঃ ‘বিক্ষিপ্ত চুল বিশিষ্ট এবং ময়লাযুক্ত কাপড় পরিহিত ব্যক্তি।' অন্য এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন্ হজ্ব উত্তম? তিনি বলেনঃ “যে হজ্বে খুব বেশী কুরবানী করা হয় এবং ‘লাব্বায়েক' শব্দ অধিক উচ্চারিত হয়। আর একটি লোক প্রশ্ন করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! (আরবী) শব্দের ভাবার্থ কি?' তিনি বলেনঃ ‘পাথেয়, পানাহারের উপযুক্ত খরচ এবং সোয়ারী।' এ হাদীসের একজন বর্ণনাকারী দুর্বল হলেও এর পিছনে অন্য সনদও রয়েছে। বিভিন্ন সাহাবী হতে বিভিন্ন সনদে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী)-এর তাফসীরে পাথেয় এবং সোয়ারীর কথা বলেছেন। মুসনাদ-ই-আহমাদের অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা ফরয হজু তাড়াতাড়ি আদায় করে নাও, না জানি কি ঘটে যায়। সুনন-ই-আবু দাউদ প্রভৃতির মধ্যে রয়েছেঃ “হজ্ব করতে ইচ্ছুক ব্যক্তির উচিত যে, সে যেন শীঘ্রই স্বীয় বাসনা পূর্ণ করে।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, যার নিকট তিনশ রৌপ্যমুদ্রা রয়েছে সে সক্ষম ব্যক্তি।' হযরত ইকরামা (রাঃ) বলেন যে, ইসলাম ছাড়া যে ব্যক্তি অন্য ধর্ম অনুসন্ধান করে তা কখনও গৃহীত হবে না'। যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়, তখন ইয়াহূদীরা বলতে থাকেঃ “আমরাও মুসলমান। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাদেরকে বলেনঃ মুসলানদের উপর তো হজ্ব ফরয, তাহলে তোমরাও হজ্ব কর। তখন তারা স্পষ্টভাবে অস্বীকার করে বসে। ফলে এ আয়াতটি অবর্তীণ হয় এবং বলা হয় যে, হজ্বের অস্বীকারকারী কাফির। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা সমগ্র বিশ্ববাসী হতে প্রত্যাশা মুক্ত। হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি খাদ্য, পানীয় ও যানবাহনের উপর ক্ষমতা রাখে এ পরিমাণ মাল তার নিকট বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও হজ্ব করে না, সে ইয়াহুদী বা খ্রীষ্টান ধর্মের উপর মৃত্যুবরণ করবে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ‘আল্লাহর উদ্দেশ্যে বায়তুল্লাহর হজ্ব করা মানুষের কর্তব্য যারা তদ্দিকে পথ অতিক্রমে সমর্থ, আর যদি কেউ অস্বীকার করে তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ সমগ্র বিশ্ববাসী হতে প্রত্যাশা মুক্ত।' এ হাসীসের বর্ণনাকারীর উপরও সমালোচনা রয়েছে। হযরত উমার ফারূক (রাঃ) বলেন, ক্ষমতা থাকতেও যে ব্যক্তি হজ্ব করে না, সে ইয়াহুদী হয়ে বা খ্রীষ্টান হয়ে মারা যাবে। এর সনদ সম্পূর্ণরূপে বিশুদ্ধ। (হাফিয আবু বাকর ইসমাঈলী) মুসনাদ-ই- সাঈদ ইবনে মানসুরের মধ্যে রয়েছে যে, হযরত উমার ফারূক (রাঃ) বলেছেনঃ “আমার ইচ্ছে রয়েছে যে, আমি বিভিন্ন শহরে লোক পাঠিয়ে দেবো এবং তারা ঐসব লোকের উপর জিযিয়া কর বসিয়ে দেবে যারা ক্ষমতা থাকতেও হজ্ব করে না। কেননা তারা মুসলমান নয়।”





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।