সূরা আলে-ইমরান (আয়াত: 45)
হরকত ছাড়া:
إذ قالت الملائكة يا مريم إن الله يبشرك بكلمة منه اسمه المسيح عيسى ابن مريم وجيها في الدنيا والآخرة ومن المقربين ﴿٤٥﴾
হরকত সহ:
اِذْ قَالَتِ الْمَلٰٓئِکَۃُ یٰمَرْیَمُ اِنَّ اللّٰهَ یُبَشِّرُکِ بِکَلِمَۃٍ مِّنْهُ ٭ۖ اسْمُهُ الْمَسِیْحُ عِیْسَی ابْنُ مَرْیَمَ وَجِیْهًا فِی الدُّنْیَا وَ الْاٰخِرَۃِ وَ مِنَ الْمُقَرَّبِیْنَ ﴿ۙ۴۵﴾
উচ্চারণ: ইযকা-লাতিল মালাইকাতুইয়া-মারইয়ামুইন্নাল্লা-হা ইউবাশশিরুকি বিকালিমাতিম মিনহু ছমুহুল মাছীহু‘ঈছাবনুমারইয়ামা ওয়াজীহান ফিদ্দুনইয়া-ওয়াল আ-খিরাতি ওয়া মিনাল মুকাররাবীন।
আল বায়ান: স্মরণ কর, যখন ফেরেশতারা বলল, ‘হে মারইয়াম, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে তাঁর পক্ষ থেকে একটি কালেমার সুসংবাদ দিচ্ছেন, যার নাম মসীহ ঈসা ইবনে মারইয়াম, যে দুনিয়া ও আখিরাতে সম্মানিত এবং নৈকট্যপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত’।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪৫. স্মরণ করুন, যখন ফেরেশতাগণ বললেন, হে মারইয়াম! নিশ্চয়ই আল্লাহ আপনাকে তার পক্ষ থেকে একটি কালেমার সুসংবাদ দিচ্ছেন(১)। তার নাম মসীহ, মারইয়াম তনয় ঈসা, তিনি দুনিয়া ও আখেরাতে সম্মানিত এবং সান্নিধ্যপ্রাপ্তগণের অন্যতম হবেন(২)।
তাইসীরুল ক্বুরআন: (স্মরণ কর) যখন ফেরেশতারা বলল, ‘হে মারইয়াম! নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে তাঁর একটি কথার সুসংবাদ দিচ্ছেন। তার নাম মারইয়ামের পুত্র ঈসা-মসীহ, সে দুনিয়া ও আখেরাতে সম্মানিত ও সান্নিধ্য প্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’
আহসানুল বায়ান: (৪৫) (স্মরণ কর) যখন ফিরিশতাগণ বলল, ‘হে মারয়্যাম! নিশ্চয় আল্লাহ নিজের পক্ষ থেকে তোমাকে একটি কালেমা[1] (দ্বারা সৃষ্ট সন্তানে)র সুসংবাদ দিচ্ছেন; যার নাম হবে মসীহ, [2] মারয়্যাম-পুত্র ঈসা। সে হবে ইহ-পরকালে সম্মানিত এবং সান্নিধ্যপ্রাপ্তগণের অন্যতম।
মুজিবুর রহমান: যখন মালাইকা/ফেরেশতারা বলেছিলঃ হে মারইয়াম! নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর নিকট হতে একটি বাক্য দ্বারা তোমাকে সুসংবাদ দিচ্ছেন নন্দন ঈসা মসীহ - সে ইহলোক ও পরলোকে সম্মানিত এবং সান্নিধ্য প্রাপ্তগণের অন্তর্ভুক্ত।
ফযলুর রহমান: (স্মরণ করো) যখন ফেরেশতারা বলেছিল, “হে মরিয়ম! আল্লাহ তোমাকে তাঁর একটি কথার (তোমার সন্তানের) সুসংবাদ দিচ্ছেন, যার নাম মাসীহ—মরিয়মপুত্র ঈসা—এবং যে ইহকাল ও পরকালে মর্যাদাবান ও (আল্লাহর) ঘনিষ্ঠ বান্দাদের অন্যতম।
মুহিউদ্দিন খান: যখন ফেরেশতাগণ বললো, হে মারইয়াম আল্লাহ তোমাকে তাঁর এক বানীর সুসংবাদ দিচ্ছেন, যার নাম হলো মসীহ-মারইয়াম-তনয় ঈসা, দুনিয়া ও আখেরাতে তিনি মহাসম্মানের অধিকারী এবং আল্লাহর ঘনিষ্ঠদের অন্তর্ভূক্ত।
জহুরুল হক: স্মরণ করো! ফিরিশ্তারা বললে -- "হে মরিয়ম, নিঃসন্দেহ আল্লাহ্ তোমাকে সুসংবাদ দিচ্ছেন তাঁর তরফ থেকে একটি বাণী দ্বারা -- তাঁর নাম হচ্ছে মসীহ্, মরিয়ম-পুত্র ঈসা, ইহকালে ও পরকালে সম্মানের যোগ্য, আর নৈকট্যে আনীতদের অন্তর্গত।
Sahih International: [And mention] when the angels said, "O Mary, indeed Allah gives you good tidings of a word from Him, whose name will be the Messiah, Jesus, the son of Mary - distinguished in this world and the Hereafter and among those brought near [to Allah].
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৪৫. স্মরণ করুন, যখন ফেরেশতাগণ বললেন, হে মারইয়াম! নিশ্চয়ই আল্লাহ আপনাকে তার পক্ষ থেকে একটি কালেমার সুসংবাদ দিচ্ছেন(১)। তার নাম মসীহ, মারইয়াম তনয় ঈসা, তিনি দুনিয়া ও আখেরাতে সম্মানিত এবং সান্নিধ্যপ্রাপ্তগণের অন্যতম হবেন(২)।
তাফসীর:
(১) কালেমা দ্বারা এখানে কি বুঝানো হয়েছে? কাতাদা বলেন, কালেমা দ্বারা كُنْ বা ‘হও’ শব্দ বোঝানো হয়েছে। [তাবারী] ঈসা আলাইহিস সালামকে ‘কালেমাতুল্লাহ’ বলার কারণ হচ্ছে এই যে, তিনি আল্লাহর কালেমা দ্বারা সৃষ্টি হয়েছেন। কেননা, ঈসা আলাইহিস সালামের জন্মের ব্যাপারটি জাগতিক কোন মাধ্যম বাদেই সংঘটিত হয়েছে। আর আল্লাহ তাকে তার নিদর্শন ও আশ্চৰ্যতম সৃষ্টি হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। তিনি জিবরীল আলাইহিস সালামকে মারইয়ামের নিকট পাঠালেন। জিবরীল আলাইহিস সালাম তার জামার ফাকে ফুঁ দিলেন। এ পবিত্র ফেরেশতার পবিত্র ফুঁ মারইয়ামের গর্ভে প্রবেশ করলে আল্লাহ্ তা'আলা সে ফুঁকটিকে পবিত্র রুহ হিসেবে পরিণত করলেন। আর এ জন্যই তাঁকে সম্মানিত করে ‘রুহুল্লাহ’ বলা হয়ে থাকে। [তাফসীরে সা’দী]
(২) অর্থাৎ দুনিয়াতে তার সম্মান হবে অনেক বড়। কারণ, আল্লাহ তাকে দৃঢসংকল্প রাসূলদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। বড় শরীআত ও তার অনুসারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি করেছেন। তার স্মরণকে এমনভাবে সারা দুনিয়াব্যাপী করেছেন যে, প্রাচ্য-প্রাশ্চাত্য তার সুনামে ভরপূর করে দিয়েছেন। অনুরূপভাবে আখেরাতেও তার মর্যাদা হবে অনেক বেশী। অন্যান্য নবী-রাসূলদের সাথে তিনিও আল্লাহর কাছে সুপারিশ করবেন। তাকে আল্লাহ তা'আলা দুনিয়াতে যারা তার সম্পর্কে বিভ্রান্ত হয়েছে তাদের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে তার মুখ থেকে সত্য বের করে বিশেষভাবে সম্মানিত করবেন। [তাফসীরে সা’দী]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৪৫) (স্মরণ কর) যখন ফিরিশতাগণ বলল, ‘হে মারয়্যাম! নিশ্চয় আল্লাহ নিজের পক্ষ থেকে তোমাকে একটি কালেমা[1] (দ্বারা সৃষ্ট সন্তানে)র সুসংবাদ দিচ্ছেন; যার নাম হবে মসীহ, [2] মারয়্যাম-পুত্র ঈসা। সে হবে ইহ-পরকালে সম্মানিত এবং সান্নিধ্যপ্রাপ্তগণের অন্যতম।
তাফসীর:
[1] ঈসা (আঃ)-কে ‘কালিমাতুল্লাহ’ (আল্লাহর কালেমা) এই জন্য বলা হয়েছে যে, তাঁর জন্ম আল্লাহর অলৌকিক শক্তির প্রকাশ স্বরূপ, মানুষ সৃষ্টির নিয়ম-বহির্ভূত বিনা পিতায় মহান আল্লাহর বিশেষ কুদরতে ‘কুন’ কালেমা (বাণী) দ্বারা হয়েছে।
[2] مَسِيْحٌ (মাসীহ) مَسَحَ ধাতু থেকে গঠিত। খুব বেশী যমীনে ভ্রমণকারীকে বলা হয় مَسَحَ الأَرْضَ । অথবা এর অর্থ হল, হাত বুলিয়ে দেওয়া। কেননা, ঈসা (আঃ) রোগীদেরর উপর হাত বুলিয়ে দিলে তারা আল্লাহর নির্দেশে আরোগ্য লাভ করত। এই উভয় অর্থের দিক দিয়ে فَعِيل এখানে فَاعِل এর অর্থে ব্যবহার হয়েছে। কিয়ামতের নিকটতম সময়ে প্রকাশ লাভকারী দাজ্জালকে যে মাসীহ বলা হয়, সেটা হয় مَمسوح العَين (কানা) অর্থের দিক দিয়ে অথবা সেও যেহেতু সারা দুনিয়া ভ্রমণ করবে এবং মক্কা ও মদীনা ব্যতীত সব স্থানেই প্রবেশ করবে। (বুখারী-মুসলিম) কোন কোন বর্ণনায় বায়তুল মুক্বাদ্দাসেরও উল্লেখ আছে। এ জন্য তাকেও ‘মাসীহুদ্ দাজ্জাল’ বলা হয়। অধিকাংশ মুফাসসিরগণ এই কথাটাই লিখেছেন। কোন কোন গবেষক বলেন, ‘মাসীহ’ ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের পরিভাষায় আল্লাহ কর্তৃক নির্দেশপ্রাপ্ত বড় বড় পয়গম্বরদেরকে বলা হয়। অর্থাৎ, তাদের পরিভাষায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ পয়গম্বরদের কাছাকাছি অর্থে এটা ব্যবহার হয়। দাজ্জালকে ‘মাসীহ’ এই জন্য বলা হয় যে, ইয়াহুদীদেরকে বিপ্লব সৃষ্টিকারী সে মাসীহের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে এবং যার জন্য তারা এখনো পর্যন্ত ভ্রান্তিময় অপেক্ষায় রয়েছে, দাজ্জাল এই মাসীহর নাম নিয়েই আসবে। অর্থাৎ, সে নিজেকে তাদের সেই অপেক্ষিত মাসীহ বলেই প্রকাশ করবে। কিন্তু সে তার এই দাবী সহ অন্যান্য সমস্ত দাবীতে এত বড় প্রতারক ও ধোঁকাবাজ হবে যে, পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের মধ্যে তার কোন নজির মিলবে না। আর এই জন্য তাকে ‘দাজ্জাল’ (ভীষণ মিথ্যুক ও ধোঁকাবাজ) বলা হয়। عِيْسَى অনারবী শব্দ। কেউ কেউ বলেছেন, এটা আরবী শব্দ যা عَاسَ يَعُوْسَ ধাতু থেকে গঠিত এবং যার অর্থ হল, রাজনীতি ও নেতৃত্বদান। (ক্বুরত্বুবী ও ফাতহুল ক্বাদীর)
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৩৫-৬০ নং আয়াতের তাফসীর:
এ আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা ঈসা (আঃ)-এর মা মারইয়াম (আলাইহাস সালাম) ও তাঁর নানী ইমরানের স্ত্রী, যার নাম হান্না বিনতে ফাকুজ ও তাঁর জন্ম, মৃত্যু, মু‘জিযাহ এবং সম্প্রদায়ের সাথে যে কার্যকলাপ ও আচরণ হয়েছিল সেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন।
শাব্দিক ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা:
مُحَرَّرًا একনিষ্ঠভাবে শুধু ইবাদত করার জন্য এবং খিদমত করার জন্য উৎসর্গ করে দেয়া। অর্থাৎ পূর্ববর্তী নাবীদের শরীয়তে প্রচলিত ইবাদত-পদ্ধতির মধ্যে আল্লাহ তা‘আলার নামে সন্তান উৎসর্গ করার রেওয়াজও চালু ছিল। এসব উৎসর্গিত সন্তানদের পার্থিব কোন কাজকর্মে নিযুক্ত করা হত না। এ পদ্ধতি অনুযায়ী ঈসার নানী অর্থাৎ ইমরানের স্ত্রী নিজের গর্ভস্থ সন্তান সম্পর্কে মানত করলেন যে, তাকে বিশেষভাবে আল্লাহ তা‘আলার ঘর বায়তুল মুক্বাদ্দাসের খেদমতে নিয়োজিত করা হবে।
(وَإِنِّيْ أُعِيْذُهَا بِكَ وَذُرِّيَّتَهَا)
‘আমি তাকে ও তার সন্তানদেরকে আপনার আশ্রয়ে সমর্পণ করছি’ হান্না এ দু‘আ করেছিলেন, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর এ দু‘আ কবূল করেছিলেন। ফলে মারইয়ামকে জন্মের সময় শয়তান স্পর্শ করতে পারেনি। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: প্রত্যেক শিশুকেই তার জন্মের সময় শয়তান আঘাত করে, এর কারণে সে চীৎকার করে কেঁদে উঠে; কিন্তু মারইয়াম (আলাইহাস সালাম) ও তাঁর ছেলে ঈসা (আঃ) এটা হতে রক্ষা পেয়েছিলেন। (সহীহ বুখারী হা: ৩৪৩১)
অন্য বর্ণনায় রয়েছে শয়তান যখন ঈসা (আঃ)-কে আঘাত করতে গেল তখন ঈসা (আঃ)-কে আঘাত করতে না পেরে পর্দায় আঘাত করল। (সহীহ বুখারী হা: ৩২৮৬)
المحراب মিহরাব বলা হয় ছোট একটি কামরাকে। এ ছোট কক্ষে মারইয়াম (আলাইহাস সালাম) থাকতেন। আর মাঝে মধ্যে তার খালু যাকারিয়া (আঃ) তাকে দেখতে যেতেন।
(مُصَدِّقًۭا بِکَلِمَةٍ مِّنَ اللہِ وَسَیِّدًا وَّحَصُوْرًا)
‘তিনি হবেন আল্লাহর বাণীর সত্যায়নকারী, নেতা, প্রবৃত্তি দমনকারী’ ইয়াহইয়া (আঃ) ছিলেন ঈসা (আঃ)-এর সত্যায়নকারী। “কালিমা” দ্বারা ঈসা (আঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। ইয়াহইয়া (আঃ) ঈসা (আঃ)-এর বড় ছিলেন। হাদীসেও ঈসা (আঃ)-এর ব্যাপারে কালিমা শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
مَنْ شَهِدَ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ وَأَنَّ عِيسَى عَبْدُ اللَّهِ وَرَسُولُهُ وَكَلِمَتُهُ أَلْقَاهَا إِلَى مَرْيَمَ وَرُوحٌ مِنْهُ وَالْجَنَّةُ حَقٌّ وَالنَّارُ حَقٌّ أَدْخَلَهُ اللَّهُ الْجَنَّةَ عَلَى مَا كَانَ مِنْ الْعَمَلِ
যে ব্যক্তি এ সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া সত্য কোন মা‘বূদ নেই, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহ তা‘আলার বান্দা ও রাসূল। ঈসা (আঃ) আল্লাহ তা‘আলার বান্দা ও রাসূল এবং আল্লাহ তা‘আলার একটি কালিমা যা মারইয়াম (আলাইহাস সালাম) এর প্রতি ছুড়ে দিয়েছিলেন এবং তাঁর একটি রূহ। জান্নাত সত্য, জাহান্নাম সত্য। তার (ঈসা (আঃ)-এর যে আমল থাকুক না কেন আল্লাহ তা‘আলা তাকে জান্নাত দিবেন। (সহীহ বুখারী হা:৩৪৩৫)
سَيِّدٌ এর অর্থ সরদার, নেতা, জননেতা।
حَصُوْرٌ ইবনু আব্বাস (রাঃ)-সহ প্রমুখ মুফাসসিরগণ বলেন: حَصُوْرٌ অর্থ হল ইয়াহইয়া-এর মহিলাদের প্রতি কোন আগ্রহ ছিল না। কেউ বলেন, তার সন্তান জন্ম দেয়ার ক্ষমতা ছিল না। কেউ বলেন, حَصُوْرٌ অর্থ হল পাপ থেকে মুক্ত, যে পাপকাজের ধারে কাছেও যায় না।
তাফসীর মুয়াসসার-এ বলা হয়েছে: “তিনি পাপ কাজ করেন না এবং কোন ক্ষতিকর প্রবৃত্তির কাজেও জড়িত হন না। (তাফসীর মুয়াসসার পৃ. ৫৫)
সঠিক কথা হল: তিনি পাপ কাজ হতে পূত ও পবিত্র, তার দ্বারা কোন অপরাধ সংঘটিত হবে না। আর যারা এ অর্থ নিয়েছেন যে, তার নারীর প্রতি কোন আসক্তি ছিল না, সন্তান জন্ম দেয়ার কোন ক্ষমতা ছিল না ইত্যাদি, তাদের এ তাফসীর সঠিক নয়; কারণ এটি একটি দোষ, যা প্রশংসার সময় বলা যায় না।
(يٰمَرْيَمُ إِنَّ اللّٰهَ اصْطَفٰكِ)
‘হে মারইয়াম! নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাকে মনোনীত করেছেন’ অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা যে ক’জন নারীকে পৃথিবীর বুকে মর্যাদাপূর্ণ করেছেন ও শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন তাদের মধ্যে মারইয়াম (আঃ) অন্যতম একজন। সহীহ হাদীসে মারইয়ামের সাথে খাদীজা (রাঃ)-কেও শ্রেষ্ঠ নারী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। (সিলসিলা সহীহাহ হা: ১৫০৮)
নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: অনেক পুরুষ পরিপূর্ণতা লাভ করেছে, নারীদের মধ্যে কেবল মারইয়াম, আসিয়া (ফির‘আউনের স্ত্রী) পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। আর সকল নারীদের ওপর আয়িশার মর্যাদা তেমন সকল খাবারের ওপর সারীদের মর্যাদা যেমন (সারীদ হল, রুটি, গোশত ও ঝোল মিশিয়ে তৈরি করা এক প্রকার মূল্যবান পুষ্টিকর খাবার)। (ইবনে কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)
(وَمَا كُنْتَ لَدَيْهِمْ إِذْ يُلْقُوْنَ أَقْلَامَهُمْ)
‘তুমি তো সে সময় তাদের কাছে ছিলে না যখন মারইয়ামের অভিভাবক কে হবে এজন্য তারা লটারী করেছিল’ অর্থাৎ মারইয়াম (আলাইহাস সালাম)-এর দায়িত্ব কে নেবে এ নিয়ে লটারী করা হয়েছিল। কারণ সবাই তার লালন-পালনের দায়িত্বভার নিতে আগ্রহী ছিল। আল্লাহ তা‘আলার নামে উৎসর্গিত সন্তান পালন করাকে তখনকার সময়ে খুবই পুণ্যের কাজ মনে করা হত। সে কারণে মারইয়ামকে প্রতিপালনের দায়িত্ব নেয়ার জন্য রীতিমত প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল। তাই সকলে জর্ডান নদীতে গিয়ে তাদের কলমগুলো নিক্ষেপ করল। বিধান ছিল যার কলম স্রোতে ভেসে যাবে না, স্থির থাকবে সেই মারইয়ামের দায়িত্বভার গ্রহণ করবে। কলম নদীতে নিক্ষেপ করার পর শুধু যাকারিয়ার কলম স্থির ছিল। তিনি তার দায়িত্ব নেন। তাছাড়া তিনি ছিলেন মারইয়ামের খালু। (তাফসীর তাবারী, হা: ৬৯০৯)
আল্লাহ তা‘আলা আমাদের নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সম্বোধন করে বলছেন: এসব গায়েবের খবর তোমার কাছে ওয়াহী করে জানিয়ে দিয়েছি। এর মাধ্যমে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সত্য নবুওয়াতের প্রমাণ মেলে এবং এ কথাও প্রমাণিত হয় যে, নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) গায়েব জানেন না; বরং আল্লাহ তা‘আলা যতটুকু গায়েবের খবর ওয়াহীর মাধ্যমে জানান ততটুকুই জানেন।
(بِكَلِمَةٍ مِّنْهُ)
‘তাঁর পক্ষ থেকে এক কালিমার’ ঈসা (আঃ)-কে কালিমাতুল্লাহ বলা হয়; কারণ আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে শুধু “কুন” (হও) কালিমা দ্বারা সৃষ্টি করেন। মানুষ সৃষ্টির সাধারণ নিয়ম বহির্ভূত অর্থাৎ বিনা পিতায়।
ঈসা (আঃ)-কে الْمَسِيْحُ মাসীহ বলা হয়; কারণ ঈসা (আঃ) রোগীদের ওপর হাত দ্বারা মাসাহ বা বুলিয়ে দিলে আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশে রোগ ভাল হয়ে যেত। অপরপক্ষে দাজ্জালকেও “মাসীহ” বলা হয়। কারণ তার এক চোখ চেহারার সাথে সমান থাকবে।
(الْحَوَارِيُّوْنَ) حَوَارِيْ
শব্দটি حَوَرٌ ধাতু থেকে উৎপত্তি। অর্থ দেয়ালে চুনকাম করার মত ধবধবে সাদা। পারিভাষিক অর্থে ঈসা (আঃ)-এর খাঁটি অনুসারী শীর্ষস্থানীয় ভক্ত ও সাহায্যকারী ব্যক্তিগণকে ‘হাওয়ারী’ বলা হত। কোন কোন তাফসীরবিদ বলেন, তাদের সংখ্যা ছিল ১২ জন। ঈসা (আঃ)্-এর অনুসারী ও সাহায্যকারী সহচরদেরকে ‘হাওয়ারী’ বলা হয়। নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: প্রত্যেক নাবীর একজন বিশেষ সাহায্যকারী (হাওয়ারী) ছিল। আমার বিশেষ সাহায্যকারী হল যুবাইর (রাঃ)। (সহীহ বুখারী হা: ২৮৪৭, সহীহ মুসলিম হা: ২৪১৫)
ঘটনার সারসংক্ষেপ:
ঈসা (আঃ)-এর নানী হান্না গর্ভাবস্থায় মানত করেছিলেন যে, আমার গর্ভে যে সন্তান হবে তাকে উপাসনালয়ের জন্য উৎসর্গ করে দেব। তাঁর আশা ছিল নিশ্চয়ই আমার একটি ছেলে হবে। আল্লাহ তা‘আলা তাকে দিলেন একজন কন্যা। তখন তিনি আফসোস করে বললেন, হে আল্লাহ! চাইলাম কী আর হল কী! কেননা কন্যা সন্তান তো উপাসনালয়ে দেয়া যাবে না।
আল্লাহ তা‘আলা সান্ত্বনা দিয়ে বললেন: কন্যা সন্তানের মত কোন পুত্রই যে হয় না। আমি এ কন্যা সন্তানের নাম রাখলাম মারইয়াম।
আল্লাহ তা‘আলা তাকে উত্তমভাবে লালন-পালন করার জন্য তার খালু যাকারিয়া (আঃ)-এর তত্ত্বাবধানে দিলেন। মারইয়াম মিহরাবের নিজ কক্ষে থাকতেন। যাকারিয়া (আঃ) যখনই মারইয়াম (আলাইহাস সালাম)-এর কক্ষে প্রবেশ করতেন তখন তার কাছে বিভিন্ন অমৌসুমী ফল-ফলাদি দেখতে পেতেন।
গ্রীষ্মের ফল শীতকালে আর শীতকালের ফল গ্রীষ্মে। এ ফলমূল দেখে জাকারিয়া (আঃ) আশ্চর্য হয়ে যেতেন; কারণ তিনি নিজে এ ফল এনে দিতেন না এবং অন্য কেউও এনে দিত না।
মারইয়াম (আলাইহাস সালাম) বললেন: এসব ফলাদি আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে আসে।
মারইয়াম (আলাইহাস সালাম) এর এরূপ অমৌসুমী ফলমূল দেখে যাকারিয়া (আঃ) বুঝতে পারলেন, আল্লাহ তা‘আলা সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান। যাকারিয়া (আঃ) আল্লাহ তা‘আলার কাছে দু‘আ করলেন: “হে আল্লাহ! আমাকে একজন সৎ সন্তান দাও।”
যাকারিয়া (আঃ) এ দু‘আ করার পর যখন সালাতরত অবস্থায় মিহরাবে ছিলেন তখন আল্লাহ তা‘আলা ফেরেশতার মাধ্যমে তাঁকে সন্তান ইয়াহইয়া (আঃ)-এর শুভ সংবাদ দিলেন। যাকারিয়া (আঃ) বললেন: হে আল্লাহ! আমি বৃদ্ধ আর আমার স্ত্রী বন্ধ্যা। কিভাবে আমাদের সন্তান হবে। আল্লাহ তা‘আলা বললেন, তিনি যা ইচ্ছা করেন তাই করতে সক্ষম।
যাকারিয়া (আঃ) বললেন: আমাকে একটি নিদর্শন দিন। আল্লাহ তা‘আলা বললেন: তোমার নিদর্শন হল তিন দিন মানুষের সাথে কথা বলতে পারবে না। তুমি সুস্থ সবল থাকবে বটে কিন্তু মুখ দিয়ে কথা বের হবে না। শুধু ইশারা- ইঙ্গিতে কাজ চালাতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:
(قَالَ اٰیَتُکَ اَلَّا تُکَلِّمَ النَّاسَ ثَلٰثَ لَیَالٍ سَوِیًّا)
“তিনি বললেন: ‘তোমার নিদর্শন এই যে, তুমি সুস্থ থাকা সত্ত্বেও কারও সাথে তিন রাত বাক্যালাপ করবে না।’’ (সূরা মারইয়াম ১৯:১০) আর আল্লাহ তা‘আলার তাসবীহ ও যিকির কর।
এরপর আল্লাহ তা‘আলা মারইয়াম (আলাইহাস সালাম)-কে সুসংবাদ দিলেন যে, আল্লাহ তা‘আলা তাকে চয়ণ করেছেন, পবিত্র করেছেন, বিশ্ববাসীর ওপর নির্বাচিত করেছেন, তাই আল্লাহ তা‘আলা তাকে বেশি বেশি রুকু-সিজদাহ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
ফেরেশতা মারইয়াম (আলাইহাস সালাম)-কে বললেন, আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে ঈসা (আঃ)-এর সুসংবাদ দিচ্ছেন। মারইয়াম (আলাইহাস সালাম)-বললেন, আশ্চর্য! কিভাবে আমার সন্তান হবে? আমাকে কোন পুরুষ স্পর্শ করেনি। ফেরেশতা বলল, এভাবেই হবে, আল্লাহ তা‘আলা যা ইচ্ছা তাই সৃষ্টি করেন। তিনি যা সৃষ্টি করার ইচ্ছা করেন শুধু বলেন, হয়ে যাও, সাথে সাথে তা হয়ে যায়।
এভাবে পিতা ছাড়াই ঈসা (আঃ)-এর জন্ম হয়। ঈসা (আঃ)-কে যখন হত্যা করার ষড়যন্ত্র করল, তখন আল্লাহ তা‘আলা তাকে তুলে নেন। ঈসা (আঃ) এখনো জীবিত অবস্থায় আকাশে আছেন। কিয়ামতের পূর্বে মুহাম্মাদী শরীয়তের শাসক হিসেবে পৃথিবীর বুকে আগমন করবেন এবং বেশ কিছু দিন থাকার পর মৃত্যুবরণ করবেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: সে সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ! অচিরেই তোমাদের মাঝে ন্যায়পরায়ণ শাসকরূপে ঈসা বিন মারইয়াম (আঃ) অবতরণ করবেন। তিনি ক্রুশ চিহ্ন ভেঙ্গে ফেলবেন, শূকর হত্যা করবেন এবং জিযিয়া কর উঠিয়ে দিবেন। মানুষের ধন-সম্পদ তখন এতো বেড়ে যাবে যে, তা গ্রহণ করার মত কেউ থাকবে না। তখন আল্লাহ তা‘আলার জন্য একটি সিজদা দুনিয়া ও তার মাঝে যা কিছু আছে তা থেকে উত্তম। (সহীহ বুখারী হা: ৩৪৪৮, সহীহ মুসলিম হা:১৫৫)
ঈসা (আঃ) যেসব নিদর্শন নিয়ে বানী ইসরাঈলের কাছে আগমন করেছিলেন:
(১) শিশু ও অপরিণত বয়সে মানুষের সাথে কথা বলা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(فَاَشَارَتْ اِلَیْھِ ﺤ قَالُوْا کَیْفَ نُکَلِّمُ مَنْ کَانَ فِی الْمَھْدِ صَبِیًّاﭬقَالَ اِنِّیْ عَبْدُ اللہِﺨ اٰتٰٿنِیَ الْکِتٰبَ وَجَعَلَنِیْ نَبِیًّاﭭ)
“অতঃপর মারইয়াম সন্তানের প্রতি ইঙ্গিত করল। তারা বলল: ‘যে কোলের শিশু তার সাথে আমরা কেমন করে কথা বলব?’ সে বলল: ‘আমি আল্লাহর বান্দা। তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন, আমাকে নাবী করেছেন” (সূরা মারইয়াম ১৯:২৯-৩০)
সহীহ হাদীসে এসেছে, তিনটি শিশু মায়ের কোলে থাকাবস্থায় কথা বলেছে: ১. ঈসা (আঃ), ২. বানী ইসরাঈলের জনৈক মহিলার সাথে একজন রাখাল ব্যভিচার করার ফলে সন্তান হয়েছিল কিন্তু মানুষ জুরাইয নামক একজন সৎ ব্যক্তির সাথে সে অপবাদ জড়িয়ে দেয় তখন জুরাইয ওযূ করে নফল সালাত আদায় করার পর মহিলার সন্তানকে তার বাবা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে সে সন্তান কথা বলে। ৩. বানী ইসরাঈলের জনৈক মহিলা তার বাচ্চাকে দুধ পান করাচ্ছিলেন এমন সময় একজন আরোহী পাশ দিয়ে অতিক্রম করলে মহিলা বলল: হে আল্লাহ! আমার সন্তানকে এ পুরুষের মত করিও। তখন সে বাচ্চা বলল, হে আল্লাহ! আমাকে এরূপ বানাইওনা। (সহীহ বুখারী হা: ৩৪৩৬)
এছাড়াও অন্যান্য বর্ণনায় পাওয়া যায় ইউসুফ (আঃ)-এর পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছিল একটি বাচ্চা এবং ফির‘আউনের স্ত্রীর খাদেমার বাচ্চা ছোট থাকতে কথা বলেছিল। (ইবনু কাসীর ৪/৩৯৩, তাবারী ১২/১১৫)
(২) কাদা-মাটি দ্বারা পাখি তৈরি করা: ঈসা (আঃ) মাটি দ্বারা পাখির মত আকৃতি তৈরি করে আল্লাহ তা‘আলার নামে ফুঁক দিতেন; ফলে আল্লাহ তা‘আলার অনুমতিক্রমে তা পাখি হয়ে উড়ে যেত। (সূরা আলি ইমরান ৩:৪৯)
(৩) জন্মান্ধ ও কুষ্ঠব্যাধিগ্রস্তকে নিরাময় করা: জন্মান্ধ ও কুষ্ঠব্যাধিগ্রস্ত ব্যক্তির চোখে ও গায়ে আল্লাহ তা‘আলার নামে হাত বুলিয়ে দিলে আল্লাহ তা‘আলার অনুমতিতে ভাল হয়ে যেত। (সূরা আলি ইমরান ৩:৪৯)
(৪) মৃতকে জীবিতকরণ: আল্লাহ তা‘আলার অনুমতিক্রমে মৃতকে তিনি জীবিত করতে পারতেন। (সূরা আলি ইমরান ৩:৪৯)
(৫) মানুষ যা আহার করে ও যা সঞ্চয় করে রাখে তা বলে দিতেন। (সূরা আলি ইমরান ৩:৪৯)
(৬) পূর্ববর্তী কিতাব তাওরাত সত্যায়নকারী এবং তাদের ওপর যেসব জিনিস হারাম করা হয়েছিল (তাদের শাস্তিস্বরূপ বা নিজেরা ইজতিহাদ করে হারাম করে নিয়েছিল) তা আল্লাহর পক্ষ থেকে হালাল করেছেন। (সূরা আলি ইমরান ৩:৫০)
(فَلَمَّآ أَحَسَّ عِيْسٰي)
যখন ঈসা (আঃ) বনু ইসরাঈলের স্বার্থবাদী নেতাদের বিরোধিতা ও চক্রান্ত বুঝতে পারলেন, তখন নিজের একনিষ্ঠ সাথীদের বাছাই করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন এবং সবাইকে একত্রিত করে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাদের মধ্যে আমার সত্যিকারের ভক্ত ও অনুসারী কারা? কারা আল্লাহ তা‘আলার ওয়াস্তে আমাকে দীনের দাওয়াতী কাজে সাহায্য করবে?
বস্তুতঃ শত্র“দের উৎপীড়নে অতিষ্ঠ হয়ে ঈসা (আঃ) তাঁর অনুসারীগণের প্রতি উপরোক্ত আহ্বান জানাতে বাধ্য হয়েছিলেন। সাথে সাথে বারজন ভক্ত অনুসারী তাঁর ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন এবং আনুগত্যের শপথ নিয়েছিলেন। এরপর ঈসা (আঃ)-কে আকাশে তুলে নেয়া হলে তারাই ঈসায়ী ধর্ম প্রচারে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। যদিও পরবর্তীতে তাদের মধ্যে বহু দল-উপদল সৃষ্টি হয়েছে। আজও খ্রিস্টানরা রোমান ক্যাথলিক ও প্রটেষ্ট্যান্ট নামে প্রধান দু’দলে বিভক্ত।
(إِذْ قَالَ اللّٰهُ يٰعِيْسٰٓي إِنِّيْ مُتَوَفِّيْكَ)
‘স্মরণ কর, যখন আল্লাহ বললেন: হে ঈসা! নিশ্চয়ই আমি তোমাকে মৃত্যু দেব’ ঈসা (আঃ)-এর যামানায় শাম (সিরিয়া) অঞ্চল রোমানদের শাসনের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এখানে তাদের যে শাসক নির্বাচিত হয়েছিল সে কাফির ছিল। ইমাম ইবনু কাসীর (রহঃ) যে বর্ণনা নিয়ে এসেছেন তাতে বলা হয়েছে, তিনি দামেস্কের বাদশা ছিলেন। সে বাদশা তারকাপূজক ছিল। (ইবনে কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)
ইয়াহূদীরা ঈসা (আঃ)-এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন বানোয়াট কথাবার্তা বলে এ শাসকের কানভারী করল। যেমন, তিনি বিনা বাপের সন্তান, ফাসাদকারী, জনগণকে বিপথে নিয়ে যাচ্ছে ও জনগণের মধ্যে বিদ্রোহের আগুন প্রজ্জ্বলিত করছে। শাসক তাদের দাবী অনুযায়ী তাকে শূলিতে চড়ানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। শাসকের নির্দেশে একটি ইয়াহূদী দল ঈসা (আঃ) যে ঘরে ছিলেন তা ঘেরাও করল। আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে তাদের হাত থেকে বাঁচিয়ে নেন এবং তাঁকে ঐ ঘরের ছিদ্র দিয়ে আকাশে তুলে নেন। আর তাঁর সদৃশ একজন লোককে তথায় নিক্ষেপ করে দেন যে সে ঘরেই অবস্থান করছিল। ঐ লোকগুলো রাত্রির অন্ধকারে তাকেই ঈসা (আঃ) মনে করে ধরে নিয়ে যায়। তাকে তারা কঠিন শাস্তি এবং তার মস্তকোপরি কাঁটার টুপি রেখে দিয়ে শূলে চড়িয়ে দেয়। এটাই ছিল তাদের সাথে মহান আল্লাহ তা‘আলার কৌশল। তাই আল্লাহ তা‘আলা বললেন:
(وَمَا قَتَلُوْهُ وَمَا صَلَبُوْهُ وَلٰكِنْ شُبِّهَ لَهُمْ)
“অথচ তারা তাকে হত্যা করেনি, ক্রশবিদ্ধও করেনি; কিন্তু তাদের জন্য (একলোককে) সাদৃশ্য করে দেয়া হয়েছিল।” (সূরা নিসা ৪:১৫৭) সুতরাং ঈসা (আঃ)-কে ক্রশবিদ্ধ করতে পারেনি এবং হত্যাও করতে পারেনি। তিনি এখনো আকাশে জীবিত অবস্থায় রয়েছেন। শেষ যুগে তিনি আগমন করবেন, সকল দীন বাতিল করে ইসলামের প্রচার করবেন। (ইবনু কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: নাবীগণ পরস্পর সৎ ভাই। তাদের মা ভিন্ন। র্ধম এক ও অভিন্ন। আর আমিই ঈসা বিন মারইয়াম (আঃ)-এর সব চাইতে নিকটবর্তী ব্যক্তি। কারণ, আমি ও তাঁর মাঝে আর কোন নাবী নেই। তিনি নিশ্চয়ই (কিয়ামতের পূর্বে) দুনিয়াতে অবতরণ করবেন। তোমরা যখন তাঁকে দেখবে অতিসত্বর চিনতে পারবে। (মুসনাদ আহমাদ হা: ৯২৭০, সহীহ)
সাহাবী জাবের (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি:আমার উম্মতের একটি দল সর্বদা সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করে যাবে। কিয়ামত পর্যন্ত তারা বিশ্বের বুকে নিজেদের মাথা উঁচু করে সম্মানের সাথে জীবন যাপন করবে। ইতোমধ্যে ঈসা বিন মারইয়াম (আঃ) দুনিয়াতে অবতরণ করবেন। তখন তাদের আমীর ঈসা (আঃ)-কে উদ্দেশ্য করে বলবেন: আসুন, আমাদেরকে সালাত পড়িয়ে দিন। তখন তিনি বলবেন: না, আমি সালাত পড়াব না। তোমরা একে অপরের আমীর। এটি হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে এ উম্মতের জন্য এক বিশেষ সম্মান। (সহীহ মুসলিম হা: ১৫৬)
(وَجَاعِلُ الَّذِيْنَ اتَّبَعُوْكَ)
‘তোমার অনুসারীদেরকে কাফিরদের উপরে স্থান দেব’ অর্থাৎ যারা ঈসা (আঃ)-এর খাটি অনুসারী ছিল, তাঁর প্রতি ঈমান এনেছিল তাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামত পর্যন্ত কাফিরদের উপরে স্থান দেবেন। নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আগমন করলে তারাই তাঁর প্রতি ঈমান এনেছিল।
অবশেষে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ঈসা আদম-এর মতই মানুষ। আদম যেমন পিতা-মাতা ছাড়া সৃষ্টি। ঈসা (আঃ)-কেও তেমনি পিতা ছাড়া সৃষ্টি করা হয়েছে। অতএব সন্দেহের কিছু নেই। তাঁকে আল্লাহ তা‘আলার সন্তান বা তিনিই আল্লাহ তা‘আলা বলার কোন যৌক্তিকতা নেই।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. মানত করা শরীয়ত সিদ্ধ; কিন্তু তা হতে হবে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা জন্য।
২. কিছু কিছু বৈশিষ্ট্যে কোন মহিলা কোন পুরুষ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হতে পারে।
৩. আল্লাহ তা‘আলার অলীদের কারামত প্রমাণিত হল, যেমন মারইয়াম (আলাইহাস সালাম) এর অমৌসুমী ফল প্রাপ্তি।
৪. কোন কল্যাণকর বস্তু হারিয়ে গেলে বা ছুটে গেলে আফসোস করা জায়েয। তবে ‘যদি এরূপ করতাম তাহলে এরূপ হত’ এ জাতীয় কথা বলা যাবে না বরং বিশ্বাস করতে হবে যে, এটাই তার তাকদীরে ছিল।
৫. আল্লাহ তা‘আলা যাকে ইচ্ছা বৃদ্ধা ও বন্ধ্যা হওয়া সত্ত্বেও সন্তান দিতে পারেন। তাই একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার কাছেই সন্তান চাইতে হবে।
৬. ঈসা (আঃ)-এর মু‘জিযাহসমূহ জানতে পারলাম।
৭. যা মানুষের সাধারণ নিয়মের বহির্ভূত তার ব্যাখ্যা চাওয়া জায়েয।
৮. গায়েব একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা জানেন। কোন নাবী-রাসূল তা জানেন না; তবে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে যেটুকু জানিয়েছেন তারা সেটুকু জানতেন।
৯. ঈসা (আঃ) আল্লাহ তা‘আলার একজন নাবী। তিনি আল্লাহ তা‘আলাও নন, আল্লাহ তা‘আলার সন্তানও নন।
১০. প্রত্যেক নাবীর সহচর ছিল। আমাদের নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সহচর হল তাঁর সাহাবীগণ।
১১. ঈসা (আঃ) এখনো আকাশে জীবিত আছেন; তিনি শেষ যামানায় দুনিয়াতে পুনরায় আগমন করবেন।
১২. ঈসা (আঃ)-কে শূলিতে চড়ানো হয়নি এবং হত্যাও করেনি।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ফেরেশতাগণ হযরত মারইয়াম (আঃ)-কে এ সুসংবাদ দিচ্ছেন যে, তাঁর একটি বড় খ্যাতিসম্পন্ন পুত্র জন্মগ্রহণ করবেন। তিনি শুধু আল্লাহ তাআলার অর্থাৎ 'হও' শব্দ দ্বারা সৃষ্ট হবেন (আরবী) এবং (৩:৩৯)-এর তাফসীর এটাই, যেমন জমহুর বর্ণনা করেছেন, যার বর্ণনা ইতিপূর্বে হয়ে গেছে।
তার নাম হবে মারইয়াম নন্দন ঈসা মাসীহ (আঃ)। প্রত্যেক মুমিন তাকে এ নামেই চিনবে। তার নাম মাসীহ হওয়ার কারণ এই যে, তিনি খুব বেশী পৃথিবীতে ভ্রমণ করবেন। মায়ের দিকে সম্বন্ধ করার কারণ এই যে, তাঁর কোন পিতা ছিল না। ইহকালে ও পরকালে তিনি আল্লাহ তাআলার নিকট মহা সম্মানিত ও তাঁর সান্নিধ্যপ্রাপ্তগণের অন্তর্ভুক্ত। তার উপর আল্লাহ তা'আলার শরীয়ত ও কিতাব অবতীর্ণ হবে। দুনিয়ায় তার উপর বড় বড় অনুগ্রহ বর্ষিত হবে এবং পরকালেও তিনি স্থির প্রতিজ্ঞ নবীদের মত আল্লাহ তা'আলার নির্দেশক্রমে ও তাঁর ইচ্ছানুযায়ী সুপারিশ করবেন এবং সেই সুপারিশও গৃহীত হবে।
তিনি স্বীয় দোলনায় ও প্রৌঢ় বয়সে লোকদের সাথে কথা বলবেন। অর্থাৎ তিনি শৈশবকালেই লোকদেরকে একক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহবান করবেন যা তার একটি অলৌকিক ঘটনারূপে গণ্য হবে। আর পরিণত বয়সেও যখন আল্লাহ তা'আলা তাঁর নিকট অহী করবেন তখন তিনি স্বীয় কথায় ও কাজে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী হবেন এবং সৎ কার্যাবলী সম্পাদনকারী হবেন। একটি হাদীসে রয়েছে যে, শৈশবাবস্থায় কথা বলেছিলেন শুধুমাত্র হযরত ঈসা (আঃ) এবং হযরত জুরায়েজের সঙ্গী। অন্য একটি হাদীসে অন্য একটি শিশুর কথা বলাও বর্ণিত আছে। তাহলে মাত্র এ তিনজন মানব শৈশবাবস্থায় কথা বলেছিলেন। হযরত মারইয়াম (আঃ) এ সুসংবাদ শুনে স্বীয় প্রার্থনার মধ্যেই বলেন, “হে আমার প্রভু! আমার সন্তান কিরূপে হতে পারে? আমি তো বিয়ে করিনি এবং আমার বিয়ে করার ইচ্ছেও নেই। তাছাড়া আমি দুশ্চরিত্রা মেয়েও নই'। আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে ফেরেশতাগণ উত্তর দেন যে, আল্লাহ পাকের নির্দেশই খুব বড় জিনিস। কোন কাজেই তিনি অসমর্থ নন। তিনি যেভাবেই চান সৃষ্টি করে থাকেন। এ সূক্ষ্মতার বিষয় চিন্তা করলে বুঝা যাবে যে, হযরত যাকারিয়া (আঃ)-এর প্রশ্নের উত্তরে (আরবী) শব্দ ছিল, আর এখানে (আরবী) শব্দ রয়েছে, অর্থাৎ তিনি সৃষ্টি করেন। এর কারণ হচ্ছে এই যে, যেন বাতিলপন্থীদের কোন সন্দেহ করার সুযোগ না থাকে এবং পরিষ্কার ভাষায় বুঝা যায় যে, হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহ তা'আলার সৃষ্ট। অতঃপর ওর উপর আরও গুরুতু আরোপ করতঃ বলেন, তিনি যে কোন কাজ যখনই করার ইচ্ছে করেন তখন শুধুমাত্র বলেন, হও আর তেমনই হয়ে যায়। তাঁর নির্দেশের পর কার্য সংঘটিত হতে এক মুহূর্তও বিলম্ব হয় না। যেমন অন্য স্থানে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ আমার একবার নির্দেশমাত্রই অবিলম্বে চোখের পলকে ঐ কাজ হয়ে যায়, আমার দ্বিতীয়বার বলার প্রয়োজন হয় না।' (৫৪:৫০)
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।