আল কুরআন


সূরা আলে-ইমরান (আয়াত: 200)

সূরা আলে-ইমরান (আয়াত: 200)



হরকত ছাড়া:

ياأيها الذين آمنوا اصبروا وصابروا ورابطوا واتقوا الله لعلكم تفلحون ﴿٢٠٠﴾




হরকত সহ:

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوا اصْبِرُوْا وَ صَابِرُوْا وَ رَابِطُوْا ۟ وَ اتَّقُوا اللّٰهَ لَعَلَّکُمْ تُفْلِحُوْنَ ﴿۲۰۰﴾




উচ্চারণ: ইয়াআইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানুসবিরু ওয়া সা-বিরু ওয়া রা-বিতূ ওয়াত্তাকুল্লা-হা লা‘আল্লাকুম তুফলিহুন।




আল বায়ান: হে মুমিনগণ, তোমরা ধৈর্য ধর ও ধৈর্যে অটল থাক এবং পাহারায় নিয়োজিত থাক। আর আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফল হও।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২০০. হে ঈমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ কর(১), ধৈর্যে প্রতিযোগিতা কর(২) এবং সবসময় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাক(৩), আর আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।




তাইসীরুল ক্বুরআন: হে মু’মিনগণ! ধৈর্য অবলম্বন কর, দৃঢ়তা প্রদর্শন কর, নিজেদের প্রতিরক্ষাকল্পে পারস্পরিক বন্ধন মজবুত কর এবং আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।




আহসানুল বায়ান: (২০০) হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ কর।[1] ধৈর্য ধারণে প্রতিযোগিতা কর এবং (শত্রুর বিপক্ষে) সদা প্রস্তুত থাক; আর আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।



মুজিবুর রহমান: হে বিশ্বাস স্থাপনকারীগণ! তোমরা ধৈর্য অবলম্বন কর এবং সহিষ্ণু ও সুপ্রতিষ্ঠিত হও; এবং আল্লাহকে ভয় কর যেন তোমরা সুফল প্রাপ্ত হও।



ফযলুর রহমান: হে ঈমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ধর, ধৈর্যের সাথে (শত্রুর) মোকাবেলা করো এবং (শত্রুর আক্রমণের বিরুদ্ধে) সর্বদা সতর্কাবস্থায় থাক। আর আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।



মুহিউদ্দিন খান: হে ঈমানদানগণ! ধৈর্য্য ধারণ কর এবং মোকাবেলায় দৃঢ়তা অবলম্বন কর। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাক যাতে তোমরা তোমাদের উদ্দেশ্য লাভে সমর্থ হতে পার।



জহুরুল হক: ওহে যারা ঈমান এনেছ! ধৈর্যধারণ করো আর ধৈর্যধারণে অগ্রণী হও, আর অবিচল থেকো, আর আল্লাহ্‌কে ভয়শ্রদ্ধা করো, যেন তোমরা সফলকাম হতে পারো।



Sahih International: O you who have believed, persevere and endure and remain stationed and fear Allah that you may be successful.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ২০০. হে ঈমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ কর(১), ধৈর্যে প্রতিযোগিতা কর(২) এবং সবসময় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাক(৩), আর আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।


তাফসীর:

(১) এ আয়াতটিতে মুসলিমগণকে চারটি বিষয়ে নসীহত করা হয়েছে- (১) সবর, (২) মুসাবারাহ (৩) মুরাবাতা ও (৪) তাকওয়া, যা এ তিনের সাথে অপরিহার্যভাবে যুক্ত। তন্মধ্যে ‘সবর’ এর শাব্দিক অর্থ বিরত রাখা ও বাধা দেয়া। আর কুরআন ও সুন্নাহর পরিভাষায় এর অর্থ নফসকে তার প্রকৃতি বিরুদ্ধ বিষয়ের উপর জমিয়ে রাখা। এর তিনটি প্রকার রয়েছে- (এক) সবর আলাত্ত্বা’আত। অর্থাৎ আল্লাহ্ তাআলা ও তার রাসূল যে সমস্ত কাজের হুকুম করেছেন, সেগুলোর অনুবর্তিতা মনের উপর যত কঠিনই হোক না কেন তাতে মনকে স্থির রাখা। (দুই) সবর আনিল মা'আসী অর্থাৎ যে সমস্ত বিষয়ে আল্লাহ্ ও তার রাসূল নিষেধ করেছেন, সেগুলো মনের জন্য যত আকর্ষণীয়ই হোক না কেন, যত স্বাদেরই হোক না কেন, তা থেকে মনকে বিরত রাখা। (তিন) সবর আলাল-মাসায়েব অর্থাৎ বিপদাপদ ও কষ্টের বেলায় সবর করা, ধৈর্য ধারণ করা, অধৈর্য না হওয়া এবং দুঃখ-কষ্ট ও সুখ-শান্তিকে আল্লাহরই পক্ষ থেকে আগত মনে করে মন-মস্তিস্ককে সেজন্য অধৈর্য করে না তোলা। [ইবনুল কাইয়্যেম, আল-জাওয়াবুল কাফী লিমান সাআলা আনিদ দাওয়ায়িশ শাফী; মাদারিজুস সালেকীন]


(২) মুসাবারাহ শব্দটি সবর থেকেই গৃহীত হয়েছে। এর অর্থ, শক্রর মোকাবিলা করতে গিয়ে দৃঢ়তা অবলম্বন করা। অথবা পরস্পর ধৈর্যের প্রতিযোগিতা করা।


(৩) মুরাবাতাহ অর্থ হলো, ঘোড়াকে বাধা এবং যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা। কুরআন ও হাদীসের পরিভাষায় এ শব্দটি দুটি অর্থে ব্যবহৃত হয়ঃ

(এক) ইসলামী রাষ্ট্রের সীমান্তের হেফাযতে সুসজ্জিত হয়ে থাকা অপরিহার্য, যাতে ইসলামী সীমান্তের প্রতি শত্রুরা রক্তচক্ষু তুলে তাকাতেও সাহস না পায়। এটিই রিবাত ও মুরাবাতাহ এর বিখ্যাত অর্থ। এর দুটি রূপ হতে পারেঃ প্রথমতঃ যুদ্ধের কোন সম্ভাবনা নেই, সীমান্ত সম্পূর্ণ শান্ত, এমতাবস্থায় শুধুমাত্র অগ্রিম হেফাযত হিসাবে তার দেখা-শোনা করতে থাকা। এক্ষেত্রে পরিবার-পরিজনসহ সেখানে (সীমান্তে) বসবাস করতে থাকা কিংবা চাষাবাদ করে রুযী-রোজগার করাও জায়েয।

এমতাবস্থায় যদি সীমান্ত রক্ষাই নিয়ত হয় এবং সেখানে থাকা অবস্থায় রুযী-রোজগার করা যদি তারই আনুষঙ্গিক বিষয় হয়, তবে এমন ব্যক্তিরও রিবাত ফী সাবীলিল্লাহ'র সওয়াব হতে থাকবে। তাকে যদি কখনও যুদ্ধ করতে না হয়, তবুও। কিন্তু প্রকৃত নিয়ত যদি সীমান্তের হেফাযত না হয়, বরং রুযী-রোজগারই হয় মুখ্য, তবে দৃশ্যতঃ সীমান্ত রক্ষার কাজ করে থাকলেও এমন ব্যত্ত্বি মুরাবিত ফী-সাবিলিল্লাহ হবে না। অর্থাৎ সে ব্যক্তি আল্লাহর ওয়াস্তে সীমান্ত রক্ষাকারী বলে গণ্য হবে না। দ্বিতীয়তঃ সীমান্তে যদি শত্রুর আক্রমণের আশংকা থাকে, তবে এমতাবস্থায় নারী ও শিশুদিগকে সেখানে রাখা জায়েয নয়। তখন সেখানে তারাই থাকবে, যারা শক্রর মোকাবিলা করতে পারে। এতদুভয় অবস্থায় রিবাত বা সীমান্তরক্ষার অসংখ্য ফযীলত রয়েছে। এক হাদীসে সাহল ইবনে সা'দ আস-সায়েদী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- আল্লাহর পথে এক দিনের ‘রিবাত’ (সীমান্ত প্রহরা) সমগ্র দুনিয়া এবং এর মাঝে যা কিছু রয়েছে সে সমুদয় থেকেও উত্তম। [বুখারীঃ ২৭৯৪, মুসলিমঃ ১৮৮১]

অপর এক হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ একদিন ও একরাতের ‘রিবাত’ (সীমান্ত প্রহরা) ক্রমাগত এক মাসের সিয়াম এবং সমগ্র রাত ইবাদাতে কাটিয়ে দেয়া অপেক্ষা উত্তম। যদি এমতাবস্থায় কারো মৃত্যু হয়, তাহলে তার সীমান্ত প্রহরার পর্যায়ক্রমিক সওয়াব সর্বদা অব্যাহত থাকবে। আল্লাহর পক্ষ থেকে তার রিযক জারী থাকবে এবং সে কবরের ফেতনা বা পরীক্ষা (প্রশ্নোত্তর) থেকে নিরাপত্তা পাবে। [মুসলিমঃ ১৯১৩]

ফুদালাহ ইবনে উবায়েদ বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলে কারম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ প্রত্যেক মৃত ব্যক্তির আমল তার মৃত্যুর সাথে সাথে শেষ হয়ে যায় শুধুমাত্র মুরাবিত (ইসলামী সীমান্তরক্ষী) ছাড়া। অর্থাৎ তার কাজ কেয়ামত পর্যন্ত বাড়তে থাকবে এবং সে কবরের হিসাবনিকাশ থেকে নিরাপদ থাকবে। [আবু দাউদঃ ২৫০০]

এসব বর্ণনার দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, রিবাত বা সীমান্ত রক্ষার কাজটি সদকায়ে জারিয়া অপেক্ষাও উত্তম। কারণ, সদকায়ে জারিয়ার সওয়াব ততক্ষণ পর্যন্ত চলতে থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত তার সদকাকৃত বাড়ী-ঘর, জমিজমা, রচিত গ্রন্থরাজি কিংবা ওয়াকফকৃত জিনিসের দ্বারা মানুষ উপকৃত হতে থাকে। যখন উপকারিতা বন্ধ হয়ে যায়, তখন তার সওয়াবও বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু আল্লাহর পথে সীমান্ত প্রহরার সওয়াব কিয়ামত পর্যন্ত বন্ধ হবে না। কারণ, সমস্ত মুসলিম সৎকর্মে নিয়োজিত থাকা তখনই সম্ভব, যখন তারা শক্রর আক্রমণ থেকে নিরাপদে থাকবে। ফলে একজন সীমান্তরক্ষীর এ কাজ সমস্ত মুসলিমদের সৎকাজের কারণ হয়। সে কারণেই কেয়ামত পর্যন্ত তার ‘রিবাত’ কর্মের সওয়াব অব্যাহত থাকবে। তাছাড়াও সে যত নেক কাজ দুনিয়ায় করত, সেগুলোর সওয়াবও আমল করা ছাড়াই সর্বদা জারী থাকবে।

(দুই) কুরআন ও হাদীসে রিবাত দ্বিতীয় যে অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, তা হচ্ছে, জামাআতের সাথে সালাত আদায়ে খুবই যত্নবান হওয়া এবং এক সালাতের পরই দ্বিতীয় সালাতের জন্য অপেক্ষামান থাকা। এক হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আমি কি তোমাদেরকে এমন কাজের সংবাদ দিব না, যা করলে তোমাদের গোনাহ মাফ হয়ে যাবে এবং তোমাদের মর্যাদা বুলন্দ হবে? সাহাবায়ে কিরাম বললেন, অবশ্যই। তিনি বললেন, তা হচ্ছে, কষ্টকর স্থান বা সময়ে অযুর পানি সঠিকভাবে পৌছানো, মসজিদের প্রতি বেশী বেশী পদক্ষেপ এবং এক সালাতের পরে অপর সালাতের অপেক্ষায় থাকা। আর এটিই হচ্ছে, রিবাত। [মুসলিম: ২৫১]

বাস্তবে উভয় অর্থের মধ্যে কোন বিরোধ নেই। প্রথম অর্থটি মানব শয়তানদের বিরুদ্ধে জিহাদের অংশ। আর দ্বিতীয় অর্থটি জিন শয়তানদের বিরুদ্ধে এক অমোঘ অস্ত্র। সুতরাং আয়াতে উভয় অর্থই গ্রহণ করা যেতে পারে।


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (২০০) হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ কর।[1] ধৈর্য ধারণে প্রতিযোগিতা কর এবং (শত্রুর বিপক্ষে) সদা প্রস্তুত থাক; আর আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।


তাফসীর:

[1] ‘ধৈর্য ধরো’ অর্থাৎ, আনুগত্যের পথে অবিচল থাকা এবং কুপ্রবৃত্তি ও ভোগ-বিলাস বর্জন করার ব্যাপারে স্বীয় আত্মাকে কাবু ও আয়ত্তাধীন রাখ। مُصَابَرَةٌ (صَابِرُوا) এর অর্থ হল, যুদ্ধের কঠিন মুহূর্তে শত্রুর মোকাবেলায় অনড় থাকা। এটা হল ধৈর্যের কঠিনতম অবস্থা। এই জন্যই এটাকে পৃথকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। راَبِطُوْا এর অর্থ হল, যুদ্ধের ময়দানে অথবা প্রতিপক্ষের সামনে সংঘবদ্ধভাবে সব সময় সতর্ক ও জিহাদের জন্য প্রস্তুত থাকা। এটাও উচ্চ সাহসিকতা ও বড়ই উদ্দীপনার কাজ। এই কারণেই হাদীসে এর ফযীলতের কথা বর্ণিত হয়েছে। হাদীসে এসেছে, (رِبَاطُ يَوْمٍ فِي سَبِيْل اللهِ خَيْرٌ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا فِيْهَا) ‘‘আল্লাহর পথে কোন এক দিন প্রতিরক্ষার কাজে নিযুক্ত থাকা দুনিয়া ও তাতে যা কিছু আছে তার চেয়েও উত্তম।’’ (বুখারী) এ ছাড়াও হাদীসে কষ্টের সময়ে সুন্দরভাবে ওযু করা, মসজিদের দিকে বেশী বেশী পদক্ষেপ করা এবং এক নামাযের পরে অপর নামাযের জন্য অপেক্ষা করাকেও ‘রিবাত্ব’ (জিহাদে প্রতিরক্ষার কাজের ন্যায়) বলা হয়েছে। (সহীহ মুসলিম)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১৯৯-২০০ নং আয়াতের তাফসীর:



এ আয়াতে আহলে কিতাবের সেই দলের কথা বলা হচ্ছে, যে দল আল্লাহ তা‘আলার প্রতি তাদের কাছে আগত রাসূল ও রিসালাতের প্রতি এবং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর রিসালাতের ওপর ঈমান এনে ধন্য হয়েছে। তাদের ঈমান এবং ঈমানী গুণাবলীর কথা উল্লেখ করে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে এমন সব আহলে কিতাব থেকে পৃথক করে দিলেন, যাদের কাজই ছিল ইসলাম, পয়গাম্বর এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করা, আল্লাহ তা‘আলার আয়াতের পরিবর্তন ও তার অপব্যাখ্যা করা এবং দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী সম্পদ লাভের জন্য দীনকে পরিবর্তন ও প্রকৃত জ্ঞানকে গোপন করা।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(لَيْسُوْا سَوَا۬ءً ط مِنْ أَهْلِ الْكِتٰبِ أُمَّةٌ قَا۬ئِمَةٌ يَّتْلُوْنَ اٰيٰتِ اللّٰهِ اٰنَا۬ءَ اللَّيْلِ وَهُمْ يَسْجُدُوْنَ)



“তারা সবাই সমান নয়। আহলে কিতাবের মধ্যে একটি দল রয়েছেন দীনের ওপর অটল। তারা রাতের বেলা আল্লাহর আয়াত তেলাওয়াত করে এবং সিজদা করে।” (সূরা আলি-ইমরান ৩:১১৩)



ইমাম ইবনু কাসীর (রহঃ) বলেন: এ আয়াতে আহলে কিতাবের যে সকল মু’মিনদের কথা উল্লিখিত হয়েছে ইয়াহূদীদের মধ্য থেকে তাদের সংখ্যা দশ জনও হবে না, তবে খ্রিস্টানদের মধ্যে বহু সংখ্যক লোক ইসলাম গ্রহণ করে সত্য দীনের অনুসারী হয়েছে। (ইবনু কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)



আব্বাদ বিন মানসূর বলেন: এ আয়াত সম্পর্কে হাসান বাসরী (রহঃ)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তিনি বলেন: তারা হল আহলে কিতাব যারা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পূর্বে ছিল। তারা ইসলাম গ্রহণ করে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অনুসরণ করছে। তাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা দ্বিগুণ প্রতিদান দেবেন।



যে সকল আহলে কিতাবগণ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে তাদের অনেক ফযীলত সহীহ হাদীসে প্রমাণিত আছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, তিন শ্রেণির মানুষকে দ্বিগুণ প্রতিদান দেয়া হবে। তার মধ্যে একশ্রেণি হল যে সকল আহলে কিতাবগণ তাদের নাবীর ওপর ঈমান এনেছে অতঃপর আমার প্রতি ঈমান এনেছে। (সহীহ বুখারী হা: ৯৭)



اصْبِرُوْا ধৈর্যধারণ করা, অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আদেশ বাস্তবায়নে এবং তাদের নিষেধ পরিত্যাগ করার ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ করা।



صَابِرُوْا “ধৈর্য ধারণে প্রতিযোগিতা কর” যুদ্ধের কঠিন মুহূর্তে শত্র“র মোকাবেলায় অনড় থাকা। এটা হল ধৈর্যের কঠিনতম অবস্থা। এ জন্যই এটাকে পৃথকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।



رَابِطُوْا যুদ্ধের ময়দানে অথবা প্রতিপক্ষের সামনে সংঘবদ্ধভাবে সব সময় সতর্ক ও জিহাদের জন্য প্রস্তুত থাকা। এটাও উচ্চ সাহসিকতা ও বড় উদ্দীপনার কাজ। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: আল্লাহ তা‘আলার পথে একদিন প্রতিরক্ষার কাজে নিযুক্ত থাকা দুনিয়া ও তাতে যা কিছু আছে তার চেয়েও উত্তম। (সহীহ বুখারী হা: ২৮৯২)



এ ছাড়াও হাদীসে কষ্টের সময়ে সুন্দরভাবে ওযু করা, মাসজিদের দিকে বেশি বেশি পদক্ষেপ ফেলা এবং এক সালাতের পর অপর সালাতের জন্য অপেক্ষা করাকেও রিবাত (জিহাদে প্রতিরক্ষার কাজের ন্যায়) বলা হয়েছে। (সহীহ মুসলিম হা: ২৫১)



আল্লামা জাযায়েরী (রহঃ) বলেন: সৈন্যদলের সাথে সর্বদা ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকা যাতে শত্র“বাহিনী কোনক্রমেই মুসলিম দেশে প্রবেশ করতে না পারে। (আইসারুত তাফাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)



সুতরাং আহলে কিতাবের সবাই সমান নয়, কেউ কেউ তাদের কাছে আগত কিতাবের প্রতি ও রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছে এবং শেষ নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতিও ঈমান এনেছে। তাদের জন্য সুসংবাদ।



আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. আহলে কিতাবের মধ্যে যারা তাদের নাবী ও শেষ নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি ঈমান এনেছে তাদের মর্যাদা জানতে পারলাম।

২. ধৈর্য ধারণ ও আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় পাহারা দেয়া ফযীলতের কাজ।

৩. মু’মিনরা সর্বদা শত্র“দের বিরুদ্ধে শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে থাকবে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১৯৯-২০০ নং আয়াতের তাফসীর:

এখানে আল্লাহ তাআলা আহলে কিতাবের ঐ দলের প্রশংসা করছেন যারা পুরোপুরি ঈমান আনয়ন করেছিল। তারা কুরআন কারীমেও বিশ্বাস করে এবং নিজেদের কিতাবের উপরও বিশ্বাস রাখে। তারা অন্তরে আল্লাহ তা'আলার ভয় রেখে তার আদেশ পালনে সদা লিপ্ত থাকে। প্রভুর সামনে তারা বিনয় প্রকাশ করতঃ ক্রন্দন করে থাকে। তাদের কিতাবে শেষ নবী (সঃ)-এর যেসব বিশেষণের বর্ণনা রয়েছে তা তারা গোপন করে না। বরং সকলকেই তা প্রদান করতঃ তাঁকে স্বীকার করে নিতে উৎসাহিত করে। এরূপ দল আল্লাহ তা'আলার নিকট পুণ্য প্রাপ্ত হবে, তারা ইয়াহুদীই হোক বা খ্রীষ্টানই হোক। সূরা-ইকাসাসের মধ্যে এ বিষয়টি নিম্নরূপ বর্ণিত হয়েছে-যাদেরকে আমি এর পূর্বে কিতাব দান করেছিলাম তারা ওর উপরেও ঈমান আনয়ন করে এবং এ কিতাব (কুরআন কারীম) তাদের নিকট পাঠ করা হয় তখন তারা স্পষ্টভাবে বলে, ‘আমরা ওর উপর ঈমান এনেছি। এটা আমাদের প্রভুর নিকট হতে সত্য কিতাব। আমরা তো প্রথম হতেই এটা মান্য করতাম। তাদেরকে তাদের ধৈর্যের দ্বিগুণ প্রতিদান দেয়া হবে। অন্য জায়গায় রয়েছে- যাদেরকে আমি গ্রন্থ প্রদান করেছি এবং যারা ওটা সঠিকভাবে পাঠ করে, তারা তো তৎক্ষণাৎ এ কুরআনের উপরও ঈমান এনে থাকে। আর এক জায়গায় ইরশাদ হচ্ছে- (আরবী) অর্থাৎ হযরত মূসা (আঃ)-এর কওমের মধ্যেও একটি দল সত্যের পথ প্রদর্শনকারী এবং সত্যের সঙ্গেই সুবিচার প্রতিষ্ঠাকারী।' (৭:১৫৯) অন্য স্থানে রয়েছে-“আহলে কিতাব সবাই সমান নয়, তাদের মধ্যে একটি দল রাত্রেও আল্লাহর কিতাব পাঠ করে থাকে এবং সিজদায় পড়ে যায়। আর এক জায়গায় রয়েছে-‘হে নবী (সঃ)! তুমি বল হে মানবমণ্ডলী! তোমরা বিশ্বাস স্থাপন কর আর নাই কর, পূর্ব হতেই যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে যখন তাদের নিকট কুরআন কারীমের আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তারা মুখের ভরে সিজদায় পড়ে যায় এবং বলে, আমাদের প্রভু পবিত্র, নিশ্চয়ই তার ওয়াদা সত্য হয়েই থাকবে। এরা কাঁদতে কাঁদতে মুখের ভরে পড়ে যায় এবং তাদের বিনয় বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়। ইয়াহূদীদের মধ্য এরূপ গুণসম্পন্ন লোক পাওয়া যায়, যদিও তাদের সংখ্যা ছিল খুব কম। যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) এবং তার মত আরও কয়েকজন ঈমানদার ইয়াহুদী আলেম। কিন্তু তাদের সংখ্যা দশের বেশী হবে না। খ্রীষ্টানদের অধিকাংশই সুপথে এসে গিয়েছিল এবং সত্যের অনুগত হয়েছিল। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে-“তুমি অবশ্যই ইয়াহুদ ও মুশরিকদেরকে মুমিনদের প্রতি ভীষণ শত্রুতা পোষণকারী পাবে এবং তাদের প্রতি ভালবাসা স্থাপনকারী পাবে ঐ লোকদেরকে যারা বলে, আমরা খ্রীষ্টান। এখান হতে তারা যা বলেছে তার বিনিময়ে আল্লাহ তাদেরকে এমন জান্নাত প্রদান করবেন যার নিম্নদেশ দিয়ে স্রোতস্বিনীসমূহ প্রবাহিত হবে, তারা তথায় চিরকাল অবস্থান করবে। এ পর্যন্ত। এখন বলা হচ্ছে যে, এসব লোক বিরাট প্রতিদানের অধিকারী। হাদীস শরীফে এও রয়েছে যে, যখন হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব (রাঃ) নাজ্জাসীর দরবারে বাদশাহ ও তার সভাসদবর্গের সামনে সূরা-ই-মারইয়াম পাঠ করেন তখন তার কান্না এসে যায়, ফলে বাদশাহ সহ উপস্থিত সমস্ত জনতাও কেঁদে ফেলেন এবং কাঁদতে কাঁদতে তাঁদের শত্রু সিক্ত হয়ে যায়। সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে নাজ্জাসীর মৃত্যুর সংবাদ প্রদান করতঃ বলেন, তোমাদের ভাই নাজ্জাসী আবিসিনিয়ায় মৃত্যুবরণ করেছেন। তার জানাযার নামায আদায় কর।

অতঃপর তিনি মাঠে গিয়ে সাহাবীগণকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করতঃ তাঁর জানাযার নামায আদায় করেন। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে যে, যখন নাজ্জাসী ইন্তেকাল করেন তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে বলেনঃ “তোমাদের ভাই-এর জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কর।' এতে কতগুলো তোক বলে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে সেই খ্রীষ্টানের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে বলছেন যে আবিসিনিয়ায় মারা গেছে। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। কুরআন কারীমই যেন তার মুসলমান হওয়ার সাক্ষ্য প্রদান করছে। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে নাজ্জাসীর মৃত্যুর সংবাদ দিতে গিয়ে বলেনঃ “তোমাদের ভাই আসহামা মারা গিয়েছেন। অতঃপর তিনি বাইরে বেরিয়ে যান এবং যেভাবে তিনি জানাযার নামায পড়াতেন ঐভাবেই চার তাকবীরে জানাযার নামায আদায় করেন। এতে মুনাফিকরা ঐ প্রতিবাদ করে এবং এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। সুনান-ই-আবি দাউদে রয়েছে, হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ নাজ্জাসীর ইন্তেকালের পর আমরা এ শুনতে থাকি যে, তাঁর সমাধির উপর আলো দেখা যায়। মুসতাদরীক-ই-হাকীমে রয়েছে যে, নাজ্জাসীর এক শত্রু তাঁরই সাম্রাজ্য হতে তার উপর আক্রমণ চালায়। তখন মুহাজিরগণ বলেন, আপনি তার মোকাবিলার জন্যে চলুন। আমরাও আপনার সাথে রয়েছি। আপনি আমাদের বীরত্ব দেখে নেবেন এবং যে উত্তম ব্যবহার আপনি আমাদের সাথে করেছেন তার প্রতিদানও হয়ে যাবে। কিন্তু নাজ্জাসী তখন বলেন, 'মানুষের সাহায্য নিয়ে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার চাইতে আল্লাহর সাহায্যের নিরাপত্তাই উত্তম। ঐ ব্যাপারেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা আহলে কিতাবের মুসলমানকে বুঝানো হয়েছে। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা ঐ আহলে কিতাবকে বুঝানো হয়েছে যারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পূর্বে ছিল, তারা ইসলামকে বুঝতে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অনুগত হওয়ারও তারা সৌভাগ্য লাভ করেছিল। কাজেই প্রতিদানও তাদেরকে দ্বিগুণ দেয়া হবে। এক প্রতিদান রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পূর্বেকার ঈমানের এবং দ্বিতীয় প্রতিদান হচ্ছে তাঁর প্রতি ঈমান আনয়নের প্রতিদান। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে হযরত আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘তিন প্রকারের লোক দ্বিগুণ প্রতিদান প্রাপ্ত হয়। তাদের মধ্যে একজন হচ্ছে আহলে কিতাবের ঐ ব্যক্তি যে স্বীয় নবীর উপর ঈমান এনেছে এবং আমার উপরও বিশ্বাস স্থাপন করেছে।'

এরপরে আল্লাহ তা'আলা বলেন-তারা অল্পমূল্যে আল্লাহর নিদর্শনাবলী বিক্রী করে না। অর্থাৎ তাদের কাছে যে ধর্মীয় শিক্ষা বিদ্যমান রয়েছে তা তারা গোপন করে না, যেমন তাদের মধ্যকার এক ইতর শ্রেণীর লোকের ঐ অভ্যাস ছিল। বরং ঐলোকগুলো তো ঐ শিক্ষাকে বেশী করে প্রচার করতো। তাদের প্রতিদান তাদের প্রভুর নিকট রয়েছে। তারপর বলা হচ্ছে-“নিশ্চয়ই আল্লাহ সত্বর হিসাব গ্রহণকারী।' অর্থাৎ সত্বর একত্রিতকারী, পরিবেষ্টনকারী এবং গণনাকারী। অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন-“আমার পছন্দনীয় ধর্ম ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক। কঠিন অবস্থায়, সহজ অবস্থায়, বিপদের সময়, শান্তির সময় মোটকথা কোন অবস্থাতেই ওটা পরিত্যাগ করো না। এমনকি প্রাণবায়ু নির্গত হলে যেন ওরই উপর নির্গত হয় এবং ঐ শক্রদের হতেও ধৈর্য ধারণ কর ও সহিষ্ণুতা অবলম্বন কর যারা স্বীয় ধর্মকে গোপন করে থাকে।' ইমাম হাসান বসরী (রঃ) প্রভৃতি পূর্ববর্তী আলেমগণও এ তাফসীরই করেছেন। ইবাদতের স্থানকে স্থায়ী করা এবং তথায় অটলভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকাকে (আরবী) বলা হয়। আবার এক নামাযের পর অন্য নামাযের জন্যে অপেক্ষা করাকেও (আরবী) বলে। এটাই হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত সাহল ইবনে হানীফ (রঃ) এবং হযরত মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব (রঃ)-এর উক্তি। সহীহ মুসলিম ও সুনান-ই-নাসাঈতে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘এসো, আমি তোমাদেরকে এমন কাজ শিখিয়ে দেই যার ফলে আল্লাহ তা'আলা পাপ মার্জনা করেন এবং মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। (১) কষ্টের সময় পূর্ণভাবে অযু করা, (২) মসজিদের দিকে গমন করা, (৩) এক নামাযের পর অন্য নামাযের জন্যে অপেক্ষা করা। ওটাই হচ্ছে (আরবী) ওটাই হচ্ছে (আরবী) এবং ওটাই হচ্ছে আল্লাহর পথের প্রস্তুতি গ্রহণ’। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে যে, একদা হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হযরত আবু সালমা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, “হে আমার ভ্রাতুস্পুত্র! তুমি এ আয়াতটির শান-ই-নমূল জান কি? হযরত আবূ সালমা (রাঃ) বলেন, আমার জানা নেই।' তখন হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন, “শুন, ঐ সময় কোন জিহাদ ছিল না। এ আয়াতটি ঐ লোকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা মসজিদকে আবাদ রাখতো এবং নামায ঠিক সময়ে আদায় করতো। অতঃপর আল্লাহ তাআলার যিকির করতো। তাদেরকেই নির্দেশ দেয়া হচ্ছে-‘তোমরা পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক, স্বীয় আত্মা ও প্রবৃত্তিকে দমিয়ে রাখ, মসজিদের দিকে গমন করতে থাক এবং আল্লাহকে ভয় করতে থাক, আর এ কার্যগুলোই হচ্ছে জাহান্নামের শাস্তি হতে মুক্তি প্রাপ্তির কারণ।' তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি কি তোমাদেরকে এমন আমলের কথা বলে দেবো না যার ফলে আল্লাহ তা'আলা পাপসমূহ মার্জনা করেন ও মর্যাদা বৃদ্ধি করেন? (১) অসুবিধার সময় পূর্ণভাবে অযু করা, (২) এক নামাযের পর অন্য নামাযের জন্যে অপেক্ষা করা। এসব কাজেই তোমাদের প্রস্তুত থাকা উচিত।

অন্য হাদীসে ‘খুব বেশী মসজিদের দিকে গমন করা এ কথাও রয়েছে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, পাপ মোচনের সঙ্গে সঙ্গে ঐ আমলসমূহের দ্বারা মর্যাদাও বৃদ্ধি পেতে থাকে। এটাই হচ্ছে এ আয়াতের ভাবার্থ। কিন্তু এ হাদীসটি একেবারেই গারীব। হযরত আবু সালমা ইবনে আবদুর রহমান (রাঃ) বলেন- (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে নামাযের জন্যে অপেক্ষা করা। কিন্তু উপরে বর্ণিত হয়েছে যে, এটা হচ্ছে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ)-এর উক্তি। এও বলা হয়েছে যে, (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করা, ইসলামী সাম্রাজ্যের সীমান্তের রক্ষণাবেক্ষণ করা এবং শত্রুদেরকে ইসলামী শহরে প্রবেশ করতে না দেয়া। এর উৎসাহ দানের ব্যাপারেও বহু হাদীস রয়েছে এবং ওর জন্যে বড় বড় পুণ্য প্রদানের অঙ্গীকার রয়েছে। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘এক দিনের এ প্রস্তুতি সারা দুনিয়া ও ওর সমুদয় বস্তু হতে উত্তম। সহীহ মুসলিম শরীফে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এক দিবস ও রজনীর জিহাদের প্রস্তুতি এক মাসের পূর্ণ রোযা এবং এক মাসের সারা রাত্রির জাগরণ হতে উত্তম। ঐ প্রস্তুতির অবস্থায় তার মৃত্যু হয়ে গেলে সে.যত ভাল ভাল কাজ করতো সব কিছুরই সে পুণ্য পেতে থাকবে এবং অল্লাহ তা'আলার নিকট হতে তাকে আহার্য প্রদান করা হবে এবং গণ্ডগোল হতে সে নিরাপত্তা লাভ করবে।” মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ প্রত্যেক মৃত ব্যক্তির আমল শেষ হয়ে যায়, কিন্তু যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে প্রস্তুতির কার্যে রয়েছে এবং ঐ অবস্থাতেই মারা গেছে তার আমল কিয়ামত পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে থাকবে ও তাকে কবরের শাস্তি হতে মুক্তি দেয়া হবে।' সুনান-ই-ইবনে মাজার বর্ণনায় এও রয়েছে যে, উত্থান দিবসের আতংক হতে সে নিরাপত্তা লাভ করবে। মুসনাদ-ই-আহমাদের অন্য হাদীসে রয়েছে যে, সকাল সন্ধ্যায় জান্নাত হতে আহার্য প্রদান করা হবে। কিয়ামত পর্যন্ত সে সৎকার্যে সুপ্রতিষ্ঠিত থাকার প্রতিদান পেতে থাকবে। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি মুসলমানদের সীমান্তের কোন প্রান্তে তিন দিন (জিহাদের) প্রহরায় নিযুক্ত থাকে তাকে সারা বছর ধরে প্রহরায় নিযুক্ত থাকার প্রতিদান দেয়া হবে। আমীরুল মুমিনীন হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) স্বীয় মিম্বরের উপর ভাষণ দান কালে একদা বলেন, “আমি তোমাদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনা কথা শুনাচ্ছি। আমি বিশেষ এক খেয়ালে এ পর্যন্ত তোমাদেরকে তা শুনাইনি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহর পথে এক ঘন্টা পাহারা দেয়া এক হাজার রাত্রির ইবাদত হতে উত্তম যে রাত্রিগুলো দাঁড়িয়ে এবং দিনগুলো রোযায় কাটিয়ে দেয়া হয়। এতদিন ধরে তার এ হাদীসটি বর্ণনা না করার কারণ তিনি বর্ণনা করেন, আমার ভয় ছিল যে, এ মর্যাদা লাভের উদ্দেশ্যে তোমরা সবাই হয়তো মদীনা ছেড়ে যুদ্ধক্ষেত্রে গমন করবে। এখন আমি তোমাদেরকে শুনিয়ে দিচ্ছি। প্রত্যেক ব্যক্তিরই এ স্বাধীনতা রয়েছে যে, যে কাজ সে নিজের জন্যে পছন্দ করে তা যেন সে পালন করে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, তিনি পরে বলেনঃ “আমি কি তোমাদের নিকট পৌছিয়ে দিয়েছি? জনগণ বলেঃ ‘হ্যা। অতঃপর তিনি বলেন, হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন। জামেউত তিরমিযীতে রয়েছে যে, হযরত শুরাহবিল ইবনে সামত (রাঃ) সীমান্ত প্রহরায় নিযুক্ত ছিলেন। বহুদিন অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পর তিনি কিছু সংকীর্ণ মনা হয়ে পড়েছিলেন। এমন সময় হযরত সালমান ফারেসী (রাঃ) তাঁর নিকট পৌছেন এবং বলেন, আমি তোমাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর একটি হাদীস শুনাবো। তিনি বলেছেনঃ ‘একদিন সীমান্ত প্রহরায় নিযুক্ত থাকা এক মাসের রোযা ও দাঁড়িয়ে ইবাদত হতে উত্তম। যে ব্যক্তি ঐ অবস্থাতেই মারা যায় সে কবরের শাস্তি হতে মুক্তি পায় এবং কিয়ামত পর্যন্ত তার কাজ চালু থাকে। সুনান-ই-ইবনে মাজার মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মুসলমানদেরকে নিরাপদে রাখার উদ্দেশ্যে একরাত্রি আল্লাহর পথে পাহারা দেয়া একশ বছরের ইবাদত অপেক্ষা উত্তম, যদিও ঐ রাত্রি রমযানের রাত্রি না হয়, যে একশ বছরের দিনগুলো রোযায় এবং রাত্রিগুলো তাহাজ্জুদে কাটিয়ে দেয়া হয়। আর মুসলমানদেরকে নিরাপদে রাখার উদ্দেশ্যে এবং পুণ্য লাভের নিয়তে রমযান মাসের দিন ছাড়াও কোন একটি দিনে আল্লাহর পথে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুতি গ্রহণ করা হাজার বছরের রোযা ও তাহাজ্জুদ হতে উত্তম। এখন যদি এ গাযী সহীহ সালামতে স্বীয় পরিবারের নিকট আগমন করে তবে এক হাজার বছরের পাপ তার আমল নামায় লিখা হয় না। কিন্তু পুণ্য লিখা হয় এবং সে কিয়ামত পর্যন্ত যুদ্ধক্ষেত্রে অটল থাকার পুণ্য পেতে থাকে।” এ হাদীসটি গারীব এমনকি পরিত্যক্ত। এর একজন বর্ণনাকারী মিথ্যায় অভিযুক্ত। সুনান-ই-ইবনে মাজার একটি গারীব হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মুসলমান সৈন্যদের পিছনে এক রাত্রির পাহারা এক বছরের রাত্রি দাড়িয়ে ইবাদত করা হতে এবং দিনগুলোর রোযা রাখা হতে উত্তম। প্রত্যেক বছরের মধ্যে তিনশ ষাট দিন রয়েছে এবং প্রত্যেক দিন বছরের মত।' এ হাদীসটির একজন বর্ণনাকারী হচ্ছে সাঈদ ইবনে খালিদ, হযরত আবু যারআ’ (রঃ) প্রভৃতি ইমামগণ তাকে দুর্বল বলেছেন। বরং ইমাম হাকিম (রঃ) বলেন যে, তার বর্ণনাকৃত হাদীসসমূহের মধ্যে মাওযূ' হাদীসও রয়েছে। একটি মুনকাতা হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ইসলামের সৈন্যের প্রহরীর উপর আল্লাহর করুণা বর্ষিত হোক।' (সুনান-ই-ইবনে মাজা) হযরত সাহল ইবনে হানযালা (রাঃ) বলেন, হুনায়েনের যুদ্ধে আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে গমন করি। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে মাগরিবের নামায আদায় করি এমন সময় একজন অশ্বারোহী এসে বলে, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি অগ্রে বেড়ে গিয়েছিলাম এবং অমুক পাহাড়ের উপর আরোহণ করে আমি লক্ষ্য করি যে, হাওয়াযেম গোত্রের লোক যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হয়ে গেছে। তাদের সাথে উট, ছাগল, স্ত্রীলোক এবং শিশুরাও রয়েছে।' একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটু মুচকি হেসে উঠে বলেনঃ ইনশাআল্লাহ! এ সবগুলো মুসলমানদের যুদ্ধলব্ধ মালের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। অতঃপর তিনি বলেনঃ “আজকের রাত্রের পাহারা দেবে কে? হযরত আনাস ইবনে আবু মুরশিদ (রঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি প্রস্তুত আছি'। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ 'যাও, সোয়ারী নিয়ে এসো।' তিনি ঘোড়ায় আরোহণ করে হাযির হন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ “এ ঘাটিতে চলে যাও এবং ঐ পর্বতের চূড়ায় আরোহণ কর। সাবধান! সকাল পর্যন্ত তাদের সাথে যেন তোমাদের কোন প্রকার বিরক্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়।” ফজর হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) নামাযের জায়গায় এসে দু' রাকআত সুন্নত আদায় করেন এবং জনগণকে জিজ্ঞেস করেনঃ “বল তো, তোমাদের অশ্বারোহী প্রহরীর কোন পদশব্দ শুনা যাবে কি?” জনগণ বলে, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! না।” তখন নামাযের জন্য তাকবীর দেয়া হয় এবং তিনি নামায আরম্ভ করেন। তাঁর খেয়াল ঘাটির দিকেই ছিল। নামাযের সালাম ফিরিয়েই তিনি বলেনঃ “তোমরা খুশী হও। তোমাদের অশ্বারোহী আসছে। আমরাও ঝোপের মধ্য হতে উঁকি মেরে দেখি। অল্পক্ষণের মধ্যে আমরাও দেখতে পাই। সে এসেই রাসূল (সঃ)-কে বলে, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি এ উপত্যকার উপরের অংশে পৌছে গিয়েছিলাম এবং আপনার নির্দেশক্রমে তথায়ই রাত্রি অতিবাহিত করি। সকালে আমি অন্য ঘাঁটিও দেখে লই কিন্তু সেখানেও কেউ নেই।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাকে বলেন, রাত্রে তুমি ওখান হতে নীচেও নেমেছিলে কি? তিনি বলেনঃ “না, শুধু নামাযের জন্যে এবং প্রস্রাব পায়খানার জন্যে নীচে নেমেছিলাম।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাকে বলেনঃ “তুমি নিজের জন্যে জান্নাত ওয়াজিব করে নিয়েছে। এরপর আর কোন আমল না করলেও কোন ক্ষতি নেই।” (সুনান-ই-আবি দাউদ ও নাসাঈ) মুসনাদ -ই-আহমাদে রয়েছে, হযরত আবু রায়হানা বলেন, “এক যুদ্ধে আমরা একটি উঁচু ভূমির উপর ছিলাম। অত্যন্ত ঠাণ্ডা পড়ছিল। শেষ পর্যন্ত লোক গর্ত খনন করে তাতে পড়ে রয়েছিল। সে সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) ডাক দিয়ে বলেনঃ “আজ রাত্রে আমাদেরকে পাহারা দেবে এবং আমাদের নিকট হতে উত্তম দু'আ নেবে এমন কেউ আছে কি?” একথা শুনে একজন আনসারী (রাঃ) দাঁড়িয়ে গিয়ে বলেন, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি প্রস্তুত আছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে নিজের কাছে ডেকে নিয়ে তাঁর নাম জিজ্ঞেস করতঃ তাঁর জন্যে বহু দু'আ করেন। আমি এ দু'আ শুনে সম্মুখে অগ্রসর হয়ে বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমিও পাহারা দেবো। তিনি আমাকেও পার্শ্বে ডেকে নেন এবং নাম জিজ্ঞেস করে আমার জন্যেও দু'আ করেন। কিন্তু ঐ আনসারী সাহাবীর তুলনায় কম ছিল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “ঐ চক্ষুর উপর জাহান্নামের তাপ হারাম যে আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করে এবং ঐ চক্ষুর উপরেও জাহান্নামের তাপ হারাম যে আল্লাহর পথে রাত্রি জাগরণ করে।” মুসনাদ-ই- আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায়, বাদশাহর পক্ষ হতে বেতন ছাড়াই মুসলমানদের পিছন হতে তাদের উপর পাহারা দেয় সে স্বীয় চক্ষু দ্বারাও জাহান্নামের আগুন দর্শন করবে না, কিন্তু শুধুমাত্র কসম পুরো হওয়ার জন্যে (দর্শন করবে)।” যেমন নিম্নের আয়াতে রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের মধ্যে সবাই ওর উপর আগমন করবে।” (১৯:৭১) সহীহ বুখারীর মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “স্বর্ণ মুদ্রার দাস রৌপ্য মুদ্রার দাস এবং বস্ত্রের দাস ধ্বংস হয়েছে। যদি তাকে সম্পদ দেয়া হয় তবে সে খুশী হয় এবং না দেয়া হলে অসন্তুষ্ট হয়, সে ধ্বংস হয়েছে এবং বিনষ্ট হয়েছে। তার পায়ে কাঁটা ঢুকলে তা বের করার চেষ্টাও করা হয় না। সৌভাগ্যবান ও উন্নতশীল ঐ ব্যক্তি যে আল্লাহর পথে যুদ্ধ করার জন্যে স্বীয় অশ্বের বগা ধারণ করে থাকে, তার মাথার চুল বিক্ষিপ্ত, পদদ্বয় ময়লা যুক্ত। তাঁকে পাহারায় নিযুক্ত করলে পাহারা দিয়ে থাকে, সেনাবাহিনীর অগ্রে নিযুক্ত করলে তাতেও খুশী হয়। লোকের দৃষ্টিতে সে এত নিকৃষ্ট যে, সে যেতে চাইলে অনুমতি পায় না, কারও জন্যে সুপারিশ করলে তা গৃহীত হয় না। আল্লাহ তা'আলারই সমস্ত প্রশংসা যে, এ আয়াত সম্পর্কীয় বিশেষ বিশেষ হাদীসসমূহ বর্ণিত হলো। তার দয়া ও অনুগ্রহের উপর আমরা তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। দুনিয়ায় থাকা পর্যন্ত তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হতে আমরা ক্ষান্ত হতে পারি না। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের মধ্যে রয়েছে যে, হযরত আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ (রাঃ) যুদ্ধক্ষেত্র হতে আমীরুল মুমিনীন, খালীফাতুল মুসলিমীন হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-কে একটি পত্র লিখেন এবং সেই পত্রে রোমক সৈন্যদের আধিক্য, তাদের যুদ্ধাস্ত্রের অবস্থা এবং তাদের প্রস্তুতির অবস্থা বর্ণনা করেন এবং লিখেন যে, ভীষণ বিপদের আশংকা রয়েছে। হযরত উমার (রাঃ) উত্তর পত্র প্রেরণ করেন যাতে আল্লাহর প্রশংসার পরে লিখিত ছিলঃ “মাঝে মাঝে মুমিন বান্দাদের উপরেও কঠিন বিপদ-আপদ নেমে আসে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা সেই কঠিন বিপদের পর তাদের পথ সহজ করে দেন। জেনে রেখো যে, ছুটি সরলতার উপর একটি কাঠিন্য জয়যুক্ত হতে পারে না। দেখ আল্লাহ পাক ঘোষণা করেন-অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য অবলম্বন কর এবণ সহিষ্ণু ও সুপ্রতিষ্ঠিত হও এবং আল্লাহকে ভয় কর, যেন তোমরা মুক্তি প্রাপ্ত হও।” হিজরী ১৭০ অথবা ১৭৭ সনে তারসুস শহরে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রঃ) যখন জিহাদে যাওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করছিলেন তখন হযরত মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহীম ইবনে সাকীনা (রঃ) তাঁকে বিদায় দেয়ার জন্যে এসেছিলেন। সে সময় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রঃ) নিম্নলিখিত কবিতা লিখে হযরত মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহীম (রঃ)-এর হাতে হযরত ফুযাইল ইবনে আয়াস (রঃ)-এর নিকট পাঠিয়ে দেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মক্কা ও মদীনায় অবস্থান করে ইবাদতকারী! আপনি যদি আমাদের মুজাহিদগণকে দেখতেন তবে আপনি অবশ্যই জানতে পারতেন যে, আপনি ইবাদতে খেল-তামাশা করছেন মাত্র। এক ঐ ব্যক্তি যার নয়না তার গণ্ডদেশ সিক্ত করে এবং এক আমরা যারা স্বীয় স্কন্ধ আল্লাহর পথে কাটিয়ে দিয়ে নিজেদের রক্তে নিজেরাই গোসল করে থাকি। এক ঐ ব্যক্তি যার ঘোড়া মিথ্যা ও বাজে কাজে ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং আমাদের ঘোড়া আক্রমণ ও যুদ্ধের দিনেই শুধু ক্লান্ত হয়। আগর বাতির সুগন্ধি হচ্ছে আপনাদের জন্যে, আর আমাদের জন্যে আগর বাতির সুগন্ধি হচ্ছে ঘোড়ার খুরের মাটি ও পবিত্র ধূলাবালি। নিশ্চিতরূপে জেনে রাখুন, আমাদের নিকট নবী (সঃ)-এর এ হাদীসটি পৌঁছেছে যা সম্পূর্ণ সত্য এবং মিথ্যা হতে পারে না, তা এই যে, যার নাসিকায় সেই আল্লাহর সৈন্যের ধূলাবালিও পৌঁছেছে তার নাসিকায় অগ্নিশিখা যুক্ত জাহান্নামের আগুনের ধুয়াও প্রবেশ করবে না। নিন, এ হচ্ছে আল্লাহর কিতাব যা আমাদের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে এবং স্পষ্টভাবে বলছে ও সত্য বলছে যে, শহীদ মৃত নয়।

হযরত মুহাম্মদ ইবনে ইবরাহীম বলেন, যখন আমি মসজিদে হারামে পৌছে হযরত ফুযাইল ইবনে আয়াস (রঃ)-কে এ কবিতাগুলো প্রদর্শন করি তখন তিনি কান্নায় ফেটে পড়েন এবং বলেন, “আবু আব্দির রহমানের উপর আল্লাহ দয়া করুন! তিনি সত্য কথাই বলেছেন এবং আমাকে উপদেশ দিয়েছেন ও আমার খুবই মঙ্গল কামনা করছেন।” অতঃপর আমাকে বলেন, “তুমি কি হাদীস লিখে থাক?” আমি বলি জ্বি, হঁ্যা। তিনি বলেন, “আচ্ছা, তুমি যখন এ উপদেশনামা আমার নিকট নিয়ে এসেছে তখন তার পরিবর্তে আমি তোমার দ্বারা একটি হাদীস লিখিয়ে নিচ্ছি।” হাদীসটি নিম্নরূপঃ

রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এক ব্যক্তি আবেদন করেন- “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি আমাকে এমন আমল শিখিয়ে দিন যা পালন করলে আমি মুজাহিদের পুণ্য লাভ করতে পারি। তিনি তখন তাকে বলেনঃ “তোমার মধ্যে কি এ শক্তি আছে যে, তুমি নামায পড়তেই থাকবে, কখনও ক্লান্ত হবে না এবং রোযা রাখতেই থাকবে এবং কখনও বে-রোযা থাকবে না?' লোকটি বলে, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এর শক্তি কোথায়? আমি তো এ ব্যাপারে অত্যন্ত দুর্বল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন লোকটিকে বলেনঃ “যদি তোমার মধ্যে এরূপ শক্তি থাকতো এবং তুমি এরূপ করতেও থাকতে তথাপি আল্লাহর পথে জিহাদকারীর মর্যাদা লাভ করতে পারতে না। তুমিও তো এটা জান যে, যদি মুজাহিদদের ঘোড়ার দড়ি লম্বা হয়ে যায় এবং সে এদিক ওদিক চড়ে যায় তবে তজ্জন্যেও মুজাহিদের পুণ্য লিখা হয়।”

এরপরে আল্লাহ পাক নির্দেশ দিচ্ছেন- “তোমরা আল্লাহকে ভয় করতে থাক এবং এ ভয় সর্বাবস্থায়, সব সময়, সর্বকাজে থাকতে হবে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ)-কে যখন ইয়ামনে প্রেরণ করেন তখন তিনি তাঁকে বলেনঃ “হে মুআয! যেখানেই থাক না কেন অন্তরে আল্লাহর ভয়। রাখবে। যদি তোমার দ্বারা কোন পাপকার্য হয়ে যায় তবে তৎক্ষণাৎ কোন পুণ্যের কাজও করবে, যেন সেই পাপ মোচন হয়ে যায়। আর জনগণের সাথে উত্তম ব্যবহার করবে।”

তারপরে আল্লাহ তা'আলা বলেন- এ চারটি কাজ করলে তোমাদের উদ্দেশ্য সফল হবে এবং দুনিয়া ও আখেরাতে তোমরা মুক্তি পেয়ে যাবে।' হযরত মুহাম্মাদ ইবনে কারাযী (রঃ) বলেন, এর ভাবার্থ হচ্ছে, 'তোমরা আমার খেয়াল রাখ, আমার ভয়ে কাঁপতে থাক। আমার ও তোমাদের কার্যের ব্যাপার সংযমী হও। যখন আমার উপর ভরসা করবে তখন তোমরা মুক্তিপ্রাপ্ত ও সফলকাম হবে।'





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।