সূরা আলে-ইমরান (আয়াত: 167)
হরকত ছাড়া:
وليعلم الذين نافقوا وقيل لهم تعالوا قاتلوا في سبيل الله أو ادفعوا قالوا لو نعلم قتالا لاتبعناكم هم للكفر يومئذ أقرب منهم للإيمان يقولون بأفواههم ما ليس في قلوبهم والله أعلم بما يكتمون ﴿١٦٧﴾
হরকত সহ:
وَ لِیَعْلَمَ الَّذِیْنَ نَافَقُوْا ۚۖ وَ قِیْلَ لَهُمْ تَعَالَوْا قَاتِلُوْا فِیْ سَبِیْلِ اللّٰهِ اَوِ ادْفَعُوْا ؕ قَالُوْا لَوْ نَعْلَمُ قِتَالًا لَّا تَّبَعْنٰکُمْ ؕ هُمْ لِلْکُفْرِ یَوْمَئِذٍ اَقْرَبُ مِنْهُمْ لِلْاِیْمَانِ ۚ یَقُوْلُوْنَ بِاَفْوَاهِهِمْ مَّا لَیْسَ فِیْ قُلُوْبِهِمْ ؕ وَ اللّٰهُ اَعْلَمُ بِمَا یَکْتُمُوْنَ ﴿۱۶۷﴾ۚ
উচ্চারণ: ওয়ালিইয়া‘লামাল্লাযীনা না-ফাকূওয়া কীলা লাহুম তা‘আ-লাও কা-তিলূফী ছাবীলিল্লা-হি আবিদ ফা‘ঊ কা-লূলাও না‘লামুকিতা-লাল্লাত্তাবা‘না-কুম হুম লিলকুফরি ইয়াওমাইযিন আকরাবুমিনহুম লিলঈমা-নি ইয়াকূলূনা বিআফওয়া-হিহিম মা-লাইছা ফী কুলূবিহিম ওয়াল্লা-হু আ‘লামুবিমা-ইয়াকতুমূন।
আল বায়ান: আর যাতে তিনি জেনে নেন মুনাফিকদেরকে। আর তাদেরকে বলা হয়েছিল, ‘এসো, আল্লাহর পথে লড়াই কর অথবা প্রতিরোধ কর’। তারা বলেছিল, ‘যদি আমরা লড়াই হবে জানতাম* তবে অবশ্যই তোমাদেরকে অনুসরণ করতাম’। সেদিন তারা কুফরীর বেশি কাছাকাছি ছিল তাদের ঈমানের তুলনায়। তারা তাদের মুখে বলে, যা তাদের অন্তরসমূহে নেই। আর তারা যা গোপন করে সে সম্পর্কে আল্লাহ অধিক অবগত।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৬৭. আর মুনাফিকদেরপ্রকাশ করার জন্য। আর তাদেরকে বলা হয়েছিল, এস, তোমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ কর অথবা প্রতিরোধ কর’। তারা বলেছিল, যদি যুদ্ধ জানতাম তবে নিশ্চিতভাবে তোমাদের অনুসরণ করতাম। সেদিন তারা ঈমানের চেয়ে কুফরীর কাছাকাছি ছিল। যা তাদের অন্তরে নেই তারা তা মুখে বলে এবং তারা যা গোপন রাখে আল্লাহ তা অধিক অবগত।
তাইসীরুল ক্বুরআন: আর মুনাফিকদেরকেও জেনে নেয়া। তাদেরকে বলা হয়েছিল; এসো, ‘আল্লাহর পথে যুদ্ধ কর, কিংবা (কমপক্ষে) নিজেদের প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা কর’। তখন তারা বলল, ‘যদি আমরা জানতাম যুদ্ধ হবে, তাহলে অবশ্যই তোমাদের অনুসরণ করতাম’। তারা ঐ দিন ঈমানের চেয়ে কুফরীরই নিকটতম ছিল, তারা মুখে এমন কথা বলে যা তাদের অন্তরে নেই, যা কিছু তারা গোপন করে আল্লাহ তা বিশেষরূপে জ্ঞাত আছেন।
আহসানুল বায়ান: (১৬৭) এবং মুনাফিক (কপটদের)কেও জানতে পারেন।[1] আর তাদেরকে বলা হয়েছিল, এস, তোমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ কর অথবা প্রতিরক্ষা কর। তারা বলেছিল, যদি আমরা যুদ্ধ জানতাম, তাহলে নিশ্চিতভাবে তোমাদের অনুসরণ করতাম।[2] সেদিন তারা বিশ্বাস (ঈমান) অপেক্ষা অবিশ্বাসের (কুফরীর) অধিক নিকটতম ছিল।[3] যা তাদের অন্তরে নেই, তা তারা মুখে বলে।[4] আর তারা যা গোপন রাখে, আল্লাহ তা বিশেষভাবে অবহিত।
মুজিবুর রহমান: আর তদ্দারা তিনি মুনাফিকদেরকে পরিচিত করেন; এবং তাদেরকে বলা হয়েছিলঃ এসো, আল্লাহর পথে সংগ্রাম কর অথবা শত্রুদেরকে প্রতিহত কর; তারা বলেছিলঃ যদি আমরা জানতাম যে, লড়াই হবে তাহলে অবশ্যই আমরা তোমাদের অনুগমন করতাম। তারা সেদিন বিশ্বাস অপেক্ষা অবিশ্বাসের নিকটবর্তী ছিল; তাদের অন্তরে যা নেই তা’ই তারা মুখে বলে থাকে; তারা যে বিষয় গোপন করে আল্লাহ তা জ্ঞাত আছেন।
ফযলুর রহমান: এবং মোনাফেকদের যাচাই করার জন্য। এই মোনাফেকদেরকে বলা হয়েছিল, “এসো, আল্লাহর পথে যুদ্ধ করো অথবা (অন্তত) প্রতিরোধ কর।” তারা বলেছিল, “আমরা যুদ্ধ হবে জানলে অবশ্যই তোমাদের অনুসরণ করতাম।” সেদিন তারা ঈমানের চেয়ে কুফরির বেশি কাছে ছিল। তারা মুখে সে কথাই বলত যা তাদের অন্তরে ছিল না। আর তারা যা গোপন করে আল্লাহ তা ভাল করেই জানেন।
মুহিউদ্দিন খান: এবং তাদেরকে যাতে সনাক্ত করা যায় যারা মুনাফিক ছিল। আর তাদেরকে বলা হল এসো, আল্লাহর রাহে লড়াই কর কিংবা শত্রুদিগকে প্রতিহত কর। তারা বলেছিল, আমরা যদি জানতাম যে, লড়াই হবে, তাহলে অবশ্যই তোমাদের সাথে থাকতাম। সে দিন তারা ঈমানের তুলনায় কুফরীর কাছাকাছি ছিল। যা তাদের অন্তরে নেই তারা নিজের মুখে সে কথাই বলে বস্তুতঃআল্লাহ ভালভাবে জানেন তারা যা কিছু গোপন করে থাকে।
জহুরুল হক: আর যেন তিনি জানতে পারেন তাদের যারা কপটতা করে, আর তাদের বলা হয়েছিল -- "এসো, আল্লাহ্র পথে যুদ্ধ করো, অথবা আত্মরক্ষা করো।" তারা বলেছিল -- "আমরা যদি যুদ্ধ করতে জানতাম তবে আমরা নিঃসন্দেহ তোমাদের অনুসরণ করতাম।" সেদিন তারা ঈমানের চাইতে অবিশ্বাসের নিকটতর হয়েছিল। তারা তাদের মুখ দিয়ে বলছিল যা তাদের অন্তরে ছিল না, আর আল্লাহ্ ভালো জানেন যা তারা লুকোচ্ছে।
Sahih International: And that He might make evident those who are hypocrites. For it was said to them, "Come, fight in the way of Allah or [at least] defend." They said, "If we had known [there would be] fighting, we would have followed you." They were nearer to disbelief that day than to faith, saying with their mouths what was not in their hearts. And Allah is most Knowing of what they conceal -
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১৬৭. আর মুনাফিকদেরপ্রকাশ করার জন্য। আর তাদেরকে বলা হয়েছিল, এস, তোমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ কর অথবা প্রতিরোধ কর’। তারা বলেছিল, যদি যুদ্ধ জানতাম তবে নিশ্চিতভাবে তোমাদের অনুসরণ করতাম। সেদিন তারা ঈমানের চেয়ে কুফরীর কাছাকাছি ছিল। যা তাদের অন্তরে নেই তারা তা মুখে বলে এবং তারা যা গোপন রাখে আল্লাহ তা অধিক অবগত।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১৬৭) এবং মুনাফিক (কপটদের)কেও জানতে পারেন।[1] আর তাদেরকে বলা হয়েছিল, এস, তোমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ কর অথবা প্রতিরক্ষা কর। তারা বলেছিল, যদি আমরা যুদ্ধ জানতাম, তাহলে নিশ্চিতভাবে তোমাদের অনুসরণ করতাম।[2] সেদিন তারা বিশ্বাস (ঈমান) অপেক্ষা অবিশ্বাসের (কুফরীর) অধিক নিকটতম ছিল।[3] যা তাদের অন্তরে নেই, তা তারা মুখে বলে।[4] আর তারা যা গোপন রাখে, আল্লাহ তা বিশেষভাবে অবহিত।
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, উহুদে তোমাদের যে ক্ষতি হয়েছে তা আল্লাহরই নির্দেশে হয়েছে। (যাতে তোমরা আগামীতে রসূল (সাঃ)-এর আনুগত্যের প্রতি যথাযথ যত্ন নাও।) এ ছাড়া এর আরো একটি উদ্দেশ্য হল, মু’মিন ও মুনাফিকদেরকে একে অপর থেকে পৃথক করা হল।
[2] যুদ্ধ জানার অর্থ হল, যদি বাস্তবিকই তুমি যুদ্ধ করতে যেতে, তাহলে আমরাও তোমার সাথে থাকতাম। কিন্তু তুমি তো নিজেকে ধ্বংসের মধ্যে ঠেলে দিতে যাচ্ছ, অতএব এ রকম ভুল কাজে আমরা তোমার সাথে কিভাবে থাকতে পারি? এই ধরনের কথা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এবং তার সাথীরা এই জন্যই বলেছিল যে, তাদের মত গ্রহণ করা হয়নি। আর এ কথা তারা তখন বলেছিল, যখন ‘শাউত্ব’ নামক স্থানে পৌঁছে তারা (যুদ্ধ না করে) প্রত্যাবর্তন করছিল এবং আব্দুল্লাহ ইবনে হারাম আনসারী তাদেরকে বুঝিয়ে যুদ্ধে শরীক করার প্রচেষ্টা করছিলেন। (এর কিছু বিস্তারিত আলোচনা পূর্বে হয়েছে।)
[3] নিজেদের মুনাফিক্বী এবং এমন কথা-বার্তার কারণে যা তারা বলেছে।
[4] অর্থাৎ, যুদ্ধ ত্যাগ করার যে কারণ মৌখিকভাবে তারা প্রকাশ করেছে, সেটা প্রকৃত কারণ নয়, বরং তাদের অন্তরে লুক্কায়িত যে কারণ ছিল তা হল, প্রথমতঃ আমাদের পৃথক হওয়ায় মুসলিমদের অন্তরে দুর্বলতার সৃষ্টি হবে। দ্বিতীয়তঃ কাফেরদের লাভ হবে। অর্থাৎ, আসল উদ্দেশ্য ছিল ইসলাম, মুসলিম এবং নবী করীম (সাঃ)-এর ক্ষতি করা।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১৬৫-১৬৮ নং আয়াতের তাফসীর:
উহুদ যুদ্ধে মুসলিমদের যেমন সত্তরজন সাহাবী শহীদ হয়েছিল, তেমনি বদর যুদ্ধে মুসলিমরাও সত্তরজন কাফিরকে হত্যা এবং সত্তরজন বন্দী করেছিলেন।
(هُوَ مِنْ عِنْدِ أَنْفُسِكُمْ)
‘ওটা তোমাদের নিজেদের নিকট থেকেই এসেছে’ অর্থাৎ তোমাদের নিজেদের ভুলের কারণে এ বিপদ এসেছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তোমাদেরকে পাহাড়ের গিরিপথ ত্যাগ না করার নির্দেশ দিয়েছিলেন; কিন্তু তোমরা নির্দেশ ভঙ্গ করে সেখান থেকে চলে এসেছিলে। এ থেকে বুঝা যাচ্ছে যে, মুসলিমরা যদি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নির্দেশ মোতাবেক না চলে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে অনুসরণ না করে তা হলে তারা কোন দিন সফলকাম হতে পারবে না।
(يَوْمَ الْتَقَي)
সম্মুখীন হবার দিন বলতে উহুদের দিনকে বুঝানো হয়েছে। এ দিন মুসলিম ও কাফির দু’দল মুখোমুখি হয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিল।
(وَلِيَعْلَمَ الَّذِيْنَ نَافَقُوْا)
অর্থাৎ উহুদে তোমাদের যে ক্ষতি হয়েছে তা আল্লাহ তা‘আলারই নির্দেশে হয়েছে। (যাতে তোমরা আগামীতে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আনুগত্যের প্রতি যতœবান হও) এ ছাড়াও এর আরো একটি উদ্দেশ্য হলো আল্লাহ তা‘আলা জানতে চান কারা প্রকৃত মু’মিন আর কারা মুনাফিক।
(لَوْ نَعْلَمُ قِتَالًا)
‘আমরা যদি যুদ্ধ হবে জানতাম’ এর অর্থ হল, যদি বাস্তবিকই তুমি যুদ্ধ করতে যেতে, তাহলে আমরাও তোমার সাথে থাকতাম। কিন্তু তুমি তো নিজেকে ধ্বংসের মধ্যে ঠেলে দিতে যাচ্ছ, অতএব এ রকম ভুল কাজে আমরা তোমার সাথে কিভাবে থাকতে পারি? এ ধরণের কথা আবদুল্লাহ বিন উবাই ও তার সাথী মুনাফিকরা বলেছিল। কারণ যুদ্ধে যাওয়ার ব্যাপারে তাদের মতামত গ্রহণ করা হয়নি। তারা মুখে যা বলে অন্তরে তা নেই। যেমন আমরা যুদ্ধ জানলে তোমাদের অনুসরণ করতাম।
এ সকল মুনাফিকরাই তাদের সঙ্গীদের বলে, তারা যদি আমাদের কথা শুনত তাহলে মারা যেত না। এসকল মুনাফিকদের জন্য রয়েছে জাহান্নাম।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. দুনিয়ার অনেক বিপদ-আপদ মানুষের পাপের কারণেই আসে, অধিকাংশই আল্লাহ তা‘আলা ক্ষমা করে দেন।
২. পৃথিবীতে যা কিছু হয় সবকিছু আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক পূর্ব নির্ধারিত।
৩. মুনাফিকরা মু’মিনদের জন্য কাফিরদের থেকে ভয়ানক।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১৬৫-১৬৮ নং আয়াতের তাফসীর:
এখানে যে বিপদের বর্ণনা দেয়া হয়েছে তা হচ্ছে উহুদ যুদ্ধের বিপদ। এ যুদ্ধে সত্তরজন সাহাবী শহীদ হন। কিন্তু মুসলমানগণ এর দ্বিগুণ বিপদ কাফিরদেরকে পৌছিয়ে ছিলেন। অর্থাৎ বদরের যুদ্ধে সত্তরজন কাফির নিহত হয়েছিল এবং সত্তরজন বন্দী হয়েছিল। মুসলমানগণ পরস্পর বলাবলি করেন যে, এ বিপদ কি করে আসলো? আল্লাহ তাআলা উত্তরে বলেন-এ বিপদ তোমাদের নিজেদের পক্ষ হতেই এসেছে। হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) বর্ণনা করেন, “বদরের যুদ্ধে মুসলমানগণ মুক্তিপণ নিয়ে যেসব কাফিরকে মুক্তি দিয়েছিলেন তারই শাস্তি স্বরূপ উহুদের যুদ্ধে সত্তরজন সাহাবীকে শহীদ করা হয়, তাদের মধ্যে পলায়নের হিড়িক পড়ে যায়, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সম্মুখের চারটি দাঁত ভেঙ্গে যায়। তার মাথার পাগড়ী পড়ে যায় এবং চেহারা মুবারক রক্তাক্ত হয়ে যায়। উক্ত আয়াতে এরই বর্ণনা রয়েছে। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম ও মুসনাদ-ই-আহমাদ) হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করেন এবং বলেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আপনার গোত্রের লোক যে কাফিরদেরকে বন্দী করেছে এটা আল্লাহ পাকের নিকট পছন্দীয় নয়। এখন দু’টি সিদ্ধান্তের মধ্যে যে কোন একটি গ্রহণের নির্দেশ দিন। হয় তারা বন্দীদেরকে হত্যা করে ফেলবে না হয় মুক্তিপণ আদায় করে ছেড়ে দেবে। কিন্তু পরে এ সংখ্যক মুসলমানও শহীদ হয়ে যাবে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুসলমানদেরকে একত্রিত করে এ দুটি সিদ্ধান্তই পেশ করেন। তাঁরা বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এরা আমাদের গোত্রীয় লোক এবং আমাদের আত্মীয়-স্বজন। সুতরাং মুক্তিপণ আদায় করে তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হোক। আর এ অর্থ দ্বারা আমরা শক্তি অর্জন করতঃ অন্যান্য শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো এবং আমাদের মধ্য হতে যে এতজন লোক শহীদ হবেন তাতে আমাদের ক্ষতি কি? এরূপে ক্ষতিপূরণ আদায় করে সত্তরজন বন্দীকে ছেড়ে দেয়া হয়। উহুদ যুদ্ধে ঠিক সত্তরজন মুসলমানই শহীদ হন। (জামেউত তিরমিযী ও সুনান-ই-নাসাঈ) সুতরাং এক ভাবার্থতো এই হলো যে, এটা স্বয়ং মুসলমানদের পক্ষ হতেই হয়েছে। অর্থাৎ তারা এই শর্তে বন্দীদেরকে মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দিতে সম্মত হয়েছিলেন যে, তাদের মধ্য হতেও এ সংখ্যক মুসলমান শহীদ হবেন এবং ঘটেছিলও তাই। দ্বিতীয় ভাবার্থ হচ্ছে“তোমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অবাধ্য হয়েছিলে বলেই তোমাদেরকে এ ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে।' তীরন্দাজগণকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের স্থান হতে সরতে নিষেধ করেছিলেন, কিন্তু ঐ নিষেধ সত্ত্বেও তারা উক্ত স্থান হতে সরে গিয়েছিলেন। আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক জিনিসের উপর সক্ষম। তিনি যা চান তাই করেন, যা ইচ্ছে করেন তাই নির্দেশ দেন। কেউ তার নির্দেশের পথে বাধা সৃষ্টি করতে পরে না। দু'টি দলের মুখখামুখী হওয়ার দিন (হে মুমিনগণ!) তোমাদের যে ক্ষতি হয়েছিল, যেমন তোমরা শত্রুদের মোকাবিলা করতে গিয়ে পলায়ন করেছিলে, তোমাদের কতক লোক শহীদ হয়েছিল এবং কিছু আহতও হয়েছিল, এ সবকিছু আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছাক্রমেই হয়েছিল। এর একটি কারণ ছিল এই যে, এর মাধ্যমে অটল ও দৃঢ় ঈমানের লোক এবং মুনাফিকদের মধ্যে পার্থক্য আনয়ন করা হয়। যেমন আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুল এবং তার সঙ্গীরা যারা রাস্তা হতে ফিরে এসেছিল। একজন মুসলমান তাদেরকে বুঝিয়ে বলেছিলেন, ‘এসো, আল্লাহর পথে যুদ্ধ কর কিংবা কমপক্ষে ঐ আক্রমণকারীদেরকে পিছনে সরিয়ে দাও।' কিন্তু তারা কৌশল করে বলে, ‘আমরা যুদ্ধবিদ্যায় মোটেই পারদর্শী নই। আমরা যুদ্ধবিদ্যা জানলে অবশ্যই তোমাদের অনুসরণ করতাম। ওরা যদি কমপক্ষে মুসলমানদের সঙ্গেও থাকতে তাহলেও কাফিরদের আক্রমণ প্রতিহত করা যেতো। কেননা এর ফলে মুসলমানদের সংখ্যা বেশী দেখানো হতো বা তারা দু'আ করতো, কিংবা প্রস্তুতি গ্রহণ করতো। তাদের উপরের কথার ভাবার্থ নিম্নরূপও বর্ণনা করা হয়েছেঃ ‘আমরা যদি জানতে পারতাম যে, সত্য সত্যই তোমরা শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে তবে অবশ্যই আমরা তোমাদের সহযোগিতা করতাম। কিন্তু আমরা জানি যে, যুদ্ধ হবেই না। সীরাত-ই-মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাকে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক হাজার লোক নিয়ে উহুদের প্রান্তরের দিকে অগ্রসর হন। পথে গিয়ে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুল বিদ্রোহী হয়ে যায় এবং বলে, রাসুলুল্লাহ (সঃ) অন্যদের কথা শুনে মদীনার বাইরে চলে আসলেন এবং আমার কথা শুনলেন না। আল্লাহর শপথ! কোন্ উপকারকে লক্ষ্য করে যে আমরা প্রাণ বিসর্জন দেবো তা আমাদের মোটেই জানা নেই। হে লোক সকল! কেন তোমরা জীবন হারাতে যাচ্ছ? কপট ও সন্দেহ পোষণকারী যত লোক। সবাই তার কথা মেনে নেয় এবং এক তৃতীয়াংশ সৈন্য নিয়ে সে দুষ্ট ফিরে আসে। বানূ সালমার ভাই হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে হারাম (রাঃ) তাদেরকে বুঝিয়ে বলেন, হে আমার গোত্র! স্বীয় নবী (সঃ)-কে ও স্বীয় সম্প্রদায়কে অপদস্থ করো না। তাদেরকে শত্রুর সম্মুকে নিক্ষেপ করে তোমরা পলায়ন করো না। কিন্তু তারা কৌশল অবলম্বন করে বলে, আমরা জানি যে যুদ্ধ হবেই না।' মুসলমানগণ তাদেরকে বুঝতে অসমর্থ হয়ে অবশেষে বলেন, “হে আল্লাহর শত্রুর দল! যাও আল্লাহ তোমাদেরকে ধ্বংস করুন! তোমাদের কোনই প্রয়োজন নেই। আল্লাহ পাক স্বীয় নবী (সঃ)-এর সাহায্যকারী। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে ছেড়ে সম্মুখে অগ্রসর হন। ইরশাদ হচ্ছে-‘সে দিন তারা বিশ্বাস অপেক্ষা অবিশ্বাসের বেশী নিকটবর্তী ছিল।' এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, মানুষের অবস্থা বিভিন্ন প্রকারের। কখনও সে কুফরীর নিকটবর্তী হয় এবং কখনও ঈমানের নিকটবর্তী। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তাদের অন্তরে যা নেই তা তারা মুখে বলে থাকে। যেমন তারা বলে থাকে-“আমরা যদি যুদ্ধ হওয়ার কথা জানতাম তবে অবশ্যই তোমাদের সঙ্গে থাকতাম। অথচ তারা নিশ্চিতরূপে জানতো যে, মুশরিকরা মুসলমানদের উপর ভীষণ আক্রমণ চালিয়ে তাদেরকে দুনিয়ার বুক হতে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার জন্যে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। কেননা, ইতিপূর্বে বদরের যুদ্ধে তাদের বড় বড় নেতারা নিহত হয়েছিল। কাজেই তারা এখন দুর্বল মুমিনদের উপর ভীষণ আক্রমণ চালিয়েছে। সুতরাং এক ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হতে যাচ্ছে। তাই মহান আল্লাহ বলেনঃ ‘তাদের অন্তরের গোপনীয় কথা আমি খুব ভালভাবেই জানি।' এ লোকগুলো ওরাই যারা তাদের ভাইদের সম্বন্ধে বলেছিল, 'যদি এরা আমাদের পরামর্শ মত কাজ করতো এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করতো তবে কখনও নিহত হতো না। এর উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যদি তোমাদের এ কথা সঠিক হয় যে, মানুষ যুদ্ধ ক্ষেত্রে উপস্থিত না হলে মৃত্যু হতে রক্ষা পেয়ে যাবে তবে তো তোমাদের না মরাই উচিত, কেননা তোমরা তো বাড়ীতেই বসে রয়েছে। কিন্তু এটা স্পষ্ট কথা যে, একদিন তোমরাও মৃত্যুবরণ করবে, যদিও সুদৃঢ় ও সুউচ্চ অট্টালিকায় আশ্রয় গ্রহণ কর। আমি তোমাদেরকে তখনই সত্যবাদী মনে করতে পারি যখন তোমরা নিজেরেদকে মৃত্যু হতে রক্ষা করতে পারবে।' হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, “এ আয়াতটি আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুল এবং তার সঙ্গীদের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।