আল কুরআন


সূরা আলে-ইমরান (আয়াত: 154)

সূরা আলে-ইমরান (আয়াত: 154)



হরকত ছাড়া:

ثم أنزل عليكم من بعد الغم أمنة نعاسا يغشى طائفة منكم وطائفة قد أهمتهم أنفسهم يظنون بالله غير الحق ظن الجاهلية يقولون هل لنا من الأمر من شيء قل إن الأمر كله لله يخفون في أنفسهم ما لا يبدون لك يقولون لو كان لنا من الأمر شيء ما قتلنا هاهنا قل لو كنتم في بيوتكم لبرز الذين كتب عليهم القتل إلى مضاجعهم وليبتلي الله ما في صدوركم وليمحص ما في قلوبكم والله عليم بذات الصدور ﴿١٥٤﴾




হরকত সহ:

ثُمَّ اَنْزَلَ عَلَیْکُمْ مِّنْۢ بَعْدِ الْغَمِّ اَمَنَۃً نُّعَاسًا یَّغْشٰی طَآئِفَۃً مِّنْکُمْ ۙ وَ طَآئِفَۃٌ قَدْ اَهَمَّتْهُمْ اَنْفُسُهُمْ یَظُنُّوْنَ بِاللّٰهِ غَیْرَ الْحَقِّ ظَنَّ الْجَاهِلِیَّۃِ ؕ یَقُوْلُوْنَ هَلْ لَّنَا مِنَ الْاَمْرِ مِنْ شَیْءٍ ؕ قُلْ اِنَّ الْاَمْرَ کُلَّهٗ لِلّٰهِ ؕ یُخْفُوْنَ فِیْۤ اَنْفُسِهِمْ مَّا لَا یُبْدُوْنَ لَکَ ؕ یَقُوْلُوْنَ لَوْ کَانَ لَنَا مِنَ الْاَمْرِ شَیْءٌ مَّا قُتِلْنَا هٰهُنَا ؕ قُلْ لَّوْ کُنْتُمْ فِیْ بُیُوْتِکُمْ لَبَرَزَ الَّذِیْنَ کُتِبَ عَلَیْهِمُ الْقَتْلُ اِلٰی مَضَاجِعِهِمْ ۚ وَ لِیَبْتَلِیَ اللّٰهُ مَا فِیْ صُدُوْرِکُمْ وَ لِیُمَحِّصَ مَا فِیْ قُلُوْبِکُمْ ؕ وَ اللّٰهُ عَلِیْمٌۢ بِذَاتِ الصُّدُوْرِ ﴿۱۵۴﴾




উচ্চারণ: ছুম্মা আনযালা ‘আলাইকুম মিম বা‘দিল গামমি আমানাতান নু‘আ-ছাইঁ ইয়াগশাতাইফাতাম মিনকুম ওয়া তাইফাতুন কাদ আহাম্মাতহুম আনফছুহুম ইয়াজুন্নূনা বিল্লা-হি গাইরাল হাক্কিজান্নাল জা-হিলিইইয়াতি ইয়াকূলূনা হাল্লানা-মিনাল আমরি মিন শাইইন কুল ইন্নাল আমরা কুল্লাহূলিল্লা-হি ইউখফূনা ফীআনফুছিহিম মা-লাইউবদূ না লাকা ইয়াকূলূনা লাও কা-না লানা-মিনাল আমরি শাইউম মা-কুতিলনা-হাহুনা-কুল্লাও কুনতুম ফী বুয়ূতিকুম লাবারাযাল্লাযীনা কুতিবা ‘আলাইহিমুল কাতলুইলামাদা-জি‘ইহিম ওয়া লিইয়াবতালিইয়াল্লা-হু মা-ফী সুদূ রিকুম ওয়ালিইউমাহহিসা মাফী কুলূবিকুম ওয়াল্লা-হু ‘আলীমুম বিযা-তিসসুদূ র।




আল বায়ান: তারপর তিনি তোমাদের উপর দুশ্চিন্তার পর নাযিল করলেন প্রশান্ত তন্দ্রা, যা তোমাদের মধ্য থেকে একদলকে ঢেকে ফেলেছিল, আর অপরদল নিজরাই নিজদেরকে চিন্তাগ্রস্ত করেছিল। তারা আল্লাহ সম্পর্কে জাহিলী ধারণার ন্যায় অসত্য ধারণা পোষণ করছিল। তারা বলছিল, ‘আমাদের কি কোন বিষয়ে অধিকার আছে’? বল, ‘নিশ্চয় সব বিষয় আল্লাহর’। তারা তাদের অন্তরে লুকিয়ে রাখে এমন বিষয় যা তোমার কাছে প্রকাশ করে না। তারা বলে, ‘যদি কোন বিষয়ে আমাদের অধিকার থাকত, তাহলে আমাদেরকে এখানে হত্যা করা হত না’। বল, ‘তোমরা যদি তোমাদের ঘরে থাকতে তাহলেও যাদের ব্যাপারে নিহত হওয়া অবধারিত রয়েছে, অবশ্যই তারা তাদের নিহত হওয়ার স্থলের দিকে বের হয়ে যেত। আর যাতে তোমাদের মনে যা আছে আল্লাহ তা পরীক্ষা করেন এবং তোমাদের অন্তরসমূহে যা আছে তা পরিষ্কার করেন। আর আল্লাহ তোমাদের অন্তরের বিষয় সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞাত’।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৫৪. তারপর দুঃখের পর তিনি তোমাদেরকে তন্দ্রারূপে প্রশান্তি, যা তোমাদের একদলকে আচ্ছন্ন করেছিল(১) এবং একদল জাহিলী যুগের অজ্ঞের ন্যায় আল্লাহ্‌ সম্বন্ধে অবাস্তব ধারণা করে নিজেরাই নিজেদেরকে উদ্বিগ্ন করেছিল এ বলে যে, আমাদের কি কোন কিছু করার আছে? বলুন, সব বিষয় আল্লাহরই ইখতিয়ারে। যা তারা আপনার কাছে প্রকাশ করে না, তারা তাদের অন্তরে সেগুলো গোপন রাখে। তারা বলে, এ ব্যাপারে আমাদের কোন কিছু করার থাকলে আমরা এখানে নিহত হতাম না(২)। বলুন, যদি তোমরা তোমাদের ঘরে অবস্থান করতে তবুও নিহত হওয়া যাদের জন্য অবধারিত ছিল তারা নিজেদের মৃত্যুস্থানে বের হত। এটা এজন্যে যে, আল্লাহ তোমাদের অন্তরে যা আছে তা পরীক্ষা করেন এবং তোমাদের মনে যা আছে তা পরিশোধন করেন। আর অন্তরে যা আছে সে সম্পর্কে আল্লাহ বিশেষভাবে অবগত।




তাইসীরুল ক্বুরআন: অতঃপর কষ্টের পর আল্লাহ তোমাদের প্রতি শান্তি-তন্দ্রা প্রেরণ করলেন, যা তোমাদের একদলকে আচ্ছন্ন করল এবং অন্যদল মূর্খের মতো আল্লাহর প্রতি কুধারণা পোষণ করতঃ নিজেরাই নিজেদের জীবনকে উদ্বেগাকুল করে বলল, কাজ-কর্মের ব্যাপারে (সিদ্ধান্ত গ্রহণের) আমাদের কিছুমাত্র অধিকার আছে কি? বল, ‘সমস্তই আল্লাহর নিরঙ্কুশ অধিকারভুক্ত’। তারা এমন সব কথা অন্তরে পোষণ করে- যা তোমার কাছে প্রকাশ করে না। তারা বলে, ‘যদি মতামত প্রদানের অধিকার আমাদের কিছুমাত্রও থাকত, তাহলে আমরা এ স্থলে নিহত হতাম না’। বলে দাও, ‘যদি তোমরা তোমাদের ঘরেও থাকতে, তথাপি যাদের ভাগ্যে মৃত্যু লেখা ছিল, তারা তাদের এ মৃত্যুশয্যার পানে বের হয়ে পড়ত’। এবং এজন্যও যে আল্লাহ তোমাদের অন্তরের ভেতরের বিষয়গুলো পরীক্ষা করেন এবং তোমাদের অন্তরস্থ বিষয়গুলোকে পরিষ্কার করেন, বস্তুতঃ আল্লাহ সকলের অন্তরের কথা সম্পর্কে বিশেষভাবে অবহিত।




আহসানুল বায়ান: (১৫৪) অতঃপর তিনি তোমাদেরকে দুঃখের পর তন্দ্রারূপে নিরাপত্তা (ও শান্তি) প্রদান করলেন, যা তোমাদের একদলকে আচ্ছন্ন করেছিল। [1] আর একদল ছিল যারা নিজেদের জান নিয়েই ব্যস্ত ছিল। [2] প্রাগ্-ইসলামী অজ্ঞদের ন্যায় আল্লাহ সম্বন্ধে কুধারণা পোষণ করেছিল। [3] তারা বলেছিল যে, ‘এ বিষয়ে আমাদের কি কোন এখতিয়ার আছে?’[4] বল, ‘সমস্ত বিষয় আল্লাহরই এখতিয়ারভুক্ত।’[5] তারা তাদের অন্তরে এমন কিছু গোপন রাখে, যা তোমার নিকট প্রকাশ করে না।[6] তারা বলে, ‘যদি এ ব্যাপারে আমাদের কোন এখতিয়ার থাকত, তাহলে আমরা এখানে নিহত হতাম না।’[7] বল, ‘যদি তোমরা তোমাদের গৃহে অবস্থান করতে তবুও নিহত হওয়া যাদের ভাগ্যে অবধারিত ছিল, তারা নিজেদের বধ্যভূমিতে এসে উপস্থিত হত।’[8] তা এ জন্য যে, যাতে আল্লাহ তোমাদের অন্তরে যা আছে, তা পরীক্ষা করেন ও তোমাদের হৃদয়ে যা (কালিমা) আছে, তা পরিশুদ্ধ করেন।[9] আর অন্তরে যা আছে, সে সম্পর্কে আল্লাহ বিশেষভাবে অবহিত।[10]



মুজিবুর রহমান: অনন্তর তিনি দুঃখের পরে তোমাদের উপর শান্তি অবতরণ করলেন, তা ছিল তন্দ্রা, যা তোমাদের এক দলকে তন্দ্রাচ্ছন্ন করেছিল, আর একদল নিজেদের জীবনের জন্য চিন্তা করছিল; তারা আল্লাহ সম্বন্ধে অজ্ঞতার অনুরূপ ধারণা পোষণ করছিল। তারা বলেছিলঃ এ বিষয়ে কি আমাদের কোন অধিকার নেই? তুমি বলঃ সকল বিষয়ে আল্লাহর অধিকার। তারা নিজেদের অন্তরে যা গোপন রাখে তা তোমার নিকট প্রকাশ করেনা; তারা বলেঃ যদি এ বিষয়ে আমাদের কোন অধিকার থাকতো তাহলে এখানে আমরা নিহত হতামনা। তুমি বলঃ যদি তোমরা তোমাদের গৃহের মধ্যেও থাকতে তবুও যাদের প্রতি মৃত্যু বিধিবদ্ধ হয়েছে তারা নিশ্চয়ই স্বীয় মৃত্যু স্থানে এসে উপস্থিত হত; তোমাদের অন্তরের মধ্যে যা আছে, আল্লাহ তা পরীক্ষা করে থাকেন; এবং আল্লাহ মনের অন্তর্নিহিত ভাব জ্ঞাত আছেন।



ফযলুর রহমান: অতঃপর তিনি তোমাদেরকে কষ্টের পর শান্তিময় তনদ্রা দান করেন যা তোমাদের একদলকে আচ্ছন্ন করেছিল। আরেকদল কেবল নিজেদের নিয়েই ভেবেছিল। এরা আল্লাহ সম্পর্কে অন্যায়ভাবে অজ্ঞতার ধারণা পোষণ করছিল। তারা বলছিল, “বিষয়টিতে আমাদের কি কিছু করার আছে?” বল, “পুরো বিষটিই আল্লাহর (হাতে)।” তারা তাদের মনে কিছু একটা লুকাচ্ছিল যা তোমার কাছে প্রকাশ করছিল না। তারা বলছিল, “বিষয়টিতে যদি আমাদের কিছু করার থাকত তাহলে এখানে আমরা (এভাবে) নিহত হতাম না।” বল, “তোমরা যদি তোমাদের ঘরেও থাকতে তবুও যাদের নিহত হওয়া নির্ধারিত ছিল তারা তাদের মৃত্যুর জায়গায় বেরিয়ে আসত।” আসলে আল্লাহ চেয়েছেন তোমাদের মনে যা আছে তা পরীক্ষা করতে এবং তোমাদের অন্তরে যা আছে তা শোধন করতে। আল্লাহ (সকলের) মনের কথা ভালভাবে জানেন।



মুহিউদ্দিন খান: অতঃপর তোমাদের উপর শোকের পর শান্তি অবতীর্ণ করলেন, যা ছিল তন্দ্রার মত। সে তন্দ্রায় তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ ঝিমোচ্ছিল আর কেউ কেউ প্রাণের ভয়ে ভাবছিল। আল্লাহ সম্পর্কে তাদের মিথ্যা ধারণা হচ্ছিল মুর্খদের মত। তারা বলছিল আমাদের হাতে কি কিছুই করার নেই? তুমি বল, সবকিছুই আল্লাহর হাতে। তারা যা কিছু মনে লুকিয়ে রাখে-তোমার নিকট প্রকাশ করে না সে সবও। তারা বলে আমাদের হাতে যদি কিছু করার থাকতো, তাহলে আমরা এখানে নিহত হতাম না। তুমি বল, তোমরা যদি নিজেদের ঘরেও থাকতে তবুও তারা অবশ্যই বেরিয়ে আসত নিজেদের অবস্থান থেকে যাদের মৃত্যু লিখে দেয়া হয়েছে। তোমাদের বুকে যা রয়েছে তার পরীক্ষা করা ছিল আল্লাহর ইচ্ছা, আর তোমাদের অন্তরে যা কিছু রয়েছে তা পরিষ্কার করা ছিল তাঁর কাম্য। আল্লাহ মনের গোপন বিষয় জানেন।



জহুরুল হক: তারপর বিষাদের পরে তিনি তোমাদের উপরে বর্ষণ করলেন নিরাপত্তা, তোমাদের একদলের উপরে নেমে এল প্রশান্তি, আর অন্য এক দলের নিজেদের মন তাদের উৎকতি করেছিল, তারা আল্লাহ্ সন্বন্ধে অজ্ঞানতাকালীন সন্দেহপ্রবণতায় সন্দিহান হয়েছিল অসঙ্গতভাবে। তারা বলছিল -- "এই ব্যাপারে আমাদের কি কোনো কিছু আছে?" বলো -- "নিঃসন্দেহ ব্যাপারটি সর্বতোভাবে আল্লাহ্‌র।" তারা তাদের নিজেদের মধ্যে যা লুকিয়ে রেখেছে তা তোমার কাছে প্রকাশ করছে না, তারা বলছিল -- "এই ব্যাপারে যদি আমাদের কিছু থাকতো তবে এখানে আমাদের কাতল করা হতো না।" তুমি বলো -- "তোমরা যদি তোমাদের বাড়ির ভিতরেও থাকতে তথাপি যাদের জন্য প্রাণঘাত লিখিত হয়েছে তারা নিশ্চয়ই তাদের নির্ধারিত-স্থলে গিয়ে হাজির হতো।" আর আল্লাহ্ যেন যাচাই করতে পারেন কি আছে তোমাদের বুকের ভেতরে, আর যেন নিংড়ে বের করে দিতে পারেন যা আছে তোমাদের অন্তরে। আর বুকের ভেতরে যা আছে সে-সন্বন্ধে আল্লাহ্ সর্বজ্ঞাতা।



Sahih International: Then after distress, He sent down upon you security [in the form of] drowsiness, overcoming a faction of you, while another faction worried about themselves, thinking of Allah other than the truth - the thought of ignorance, saying, "Is there anything for us [to have done] in this matter?" Say, "Indeed, the matter belongs completely to Allah." They conceal within themselves what they will not reveal to you. They say, "If there was anything we could have done in the matter, some of us would not have been killed right here." Say, "Even if you had been inside your houses, those decreed to be killed would have come out to their death beds." [It was] so that Allah might test what is in your breasts and purify what is in your hearts. And Allah is Knowing of that within the breasts.



তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ: কোনো তথ্য নেই।


তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১৫৪. তারপর দুঃখের পর তিনি তোমাদেরকে তন্দ্রারূপে প্রশান্তি, যা তোমাদের একদলকে আচ্ছন্ন করেছিল(১) এবং একদল জাহিলী যুগের অজ্ঞের ন্যায় আল্লাহ্– সম্বন্ধে অবাস্তব ধারণা করে নিজেরাই নিজেদেরকে উদ্বিগ্ন করেছিল এ বলে যে, আমাদের কি কোন কিছু করার আছে? বলুন, সব বিষয় আল্লাহরই ইখতিয়ারে। যা তারা আপনার কাছে প্রকাশ করে না, তারা তাদের অন্তরে সেগুলো গোপন রাখে। তারা বলে, এ ব্যাপারে আমাদের কোন কিছু করার থাকলে আমরা এখানে নিহত হতাম না(২)। বলুন, যদি তোমরা তোমাদের ঘরে অবস্থান করতে তবুও নিহত হওয়া যাদের জন্য অবধারিত ছিল তারা নিজেদের মৃত্যুস্থানে বের হত। এটা এজন্যে যে, আল্লাহ তোমাদের অন্তরে যা আছে তা পরীক্ষা করেন এবং তোমাদের মনে যা আছে তা পরিশোধন করেন। আর অন্তরে যা আছে সে সম্পর্কে আল্লাহ বিশেষভাবে অবগত।


তাফসীর:

(১) অর্থাৎ এ কঠিন বিপদের সময় তাদের উপর তন্দ্রা নেমে এসে তাদেরকে প্রশান্ত করে দিচ্ছিল। আবু তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমরা ওহুদের দিন কাতারবন্দী অবস্থাতেই তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ছিলাম। এমনকি আমাদের হাত থেকে তরবারী পড়ে যাচ্ছিল আর আমি বারবার তা উঠিয়ে নিচ্ছিলাম। [বুখারী ৪৫৬২] আর এটাই আল্লাহর বাণী “তারপর দুঃখের পর তিনি তোমাদেরকে প্রদান করলেন তন্দ্রারূপে প্রশান্তি, যা তোমাদের একদলকে আচ্ছন্ন করেছিল, এবং একদল জাহিলী যুগের অজ্ঞের ন্যায় আল্লাহ সম্বন্ধে অবাস্তব ধারণা করে নিজেরাই নিজেদেরকে উদ্বিগ্ন করেছিল” এর তাৎপর্য। আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, যুদ্ধের মধ্যে তন্দ্রাচ্ছন্ন হওয়া আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর সালাতের মধ্যে শয়তানের পক্ষ থেকে হয়। [ইবন আবী হাতেম আত-তাফসীরুস সহীহ]


(২) এখানে আরেক দল বলে মুনাফিকদের বুঝানো হয়েছে। তারা নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত ছিল। তারা সবচেয়ে ভীতু ও কাপুরুষ ও হকের বিপরীতে অবস্থানকারী সম্প্রদায় ছিল। [তাবারী] আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, যুবাইর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেনঃ উহুদের যুদ্ধের দিন আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ছিলাম, আল্লাহ আমাদের উপর ঘুম পাঠালেন, আমাদের প্রত্যেকের থুতনি বুকে লেগে যাচ্ছিল। আল্লাহর শপথ আমি যেন মু'আত্তাব ইবনে কুসাইরের কথা স্বপ্নের মাঝে শুনছিলাম। সে বলছিলঃ ‘এ ব্যাপারে আমাদের কোন কিছু করার থাকলে আমরা এখানে নিহত হতাম না’ এ ব্যাপারেই আল্লাহর উপরোক্ত বাণী নাযিল হয়। [আল-আহাদিসুল মুখতারাহঃ ৩/৬০, ৮৬৪]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১৫৪) অতঃপর তিনি তোমাদেরকে দুঃখের পর তন্দ্রারূপে নিরাপত্তা (ও শান্তি) প্রদান করলেন, যা তোমাদের একদলকে আচ্ছন্ন করেছিল। [1] আর একদল ছিল যারা নিজেদের জান নিয়েই ব্যস্ত ছিল। [2] প্রাগ্-ইসলামী অজ্ঞদের ন্যায় আল্লাহ সম্বন্ধে কুধারণা পোষণ করেছিল। [3] তারা বলেছিল যে, ‘এ বিষয়ে আমাদের কি কোন এখতিয়ার আছে?’[4] বল, ‘সমস্ত বিষয় আল্লাহরই এখতিয়ারভুক্ত।’[5] তারা তাদের অন্তরে এমন কিছু গোপন রাখে, যা তোমার নিকট প্রকাশ করে না।[6] তারা বলে, ‘যদি এ ব্যাপারে আমাদের কোন এখতিয়ার থাকত, তাহলে আমরা এখানে নিহত হতাম না।’[7] বল, ‘যদি তোমরা তোমাদের গৃহে অবস্থান করতে তবুও নিহত হওয়া যাদের ভাগ্যে অবধারিত ছিল, তারা নিজেদের বধ্যভূমিতে এসে উপস্থিত হত।’[8] তা এ জন্য যে, যাতে আল্লাহ তোমাদের অন্তরে যা আছে, তা পরীক্ষা করেন ও তোমাদের হৃদয়ে যা (কালিমা) আছে, তা পরিশুদ্ধ করেন।[9] আর অন্তরে যা আছে, সে সম্পর্কে আল্লাহ বিশেষভাবে অবহিত।[10]


তাফসীর:

[1] উল্লিখিত চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতির পর আল্লাহ তাআলা মুসলিমদের উপর পুনরায় অনুগ্রহ করলেন এবং তাঁদের মধ্যে যাঁরা যুদ্ধের ময়দানে অবশিষ্ট ছিলেন, তাঁদের উপর তন্দ্রার ভাব সৃষ্টি করে দিলেন। আর এই তন্দ্রা (ঢুল) ছিল আল্লাহর পক্ষ হতে প্রশান্তি এবং সাহায্যের দলীল। আবূ ত্বালহা (রাঃ) বলেন, আমিও তাঁদের একজন, যাঁদের উপর উহুদের দিন তন্দ্রার ভাব সৃষ্টি হয়েছিল। এমন কি আমার তরবারি কয়েকবার আমার হাত থেকে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল, আর আমি ধরে নিয়েছিলাম। (সহীহ বুখারী) نُعَاسًا হল أَمَنَةً শব্দের বদল (পরিবর্ত শব্দ)। طَائِفَةٌ একবচন এবং বহুবচন উভয় ক্ষেত্রেই ব্যবহার হয়। (ফাতহুল ক্বাদীর)

[2] এ থেকে মুনাফিকদেরকে বুঝানো হয়েছে। প্রকাশ থাকে যে, এ রকম কঠিন পরিস্থিতিতে তারা কেবল নিজেদের প্রাণ নিয়েই চিন্তিত ছিল।

[3] যেমন ভাবত যে, নবী করীম (সাঃ)-এর সম্পূর্ণ ব্যাপারটাই মিথ্যা। তিনি যে দ্বীনের প্রতি আহবান করেন, তার ভবিষ্যৎ আশঙ্কাজনক। তিনি তো আল্লাহর সহযোগিতা থেকেই বঞ্চিত ইত্যাদি ইত্যাদি।

[4] অর্থাৎ, আমাদের জন্য কি আল্লাহর পক্ষ হতে আর কোন বিজয় ও সহযোগিতার সম্ভাবনা আছে? অথবা আমাদের কি কোন কথা চলতে পারে এবং মেনে নেওয়া যেতে পারে?

[5] তোমাদের কিংবা শত্রুদের এখতিয়ারে কিছুই নেই। সাহায্য-সহযোগিতা তাঁর পক্ষ থেকেই আসবে, সফলতা তিনিই দান করবেন এবং আদেশ-নিষেধ কেবল তাঁরই চলবে।

[6] নিজেদের অন্তরে মুনাফিক্বী গোপন রেখে ভাব এমন দেখাত যে, তারা পথ নির্দেশের মুখাপেক্ষী।

[7] এটা তারা আপোসে বলাবলি করত অথবা মনে মনে বলত।

[8] মহান আল্লাহ বললেন, এই ধরনের কথার লাভ কি? যেভাবেই হোক না কেন, মৃত্যু তো আসবেই এবং তা সেই স্থানেই আসবে, যেখানে আল্লাহর পক্ষ হতে লিখে দেওয়া হয়েছে। যদি তোমরা নিজেদের বাড়িতে অবস্থান কর, আর তোমাদের মৃত্যু কোন যুদ্ধের ময়দানে লিখা থাকে, তাহলে আল্লাহ কর্তৃক এই ফায়সালা তোমাদেরকে সেখানেই টেনে নিয়ে যাবে।

[9] (যুদ্ধের ময়দানে) যা কিছু ঘটেছে তার পিছনে একটি উদ্দেশ্য ছিল, তোমাদের অন্তরে বিদ্যমান ঈমানকে পরীক্ষা করা (যাতে মুনাফিকরা তোমাদের থেকে পৃথক হয়ে যায়) এবং তোমাদের অন্তঃকরণকে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে পবিত্র করা।

[10] অর্থাৎ, খাঁটি মুসলিম কে এবং মুনাফিক হয়ে বাহ্যিকভাবে ইসলামের পোশাক কে পরে আছে, তা তো তিনি জানেন। জিহাদের বিভিন্ন কৌশলের মধ্যে এটাও একটি কৌশল যে, এতে মু’মিন ও মুনাফিকের প্রকৃত রূপ বিকশিত হয়ে সামনে চলে আসে; ফলে সাধারণ মানুষও তাদেরকে দেখে ও চিনে নিতে পারে।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১৫৪-১৫৫ নং আয়াতের তাফসীর:



অত্র আয়াতসমূহে আল্লাহ তা‘আলা উহুদের ময়দানে মুসলিম মুজাহিদদের ওপর যে অনুগ্রহ করেছিলেন তার দৃশ্যপট তুলে ধরেছেন।



মুসলিম মুজাহিদদের চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতির পর আল্লাহ তা‘আলা তাদের ওপর তন্দ্রাভাব সৃষ্টি করে দিলেন। এ তন্দ্রা ছিল আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে প্রশান্তি এবং সাহায্য। আবূ তালহা (রাঃ) বলেন, আমিও তাদের মধ্যে একজন যাদের ওপর উহুদের দিন তন্দ্রা ভাব সৃষ্টি হয়েছিল। এমনকি আমার তরবারী কয়েকবার আমার হাত থেকে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। আর আমি তা ধরে রেখেছিলাম। (সহীহ বুখারী হা: ৪০৬৮)



(وَطَا۬ئِفَةٌ أخري)



‘অন্য আরেকটি দল’, এর দ্বারা মুনাফিকদেরকে বুঝানো হয়েছে। প্রকাশ থাকে যে, কঠিন পরিস্থিতিতে তারা কেবল নিজেদের প্রাণ নিয়েই চিন্তিত ছিল।



(ظَنَّ الْجَاهِلِيَّةِ)



জাহিলী ধারণা, যেমন তারা ধারণা করত যে, নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ব্যাপারটাই সম্পূর্ণ মিথ্যা। তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে দীনের প্রতি আহ্বান করেন, তার ভবিষ্যৎ আশঙ্কাজনক। তিনি তো আল্লাহ তা‘আলার সহযোগিতা থেকেই বঞ্চিত ইত্যাদিকে বুঝানো হয়েছে।



জুবাইর (রাঃ) বলেন, যখন আমাদের কঠিন ভয় ছিল তখনও আমরা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে ছিলাম। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা আমাদের ওপর তন্দ্রা দিলেন। এ তন্দ্রার ফলে আমাদের প্রত্যেকেরই চিবুকগুলো বক্ষের সাথে লেগে যায়।



জুবাইর (রাঃ) বলেন, আমি সে অবস্থায় মুত‘আব বিন কুশাইবের নিম্নের উক্তি শুনতে পাই, যদি আমার সামান্য কিছু অধিকার থাকত তবে এখানে নিহত হতাম না। তখন এ ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা নাযিল করেন:



(لَوْ كَانَ لَنَا مِنَ الْأَمْرِ شَيْءٌ مَّا قُتِلْنَا هٰهُنَا)



আল্লাহ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলে দিলেন: বলে দাও! যদি তোমরা বাড়িতে অবস্থান কর আর যদি তোমাদের ভাগ্যে মৃত্যু অবধারিত থাকে তাহলে সেখানেই মৃত্যু পৌঁছবে।



(إِنَّ الَّذِيْنَ تَوَلَّوْا مِنْكُمْ يَوْمَ الْتَقَي الْجَمْعٰنِ)



“নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে যারা দুদলের সম্মুখীন হবার দিন পশ্চাদবর্তিত হয়েছিল” দুদলের সম্মুখীন হবার দিন বলতে বদরের দিনকে বুঝানো হয়েছে।



উসমান বিন মাওহাব (রহঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন: হাজ্জ পালনের উদ্দেশ্যে একজন ব্যক্তি বাইতুল্লাহয় এসে সেখানে একদল লোককে উপবিষ্ট অবস্থায় দেখে জিজ্ঞাসা করলেন: এ উপবিষ্ট লোকগুলো কারা? তারা বললেন: এরা হচ্ছেন কুরাইশ গোত্রের লোক। লোকটি আবার জিজ্ঞাসা করলেন: এ বৃদ্ধ লোকটি কে? তারা বললেন: ইনি হচ্ছেন ইবনু উমার (রাঃ)। তখন লোকটি তাঁর কাছে গিয়ে বললেন; আমি আপনাকে কিছু কথা জিজ্ঞাসা করব, আপনি আমাকে বলে দেবেন কি? এরপর লোকটি বললেন: আমি আপনাকে এ ঘরের রবের কসম দিয়ে বলছি উহুদের দিন উসমান বিন আফফান (রাঃ) পালিয়েছিলেন- এ কথা আপনি কি জানেন? তিনি বললেন: হ্যাঁ। লোকটি বললেন: তিনি বদরে অনুপস্থিত ছিলেন, যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি- এ কথাও জানেন? তিনি বললেন হ্যাঁ। লোকটি বললেন: তিনি বাইআতে রিদওয়ানে অনুপস্থিত ছিলেন- এ কথা আপনি জানেন? তিনি বললেন: হ্যাঁ। বর্ণনাকারী বলেন: লোকটি তখন আল্লাহু আকবার ধ্বনি উচ্চারণ করল। তখন ইবনু উমার (রাঃ) বললেন: এসো, এখন আমি তোমাকে সব ব্যাপার জানিয়ে দিই এবং তোমার প্রশ্নগুলোর উত্তর বলে দিই। ১. উহুদের দিন তাঁর পালানো সম্বন্ধে আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ তা‘আলা তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। ২. বদরের দিন অনুপস্থিতির কারণ হলো তাঁর স্ত্রী রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কন্যা অসুস্থ ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে বলেছিলেন: যারা বদরের যুদ্ধে উপস্থিত হয়েছে তাদের মত একজনের প্রতিদান ও গনীমত তুমিও পাবে। ৩. বাইয়াতে রিদওয়ানে অনুপস্থিতির কারণ হলো রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উসমানকে মক্কাবাসীর কাছে প্রেরণ করেছিলেন, যদি মক্কাবাসীর সাথে উসমানের চেয়ে কারো বেশি সম্পর্ক থাকত তাহলে তাকেই পাঠাতেন। বাইয়াতে রিদওয়ান হয়েছিলো উসমান (রাঃ) যাওয়ার পর। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ডান হাত বাম হাতের ওপর রেখে বললেন: এটা উসমানের হাত। ইবনু উমার (রাঃ) বললেন: এখন তুমি যেতে পার। (সহীহ বুখারী হা: ৪৬৬০)



সুতরাং বদরের যুদ্ধে পলায়নকারীদের মধ্যে উসমান (রাঃ) ছিলেন না।



আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদেরকে শত্র“দের ওপর সর্বদা বিজয় দান করেন।

২. আল্লাহ তা‘আলা তার শত্র“দের অপমানিত করেন পরাজয়ের মাধ্যমে।

৩. তাকদীরের ভাল-মন্দের প্রতি বিশ্বাস রাখা আবশ্যক।

৪. আল্লাহ তা‘আলার প্রতিটি কাজ হিকমাতপূর্ণ।

৫. উসমান (রাঃ) এর ব্যাপারে কারো কোন খারাপ ধারণা রাখার সুযোগ নেই।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১৫৪-১৫৫ নং আয়াতের তাফসীর:

মহান আল্লাহ স্বীয় বান্দাদের উপর সেই দুঃখ ও চিন্তার সময় যে অনুগ্রহ করেছিলেন এখানে তারই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তিনি তাদেরকে তন্দ্রাভিভূত করেছিলেন। অস্ত্র-শস্ত্র হাতে রয়েছে এবং শত্রু সম্মুখে বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু অন্তরে এত শান্তি রয়েছে যে, চক্ষু তন্দ্রায় ঢলে পড়েছে`যা শান্তি ও নিরাপত্তার লক্ষণ। যেমন সূরা-ই-আনফালের মধ্যে বদরের ঘটনায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ তার পক্ষ হতে শান্তিরূপে যখন তন্দ্রা তোমাদেরকে আচ্ছন্ন করে। (৮:১১) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ ‘যুদ্ধের সময় যে তন্দ্রা আসে তা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে এসে থাকে এবং নামাযের সময় যে তন্দ্রা আসে তা শয়তানের পক্ষ হতে আসে।' হযরত আবু তালহা (রাঃ) বলেনঃ ‘উহুদের যুদ্ধের দিন আমার চক্ষে এত বেশী তন্দ্রা এসেছিল যে, আমার হাত হতে তরবারী বারবার ছুটে গিয়েছিল। তিনি আরও বলেনঃ ‘আমি চক্ষু উঠিয়ে দেখি যে, প্রায় সবারই ঐরূপ অবস্থাই ছিল। তবে অবশ্যই একটি দল এরূপও ছিল যাদের অন্তর ছিল কপটতায় পরিপূর্ণ এবং তারা ছিল সদা ভীত-সন্ত্রস্ত। তাদের কুধারণা শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল। অতএব বিশ্বস্ত আল্লাহর উপর নির্ভরশীল এবং সত্যপন্থী লোকদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, আল্লাহ পাক অবশ্যই তাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তারা অবশ্যই সফলকাম হবে। কিন্তু কপট সন্দেহ পোষণকারী এবং টলমলে ঈমানের লোকদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত বিস্ময়কর। তাদের প্রাণ শাস্তির মধ্যে নিমজ্জিত ছিল। তারা সদা হায় হায় করছিল এবং তাদের অন্তরে বিভিন্ন প্রকারের কুমন্ত্রণা ঢুকে পড়েছিল। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, তারা মরতে চলেছে। তাদের অন্তরে বিশ্বাসও বদ্ধমূল হয়েছিল যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং মুমিনগণ আর দুনিয়ায় থাকবে না। কাজেই বাঁচার কোন উপায় নেই। প্রকৃতপক্ষে মুনাফিকদের অবস্থা এই হয় যে, যেখানেই তারা সামান্য নিম্নভূমি দেখে, তাদের নৈরাশ্যের ঘনঘটা তাদেরকে ঘিরে নেয়। পক্ষান্তরে ঈমানদারগণ মন্দ হতে মন্দতম অবস্থাতেও আল্লাহ তা'আলার প্রতি ভাল ধারণাই রাখেন। মুনাফিকদের মনের ধারণা ছিল এই যে, যদি তাদের কোন অধিকার থাকতো তবে তারা সেদিনের মৃত্যু হতে রক্ষা পেয়ে যেতো এবং তারা গোপনে ওটা বলতোও বটে। হযরত যুবায়ের (রাঃ) বলেনঃ ‘ঐ কঠিন ভয়ের সময়েও আমাদেরকে এত ঘুম পেয়ে বসে যে, আমাদের চিবুকগুলো বক্ষের সাথে লেগে যায়। আমি আমার সে অবস্থাতেই মু’তাব ইবনে কুশায়েরের নিম্নের উক্তি শুনতে পাইঃ যদি আমার সামান্য কিছু অধিকার থাকতো তবে এখানে নিহত হতাম না। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকেই বলছেনঃ মৃত্যু তো আল্লাহ কর্তৃক ভাগ্যে লিখিত রয়েছে। মৃত্যুর সময় পরিবর্তিত হতে পারে না। তোমরা যদি বাড়ীতেও অবস্থান করতে, তথাপি এখানে যার ভাগ্যে মৃত্যু লিখা রয়েছে সে অবশ্যই বাড়ী ছেড়ে এখানে চলে আসতো। ফলে আল্লাহ কর্তৃক ভাগ্য লিখন পূর্ণ হয়ে যেতো। এ সময়টি এ জন্যেই ছিল যে, যেন আল্লাহ তোমাদের অন্তরের গোপন কথা প্রকাশ করে দেন। এ পরীক্ষা দ্বারা ভাল-মন্দ, সৎ ও অসতের মধ্যে প্রভেদ হয়ে গেল। যে আল্লাহ তাআলা অন্তরের গোপন কথা অবগত আছেন তিনি এ সামান্য ঘটনা দ্বারা মুনাফিকদেরকে প্রকাশ করে দিলেন এবং মুসলামনদেরও স্পষ্ট পরীক্ষা হয়ে গেল। এখন আল্লাহ পাক খাটি মুসলমানদের পদস্খলনের বর্ণনা দিচ্ছেন যা মানবীয় দুর্বলতার কারণে তাদের দ্বারা সাধিত হয়েছিল। শয়তানই তাদের এ পদস্খলন ঘটিয়েছিল এবং প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল তাদের কর্মেরই ফল। তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অবাধ্যও হতো না এবং তাদের পদগুলো টলমলও করতো না। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ক্ষমার যোগ্য মনে করতঃ ক্ষমা করে দিয়েছেন। আল্লাহ পাকের কাজই হচ্ছে ক্ষমা করে দেয়া। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, হযরত উসমান (রাঃ) প্রভৃতির ঐ অপরাধকে আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করে দিয়েছেন। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, হযরত ওলীদ ইবনে উকবা (রাঃ) একদা হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ)-কে বলেনঃ ‘শেষ পর্যন্ত আপনি আমীরুল মুমিনীন হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ)-এর উপর এত চটে রয়েছেন কেন?' তিনি তাকে বললেনঃ হযরত উসমান (রাঃ)-কে তুমি বল- আপনি কি উহুদের যুদ্ধের সময় পলায়ন করেননি? বদরের যুদ্ধে অনুপস্থিত থাকেননি এবং হযরত উমার (রাঃ)-এর পন্থা পরিত্যাগ করেননি?”

হযরত ওলীদ (রাঃ) গিয়ে হযরত উসমান (রাঃ)-এর নিকট এ ঘটনাটি বর্ণনা করেন। তখন হযরত উসমান (রাঃ)এর উত্তরে বলেন (আরবী) অর্থাৎ (উহুদ যুদ্ধের অপরাধের জন্যে আল্লাহ তাদেরকে অবশ্যই ক্ষমা করে দিয়েছেন। সুতরাং সে জন্যে আর দোষারোপ কেন? বদরের যুদ্ধের সময় আমার সহধর্মিণী এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কন্যা হযরত রুকাইয়াহ রোগাক্রান্ত হওয়ায় তার রোগ দেখাশুনার কাজে ব্যস্ত থাকি। সে ঐ রোগেই মারা যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে গনীমতের মালের পূর্ণ অংশ দিয়েছিলেন। এটা স্পষ্ট কথা যে, একমাত্র সে ব্যক্তিই যুদ্ধলব্ধ মাল পেয়ে থাকে যে যুদ্ধক্ষেত্রে বিদ্যমান থাকে। সুতরাং বদরের যুদ্ধে আমার উপস্থিত থাকাই সাব্যস্ত হয়েছে। এখন বাকী থাকলো হযরত উমার (রাঃ)-এর পন্থা, ওটার ক্ষমতা আমারও নেই এবং আবদুর রহমান ইবনে আউফেরও (রাঃ) নেই। যাও তার নিকট এ সংবাদ পৌছিয়ে দাও।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।