আল কুরআন


সূরা সোয়াদ (আয়াত: 41)

সূরা সোয়াদ (আয়াত: 41)



হরকত ছাড়া:

واذكر عبدنا أيوب إذ نادى ربه أني مسني الشيطان بنصب وعذاب ﴿٤١﴾




হরকত সহ:

وَ اذْکُرْ عَبْدَنَاۤ اَیُّوْبَ ۘ اِذْ نَادٰی رَبَّهٗۤ اَنِّیْ مَسَّنِیَ الشَّیْطٰنُ بِنُصْبٍ وَّ عَذَابٍ ﴿ؕ۴۱﴾




উচ্চারণ: ওয়াযকুর ‘আবদানাআইইঊব । ইযনা-দা-রাব্বাহূআন্নী মাছছানিয়াশ শায়তা-নু বিনুসবিওঁ ওয়া ‘আযা-ব।




আল বায়ান: আর স্মরণ কর আমার বান্দা আইউবকে, যখন সে তার রবকে ডেকে বলেছিল, ‘শয়তান তো আমাকে কষ্ট ও আযাবের ছোঁয়া দিয়েছে’।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪১. আর স্মরণ করুন, আমাদের বান্দা আইউবকে, যখন তিনি তার রবকে ডেকে বলেছিলেন, শয়তান তো আমাকে যন্ত্রণা ও কষ্টে ফেলেছে,




তাইসীরুল ক্বুরআন: স্মরণ কর আমার বান্দা আইয়ূবের কথা, যখন সে তার প্রতিপালককে ডেকে বলেছিল- শয়ত্বান আমাকে কষ্ট আর ‘আযাবে ফেলেছে (অর্থাৎ আমার ধৈর্যচ্যুতি ঘটিয়ে আমাকে আল্লাহর অকৃতজ্ঞ বান্দাহ বানানোর জন্য কুমন্ত্রণা দিয়ে চলেছে)।




আহসানুল বায়ান: (৪১) স্মরণ কর, আমার দাস আইয়ুবের কথা, যখন সে তার প্রতিপালককে আহবান করে বলেছিল, শয়তান তো আমাকে যন্ত্রণা ও কষ্টে ফেলেছে। [1]



মুজিবুর রহমান: স্মরণ কর আমার বান্দা আইয়ুবকে! যখন সে তার রাব্বকে আহবান করে বলেছিলঃ শাইতানতো আমাকে যন্ত্রণা ও কষ্টে ফেলেছে।



ফযলুর রহমান: আমার বান্দা আইউবের কথা স্মরণ কর। যখন সে তার প্রভুকে সম্বোধন করে বলল, “শয়তান আমাকে দুর্ভোগ আর কষ্টে ফেলে দিয়েছে।”



মুহিউদ্দিন খান: স্মরণ করুণ, আমার বান্দা আইয়্যুবের কথা, যখন সে তার পালনকর্তাকে আহবান করে বললঃ শয়তান আমাকে যন্ত্রণা ও কষ্ট পৌছিয়েছে।



জহুরুল হক: আর আমাদের বান্দা আইয়ূবকে স্মরণ করো। দেখো, তিনি তাঁর প্রভুকে ডেকে বলেছিলেন -- "শয়তান আমাকে পীড়ন করছে ক্লান্তি ও কষ্ট দিয়ে।"



Sahih International: And remember Our servant Job, when he called to his Lord, "Indeed, Satan has touched me with hardship and torment."



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৪১. আর স্মরণ করুন, আমাদের বান্দা আইউবকে, যখন তিনি তার রবকে ডেকে বলেছিলেন, শয়তান তো আমাকে যন্ত্রণা ও কষ্টে ফেলেছে,


তাফসীর:

-


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৪১) স্মরণ কর, আমার দাস আইয়ুবের কথা, যখন সে তার প্রতিপালককে আহবান করে বলেছিল, শয়তান তো আমাকে যন্ত্রণা ও কষ্টে ফেলেছে। [1]


তাফসীর:

[1] আইয়ুব (আঃ)-এর রোগ ও তাতে তাঁর ধৈর্য ধারণ করার কাহিনী একটি প্রসিদ্ধ বিষয়। আল্লাহ তাআলা তাঁর সন্তান-সন্ততি, ধন-সম্পদ ধ্বংস করে এবং রোগ দ্বারা তাঁকে পরীক্ষা করেছিলেন। এই সময় তিনি কয়েক বছর রোগাক্রান্ত ছিলেন, এমনকি (তাঁর স্ত্রীগণও তাঁকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন) তাঁর সাথে মাত্র একজন স্ত্রী ছিলেন, যিনি সকাল-সন্ধ্যা তাঁর সেবা-শুশ্রূষা করতেন এবং কোথাও কাজ-কর্ম করে তাঁর জন্য কোন রকম আহারের ব্যবস্থা করতেন। এই বিষয়ে বিভিন্ন বিস্তারিত রেওয়ায়াত বর্ণনা করা হয়। কিন্তু তার মধ্যে কতটা সহীহ ও কতটা সহীহ নয়, তা জানার কোন নির্ভরযোগ্য সূত্র নেই। نُصُبٍ দ্বারা শারীরিক কষ্ট এবং عَذَابٍ দ্বারা ধন-সম্পদ ধ্বংস বুঝানো হয়েছে। আসলে সব কিছু করার মালিক একমাত্র আল্লাহ। এর পরেও তার সাথে শয়তানের সম্পর্কের কথা এই জন্য বলা হয়েছে যে, সম্ভবতঃ শয়তানের কুমন্ত্রণাই তাঁকে এমন কর্মে লিপ্ত করেছিল, যার কারণে আল্লাহর পক্ষ থেকে এই পরীক্ষা এসেছিল অথবা সম্পর্কের কথা আদবের দিকে লক্ষ্য করে বলা হয়েছে। অর্থাৎ ভালোকে আল্লাহর সাথে এবং মন্দকে নিজের বা শয়তানের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৪১-৪৪ নম্বর আয়াতের তাফসীর :



এ আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নাবী আইয়ূব (আঃ)-কে পরীক্ষা ও তাঁকে প্রদত্ত কয়েকটি মু‘জিযাহ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। আইয়ুব (আঃ) ধৈর্যশীল নাবীগণের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় এবং অনন্য দৃষ্টান্ত ছিলেন। বিপদে ধৈর্য ধারণ করায় এবং আল্লাহ তা‘আলার পরীক্ষাকে হাসিমুখে বরণ করে নেয়ায় আল্লাহ তা‘আলা আইয়ূব (আঃ)-কে ‘ধৈর্যশীল’ ও ‘সুন্দর বান্দা’ হিসেবে প্রশংসা করেছেন। কুরআনে ৪টি সূরার ৮টি আয়াতে তাঁর কথা উল্লেখ রয়েছে।



(اَنِّیْ مَسَّنِیَ الشَّیْطٰنُ بِنُصْبٍ وَّعَذَابٍ)



‘শয়তান তো আমাকে যন্ত্রণা ও কষ্টে ফেলেছে’ অর্থাৎ আইয়ুব (আঃ) দীর্ঘ দিন অসুস্থ্য ও কষ্ট ভোগ করার বিষয়টি শয়তানের দিকে সম্বন্ধ করেছেন, আল্লাহ তা‘আলার দিকে নয়। এটা তিনি করেছেন আল্লাহ তা‘আলার প্রতি শিষ্টাচারের দিকে লক্ষ্য রেখে। কেননা শয়তান নাবীদের ওপর কোন ক্ষমতা রাখে না। এমনকি কোন নেক্কার বান্দাকেও শয়তান পথভ্রষ্ট করতে পারে না, তবে সে ধোঁকা দিতে পারে, বিপদে ফেলতে পারে, যা আল্লাহ তা‘আলার হুকুম ব্যতীত কার্যকর হয় না। بِنُصْبٍ দ্বারা শারীরিক কষ্ট বা রোগ আর عَذَابٍ দ্বারা ধন-সম্পদ ধ্বংস হওয়া বুঝোনো হয়েছে। উল্লেখ্য যে, তাঁর শরীরের মাংস খসে পড়ে গিয়েছিল, শরীরে পোকা হয়েছিল, পচে-গলে দুর্গন্ধময় হয়ে যাওয়ায় ঘর থেকে বের করে জঙ্গলে ফেলে আসা হয়েছিল, ১৮ বা ৩০ বছর ধরে রোগগ্রস্ত ছিলেন এ জাতীয় কথা নাবীবিদ্বেষী ও ইসলামের শত্র“দের বানোয়াট গল্পগুজব বৈ কিছুই নয়। তাঁর শারীরিক কী অসুখ হয়েছিল সে ব্যাপারে সহীহ কোন বর্ণনা পাওয়া যায় না। তবে তাঁর ব্যাপারে বানোয়াট যে সকল অশালীন কথা বলা হয় তা একজন নাবীর জন্য সমীচিন না। তিনি বিপদে আক্রান্ত হলে আল্লাহ তা‘আলার কাছে দু‘আ করলেন এ কথা দিয়েই তাঁর আলোচনা শুরু করা হয়েছে। যেমন সূরা আম্বিয়াতেও এ কথা দ্বারাই শুরু করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর দু‘আ কবূল করে সকল কষ্ট ও বেদনা দূর করে দিলেন।



যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন :



(فَاسْتَجَبْنَا لَھ۫ فَکَشَفْنَا مَا بِھ۪ مِنْ ضُرٍّ)



‘তখন আমি তার ডাকে সাড়া দিলাম, তার দুঃখ-কষ্ট দূরীভূত করে দিলাম’ (সূরা আম্বিয়া ২১ : ৮৪) কীভাবে দূর করা হয়েছিল তার চিকিৎসা বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন : তুমি তোমার পা দ্বারা মাটিতে আঘাত কর, ফলে তা থেকে ঠাণ্ডা পানি বের হবে, তুমি তা থেকে পান কর এবং তা দ্বারা গোসল কর এতে তোমার ভেতর ও দেহের কষ্ট দূর হয়ে যাবে।



(وَّاٰتَیْنٰھُ اَھْلَھ۫ وَمِثْلَھُمْ)



‘তাকে তার পরিবার-পরিজন ফিরিয়ে দিলাম এবং তাদের সঙ্গে তাদের সমপরিমাণ আরো দিলাম’ এখানে পরিষ্কারভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি তাঁর বিপদে ধৈর্য ধারণের পুরস্কার দ্বিগুণ পেয়েছিলেন দুনিয়াতে এবং আখেরাতে। বিপদে পড়ে যা কিছু তিনি হারিয়েছিলেন, সবকিছুই তিনি পর্যাপ্ত পরিমাণে ফেরত পেয়েছিলেন।



অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন :



(وَکَذٰلِکَ نَجْزِی الْمُحْسِنِیْنَ)



“আর আমি এভাবেই সৎকর্মপরায়ণদেরকে পুরস্কৃত করি।” (সূরা আন‘আম ৬ : ৮৪) তিনি কি তাঁর মৃত সন্তানাদি পুনর্জীবিত পেয়েছিলেন, না-কি হারানো গবাদি পশু ফেরত পেয়েছিলেন এসব কষ্ট-কল্পনার কোন প্রয়োজন নেই।



(رَحْمَةً مِّنْ عِنْدِنَا)



‘আমার বিশেষ রহমতরূপে’ অর্থাৎ আইয়ূব (আঃ)-কে বিপদ থেকে মুক্তি ও পরিবারবর্গকে ফেরত দেয়া ইত্যাদি সবই ছিল আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে রহমত। তিনি অনুগ্রহ করে দান করেছেন। আয়াতের এ শব্দটিকে ‘রহীমা’ করে এটিকে আইয়ূব (আঃ)-এর স্ত্রীর নাম হিসেবে একদল লোক সমাজে চালু করে দিয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা যেন বলছেন যে, আইয়ূবের স্ত্রী রহীমা তার স্বামীকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। পরে আমি তাকে আইয়ূবের কাছে ফিরিয়ে দিলাম। বস্তুত এটি একটি উদ্ভট মিথ্যা ব্যাখ্যা ছাড়া কিছুই নয়। মূলতঃ আইয়ূব (আঃ)-এর স্ত্রীর নাম কী ছিল সে বিষয়ে সঠিক কোন তথ্য কুরআন ও সহীহ হাদীসে নেই।



আইয়ূব (আঃ)-এর অত্র ঘটনা বর্ণনা করার পর আল্লাহ তা‘আলা বলেন :



(وَذِکْرٰی لِاُولِی الْاَلْبَابِ)



‘এবং জ্ঞানীদের জন্য উপদেশস্বরূপ’ আর সূরা আম্বিয়ায় বলা হয়েছে-



(وَذِکْرٰی لِلْعٰبِدِیْنَ)



‘আর এটা ‘ইবাদতকারীদের জন্য উপদেশস্বরূপ’, অর্থাৎ এতে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে যে, আল্লাহর দাসত্বকারী ব্যক্তিই প্রকৃত জ্ঞানী এবং প্রকৃত জ্ঞানী তিনিই যিনি জীবনের সর্বক্ষেত্রে আল্লাহ তা‘আলার দাসত্বকারী।



(وَخُذْ بِیَدِکَ ضِغْثًا)



‘এক মুঠো তৃণশলা হাতে নাও’ অত্র আয়াতে আরেকটি ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। তাহল আইয়ূব (আঃ) অসুস্থ অবস্থায় রাগের বশবর্তী হয়ে শপথ করলেন যে, তিনি সুস্থ হলে তাঁর স্ত্রীকে একশত বেত্রাঘাত করবেন। রোগ তাড়িত স্বামী কোন কারণবশত স্ত্রীর ওপর ক্রোধবশে এরূপ শপথ করতেও পারেন। কিন্তু কেন তিনি এ শপথ করেছিলেন তার কোন স্পষ্ট বর্ণনা কুরআন ও সহীহ সুন্নাতে পাওয়া যায় না। ফলে তাফসীরের কিতাবে নানান গল্পগুজব উল্লেখ রয়েছে যা আইয়ূব (আঃ)-এর পুণ্যশীলা স্ত্রীর উচ্চ মর্যাদার বিপরীত। আইয়ূব (আঃ)-এর স্ত্রী আল্লাহ তা‘আলার প্রিয় বান্দীদের অন্যতম। তাকে কোনরূপ কষ্টদান আল্লাহ তা‘আলা পছন্দ করেননি। অন্যদিকে শপথ ভঙ্গ করাটাও নাবীর মর্যাদার খেলাফ। তাই আল্লাহ তা‘আলা একটি সুন্দর পথ বলে দিলেন। তা হল, একমুষ্ঠি তৃণশলা নিয়ে প্রহার করবে যা মোটেও কষ্টদায়ক নয়।



প্রত্যেক নাবীকেই কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়েছে। তারা সকলেই সে সব পরীক্ষায় ধৈর্যধারণ করেছেন ও উত্তীর্ণ হয়েছেন। কিন্তু আইয়ূব (আঃ)-এর আলোচনায় বিশেষভাবে



(اِنَّا وَجَدْنٰھُ صَابِرًا)



“আমি তাকে অবশ্যই ধৈর্যশীল পেয়েছি।” (সূরা সোয়াদ ৩৮ : ৪৪) বলার মধ্যে ইঙ্গিত রয়েছে যে, আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে কঠিনতম কোন পরীক্ষায় ফেলেছিলেন। তবে সে পরীক্ষা কী তা কুরআনে উল্লেখ নেই। হাদীসে শুধু এতটুকু এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : আইয়ূব (আঃ) একদিন নগ্নাবস্থায় গোসল করছিলেন। এমন সময় তাঁর ওপর সোনার টিড্ডি পাখিসমূহ এসে পড়ে। তখন তিনি সেগুলোকে ধরে কাপড়ে ভরতে থাকেন। এমতাবস্থায় আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে বলেন : হে আইয়ূব



أَلَمْ أَكُنْ أَغْنَيْتُكَ عَمَّا تَرَي



আমি কি তোমাকে এসব থেকে অমুখাপেক্ষী করিনি? আইয়ূব (আঃ) জবাবে বললেন :



بَلَي وَعِزَّتِكَ وَلَكِنْ لَا غِنَي بِي عَنْ بَرَكَتِكَ



তোমার ইযযতের কসম! অবশ্যই তুমি আমাকে তা দিয়েছ। কিন্তু তোমার বরকত থেকে আমি অমুখাপেক্ষী নই। (সহীহ বুখারী হা. ২৭৯) সুতরাং নাবীর মর্যাদার খেলাফ ও যা ফাসেকদের হাসি-ঠাট্টার খোরাক হয় এমন কথা ও মন্তব্য না করাই শ্রেয়।



আইয়ূব (আঃ) সম্পর্কে বিস্তারিত ঘটনা সূরা ‘আম্বিয়ার ৮৩-৮৪ নম্বর আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :



১. বিপদে ধৈর্য ধারণ করতে হবে। যেমন ধৈর্য ধারণ করেছিলেন আইয়ূব (আঃ)।

২. শপথ করলে তা অবশ্যই পূরণ করতে হবে। আর যদি শপথ ভঙ্গ করতে চায় তাহলে কাফ্ফারা আদায় করতে হবে।

৩. বড় পরীক্ষায় বড় পুরস্কার লাভ করা যায়। দুনিয়াতে সবচেয়ে বড় পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলেন নাবী-রাসূলগণ, তারপর ঈমানে যারা তাদের পরবর্তী স্তরে তারা।

৪. প্রকৃত মু’মিনগণ আনন্দে ও বিষাদে সর্বাবস্থায় আল্লাহ তা‘আলার রহমতের আশা করে। বিপদে পড়লে আল্লাহ তা‘আলার রহমত থেকে নিরাশ হয় না।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৪১-৪৪ নং আয়াতের তাফসীর:

আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বীয় বান্দা ও রাসূল হযরত আইয়ুব (আঃ)-এর বর্ণনা দিচ্ছেন এবং তাঁর চরম ধৈর্য ও কঠিন পরীক্ষায় পাশের প্রশংসা করছেন। তার ধন-মাল ধ্বংস হয়ে যায় এবং সন্তান-সন্ততি মৃত্যুবরণ করে। তার দেহে রোগ দেখা দেয়। এমনকি তার দেহে সূচের ছিদ্রের পরিমাণ এমন জায়গাও বাকী ছিল না যেখানে রোগ দেখা দেয়নি। তার অন্তরে শুধু প্রশান্তি বিরাজমান ছিল। আর তাঁর দারিদ্রের অবস্থা এই ছিল যে, এক সন্ধ্যার খাবারও কাছে ছিল না। ঐ অবস্থায় তাঁর কাছে এমন কোন লোক ছিল না যে তার খবরাখবর নেয়। শুধুমাত্র তার এক স্ত্রী তাঁর কাছে থাকতেন ও তাঁর সেবা করতেন যার অন্তরে আল্লাহর ভয় ও স্বামী প্রেম বিদ্যমান ছিল। তিনি লোকদের কাজ কাম করে যা কিছু পেতেন তা দ্বারাই নিজের ও স্বামীর আহারের ব্যবস্থা করতেন। সুদীর্ঘ আট বছর পর্যন্ত এ অবস্থাই থাকে। অথচ ইতিপূর্বে তাঁর ধন-মাল ও সন্তান-সন্ততির প্রাচুর্য ছিল। এতে তাঁর সমকক্ষ আর কেউই ছিল না। দুনিয়ার সুখ-শান্তির উপকরণ সবই তাঁর ছিল। কিন্তু সবই ছিনিয়ে নেয়া হয় এবং শহরের ময়লা আবর্জনা ফেলার জায়গায় তাঁকে রেখে আসা হয়। এ অবস্থায় একদিন দু’দিন নয় এবং এক বছর দু'বছর নয়, বরং দীর্ঘ আটটি বছর অতিবাহিত হয়। আপন ও পর সবাই তার থেকে বিমুখ হয়ে যায়। এমন কেউ ছিল না যে তাঁর অবস্থার কথা তাঁকে জিজ্ঞেস করে। শুধু তার কাছে তাঁর এই পত্নীটিই ছিলেন যিনি সব সময় তার সেবায় লেগে থাকতেন। শুধুমাত্র উভয়ের পেট পালনের জন্যে তাঁকে পরিশ্রম ও মজুরীতে যে সময়টুকু ব্যয় করতে হতো ঐ সময়টুকুই বাধ্য হয়ে তিনি স্বামী হতে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় কাটাতেন। অবশেষে হযরত আইয়ূব (আঃ)-এর পরীক্ষার পরিসমাপ্তি ঘটে। আল্লাহ পাকের এই মনোনীত বান্দা তাঁর দরবারে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে প্রার্থনা করেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমাকে তো কষ্ট ও বিপদ স্পর্শ করেছে এবং আপনি তো দয়ালুদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।” বলা হয়েছে যে, তিনি এ প্রার্থনায় তার শারীরিক দুঃখ কষ্ট এবং মাল-ধন ও সন্তান-সন্ততি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার দুঃখ-কষ্ট দূর করার কথা উল্লেখ করেছিলেন। তৎক্ষণাৎ পরম দয়ালু আল্লাহ তার প্রার্থনা কবুল করেন এবং বলেনঃ “তুমি তোমার পদ দ্বারা ভূমিতে আঘাত কর, এই তো গোসলের সুশীতল পানি ও পানীয়।” পা দ্বারা ভূমিতে আঘাত করা মাত্রই সেখানে একটি প্রস্রবণ উথলিয়ে উঠলো। আল্লাহ তাআলার নির্দেশানুসারে তিনি ঐ পানিতে গোসল করলেন। ফলে তার দেহের সব রোগ দূর হয়ে গেল এবং এমনভাবে সুস্থ হয়ে উঠলেন যে, যেন তাঁর দেহে কোন রোগ ছিল না। আবার অন্য জায়গায় তাকে ভুমিতে পা দ্বারা আঘাত করতে বলা হয়। আঘাত করা মাত্রই আর একটি প্রস্রবণ জারী হয়ে যায় এবং তাকে ঐ পানি পান করতে বলা হয়। ঐ পানি পান করা মাত্রই আভ্যন্তরীণ রোগও দূর হয়ে যায়। এই ভাবে বাহির ও ভিতরের পূর্ণ সুস্থতা তিনি লাভ করেন।

হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহর নবী হযরত আইয়ূব (আঃ) আঠারো বছর পর্যন্ত এই দুঃখ কষ্টের মধ্যে জড়িত ছিলেন। তাঁর আপন ও পর সবাই তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। শুধুমাত্র তাঁর দু’জন অন্তরঙ্গ বন্ধু সকাল-সন্ধ্যায় তাঁকে দেখতে আসতো। একদিন তাদের একজন অপরজনকে বললোঃ “আমার মনে হয় যে, হযরত আইয়ুব (আঃ) এমন কোন পাপ করেছেন যে পাপ দুনিয়ার আর কেউই করেনি। কারণ, তিনি দীর্ঘ আঠারো বছর ধরে এ রোগে ভুগছেন, অথচ আল্লাহ তাঁর প্রতি দয়া করছেন না!” সন্ধ্যার সময় দ্বিতীয় ঐ লোকটি প্রথম ঐ লোকটির এ কথা হযরত আইয়ুব (আঃ)-কে বলে দেয়। এ কথা শুনে হযরত আইয়ুব (আঃ) খুবই দুঃখিত হন এবং বলেনঃ “কেন সে একথা বললো? অথচ আল্লাহ খুব ভাল জানেন যে, আমি যখন কোন দুই ব্যক্তিকে পরস্পর ঝগড়া করতে ' দেখতাম এবং দু’জনই আল্লাহর নাম নিতো আমি তখন বাড়ী গিয়ে তাদের দু’জনের পক্ষ হতে কাফফারা আদায় করে তাদের ঝগড়া মিটিয়ে দিতাম। কেননা, আমি এটা পছন্দ করতাম না যে, সত্য ব্যাপার ছাড়া আল্লাহর নাম নেয়া হোক (কেননা, এতে আল্লাহর নামে বেয়াদবী করা হয় এবং এটা আমার নিকট অসহনীয় ব্যাপার)।”

ঐ সময় হযরত আইয়ুব (আঃ) একাকী চলাফেরা এমন কি উঠা-বসাও করতে পারতেন না। তাঁর স্ত্রী তাঁকে তাঁর প্রাকৃতিক প্রয়োজনে উঠিয়ে নিয়ে যেতেন ও আসতেন। একদা তাঁর ঐ স্ত্রী হাযির ছিলেন না। তিনি অত্যন্ত কষ্ট পাচ্ছিলেন। ঐ সময় তিনি পরম করুণাময় আল্লাহর দরবারে তার শারীরিক সুস্থতার জন্যে প্রার্থনা করেন। তখন আল্লাহ তাআলা তাঁর নিকট অহী করেনঃ “তুমি তোমার পদ দ্বারা ভূমিতে আঘাত কর, এই তো গোসলের সুশীলত পানি আর পানীয়।”

অতঃপর তিনি সম্পূর্ণরূপে আরোগ্য লাভ করেন। দীর্ঘক্ষণ পর তার স্ত্রী ফিরে এসে দেখেন যে, তাঁর রুগ্ন স্বামী তো নেই, বরং তার স্থানে একজন উজ্জ্বল চেহারা বিশিষ্ট সুস্থ মানুষ বসে আছেন। তিনি তাকে চিনতে পারলেন না। তাঁকে তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর বান্দা! আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুন! এখানে একজন আল্লাহর নবী রুগ্ন অবস্থায় ছিলেন তাঁকে দেখেছেন কি? আল্লাহর কসম! তিনি যখন সুস্থ ছিলেন তখন তার যেমন চেহারা ছিল, ঐ চেহারার সাথে আপনার চেহারার খুবই সাদৃশ্য রয়েছে। তিনি দেখতে যেন প্রায় আপনার মতই ছিলেন।” তিনি উত্তরে বললেনঃ “আমিই সেই ব্যক্তি।” বর্ণনাকারী বলেন যে, হযরত আইয়ূব (আঃ)-এর দুটি গোলা ছিল। একটিতে গম রাখা হতো এবং অপরটিতে রাখা হতো যব। আল্লাহ তা'আলা দুই খণ্ড মেঘ পাঠিয়ে দেন। এক মেঘখণ্ড হতে সোনা বর্ষিত হয় এবং ঐ সোনা দ্বারা একটি গোলা ভর্তি হয়ে যায়। তারপর দ্বিতীয় মেঘখণ্ড হতেও সোনা বর্ষিত হয় এবং তা দ্বারা অপর গোলাটি ভর্তি করা হয়।” (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) ও ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হযরত আইয়ুব (আঃ) উলঙ্গ হয়ে গোসল করছিলেন এমন সময় আকাশ হতে সোনার ফড়িং বর্ষিতে শুরু হয়। হযরত আইয়ুব (আঃ) তাড়াতাড়ি ওগুলো স্বীয় কাপড়ে জড়িয়ে নিতে শুরু করেন। তখন আল্লাহ তা'আলা তাকে ডাক দিয়ে বলেনঃ “হে আইয়ূব (আঃ)! তুমি যা দেখছো তা থেকে কি আমি তোমাকে বেপরোয়া ও অভাবমুক্ত করে রাখিনি?” তিনি জবাবে বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! হ্যা, সত্যিই আপনি আমাকে এসব হতে বেপরোয়া ও অভাবমুক্ত রেখেছেন। কিন্তু আপনার রহমত হতে আমি বেপরোয়া ও অমুখাপেক্ষী নই।” (ইমাম আহমাদ (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) এককভাবে এটা তাখরীজ করেছেন)

সুতরাং মহান আল্লাহ তাঁর এই ধৈর্যশীল বান্দাকে ভাল প্রতিদান ও উত্তম পুরস্কার প্রদান করেন। তাকে তিনি তাঁর সন্তানগুলোও দান করেন এবং অনুরূপ সংখ্যক আরো বেশী দেন। এমনকি হযরত হাসান (রঃ) ও হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ্ তাঁর মৃত সন্তানগুলোকেও পুনর্জীবিত করেন এবং অনুরূপ সংখ্যক আরো বেশী দান করেন। এটা ছিল আল্লাহর রহমত যা তিনি হযরত আইয়ূব (আঃ)-কে তার ধৈর্য, স্বৈর্য, আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন এবং বিনয় ও নম্রতার প্রতিদান হিসেবে দান করেছিলেন। এটা বোধশক্তি সম্পন্ন লোকদের জন্যে উপদেশ স্বরূপ যে, ধৈর্যশীল লোকেরা পরিণামে এভাবেই স্বচ্ছলতা ও সুখ-শান্তি লাভ করে থাকে।

কোন কোন লোক হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আইয়ুব (আঃ) তাঁর স্ত্রীর কোন এক কাজের কারণে তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন। কেউ কেউ বলেন যে, তাঁর স্ত্রী তার চুলের খোপা বিক্রি করে তাঁদের খাদ্য এনেছিলেন বলে তিনি তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন। ঐ সময় তিনি কসম করেছিলেন যে, আরোগ্য লাভ করার পর তিনি তাঁর স্ত্রীকে একশ’ চাবুক মারবেন। অন্যেরা তার অসন্তুষ্টির অন্য কারণ বর্ণনা করেছেন। সুস্থ হওয়ার পর তিনি তাঁর কসম পুরো করার ইচ্ছা করেন। কিন্তু যে শাস্তি দেয়ার শপথ তিনি করেছিলেন তার সতী-সধ্বী স্ত্রীর জন্যে মোটেই তা যোগ্য ছিল না। কারণ তিনি এমন সময় স্বামীর সেবায় সদা লেগে থাকেন যখন তার সেবা করার আর কেউই ছিল না। এ জন্যে বিশ্ব-জগতের প্রতিপালক পরম দয়ালু আল্লাহ তাঁর প্রতি সদয় হন এবং স্বীয় নবী (আঃ)-কে হুকুম করেন যে, তিনি যেন এক মুষ্টি তৃণ নেন (যাতে একশ’টি তৃণ থাকবে) এবং তা দ্বারা তাঁর স্ত্রীকে আঘাত করেন এবং এভাবেই যেন নিজের কসম পুরো করেন। এতে তাঁর কসমও পুরো হয়ে যাবে, আবার ঐ সতী-সাধ্বী ধৈর্যশীলা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারিণীর কোন কষ্ট হবে না। আল্লাহ তাআলার নীতি এই যে, তাঁর যেসব সৎ বান্দা তাকে ভয় করে তাদেরকে তিনি দুঃখ-কষ্ট ও অশান্তি হতে রক্ষা করে থাকেন।

এরপর মহান আল্লাহ হযরত আইয়ূব (আঃ)-এর প্রশংসা করছেন যে, তিনি তাঁকে ধৈর্যশীল পেলেন। তিনি তাঁর কতই না উত্তম বান্দা ছিলেন। তিনি ছিলেন আল্লাহর অভিমুখী। তার অন্তরে আল্লাহর খাঁটি প্রেম ছিল। তিনি তার দিকেই সদা ঝুঁকে থাকতেন। এ জন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যে কেউ আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহ তার পথ করে দিবেন এবং তাকে তার ধারণাতীত উৎস হতে দান করবেন রিযক। যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর নির্ভর করে তার জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট। আল্লাহ তাঁর ইচ্ছা পূরণ করবেনই। আল্লাহ্ সমস্ত জিনিসের জন্যে স্থির করেছেন নির্দিষ্ট মাত্রা।” (৬৫:২-৩) জ্ঞানী আলেমগণ এ আয়াত হতে বহু ঈমানী ইত্যাদি মাসআলা গ্রহণ করেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।